• Bangla - তন্ত্র

    ডামরু-সাধনা

    তথাগত সান্যাল অধ্যায় ১: ডামরুর প্রথম ধ্বনি শিবরাত্রির রাত। হিমছোঁয়া বাতাসে ভেসে আসছে ধূপধুনোর গন্ধ, শালবনের ফাঁকে পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে মাটি ছুঁয়ে। উত্তর ত্রিপুরার অরণ্যঘেরা গুহামন্দিরে দাঁড়িয়ে ঋভু রায়চৌধুরী অনুভব করলেন—এ কেবল একটি সাধারন রাত্রি নয়। দিনদুয়েক আগেই কলকাতা থেকে আসার সময় লোকাল ড্রাইভার বলে দিয়েছিল, “এই মন্দিরে আজও কিছু ঘটে… বিশেষ করে শিবরাত্রির রাতে।” ঋভু প্রথমে হেসেছিলেন। তবে সেই হাসি চাপা পড়ে গেল, যখন তিনি ওই গুহার সামনে পৌঁছে এক ছায়াময় বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখলেন—দাঁতহীন মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি, গায়ে জটাধারী চেহারা, আর হাতে ছিল একটি পুরনো কাঠের বাক্স। বৃদ্ধ কোনও কথা না বলে কেবল ইশারায় বাক্সটি ঋভুর…

  • Bangla - তন্ত্র

    ডাকঘরের তান্ত্রিক

    অধ্যায় ১: চিঠির মতো নিঃশব্দ পাহাড়ে ওঠার পথে হঠাৎ করে কুয়াশা ঘন হয়ে এল। ট্রেকিং পাথ বেয়ে যে ঘোড়ামারা ডাকে ওঠা গ্রামের দিকে এগোচ্ছিল অভিজিৎ সরকার, তার চারপাশে যেন হঠাৎই সময় থমকে গেল। বালির কাঁধে বয়ে আনা ছোট স্যুটকেস, একটা জলচৌকো ব্যাগ আর হাতে ধরা সরকারি ফাইলের খাম—সবই ভার হয়ে উঠল যেন হঠাৎ। এই ডাকঘরটা, পুরুলিয়ার এক পাহাড়ি অঞ্চলের প্রান্তে অবস্থিত, বহু বছর আগেই তালাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে রেকর্ডে লেখা ছিল। কিন্তু হেড অফিস থেকে অদ্ভুত এক চিঠির সূত্র ধরে, তাকে বদলি করা হল এই ‘বন্ধ’ ডাকঘরে। সে ভেবেছিল হয়তো কোনো ফাইলের গরমিল, অথবা ভুল পদক্ষেপ। কিন্তু বদলিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন…

  • Bangla - তন্ত্র - রহস্য গল্প

    নির্বাপিত প্রদীপ

    সুব্রত গাঙ্গুলি প্রতীক দত্ত, কলকাতার এক নামকরা দৈনিকের অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিক, চিরকাল যুক্তির পথ ধরেই হাঁটতে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু কিছু ঘটনা এমন থাকে, যেগুলো যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়—এমনই এক ঘটনার পেছনে ছুটে সে এসে পৌঁছেছিল পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এক গ্রামে, নাম উজানডাঙা। শহর থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে, রুক্ষ কাঁচা রাস্তা ও নিস্তব্ধ পলিমাটির ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামটির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি—মহিমা চৌধুরী প্রাসাদ। এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কাহিনি তাকে টেনেছিল এখানে: প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তির রাতে, বাড়ির মধ্যবর্তী ত্রিকোণ চত্বরে রাখা এক প্রাচীন ব্রোঞ্জের প্রদীপ নিজে থেকেই জ্বলে ওঠে—কেউ জ্বালায় না, কেউ দেখেনি জ্বালাতে, তবুও জ্বলে। খবরটি প্রথম সে পায় এক…

  • Bangla - তন্ত্র

    ঘড়ির কাঁটা ও কালতন্ত্র

    রৌনক রায় ১ রাত তখন দেড়টা। সল্টলেকের গলির মুখে জ্বলছে কেবল একটি পথবাতি। সেই হালকা আলোয় ঢাকা পড়ে আছে বিশাল এক ভবনের শেড—যেটিকে বাইরে থেকে সাধারণ কোনো গবেষণাগার মনে হলেও, তার ভেতরে সময় নিয়ে চলছিল এক অকল্পনীয় গবেষণা। ড. অনির্বাণ চৌধুরী বসে আছেন ডেস্কে, সামনে ছড়ানো রয়েছে ঘড়ির যন্ত্রাংশ, একটি প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা চর্মপুঁথি এবং তাঁর সর্বশেষ নির্মিত কোয়ান্টাম পেনডুলাম। সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে, আর তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করছে—দীর্ঘদিনের অভ্যাসে তিনি বুঝে গেছেন, আজ কিছু হতে চলেছে। হঠাৎই ঘড়ির কাঁটা, যেটি তিনি নিজেই ডিজাইন করেছিলেন সময়চক্র পরিমাপের জন্য, ধীরে ধীরে থেমে গিয়ে ঘুরে গেল উল্টো…

  • Bangla - তন্ত্র

    নির্বাণপথের দ্বার

    সৌম্যজ্যোতি ভট্টাচার্য ভোর চারটের দিকে কলকাতার আকাশে বৃষ্টির গন্ধ মিলিয়ে ছিল ধোঁয়ার মত আবছা আলো। কৌশিক মৈত্র জানালার ধারে বসে ছিল চুপ করে, ছয়তলার ফ্ল্যাটের নিচে তখনও শহর জেগে ওঠেনি। তার গলায় ঝুলে থাকা কাঁপতে থাকা একচিলতে নিঃশ্বাস, বিছানার ধারে পড়ে থাকা খোলা ঘুমের ওষুধের শিশি, ও পাশের টেবিলে ছেঁড়া কাগজে কুংথিত দুটো শব্দ— “মাফ করো”। গত রাতটা সে ঠিক কীভাবে পার করল, মনে পড়ে না। অথবা, মনে পড়াতে চায় না। এ জীবনের সব ছায়া, সব আগুন, সব ব্যর্থতা ঘিরে রেখেছিল তাকে এক অদ্ভুত অস্পষ্ট ধোঁয়াশায়, যেন কিছুই আর বাস্তব নয়—সবই বাষ্প। সেই বাষ্পেই ঘোর লাগা চোখে হঠাৎ পড়ে যায়…

  • Bangla - তন্ত্র - ভূতের গল্প

    অরণ্যতন্ত্র

    শুভ্রনীল ধর ১ জুলাই মাসের ঘন মেঘলা এক সকালে পুরুলিয়ার পাহাড়ঘেরা রাস্তায় এগিয়ে চলেছে একটি সাদা জিপ—ড্রাইভারের সিটে বসে বছর পঁয়ত্রিশের এক লোক, কাঁধে গামছা ঝোলানো, কপালে রোদচশমা তুলে, মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় কিছু গুনগুন করছিল। তার পেছনে জানালার পাশে বসে অদ্বৈত চ্যাটার্জি দূরের দিকে তাকিয়ে ছিল—বৃষ্টির ধোঁয়া-ধোঁয়া কুয়াশার পর্দার আড়ালে যেন গাছগুলোর গায়ে একটা ধোঁয়াটে সুরভি জড়িয়ে আছে। অদ্বৈত কলকাতা থেকে আগত এক পরিবেশকর্মী, শহুরে সভ্যতার মাঝে বড় হওয়া অথচ মনেপ্রাণে প্রকৃতির ভক্ত। বনজীবনের সঙ্গে পরিচয় তার দীর্ঘদিনের, কিন্তু জঙ্গল, বিশেষ করে আদিবাসী সংস্কৃতি ও লোকবিশ্বাসের গভীরে ঢোকার এই প্রথম। সে এসেছে একটি প্রকল্পের আওতায়—”বৃক্ষজীবন”—যার মূল…

  • Bangla - তন্ত্র

    রক্ততিলক

    সৌভিক নন্দী ১ কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলের সেই রাতটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা ছিল, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ। শহরের ব্যস্ততা একটু শান্ত হলেও, গলিগুলোয় যেন ছায়া আরও ঘন হয়ে উঠছিল। ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ এক রিকশাওয়ালা প্রথম মৃতদেহটি দেখতে পান—লাল রঙের কাঁথায় মোড়া একটি দেহ, যার কপালে স্পষ্ট লাল তিলক, যেন রক্তে আঁকা। তার চিৎকারে স্থানীয় থানা ছুটে আসে। অচিন্ত্য বসু, ডেপুটি কমিশনার (ক্রাইম ব্রাঞ্চ), সকালে ফোন পান—”স্যর, কালীঘাটে অদ্ভুত খুন… একটা সিম্বলিক মার্ডার বলেই মনে হচ্ছে।” সাদা শার্ট গায়ে চাপিয়ে, ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ হাতে, তিনি বললেন, “জীবনে কিছুই সিম্বলিক হয় না। সব কিছুরই মানে আছে। পাঠাও লোক।” কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিজেই…

  • Bangla - তন্ত্র

    কৃষ্ণনাগিনী

    তপতী ঘোষাল ১ ঝাড়গ্রামের পাতাঝরা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলেছে একটা পুরনো জিপ, যার ইঞ্জিনের গর্জন আর পেছনের চাকার কাদামাখা ঝাঁকুনিতে ভেসে যাচ্ছে অরণ্যের শান্তি। বসন্তের শেষ সপ্তাহ, গাছগুলো যেন নিজেদের সবুজ পোশাক খুলে রেখেছে – পাতাগুলো শুকিয়ে পড়ে আছে মাটিতে, যার উপর গাড়ির টায়ার টেনে দিচ্ছে সরু দাগ। জিপের ভিতর বসে থাকা স্পেনীয় গবেষক ড. লুইস রডরিগেজ জানালার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ চমকে উঠলেন—একটা কালো কুড়ুলের মতো আকৃতির কিছু খুব দ্রুত রাস্তা পেরিয়ে গেল। পাশে বসা স্থানীয় গাইড গঙ্গা হাঁসদা বলল, “এইসব কিছু না স্যার… সাপেরা এই সময় খুব সক্রিয় থাকে।” লুইসের ঠোঁটে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল। সে বহুদিন ধরেই…

  • Bangla - তন্ত্র

    চৌরঙ্গীর অমাবস্যা

    তিথি বসু পর্ব ১: তাবিজওয়ালা ঘর শহরের কোলাহলের মাঝখানে, যেখান থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ঝাপসা দেখা যায়, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে চৌরঙ্গীর একটি পুরনো হোটেল—‘হোটেল সম্রাট’। বাইরে থেকে দেখলে আধুনিক মনে হলেও ভিতরে ঢুকলেই যেন সময় পিছিয়ে যায়—ফিকে আলো, সাদা কাঠের জানালা, আর মোটা মোটা পর্দা যা আলো ঢুকতে দেয় না। সেই হোটেলের ৩১৫ নম্বর ঘর থেকে পাওয়া গেল এক মৃতদেহ। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দেখে—একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ খাটে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। ঘরের ভিতর অদ্ভুত একটা গন্ধ—মাটির, ধূপের, আর যেন ভেজা ছাইয়ের গন্ধ। মৃতদেহের পাশে পড়ে ছিল একটি তাবিজ—লাল সুতোয় বাঁধা, তাতে শিকল দিয়ে আটকানো একটা ক্ষুদ্র রৌপ্য বাক্স। এই খুনের…

  • Bangla - তন্ত্র

    মশানতান্ত্রিক

    সমীক দাশগুপ্ত ১ বারাণসীর গলির গাঢ় ধুলো, ভাঙাচোরা ঘাট আর প্রাচীন মন্দিরের শিলালিপির মাঝখানে হাঁটতে হাঁটতে অরুণাভ ক্যামেরা হাতে পৌঁছে গিয়েছিল মণিকর্ণিকা ঘাটের একটু দূরের একটি পুরনো শ্মশানে। খুব বেশি কেউ আসে না এখানে। জায়গাটির একধরনের পবিত্র ভয়াবহতা আছে—যেন কেউ নিঃশব্দে দেখছে সব, পুড়তে থাকা কাঠের ফাঁক দিয়ে, আগুনের গন্ধে মিশে থাকা পুরোনো আত্মার নিঃশ্বাসে। অরুণাভ এমনটাই খুঁজছিল। তার ফটোগ্রাফির বিষয়বস্তু বরাবরই ছিল ‘আত্মা আর দেহের অন্তরালের গল্প’। সে বলে, “জীবন নয়, মৃত্যু সত্যি, তাই আমি তাকেই দেখি।” এমন একটা কথা শুনে কেউ হেসে উড়িয়ে দিলেও, অরুণাভ নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়ায় এক নিঃসঙ্গ দর্শন — যে মৃত্যু দেখেছে, সে…