• Bangla - ভূতের গল্প

    শালবনের ছায়া

    অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় পুরুলিয়ার লাল মাটির রাস্তা যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ভিজে ছিল। ঋত্বিক সেনগুপ্তের বাস থেকে নামতেই ধুলো মেখে গেল জুতো। কলকাতা থেকে এখানে পৌঁছতে প্রায় নয় ঘণ্টা লেগেছে—স্টেশন থেকে বাস, বাস থেকে আবার চোট্টোখাটো জিপ। চারপাশে শুধু শাল, পিয়াল, মহুয়ার গন্ধ, দূরে টিলা আর ঝকঝকে নীল আকাশ। তার ক্যামেরার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়েই একবার চারদিক দেখে নিল সে। মনে হচ্ছিল, এ জায়গাটার বুকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কোনও গল্প, যে গল্প ফোটে না শহরের আলোয়, কেবল গ্রামবাংলার অচেনা অন্ধকারেই তার রূপ খুঁজে পাওয়া যায়। ঋত্বিকের সঙ্গে এসেছিল তৃষা—বন্ধু, সহযাত্রী আর কৌতূহলী সঙ্গী। ওর চোখে এ ভ্রমণটা শুধু ফটোগ্রাফির জন্য নয়,…

  • Bangla - ভূতের গল্প - রহস্য গল্প

    অন্ধকার কূপের ডাক

    এক গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে, বাঁশঝাড়ের আড়ালে এক বিস্মৃত কূপ বহুদিন ধরে অচল পড়ে আছে। সময়ের ভারে তার ইটগুলো ভেঙেচুরে এক অদ্ভুত শৈবাল-ঢাকা রূপ নিয়েছে, যেন প্রকৃতি নিজেই কূপটিকে ঢেকে রাখতে চায়। চারপাশে গজিয়ে ওঠা কাঁটাঝোপ, শুকনো ডালপালা আর বনলতা মিলেমিশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে দিনের আলোও প্রবেশ করতে চায় না। গ্রামের শিশুরা দূর থেকে কূপটিকে দেখে আঁতকে ওঠে, আর বয়স্করা ভয়ে নামও মুখে আনে না। শোনা যায়, একসময় এ কূপই ছিল গ্রামের প্রধান পানির উৎস। মানুষজন প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা জল তুলতে আসত, কূপপাড়ে হাসি-ঠাট্টার আসর বসত। কিন্তু প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে এক ভয়াবহ ঘটনার পর হঠাৎ করেই কূপটি অশুভের প্রতীক…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    দেউলতলার মৃতবধূ

    সুনন্দা সোম বীরভূমের দেউলতলা গ্রামটি যেন সময়ের গতির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে ঢেউখেলানো মাঠ, মাটির ঘর, পাখিদের ডাক আর নিরিবিলি দুপুর—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তির আবহাওয়া। কিন্তু এই শান্ত গ্রামটির বুকেই দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন মন্দির, যেন ইতিহাসের এক নিঃশব্দ সাক্ষী। কেউ কেউ বলে মন্দিরটির বয়স চারশো বছরেরও বেশি, আবার কেউ বলে আরও প্রাচীন। দিনের বেলায় এখানে গ্রামের মানুষ আসে পুজো দিতে, গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়, মন্দিরের চাতালে বসে বাচ্চারা খেলা করে। কিন্তু সূর্য ডুবে গেলেই সবকিছু যেন পাল্টে যায়। মন্দিরটিকে ঘিরে এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসে, এমন নীরবতা যেন কেউ অদৃশ্য হয়ে সারা পরিবেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। গ্রামবাসীরা…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    গোপালগঞ্জের কালো জঙ্গল

    তানভীর রানা ১ ঢাকার ব্যস্ত শহর থেকে কয়েকজন যুবক-যুবতী বেরিয়ে পড়েছে এক অজানা যাত্রায়। তারা কেউই পেশাদার অভিযাত্রী নয়, তবে প্রত্যেকেই নতুন জায়গা ঘোরার নেশায় পাগল। একসঙ্গে বন্ধুদের একটি ট্রাভেল গ্রুপ গড়ে তোলা হয়েছে কেবল রোমাঞ্চ খোঁজার জন্য, আর সেই রোমাঞ্চের খোঁজেই এবার তাদের গন্তব্য গোপালগঞ্জের বিখ্যাত কালো জঙ্গল। নাম শুনলেই মনে হয় ভয়ঙ্কর কোনো অরণ্যের কথা, যেখানে আলো পৌঁছায় না, মানুষের পা পড়েনি বছরের পর বছর। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় রাত তিনটের দিকে যখন তারা মাইক্রোবাসে উঠলো, তখনও কারো চোখে ক্লান্তি নেই—হাসি, মজা আর নানা রকম ঠাট্টায় গাড়ির ভেতর জমে উঠেছে উৎসবের আবহ। দলের নেতৃত্বে আছে রাহুল, বয়স তেইশ-চব্বিশের মধ্যে,…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    আটচালার কান্না

    প্রমিত চৌধুরী ১ শান্তিনগর গ্রামের প্রাচীন জমিদারবাড়িটি যেন এক ইতিহাসের দলিল, কিন্তু সেই ইতিহাস আজ ধ্বংসস্তূপের স্তূপে চাপা পড়ে আছে। লাল ইটের গা বেয়ে নেমে এসেছে লতাপাতা, জানালার কাঠের খাঁচাগুলো ভেঙে পড়েছে, আর দালানের ছাদের টালিগুলো অর্ধেক জায়গায় খসে গিয়ে আকাশের আলো ঢুকে পড়েছে ভেতরে। গ্রামবাসী দিনের আলোয় জমিদারবাড়ির পাশ দিয়ে গেলেও ভেতরে প্রবেশ করতে ভয় পায়, কারণ তারা বিশ্বাস করে এখানে কেবল ভগ্নদালান নয়, লুকিয়ে আছে অভিশপ্ত অতীত। তবে এই জমিদারবাড়ির ধ্বংসস্তূপের মাঝেও যেটি অদ্ভুতভাবে টিকে আছে তা হলো আটচালা। প্রাচীন কালের মতোই তার খিলানদ্বারগুলো দাঁড়িয়ে আছে, অর্ধেক জায়গায় ধসে গেলেও এক ধরনের অদ্ভুত দৃঢ়তায় সে দাঁড়িয়ে থেকে যেন…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    চন্দ্রাবতীর অভিশাপ

    নন্দিতা দাস ১ শীতলপুর নামের ছোট্ট গ্রামটি যেন সময়ের স্রোতকে অগ্রাহ্য করে দাঁড়িয়ে আছে। মাটির বাড়ি, কাঁচা রাস্তা, চারপাশে গাছপালা আর মাঝে দিয়ে বয়ে চলা শান্ত কুশাবতী নদী—সব মিলিয়ে গ্রামের এক সহজ, নিরিবিলি ছবি। দিনের বেলায় নদীর ধারে হাট বসে, গ্রামের ছেলে-বুড়ো সেখানে বসে গল্প করে, গৃহিণীরা আসে কলসি ভরতে। কিন্তু রাত নামলেই এই কুশাবতী নদীর চেহারা যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। আকাশজোড়া চাঁদ উঠলে নদীর কালো জলের ওপর ঝিলমিল আলো পড়ে, গাছের ছায়া জলে মিশে যায়, আর সেই নির্জনতাকে ভেঙে কখনও শোনা যায় এক অচেনা কান্নার শব্দ। গ্রামবাসী অনেক বছর ধরে সেই কান্নাকে চন্দ্রাবতীর অভিশাপ বলে মানে। কারণ বহু আগে,…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    নির্বাক স্কুলঘর

    অরিত্র ভট্টাচার্য আমাদের গ্রামের নাম হিজলতলা, চারদিকে জলাভূমি, তালডোবা, মাঝেমধ্যে ধানক্ষেতে চিলের পাখা লেগে বাতাস কেটে যায়, আর মাঝখানে বটগাছের ছায়ায় পড়েই আছে যে জিনিসটা নিয়ে এত কথা—পুরনো প্রাইমারি স্কুলঘর। টালির ছাদে শ্যাওলা, দরজায় মরচে, জানালার কাঠ নড়ে উঠলেই যেন লম্বা ককিয়ে ওঠা কান্না, আর ভেতরে ধুলো জমা বেঞ্চ-ডেস্ক যাদের ওপর আমরা কোনোদিন বসিনি, কারণ স্কুলটা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক বছর। কেন বন্ধ, সেটা নিয়ে গ্রামের লোকের হাজার গল্প। কেউ বলে, শিক্ষক আত্মহত্যা করেছিলেন, কেউ বলে একটা মেয়ের সঙ্গে তাঁর গোপন সম্পর্ক ছিল, কেউ বলে রাতে চক ঘষার শব্দ শুনে পাগল হয়ে যান। এসব কথার সঙ্গে সঙ্গে আমরা—আমি, বাপন, শুভ,…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    দূর্গাপুরের কয়লা খনি

    ১ রাতটা ছিল ভয়ংকর, দূর্গাপুরের আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘ জমে উঠেছিল, যেন প্রকৃতিই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছিল আসন্ন বিপর্যয়ের। পুরোনো কয়লা খনিটি দিনের পর দিন ক্লান্ত শরীরের ঘাম শুষে নিয়েছে, হাজারো হাতুড়ির আঘাতে প্রতিদিন মাটির গা ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে কালো রুটি, কিন্তু সেই রাত যেন ভিন্ন ছিল। শ্রমিকরা কাজ শেষ করে অন্ধকার টানেলের গভীরে শিফট পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, হঠাৎ ভূগর্ভ থেকে গম্ভীর গর্জন উঠতে লাগল। মনে হচ্ছিল, মাটি যেন কেঁপে উঠছে, দেয়ালের কাঠের পাটাতন ভেঙে পড়ার মতো শব্দ উঠছিল, বাতাসে ভেসে আসছিল ধুলো আর কয়লার গন্ধে ভারী নিঃশ্বাসরোধ করা পরিবেশ। শ্রমিকরা চিৎকার করল, “ধস হচ্ছে, বাইরে বেরোও!” কিন্তু বেরোনোর…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    ডাকিনী কুন্ড

    সুপ্ৰকাশ মুখার্জী ১ অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের অলিগলিতে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সন্ধের প্রার্থনা শেষ হলে কাকাদের আড্ডা থেমে যায়, খুদেরা দৌড়ঝাঁপ বন্ধ করে মায়েদের আঁচলের আড়ালে ঢুকে পড়ে। একমাত্র যিনি তখনও সক্রিয়, তিনি রাধিকা কাকিমা। বয়স আশির কাছাকাছি, মুখভর্তি কুঁচকানো ভাঁজ, মাথার চুল প্রায় সাদা, তবুও তার চোখদুটি এখনো অদ্ভুত উজ্জ্বল। গ্রামের বাচ্চারা যখন চারদিকে ছুটোছুটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সন্ধেবেলায় তার উঠোনে জড়ো হয়। উঠোনের মাঝখানে রাখা মাটির প্রদীপটিতে হলদেটে আলো জ্বলে ওঠে, আর কাকিমার গলায় ভেসে আসে সেই পুরোনো দিনের গল্প। আজও তিনি বসে আছেন শালপাতার পাখা হাতে, যেন সেই আলো আর বাতাসকে গল্পের তালে তালে…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    নিশির বাঁশি

    ১ শহরের একেবারে প্রান্তে, ব্যস্ততা ও জনবসতির বাইরে যেন পৃথিবীর ভিন্ন এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো শ্মশান। চারদিক ঘন গাছপালা দিয়ে ঢাকা, লতাগুল্মে জড়ানো ভাঙাচোরা ঘাট, অর্ধেক ডুবে থাকা শিলাস্তম্ভ আর শেওলা ধরা সিঁড়ি—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন সময়ের হাতে পরিত্যক্ত। দিনের আলোয়ও এখানে এক অদ্ভুত গা ছমছমে পরিবেশ বিরাজ করে, আর রাতের অন্ধকারে শ্মশান হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ অন্য রূপে। বহু বছর আগে এখানে চিতা জ্বলত নিয়মিত, শবদেহ সৎকারের জন্য আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষ আসত, কিন্তু এখন অনেক বছর হলো কেউ আর এখানে শবদাহ করতে আসে না। ধীরে ধীরে জায়গাটা জনশূন্য হয়ে পড়ে, শুধু কাক, শেয়াল আর বাদুড়েরা এটিকে নিজেদের…