তনুশ্রী বসাক অধ্যায় ১: জন্মের অশনি নীলডিহি গ্রামের পূর্বপাড়ার শেষে, একটি জরাজীর্ণ কুঁড়ে ঘর। শিউলি ফুলের গাছ তার সামনের উঠোনে ঝুঁকে পড়েছে, আর ঘরের ভিতর থেকে এক আর্তনাদ ভেসে আসছে—এক প্রসূতির কষ্টকর আর্তি। গ্রামের বয়স্কা ধাইমা চৈতালী বুড়ি দরজা বন্ধ করে ভেতরে নিঃশব্দে কাজ করছে। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দু-তিনজন নারী, চোখে ভয়, কানে হাওয়ায় ভেসে আসা শতাব্দী পুরনো গুজবের প্রতিধ্বনি। আজকের এই জন্ম আলাদা। ঠিক একশো বছর পর আবার সেই অমঙ্গল বার্তাবাহী ‘শঙ্খচক্ষু কন্যা’ জন্ম নিচ্ছে — এমনটাই বলছে লোককথা। সন্ধ্যা নামছে, তালগাছের মাথায় দাঁড় টেনে সূর্য ডুবে যাচ্ছে পশ্চিমে, আর ঠিক সেই মুহূর্তে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক নবজাতকের…
-
-
চৈতালি লাহিড়ী এক প্রতিভার জীবনের প্রথম স্মৃতি যেন সেই গন্ধ—হলুদের, ধূপের, আর নতুন শাড়ির আলতো কলকার। বাল্যবিয়ে তার জন্য ছিল এক নীরব আনুষ্ঠানিকতা, চোখের কোনায় জল জমলেও মন বোঝেনি এর অর্থ। ছোট্ট গ্রামের মাটির বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির লাল ইটের প্রাচীরের মধ্যে পা রাখার মুহূর্তে সে অনুভব করেছিল পৃথিবীটা কত বড়, আর সেই বড় পৃথিবীতে সে কতটুকু ক্ষুদ্র। প্রতিভার বয়স তখন মাত্র তেরো, বইয়ের পাতায় এখনও তার হাতের গন্ধ লেগে ছিল, অথচ জীবনের নতুন পাঠশালায় তাকে পা রাখতে হলো অনিচ্ছায়। স্বামী অরুণমাধব, দশ বছরের বড়, শুরুর দিকে মুখে কথাই বলতেন না; শ্বশুরবাড়ির রীতিনীতি, শাশুড়ির কড়া চোখ, আর গৃহস্থালির দায়িত্ব একসঙ্গে যেন…
-
প্রজ্ঞা সেনগুপ্ত এক সূর্য তখন পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতিতে, আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা রঙের ছায়া। গ্রামের শেষপ্রান্তের কাঁচা রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে। গরু-বাছুর ফিরেছে খুঁটির কাছে, ধোঁয়া উঠেছে রান্নার চুলায়। এমন সময় একটা ছায়ামূর্তি—কোনওমতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, কাপড় ছেঁড়া, হাঁটা কাঁপা কাঁপা। তার মুখটা ঢাকা, কিন্তু চোখের নিচে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ স্পষ্ট। কেউ জানে না কোথা থেকে এল, বা কী ঘটেছে। অনেকে জানতেও চায় না। গ্রামের মধ্যে কানাঘুষো শুরু হল, “ওই তো সরকারবাড়ির পেছনের পথ দিয়ে আসছে! ওই তো রাধার কনিকা… বাঁচাও বাবা, আবার নাম জড়াবে গ্রামের।” কেউ জল এগিয়ে দিল না, কেউ তাকে…
-
মিতা চট্টোপাধ্যায় স্বরূপা নিজের জীবনের মধ্যে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করে, যদিও তার কাজ ছিল কিছুটা অদ্ভুত এবং রহস্যময়। সে এক ধরনের ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিল, যা তাকে অন্যদের স্বপ্নে প্রবাহিত হতে সাহায্য করত। তার কাজ ছিল মানুষের স্বপ্ন রেকর্ড করা, তাদের সেসব অনুভূতি, দৃষ্টিকোণ এবং অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করা। প্রতিদিন সে তাদের স্বপ্নের সুর ও ছন্দে প্রবাহিত হয়ে যেত, যেন একটি অবিকল চিত্র, যা তার কাছে একান্ত সত্য হয়ে উঠত। তার ঘরটা ছিল এক অদ্ভুত জায়গা, যেখানে শত শত স্বপ্নের ডায়েরি রাখা ছিল, স্বপ্নের টুকরো, ছবি, শব্দ — সব কিছু যার মাধ্যমে সে তাদের মানসিক জগতের গভীরে পৌঁছাতে পারত। তবে, এই…
-
তানিয়া রায় অধ্যায় ১: জলাধারের স্নান অঞ্জলী ঘোষ, জলাধার বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত একজন নারী, অনেক বছর ধরেই নদীর জল পরীক্ষা করে চলেছে। তার পেশার মধ্যে ছিল নদী, নালার পানি এবং অন্যান্য জলধারার উপাদান বিশ্লেষণ করা, যাতে করে মানুষ আগে থেকে বিপদ বুঝে নিতে পারে বা পরিবেশের স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। যে কোনো জলপ্রবাহের বিশ্লেষণ ছিল তার কাছে একটি গম্ভীর প্রক্রিয়া, যেখানে তার মাথায় চলত একাধিক রাসায়নিক, শারীরিক গুণাবলী এবং পরিবেশগত প্রভাবের হিসাব। এমনকি এই সেবাটি তার নিজের কাছে কিছুটা ধর্মীয় রীতির মতোই ছিল। অঞ্জলীর জীবন ছিল একরকম নিয়মতান্ত্রিক—প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট সময় পর নদীর তীরে গিয়ে তার পরীক্ষামূলক কাজ শুরু…
-
নীহারিকা চক্রবর্তী ১ নয়নার জন্মের পর থেকেই তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক শূন্যতা, যদিও ডাক্তাররা বলেছিল মেয়েটির দৃষ্টি একদম ঠিক আছে—কিন্তু রঙের জগৎ তার কাছে ধোঁয়াটে, অচেনা। জন্মগতভাবে বর্ণান্ধ এই মেয়েটির জন্য লাল আর সবুজ ছিল একই ধূসর ছায়া, আর নীল আর বেগুনির মধ্যে কোনো তফাত তার চোখে ফুটত না। প্রথম প্রথম সে বুঝেই উঠতে পারত না, রঙের জগৎ যে এতটা বিস্তৃত আর বর্ণিল হতে পারে। মা যখন শাড়ি বদলাতেন, নয়না শুধুই আঁচল ছোঁয়ার নরমতা টের পেত, কিন্তু তার জন্য সেই রঙের লালিমা ছিল শুধুই গল্পে শোনা এক রহস্যময় জিনিস। স্কুলের ছবি আঁকার ক্লাসে শিক্ষকরা যখন বলতেন—‘আকাশ নীল করো, গাছের…
-
অন্বেষা পাল পর্ব ১: শহর থেকে আগমন শহর যতটা দ্রুত হাঁটে, শান্তিনিকেতন ততটাই ধীরে হাঁটে—আর সেই ধীর গতির মধ্যেই যেন তার প্রকৃত ছন্দ। ঈশিতা চক্রবর্তী, কলকাতার একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্রী, প্রথম যখন শান্তিনিকেতনে পা রাখল, তার মনে হয়েছিল যেন কেউ টিভির রিমোটে ‘স্লো মোশন’ বাটন চাপিয়ে দিয়েছে। কলকাতা থেকে আসা লোকাল ট্রেনটা বোলপুর স্টেশনে থেমে যাওয়ার পর যে নিস্তব্ধতা তাকে ঘিরে ধরল, তা কিছুটা আরামদায়ক, কিছুটা অস্বস্তিকর। সে যেন নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও বেশি করে শুনতে পাচ্ছিল। ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে সে স্টেশনের বাইরে বেরোল। শান্তিনিকেতনের বাতাসে একটা হালকা শুকনো পাতার গন্ধ ছিল—সেই গন্ধ শহরে নেই, পারফিউমেও নেই। অথচ কেমন একটা…
-
কৃষ্ণা চক্রবর্তী অধ্যায় ১: ছোট পেনসিল, বড় মন শীতের সকালে কুয়াশায় ঢাকা গ্রামটার গায়ে প্রাইমারি স্কুলটা যেন এক ছায়াপথের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশটা কুড়িয়ে কুড়িয়ে জেগে উঠছে; কাঁচা রাস্তায় ছেলেমেয়েদের চেনা পায়ের ধ্বনি, বইয়ের ব্যাগের চড়া ভার আর মায়ের তাড়াহুড়ির গলা মিশে একটা গাঁথা তৈরি করছে। স্কুলের ছোট মাঠটা শিশিরে ভেজা, কাঠের পুরোনো বেঞ্চগুলো যেন কাঁপছে ঠান্ডায়। এই দৃশ্যের মাঝখানে, নিরিবিলিতে, তার রোজকার সময়ের আগেই স্কুলে এসে গেছেন শ্রীমতী কাবেরী দাস – হালকা বেগুনি শাল জড়িয়ে, ছোটখাটো গড়নের মধ্যে এক বিস্ময়কর দৃঢ়তা। স্কুলে তাঁর পরিচয় ‘কাবেরী ম্যাডাম’, কিন্তু গ্রামে তিনি শুধুই ‘দিদিম্যাডাম’ — সম্মান আর মমতার একত্র নাম। আজ বছরের…
-
মেরিলিনা মিত্র রেশমি সেনগুপ্ত আজকাল খুব ভোরে উঠে পড়েন। দুধের পাত্র বসিয়ে দেন চুলায়, চায়ের পাতা মেপে রাখেন একটা ছোট্ট কৌটোয়, আর বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, যেন কোনো অদৃশ্য সুরকে কান পেতে শুনছেন। শহরটা জেগে ওঠে অজস্র শব্দে—ট্রাফিক, রিকশার ঘণ্টা, খবরের কাগজ ছুঁড়ে ফেলার আওয়াজে—কিন্তু রেশমির মনে হয়, এসব শব্দের ভিতর কোথাও যেন হারিয়ে আছে সেই সুর, যে সুর একদিন তাঁর গলা দিয়ে বেরোত, মেঘমল্লার বা ভৈরবী হয়ে। একসময় সারা কলকাতা চিনত রেশমির নাম—‘তালতলা মহোৎসবে যাঁর আলাপ শুনলে পাখিরাও স্তব্ধ হয়ে যেত।’ তারপর? সংসার। দুই সন্তানের মা, অরিন্দমের স্ত্রী, মাসে দু’বার পায়েস রান্না করা এক গৃহবধূ। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে…
-
রঞ্জিনী পাল ১ রাত্রি তখন প্রায় গলগল করে গলে পড়ছিল গাছের পাতার নিচে। জ্যোৎস্না ছিল না, কুয়াশাও নয়। যেন আলোটা থেমে গিয়েছে দূরে—চুপিচুপি। আর সেই আলোর ফাঁক গলে, ডুয়ার্সের এক পাহাড়ঘেরা ছোট গ্রাম, চিলাপাতা জঙ্গলের পাশের জনপদ, অন্ধকারের ঘুমে ঢলে পড়ছিল ধীরে ধীরে। তখনই সিঁদুরে রঙের এক পালকি ঢুকেছিল বনের ভেতর, তার ভিতর বসেছিলেন সাহেব সাহেবি দল। সঙ্গে খাস পিয়ন, বন্দুকধারী, আর এক বিদেশিনী নারী—মিস কনস্ট্যান্স হিলডা। তার চোখে ছিল আগুন। একরাশ রুক্ষতা মেখে সে বলেছিল, “This soil shall now bear the empire’s favourite leaf.” ১৮৬০ সালের ১২ জুন রাত। ব্রিটিশরা প্রথম চা-গাছ পুঁতে দেয় ডুয়ার্স অঞ্চলে—মার্চ পাড়ার উপত্যকায়। ঘুমন্ত…