তন্ত্র
-
রক্ততান্ত্রিক
অধ্যায় ১: উত্তরাধিকার দক্ষিণ কলকাতার শেষ প্রান্তে, গড়িয়ার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো বাড়িগুলোর মধ্যে একটি ছিল “নীলকুঠি”—একটা অর্ধভাঙা, গাঢ় সবুজ পাতাবরণে ঢাকা অদ্ভুত প্রাসাদসদৃশ বাড়ি। বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত, নিঃসঙ্গ সেই বাড়িটির একটিমাত্র প্রহরী ছিল সময়—যার সঙ্গে লড়তে লড়তে ভেঙে পড়েছিল ছাদের কার্নিশ, ভেঙে গিয়েছিল মেঝের সিমেন্ট, আর কড়া নড়তে নড়তে শূন্যতার ভিতরেও এক…
-
চণ্ডীমণ্ডপের ছায়া
অরূপ কুমার সেনগুপ্ত এক উৎসব মিত্র গাড়ি থেকে নামতেই তার চোখে পড়ল গ্রামের সেই ধূসর রঙা বিকেল, যেন ছায়ায় মোড়া এক মৃত সময়। গড়ভানিপুর — নামটা যতটা রূপকথার মত, বাস্তবটা যেন ঠিক ততটাই নিঃসাড়। কলকাতা থেকে ট্রেনে এসে তিন ঘণ্টা বাস জার্নি আর এক ঘণ্টা ইজে রিকশার পর, অবশেষে তার গবেষণার গন্তব্যে সে পৌঁছল। একটি…
-
চক্রপুরের চৌরাশি
১ শীতের শুরুতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়া সকালটা চক্রপুর রেলস্টেশনে থেমেছিল মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য। ছোট একটা প্ল্যাটফর্ম, দুই পাশে ধানখেত, মাঝখানে লালমাটির পথ—নেমেই অরিজিৎ বুঝে গিয়েছিল, এখানে সময় একটু ধীরে চলে। তার পায়ের কাছে গুটিগুটি করে হেঁটে যাওয়া কুকুরটা যেন তাকিয়ে বলছিল, “তুমি নতুন এসেছো, বুঝি?” সল্টলেক থেকে বেরিয়ে প্রায় ছ’ঘণ্টার সফর শেষে সে…
-
অঘোরিণী
অনির্বাণ বসু পর্ব ১: শ্মশানের আগুনের নিচে শ্মশানের রাতগুলো বড় নিঃশব্দ হয়, কিন্তু সেই রাতে কিছু ছিল যা নিঃশব্দ ছিল না। ছিল আগুনের গর্জন, ছিল মাটির নিচ থেকে উঠে আসা ধোঁয়ার মতো এক দীর্ঘশ্বাস। কাশীপুরের পুরনো শ্মশানঘাটে সেই রাতে আবার জ্বলে উঠেছিল চিতা, অথচ কারো মৃতদেহ ছিল না। অন্তত চোখে দেখা যায়নি। গ্রামের মানুষজন বলত—এই…
-
শ্মশানতলার পিশাচ
সৌম্য আইচ অধ্যায় ১: অমাবস্যার আগমন বছর দশেক পরে তমাল আবার ফিরছে গ্রামের দিকে। শহরের ব্যস্ততা, কনক্রিটের জঞ্জাল, অসংখ্য হর্নের আওয়াজের ভিতর থেকেও তার মনটা একধরনের অস্থিরতায় কাঁপছিল কয়েকদিন ধরে। দাদুর হঠাৎ মৃত্যু সংবাদে সে যেন মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল, যদিও শেষ ক’বছর তেমন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু শৈশবের সেই বিকেলগুলো, যখন দাদুর তান্ত্রিক ঘরের ধূপগন্ধে…
-
তান্ত্রিক.কম
দেবাশিস চৌধুরী ১ অভ্র সেন দুই বছর আগেও ভাবতে পারেনি তার বানানো অ্যাপ “ChalBeta” এত সহজে ব্যর্থ হয়ে যাবে। ‘মন খারাপ হলে দাদা বকা দেবে’ এই ধারণা নিয়ে বানানো অ্যাপটি প্লে স্টোর থেকে ব্যান হওয়ার পর সে বুঝেছিল—এই সমাজ মজা করতে জানে না, আর কিছু বেশি সিরিয়াস হলে তারা মামলা করে। একবারে শেষ। এখন সে…
-
পঞ্চভূতের সাধনা
রূপক চক্রবর্তী এক শহরের ভেতরে থেকেও কিছু মানুষ থাকে সময়ের বাইরে। অম্বরীশ সেন ছিল তেমনই একজন। তার সহপাঠীরা যখন উচ্চতর গবেষণার জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছিল, বা চাকরির খোঁজে দৌড়াচ্ছিল কর্পোরেট কারিডোরে, তখন অম্বরীশ দিনের পর দিন পড়ে থাকত কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের “তরুণ ভারতী গ্রন্থাগার”-এর প্রাচীন, ধূলিধুসর কক্ষে। সে যেসব বই পড়ত, তা বহু আগেই মানুষের…
-
তামার পায়ের ছায়া
অরিজিৎ দে পর্ব ১: কুসুমবাড়ির ডাইনি পাহাড়ের কিনারে ছুঁয়ে বইছে জলঢাকা নদী। নদীর পাড়ে একটা গ্রাম—ছোট্ট, চুপচাপ, নাম তার কুসুমবাড়ি। দিনের বেলা গাছেদের ছায়ায় এখানে শিশুরা খেলে, বুড়োরা বিড়ি টানে আর মহিলারা কলতলায় গান ধরে। কিন্তু রাত নামলে? রাত নামলে কুসুমবাড়ি নিঃশব্দ হয়ে যায়। যেন কেউ বা কিছু পুরো গ্রামটাকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়। এই…
-
লন্ডনের সপ্তম চক্র
অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় পর্ব ১ রাত তখন প্রায় দেড়টা। থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছিল লন্ডনের জানালা বেয়ে, যেমনটা এই শহরে বরাবরই হয়ে থাকে—নীরব অথচ জেদি। এলেনা ব্যাকলে তার ডেস্কে বসে শেষ পর্যন্ত সেই ইমেলটা আবার খুলল। “Attend the séance this Friday. No cameras, no questions. Just watch. – L.S.S.” কোনো সাইনেচার নেই, শুধু নিচে ছায়ার মতো ছাপানো…
-
তন্ত্রের নীল খঞ্জন
সন্দীপ দে অধ্যায় ১ — নদিয়ার ছোট্ট গ্রাম চন্দ্রপুর, গঙ্গার শাখানদী ছোট ছোট খাল বেয়ে ছড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন জনপদ, যেখানে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মাটির রাস্তা, কাঁচা বাড়ি, আর প্রায় ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও সেই গ্রামকে ঘিরে রেখেছে। গাঁয়ের লোকেরা সূর্যাস্তের পর আর বাইরে বেরোয় না। কারণ, চন্দ্রপুরের ঠিক প্রান্তে শুরু হয় শ্মশানঘাট,…
-
কালতান্ত্র
সুমন দাস ১ শিলচরের একান্ত কোণে, যেখানে সরু গলি ছুঁয়ে উঠে যায় পাহাড়ের ঢালে এবং সেখানেই ছড়িয়ে আছে কামাক্ষ্যা মন্দিরের প্রাচীন কমপ্লেক্স—সেখানকারই এক জনমানবহীন অংশে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষ পুরোনো গ্রন্থাগার, ‘তান্ত্রচক্র পাঠাগার’। লাল ইটের দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, কাঠের জানালার পাল্লা আধা খোলা, যেন কেউ সদ্যই ভিতরে ঢুকেছে—বা বেরিয়ে এসেছে। এখানে কর্মরত গ্রন্থাগারিক সায়ন্তন রক্ষিত, নিজেকে…
-
তন্ত্রবৃত্তের ছায়া
অদ্বৈত বসু চন্দ্রপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে, গহন বাঁশবনের মাঝে লুকিয়ে ছিল একটা জরাজীর্ণ পোড়ো মন্দির। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলত, এককালে সেখানে সিদ্ধতান্ত্রিক করালীনাথ তপস্যা করতেন। তার মৃত্যুর পর কেউ আর সাহস করে ওই মন্দিরে পা রাখেনি। কিন্তু শহর থেকে আসা প্রত্নতত্ত্ব গবেষক দিব্যজিৎ বিশ্বাস কুসংস্কারে বিশ্বাস করতেন না। তিনি ঠিক করলেন, এই তন্ত্রমন্দিরের ইতিহাস খুঁজে বার…












