নারীবিষয়ক গল্প
-
অদেখা সত্য
সোনালী গুপ্ত অধ্যায় ১ – নিখুঁত প্রারম্ভ রচনার জীবন শুরু হয়েছিল এক নিরবচ্ছিন্ন শান্তির আভায়, যা অনেক দিন ধরে সে অনুভব করছিল। সকালগুলো নরম আলোয় ভরে ওঠা রঙিন কফির গন্ধ এবং অরুণের সঙ্গে হালকা কথোপকথনের মধ্য দিয়ে শুরু হতো। শহরের মাঝারি আয়ের একটি বস্তিতে বসবাস করলেও তাঁদের জীবনযাত্রা সবসময়ই সরলতার মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে পেত। রচনা…
-
নিষিদ্ধ উঠোন
শ্রেয়া বসু গ্রামের ভেতরটা এখনও যেন এক পুরোনো ছবির মতো আটকে আছে—মাটির রাস্তা, গাছপালার ছায়া, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী জমিদারবাড়ি। বাড়িটার সামনে বিশাল দোতলা বারান্দা, অথচ তার উঠোনে কারও পদচিহ্ন নেই। বছরের পর বছর ধরে শুনে আসা কড়া নিয়ম—“মেয়েরা এই উঠোনে পা রাখবে না।” যেন মেয়েদের উপস্থিতি ওই পুরুষতান্ত্রিক প্রতীকের গাম্ভীর্য ভেঙে দেবে। শিউলি,…
-
অদৃশ্য শিকল
সোমা সেন শহরের ভিড়ভাট্টা আর হট্টগোলের মধ্যে অনন্যার জীবন যেন এক অন্য ছন্দে বাঁধা। সকালবেলায় তার দিন শুরু হয় একেবারে মেশিনের মতো—অ্যালার্মের কর্কশ আওয়াজে ঘুম ভাঙা, দ্রুত শাওয়ার নেওয়া, নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা শার্ট আর স্কার্ট পরে আয়নার সামনে দাঁড়ানো। সেই আয়নায় প্রতিদিনই ফুটে ওঠে এক সফল নারীর প্রতিচ্ছবি—চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিকের টান, আর কাঁধে…
-
আবিষ্কারের পথে
অদিতি পাল অধ্যায় ১ : স্বপ্নের সূত্রপাত কলকাতার ভোরের শহর তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পুরোনো পাড়ার সরু রাস্তাগুলোতে ছায়া আর কুয়াশার মিশ্রণ, দূরে কোথাও হালকা চায়ের গন্ধ ভেসে আসছে। এই পরিচিত পরিবেশের মধ্যেই হাঁটছে ঈশানি দত্ত—মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, বয়স মাত্র ছাব্বিশ। সকালটা যেন তার কাছে এক নতুন দিনের প্রতীক, যেখানে দায়িত্ব আর স্বপ্নের সীমানা মিলেমিশে…
-
জলরঙের জীবন
নয়না ঘোষ অধ্যায় ১: নিঃসঙ্গতার ছায়া মায়া বড় শহরের এক আধুনিক স্টুডিওর মধ্যে বসে থাকে, যেখানে জানালার কাচে বিকেলের আলো আলোর খেলা খেলে। স্টুডিওর দেয়ালগুলো সাদা, কিন্তু সেই সাদার মধ্যে যেন অদৃশ্যভাবে তার নিজের ভাঙা জীবনের ছায়া ঢেকে আছে। প্রায়শই সে নিজেকে ভেতরে ভেতরে শূন্য বোধ করে, যেন চারপাশের কোলাহল, মানুষের উদাসীন হাসি এবং শহরের…
-
ছিন্ন মুকুট
এক রিবা, এক স্বপ্নের মতো জীবনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তার নবগৃহে পা রাখল। অভিজাত পরিবারের নববধূ হিসেবে তার আগমন ছিল যেন এক চলচ্চিত্রের দৃশ্য—দীর্ঘ কার্পেট, সোনালি আলোয় ঝলমলানো হালকা পর্দা, দারুণ সজ্জিত হল এবং চারপাশে ঝলমলে ক্রিস্টাল লাস্টার। তার স্বপ্নের সঙ্গে মিলে গেছে বিশাল বাগান, ফোয়ারার ছোঁয়া, আর রঙিন ফুলের ছটা যা বাড়ির প্রতিটি কর্নারে ছড়িয়ে…
-
দগ্ধ ছায়া
অনিন্দিতা মুখার্জি সন্ধ্যার আঁধারে গ্রামটা যেন এক অচেনা বিষণ্নতার আস্তানা। খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরগুলো, ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তা আর কাদামাটি ভেজা উঠোন—সবকিছুই যেন নিঃশব্দে নিজের অসহায়তার গল্প বলে চলে। মীরার জন্ম এই গ্রামেই, মাটির গন্ধ মেখে বড় হওয়া সেই ছোট্ট মেয়ে আজ কিশোরীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। সে জানে, তার জীবনটা আর পাঁচজন মেয়ের মতোই হবে—বাল্যবিবাহ, সংসারের…
-
অন্তরঙ্গ পরিচয়
অন্তরা মান্না অধ্যায় ১ – মায়ার জীবন, বাইরের চোখে, এক নিখুঁত শান্তির গল্পের মতো মনে হয়। সকালে উঠে রিয়াদের সঙ্গে চায়ের কাপ ভাগ করে নেওয়া, রাস্তার ধারের ছোট্ট ফুলের দোকান থেকে রঙিন ফুল আনা, এবং বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে হালকা আড্ডা—সবকিছু যেন একটি সুন্দর ছন্দে বাঁধা। মায়া মনে করত, এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তার জীবনের আসল…
-
অগ্নিশিখা
সহেলী দেব অগ্নিশিখা দত্ত ছিলেন এক মফস্বল শহরের সাধারণ স্কুলশিক্ষিকা, কিন্তু তার ভেতরে ছিল অদ্ভুত এক দীপ্তি, যা বাইরের সাধারণ চোখে ধরা পড়ত না। শাড়ির আঁচল গুঁজে স্কুলে গিয়ে তিনি যেমন মাটির গন্ধে ভিজে থাকা খড়ের ছাউনিওয়ালা শ্রেণিকক্ষে মেয়েদের পড়াতেন, তেমনি দিনের শেষে ঘরে ফিরে নিজের বুকের ভেতর জমতে থাকা অস্থির স্বপ্নকে আঁকড়ে থাকতেন। ছোটবেলা…
-
নির্জন শহর
তমালিকা দাস মহামারীর প্রথম ঢেউ এসে যেন শহরের প্রাণ এক নিমেষে কেড়ে নিল। কলকাতার মতো এক কর্মব্যস্ত মহানগর, যেখানে প্রতিদিনের সকাল মানেই ভিড়ে ঠাসা লোকাল ট্রেন, গাড়ির হর্নে মুখরিত রাস্তা, আর মানুষের ভিড়ের কোলাহল—সেই শহর হঠাৎই হয়ে গেল এক বিরান চৌহদ্দি। অদৃশ্য শত্রুর ভয়ে মানুষ ঘরে বন্দি, যেন কেউ আর সাহস করছে না রাস্তায় পা…
-
শঙ্খচিল
শিবানী চৌধুরী এক মাধবীলতার জীবনের ভোর আর রাতের মধ্যে যেন আর কোনো পার্থক্য নেই। সকালবেলায় জানালার ফাঁক গলে আলো এসে পড়লেও তার চোখে সেই আলো ঢোকে না। দিন শুরু হয় কড়াইতে ছটফট করা তেলের শব্দে, চাল ধোয়ার গন্ধে আর শ্রীময়ীর স্কুলে যাওয়ার তাড়াহুড়োয়। কিন্তু সব কিছুর মধ্যেই থাকে এক গভীর শূন্যতা। স্বামী মারা যাওয়ার পর…
-
কালো শাড়ির ভোর
চৈতালি ঘোষ কলকাতার এক আর্দ্র গ্রীষ্মের দুপুরে সায়ন্তনী মুখার্জী তার চেম্বারে বসে ছিল, ডেস্কে জমে থাকা কেস ফাইলের পাতাগুলো উল্টাচ্ছিলেন। জানলার বাইরে থেকে ভেসে আসছিল রাস্তার গরম ধুলো আর রিকশাওয়ালার ক্লান্ত গলার আওয়াজ। এদিনটা অন্য দিনের মতোই ছিল, যতক্ষণ না দরজায় ধীর, দ্বিধাগ্রস্ত কড়া নাড়ার শব্দ হয়। “ভেতরে আসুন,” বলতেই দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়,…












