Bansari Banerjee
গোয়েন্দা বুলেট
সোনারপুর বাইপাসের ধারে, উৎসব কমপ্লেক্সের ডি ব্লকের পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে নতুন এসেছে বুলেটরা ৷ আগে সে থাকতো দিল্লির এক বড় বাংলোয়– প্রশস্ত লন, ফুলের বাগান, আর কত রকমের পাখি আর কাঠবিড়ালি ৷ ওদের সঙ্গে বুলেটের বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল ৷ এখন চার কামড়ার ফ্ল্যাটে মানিয়ে নেওয়া একটু কঠিনই ৷
বুলেটের মনিব ,জয় শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লি কোর্টে প্রখ্যাত বিচারক ছিলেন ৷ অবসর নেওয়ার পর তিনি কলকাতায় ফিরে এলেন নিজের জন্মভূমিতে ৷, আজও তিনি একা, বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি ৷ তবে তিনি একা নন, সঙ্গে আছে হরি কাকা, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী, ম্যানেজার ,বন্ধু। হরি কাকা বলেছিলেন তিনি গ্রামে ফিরে যাবেন ।কিন্তু মনি বললেন ,”এতগুলো বছর যখন একসঙ্গে কাটালাম বাকি আর কটা বছর একসঙ্গে কাটাই না।”
আমি বুলেট কালো, লেজকাটা ডোবারম্যান । পাঁচ বছর ধরে মনিবের সঙ্গে আছি একবার দিল্লিতে মনিবের ওপর হামলা হয়েছিল –একজনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন বলে কিছু দুষ্কৃতি প্রতিশোধ নিতে এসেছিল ।তারপর থেকেই নিরাপত্তার জন্য মনিব আমাকে আর্মি ডগ স্কুল থেকে নিয়ে আসেন। সাধারণত সবাই ডগ স্কুলে এসে সুন্দর লোমশ কুকুর গুলোকেই বেছে নেয় -যেমন গোল্ডেন রিট্রিভার ,ডালমেশিয়ান ,অ্যালসেশিয়ান ,আমাকে কেউ দেখেই না – কালো ঢ্যাঙ্গা লেজ কাটা কে চায়?অথচ মনিব আমাকে দেখেই পছন্দ করলেন। আমার ট্রেনারকেই বললেন ,”এ আমার বাড়ির সদস্য হবে ,ওকে বাড়ির আদব কায়দা শেখাতে হবে ।”
এইভাবে আমার নতুন জীবন শুরু হল । আমি খাবার টেবিলে চেয়ারে বসতে শিখলাম, মানুষের মতো বাথরুম ব্যবহার করতে শিখলাম ,মনিবের গল্পের সঙ্গী হতে শিখলাম।
হরি কাকার সঙ্গেও আমার দারুন বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তিনি রান্না করতে করতে গ্রামের গল্প বলেন ,মেয়ের গল্প বলেন, আমি চুপ করে শুনি। মনিব আর হরি কাকা বুঝে গেছেন –আমি শুধু পাহারাদার নই। আমি তাদের পরিবারেরই এক সদস্য। আমি যেমন মানুষের ভাষা বুঝি। হরি কাকা ও মনিব তেমনি আমার ইশারা বুঝতে পারেন, কাজেই কথা ও ভাবে মিলে একাকার আমাদের সম্পর্ক ।
কলকাতার নতুন বাড়ি সাজাতে মাসখানেক লেগে গেল । পিসি আর পিসেমশাই (মনিবের বোন ও ভগ্নিপতি লাল বাজারে বড় অফিসার) প্রায় আসেন৷ওনারা খুবই হাসিখুশি মানুষ ।গল্পে আড্ডায় সময় কেটে যায় ৷পিসেমশাই মনিবকে নানা মামলার রোমাঞ্চকর কাহিনী শোনান। আমি আর হরিকাকাও খুব মন দিয়ে শুনি ৷এক একটা গল্প শুনে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।
মনিবের নতুন শখ হয়েছে –ছোটদের বই ,গল্প ,উপন্যাস ,প্রবন্ধ সংগ্রহ করা ৷ওকালতির বই পড়া একদম বন্ধ ৷জন্মদিনে পিসি তাকে শরদিন্দু অমনিবাস আর গজল এর সিডি উপহার দিয়েছেন৷ মনিব এখন গান শুনবেন আর সময় কাটাবেন আমাদের সঙ্গে। তাই তিনি নতুন দুজন লোক খুঁজছেন – একজন রান্নার জন্য আর একজন বাড়ির অন্যান্য কাজের জন্য, যাতে হরি কাকার উপর চাপ না পড়ে।
একদিন বিকেলে আমরা কমপ্লেক্সে ঘুরতে বেরোলাম ।বিশাল এলাকা ৬ টি ১০ তলা বিল্ডিং প্রতিটিতে কুড়িটি করে ফ্ল্যাট, দুটো সুইমিং পুল ,দুটো জিম ,বড় লাইব্রেরী ,পার্টির জন্য বিরাট হল ঘর, তিনটি পার্ক, বড় মুদির দোকান— সবই আছে৷ সকালে আমরা নিয়মিত হাঁটতে যাই ,আমি দুবার পুরো কমপ্লেক্স দৌড়ে নি–অনেক অ্যালসেশিয়ান, গোল্ডেন রিট্রিভার আসে । কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে ভাব করতে চায়না, নো প্রবলেম –আমি একাই ভালো।
একদিন পার্কে একদল লোককে অদ্ভুতভাবে হাসতে দেখলাম ।জানতে পারলাম এটা ‘হাস্যযোগ’,শিখে নিলাম আমিও। এতে শরীর মন দুটোই ভালো থাকে । বিকেলে পার্কের বেঞ্চে বসে কত রকম গল্প শুনি। একদল দিদা ঠাকুরমা আধ্যাত্মিক গল্প করতে করতে শেষমেষ বৌমাদের নিন্দে করতে শুরু করেন। হরি কাকা আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচান -”এবার আসল গল্প শুরু”, আমি হাসি চেপে রাখতে পারি না, হরি কাকা মুখ ঘুরিয়ে নেন।
একদিন বিকেলে পার্কের বাইরে তিনটে রাস্তার কুকুর ঘুর ঘুর করছে দেখলাম । ভালো করে তাকিয়ে দেখি , এক কোনার বেঞ্চের তলায় একটা সাদা বিড়াল ভয়ে কাঁপছে। আমি চেঁচিয়ে বকে দিতেই কুকুরগুলো পালিয়ে গেল। হরি কাকা কাছে এসে বললেন,” কিরে এত রেগে গেলি কেন?”আমি তাকে বিড়ালটার দিকে নিয়ে গেলাম। বেচারি কাঁদছিল – “মার পেছন পেছন এসেছিলাম পথ হারিয়ে ফেলেছি”। বেচারা বাড়ির ঠিকানাও জানেনা।, সন্ধ্যে নেমে এলো আমাদের বাড়ি ফেরার সময় হল। কিন্তু আমি ওকে একা ফেলে যেতে রাজি নই। হরি কাকার পা জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করলাম ওকে নিয়ে চলো।
বিড়ালটাও হরি কাকা পায়ে গা ঘষতে লাগলো। মনিবের কাছে গিয়ে, হরি কাকা বললেন “দাদাবাবু ওকে নিয়ে যাই ?একা পেলে কুকুরগুলো মেরে দেবে”। মনিব একটুও ভাবলেন না। হেসে বললেন,” নিয়ে চল আমাদের পরিবারে আরেকজন যোগ হল।”
আমি আনন্দে দু পাক দৌড়ে নিলাম ।বাড়ি ফিরে হরি কাকা ,বিড়ালটাকে থালা বাটি আর একটা নরম বিছানা দিলেন ৷গম্ভীর মুখে আঙ্গুল তুলে বললেন,’’ শোনো এখানে থাকতে হলে নিয়ম মানতে হবে। যেখানে সেখানে পটি করা চলবে না ,নিজের খাবার থালা ছাড়া অন্য খাবারের মুখ দেওয়া চলবে না ,আর রান্নাঘরে নো এন্ট্রি।”
বিড়ালটা মিটমিট করে আমার দিকে তাকালো ।আমি হেসে বললাম, “চিন্তা করোনা আমি সব দেখিয়ে দেব৷”
রাতে মনিবের চার বন্ধু এলেন, নতুন কেউ এলে আমার দায়িত্ব থাকে ,একটু পরীক্ষা করা –এক প্রকার গেট পাস বলা চলে৷ এই পর্বটা শেষ হতেই,মনিব ওনাদের সঙ্গে হরি কাকা, আমার আর নতুন অতিথি পুষিক্যাটের পরিচয় করিয়ে দিলেন।
একজন বন্ধু বললেন,” জয় ভালোই আছিস৷ বিয়ে বা সন্তানের ঝামেলায় না গিয়ে, কুকুর বিড়াল নিয়ে দিব্যি দিন কাটাচ্ছিস। কোন দায়িত্ব নেই, ঝাড়া হাত-পা।
মনিব সঙ্গে সঙ্গে বললেন,” ওহ, নো সরি । ওদের নাম বুলেট ও পুষিক্যাট ।এভাবেই ডাকবি আর হ্যাঁ- বাচ্চা না হলে যেমন লোকে দত্তক নেয় ,সে রকম আমিও ওদের দত্তক নিয়েছি। শখ করে পোষা নয় একদম ,উই আর অল ফ্যামিলি, এন্ড আই হ্যাভ ডিউটি টু ওয়ার্ড দেম। ওরা গান শোনে, গল্প শোনে । ওদের অনুভূতি আছে, যা বোঝার মানসিকতা মানুষকে তৈরি করতে হয়। ওরা কিন্তু বেইমান হয় না ।কজন ছেলে বাবা মায়ের জন্য ভাবে ?এরা সর্বদা আমার জন্য ভাবে ।ওদের অনেক দায়িত্ব ।যা না করলেও পারতো। কিন্তু তবুও ওরা আমাকে প্রটেক্ট করে ,ভালোবাসে -এক কথা আমার একাকিত্বের সঙ্গী।
চার বন্ধুর আড্ডা বেশ জমে উঠেছিল ।পুষিক্যাটের জন্য সেদিন বেশ ভালো একটা ওয়েলকাম পার্টি হলো। প্রাণ ভরে মাছ খেলো সে!
ভোরবেলা আমরা চারজনে মর্নিং ওয়াকে বেরোলাম। এস ইউসুয়াল সবাই যে যার মত এক্সারসাইজ করছে। আর আমি মনিবের উপর নজর রাখছি।
কয়েক দিন ধরে দেখছি ।একজন দাদা দুটো সাদা জার্মান শেফার্ড নিয়ে আসছেন ।ওরা এত ন্যাকা যে, আমার একটুও ভালো লাগে না। আজ দেখি একটা বাচ্চা ল্যাব্রাডর এসেছে ।আমাকে দেখে কাছে এলো, আমিও এগিয়ে গেলাম ।নাম জিজ্ঞেস করতে যাব ,এমন সময় ওর মালিক লাঠি তুলে আমার দিকে এগিয়ে এল। ঠিক তখনই বুঝলাম আমার মনিবও আমাকে নজরে রাখেন ।তিনি দূর থেকে গম্ভীর গলায় বললেন,” সাবধান ওর নাম বুলেট। আর্মি ট্রেনড, বিনা কারণে লাঠি দেখিও না ৷লোকটি সঙ্গে সঙ্গে ল্যাব্রাডরটাকে নিয়ে চলে গেলেন।
এত সব ঝামেলার মাঝে পুষিক্যাট কখন ভ্যানিশ হয়ে গেল ,অনেক খুঁজেও পেলাম না।
বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল ।কারণ নতুন কাজের লোক আসবে হঠাৎ দেখি একটা নেংটি ইঁদুর দৌড়ে গেল। আর তার পেছন পেছন পুষিক্যাট ।কিন্তু এক নিমেষে কোথায় যে গেল দেখতেই পেলাম না। আসুক আজ ,এমন বকবো জীবনেও ভুলবে না।
উপরে এসে দেখি, দুজন মহিলা ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন৷ কাজের জন্য এসেছেন৷ হরি কাকা ওদের সঙ্গে কথা বলে বুঝিয়ে দিলেন, কে কি কাজ করবেন।
মিতাদি রান্না আর বাসন মাজবেন। চারু মাসি বাকি সব কাজ করবেন ।
এরপর শুরু হল গেট পাস,আমার পরীক্ষা নেবারপালা । আমি ঘুরে ফিরে, গায়ে উঠে, শুঁকে নানা ভাবে পরীক্ষা করলাম। ওরা কিন্তু খুব ভয় পেয়ে গেল খুব।
চারু মাসির গায়ে মাছের গন্ধ– নিশ্চয়ই অন্য বাড়িতে মাছ কেটে এসেছে ।আর মিতাদি ? তিনি তো চুল ঠিক করতে করতে বকবকি করেই চলেছেন।
চারু মাসিকে মিতাদি বলল ,”তোমার আবার এত ভয় ?এখন তো সব বড়লোক বাড়িতেই কুকুর”।
তারপর হরিদার দিকে তাকিয়ে বললেন,” শোনো আমি কিন্তু কুকুরের কাজ করবো না।”
হরি কাকা একেবারে পরিষ্কার বলে দিলেন,” সে তোমায় করতেও হবে না, তুমি সোজা রান্নাঘরে ঢুকবে ,কাজ শেষ করে বেরিয়ে যাবে| ওর নাম বুলেট। কুকুর বলবেনা ।আমরা পছন্দ করি না ।
মিতাদি আস্তে করে বললেন যতসব বড়লোকই ন্যাকামি ।
আমি কিন্তু তখনও পুষিকাটের চিন্তায়, মিতাদির কথায় বিশেষ আমল দিলাম না।
আমাদের ফ্ল্যাটের তিন দিকে তিনটে বারান্দা ।পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর। উত্তরের বারান্দা একটু পেছনের দিকে, সেদিকে একটা ছোট্ট বাগান আছে। পেয়ারা, জামরুল, একটা বড় রাবার গাছ আর কিছু ঝোপঝাড় ।
আমি সাধারনত ওই দিকে যাই না। কিন্তু আজ পুষিক্যাটকে খোঁজার জন্য উত্তরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষন পর দেখি পুষিক্যাট এখনো বেচারা ইঁদুরের পেছনে ছুটছে। ছোট্ট ইঁদুরটা প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে, গাছে উঠছে আর পুষিক্যাটও গাছে ওঠার চেষ্টা করছে।
তখনই জোরে বকলাম ,শিগগিরই ওপরে চলে আয় । পুষিক্যাট প্রথমে না শুনলেও; পরে ঠিক চলে এলো।
আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, আমাদের ফ্ল্যাট ঠিক চিনতে পারবে তো? দরজা খুলতে যাব(এখানে বলে রাখা দরকার ,আমার জন্য মনিব বিশেষ ধরনের লক লাগান যাতে আমিও দরজা খুলতে পারি) ;এমন সময় বেল বেজে উঠলো। আমি তো অবাক -পুষিক্যাট কি করে বেল বাজালো?দরজা খুলে দেখি পাশের ফ্ল্যাটের দিদি ,আদর করে বললেন, “কি বুলেট দাদা কেমন আছো”?আমিও মাথা নেড়ে হাসলাম।
দিদি ওর ঘরের চাবিটা, ওনার মাকে দিয়ে দেবার জন্য দিয়ে গেলেন। হরিকাকা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “বুলেটকে তোমার মায়ের ছবি দেখাও। নইলে ও বুঝবে কি করে ?” দিদিও মোবাইলে মায়ের ছবি দেখালেন। আমিও থ্যাঙ্কস জানালাম ।
এই ফাঁকে পুষিক্যাট নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে গেল।
রাত আটটা বাজে, কিন্তু মনিব এখনো কলেজস্ট্রিট থেকে ফেরেননি। সেই দুপুরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন। হরিকাকার মোবাইলে রিচার্জ শেষ, তাই ফোনও করা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর মনিব এলেন সঙ্গে চার পাঁচটা বইয়ে কার্টন।
পুষিক্যাটকে বললাম ,”দেখবি মনির এক এক সময় জোরে জোরে গল্প বলবেন। আমি আর হরি কাকা দুজনে বসে শুনি,ভূতের গল্প, গোয়েন্দা গল্প আরো কত কি । এবার থেকে তুইও শুনবি।
মনিব হরিকাকাকে বললেন ,”হরি এগুলো সুন্দর করে লাইব্রেরীতে গুছিয়ে রাখবি। সিডি কিনতে যেতে পারিনি ,পরে সবাই মিলে মিউজিক ওয়ার্ল্ড যাব। সেদিনের মত সব দুশ্চিন্তা ভুলে গেলাম ।মনির ফিরেছেন ,বই এসেছে আর পুষিক্যাট? সে তো আমার পাশেই মিউ মিউ করছে।
ফ্রেশ হয়ে, মনিব একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন আর আমরা তো ওনার গল্প শোনার আশায় পাশে বসে আছি ।ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠলো। কিছুক্ষণ কথা বলে মনিব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ,”কাল থেকে ট্রেনার আসবেন। উনি ফোর্ট উইলিয়ামের ট্রেনার। অনেক বলে কয়ে রাজি করিয়েছি। পুষিক্যাট তুমিও শিখবে।”পুষিক্যাট মাথা নাড়লো। সেদিন রাতের খাবার তাড়াতাড়ি সেরে ফেললাম । ওহো একটা কথা বলা হয়নি। আমার একটা খাবার টেবিল চেয়ার আছে। পুষিক্যাটের জন্যও অর্ডার দেওয়া হয়েছে।।
খাবার পর, হরিকাকা মোবাইলে ‘সান্ডে সাসপেন্স’ চালালেন। সবাই মন দিয়ে শুনছিলাম, হরি কাকা চোখ বন্ধ করে দুলতে দুলতে শুনছিলেন। পুষিক্যাট আমার কানে কানে বলল,” বুলেটদা হরি কাকাকে দেখো, মনে হচ্ছে যেন ভক্তিগীতি শুনছে, বলেই সে মুখে হাত দিয়ে খিকখিক করে হাসতে লাগলো ।রাতে চারিদিক দেখা আমার ডিউটি। উত্তরের বারান্দায় গিয়ে দেখি, নিচে দুটো ইঁদুর দৌড়োদৌড়ি করছে ।ওদের দেখে মনে হল যেন সবাই আনন্দ করছে। পষিক্যাটকে বললাম ,”দেখলি? তোর জন্য ভয় পেয়ে ওরা ঘর ছাড়া হয়েছিল ।এখন বোধহয় ফিরেছে! কাল সকালে গিয়ে ভাব করা যাবে, তুই কিন্তু ক্ষমা চাইবি।
পরদিন ভোরে ,জগিং সেরে বাগানের একটু দূরে লুকিয়ে নজর রাখলাম, পুষিক্যাটও একটা থামের আড়ালে ছিল। কিছুক্ষণ পর দেখি কর্তা গিন্নি (দুটি ইঁদুর )গর্ত থেকে উঁকি মারছে। ধারে কাছে কাউকে না দেখে বাইরে বেরিয়ে এলো। আমি এক দৌড়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সঙ্গে সঙ্গে ওরা চোখ বন্ধ করে কাঁদতে লাগল। আহারে খুব মায়া হল ।পুষিক্যাটও চলে এসেছে। আমরা দুজন হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলাম ,বন্ধুত্বের পিংকি প্রমিস করলাম ।ওরা তো ভাবতেই পারেনি এমন কিছু হবে। এমন সময় গাছ থেকে পায়রা দিদা এসে বললেন,”ভয় পাবার কিছু নেই, ওরা খুব ভালো, আমি শুনেছি বুলেট সেদিন পুষিক্যাটকে খুব বকেছিল।” তারপর আলাপ করিয়ে দিলেন ইন্দ্র ও ইন্দ্রানী—- ইঁদুর দম্পতি ;কাকেশ্বর ও কাকেশ্বরী (কাক দম্পতি), মৌ (একটা দুষ্টু পাখি মৌটুসী)। সবার সঙ্গে পরিচয় হয়ে বেশ ভালো লাগলো ।ওদের বললাম আমাদের ব্যালকনিতে এসো গল্প হবে। কিন্তু ইন্দ্র ইন্দ্রানী একটু দুঃখ পেল ,আমরা তো পাঁচ তলায় উঠতে পারবো না। আমি বললাম ,”চিন্তা করিস না সমাধান বের করবো।”
একদিন মৌ এসে খবর দিল, আমাদের গ্রুপে নতুন দুই সদস্য এসেছে –একটা ছেলে আর একটা মেয়ে পায়রা ।পায়রা দিদা ওদের আশ্রয় দিয়েছেন ।পুষিক্যাট মহাপাকা বলল ,”কেন কেন? কেন পালিয়ে এলো? মৌ বলল,” মেয়ে পায়রাটা লক্কা পায়রা ,খুব সুন্দরী আর ছেলে পায়রাটা সাধারণ পায়রা। তাই ওর মায়ের পছন্দ হয়নি। অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক করেছিলেন। তাই পালানো ছাড়া উপায় ছিল না ।ওদের নাম রাখা হলো —-চুনু ও মুনু ।
আমাদের গল্পের আসর ভালই চলছিল। মনিব দূর থেকে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখতেন আর মিটিমিটি হাসতেন। মনে হতো উনিও খুব উপভোগ করছিলেন।
একদিন ইন্দ্র বললো, তোমরা কি সুন্দর গল্প করো, আমাদেরও খুব ইচ্ছে হয় যোগ দিতে। পুষিক্যাট বলল ,”তাহলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসো।” ইন্দ্রানী হতাশ গলায় বলল “ওখানে তো সিকিউরিটি দাদা আছে। দেখলেই তাড়া করবে “।এই শুনে পুষিক্যাট এক লাফ দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, বলল “মনিব যে বাক্স গুলো কলেজ স্ট্রিট থেকে এনেছিলেন সেগুলো খুব শক্তপোক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিলও।হরি কাকা সেগুলো গুছিয়ে রেখেছেন ।ওগুলো জোড়া দিয়ে বেলকনির রড এ বেঁধে ঝুলিয়ে দেব তাহলেই কেল্লাফতে। শুনেই ইন্দ্র ইন্দ্রানী খুশিতে ডিগবাজি খেতে লাগলো, মৌ গান গেয়ে উঠলো, কাকেশ্বরও গান ধরতে যাচ্ছিল আমি চট করে বললাম ,”ও তোমার কাজ না। চুপ থাকো।” পায়রা দিদা আর পুষি ক্যাট মিটিমিটি হাসছিল। যেমন ভাবা তেমনি কাজ ।কাকেশ্বর খুব শক্ত করে দড়ি বেঁধে দিল। এখন যখন তখন ইন্দ্র ইন্দ্রানী উপরে উঠে আসে ,আমার ঘাড়ে উঠে ঘুরে বেড়ায়।
মনিব আমাদের অনেকগুলো ছবিও তুলেছেন। তবে একটা শর্ত কোন বই যেন নষ্ট না হয় ।ইন্দ্র ইন্দ্রানী সঙ্গে সঙ্গে পিংকি প্রমিস করল। এইভাবে আমাদের এক অদ্ভুত বন্ধুত্বের শুরু হল।
একদিন ইন্দ্রানী এসে খবর দিল -আমাদের ফ্ল্যাটের পশ্চিম দিকে নতুন প্রতিবেশী এসেছেন ।ডুপ্লেক্স বিল্ডিং এর নিচের তলায় উঠেছেন; এক দিদা ,একদাদা ,এক দিদি ও মিষ্টি একটা ছোট্ট মেয়ে আর এক মাসি। শুধু তাই নয়, সঙ্গে এনেছেন প্রচুর গাছ, দুটো টিয়া পাখি আর একটা গোল্ডেন রিট্রিভার সোনালী।শুনেই আমার কৌতুহল চরমে উঠলো, এদের একবার দেখে আসতে হবে।
ইন্দ্রানী বলল ,”দিদা খুব ভালো ঠাকুর পুজো করেন।রোজ লাড্ডু দেন ,আর সেই লাড্ডু প্রসাদ বাগানে রেখে যান আর আমরা সবাই মিলে সেটা ভাগ করে খাই ।সকালে চুনি পান্না মানে টিয়া দুটো কে বারান্দায় বড় খাচায় রেখে দেওয়া হয়। পাখিদের সঙ্গে ইতিমধ্যে ওদের ভাব হয়ে গেছে”।আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম বিকেলে কখন হবে।
দুপুরে খাবার খেতে খেতে মনিব বললেন,” হরি, ডুপ্লেক্সে সমীরণের (মনিবের বন্ধু) এক আত্মীয় এসেছেন। বিকেলে যাব দেখা করতে, মনে রাখিস।
সারাটা দুপুর আমার ছটফট করেই কাটলো।আবার মনে হল সোনালী কি আমার মত কেলে ঢ্যাঙা কে বন্ধু বানাবে?
বিকেলে আমরা চারজনে মিলে বিশ্বাস দিদার বাড়ি গেলাম ।সবাই বাইরে বসে ছিলেন ,মিষ্টি দিদির সঙ্গে সোনালী খেলছিল ।আমাদের দেখে সবাই উঠে দাঁড়ালেন।
মনিব বললেন ,”সমীরণ আমার বন্ধু, ওর কাছ থেকে আপনাদের কথা শুনেছি, তাই আলাপ করতে এলাম ।
রাজা দাদা আর মিলি দিদি খুব ভালো মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে মনিব আর হরি কাকাকে বসতে দিলেন। আমিও এগিয়ে গেলাম আর সোনালীও আমায় দেখে খুশি হয়ে কাছে এলো। কি ভাগ্য! মনের একটা ভার নেমে গেল। মনিব আমার পরিচয় দিয়ে বললেন,” ওর নাম বুলেট আর ও পুষিক্যাট। রাজা দাদা হাসতে হাসতে বললেন,” তাহলে তো ওদের দলে আরো সদস্য যোগ হল , সোনালী ,চুনী পান্নাওএখন থেকে ওদের দলে ঢুকে গেল।
মনিব আমাকে বললেন,” বুলেট তোর তো প্রচুর সৈন্য সামন্ত হয়ে গেল ।”আমার একটু লজ্জা লাগলো। দিল্লির কথা খুব মনে পড়ছে ,ভাবলাম দিল্লি থেকে যদি কাঠবিড়ালিগুলো কে আনতে পারতাম! রাজা দাদাকে মনিব বললেন ,”সোনালীর সঠিক ট্রেনিং দরকার। যদি চাও বুলেটকে যে ট্রেনিং দেয়, তাকে বলে দেখতে পারি”। রাজা দাদা এক কথায় রাজি হয়ে গেল।
দিদা খুব যত্ন করে সবাইকে চায়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। আমাদের বিস্কুট দিলেন ,চুনি পান্না খুবই মিশুকে, কিন্তু আমার একটাই আফসোস ,ওরা যদি খাঁচার বাইরে উড়ে আসতে পারতো।
মনিব, দিদাদের সবাইকে পরের দিন দুপুরে আমাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলেন। মনিব বললেন চুনি পান্না আর সোনালীও নিমন্ত্রিত।
সকাল থেকেই হরি কাকা আর মিতাদি বাজার আর রান্নায় ব্যস্ত। আমি আর পুষিক্যাট মনিবকে লাইব্রেরীতে বই সাজাতে সাহায্য করলাম। শিশুদের বই, বড়দের বই, প্রবন্ধ ,জীবনী সব ভাগ করে রাখলেন ।আমরা বই মুখে করে এনে মনিবের হাতে দিচ্ছিলাম ।
দুপুর নাগাদ প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হল। রাজা দাদা, মিলি দিদি,দিদা, মিষ্টি সবাই এলো। ওরা প্রচুর মিষ্টি এনেছিল। আর মনিব মিষ্টিদিদির জন্য কিছু বই আনিয়ে ছিলেন বই পেয়ে মিষ্টিদিদি খুব খুশি।
লাইব্রেরি দেখে রাজা দাদা খুব খুশি হয়ে বললেন,” নেক্সট টাইম যখন আসবো তখন আমিও বই কিনব ,যাতে মা পড়তে পারেন। আপনার সাহায্য লাগবে কিন্তু ।
মনিব বললেন,” সে আর বলতে নিশ্চয়ই করব” দিদাকে বললেন,” আপনি তো আমার বোনের মত।যখন খুশি চলে আসবেন বই পড়বেন, নিয়েও যাবেন “।
দুপুরে প্রচুর রান্না হয়েছিল ।সবাই খুব আনন্দ করে খেলো। আমার ছোট টেবিল চেয়ার এ সেদিন সোনালীকে খেতে দিলাম। হরি কাকা আমাদের জন্য পাঁঠার মাংসের খিচুড়ি বানিয়ে ছিলেন। পুষিক্যাট সেদিন আনন্দে প্রচুর মাছ খেল ।চুনি পান্নার জন্য ছিল– পেয়ারা আর লাল রঙের বড় বড় লঙ্কা। অতিথি আপ্পায়নে হরি কাকা জুড়ি নেই!
আমার অন্য বন্ধুদের জন্য- উত্তরের বারান্দায় হরি কাকা আলাদা থালায় খাবার সাজিয়ে রেখেছিলেন ।পায়রা দিদা চুনু মনু মৌ কাকেশ্বর কাকেশ্বরী সবাই এসেছিল । ইন্দ্র আর ইন্দ্রানী তো সেই কখন থেকে আমার ঘাড়ে চড়েই ঘুরছে, মিষ্টির সঙ্গে সবাই মিলে খুব মজা করলাম।
শুধু এক সময় মনিব আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন বললেন,” তুই আর সোনালী ও শোন। খুব দরকারী কথা কারণ তাহলে তোরাও অ্যালার্ট থাকতে পারবি”। কি দরকারি কথা সেটা জানার জন্য আমার তো মন খুব উসখুস করছে।
দাদা বোম্বের কিছু ঘটনা বলতে শুরু করলেন। দিদি আর দাদা দুজনেই এখন বিদেশে থাকেন ।দাদা ইউকেতে এফআরসিএস পড়তে গেছেন । আর দিদির বিয়ে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর ওরা ঠিক করলেন ,৬ মাস অন্তর পালা করে এক মাস করে দিদার কাছে এসে থাকবেন।
এবার আসল ঘটনাটা সংক্ষেপে বলছি ।বিশ্বাস দাদু বোম্বেতে নামকরা ডাক্তার ছিলেন আর বিশ্বাস দিদার শ্বশুর মশাইও ডাক্তার ছিলেন। ওখানকার বিশাল দোতলা বাড়িটা তাদেরই তৈরি। দিদির বিয়ে আর দাদার পড়াশোনার কারণে ওরা একাই থাকতেন বোম্বেতে। কিন্তু হঠাৎ করেই চোরের উপদ্রব বেড়ে যায়, কারণ সঠিক বোঝা জাচ্ছিল না ।দিদার ঘর নানা দামি জিনিস দিয়ে সাজানো থাকতো। আর বংশপরম্পরায় পাওয়া বেশ কিছু গয়না কিছু বাড়িতে কিছু ব্যাংকে থাকতো। তবে একবার ঠাকুরের সিংহাসনে দুটো পায়া ভেঙে গেলে, দুজন মিস্ত্রি ঠিক করা হয় তা সারানোর জন্য। কিন্তু এরপর থেকেই বাড়িতে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে।
দিদারা উপরের ঘরে ঘুমোতেন ।এক বার রাত্রে, আওয়াজে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। দাদু নিচে নামতেই দুজন মুখ ঢাকা লোক ওকে চেপে ধরে বলে ,জো হ্যায় দেদো, জলদি দে দো। দাদুও বলেন যা আছে নিয়ে যাও। কিন্তু ওরা বলতে থাকে “মণি দে দো”। মা দৌড়ে নিচে নামতে গেলে দাদু চিৎকার করে বলে ওঠেন “আমার দিব্যি ঠাকুর ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ কর” দিদা আর কি করেন, দাদুর কথা মতই ঠাকুর ঘরে চলে যান।
কিছুক্ষণ পরে দুটো গুলির শব্দ শুনে , দিদা ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। যখন তার জ্ঞান ফেরে তখন সকাল হয়ে গেছে ,নিচে নেমে দেখেন সব শেষ ।পুলিশ কেস করা হলো, বোম্বে পুলিশ চেষ্টা করেছিল কিন্তু চোরদের ধরা যায়নি।
দাদাদের আত্মীয়-স্বজন সবাই কলকাতায় আছে । দিদাকে বোম্বেতে একা রাখতে দাদাদের মন চাইল না। তাই দিদাকে তারা কলকাতায় নিয়ে আসেন। মনিব বললেন “তোমরা চিন্তা করোনা। আমরা তোমার মায়ের পাশে আছি। সব দেখে রাখব।
মিলিদিদি হরিকাকাকে বললেন,” হরি কাকা, আমাদের বাড়ির জন্য একজন কাজের লোক,আর একজন মালি কাম ফাই ফরমাস খাটার লোক খুঁজে দিতে পারলে খুব ভালো হয়”। হরিকাকাও কথা দিলেন।
সেই মতো ঠিক হয় মিতাদি দিদাদের সব কাজ করবে ।শেফালী মাসি রান্না করবেন, ও সব সময় দিদার সঙ্গে থাকবেন। ঠাকুর ঘরের কাজ দিদা বাইরের কাউকে দেবেন না জানালেন। মালি কাকুকে এনে দেবার ভার মিতাদি নিল।
দাদা, দিদি ও মিষ্টি আর মাত্র ১৫ দিন ছিল ।এই কদিন আমাদের খুব আনন্দে কেটেছিল ।মিষ্টিকে নিয়ে আমাদের বাগান পার্টি খুব সুন্দর দিন কাটালাম ।মিষ্টি বিদেশ চলে যাওয়ায় খুব ফাঁকা লাগতো। ওহো বলা হয়নি দিদার বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় আমার আর সোনালীর ট্রেনিং চলতে লাগলো জোর কদমে। তবে সোনালী বড্ড অমনোযোগী, বাচ্চা কিনা -একটু অবুঝ।
একদিন দাদার ফোন এলো ইউকে থেকে দাদা বললেন,” মামা বাবু গণেশ চতুর্থীর পূজা যেন বন্ধ না হয় ।এটা ঠাকুরদার সময় থেকে চলে আসছে ।আপনি একটু মাকে রাজি করান “।
পরদিন ভোরবেলায় সবাই মিলে বিশ্বাস দিদার বাড়ি গিয়ে তাকে রাজি করানোর চেষ্টা করলাম ।আমি ,সোনালী ,ইন্দ্র আর ইন্দ্রানী দিদার পায়ে শুয়ে পড়লাম । দিদা হেসে ফেললেন শেষ অবধি ঠিকই রাজি হলেন ।তবে একটা শর্ত আমাদের মনিবকে পুরো আয়োজনটা দেখতে হবে।
তিন দিনের মধ্যে বিশাল আয়োজন করা হলো ।ঠাকুর বসানো হলো বসার ঘরে ,প্রচুর ফুল মালা দিয়ে সাজানো হলো ।মামা মামি ,পিসে পিসেমশাই ,কাকু কাকিমারা এলেন। রান্নায় সাহায্য করলেন ।কমপ্লেক্সের লোকজনও প্রসাদ নিতে এলো। পূজার পুরোটা ভিডিও করা হলো। দিদি দাদাও ভিডিও কলে মাঝে মধ্যে সব দেখে নিচ্ছিলেন ।কিন্তু আমার মনে একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।
সকাল থেকে দেখছি ,সোনালী আমাদের সঙ্গে না থেকে মালি কাকু ও প্লাম্বার দাদার সঙ্গে বেশি থাকছে। যেটা মোটেই ভালো না। নিজের প্রভু আর তার পরিবার আমাদের প্রায়োরিটি। ওনাদের পরিবারকে রক্ষা করার জন্যই আমাদের এই পরিবারে আসা। তারা আমাদের ভালো খেতে দেন, ট্রেনিং দেন, আদর ভালোবাসা দেন, যত্ন করেন,সর্বোপরি পুরো বাড়ি আমাদের বিশ্বাস করে ছেড়ে দেন। সেখানে বাইরের লোক- ভালো জানাশোনা নেই তার অত কাছের হওয়াটা ঠিক না।
পায়রা দিদারা সবাই সেটা খেয়াল করেছে, ঠিক হলো ওকে বোঝানো হবে। বিশ্বাস দিদার বাড়িতে নতুন মালি কাকু আর মিতাদির খুব খিটি মিটি চলছিল। ঝগড়া এতটাই বাড়ছিল যে মাঝে মধ্যে হরি কাকাকে গিয়ে থামাতে হতো। এর দুদিন পরেই বিশ্বকর্মা পুজো এলো ।কমপ্লেক্সে প্লাম্বিং বিভাগের দাদারা নাকি অনেক বড় করে পূজা করে ।খাওয়া দাওয়ার বিশাল আয়োজন হয়। দুপুরে নিরামিষ খাবার আর রাতে মাটন বিরিয়ানি হয় ।
রাতে মালিক কাকু আর প্লাম্বার দাদা বিরিয়ানি দিতে এলো ।দরজা খুলতেই এক অদ্ভুত গন্ধ পেলাম । হরি কাকা বললেন ,”মদ খেয়ে আবার প্রসাদ দিতে এসেছিস?” প্লাম্বার দাদা হেসে বলল” ওসব চালতা হ্যায়! তুমি খাবে ?”হরি কাকা রেগে দরজা বন্ধ করে দিলেন ।আমি বুঝলাম গন্ধটা শুধু বিরিয়ানির নয়। কিছু একটা গোলমাল আছে ।মনিব বললেন” এগুলো কাল মিতাদের দিয়ে দিস”।
আমি তো খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম, নিশ্চয়ই সোনালী এইসব চাইপাশ গিলবে। সহ্য করতে পারবে তো? এইসব ভাবতে ভাবতেই ইন্দ্রানী এসে বলল” জানো বুলেট দাদা সেদিন সোনালী বলছিল যে ও কোনদিন বিরিয়ানি খাইনি। টিভিতে দেখলে ওর খুব লোভ লাগে “।
ইন্দ্র আসতে পারেনি, ওর দিদার খুব শরীর খারাপ তাই দিদাকে দেখতে বরানগর যেতে হয়েছে। আমি কিছু বলার আগেই ইন্দ্রানী আবার শুরু করল “ওর দিদাদের বাজারে একটা চাটের দোকান আছে, বুড়ি প্রায় দিন সেখানে গিয়ে পাপড়ি চাট খায় ,কতবার বারণ করেও কাজ হয়নি। তাই মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে আর প্রতিবার অতদূর ইন্দ্রকে দৌড়াতে হয় সামাল দিতে” । পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চুনু মুনু আর পুষিক্যাট মুখে হাত দিয়ে খিল খিল করে হেসে ওঠল ।ইন্দ্রানী রেগে গিয়ে বলল ,”এই তোরা অমন করে হাসছিস কেন?” পুষিক্যাট বললো,” হাসবো না !!ইন্দ্রকে যেতে হয়েছে তাই একা থাকতে ভয় করছে।” ইন্দ্রানী আর কিছু বলার আগেই পুষিক্যাট আমার পিঠে চড়লো আর ইন্দ্রানী ও এসে বসলো। আমি ধমক দিয়ে বললাম “হ্যাঁ রে !আমার পিঠ কি তোদের খেলার মাঠ ?” তখন ইন্দ্রানী বলল “আর তো কদিন পরে পুজো, মিষ্টি সোনারা আসবে ।বিশাল আনন্দ হবে”। কাকেশ্বর বলল “আমাদের বাড়িতে নতুন অতিথিও আসবে”। সবাই আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। ইন্দ্রানী দাঁত বের করে ধিন্ ধিন্ করে নাচতে থাকলো। সে বলল আরও একটা খবর আছে। পায়রা দিদা ওর কান ধরে বলল,” বলে ফেলো জলদি”। ইন্দ্রাণী হি হি করে হেসে বলল ,”সানাই বাজবে”। পায়রা দিদা অবাক হয়ে বলল “কার বাড়িতে?” “আমাদের বাগানে মৌটুসীর বিয়ে পাকা হয়েছে ,পুজোর মধ্যে ওর বিয়ে হবে”বলল ইন্দ্রানী। পায়রা দিদা বিস্মিত হয়ে বললেন “আমাকে জানালি না তো?”
মৌ তখন পায়রা দিদাকে জড়িয়ে ধরে বলল,” তুমি তো আমায় রাস্তা থেকে তুলে এনে বড় করেছো, তুমিই ছেলের বাড়ির সঙ্গে কথা বলে সব পাকা করবে”। পুষিক্যাট হাততালি দিয়ে উঠলো বলল, “এবার পুজোয় আমাদের আনন্দ শুধুই আনন্দ।”
এত কথায় আমার মন বসছিলো না। হঠাৎ বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল, যেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে ;কিছু ভয়ংকর। মাথাটা কেমন ভারী হয়ে গেল। আমি কপালে হাত দিলাম ,ঘাম জমে উঠেছে। সবাই বলল “কি হলো বুলেট দাদা ?শরীর খারাপ ?”আমি ধীরে ধীরে ফ্যানের নিচে গিয়ে বসলাম। হরি কাকা আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, “কেন এমন অস্থির লাগছে ?রাগ হয়েছে?” আমি কিছু বললাম না। হরি কাকা একটা ভজন চালিয়ে দিলেন। পুষিক্যাটও এসে পাশে শুয়ে পড়ল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি।
হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চমকে উঠলাম, ব্যালকনির দিকে দৌড়ালাম।
কাকেশ্বর , পায়রা দিদা, ইন্দ্রানী সবাই ছুটে বেড়াচ্ছে। বাইরে তখনও অন্ধকার। ব্যালকনিতে গিয়ে শুনলাম বিশ্বাস দিদার বারান্দায় সোনালী পড়ে আছে।
দৌড়ে এসে হরি কাকাকে জাগালাম ।হরিকাকাকে নিয়ে সবাই দৌড়ে বিশ্বাস দিদার বাড়ি গেলাম।গিয়ে দেখি সোনালী অচৈতন্য অবস্থায় শুয়ে আছে। ধাক্কা দিলাম কোন সাড়া নেই ।নাকের কাছে হাত নিয়ে বুঝলাম সব শেষ।কিন্তু সেই অদ্ভুত বাজে গন্ধটা পেলাম।
ইন্দ্রানী মুখ ঢেকে বলল ,”বিরিয়ানির গন্ধ”। হরিকাকা সোনারির কুঁচকিতে হাত দিয়ে দেখল, তারপর বসে পড়ল। আমি কাকেশ্বর কে বললাম,” একটা শুকনো কাঠি আনতে পারবি?” সে নিমিষে কাঠি এনে দিল ।আমি ইন্দ্রানীকে বললাম,” আমি সোনালীর মুখ হাঁ করছি, তুই সাবধানে দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা খাবার বার করবি কিন্তু নিজের মুখে যেন না লাগে।
মৌ রাবার গাছের পাতা এনে দিল। ইন্দ্রাণী কাঠি দিয়ে দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা ভাত-মাংস বের করল। কাকেশ্বরী সেগুলো পাতায় মুড়ে একটা কাঠি দিয়ে গেঁথে দিল। আমি বললাম “এটা আমাদে ব্যালকনিতে রেখে দিয়ে আয় ,আমি বারান্দা পরীক্ষা করছি।”
বারান্দা একদম পরিষ্কার। তবে কয়জন মানুষের গন্ধ পেলাম ।সোনালীর মুখে দড়ি বাধার দাগ! মুখও ধোয়া হয়েছে যেন কোন প্রমাণ লুকানো হয়েছে।
হরি কাকা বিশ্বাস দিদার বেল বাজাতে যাচ্ছিল ,আমি হাত ধরে থামালাম। “এখন নয় আগে মনিবকে ডেকে আনো”।
পুষিক্যাট আর পায়রা দিদা সোনালীর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে ।আমি, ইন্দ্রানী আর কাকেশ্বর পায়ের দাগ খুঁজতে খুঁজতে রান্না ঘরের পেছনে পৌঁছালাম, দেখি রান্না ঘরে পিছন দিকটা ভালো করে ধুয়ে ফেলা হয়েছে। ফিনাইল এর গন্ধ ছড়িয়ে আছে। আমি ইন্দ্রানীকে সাবধান করলাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম,”আমি যা বলছি আগে তাই কর ,পরে সব বলছি ।এখন এই জলের দাগ ধরে ধরে চল্,ওখানে কিছু পাই কিনা দেখতে হবে”।যা দেখলাম যা বুঝলাম তাতে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। বিরিয়ানিতে বিষ মেশানো হয়েছিল।
আমার অনুমান দুপুরেই ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল ।যাতে বেশি দৌড়োদৌড়ি করতে না পারে । বিরিয়ানি খাইয়ে দড়ি দিয়ে হাত-পা মুখ বাঁধালে, সোনালী বাধা দিতে না পারে। তারপর যখন ওরা নিশ্চিন্ত হয়েছে যে সে মরে গেছে তখন মুখ ধুয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছে।
কিন্তু সোনালীকে মারার কারণ কি? এরা কারা?
ইতিমধ্যে হরি কাকা, মনিবকে নিয়ে চলে এসেছে। বিশ্বাস দিদাকেও ডাকা হলো। চুনি পান্না চেঁচিয়ে উঠল।সিকিউরিটি গার্ডরা কয়েকজন এসে জড়ো হল। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন জমতে লাগলো। আমি ,ইন্দ্রানী আর পুষিক্যাটকে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেলাম। রান্নাঘর একদম পরিষ্কার কিন্তু সিঙ্কের নিচে একটা পাইপ রাখা। ইন্দ্রানী আমার দিকে তাকিয়ে চোখ ঘোরালো পুষিক্যাট ছুটে এসে বলল “এত আওয়াজেও শেফালী মাসির ঘুম ভাঙছে না কেন?” পুষিক্যাট ছুটে শেফালী মাসিকে ডাকতে গেল। ইন্দ্রানী বলল “শেফালী মাসি কি ঘুমের ওষুধ খায়?” রান্নাঘরে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে একটা চকচকে রাংতার টুকরো দেখা গেল ।আমি আর ইন্দ্রানী একে অপরের দিকে তাকালাম ।আর কোন সন্দেহ নেই। এটা শুধু দুর্ঘটনা নয়, পরিষ্কার পরিকল্পিত খুন।
বারান্দায় এসে দেখি প্রচুর লোকের জটলা, সবার চোখে মুখে অস্বস্তি ,উৎকণ্ঠা। আমি এক ভাবে সোনালীর দিকে তাকিয়ে ভাবছি, সেই প্রথম দিনটার কথা ।এমন সময় হরি কাকা বলে উঠলেন “মিতা তুই এত সকালে?” মিতাদি প্রথমে হক চকিয়ে গেলেও দ্রুত সামলে নিয়ে বলল “আর বলো না রাতে এত বিরিয়ানি খেয়েছি যে পেট গরম হয়ে ঘুম আসছিল না ,শেফালী মাসি অসুস্থ তাই এলাম। নইলে আজ আসতাম না”। তারপর এক মুহূর্ত চুপ থেকে বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করল “কিন্তু সোনালী এইভাবে শুয়ে আছে কেন?”
ভিড়ের মধ্যে দেখি মালিক কাকু ও প্লাম্বার দাদা আমার দিকে তাকিয়েই আছে ,মনে হল যেন চোর চোর ভাব চোখে ।আমি দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “কি করে হলো? সোনালী ঘরে না থেকে বাইরে কেন ?” ওরা তো আমার কথা বোঝেনা তবে চোখে মুখে ভয়ের ছাপ দেখলাম।
ভিড়ের মধ্যে কতজনের কত কথা। কেউ বলছে হার্ট অ্যাটাক হলো নাকি? কেউ বলছে বেশি বিরিয়ানি খেয়ে ফেলেছে। প্লাম্বার কাকু বলল” নিশ্চয়ই বাগানে গিয়েছিল সাপে কামড়েছে।”ইন্দ্রানী আমার হাত চেপে ধরে বলল “না না এই বাগানে কিন্তু কোন সাপ নেই “।এরই মধ্যে একটা গাড়ি এসে সোনালীর নিথর দেহ নিয়ে চলে গেল ।আমরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম চোখের জল মাটিতে মিশে গেল। হঠাৎ চুনু মনু এসে বলল পাঁচিলের ওপারে কয়েকটা বিরিয়ানির প্যাকেট ;প্রচুর পিঁপড়ে আর তিনটে ইঁদুর মরে পড়ে আছে।
আমি এক মুহূর্ত চুপ থেকে বললাম “চল আমরা সবাই মিলে সোনালীর হত্যাকারীকে ধরবোই।
আমি দৌড়ে গিয়ে মনিবের হাত চেপে ধরলাম। ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে পাতায় মোরা বিরিয়ানির সামান্য অংশ দেখালাম ।মনিব সেটি দেখে বললেন “সাব্বাস তুই আমার মনের জট খুলে দিলি। এটা সাপের কামড় নয়, মুখে কোন গ্যাজেলা ছিল না বরং গলায় দড়ির দাগ দেখলাম । তিনি চিন্তিত মুখে বললেন আমি বিনয়কে (পিসের নাম) ফোন করি ।এই খাবারটা পরীক্ষা করাতে হবে।
বিশ্বাস দিদার বাড়িতে সন্দেহের বাতাস ।আমরা সবাই আবার বিশ্বাস দিদার বাড়ি গেলাম। দেখি মালি কাকা আর প্লাম্বার দাদা দিদার সঙ্গে বসে গল্প করছে ।শেফালী মাসি উঠে গেছে। মিতাদি দিদাকে সান্তনা দিয়ে বলছে “দিদা আমি আছি চিন্তা করো না” ।
মনিব জিজ্ঞেস করলেন,” সোনালী রাতে বাইরে ছিল কেন ?”বিশ্বাস দিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “আমি তো খেয়ে ঠাকুর প্রণাম করে শুয়ে পড়ি।”মনিব শেফালী মাসির দিকে তাকালেন। মিতাদি আগেভাগে বলে উঠলো (যেটা মনিবের অপছন্দ )”আমরা তো ভেবেছিলাম সোনালী দিদার ঘরে ওপরেই আছে ।তাই আমি বেরিয়ে যেতেই শেফালী মাসি দরজায় তালা দিয়ে শুয়ে পড়ে। মনিব বললেন “রোজ-ই কি এমন হয়?” শেফালী মাসি নিচু গলায় বললেন,” সাধারণত সোনালী নিচে থাকে।” মনিব বললেন “তোমার কালকে কি হয়েছিল ?এত চেঁচামেচিতেও ঘুম ভাঙলো না কেন”?শেফালী মাসি মাথা নিচু করে বললেন “কাল আমার পেটে খুব ব্যথা ছিল। মিতা একটা ওষুধ দিয়েছিল তাই খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম”।তখনই বুঝলাম ডাল মে কুছ তো কালা হ্যায়। রান্নাঘরের রাংতা কেনো? বুঝতে অসুবিধা হলো না।
আমি মালিকাকা আর plumber দাদার দিকে তাকালাম, তারা কেমন যেন অসস্তিতে ঘেমে উঠেছে। আমি পুষিক্যাট আর ইন্দ্রাণীর দিকে ইশারা করলাম ,ওরা বুঝে গেল । পুষিক্যাট আমার কানে ফিসফিস করে বলল “বুলেট দাদা রান্নাঘরে পাইপটা নেই ।আমি বললাম “ওটা মালী কাকুর কাছে আছে”। ইন্দ্রানী চোখ কুঁচকে বলল “কখন পাচার হল?” আমি বললাম “রান্নাঘরেরজানালা দিয়ে মিতাদি পাচার করেছে”।
দুপুরে খেয়েদেয়ে চিন্তা করতে করতে কিছুটা চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলাম। বিকেলে আবার বিশ্বাস দিদার বাড়ি গেলাম ।দিদা একা বারান্দায় বসে কাঁদছিলেন। আমাদের দেখে নিজেকে সামলে নিলেন।
উনি বললেন “আপনার দোতলা কিন্তু আমি দেখিনি। চলুন দেখি আসি”বলেই উপরে হাটা দিলেন।বিশ্বাস দিদা অবাক চোখে তাকালেন।আমরাও মনিবের পেছন পেছন উপরে উঠলাম। মনিব চুপিসারে হরিকাকাকে বললেন “বাইরে দাঁড়া। কেউ এলে খবর দিস।” ঘরে ঢুকেই মনিব বিশ্বাস দিদাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন “আপনাদের কোনো মূল্যবান জিনিস আছে ?যা এখানে রাখা আছে?বিশ্বাস দিদা চমকে উঠে বললেন,” না! গয়না টাকা সব ব্যাংকের লকারে।” মনিব ধীরে ধীরে বললেন,”উহূ এমন কিছু যা লকারে নেই ,ঘরেই আছে বলুন কোন সেই মণি? যার জন্য মিস্টার বিশ্বাস কে প্রাণ দিতে হয়েছিল ,আর আজ সোনালীকেও।” বিশ্বাস দিদা উঠে দাঁড়ালেন আতঙ্কিত কন্ঠে বললেন “সোনালীকে কেউ খুন করেছে? মনিব গম্ভীর গলায় বললেন ‘হ্যাঁ, এখানে যা বলা হচ্ছে তা সত্যি নয়।এটা সাপের কামড় নয়। কেউ বিষ খাইয়েছে সোনালীকে।”বিশ্বাস দিদা ফ্যাকাসে মুখে বসে পড়লেন।ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো, রহস্যের জট আরো ঘনীভূত হল।
বিশ্বাস দিদা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলেন। তার পূর্ব পুরুষদের গল্প ।তার শ্বশুর মশাইয়ের ঠাকুরদার বাবা ছিলেন একজন বিখ্যাত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ।কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা ঋষিকেশে বসবাস করতেন, আর দূর দুরান্ত থেকে মানুষ ,নানা সমস্যা সমাধান পেতে তার কাছে আসতো।
একবার রাজস্থানের এক বেপরোয়া ও লম্পট স্বভাবের রাজপুত্র , বিন্ধাচল পর্বতে এডভেঞ্চার করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ।বহু চেষ্টা পর তাকে উদ্ধার করা হয় ঠিকি কিন্তু তার দেহে কোন প্রাণশক্তি ছিল না ।বহু চিকিৎসক ,ওঝা সবাই ব্যর্থ হলেন ।অবশেষে ঋষিকেশে সেই বিখ্যাত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন রাজা।
বিশ্বাস দিদার পূর্বপুরুষরা অক্লান্ত পরিশ্রম ক’রে ,এক বছর ধরে নানা ধরনের ওষুধ জরিবুটি প্রয়োগ করে রাজপুত্রকে সুস্থ করে তোলেন। রাজা কৃতজ্ঞতা বশত – তাকে রাজ বৈদ্য করেন, উনারা রাজস্থানেই থাকতে শুরু করেন ,তাছাড়া প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা এবং তিনটি মূল্যবান অষ্টধাতুর মূর্তি উপহার দেন। প্রতিটি মূর্তির কপালে বসানো ছিল দুর্লভ রত্ন গণেশের– কপালে দামি পান্না, লক্ষীর -কপালে বিরল পোখরাজ, আর নারায়নের কপালে নীলকান্ত মনি।
বংশপরম্পরায় সেই তিনটি মূর্তি বিশ্বাস পরিবারের কাছে আসে ,বিশ্বাস দিদার শ্বশুর যিনি প্রথম এলোপ্যাথি চিকিৎসক হয়ে বোম্বে চলে আসেন ।তার ভাগে এসেছিল এই তিন মূর্তি তাই ঠাকুর ঘর ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। এবং শুধুমাত্র বিশ্বাস পরিবারের নারীরাই এর যত্ন নিতেন। বিশ্বাস দিদার শাশুড়ির পর ঠাকুরের পুরো দায়িত্ব বিশ্বাস দিদা নিলেন। সুরক্ষার জন্যই নিয়ম ছিল তিনজন ঠাকুরের কপালেই মণির ওপরে ভালো করে চন্দনের টিপ এমনভাবে পড়াতে হবে যাতে বোঝা না যায়।
বিশ্বাস দিদা কথাগুলো বলতে বলতে হঠাৎ চমকে উঠলেন— ঠিক ওই সময় থেকেই চুরির চেষ্টা শুরু হয়েছিল। মনিব শান্তভাবে বললেন “উত্তেজিত হবেন না। রাজাকে নিশ্চয়ই সব বলবেন ,কিন্তু আগে বলুন এই ঠাকুর ঘরের ব্যাপারে কে কে জানতো?” কিছুক্ষণ ভাবলেন তারপর বললেন “শেফালী জানে কারণ সেই ঠাকুরঘর পরিষ্কার করে। আর কেউ জানতো বলে মনে হয় না এমনকি আমার বাপের বাড়ির লোকেরাও না।”
“মিতা জানেনা?”
দিদা বললেন, “সেও জানে কারণ সেও ঠাকুর ঘরের কাজে সাহায্য করছে, খুব পরিশ্রমী মেয়ে! দারুন যত্ন নিয়ে কাজ করে” ।মনিব বললেন “সেটাই তো চিন্তার বিষয় । আমরা আপনার ঠাকুর ঘরটা একটু দেখতে চাই, আপনার কোন আপত্তি নেই তো? বুলেটও কিন্তু আমার সঙ্গে ভেতরে যাবে”। বিশ্বাস দিদা দেখলাম সম্মতি জানালেন।
নিচে এসে বিশ্বাস দিদা ঠাকুর ঘরে দরজা খুলতে যাচ্ছিলেন, তখনই মনির হাত তুলে থামিয়ে দিলেন ।বললেন “এক মিনিট; আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “বুলেট”। আমি বুঝে গেলাম কি করতে হবে। উঠে দাঁড়িয়ে তালার গায়ে নাক লাগিয়ে গন্ধ শুকলাম একেবারে টাটকা গন্ধ।
লকটা মোবাইলের কিপ্যাড এর মত ।দিদা নম্বর চাপতে লাগলেন, দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমি দুহাত জড়ো করে প্রণাম করলাম। ইন্দ্রানী এসে ফিসফিস করে বলল, “কথা আছে”। আমি ইশারায় অপেক্ষা করতে বললাম।
মনিব, ঠাকুরের সামনে গিয়ে ভালো করে লক্ষ্য করলেন , আলো নিভিয়ে দিতে বললেন। ঘর অন্ধকার হতেই মোবাইলের আলো ঠাকুরের উপর ফেলতেই ,নানা রঙের রশ্মি সারা ঘর আলোকিত করে দিল। “কেমন চন্দনের টিপ পরিয়েছেন বোন” ? মনি বললেন ।
বিশ্বাস দিদা স্তব্ধ । মুখে কোন কথা নেই বিড়বিড় করে বললেন “আমি তো মোটা করে চন্দন পড়াই কি করে এমন হলো”?
আমরা ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। মিতাদিকে দিদা চা বানাতে বললেন। মনিব বলে উঠলেন “না না ,তার দরকার নেই ।আমরা এখন বাড়ি যাব”। হরি কাকাকে মনিব নির্দেশ দিলেন কাল থেকে এই বাড়ির খাবার এমনকি জল কেউ খাবে না।
আমরা যখন ফিরে এলাম তখনই পিসি ও পিসেমশাই এলেন ।রিপোর্ট হাতে পেয়ে মনিব ঘোষণা করলেন সোনালীকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে ।আমি দেখলাম মনিব টেবিলে কম্পিউটার রেখে গণেশ পূজোর ছবি জুম করে দেখছেন। আমায় বললেন “কাদের গন্ধ পেয়েছিস বল” আমি মাথা নেড়ে ইশারায় জানিয়ে দিলাম। মনিব, পিসি ও পিসেমশাইয়ের সঙ্গে গম্ভীর আলোচনা শুরু করলেন। আমি বারান্দায় এলাম ,তখন ইন্দ্রানী খবর দিল মিতাদির একটা স্মার্টফোন আছে। দেখছি মিতাদির উপর করা নজর রাখতে হবে।।
ফিরে এলাম বসার ঘরে মনিব বললেন “সোনালীর মৃত্যুর কারণ শুধু ঠাকুর নয়। এর সঙ্গে অন্য কিছু জড়িয়ে আছে।” পিসেমশাই বললেন “তবে কি পুলিশ পাহারা বসাতে হবে”? মনিব জানালেন নানা নানা পুলিশ ডাকলে হবে না ,সব ভেস্তে যাবে। হাতে না হাতে ধরতে হবে ।হত্যাকারী রাতের অন্ধকারেই আবার আঘাত হানবে।কালকের মধ্যে সত্য সামনে আনতে হবে। ওরা আর দেরি করবে না। আমাদেরও সেই মতো এগোতে হবে। আমি বুঝতে পারলাম- কিছু একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে চলেছে…….
রাতে আমি আর হরি কাকা দিদার বাড়িতেই শুলাম। ছাদের একটা জানলা খোলা রাখলাম, যাতে বাগান পার্টি আসতে পারে ।ইন্দ্রানী আমাদের সঙ্গে ঢুকে গিয়েছিল ।আমরা সবাই ঠিক করলাম কাল থেকে এই বাড়ি এবং ওই তিনজনের উপর নজর রাখবো ।এর মধ্যে শুনতে পেলাম চুনি পান্না খুব চেঁচাচ্ছে, দেখতে গেলাম কি হয়েছে। আসলে ওরাও আমাদের সঙ্গে উপরে আসতে চায়। কিন্তু কিভাবে নিয়ে যাব? পুষিক্যাট বলল “বুলেট দাদা, তুমি সোজা হয়ে দাঁড়াও, ইন্দ্রানী তোমার মাথায় চড়ে ওদের খুলে দেবে”। ভালো বুদ্ধি -তাই হল। এই করতে করতেই বাইরে ইন্দ্রর আওয়াজ শুনলাম। ইন্দ্রানী ছুটলো ইন্দ্রকে আনতে ।
সোনালীর মৃত্যুর পর থেকে যা যা ঘটেছে সব ইন্দ্রকে জানানো হলো । সব শুনে ইন্দ্র কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারল না। নিজেকে একটু সামলে বলল “আমি তোমাদের এমন কিছু খবর দিতে পারি, যা তদন্তে সাহায্য করবে” ।আমি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম “কি খবর”। ইন্দ্র বলল “বরানগর থেকে আসতে অনেকক্ষণ লাগে ।দুটো বাস বদলাতে হয় ।এখানে বাস স্টপ একটু আগে। নামার পর জল তেষ্টা পেয়ে গেল। রোল কাকুর দোকানে গেলাম।তখনই বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে শুনতে পেলাম, মিতাদি বলছে আজই হয়ে যেত। ওই উকিলটাই সব নষ্টের গোড়া ,ব্যাটা বুদ্ধিমান আর বোনের জন্য পাগল ।মালিকাকু বলল “তাহলে কাল বিকেলে প্ল্যান বি সফল করতেই হবে”। প্লাম্বার দাদা বলল “দড়ি আমার কাছে রেডি আছে” ।মিতাদি হেসে বলল “চিন্তা করিস না। আমার প্ল্যানও তৈরি ভরে ট্রেনেই পালাবো”।
ইন্দ্রর কথা শুনে, আমি বললাম “বুঝলাম। তাহলে আজ রাতটা নিশ্চিন্ত। কিন্তু কাল ভোর থেকেই আমাদের পজিশন নিতে হবে। মনিবকে সব জানাতে হবে”। ইন্দ্র বললো কিন্তু মনিবকে বোঝাবো কি করে ইন্দ্রানী বলল “চিন্তা নেই। হরি কাকা, স্যার আর বুলেটদা একে অন্যের শুধু কথা নয় ,চোখের ভাষা ও বোঝে” । আমি বললাম “সেটা আমার দায়িত্ব। তবে কাল থেকে বাড়ির উপর নজর রাখতে হবে। চুনি পান্না তো আছেই। ইন্দ্র ইন্দ্রানী পুষিক্যাট তোমরা ভেতরের খবর আমাদের রিলে করবে ।কাকেশ্বর, কাকেশ্বরী কমপ্লেক্সের আশেপাশের রাস্তাগুলি ওপর নজর রাখবে। মৌ আর চুনু মনু মালি কাকু আর প্লাম্বার দাদার উপর নজর রাখবে ।আর পায়রা দিদা তুমি রাবার গাছের উপর থেকে সব দিক খেয়াল করবে। মিতাদি মোবাইলটাও চুরি করতে হবে সঠিক সময় আমি বলে দেব”।
পরদিন সকালে আমরা আমাদের মত হাঁটাহাঁটি জগিং করলাম যেন কিছুই হয়নি। এরপর বিশ্বাস দিদার বাড়িয়ে গেলাম ,সেখানে ঢুকতেই কান্নার আওয়াজ পেলাম। আমার আর মনিবের চোখাচোখি হতেই দৌড়ে গেলাম। দেখি মিতাদি হাঁপাচ্ছে আর কেঁদে যাচ্ছে। মিতাদির বর মদ খেয়ে মিতাদিকে মেরে ঘর থেকে বার করে দিয়েছে। তাই মিতাদি কয়েকদিন বিশ্বাস দিদার বাড়িতে থাকতে চায়। মনিব আমায় চোখে চোখে ইঙ্গিত করলেন বললেন “কোন অসুবিধা নেই । একা মানুষ কোথায় যাবে? বোন আপনি ওকে এখানে কয়েক দিন থাকতে দিন।”এদিকে কাকেশ্বর তখন থেকে ডেকে যাচ্ছে ওর কাছে যেতেই বললো “মিতাদি মিথ্যে কথা বলছে”। আমি বললাম বুঝতে পেরেছি। সবাই বাগানে চল।
বাগানে গিয়ে শুনলাম আরো সাংঘাতিক কথা। কাকেশ্বরী রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকানে বসে ছিল ,হঠাৎ দেখে মিতালী মালিকাকুর সাইকেলের পেছনে বসে আসছে ।দুজন চা বিস্কিট খেতে খেতে খুনসুটি করছে। মালিকাকু মিতাদির চিবুক ধরে বলছে “আহারে আমার বর আমার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।”মিতাদি হেসে পকেট থেকে একটা ছোট্ট কৌটো বার করলো বলল “এটা চোখে দিলে জল পড়বে ,একটু জ্বালা করবে তবে দরকার পড়লে কষ্ট করতেই হবে”।
মিতাদি আর মালিক কাকু স্বামী-স্ত্রী।
সবাইকে আমি সাবধান করলাম। আজ একটুও কথা বলবে না। শুধু নজর রাখবে। এরপর বিশ্বাস দিদার বাড়ি গিয়ে দেখি সবাই চা খাচ্ছে। হরিকাকা বললেন “কোথায় ছিলি বুলেট? চা খেয়ে নে”।, আমি আর মনিব, ঠাকুর ঘরে গিয়ে গোপন আলোচনা করলাম। মনিব বললেন, “বুঝেছি তবে এবার সাবধানে থাকতে হবে”। ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে ঘোষণা করলে আজ ওনার জন্মদিন উপলক্ষে সকাল থেকে রাত অবধি খাওয়া দাওয়া দায়িত্ব হরিকাকার। সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে রাতের ডিনার পর্যন্ত হরি কাকাই রান্না করে এ বাড়িতে নিয়ে আসবে । একেই বলে জজের বুদ্ধি!এক মিতাদিকে রান্নাঘরে ঢুকতে না দেওয়া, দুই ঠাকুর ঘর নজরে রাখা।
লুচি তরকারি বানিয়ে হরি কাকা নিয়ে এলেন, সঙ্গে জলের বোতল এমনকি নুনটাও। দুপুরের বিশ্বাস দিদার বোনকে মনির রাজা দাদাকে বলে আনিয়েছেন।দুপুরেও সকালের মতোই ব্যবস্থা হল। শুধু আমিও পুষিক্যাট বাড়ি থেকে খেয়ে এলাম। হরি কাকার একটা গুণ হলো ,মানুষটা নির্ভেজাল ভালো মানুষ। কিন্তু দরকারে এমন শক্ত যে সবাই সম্মোহিত হয়ে যায়। মিতাদিরও তাই হল। রান্নাঘর হরি কাকা লক করে দিয়েছেন। বিশ্বাস দিদা বললে ,”আজ মনিবের জন্মদিন পায়েস করব”। মনিব বললেন “হরিকে বলবেন যেন পায়েসে মিতা হাত না দেয় ।মনিব নার্সিংহোমে ফোন করে শেফালী মাসিকে আইরিস নার্সিংহোমে ভর্তি করিয়ে দিলেন। মিতাদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, চোখেমুখে খুব নিশ্চিন্ত ভাব ফুটে উঠেছে।আমি মনে মনে হাসলাম ।
দুপুরে আমিও পুষি ক্যাট বাড়িতে খেয়ে দিদার বাড়ি এলাম ।পিসি জানিয়েছে কাজ এখনো শেষ হয়নি সন্ধ্যেবেলায় আসবে। দিদার বাড়িতে ঢুকতে মিতাদি বলল “কি ব্যাপার হরি কাকা এখানে করলেই তো পারতে! আমিও হাত লাগাতাম ও বাড়ি যেতে তো বারণ করেছিলে”। হরি কাকা হেসে বলল মনে কর আমাদের ফ্ল্যাটে খাওয়া দেওয়া হচ্ছে। তুইও নিমন্ত্রিত কিছু কাজে হাত দিবি না আজ দাদাবাবুর জন্মদিন কাজেই সব আয়োজন আমি করব হরি কাকা দারুন ভাবে টেবিল সাজিয়ে দিল। হরি কাকা আজ সুপাড়ি গাছের ছালের থালা বাটিতে সব খাবার সাজিয়ে দিলেন।
মনিব আমার দিকে তাকালে, আমি ওকে ইশারায় কিছু জানালাম। কারণ আমরা জানতাম মিতাদি ঠাকুর ঘরের লকার এর নম্বর জানে। তাই ইন্দুদের বলেছিলাম ওর উপর নজর রাখতে। অবশ্য মিতাদি বেশিরভাগ সময় বাইরে ছিল। খাওয়া দাওয়ার শেষে সবাই গল্প করছিল। ইন্দুরা ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ঠিক তখনই ইন্দ্রানী এসে খবর দিল মিতাদি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। ফোনে মনিবের সঙ্গে পিসিদের কিছু আলোচনা হচ্ছিল। আমরা বাড়ি চলে এলাম কিন্তু সবাইকে সজাগ থাকতে বলা হলো।
বিকেলে চারুমাসিকেও হরি কাকা খেতে দিলেন ।চারু মাসি হরি কাকাকে বলল “জানিস হরি কালে কালে কত কিছু দেখব? বড়লোকদের বাড়িতে টাকা চুরি ,গয়না চুরি হয়। কিন্তু ঘুমের ওষুধ চুরি হয় এই প্রথম শুনলাম। ডি আই ব্লকের মাসিমার ঘুমের ওষুধ চুরি হয়েছে ।”আমরা সবাই হেসে উঠলাম হরি কাকা একটু অবাক হয়ে গেল। হরি কাকা বললেন “আরে মিতাও তো বাড়িতে কাজ করে তাই না?”
চারু মাসি বলল হ্যাঁ, কিন্তু ও তো আজ যায়নি।”আমি পুষিক্যাট হরিকাকা নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাওয়ি করলাম। বুঝতে আর কিছু বাকি নেই।
সন্ধ্যায় পিসি ও পিসেমশাই এলেন ।সঙ্গে বড় একটা ব্যাগ আর ছোট্ট চৌকো কিছু আনলেন। মনিব সেটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছিলেন ,আমাকে ডেকে বললেন “বুলেট আমি কিন্তু তৈরি, বাইরে চারিদিকে প্লেন ড্রেসে পুলিশের লোক আছে। তুই তোর দলবলকে রেডি থাকতে বল ।আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।
আমরা সবাই দিদার বাড়ি গেলাম ।পিসিরা দিদাকে নিয়ে ঠাকুর ঘরে গেলেন ।আর আমি বাগানে গিয়ে ইন্দ্র ,ইন্দ্রানী ,কাকেশ্বর ,কাকেশ্বরী, পায়রা দিদা পুষিক্যাট সবাইকে নিয়ে ‘মিশন সোনালী’ পরিকল্পনা করছিলাম।
ঠিক হলো- রাতে ইন্দ্র ও ইন্দ্রানী ঘরের মধ্যে থাকবে। পুষিক্যাট জানলা দিয়ে ঢুকবে ,আমি পুষিক্যাটকে দিয়ে একটা জানলার লক নষ্ট করিয়ে রেখেছিলাম ,যাতে বন্ধ করা না যায়। পাঁচিলের উপরে কাকেশ্বর তার কুড়িজন বন্ধুদের বসিয়ে রাখবে। চুনু মুনু উপর থেকে নজর রাখবে আর পায়রা দিদা রবার গাছে উঁচু ডালে থাকবে ।কিন্তু মিতাদিকে সন্ধ্যার পর আর দেখা গেল না ।ইন্দ্র জানাল ,সে নাকি কোন বান্ধবী কাছে গেছে ।এটা আমাদের জন্য ভালই হল। ইন্দ্র ও ইন্দ্রানীকে নিয়ে আমি ও পুষি ক্যাট মিতাদির ব্যাগ সার্চ করতে গেলাম ।ইন্দ্র দক্ষতার সঙ্গে চেন খুলল ইন্দ্রানী ব্যাগের ভেতরে ঢুকে গেল। একটু পরেই বেরিয়ে এসে বলল “কত প্যাকেট কোনটায় কি আছে বুঝবো কিভাবে”? পুষিক্যাট বলল “টেনে বার করি,” আমি বললাম “দাঁড়া, হরিকাকাকে ডাকি। হরি কাকা এসে ব্যাগের ভেতর দেখল অনেক সোনার গয়না আর জামা কাপড় । অবাক হলাম এত গয়না মিতাদি কোথায় পেলো? ঠিক তখনই ইন্দ্রানী সাইট পকেটে ঢুকে কিছু বের করার চেষ্টা করছিল ,হরি কাকা সাহায্য করল আর ব্যাগ থেকে বেরোলো কিছু ঘুমের ওষুধ। ইন্দ্রানী চেঁচিয়ে উঠলো “এইতো ডি ব্লকের দিদার ঘুমের ওষুধ”। আমরা অবাক হয়ে ইন্দ্রানী দিকে তাকাই ।পুষিক্যাট মাথায় হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বসে পড়ল। “পায়রা দিদা কি সাধে ইন্দ্রানী কে খবরি বলে!!”হরিকাকা গিয়ে পিসি কে ডেকে এনে সব দেখালেন। আবার সব ঠিকঠাক করে রেখে দিলাম যাতে সন্দেহ না হয়।
মনিব ঠিক তখনই ফিরলেন। হাতে সেই চৌকো বস্তুটা। হরি কাকা চা আর পাকৌড়া করে আনলেন । দিদাকে হরি কাকা তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খাইয়ে দিলেন ।দিদাকে বলা হলো তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে এবং দরজা লাগিয়ে দিতে। মিতাদি হাজার ডাকলেও যাতে সাড়া না দেন। আর কিছু দরকার হলে, আমাদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেন।দিদা মাথা নেড়ে সায় দিলেন ।আমরা সবাই শিহরিত একটা দারুন অ্যাডভেঞ্চার অপেক্ষা করছে।মিতাদি বেশ রাত করে ফিরল। আমরাও তখন উঠে পড়লাম
মনিব বললেন “হরি ,আজ রাতে কিছু খাব না।দুপুরে অনেক বেশি খাওয়া হয়ে গেছে”। পিসে বললেন আমরা কিন্তু খাব দুপুরের খাবারগুলো বাঁচিয়ে রেখেছো তো? হরিকাকা বললেন “হ্যাঁ, জামাইবাবু সব আগেই আলাদা করে তুলে রেখেছি।” বিশ্বাস দিদা বললেন, “মিতা আমি কিছু খাব না তুই খেয়ে শুয়ে পড়।আমি একটু ঠাকুর ঘরে যাচ্ছি। মিতাদি বলল “সে কি দিদা,কিছু না খেলে শরীর খারাপ হবে।এক গ্লাস দুধ খেয়ে নিন”। দিদা বললেন, “শোবার ঘরে রেখে দে ,খেয়ে নেব”।
বাড়ি গিয়ে মনির কম্পিউটার খুলে বসলেন,বললেন “বুলেট আয়,দেখে যা”। কাছে গিয়ে দেখি বিশ্বাস দিদার ঠাকুর ঘর আর বসার ঘর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি বুঝলাম চৌকো বস্তুটা আসলে পোর্টেবল সিসি ক্যামেরা। ইন্দ্রানী সেদিকে তাকিয়ে সামনের বড় দাঁত দুটো বের করে হাসছে। হরিকাকা গোল গোল চোখ করে বললেন “আচ্ছা বিচ্ছু”! কম্পিউটার চালু ছিল, কেউ না কেউ আমরা ওটার সামনে বসেই ছিলাম। রাত দেড়টার সময় আমি, পিসে আর মনিব নিচে নেমে এলাম। আমি বাগানে লুকিয়ে নজর রাখছিলাম। এর মধ্যেই ইন্দ্র এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলাম “কিরে, দিদা দুধ খাননি তো?” ইন্দ্র বলল “তোমরা চলে যাবার পরেই দিদারা ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দেয়। মিতাদির হাজার ডাকেও সাড়া দেননি। ইন্দ্র বলল “বুলেট, দাদা ওই দেখো রান্না ঘরে পেছনে কারা যেন আছে”। আমি বললাম “চিন্তা করিস না ।মেয়ে পুলিশ,পিসে আর মনিব।” কাকেশ্বর খবর দিল মনে হচ্ছে পেছনে প্রচুর পুলিশ সাধারণ মানুষের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রায় এক ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পুষিক্যাট এসে জানালো “গনেশ, লক্ষ্মী আর রাধা কৃষ্ণ ব্যাগে ঢুকে পড়েছে।তার মানে এবার বেরোবে। ঠিক দুটো পঁয়ত্রিশ পাঁচিলে শব্দ হলো। একটা ছায়া মূর্তি চাদরে ঢাকা এদিক ওদিক তাকিয়ে পাঁচিলের দিকে এগোচ্ছে, হাতে একটা ব্যাগ। ইন্দ্রানী হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলো।আমি জিজ্ঞেস করলাম “কি হলো রে তোর”। সে বলল, “আর বোলো না বুলেট দাদা, এতক্ষণ বারান্দায় ব্যাগটা আমার পেছনের পা আর লেজের উপর চেপেছিল ।এত ভারী কি বলব, মিতাদিও টানতে না পেরে মাটিতে রাখলো তো রাখল আমারই ওপরে। ভাগ্যিস মাথার উপরে রাখেনি। কোন মতে বেঁচে দৌড়ে এসেছি”।
আমি বললাম চুপ, ওই দেখ ওপার থেকে দড়ি এপারে ছোড়া হল। মিতাদি সেই দড়িতে ব্যাগটা বেঁধে টেনে সিগন্যাল দিয়ে আবার ফিরে এলো।বুঝলাম কাজ হয়ে গেছে।
মনিব শিষ দিতেই কাকেশ্বর বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল মালিকাকুদের উপর।মিতাদি ব্যাগের কাছে যেতেই আমি গিয়ে টুটি চেপে ধরলাম। দেখি লেডি কনস্টেবল চলে এসে মিতাদিকে হাতকড়া পরিয়ে বারান্দায় নিয়ে এলো ।
পুষিক্যাট পা দিয়ে আমার পায়ে চাপ দিয়ে ইশারায় করতেই ,দেখি আরেকজন ব্যাগের কাছে যাচ্ছে। আমি দৌড়ে কাছে গিয়ে দেখলাম ব্যাগটা বদলে দিলেন। তিনি দেখি হরি কাকা।
হরিকাকা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন ঠাকুর বদল হলো রে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
হরিকাকা বললেন“মনিব বলেছেন।এবার কমপ্লেক্সের সবাই আসবে ঠাকুর দেখতে। রিপোর্টাররাও খবর পেলেই দৌড়ে আসবে কিন্তু যদি সত্যিটা জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে এ বাড়িতে আবার হামলা হতে পারে। তাই জন্য ঠাকুর বদলে দিতে বলেছেন মনিব। কাল পিসিমনি বাজার থেকে দামি পেতলের মূর্তিগুলো নিয়ে এসেছেন। দেখে মনে হচ্ছে যেন সোনার । সবার চোখে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা”। বলে হাসতে লাগলেন। আমিও মনিবের উদ্দেশ্যে স্যালুট জানিয়ে বললাম এই না হলে জাজ জয় বন্দোপাধ্যায়! আমার বুক গর্বে ভরে উঠলো।
ততক্ষণে দিদারা সবাই বেরিয়ে এলেন ।ওদিক থেকে মালিকাকু ও প্লাম্বার দাদাকে হাতকড়া পরিয়ে আনা হলো ।তিনজন চোরকে গাড়িতে তোলা হল। কমপ্লেক্স কমিটিকে সব জানানো হলো।
দেখতে দেখতে প্রচুর লোক জমা হয়ে গেল। কমপ্লেক্সের লোক, পুলিশের লোক, রিপোর্টারের লোক সবাই এসে ছেঁকে ধরল। তাদের নানা প্রশ্ন ।পিসে বললেন “এরা নামকরা মুক্তি চোর। কলকাতার নানা জায়গা থেকে প্রচুর চুরি করেছে । মন্দির থেকেও ঠাকুরের গয়না চুরি করতে ছাড়েনি। এর আগে উড়িষ্যা বিহারেও অনেক চুরি ডাকাতি করেছে । মিতাদি, মালিকাকা আর প্লাম্বার দাদা একটা দল ।
সবার সামনে ব্যাগ থেকে নকল মূর্তিগুলো বার করা হলো সবাই ভাবল সোনারই হবে। আসলটা হরি কাকা আগেই বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে রেখে এসেছেন।
সবাই ছবি তুলতে শুরু করলো ।মনিবকে, দিদাকে পিসেকে অনেক প্রশ্নে জর্জরিত করে তুলল সবাই। রিপোর্টাররা সব ছবি তুলতেই ব্যস্ত। আমরা সবাই বাগানে চুপচাপ গিয়ে দাঁড়ালাম। ইন্দ্র বলল “কিছু বল বুলেটদা! তোমার জন্যই আজ সব ধরা পড়ল”। আমি মাথা নাড়লাম, বললাম “না রে, তোরা না থাকলে আমি একা কী করতে পারতাম? আমার ইচ্ছা করছিল মিতাদির গলা টিপে দি”।
পায়রা দিদা বললেন “সেটা আমাদেরও ইচ্ছা করছিল। কিন্তু বুলেটের মনিব যখন জড়িয়ে গেছেন তখন আইন মেনেই চলতে হবে। আমরা তো আইনের বাইরে”। ইন্দ্রানী বলল “ওরা মরবেই, এই আর কদিন মাত্র আয়ু” ।সবাই চমকে উঠলাম ওর দিকে তাকালাম। ইন্দ্রানী চোখ মেরে হেসে বললো “আমি মেঠো ইঁদুরদের বলে রেখেছিলাম ওদের এমন কামড়ে দিয়ে, যাতে পৃথিবীর আলো বেশি দিন দেখতে না হয়; ওম শান্তি!!”
“বুলেট তোর দলবল নিয়ে এদিকে আয়” বলে মনিব চিৎকার করে ডাকলেন।
গিয়ে দেখি বিরাট ভিড় ।মাইক হাতে মনিব বলছেন “এতে আমাদের কোন কৃতিত্ব নেই। সবটাই করেছে বুলেট এন্ড কং।ওরাই আগে বুঝেছে, সোনালীকে হত্যা করা হয়েছে।সেদিন সোনালীকে সাপে কামড়েছে বলে দাহ করা হয়েছিল। কিন্তু আসলে সোনালীকে হত্যা করা হয়েছিল ।বুলেট বুদ্ধি করে বিরিয়ানির টুকরো মুখ থেকে বের না করলে তো আজ কিছুই জানা যেত না”। সবাই আমাদের ছবি তুলতে শুরু করল। আমাদের পুরো কমপ্লেক্সে ঘোরানো হলো।
মনিব বললেন “আজ আমি এদের জন্য গর্ববোধ করছি। যেটা মানুষ পারেনি সেটা এই পশুপাখিরা করে দেখালো”।
ইন্দ্র ইন্দ্রানী ,পুষিক্যাট, চুনু মুনু ,মৌ , কাকেশ্বর কাকেশ্বরী সবাই আমরা লাইন দিয়ে চললাম।ছোটরা ফ্লাইং কিস দিচ্ছে। কেউ মালা পরাচ্ছে। যারা আমায় ঘৃনা করত তারাও এসে হ্যান্ডসেট করছে ।
কিন্তু আমার বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে আমি চিৎকার করে কাঁদতে চাই। মানুষের এত ভিড় এত আদিখ্যেতা আমার ভালো লাগছে না। ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সোনালী বলছে, “সরি বুলেট দাদা আর কোনদিন দুষ্টুমি করবো না। এই পিংকি প্রমিস”করলাম।
বিশ্বাস দিদা –চুনি পান্না কে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিলেন।



