Posted in

চৌষট্টি যোগিনীর মন্দির

Spread the love

অর্ণব মুখোপাধ্যায়


পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের ভেতরের জঙ্গলটা সন্ধ্যার পর দ্রুত বদলে যায়। দুপুরের শুকনো রোদ, পাথরের গায়ে লেগে থাকা ধুলো, দূরের লাল মাটির রাস্তা—সবকিছু যেন রাত নামার আগেই অন্য এক রঙে ঢেকে যেতে থাকে। ইউটিউব চ্যানেল Urban Folklore Bengal-এর চার সদস্য সেই জঙ্গলের গভীরে ঢুকছিল ঠিক সূর্য ডোবার সময়। গাড়ির সামনে লাগানো ক্যামেরা অন ছিল। ড্রোন ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হাঁটছিল রুদ্র। তার পিছনে তিথি, সায়ন আর নীল। চারজনের মুখেই অদ্ভুত উত্তেজনা। কারণ গত তিন মাস ধরে তারা এই জায়গার খোঁজ করছিল।

লোকমুখে প্রচলিত ছিল—পুরুলিয়ার জঙ্গলের গভীরে এক প্রাচীন “চৌষট্টি যোগিনীর মন্দির” আছে, যেটা মানচিত্রে নেই। আশেপাশের আদিবাসী গ্রামগুলো সেই দিক এড়িয়ে চলে। রাতের পর কেউ ওখানে যায় না। বলা হয়, মন্দিরে এখনও পূজা হয়। কিন্তু মানুষ করে না।

রুদ্র ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছিল, “আজ আমরা যাচ্ছি বাংলার সবচেয়ে রহস্যময় জায়গাগুলোর একটায়। লোকালরা আমাদের বারবার বারণ করেছে। কিন্তু আমরা দেখব, সত্যিই এখানে কিছু আছে কিনা।”

তিথি নিচু গলায় বলেছিল, “আমার এখনও মনে হচ্ছে আমাদের না এলেই ভালো হত।”

সায়ন হেসে উঠেছিল। “হরর ভিডিও করতে এসে ভয় পেলে হবে?”

তিথি আর উত্তর দেয়নি। কারণ জঙ্গলের ভেতর ঢোকার পর থেকেই তার অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল। যেন কেউ তাদের দেখছে। গাছের আড়াল থেকে। নিঃশব্দে।

তারা যে বৃদ্ধ লোকটার কাছ থেকে পথ জেনেছিল, সে শেষ মুহূর্তে বলেছিল, “রাত নামার আগে যদি মন্দির দেখতে পাও, ফিরে আসবে। ওখানে রাত কাটাবে না। যোগিনীরা একা থাকতে ভালোবাসে না।”

কথাটা শুনে সবাই হেসেছিল। শুধু নীল হাসেনি।

নীল সাধারণত খুব কম কথা বলে। ক্যামেরা আর সাউন্ড সামলায়। কিন্তু জঙ্গলে ঢোকার পর থেকে সে বারবার পিছনে তাকাচ্ছিল। যেন কারও পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।

প্রায় চল্লিশ মিনিট হাঁটার পর তারা প্রথম মন্দিরটা দেখতে পেল।

গাছের ঘন অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পাথরের স্থাপনা। চারপাশে ভাঙা স্তম্ভ। মাথার ওপর ঝুলে থাকা বটগাছের শেকড়। জায়গাটা যেন মাটির নিচ থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে।

মন্দিরের গায়ে অসংখ্য নারীমূর্তি খোদাই করা। প্রতিটা মুখ আলাদা। কারও হাতে খুলি, কারও হাতে ত্রিশূল, কেউ নগ্ন, কেউ রক্তমাখা জিভ বার করে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ অদ্ভুতভাবে সব মুখের চোখ একইরকম। বড়, গোল, স্থির।

তিথি ফিসফিস করে বলল, “এগুলো যেন তাকিয়ে আছে।”

রুদ্র উত্তেজিত হয়ে ক্যামেরা চালু করল। “বন্ধুরা, তোমরা এটা দেখছ? অবিশ্বাস্য! এই জায়গার কোনো ছবি ইন্টারনেটে নেই!”

মন্দিরের দরজা ছিল খোলা। ভিতর থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছিল। গরমের রাতেও সেই বাতাস বরফের মতো ঠান্ডা।

নীল দাঁড়িয়ে পড়ল। “আমার ভালো লাগছে না।”

সায়ন বলল, “এখন আবার নাটক শুরু করিস না।”

ভিতরে ঢুকতেই তারা বুঝল মন্দিরটা বাইরে থেকে যতটা ছোট দেখাচ্ছিল, ভিতরে তার চেয়ে অনেক বড়। গোলাকার কেন্দ্রীয় চত্বর। চারদিকে খোপের মতো ছোট ছোট কক্ষ। প্রতিটা কক্ষে একেকটা যোগিনীর মূর্তি।

চৌষট্টি।

ঠিক মাঝখানে কালো পাথরের বেদি।

বেদির ওপর শুকনো লাল দাগ।

রুদ্র নিচু হয়ে সেটা ছুঁয়ে বলল, “রঙ নাকি?”

তিথি হঠাৎ বলে উঠল, “না, এটা রক্ত।”

কথাটা বলেই সে থেমে গেল। কারণ সে জানত না কেন তার এমন মনে হল।

সায়ন ইতিমধ্যে লাইভ শুরু করে দিয়েছে। “বন্ধুরা, আজ আমরা রাত কাটাব এই মন্দিরে।”

মুহূর্তের মধ্যে কমেন্ট ভরে যেতে লাগল।

“ফেক।”

“রাতে পালাবে।”

“ভূত দেখিও।”

রুদ্র বলল, “আমরা প্রুভ করব এসব গুজব ছাড়া কিছু নয়।”

কিন্তু ঠিক তখনই মন্দিরের ভেতরে খুব ধীরে একটা শব্দ হল।

ঘুঙুর।

একবার।

তারপর আবার।

চারজন একসঙ্গে ঘুরে তাকাল।

অন্ধকার কক্ষগুলোর মধ্যে একটা থেকে যেন ক্ষীণ আলো বেরোচ্ছে।

তিথির গলা শুকিয়ে গেল। “তোরা শুনলি?”

সায়ন জোর করে হাসল। “বাদুড় হবে।”

কিন্তু শব্দটা এবার আরও কাছে এল।

ঘুঙুর।

ঝনঝন।

ঝনঝন।

মনে হচ্ছিল কেউ ধীরে ধীরে হাঁটছে।

মন্দিরের ভিতরের বাতাস বদলে যেতে লাগল। গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। পুরনো ধূপ, ভেজা মাটি আর পচা ফুলের গন্ধ।

নীল ক্যামেরা তুলে সেই অন্ধকার কক্ষটার দিকে জুম করল।

কিছু দেখা যাচ্ছিল না।

শুধু… দুটো চোখ।

স্থির।

চকচকে।

তারপর হঠাৎ ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেল।

স্ক্রিন কালো।

একই সঙ্গে মন্দিরের বাইরে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হল।

গাছগুলো কাঁপতে লাগল।

তিথি ফিসফিস করে বলল, “আমরা বেরিয়ে যাই।”

কিন্তু দরজার দিকে তাকিয়েই তারা থেমে গেল।

কারণ যে দরজা দিয়ে তারা ঢুকেছিল… সেটা আর সেখানে নেই।

চারপাশে শুধু পাথরের দেয়াল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে মন্দিরের অন্ধকারে এক নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

খুব ধীরে।

খুব কাছে।

“এতদিন পরে… অতিথি এলো…”

মন্দিরের ভেতরের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। যেন চারদিকের অন্ধকার নিঃশ্বাস নিচ্ছে। রুদ্র প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না দরজাটা সত্যিই উধাও হয়ে গেছে। সে হাতের টর্চ জ্বেলে দেয়ালের গায়ে আলো ফেলল। শুধু কালো পাথর। কোথাও কোনো ফাঁক নেই।সায়ন গলা চড়িয়ে বলল, “এইসব ট্রিক! নিশ্চয়ই অন্যদিক দিয়ে বেরোতে হবে।”কিন্তু তার গলার ভেতরেও ভয় জমে উঠছিল।তিথি পেছনে সরে এসে মূর্তিগুলোর দিকে তাকাল। আগের চেয়ে যেন আলাদা লাগছে। চোখগুলো আরও উজ্জ্বল। যেন অন্ধকারের মধ্যে বসে তারা চারজনকে পর্যবেক্ষণ করছে।নীল আবার ক্যামেরা অন করার চেষ্টা করল। স্ক্রিনে শুধু স্ট্যাটিক। খসখস শব্দ। তারপর কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভিডিও ফুটে উঠল।স্ক্রিনে দেখা গেল—তারা চারজন দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরের মাঝখানে।কিন্তু তাদের পিছনে আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে।নারী।লম্বা চুল।নগ্ন শরীরে গয়না।স্থির চোখ।নীল চিৎকার করে ক্যামেরা ফেলে দিল। “ওটা কী ছিল!”রুদ্র ক্যামেরা তুলে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। এবার কিছু নেই। শুধু তাদের মুখ।সায়ন জোর করে হেসে বলল, “গ্লিচ। ক্যামেরা গ্লিচ।”তিথি ধীরে বলল, “গ্লিচ হলে একই জিনিস বারবার দেখা যায় না।”তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার সেই ঘুঙুরের শব্দ।এবার একসঙ্গে অনেকগুলো।ঝনঝন।ঝনঝন।ঝনঝন।মনে হচ্ছিল মন্দিরের চারপাশে কেউ হাঁটছে। গোল হয়ে। ধীরে ধীরে।তারপর শুরু হল মন্ত্রপাঠ।খুব নিচু স্বর। নারী কণ্ঠ। অনেকগুলো গলা একসঙ্গে। শব্দগুলো স্পষ্ট নয়, কিন্তু তাতে এমন এক ছন্দ ছিল যা শুনলে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।নীল দুহাতে কান চেপে ধরল। “বন্ধ কর! বন্ধ কর!”রুদ্র বলল, “শান্ত হ। আমরা বেরোনোর রাস্তা খুঁজি।”তারা চারদিকে টর্চ নিয়ে খুঁজতে শুরু করল। প্রতিটা কক্ষ একইরকম। ছোট পাথরের ঘর। ভিতরে যোগিনীর মূর্তি। কিন্তু প্রতিটা মূর্তির মুখের অভিব্যক্তি আলাদা।একটা মূর্তি হাসছে।একটা কাঁদছে।একটা জিভ বের করে আছে।একটার হাতে মানুষের খুলি।তিথি একটা কক্ষের সামনে এসে থেমে গেল। ভিতরের মূর্তিটার চোখে লাল রঙের পাথর বসানো। অদ্ভুতভাবে সেটার মুখটা তার নিজের মতো দেখতে।তার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল।সে পিছিয়ে আসতে যাচ্ছিল, তখনই খুব আস্তে একটা গলা শুনতে পেল।“তিথি…”সে জমে গেল।বাকিরা অনেক দূরে।গলাটা আবার এল।“তিথি…”একেবারে তার কানের পাশে।সে ঘুরে দাঁড়াল।কেউ নেই।কিন্তু মূর্তিটার ঠোঁট যেন একটু নড়ল।তিথি দৌড়ে বাকিদের কাছে চলে এল। মুখ ফ্যাকাশে।রুদ্র জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে?”সে কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, “ওরা আমাদের নাম জানে।”মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের মন্ত্রপাঠ থেমে গেল।নিস্তব্ধতা।তারপর কেন্দ্রের বেদিটার ওপর ধীরে ধীরে আগুন জ্বলে উঠল।নীলচে আগুন।কেউ আগুন ধরায়নি।তবু সেটা জ্বলছে।আগুনের আলোয় মন্দিরের দেয়ালে ছায়াগুলো নড়তে শুরু করল। যেন খোদাই করা যোগিনীরা দেয়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসছে।সায়ন মোবাইল তুলে ভিডিও করতে গেল। ঠিক তখন তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।LIVE VIEWERS: 0কিন্তু লাইভ তো অনেকক্ষণ আগেই বন্ধ হয়ে গেছিল।সে স্ক্রিনে চাপ দিল।ভিডিও এখনও চলছে।আর কমেন্ট আসছে।“ওদের পিছনে তাকাও।”“ওরা জেগে উঠেছে।”“একজন কম আছে।”সায়নের হাত কাঁপতে লাগল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।চারজন ছিল।এখন তিনজন দাঁড়িয়ে আছে।নীল নেই।তিথি প্রথম চিৎকার করল। “নীল কোথায়!”চারপাশে টর্চের আলো ঘুরতে লাগল। কোনো উত্তর নেই।তারপর অন্ধকারের একটা কক্ষ থেকে খুব আস্তে ক্যামেরার রেকর্ডিং লাইট জ্বলে উঠল।লাল বিন্দু।ঝিকঝিক করছে।রুদ্র দৌড়ে এগোল। বাকিরাও পিছনে।কক্ষটার সামনে পৌঁছেই তারা থেমে গেল।নীল দাঁড়িয়ে আছে।পিঠ তাদের দিকে।একদম স্থির।তার সামনে যোগিনীর মূর্তি।রুদ্র বলল, “নীল!”কোনো উত্তর নেই।সে গিয়ে নীলের কাঁধে হাত রাখল।ঠিক তখনই নীল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।তার চোখ পুরো কালো।একফোঁটা সাদা নেই।ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি।আর তার গলা দিয়ে বেরোল মেয়েলি স্বর।“ও আমাকে পছন্দ করেছে।”তিথির পা অবশ হয়ে গেল।সায়ন পিছিয়ে এল। “এটা মজা না নীল!”নীল মাথা কাত করল। যেন কথাটা বুঝতে পারছে না।তারপর সে খুব ধীরে নিজের গলার চামড়ায় নখ বসাল।চিরে ফেলতে শুরু করল।রুদ্র ঝাঁপিয়ে পড়তেই মন্দিরের সব মূর্তির চোখ একসঙ্গে জ্বলে উঠল।আর সেই মুহূর্তে পুরো মন্দির কেঁপে উঠল।মন্দিরটা যেন ভিতর থেকে শ্বাস নিচ্ছিল।পাথরের দেয়াল কাঁপছিল ধীরে ধীরে। ছাদ থেকে ধুলো ঝরে পড়ছিল। চারপাশের মূর্তিগুলোর চোখে জ্বলে থাকা লাল আলো অন্ধকারকে আরও গভীর করে তুলছিল। রুদ্র নীলকে জোরে ধরে পিছনে টেনে আনতেই সে হঠাৎ অমানুষিক শক্তিতে ধাক্কা মেরে তাকে ফেলে দিল।রুদ্র পাথরের মেঝেতে আছড়ে পড়ল।তিথি চিৎকার করে উঠল, “নীল! থাম!”কিন্তু নীল যেন আর তাদের চিনতেই পারছে না।তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। মানুষের মুখ এতটা হাসতে পারে না। ঠোঁটের কোণ প্রায় কানের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল।সায়ন কাঁপা গলায় বলল, “ওর মধ্যে কিছু ঢুকেছে…”ঠিক তখনই মন্দিরের মাঝখানের আগুনটা হঠাৎ আরও উঁচু হয়ে জ্বলে উঠল।নীলচে শিখার মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা অবয়ব দেখা গেল।নারী।লম্বা চুল।মাথায় খুলি দিয়ে তৈরি মুকুট।তারপর মিলিয়ে গেল।তিথি কাঁপতে শুরু করল। “আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে… এখনই…”রুদ্র উঠে দাঁড়িয়ে নীলকে ধরে ঝাঁকাতে লাগল। “শুনতে পাচ্ছিস? নীল!”নীল ধীরে মাথা তুলল।তার চোখের কালো অংশে যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লাল বিন্দু নড়ছে।তারপর সে বলল, “ওরা অনেকদিন অপেক্ষা করেছে।”সেই একই মেয়েলি গলা।ঠান্ডা।ফাঁপা।“এবার কেউ যাবে না।”হঠাৎ তার শরীরটা কেঁপে উঠল। যেন ভিতরে কিছু নড়ছে। তারপর সে মুখ হাঁ করল।আর তার গলা থেকে বেরোতে শুরু করল কালো ধোঁয়া।ধোঁয়াটা মাটির ওপর দিয়ে সাপের মতো এগিয়ে গিয়ে মন্দিরের বেদির চারপাশে ঘুরতে লাগল। সেই ধোঁয়ার ভিতরে মুখ দেখা যাচ্ছিল। অসংখ্য নারীমুখ। তারা ফিসফিস করছিল।তিথি দুহাতে কান চেপে বসে পড়ল।ফিসফিস শব্দগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছিল।“থেকে যা…”“একা যাস না…”“আমাদের সঙ্গী হ…”সায়ন মোবাইল বের করে সিগন্যাল খুঁজতে লাগল। কিছুই নেই। শুধু স্ক্রিনের ওপর বারবার একটা নোটিফিকেশন উঠছে।UNKNOWN USER REQUESTING TO JOIN LIVEসে ভয়ে স্ক্রিনে চাপ দিল।সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও খুলে গেল।কিন্তু সেখানে লাইভ ভিডিও নয়।দেখা যাচ্ছে এই মন্দিরই।অনেক পুরনো ফুটেজ।কালো-সাদা।কয়েকজন মানুষ মাটিতে বসে আছে। তাদের চারপাশে আগুন। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক নারী মন্ত্র পড়ছে।তার চোখে একই লাল আলো।হঠাৎ ভিডিওর মানুষগুলো একসঙ্গে ক্যামেরার দিকে তাকাল।তারপর স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে গেল।শেষে শুধু একটা বাক্য ফুটে উঠল।“চৌষট্টি পূর্ণ হয়নি।”সায়নের গলা শুকিয়ে গেল। “এর মানে কী?”রুদ্র কিছু বলল না। কারণ সে তখন দেয়ালের খোদাইগুলো দেখছিল।আগে সেগুলো স্থির ছিল।এখন মনে হচ্ছে নড়ছে।প্রতিটা যোগিনী যেন ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছে।একটার মুখ এখন সোজা তাদের দিকে।আরেকটার হাত একটু ওপরে উঠেছে।তিথি ফিসফিস করে বলল, “ওরা জীবন্ত…”ঠিক তখন মন্দিরের গভীর থেকে একটা বিকট শব্দ এল।ধুপ।ধুপ।ধুপ।মনে হচ্ছিল কেউ বিশাল কিছু টেনে আনছে মাটির ওপর দিয়ে।শব্দটা ক্রমশ কাছে আসছিল।নীল হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। মাথা নিচু।তারপর সে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে বলল, “মা আসছেন…”চারপাশের সব মূর্তির ঘুঙুর একসঙ্গে বেজে উঠল।ঝনঝনঝনঝন।মন্দিরের অন্ধকারের মধ্যে তখন কিছু একটা নড়ল।প্রথমে শুধু চুল দেখা গেল।তারপর দুটো হাত।মাটির ওপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।এক নারী।কিন্তু মানুষের মতো না।তার শরীর অস্বাভাবিক লম্বা। হাতের আঙুল মাকড়সার পায়ের মতো সরু। পুরো শরীরে ছাই মাখানো। চোখ দুটো জ্বলছে।আর তার কোমরে বাঁধা অসংখ্য ঘুঙুর।সে হামাগুড়ি দিয়ে বেদির কাছে এসে থামল।তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলল।তিথির বুকের রক্ত জমে গেল।কারণ সেই মুখটা তার নিজের মুখের মতো।একদম হুবহু।নারীটা হাসল।তার ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোল।“তুই এসেছিস অবশেষে…”তিথি পিছিয়ে যেতে লাগল। “না… না…”নারীটা বলল, “তুই তো আমাদেরই একজন।”রুদ্র তিথির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল, “তুই কে?”নারীটা ধীরে তার দিকে তাকাল।তার চোখের ভেতর যেন শত শত মুখ নড়ছে।“আমরা যোগিনী। আমরা অসম্পূর্ণ। আমাদের প্রত্যেকের একজন সঙ্গী দরকার। শরীর দরকার। আত্মা দরকার।”সায়ন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমরা চলে যাব… প্লিজ…”নারীটা হেসে উঠল।সেই হাসির সঙ্গে মন্দিরের সব মূর্তি একসঙ্গে হাসতে শুরু করল।একই শব্দ।একই ছন্দ।অমানুষিক।“এখানে যারা আসে… তারা আর একা ফিরে যায় না…”

মন্দিরের ভিতরের হাসির শব্দ থামতে চাইছিল না। যেন পাথরের দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকা শত শত গলা একসঙ্গে হেসে চলেছে। তিথির মাথা ঝিমঝিম করছিল। তার মনে হচ্ছিল মন্দিরের মেঝে ধীরে ধীরে নরম হয়ে যাচ্ছে, যেন পাথরের নিচে কিছু স্পন্দিত হচ্ছে।রুদ্র তার হাত শক্ত করে ধরল। “চোখ নিচু করে থাক। ওর দিকে তাকাবি না।”কিন্তু তিথি চোখ সরাতে পারছিল না।বেদির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নারীমূর্তিটা যেন তাকে টানছিল। তার নিজের মুখ। নিজের চোখ। শুধু অনেক পুরনো। অনেক ক্ষুধার্ত।নারীটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।তার হাড় ভাঙার শব্দ শোনা গেল।কট।কট।কট।মনে হচ্ছিল বহুদিন পর সে নিজের শরীর সোজা করছে।নীল তখনও হাঁটু গেড়ে বসে। মাথা নিচু। ঠোঁট নড়ছে। সে খুব আস্তে কিছু মন্ত্র পড়ছে।সায়ন হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “চুপ কর!”সে এগিয়ে গিয়ে নীলকে টানতে গেল।ঠিক সেই মুহূর্তে নীল মাথা তুলল।তার মুখের চামড়া নড়ছিল।ভিতর থেকে যেন কেউ ঠেলে বেরোতে চাইছে।তারপর তার মুখের মাঝখানটা ধীরে ধীরে ফেটে গেল।তিথি আতঙ্কে চিৎকার করল।চামড়ার ফাঁক দিয়ে আরেকটা মুখ বেরিয়ে আসছিল।এক নারীর মুখ।কালো জিভ।রক্তমাখা দাঁত।সায়ন পিছিয়ে এসে পড়ে গেল।রুদ্র একটা ভাঙা পাথর তুলে নীলের দিকে ছুঁড়ে মারল। পাথরটা মাথায় লাগতেই নীল মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু তার শরীর থামল না। সে মাটিতে শুয়েও কাঁপছিল, যেন ভিতরে কেউ নড়াচড়া করছে।মন্দিরের সব ঘুঙুর একসঙ্গে আবার বেজে উঠল।তারপর চারপাশের কক্ষগুলো থেকে খুব ধীরে নারীরা বেরিয়ে আসতে শুরু করল।প্রথমে রুদ্র ভাবল ওগুলো ছায়া।কিন্তু না।ওগুলো মূর্তি ছিল।এখন হাঁটছে।চৌষট্টি যোগিনী।কারও শরীরে পাথরের ফাটল। কারও চোখ নেই। কারও পেট চেরা। কারও গলায় খুলি ঝুলছে। তারা ধীরে ধীরে বেদির চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়াতে লাগল।তাদের পায়ের নড়াচড়ায় ঘুঙুর বাজছিল।ঝনঝন।ঝনঝন।একই ছন্দ।একই গতি।তিথির মনে হচ্ছিল সে এই শব্দ আগে শুনেছে।খুব ছোটবেলায়।স্বপ্নে।হঠাৎ তার মাথার ভিতরে ছবি ভেসে উঠতে শুরু করল।আগুন।রক্ত।অসংখ্য নারী বৃত্ত করে দাঁড়িয়ে আছে।মাঝখানে একটা ছোট মেয়ে।তার কপালে লাল চিহ্ন আঁকা।আর কেউ একজন বলছে—“শেষ যোগিনী ফিরে এলে দ্বার খুলবে।”তিথি মাথা চেপে বসে পড়ল।রুদ্র তাকে ধরল। “কি হয়েছে?”তিথি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আমি… আমি এসব আগে দেখেছি…”সায়ন আতঙ্কিত গলায় বলল, “তুই কী বলছিস!”কিন্তু উত্তর দেওয়ার আগেই মন্দিরের ভেতরের অন্ধকার হঠাৎ আরও ঘন হয়ে গেল।আগুন নিভে গেল।চারপাশ সম্পূর্ণ কালো।শুধু যোগিনীদের চোখ জ্বলছে।চৌষট্টি জোড়া লাল চোখ।তারপর একসঙ্গে তারা মন্ত্র পড়া শুরু করল।এবার শব্দগুলো স্পষ্ট।“কালী কালী মহাকালী…”“রক্তে জাগো…”“শরীরে ফিরো…”মন্দিরের মেঝেতে লাল রেখা ফুটে উঠতে লাগল। যেন পাথরের নিচে রক্ত বইছে। সেই রেখাগুলো ধীরে ধীরে মিলিত হয়ে একটা বিশাল তন্ত্রমণ্ডল তৈরি করল।ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিথি।নারীটা ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।“তুই জানিস না তুই কে।”তিথি কাঁপছিল। “আমি মানুষ…”নারীটা হাসল।“মানুষ ছিলি।”তারপর সে হাত বাড়াল।তার আঙুল তিথির কপালে ছোঁয়ামাত্র তিথির শরীরের মধ্যে আগুনের মতো কিছু ছড়িয়ে পড়ল।আর মুহূর্তের মধ্যে সে দেখতে পেল—এক অন্য সময়।শত শত বছর আগে।এই একই মন্দির।অমাবস্যার রাত।মশালের আলো।চৌষট্টি নারী নাচছে।মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক কিশোরী।তার মুখ তিথির মতো।কিশোরীর গলায় খুলি-মালা পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।এক বৃদ্ধ তান্ত্রিক বলছে—“আজ শেষ সাধনা পূর্ণ হবে।”তারপর হঠাৎ আগুন।চিৎকার।রক্ত।মন্দির ভেঙে পড়ছে।আর সেই কিশোরী আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে অভিশাপ দিচ্ছে—“আমরা ফিরব।”তিথি হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল।তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে।রুদ্র তাকে ধরে ফেলল।“তিথি!”কিন্তু তিথি তখন অন্যদিকে তাকিয়ে।কারণ মন্দিরের প্রবেশপথে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।এক বৃদ্ধ।সাদা দাড়ি।শুকনো শরীর।হাতে লণ্ঠন।সেই একই লোক… যে তাদের জঙ্গলের পথ দেখিয়েছিল।সে ধীরে বলল—“ওদের জাগিয়ে ফেলেছ তোমরা…”

বৃদ্ধ লোকটার মুখে লণ্ঠনের আলো কাঁপছিল। অন্ধকারের মধ্যে তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির। যেন সে এই দৃশ্য বহুবার দেখেছে। মন্দিরের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা যোগিনীরা তাকে দেখে মন্ত্রপাঠ থামিয়ে দিল।এক মুহূর্তে পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ।শুধু নীলের গলা থেকে ভেজা শব্দ বেরোচ্ছে। সে এখনও মাটিতে পড়ে কাঁপছে।রুদ্র চিৎকার করে উঠল, “আপনি কে? আমাদের বের করুন এখান থেকে!”বৃদ্ধ ধীরে ভিতরে ঢুকল। তার পায়ে বাঁধা ছিল ছোট ছোট ঘণ্টা। কিন্তু আশ্চর্যভাবে হাঁটার সময় কোনো শব্দ হচ্ছিল না।সে বেদির দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “অনেক বছর পরে আবার শুরু হল…”তিথি ফিসফিস করে বলল, “আপনি জানতেন এখানে কী আছে?”বৃদ্ধ তার দিকে তাকাল।তার চোখে ভয় ছিল।আর করুণা।“আমি তোমাদের বারণ করেছিলাম।”সায়ন প্রায় কেঁদে ফেলল। “এগুলো কী জিনিস!”বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ওরা মানুষ ছিল না কোনোদিন। ওরা ছিল শক্তি। নারীর অন্ধকার রূপ। বহু শতাব্দী আগে তান্ত্রিকরা এই জঙ্গলে ওদের বেঁধে রাখে। চৌষট্টি যোগিনী। প্রত্যেকের জন্য একজন জীবন্ত সঙ্গী দরকার ছিল। শরীর ছাড়া ওরা সম্পূর্ণ হতে পারে না।”রুদ্র বলল, “এসব বাজে কথা! আমরা হ্যালুসিনেট করছি!”বৃদ্ধ হঠাৎ রুদ্রর দিকে তাকাল। “তোমার বন্ধুর চোখ দেখেছ?”রুদ্র চুপ করে গেল।কারণ নীল তখন ধীরে ধীরে উঠে বসছে।তার শরীরের হাড়গুলো অদ্ভুতভাবে বেঁকে যাচ্ছে। হাতের আঙুল লম্বা হয়ে গেছে। নখ কালো।আর তার মুখের ভেতর থেকে সেই নারীমুখটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।তিথি চোখ ফিরিয়ে নিল।বৃদ্ধ বলল, “একবার ওরা কাউকে পছন্দ করলে আর ছাড়ে না।”সায়ন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তাহলে আমরা মরব?”বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়ল।“মৃত্যু সবসময় সবচেয়ে খারাপ জিনিস না।”ঠিক তখন মন্দিরের দেয়ালে থাকা সব মশাল একসঙ্গে জ্বলে উঠল।আগুনের আলোয় পুরো মন্দির পরিষ্কার দেখা গেল।আর তখনই তারা জিনিসটা দেখতে পেল।দেয়ালের ওপরে খোদাই করা আছে অসংখ্য মানুষের মুখ।পুরুষ।নারী।শিশু।সবাইয়ের চোখ খোলা।মনে হচ্ছিল তারা জীবন্ত অবস্থায় পাথরের মধ্যে আটকে গেছে।তিথি ফিসফিস করে বলল, “ওরা কারা…”বৃদ্ধ উত্তর দিল, “যারা বেরোতে পারেনি।”সায়ন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে দৌড়ে অন্ধকার করিডরের দিকে ছুটল।“আমি এখান থেকে বেরোব!”বৃদ্ধ চিৎকার করল, “ওদিকে যেও না!”কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে।সায়নের টর্চের আলো অন্ধকারের মধ্যে ছোট হয়ে মিলিয়ে গেল।তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।হঠাৎ দূর থেকে তার চিৎকার শোনা গেল।একবার।তারপর আবার।আর তারপর শব্দটা বদলে গেল।চিৎকার না।হাসি।অস্বাভাবিক নারীকণ্ঠের হাসি।রুদ্র দৌড়াতে যাচ্ছিল, বৃদ্ধ তার হাত চেপে ধরল।“গেলেই তুইও ফিরবি না।”“ও আমার বন্ধু!”“ও এখন আর একা নেই।”ঠিক তখন অন্ধকার করিডর থেকে সায়ন বেরিয়ে এল।ধীরে ধীরে হাঁটছে।মাথা নিচু।তার গায়ের জামা ছিঁড়ে গেছে।রুদ্র ছুটে গেল। “সায়ন!”সায়ন মুখ তুলল।তার দুটো চোখ উপড়ে নেওয়া।খালি রক্তাক্ত গর্ত।তবু সে হাসছে।আর তার কাঁধের ওপর বসে আছে একটা ছোট মেয়ের মতো মূর্তি।পাথরের।কিন্তু তার চোখ নড়ছে।মেয়েটা ফিসফিস করে বলল, “এবার ও আমার…”রুদ্র পিছিয়ে এল।তিথি বমি করে ফেলল মেঝেতে।বৃদ্ধ মন্ত্র পড়তে শুরু করল। তার গলা কাঁপছিল। লণ্ঠনের আগুন হঠাৎ নীল হয়ে উঠল।যোগিনীরা একসঙ্গে হিসহিস শব্দ করতে লাগল।মনে হচ্ছিল তারা রেগে গেছে।বৃদ্ধ চিৎকার করে বলল, “তোমাদের একজন এখনও পূর্ণ হয়নি! তাই তো?”মন্দির কেঁপে উঠল।বেদির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তিথির-মতো নারী ধীরে মাথা তুলল।তার ঠোঁটে রক্ত।“শেষ যোগিনী এখনও নিজের শরীর খুঁজছে।”তারপর সে তিথির দিকে আঙুল তুলল।“ও-ই আমাদের দ্বার খুলবে।”তিথি পিছিয়ে যেতে লাগল। “না…”হঠাৎ তার শরীর জমে গেল।কারণ সে অনুভব করল—তার পায়ের নিচে কিছু নড়ছে।মেঝের পাথর ফেটে একটা হাত বেরিয়ে এল।মানুষের হাত।পচা।রক্তমাখা।তারপর আরেকটা।আরেকটা।মন্দিরের মেঝের নিচ থেকে অসংখ্য হাত বেরোতে শুরু করল। তারা তিথির পা চেপে ধরল।তিথি চিৎকার করল।রুদ্র তাকে টানতে গেল।ঠিক তখন মন্দিরের ছাদ থেকে খুব ধীরে একটা বিশাল ঘণ্টা নড়ল।ঢং—একবার শব্দ হতেই সব যোগিনী একসঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।মন্দিরের সবচেয়ে অন্ধকার কোণটার দিকে।সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।এতক্ষণ ছিল না।লম্বা।কালো।মাথা নিচু।আর তার শরীরের চারপাশে যেন অন্ধকার নিজেই নড়ছে।বৃদ্ধের মুখ সাদা হয়ে গেল।সে ফিসফিস করে বলল—“ভৈরব জেগে উঠেছে…”

মন্দিরের ভিতরের তাপমাত্রা আচমকা নেমে গেল। তিথির নিঃশ্বাস থেকে সাদা ধোঁয়া বেরোতে লাগল। মেঝের নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা পচা হাতগুলো আরও শক্ত করে তার পা চেপে ধরল। সে ছটফট করছিল, কিন্তু হাতগুলো মানুষের না। ঠান্ডা। পাথরের মতো শক্ত।

আর অন্ধকারের সেই কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

রুদ্রর বুকের ভেতর যেন কিছু থেমে গেল।

মুখটা পুরো দেখা যাচ্ছিল না। কারণ তার চারপাশে অন্ধকার ঘুরছিল ধোঁয়ার মতো। শুধু দুটো চোখ দেখা যাচ্ছিল।

সাদা।

পুরো সাদা।

কোনো মণি নেই।

ভৈরব।

বৃদ্ধ লোকটা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ঠোঁট কাঁপছে। সে দ্রুত মন্ত্র পড়তে লাগল।

“ওঁ ক্ষৌং ভৈরবায় নমঃ…”

যোগিনীরা একসঙ্গে পিছিয়ে গেল। তাদের মুখে এবার ভয়।

তিথির-মতো সেই নারীও কয়েক পা সরে দাঁড়াল।

কিন্তু ভৈরব স্থির।

তারপর খুব ধীরে সে হাঁটতে শুরু করল।

ধুপ।

ধুপ।

প্রতিটা পায়ের শব্দে মন্দির কেঁপে উঠছিল।

নীল হঠাৎ বিকট চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল। তার শরীর বাঁকতে লাগল। যেন ভিতরের কিছু বেরিয়ে আসতে চাইছে।

সায়ন, যে এতক্ষণ চোখহীন মুখে হাসছিল, হঠাৎ মাথা চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করল।

“ও আসছে… ও আসছে…”

রুদ্র বুঝতে পারছিল না কী করবে। তার মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো। শুধু একটা জিনিস স্পষ্ট—এই জায়গা বাস্তবের বাইরে।

ভৈরব বেদির সামনে এসে থামল।

তার শরীরটা এবার স্পষ্ট দেখা গেল।

পুরো শরীর ছাই মাখা। গলায় মানুষের খুলি। বুকের মাঝখানে গভীর কাটা দাগ। আর তার দুহাতে শুকনো রক্ত।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তার মুখ।

কারণ সেটা মানুষের মুখ না।

মনে হচ্ছিল বহু মানুষের মুখ জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা।

কারও চোখ, কারও ঠোঁট, কারও দাঁত।

সবসময় বদলে যাচ্ছে।

ভৈরব ধীরে তিথির দিকে তাকাল।

তারপর প্রথমবার কথা বলল।

গলা যেন একসঙ্গে বহুজনের।

“শেষ দ্বার…”

তিথির শরীর কাঁপতে লাগল।

তার মাথার ভেতরে আবার সেই ছবিগুলো ফিরে আসছিল।

আগুন।

নাচ।

রক্ত।

আর সেই কিশোরী।

এবার সে কিশোরীর মুখ স্পষ্ট দেখতে পেল।

ওটা সত্যিই তার মুখ।

একই চোখ।

একই কপাল।

হঠাৎ তার মাথার ভিতরে একটা স্মৃতি খুলে গেল।

শত শত বছর আগে।

এই মন্দিরে সে দাঁড়িয়ে।

কিন্তু তখন তার নাম তিথি না।

তার নাম—ঈশানী।

শেষ যোগিনী।

তাকে বলি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু সাধনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তিথি হাঁপাতে শুরু করল।

“না… না… এটা আমার স্মৃতি না…”

তিথির-মতো সেই নারী হেসে উঠল।

“সব মনে পড়ছে?”

বৃদ্ধ হঠাৎ চিৎকার করল, “ওর কথা শুনবে না!”

সে কোমর থেকে একটা ছোট তামার পাত্র বের করল। ভিতরে লাল গুঁড়ো। সে সেটা আগুনে ছুঁড়ে মারতেই নীল শিখা মুহূর্তের মধ্যে বড় হয়ে উঠল।

যোগিনীরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।

মন্দির কেঁপে উঠল।

বৃদ্ধ তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, “শোনো! তুমি যদি নিজেকে ওদের হাতে তুলে দাও, ওরা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে! এই মন্দির আবার জেগে উঠবে!”

রুদ্র বলল, “তাহলে কী করতে হবে?”

বৃদ্ধের চোখে আতঙ্ক।

“ভৈরবকে থামাতে হবে।”

সায়ন কাঁদতে কাঁদতে হাসছিল। “ভৈরবকে কেউ থামাতে পারে না…”

ঠিক তখন ভৈরব ধীরে নিজের মাথা কাত করল।

আর মুহূর্তের মধ্যে সে রুদ্রর সামনে।

কেউ তাকে হাঁটতে দেখেনি।

এক সেকেন্ড আগেও সে দূরে ছিল।

এখন একেবারে সামনে।

রুদ্র ভয়েও নড়তে পারল না।

ভৈরব তার মুখের খুব কাছে ঝুঁকল।

তার নিঃশ্বাসে পচা গন্ধ।

তারপর সে ফিসফিস করে বলল—

“তুইও থাকতে চাস…”

রুদ্রর মাথার ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত শান্তি নেমে এল।

সে দেখতে পেল—

এক অন্য জীবন।

এই মন্দিরে সে আছে।

চারপাশে আগুন।

যোগিনীরা তার চারপাশে নাচছে।

তার কোনো ভয় নেই।

শুধু আনন্দ।

শুধু মুক্তি।

সে ধীরে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখন তিথি চিৎকার করল—

“রুদ্র!”

রুদ্র হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল।

আর সঙ্গে সঙ্গে ভৈরবের মুখ বদলে গেল।

শান্তি উধাও।

এবার সেখানে শুধু ক্রোধ।

সে বিকট গর্জন করল।

মন্দিরের সব মশাল একসঙ্গে নিভে গেল।

সম্পূর্ণ অন্ধকার।

তারপর একে একে চারপাশে চোখ জ্বলতে শুরু করল।

চৌষট্টি যোগিনী।

ভৈরব।

আর মন্দিরের দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকা শত শত মুখ।

সবাই একসঙ্গে ফিসফিস করছিল—

“রক্ত দাও…”

“দ্বার খোলো…”

“শেষ করো…”

অন্ধকারের ভিতরে শব্দগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। যেন পুরো মন্দিরটাই একসঙ্গে কথা বলছে। রুদ্র অনুভব করছিল তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে গেছে। সে হাতড়ে তিথির হাত খুঁজে পেল। ঠান্ডা। কাঁপছে।

চারপাশে শুধু চোখ।

অসংখ্য চোখ।

আর সেই চোখগুলোর মাঝখানে ভৈরব দাঁড়িয়ে।

তার শরীরের চারপাশে অন্ধকার নড়ছে, যেন জীবন্ত ধোঁয়া।

বৃদ্ধ লোকটা হঠাৎ লণ্ঠনটা মাটিতে আছড়ে ফেলল।

কাঁচ ভাঙার শব্দ।

নীল আগুন ছড়িয়ে পড়ল মেঝের তন্ত্রমণ্ডলের ওপর।

এক মুহূর্তে পুরো মন্দির আবার আলোয় ভরে উঠল।

আর সেই আলোয় তারা যা দেখল, তাতে তিথির গলা শুকিয়ে গেল।

মন্দিরের দেয়ালগুলো আর পাথরের নেই।

সেগুলো ধুকপুক করছে।

মাংসের মতো।

যেন বিশাল কোনো জীবের পেটের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে তারা।

দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকা মুখগুলো এবার নড়ছে। কেউ কাঁদছে। কেউ চিৎকার করছে। কেউ ফিসফিস করে সাহায্য চাইছে।

রুদ্র পিছিয়ে এল। “এটা… এটা কী জিনিস!”

বৃদ্ধ বলল, “মন্দিরটা বেঁচে আছে।”

তার কণ্ঠ কাঁপছিল।

“শত বছর ধরে যারা এখানে আটকা পড়েছে… তাদের শরীর, আত্মা, রক্ত—সব মিলিয়ে এটা তৈরি হয়েছে।”

তিথি হাঁপাতে লাগল।

কারণ দেয়ালের ভেতর সে একটা মুখ চিনতে পেরেছে।

ওটা নীলের।

দেয়ালের মধ্যে আধা ডুবে আছে।

চোখ খোলা।

মুখ নড়ছে।

“বাঁচাও…”

তিথি চিৎকার করে উঠল, “নীল!”

সে এগোতে যাচ্ছিল, হঠাৎ দেয়াল থেকে কয়েকটা হাত বেরিয়ে তার দিকে ছুটে এল।

রুদ্র তাকে টেনে সরিয়ে নিল।

হাতগুলো বাতাসে ছটফট করতে লাগল, তারপর আবার দেয়ালের ভিতরে ঢুকে গেল।

এদিকে সায়ন ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছিল।

তার চোখহীন মুখে আবার সেই হাসি ফিরে এসেছে।

তার কাঁধের ওপর বসে থাকা পাথরের মেয়েটা এবার বড় হচ্ছে।

ধীরে ধীরে।

তার পাথরের শরীরে ফাটল ধরছে।

ভিতর থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।

মেয়েটা সায়নের কানে ফিসফিস করে বলল, “আমাকে শরীর দে…”

সায়ন কাঁদতে কাঁদতে নিজের মাথায় আঘাত করতে লাগল।

“চুপ কর! চুপ কর!”

হঠাৎ সে নিজের গলার মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে দিল।

রুদ্র চিৎকার করল, “সায়ন থাম!”

কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।

সায়নের মুখ থেকে কালো, পিচ্ছিল কিছু বেরিয়ে এল।

দীর্ঘ।

সরু।

সাপের মতো।

ওটা মাটিতে পড়েই কিলবিল করতে করতে পাথরের মেয়েটার শরীরের মধ্যে ঢুকে গেল।

আর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার চোখ খুলে গেল।

জীবন্ত চোখ।

সে ধীরে সায়নের কাঁধ থেকে নেমে দাঁড়াল।

এবার সে আর পাথর না।

রক্তমাংসের।

আট-নয় বছরের একটা মেয়ে।

কিন্তু তার মুখে কোনো চামড়া নেই।

শুধু লাল মাংস।

সে হাসল।

সায়ন তখন মাটিতে পড়ে খিঁচুনি খাচ্ছে।

বৃদ্ধ আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “ওরা জন্ম নিচ্ছে…”

ভৈরব ধীরে হাত তুলল।

সঙ্গে সঙ্গে সব যোগিনী হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তিথির-মতো সেই নারী সামনে এগিয়ে এল।

“সময় হয়ে গেছে।”

তারপর সে তিথির দিকে তাকাল।

“তুই ফিরে আয়।”

তিথির মাথার ভিতর যেন কেউ কথা বলতে শুরু করল।

একটা না।

অনেকগুলো গলা।

“তুই একা ছিলি…”

“আমরা তোকে চাই…”

“আমরা তোর পরিবার…”

তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল।

সে দেখতে পেল—তার চারপাশে আগুন জ্বলছে। যোগিনীরা নাচছে। আর সে তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।

তার ভালো লাগছিল।

অদ্ভুত শান্তি।

রুদ্র বুঝতে পারল তিথি বদলে যাচ্ছে।

তার চোখের মণি ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে।

সে তিথির দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, “আমার দিকে তাকাও!”

তিথি ধীরে তার দিকে তাকাল।

কিন্তু সেই চোখ… তিথির চোখ না।

সেখানে অন্য কেউ আছে।

ভৈরব হাসল।

প্রথমবার।

তার মুখের সব আলাদা আলাদা ঠোঁট একসঙ্গে নড়ল।

“দ্বার খুলছে…”

মন্দিরের মেঝে কেঁপে উঠল।

তন্ত্রমণ্ডলের মাঝখানে ফাটল ধরতে শুরু করল।

গভীর।

অন্ধকার।

সেই ফাটলের ভিতর থেকে গরম বাতাস বেরোতে লাগল।

আর সঙ্গে আসছিল গন্ধ।

পোড়া মাংসের গন্ধ।

হাজার মৃতদেহের গন্ধ।

তিথির-মতো নারী হাঁটু গেড়ে সেই ফাটলের সামনে মাথা নত করল।

সব যোগিনী একই সঙ্গে মন্ত্র পড়তে শুরু করল।

“ওঁ হ্রীং কালী…”

“ওঁ ক্ষৌং ভৈরব…”

“দ্বার উদ্ঘাটিত হোক…”

ফাটলটা আরও বড় হল।

তার ভিতর থেকে হাত বেরোতে শুরু করল।

শত শত হাত।

কালো।

পোড়া।

নখওয়ালা।

তারা মাটির কিনারা আঁকড়ে উপরে উঠতে চাইছে।

রুদ্রর বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।

বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলল—

“ওরা নিচের জগতের…”

ফাটলের ভিতর থেকে ওঠা হাতগুলো পাথরের মেঝে আঁচড়ে এগোতে লাগল। তাদের নখে কালো রক্ত। গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে নিচ থেকে। মনে হচ্ছিল মাটির তলায় কোনো বিশাল জীব শ্বাস নিচ্ছে।

রুদ্র তিথিকে টেনে পিছনে সরাতে গেল।

কিন্তু তিথি স্থির দাঁড়িয়ে।

তার চোখ এখন পুরো লাল।

ঠোঁট ধীরে নড়ছে।

সে একই মন্ত্র পড়ছে যা যোগিনীরা পড়ছে।

“ওঁ হ্রীং কালী…”

রুদ্র চিৎকার করল, “তিথি!”

কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

ভৈরব তখন বেদির সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত আকাশের দিকে তুলেছে। তার শরীরের চারপাশে অন্ধকার ঘুরছে ঘূর্ণির মতো। মন্দিরের ছাদ থেকে ধুলো, হাড়, শুকনো ফুল ঝরে পড়তে লাগল।

বৃদ্ধ লোকটা কাঁপতে কাঁপতে নিজের গলার মালা খুলল। রুদ্র প্রথমবার লক্ষ্য করল—মালাটা রুদ্রাক্ষ না।

ছোট ছোট হাড় দিয়ে তৈরি।

বৃদ্ধ সেটা হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করল।

“একটাই পথ আছে…”

রুদ্র হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “কী পথ?”

বৃদ্ধ চোখ খুলল।

সেখানে ভয় না।

শুধু ক্লান্তি।

“শেষ যোগিনীকে আবার বন্দি করতে হবে।”

তারপর সে তিথির দিকে তাকাল।

রুদ্র বুঝে গেল কথার মানে।

“না।”

বৃদ্ধ নিচু গলায় বলল, “ও জন্মেছিল এই কাজের জন্য।”

“চুপ করুন!”

রুদ্রর গলা ফেটে গেল।

“ও মানুষ!”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “এই মন্দির মানুষকে মানুষ থাকতে দেয় না।”

ঠিক তখন ফাটলের ভিতর থেকে একটা মুখ উঠল।

অর্ধেক পোড়া।

চোখ নেই।

তবু সে হাসছে।

তারপর আরেকটা।

আরেকটা।

দশ।

কুড়ি।

শত।

ওরা নিচ থেকে উঠছে।

যোগিনীরা একসঙ্গে নাচতে শুরু করল। তাদের ঘুঙুরের শব্দে মন্দির কেঁপে উঠছিল। সেই ছন্দের সঙ্গে তিথির শরীরও ধীরে নড়ছিল।

রুদ্র তার হাত শক্ত করে ধরল।

“তিথি… প্লিজ…”

তিথি ধীরে তার দিকে তাকাল।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের লাল রঙ ফিকে হল।

সে খুব আস্তে বলল—

“আমাকে যেতে দিস না…”

তারপর আবার মুখ বদলে গেল।

ভৈরব গর্জে উঠল।

মন্দিরের দেয়াল থেকে রক্ত গড়াতে শুরু করল।

সায়ন তখনও বেঁচে।

মাটিতে পড়ে হাঁপাচ্ছে।

তার গলা ফেটে গেছে। চোখ নেই। তবু সে হাত বাড়িয়ে রুদ্রর দিকে তাকাতে চাইছিল।

“বেরো… পালা…”

কথা শেষ হওয়ার আগেই তার পিঠের হাড় হঠাৎ বাইরে বেরিয়ে এল।

কটাস!

সায়ন চিৎকার করল।

তার শরীর বাঁকতে শুরু করল অস্বাভাবিকভাবে।

হাড় ভাঙার শব্দ।

মাংস ছিঁড়ছে।

আর ধীরে ধীরে তার শরীরের ভিতর থেকে আরেকটা অবয়ব বেরোতে লাগল।

এক নারী।

রক্তে ভেজা।

হাসছে।

সায়নের বুক ফুঁড়ে সে পুরো বেরিয়ে এল।

তারপর মৃতদেহটা ফেলে দিয়ে যোগিনীদের দলে গিয়ে দাঁড়াল।

রুদ্র বমি করে ফেলল।

বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলল, “প্রতিটা যোগিনী একজন শরীর নেয়…”

নীল।

সায়ন।

এবার…

তিথি।

ভৈরব ধীরে হাত বাড়াল তিথির দিকে।

“ফিরে আয়।”

তিথি যেন সম্মোহিতের মতো এগোতে লাগল।

রুদ্র তাকে জড়িয়ে ধরল।

“না!”

মুহূর্তের মধ্যে ভৈরব তার সামনে এসে দাঁড়াল।

এত কাছে যে রুদ্র তার মুখের ভেতরের নড়তে থাকা মুখগুলো দেখতে পাচ্ছিল।

ভৈরব নিচু হয়ে ফিসফিস করল—

“তুই ওকে বাঁচাতে পারবি না।”

তারপর সে রুদ্রর কপালে আঙুল ছোঁয়াল।

আর সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রর মাথার ভিতর বিস্ফোরণ হল।

সে দেখতে পেল—

এই মন্দিরে বহু মানুষ এসেছে।

ব্রিটিশ অফিসার।

তান্ত্রিক।

চোর।

অভিযাত্রী।

ইউটিউবার।

সবাই শেষে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে যোগিনীদের মাঝে।

হাসছে।

কারও চোখ নেই।

কারও শরীর অর্ধেক পাথর।

কেউ দেয়ালের মধ্যে আটকে।

তারপর সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখল।

সে দেয়ালের ভিতরে বন্দি।

চোখ খোলা।

শত বছর ধরে চিৎকার করছে।

রুদ্র বিকট চিৎকার করে পিছিয়ে এল।

তার নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।

বৃদ্ধ তখন মাটিতে তন্ত্রচিহ্ন আঁকছে নিজের রক্ত দিয়ে।

সে চিৎকার করল—

“রুদ্র! ওকে নিয়ে বৃত্তের ভিতরে আয়!”

রুদ্র তিথিকে টেনে নিয়ে এল।

বৃদ্ধ দ্রুত মন্ত্র পড়তে লাগল।

নীল আগুন বৃত্তের চারপাশে জ্বলে উঠল।

যোগিনীরা একসঙ্গে হিসহিস করে উঠল।

ভৈরব প্রথমবার থামল।

তার চোখ দুটো সরু হয়ে এল।

বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বলল—

“যতক্ষণ বৃত্ত জ্বলবে, ওরা ঢুকতে পারবে না…”

ঠিক তখন মন্দিরের গভীর থেকে একটা শব্দ এল।

ধুপ।

ধুপ।

ধুপ।

কেউ আসছে।

কিন্তু এবার পদশব্দটা ভৈরবের না।

অনেক বড়।

অনেক ভারী।

ফাটলের ভিতর থেকে ধীরে ধীরে কিছু একটা উঠছিল।

শুধু তার মাথাটাই মন্দিরের ছাদ ছুঁয়ে ফেলল।

অসংখ্য হাত।

অসংখ্য মুখ।

অন্ধকারে তৈরি এক বিশাল দেবীর অবয়ব।

সব যোগিনী একসঙ্গে মাথা নিচু করল।

বৃদ্ধের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।

সে ফিসফিস করে বলল—

“মহাযোগিনী…”

মন্দিরের ছাদ কাঁপছিল।

ফাটলের ভিতর থেকে উঠে আসা সেই বিশাল অবয়ব ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার শরীর যেন অন্ধকার দিয়ে তৈরি, কিন্তু সেই অন্ধকারের ভিতরে অসংখ্য মুখ নড়ছে। কেউ কাঁদছে। কেউ হাসছে। কেউ সাহায্য চাইছে।

মহাযোগিনী।

তার চোখ দুটো খোলা মাত্র পুরো মন্দিরের আগুন নিভে গেল।

শুধু তার চোখ জ্বলছে।

দুটি বিশাল লাল সূর্যের মতো।

রুদ্রর বুকের ভিতর চাপা ব্যথা শুরু হল। মনে হচ্ছিল শুধু সেই চোখের দিকে তাকালেই মানুষ পাগল হয়ে যাবে।

বৃদ্ধ চিৎকার করল, “চোখ নামাও!”

রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে তিথির মুখ নিজের বুকে চেপে ধরল। কিন্তু তিথি লড়াই করতে লাগল।

“আমাকে যেতে দাও…”

তার গলা বদলে গেছে।

এবার সেখানে অনেকগুলো গলা একসঙ্গে কথা বলছে।

“আমরা ফিরব…”

“দ্বার খুলবে…”

“রক্ত সম্পূর্ণ হবে…”

বৃত্তের নীল আগুন কাঁপছিল।

যোগিনীরা ধীরে ধীরে বৃত্তের চারপাশে ঘুরতে শুরু করল। তাদের পায়ের ঘুঙুরে এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি হচ্ছিল। সেই ছন্দ শুনে রুদ্রর মাথা ভারী হয়ে উঠছিল।

ভৈরব তখন স্থির দাঁড়িয়ে।

সে মহাযোগিনীর দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল।

তারপর ধীরে তিথির দিকে হাত বাড়াল।

“শেষ করো।”

মহাযোগিনী তার শত শত হাত একসঙ্গে নড়াল।

মন্দিরের দেয়াল থেকে হঠাৎ মানুষগুলো বেরোতে শুরু করল।

যারা এতক্ষণ পাথরের ভিতরে আটকে ছিল।

তারা এখন হাঁটছে।

অর্ধেক পাথর।

অর্ধেক মাংস।

খালি চোখ।

ফাটা মুখ।

তারা ধীরে ধীরে বৃত্তের দিকে এগিয়ে আসছিল।

রুদ্র আতঙ্কে পিছিয়ে এল।

বৃদ্ধ মন্ত্র পড়তে পড়তে রক্ত কাশল।

তার শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

“আমি বেশিক্ষণ আটকাতে পারব না…”

তিথি তখন কাঁদছে।

তার চোখ থেকে রক্ত পড়ছে।

“রুদ্র… আমাকে মেরে ফেল…”

রুদ্র জমে গেল।

“কি?”

“ওরা আমার ভিতরে ঢুকে পড়ছে…”

সে নিজের মাথা চেপে ধরল।

“আমি ওদের শুনতে পাচ্ছি…”

তারপর হঠাৎ সে মাথা তুলল।

তার চোখ পুরো কালো।

“খুলে দাও।”

রুদ্র পিছিয়ে গেল।

এক সেকেন্ডের জন্য সে বুঝতেই পারছিল না সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা সত্যিই তিথি কিনা।

বৃদ্ধ চিৎকার করল, “এখনই! নাহলে দেরি হয়ে যাবে!”

তার হাতে তখন একটা পুরনো লোহার ছুরি।

কালো দাগে ভরা।

তান্ত্রিক চিহ্ন খোদাই করা।

সে ছুরিটা রুদ্রর দিকে বাড়িয়ে দিল।

“শেষ যোগিনীর হৃদয়ে এটা বসাতে হবে।”

রুদ্রর হাত কাঁপতে লাগল।

“না…”

“ও আর পুরো মানুষ নেই!”

মহাযোগিনী তখন আরও উপরে উঠছে। তার মাথা ছাদ ভেদ করে যাচ্ছে। মন্দিরের বাইরে ঝড় শুরু হয়েছে। বজ্রপাতের আলো ভিতরে ঢুকছে।

আর প্রতিটা বজ্রপাতের সঙ্গে তিথির শরীর কেঁপে উঠছে।

যোগিনীরা দ্রুততর ছন্দে নাচছে এখন।

ঝনঝনঝনঝন।

মাটির ফাটল আরও বড় হচ্ছে।

নিচ থেকে হাজার হাত বেরিয়ে আসছে।

বৃদ্ধ রুদ্রর কাঁধ চেপে ধরল।

“যদি এখন না করো… ওরা বাইরে চলে আসবে।”

রুদ্রর চোখে জল এসে গেল।

তিথি তার দিকে তাকাল।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখ আবার স্বাভাবিক হল।

সেই পুরনো তিথি।

ভীত।

ক্লান্ত।

সে খুব আস্তে বলল—

“প্লিজ…”

ঠিক তখন ভৈরব গর্জে উঠল।

এক মুহূর্তে সে বৃত্তের সামনে এসে দাঁড়াল।

নীল আগুন তার শরীরে লাগতেই ধোঁয়া উঠল।

কিন্তু সে থামল না।

ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকতে লাগল।

বৃদ্ধ আতঙ্কে মন্ত্র আরও জোরে পড়তে লাগল।

তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।

মহাযোগিনীর কণ্ঠ তখন পুরো মন্দিরে গমগম করছে।

“দ্বার খোলো…”

“দ্বার খোলো…”

“দ্বার খোলো…”

রুদ্র বুঝতে পারল—আর সময় নেই।

সে ছুরিটা হাতে নিল।

তিথি চোখ বন্ধ করল।

ভৈরব তখন প্রায় বৃত্তের ভিতরে।

তার সাদা চোখ রুদ্রর দিকে স্থির।

হাসছে।

মনে হচ্ছিল সে জানে রুদ্র এটা পারবে না।

রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে তিথির দিকে এগোল।

তার হাত কাঁপছে।

তিথি ফিসফিস করে বলল—

“ভয় পেয়ো না…”

তারপর সে নিজেই রুদ্রর হাত ধরে ছুরিটার ফল নিজের বুকে চেপে দিল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে মহাযোগিনী চিৎকার করে উঠল।

এক অমানুষিক শব্দ।

যেন হাজার মৃত মানুষ একসঙ্গে আর্তনাদ করছে।

ছুরির ফল তিথির বুক ভেদ করতেই সময় যেন থেমে গেল।

মন্দিরের সব শব্দ এক মুহূর্তে স্তব্ধ।

ঘুঙুর থেমে গেল।

মন্ত্র থেমে গেল।

ঝড় থেমে গেল।

শুধু তিথির মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র। তার হাত এখনও ছুরির হাতলে। উষ্ণ রক্ত ধীরে ধীরে আঙুল বেয়ে পড়ছে।

তিথির চোখে তখন আর লাল আভা নেই।

শুধু ক্লান্তি।

আর অদ্ভুত শান্তি।

সে খুব আস্তে হাসল।

“এবার… ওরা পারবে না…”

তারপর তার শরীর কেঁপে উঠল।

মুহূর্তের মধ্যে পুরো মন্দির গর্জে উঠল।

মহাযোগিনীর চিৎকারে ছাদ ফেটে যেতে লাগল। পাথরের টুকরো পড়তে শুরু করল চারদিকে। ফাটলের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা হাতগুলো পুড়তে লাগল নীল আগুনে।

ভৈরব বিকট গর্জন করে বৃত্তের ভিতরে ঢুকতে গেল।

কিন্তু তিথির বুক থেকে হঠাৎ প্রচণ্ড আলো বেরোল।

নীল।

অন্ধকার ভেদ করা আলো।

সেই আলো ভৈরবের গায়ে লাগতেই তার শরীর ফেটে যেতে শুরু করল।

তার মুখের ভিতরের শত মুখ একসঙ্গে চিৎকার করছিল।

“না—!”

যোগিনীরা পাগলের মতো কাঁদতে লাগল।

কেউ নিজের মুখ ছিঁড়ছে।

কেউ মাটিতে মাথা ঠুকছে।

কেউ আগুনে জ্বলছে।

বৃদ্ধ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তার চোখে জল।

“শেষে… শেষ হল…”

মহাযোগিনী তখন ফাটলের ওপর ঝুঁকে।

তার বিশাল মুখে ক্রোধ।

সে শত হাত বাড়িয়ে তিথির শরীর ধরতে গেল।

ঠিক তখন তিথি চোখ খুলল।

আর রুদ্র দেখল—তার চোখের ভিতরে পুরো আকাশ জ্বলছে।

তিথি ধীরে হাত তুলল।

মুহূর্তের মধ্যে পুরো তন্ত্রমণ্ডল আগুনে জ্বলে উঠল।

নীল আগুন।

আগের চেয়ে হাজারগুণ উজ্জ্বল।

মহাযোগিনী প্রথমবার ভয় পেল।

তার শরীর পিছিয়ে যেতে লাগল।

তিথির কণ্ঠ তখন আর মানুষের না।

গভীর।

প্রাচীন।

“দ্বার বন্ধ হোক।”

মন্দির কেঁপে উঠল।

ফাটলটা ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করল।

নিচের হাতগুলো আর্তনাদ করতে লাগল।

ভৈরব বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে ছটফট করছিল। তার শরীর টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

যোগিনীরা একে একে পাথর হয়ে যেতে লাগল।

তাদের চোখ নিভে গেল।

ঘুঙুর থেমে গেল।

মহাযোগিনী শেষবার গর্জন করল।

তারপর পুরো বিশাল শরীরটা অন্ধকারে ভেঙে পড়ে ফাটলের ভিতরে তলিয়ে গেল।

ধপাস।

ফাটল পুরো বন্ধ হয়ে গেল।

সব আলো নিভে গেল।

শুধু রুদ্র আর বৃদ্ধ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে।

আর তিথি।

সে এখনও দাঁড়িয়ে ছিল কয়েক সেকেন্ড।

তারপর ধীরে ধীরে রুদ্রর দিকে তাকাল।

চোখে আবার সেই পরিচিত কোমলতা।

সে খুব আস্তে বলল—

“এবার বাড়ি চল…”

তারপর তার শরীর ভেঙে ছাই হয়ে গেল।

রুদ্র চিৎকার করে উঠল।

সে দুহাতে ছাই ধরতে গেল, কিন্তু বাতাসে উড়ে গেল সব।

শুধু মাটিতে পড়ে রইল একটা ছোট ঘুঙুর।

নিস্তব্ধতা।

অনেকক্ষণ কেউ কথা বলেনি।

তারপর বৃদ্ধ ধীরে উঠে দাঁড়াল।

মন্দির তখন ভাঙছে।

দেয়ালের মুখগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে।

পাথর ঝরে পড়ছে।

বৃদ্ধ বলল, “চলো। সূর্য ওঠার আগে এই জায়গা মাটির নিচে চলে যাবে।”

রুদ্র যেন কিছুই শুনছিল না।

তার চোখ স্থির সেই ঘুঙুরটার দিকে।

শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধই তাকে টেনে বাইরে নিয়ে এল।

জঙ্গলের বাইরে বেরোতেই প্রথম ভোরের আলো দেখা গেল।

পাখির ডাক।

কুয়াশা।

মনে হচ্ছিল রাতের সবকিছু স্বপ্ন ছিল।

কিন্তু রুদ্রর জামায় তখনও শুকনো রক্ত।

আর তার মুঠোয় ধরা সেই ছোট ঘুঙুর।

পেছনে তাকিয়ে সে দেখল—

জঙ্গলের মধ্যে কোনো মন্দির নেই।

শুধু ফাঁকা গাছ।

যেন সেখানে কখনও কিছু ছিলই না।


ছয় মাস পরে।

কলকাতা।

রুদ্র আর ইউটিউব করে না।

সে একা থাকে এখন। কারও সঙ্গে খুব বেশি কথা বলে না। তিথি, সায়ন, নীল—তিনজনকেই “জঙ্গলে নিখোঁজ” বলা হয়েছে।

কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পুলিশও বিশ্বাস করেনি তার গল্প।

সেদিন রাতেও রুদ্র ঘুমোতে পারছিল না।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।

হঠাৎ সে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ শুনল।

ঝনঝন।

সে জমে গেল।

আবার।

ঝনঝন।

ঘুঙুর।

খুব ধীরে সে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল ঘরের অন্ধকার কোণটার দিকে।

সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে।

লম্বা চুল।

অস্পষ্ট মুখ।

আর অন্ধকারে দুটো চোখ জ্বলছে।

তারপর খুব পরিচিত একটা গলা ফিসফিস করে বলল—

“আমি তোকে একা ছাড়িনি…”

***

WhatsApp-Image-2026-05-19-at-5.07.50-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *