অনুপ্রেরণামূলক গল্প
-
ফেরিওয়ালার অ্যাপ
তন্ময় বাগচী ১ ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই শহরের রাস্তায় এক অদ্ভুত নীরবতা থাকে। বড় বড় বহুতল ভবনের কাঁচে তখনও আলো এসে পড়েনি, ট্রাফিক সিগন্যালগুলো লাল-সবুজ ঝলকাচ্ছে কিন্তু গাড়ি তেমন নেই। এই আধো-অন্ধকার, আধো-নিস্তব্ধ সময়ে রাস্তার ধারে এক মাঝবয়সী মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে থামে পরিচিত জায়গায়—ফুটপাতের সেই চওড়া জায়গাটিতে যেখানে তার ছোট্ট দোকান বসে প্রতিদিন।…
-
কাগজের ঘুড়ি
হিমাদ্ৰী ঘোষ ১ বস্তির সকাল সবসময় একরকম শব্দে ভরা—খটাখট হাঁড়ি-বাসনের শব্দ, চায়ের দোকানের কেটলি থেকে উঠতে থাকা সিটি, ভাঙা টিনের চালের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করা সূর্যের লালচে আলো আর তার সঙ্গে মিলেমিশে থাকা ছোট ছোট শিশুদের কোলাহল। এখানে সকাল মানেই নতুন দিনের লড়াই শুরু। কেউ ভোরেই কাজে বেরিয়ে পড়ে, কেউ বা কুপির আলো নিভিয়ে আবার…
-
সাতরঙা আকাশ
সঙ্গীতা দাস ১ মেঘলার শৈশব কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, যেখানে কাঁচা রাস্তা, বিস্তীর্ণ ধানের মাঠ আর দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা আকাশ তার শৈশবের নিত্যসঙ্গী। সকালবেলা কাকডাকা ভোরে মাটির ঘরের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া আলোয় সে ঘুম ভাঙত, আর সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল সন্ধ্যা। গ্রামের খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত ঘণ্টার পর…
-
খেলাঘর
অর্ণা মুখার্জী ১ সায়নী বসু দক্ষিণ কলকাতার মফস্বলি এলাকায় দাঁড়িয়ে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত বাসস্ট্যান্ডের দিকে। নতুন প্রজেক্টের কাজে তাকে পাঠানো হয়েছিল এই অঞ্চলের একটি পুরনো জমি পরিদর্শনের জন্য, যেখানে একটা কমিউনিটি সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা আছে। কিন্তু সেই জমির পাশেই পড়ে থাকা পুরনো বাসস্ট্যান্ডটি তার দৃষ্টি আটকে দেয়। নীল রং উঠে যাওয়া টিনের…
-
“অ আ ক খ”
১ নদীর পাড়ের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটা দিনের শেষে যেন এক শান্তির আশ্রয় হয়ে উঠত আশেপাশের শ্রমজীবী মানুষদের জন্য। পাশ দিয়ে গঙ্গার একটি শাখানদী বয়ে গেছে, তার জল সবসময়ই মাটি ছুঁয়ে যায়, আর গ্রীষ্ম হোক বা শীত—সন্ধ্যার দিকে বাতাসে একধরনের স্নিগ্ধতা নেমে আসে। আব্দুল হালিম প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই দোকান চালিয়ে আসছেন। বয়স পঞ্চাশ…
-
এক মুঠো চাল
সায়ন্তন বসু ১ ধনেখালির একচালা ছোট্ট প্রাইমারি স্কুলটার ক্লাসঘরে তখন দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, সূর্যের আলো বেখেয়ালে মেঝেতে খেলছে, কিন্তু সুধাংশু বেরা বুঝতে পারছিলেন, আজকের শিক্ষার আলো যেন কেমন ম্লান। ক্লাসরুমে মাত্র ন’জন ছাত্র—হাজিরার খাতা বলছে তেইশজন আছে রোল কল-এ। যাদের এসেছে, তাদের চোখে ঘুম নেই, আছে কেমন এক শূন্যতা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো মাথা নিচু করে…
-
নিঃশব্দ পাঠশালা
অর্পিতা দাশগুপ্ত অধ্যায় ১: ইশারার প্রথম পাঠ নবনীতা মুখার্জি যখন প্রথম “পূর্ব আনন্দনিকেতন বিশেষ বিদ্যালয়”-এর ধুলোমাখা ফটকে পা রাখেন, তখন আকাশে কুয়াশা জমেছিলো যেমন, তেমনি তাঁর মনের ভিতরেও ছিল অনিশ্চয়তার এক অদৃশ্য কুয়াশা। শহরের একপ্রান্তে ঝাঁপসা হয়ে থাকা এই স্কুলটিকে অধিকাংশ মানুষ ‘বাতিল জায়গা’ বলে এড়িয়ে যায়। গেটের ধারে একটা মরচে পড়া সাইনবোর্ড—যেখানে অর্ধেক লেখা…
-
পেনশনের শেষ চেক
সন্দীপন ধর খামে মোড়া নীরবতা রমেশচন্দ্র বসু বসে আছেন জানালার ধারে রাখা সেই পুরনো বেতের চেয়ারে। জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া বিকেলের আলো তার রুপোলি চুলে খেলে যাচ্ছে। মাথার ঠিক পাশেই একটা ছোট কাঠের তাক, সেখানে রাখা তার স্ত্রীর একটা ছবি — মেঘলা শাড়ি, মৃদু হাসি, কপালে ছোট্ট টিপ। নাম ছিল তার — কাবেরী।…
-
ফেরিওয়ালার স্বপ্ন
মৃণাল সেনগুপ্ত ১ শীতের কুয়াশাঘেরা সকাল। কাটিয়াতলা গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে এক চেনা হুইলগাড়ি—লোহার চাকা ঘষটে ঘষটে আওয়াজ তুলছে, আর গাড়ির উপরে বাঁশের ঝুড়ি ভর্তি পুরোনো বইয়ের স্তূপ। হুইলগাড়িটা ঠেলে নিয়ে চলেছে মধু, যাঁর পুরো নাম মধুসূদন পাল—গ্রামেরই সন্তান, বয়স প্রায় পঁইচাল্লিশ, গায়ে সাদা ধুতি, গায়ে উলের পাতলা চাদর, পায়ে ছেঁড়া…
-
আলোর কাক
তিয়াস চক্রবর্তী ১ বটগাছটা ছিল বিশাল, ছায়াময় আর পুরনো। বনের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই গাছটাকে পাখিরা ডাকে “আকাশদ্বার”—যেন তার ডালপালায় সিঁড়ি বেয়ে আকাশ ছোঁয়া যায়। সেখানে বাস করত রকমারি পাখি—নীল টিয়া, সবুজ বেনেবউ, সোনালি ঘুঘু আর শাদা পায়রা। প্রত্যেকের নিজের গান ছিল, নিজের আভিজাত্য। গাছজুড়ে প্রতিদিন সকালবেলা এক অপূর্ব সঙ্গীতসন্ধ্যা বসত—কারও কণ্ঠে মিষ্টি রাগ,…
-
তালপাতার পাখা
স্নেহাশিষ রায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে। জাদরেল রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে শহরের স্টেশনে। গরম বাতাসে ছিন্ন কাপড়ের মতো ওড়ানো যাচ্ছে না কোনো মন। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ৩২ নম্বর লোকাল ট্রেনের কামরায় যেন আগুনের ঢেউ বইছে। সেই উত্তপ্ত কামরার মধ্যে দিয়ে হাঁটছে দশ বছরের একটি ছেলে—হাতে একগুচ্ছ তালপাতার পাখা। ছোট্ট শরীরে ঘাম জমে রেখার মতো গড়িয়ে…
-
আলো আসবে হুইলচেয়ারে
নয়না চক্রবর্তী (১) প্রতিদিন সকালে ছাদে উঠে নাচ করাটা ছিল সঞ্চারীর জীবনের রুটিনের মতো। ধান্দার কথা, কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি, অডিশনের প্র্যাকটিস—সব মিলিয়ে একটা ঘূর্ণির মধ্যে বাস করত সে। বেহালার গলির ভেতরের ছোট্ট বাড়িটার জানালা দিয়ে আসা রোদে সঞ্চারী যেভাবে নিজের ছায়াকে নিয়ে খেলা করত, সেই ছবিগুলো এখন শুধু মায়ার স্মৃতি। ওই দিনে, দুর্ঘটনার আগের…












