Posted in

দোতলার জানালা

Spread the love

ঈশানী দত্ত


পুরোনো বাড়ির গন্ধ

উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়িগুলোর একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, পুরোনো কাঠ, ধূপের ধোঁয়া আর বহুদিন ধরে জমে থাকা অন্ধকারের মিশ্রণে তৈরি সেই গন্ধ যেন বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই মানুষের শরীরে লেগে যায়। রিমি প্রথম দিন বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে সেই গন্ধটাই টের পেয়েছিল। কলেজ স্ট্রিট থেকে খুব দূরে নয়, পুরোনো এক গলির শেষে দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা বনেদি বাড়ি। লোহার বিশাল ফটকের ওপরে মরচে ধরা নাম— “চৌধুরী ভিলা”। নামের কিছু অক্ষর ভেঙে পড়ে গেছে। দুপুরের আলোতেও বাড়িটাকে অদ্ভুত অন্ধকার লাগছিল।

রিমি কলকাতায় নতুন চাকরি পেয়েছে। একটি প্রকাশনা সংস্থায় এডিটোরিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট। বেতন বেশি নয়, তাই কম ভাড়ার পুরোনো বাড়িটা তার কাছে আশীর্বাদের মতোই মনে হয়েছিল। বাড়ির মালকিন সরযুবালা দেবী বয়সে অনেক বৃদ্ধা। কানে কম শোনেন। প্রথম দিন রিমিকে ঘর দেখাতে গিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। তাঁর সাদা থান, কাঁপা হাত আর অদ্ভুত নির্লিপ্ত চোখ দেখে রিমির মনে হচ্ছিল এই বাড়ির সঙ্গে মহিলাটাও যেন ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত হয়ে গেছেন।

“দোতলায় উঠবেন না রাতে,” হঠাৎ বলেছিলেন তিনি।

রিমি অবাক হয়েছিল। “কেন?”

“ওপরে কেউ থাকে না।”

“তাহলে?”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর খুব আস্তে বলেছিলেন, “খালি ঘর সবসময় খালি থাকে না।”

কথাটা শুনে রিমি হেসে ফেলেছিল। সে ভূতে বিশ্বাস করে না। কলকাতায় একা থাকা মেয়েদের ভয় দেখানোর জন্য লোকজন নানা কথা বলে। সে এসব পাত্তা দেয় না। নিজের ছোট্ট ঘরটা দেখে তার বরং ভালোই লেগেছিল। উঁচু ছাদ, পুরোনো কাঠের জানালা, একটা ছোট বারান্দা। সমস্যা একটাই— ঘরের ঠিক ওপরে দোতলার একটি জানালা সবসময় বন্ধ। দিনের বেলাতেও। কাঠের পাল্লা কালচে হয়ে গেছে। জানালার নীচে কবুতরের বিষ্ঠা জমে সাদা দাগ তৈরি হয়েছে।

প্রথম রাতেই রিমি ঘুমোতে পারেনি। পুরোনো বাড়ির নানা শব্দ থাকে। কোথাও কাঠ কেঁপে ওঠে, কোথাও জল পড়ার শব্দ হয়। কিন্তু রাত দুটো নাগাদ সে স্পষ্ট শুনেছিল উপরে কেউ হাঁটছে। ধীর পায়ের শব্দ। যেন কেউ ভারী শাড়ি পরে ঘরের ভেতরে হাঁটছে।

সে উঠে বসেছিল।

মোবাইলের স্ক্রিনে ২:১৭।

শব্দটা আবার হলো।

টক।

টক।

টক।

রিমি নিজেকে বোঝালো, পুরোনো বাড়ি। কাঠ বসে যাচ্ছে। ইঁদুরও হতে পারে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরে সে শুনতে পেল আরেকটা শব্দ। জানালায় নখ ঘষার মতো।

খরররর…

তার বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল।

সকালে অফিসে গিয়ে সে ঘটনাটা ভুলে গিয়েছিল। কাজের চাপ অনেক ছিল। কিন্তু রাতে ফিরে আবার যখন নিজের ঘরে ঢুকল, তখন অদ্ভুত একটা বিষয় নজরে এলো। দোতলার সেই বন্ধ জানালাটা আধখোলা।

সে থমকে দাঁড়াল।

কাল তো বন্ধ ছিল।

বাড়ির সামনে রাস্তার আলো এসে জানালার ফাঁকে পড়ছিল। ভেতরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। রিমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তারপর নিজেকে বোকা মনে হলো। হয়তো সকালে কেউ খুলেছে।

সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।

রাত বাড়ল।

বৃষ্টি নামল।

পুরোনো বাড়ির কার্নিশ দিয়ে জল পড়ার শব্দ আসছিল। প্রায় বারোটার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেল। রিমি মোবাইলের টর্চ জ্বালাতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বাইরে একটা শব্দ পেল।

খট।

যেন কাঠের জানালা খুলল কেউ।

তারপর খুব ধীরে ধীরে কারও নিঃশ্বাসের শব্দ।

রিমি বারান্দার দিকে এগোল। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার আলো আধো অন্ধকারে দোতলার জানালাটা এবার পুরো খোলা।

আর সেই জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা।

লম্বা চুল।

সাদা শাড়ি।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

তিনি স্থির হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন।

রিমির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড নড়তেই পারেনি। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ ফিরে এলো।

আলো জ্বলে উঠতেই জানালাটা আবার বন্ধ।

কেউ নেই।

পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।

রিমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সে নিজেকে বোঝাতে লাগল, এটা চোখের ভুল। আলো-অন্ধকারে ভুল দেখেছে।

কিন্তু ঘুমোতে যাওয়ার আগে হঠাৎ তার চোখ পড়ল দরজার নীচে।

একটা ভেজা পায়ের ছাপ।

ঠিক দরজার বাইরে।

যেন কেউ বৃষ্টিতে ভিজে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।

বন্ধ ঘরের ভেতর

সকালে ঘুম ভাঙতেই রিমির প্রথমে মনে হয়েছিল রাতের ঘটনাটা দুঃস্বপ্ন ছিল। কলকাতার নতুন জায়গা, পুরোনো বাড়ি, কাজের চাপ— সব মিলিয়ে মাথা গুলিয়ে গেছে। কিন্তু দরজা খুলতেই সে থেমে গেল। ভেজা পায়ের ছাপগুলো এখনও মেঝেতে শুকিয়ে ধূসর হয়ে আছে। মানুষের পায়ের মতো, কিন্তু অদ্ভুত লম্বা। যেন জলে ভিজে ফুলে ওঠা পা।

তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে নিচে নেমে সরযুবালা দেবীকে সব বলল। বৃদ্ধা তখন উঠোনে তুলসীতে জল দিচ্ছিলেন। রিমির কথা শুনে তিনি একবারও অবাক হলেন না। শুধু থেমে গিয়ে খুব ধীরে বললেন, “রাতে জানালার দিকে তাকাবে না।”

“কিন্তু আমি সত্যিই কাউকে দেখেছি।”

“দেখলেও দেখোনি ভাববে।”

“ওখানে কে থাকে?”

বৃদ্ধা এবার চুপ করে গেলেন। তাঁর চোখের ভেতর এমন একটা ভয় ছিল যা বয়সের থেকেও পুরোনো। অনেকক্ষণ পরে তিনি বললেন, “একসময় বড়বউ থাকত।”

“এখন?”

“এখন কেউ নেই।”

“তিনি মারা গেছেন?”

সরযুবালা দেবী মাথা নিচু করলেন। “মানুষ সবসময় মারা গেলে দেহ পাওয়া যায় না।”

কথাটা শুনে রিমির বিরক্ত লাগল। সবাই যেন ইচ্ছে করে ধাঁধা বানিয়ে কথা বলছে। সে আর কিছু না বলে অফিসে বেরিয়ে গেল। কিন্তু সারাদিন তার মাথার ভেতর একই ছবি ঘুরছিল— অন্ধকার জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা সাদা শাড়ির মহিলা।

অফিসে সহকর্মী তুহিনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কয়েকদিন আগে। তুহিন পুরোনো কলকাতার ইতিহাস নিয়ে ভীষণ আগ্রহী। দুপুরে ক্যান্টিনে বসে রিমি হঠাৎ পুরো ঘটনাটা বলে ফেলল।

তুহিন প্রথমে হেসেছিল। “উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়ি মানেই ভূতের গল্প ফ্রি।”

“আমি সিরিয়াস।”

রিমি যখন পায়ের ছাপের কথা বলল, তখন তুহিন একটু চুপ করল। তারপর মোবাইল বের করে জিজ্ঞেস করল, “বাড়িটার নাম কী বললে?”

“চৌধুরী ভিলা।”

নাম শুনেই তুহিনের মুখ বদলে গেল।

“তুই ওই বাড়িতে থাকিস?”

“হ্যাঁ। কেন?”

তুহিন কিছুক্ষণ স্ক্রিনে খুঁজল। তারপর মোবাইলটা রিমির দিকে বাড়িয়ে দিল। কয়েক বছর আগের একটা খবর। শিরোনাম—
“উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ি থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ গৃহবধূ।”

খবরে লেখা, বাড়ির বড় ছেলে অরিন্দম চৌধুরীর স্ত্রী নন্দিতা চৌধুরী এক রাতে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। পুলিশ আত্মহত্যার সন্দেহ করেছিল, কারণ দোতলার ঘরে রক্ত পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহ কখনও পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পর কেস বন্ধ হয়ে যায়।

রিমির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কত বছরের পুরোনো ঘটনা?”

“প্রায় পনেরো বছর।”

“তারপর?”

“লোকজন বলে ওই বাড়িতে নাকি রাতে জানালায় একজন মহিলাকে দেখা যায়।”

রিমি আর কথা বলতে পারছিল না।

সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার সময় থেকেই তার ভেতরে অদ্ভুত চাপা ভয় কাজ করছিল। গলির ভেতর ঢুকতেই মনে হলো বাড়িটা যেন দূর থেকে তাকিয়ে আছে। ওপরে সেই জানালা আবার বন্ধ।

সে দ্রুত ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল।

রাত এগারোটা পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। তারপর হঠাৎ উপরের ঘর থেকে ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ এলো।

ঘষসসস…

যেন কাঠের আলমারি সরানো হচ্ছে।

রিমি কান চেপে বসে রইল। কিছুক্ষণ পরে শব্দ থেমে গেল। তারপর খুব আস্তে একটা গুনগুন গান ভেসে এলো। মহিলা কণ্ঠ। পুরোনো বাংলা গান।

“ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা…”

তার গা কাঁটা দিয়ে উঠল।

সে সাহস করে বারান্দায় বেরোল। দোতলার জানালাটা আজও আধখোলা। ভেতরে ক্ষীণ আলো জ্বলছে। হলদেটে আলো। যেন কেরোসিন ল্যাম্প।

রিমি তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখল, জানালার ফাঁক দিয়ে একটা মুখ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।

ফ্যাকাশে।

চোখদুটো সম্পূর্ণ কালো।

গলার ডানদিকে কালচে কাটা দাগ।

মহিলাটা স্থিরভাবে নিচে তাকিয়ে আছে।

রিমির শরীর জমে গেল। সে চিৎকার করতে পারল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর মহিলাটা খুব ধীরে একটা হাত তুলল।

ইশারা করল।

উপরে আসতে।

ঠিক তখনই রিমির পেছনে কারও কাঁপা গলা শোনা গেল।

“যেও না।”

সে ঘুরে দাঁড়াল।

সরযুবালা দেবী দাঁড়িয়ে আছেন অন্ধকারে।

তাঁর চোখে আতঙ্ক।

“যে ওপরে যায়,” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “সে আর আগের মতো ফিরে আসে না।”

নন্দিতার ঘর

সেই রাতের পর রিমি আর স্বাভাবিক থাকতে পারল না। অফিসে কাজ করতে বসলে তার মনে হচ্ছিল কেউ পেছন থেকে তাকিয়ে আছে। বাড়ি ফেরার সময় গলির মুখে পৌঁছোলেই বুকের ভেতর অকারণে ধুকপুক শুরু হয়ে যেত। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়— এখন সে প্রায় প্রতি রাতেই সেই গুনগুন গান শুনতে পায়।

“ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা…”

একই সুর।

একই ভাঙা কণ্ঠ।

মাঝরাতের পর দোতলা থেকে ভেসে আসে।

সরযুবালা দেবী এরপর আর কিছু বলতে চাননি। যতবার রিমি নন্দিতার কথা জিজ্ঞেস করেছে, বৃদ্ধা শুধু এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু ভয় আর কৌতূহলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত ভয়কে ভুলে যায়। রিমিরও তাই হলো।

তৃতীয় রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল, ওপরে যাবে।

রাত একটা নাগাদ পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেলে সে দরজা খুলল। হাতে মোবাইলের টর্চ। পুরোনো কাঠের সিঁড়ি দোতলার দিকে উঠে গেছে। দিনের বেলাতেও সিঁড়িটা অন্ধকার থাকে। আজ যেন আরও কালো।

প্রথম ধাপে পা দিতেই শব্দ হলো।

ক্যাঁচ…

রিমির গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল। বাতাসে পুরোনো আতরের গন্ধ। খুব মিষ্টি কিন্তু পচা। যেন বহুদিনের পুরোনো ফুল।

দোতলার করিডোরে পৌঁছে সে থেমে গেল।

দীর্ঘ অন্ধকার বারান্দা। দুপাশে বন্ধ দরজা। দেয়ালে পুরোনো পারিবারিক ছবি। বেশিরভাগ ছবির মুখ আর্দ্রতায় নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এক ছবিতে রিমি স্পষ্ট দেখতে পেল এক তরুণীকে। সাদা শাড়ি। বড় বড় চোখ। ঠোঁটে চাপা হাসি।

নন্দিতা।

ঠিক সেই মুখ।

তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

করিডোরের একেবারে শেষে যে ঘরটা, তার দরজা আধখোলা। ভেতর থেকে হলদেটে আলো বেরোচ্ছে। আর সেই গুনগুন গান।

রিমি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে দরজাটা ঠেলে খুলল।

ঘরের ভেতরে ঢুকেই তার মনে হলো যেন সময় থেমে গেছে।

পুরো ঘরটা পনেরো বছর আগের মতো সাজানো। কাঠের ড্রেসিং টেবিল, পুরোনো আয়না, খাটের ওপর লাল বেনারসি ভাঁজ করে রাখা। টেবিলের ওপর শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ। অথচ এত বছর কেউ থাকেনি এখানে।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসটা ছিল আয়নাটা।

আয়নাতে রিমির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল না।

সে জমে গেল।

ঠিক তখনই গুনগুন গান থেমে গেল।

ঘরের কোণ থেকে একটা মৃদু ফিসফিস শব্দ এলো।

“এতদিন পরে এলে?”

রিমি ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

খাটের পাশে একজন মহিলা বসে আছেন।

সাদা শাড়ি।

লম্বা চুল।

মুখ নিচু।

রিমির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। সে পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পা নড়ল না।

মহিলাটা ধীরে মুখ তুললেন।

নন্দিতা।

চোখদুটো অস্বাভাবিক কালো। ঠোঁটের কোণে শুকনো রক্তের মতো দাগ। কিন্তু মুখে অদ্ভুত শান্ত হাসি।

“তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ,” তিনি বললেন।

কণ্ঠস্বর খুব নরম।

রিমি কাঁপা গলায় বলল, “আপনি… কে?”

মহিলাটা হাসলেন। “এই বাড়িতে সবাই নাম ভুলে গেছে। তুমিও ভুলে যাবে।”

ঘরের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। রিমির মনে হচ্ছিল তার মাথার ভেতর কেউ ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে।

“আপনি কি নন্দিতা?”

মহিলাটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ওরা বলেছিল আমি মরে গেছি।”

“তাহলে?”

“মৃত মানুষরা কি অপেক্ষা করে?”

কথাটা শেষ হতেই ঘরের দরজা হঠাৎ নিজে থেকে বন্ধ হয়ে গেল।

ধাম।

রিমি চমকে উঠল।

মোবাইলের টর্চ নিভে গেল।

পুরো ঘর অন্ধকার।

তারপর খুব কাছে কারও নিঃশ্বাসের শব্দ।

একেবারে কানের পাশে।

“ওরা আমাকে খুঁজে পায়নি কারণ আমি এখনও এখানেই আছি।”

রিমি চিৎকার করে উঠল। সে অন্ধকারে দরজা খুঁজতে লাগল। হাত কাঁপছে। ঠিক তখনই তার আঙুলে ঠান্ডা কিছু ছুঁয়ে গেল।

মানুষের হাত।

বরফের মতো ঠান্ডা।

অন্ধকারের ভেতর নন্দিতার গলা শোনা গেল—
“জানালাটা কেউ খুলতে পারে না।”

তারপর ফিসফিস করে—
“ভেতর থেকে ছাড়া।”

রক্তের দাগ

রিমি কীভাবে সেদিন দোতলার ঘর থেকে নীচে নেমে এসেছিল, পরে আর স্পষ্ট মনে করতে পারেনি। শুধু মনে আছে, দরজাটা হঠাৎ খুলে গিয়েছিল। তারপর সে প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছিল। সারারাত আলো জ্বালিয়ে বসে ছিল। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয় হলো— তার মনে হচ্ছিল নন্দিতা এখনও কাছেই আছে। যেন ঘরের অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে।

ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল।

আর তখনই সে স্বপ্নটা দেখল।

একটা বন্ধ ঘর।

মেঝেতে ছড়িয়ে রক্ত।

একজন মহিলা কাঁদছেন।

আর একজন পুরুষ খুব ধীরে বলছে—
“কেউ তোমাকে খুঁজে পাবে না।”

রিমির ঘুম ভাঙল নিজের চিৎকারে।

সকালের আলো ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু তার শরীর এখনও ঠান্ডা। সে মুখে জল দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই থেমে গেল।

তার গলার ডানদিকে সরু কালচে একটা দাগ।

ঠিক নন্দিতার গলার মতো।

রিমির হাত কাঁপতে লাগল।

সে দৌড়ে নীচে নেমে সরযুবালা দেবীর ঘরে গেল। বৃদ্ধা তখন জানালার পাশে বসে ছিলেন। রিমিকে দেখেই যেন সব বুঝে গেলেন।

“তুমি ওপরে গিয়েছিলে।”

রিমি কাঁপা গলায় বলল, “ওখানে একজন আছে।”

বৃদ্ধা চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি বলেছিলাম।”

“নন্দিতা কী হয়েছিল?”

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর সরযুবালা দেবী ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

“নন্দিতা এই বাড়ির বড়বউ ছিল। খুব শান্ত মেয়ে। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই বদলে যেতে থাকে। মাঝরাতে একা কথা বলত। বলত, দোতলার জানালার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে। সবাই ভাবত ওর মাথার সমস্যা হয়েছে।”

“তারপর?”

“একদিন হঠাৎ বলল, বাড়ির ভেতরে একটা ঘর আছে যেটা কেউ দেখতে পায় না।”

রিমির বুক ধক করে উঠল।

“কোন ঘর?”

বৃদ্ধা ধীরে মাথা নাড়লেন। “সেটাই তো কেউ জানে না।”

তিনি বলতে লাগলেন, নন্দিতা নাকি বারবার বলত বাড়ির ভেতরে কেউ হাঁটে। বিশেষ করে রাত দুটোর পর। একসময় সে দাবি করতে শুরু করে, কেউ তাকে ডাকছে। জানালার ওপার থেকে।

“অরিন্দম বিশ্বাস করত না,” বৃদ্ধা ফিসফিস করলেন। “ওদের মধ্যে খুব ঝগড়া হতো।”

“সেদিন রাতে কী হয়েছিল?”

সরযুবালা দেবীর ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“অনেক চিৎকার শুনেছিলাম। তারপর আচমকা সব চুপ।”

“পুলিশ?”

“ওরা এসেছিল। দোতলার ঘরে রক্ত পেয়েছিল। কিন্তু নন্দিতার দেহ আর পাওয়া যায়নি।”

“অরিন্দম?”

“দু মাস পরে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তারপর আর ফেরেনি।”

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

ঠিক তখনই ওপর থেকে শব্দ এল।

টক।

টক।

টক।

কেউ হাঁটছে।

দুজনেই থেমে গেল।

সরযুবালা দেবীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “দিনের বেলায় ও কখনও হাঁটে না।”

রিমির বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ভয় জমতে লাগল।

সে সিঁড়ির দিকে তাকাল।

শব্দটা আবার হলো।

ধীরে।

ভারী।

যেন কেউ খালি পায়ে হাঁটছে।

তারপর আচমকা ওপর থেকে একটা জিনিস গড়িয়ে পড়ল সিঁড়ি দিয়ে।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

রিমি এগিয়ে গিয়ে দেখল— একটা পুরোনো ফটোগ্রাফ।

সে তুলে নিল।

ছবিতে নন্দিতা দাঁড়িয়ে আছে দোতলার জানালার সামনে। পাশে একজন পুরুষ— সম্ভবত অরিন্দম। কিন্তু ছবিটার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশ ছিল পেছনে।

জানালার কাঁচের ওপারে আরও একজন দাঁড়িয়ে।

ফ্যাকাশে মুখ।

অস্বাভাবিক লম্বা হাত।

আর সেই মুখটা নন্দিতার নয়।

রিমি ছবিটা হাতে নিয়েই জমে গেল।

ঠিক তখনই ওপর থেকে খুব আস্তে একটা হাসির শব্দ ভেসে এলো।

মহিলার হাসি।

তারপর ফিসফিস—

“ও আমাকে একা রেখে গেছে…”

অদৃশ্য ঘর

সেই দিনটার পর বাড়িটার ভেতরের বাতাস যেন বদলে গেল। আগে শুধু রাতে ভয় লাগত, এখন দিনের বেলাতেও রিমির মনে হচ্ছিল বাড়ির দেওয়ালগুলো নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কোথাও কেউ নেই, তবু করিডোরে হাঁটার সময় মনে হয় পেছনে আরেক জোড়া পা এগোচ্ছে।

ফটোগ্রাফটা সে বারবার দেখছিল।

নন্দিতা।

অরিন্দম।

আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অস্বাভাবিক মুখ।

ছবিটা পুরোনো হলেও একটা বিষয় স্পষ্ট ছিল— পেছনের মুখটা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছিল।

মানুষের মতো নয়।

কেমন যেন টানা, বিকৃত হাসি।

সেদিন রাতে তুহিনকে ফোন করেছিল রিমি। সব শুনে তুহিন বলল, “আমি কাল আসছি।”

“এসব মজা নয়।”

“আমি মজা করছি না। ওই বাড়ির ইতিহাস নিয়ে আগে পড়েছিলাম। কিন্তু একটা জিনিস তখনও বুঝিনি।”

“কী?”

“চৌধুরী ভিলায় এর আগেও একজন নিখোঁজ হয়েছিল।”

রিমির বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কে?”

“অরিন্দমের প্রথম স্ত্রী।”

রিমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। “কিন্তু খবরের কাগজে তো—”

“কোথাও লেখা হয়নি। পরিবার চাপা দিয়েছিল। প্রায় কুড়ি বছর আগে।”

ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী লাগতে শুরু করল।

তুহিন ফিসফিস করে বলল, “লোকজন বলে বাড়িটার দোতলায় একটা ঘর আছে যেটা সবসময় জায়গা বদলায়।”

“মানে?”

“যে ঘরকে বাইরে থেকে দেখা যায় না।”

রিমির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। নন্দিতাও তো একই কথা বলেছিল।

রাত বাড়ছিল। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তুহিন ফোন কেটে দেওয়ার আগে বলল, “আজ রাতে দরজা বন্ধ রাখিস। আর যদি আবার ডাক শুনিস, সাড়া দিবি না।”

কিন্তু মাঝরাতের পর সেই ডাক আবার এলো।

খুব আস্তে।

“রিমি…”

সে ঘুম থেকে উঠে বসল।

ঘর অন্ধকার। কিন্তু এবার শব্দটা একেবারে দরজার ওপাশ থেকে।

“রিমি… দরজা খোলো…”

গলাটা নন্দিতার।

তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে নড়ল না।

তারপর আবার।

“আমি একা…”

কণ্ঠস্বরটা এবার কাঁদছিল।

রিমির মায়া লাগল। ভয়ও লাগছিল। কয়েক সেকেন্ড পরে সে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

দরজার নীচে ছায়া দেখা যাচ্ছে।

কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

“আপনি কী চান?” রিমি কাঁপা গলায় বলল।

বাইরে কিছুক্ষণ চুপ।

তারপর খুব ধীরে উত্তর এলো—
“ওই ঘরটা খুঁজে বের করো।”

“কোন ঘর?”

“যেখানে ও আমাকে রেখেছে।”

রিমির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে একটা প্রচণ্ড শব্দ এলো।

ধামমম।

যেন ভারী কিছু পড়ে গেল।

তারপর সারা বাড়ি নিস্তব্ধ।

দরজার ওপাশের ছায়াটাও মিলিয়ে গেছে।

রিমি আর থাকতে পারল না। সে মোবাইলের টর্চ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই বুঝল কিছু একটা বদলেছে।

করিডোরটা আগের চেয়ে লম্বা।

অনেক লম্বা।

সে থেমে গেল।

এত বড় তো ছিল না।

দেওয়ালের পুরোনো ছবিগুলো একটার পর একটা ঝুলছে। আর সব ছবির মানুষদের চোখ যেন তার দিকে তাকিয়ে।

টক।

টক।

টক।

করিডোরের শেষ থেকে শব্দ আসছে।

রিমি ধীরে এগোতে লাগল।

দোতলার সেই ঘরের দরজা এবার পুরো খোলা। ভেতরে অন্ধকার। কিন্তু ঘরের পাশের দেওয়ালে আগে যে জায়গাটা ফাঁকা ছিল, সেখানে এখন আরেকটা দরজা দেখা যাচ্ছে।

কালো কাঠের।

ভেজানো।

যেন বহু বছর কেউ খোলেনি।

রিমির নিঃশ্বাস আটকে গেল।

এটাই কি সেই অদৃশ্য ঘর?

সে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে ছুঁতেই বুঝল কাঠটা ভেজা।

জলের মতো নয়।

আঠালো।

মোবাইলের আলো ফেলতেই তার গা কাঁটা দিয়ে উঠল।

দরজার হাতলে শুকনো রক্ত লেগে আছে।

ঠিক তখনই পেছনে খুব আস্তে একটা গলা শোনা গেল।

“ও এখনও ভেতরে আছে।”

রিমি ঘুরে দাঁড়াল।

নন্দিতা দাঁড়িয়ে।

একেবারে কাছে।

আজ তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

গলার কাটা দাগটা আরও গভীর। চোখের নীচে কালো ছোপ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর— তার পায়ের নীচে ছায়া নেই।

নন্দিতা ধীরে হাত তুলল।

কালো দরজাটার দিকে ইশারা করল।

“খুলো।”

দেওয়ালের ওপাশে

রিমির হাত কাঁপছিল। কালো দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল যেন পুরো বাড়িটা নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে। করিডোর নিস্তব্ধ। শুধু কোথাও জল পড়ার টুপটাপ শব্দ।

নন্দিতা স্থির চোখে তাকিয়ে আছে।

“খুলো,” সে আবার বলল।

কণ্ঠস্বরটা এবার মানুষের মতো শোনাল না। যেন একাধিক গলা একসঙ্গে ফিসফিস করছে।

রিমি ধীরে হাত বাড়াল। দরজার হাতলটা বরফের মতো ঠান্ডা। আঙুল ছোঁয়াতেই ভেতর থেকে একটা মৃদু শব্দ এলো।

ঠক।

যেন কেউ ভেতর থেকে দরজায় আঘাত করল।

রিমির বুক ধক করে উঠল।

“ওখানে কে আছে?” সে ফিসফিস করে বলল।

নন্দিতা হাসল।

“যাকে ওরা লুকিয়ে রেখেছে।”

তারপর হঠাৎ করিডোরের সব আলো নিভে গেল।

পুরো দোতলা অন্ধকার।

রিমির মোবাইলের স্ক্রিন ঝিকমিক করতে লাগল। আলো কমে যাচ্ছে। ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে খুব আস্তে কারও কান্নার শব্দ ভেসে এলো।

মহিলার কান্না।

দমবন্ধ করা।

যেন কেউ বহু বছর ধরে কাঁদছে।

রিমির মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। ভয় তাকে পিছিয়ে যেতে বলছিল। কিন্তু কৌতূহল আরও গভীর। সে ধীরে দরজাটা ঠেলে খুলল।

ক্যাঁচ…

একটা পচা গন্ধ বেরিয়ে এলো। পুরোনো, ভিজে, মৃত গন্ধ।

ভেতরে ছোট্ট একটা ঘর।

জানালা নেই।

দেওয়াল স্যাঁতসেঁতে।

মেঝেতে ধুলো জমে আছে। কিন্তু ধুলোর ওপর স্পষ্ট টানার দাগ। যেন ভারী কিছু বারবার টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের চেয়ার।

চেয়ারের পাশে শুকনো দড়ি।

রিমির গলা শুকিয়ে গেল।

হঠাৎ সে খেয়াল করল— দেওয়ালের একদিকে নখের আঁচড়।

শত শত।

যেন কেউ ভেতর থেকে বেরোতে চেয়েছিল।

মোবাইলের আলো ফেলতেই দেখা গেল আঁচড়ের মাঝখানে কিছু লেখা।

“ও আমাকে মেরেছে।”

রিমির শরীর জমে গেল।

ঠিক তখনই দরজাটা ধাম করে বন্ধ হয়ে গেল।

সে চিৎকার করে উঠল। দরজার দিকে ছুটে গিয়ে টানতে লাগল। খুলছে না।

অন্ধকার ঘরের ভেতর হঠাৎ ফিসফিস শব্দ শুরু হলো।

চারপাশ থেকে।

“ও মিথ্যে বলেছিল…”

“ও বলেছিল কেউ জানবে না…”

“ও বলেছিল আমি পাগল…”

রিমি হাঁপাচ্ছিল। শব্দগুলো যেন দেওয়ালের ভেতর থেকে আসছে।

তারপর সে অনুভব করল— ঘরে সে একা নেই।

ঠিক পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে।

বরফঠান্ডা নিঃশ্বাস ঘাড়ে লাগছে।

রিমি ধীরে ঘুরল।

একজন মহিলা।

কিন্তু তিনি নন্দিতা নন।

মুখ বিকৃত।

চোখদুটো ফাঁকা গর্তের মতো।

গলায় দড়ির দাগ।

চুল ভেজা।

মহিলাটা ধীরে মুখ খুলল।

“ও কোথায়?”

রিমি পিছিয়ে গেল। “কে?”

“অরিন্দম।”

ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ আরও নেমে গেল। দেওয়াল থেকে জল পড়তে শুরু করেছে। সেই জলের রং কালচে।

মহিলাটা এগিয়ে আসছিল।

“ও বলেছিল আমাকে ভালোবাসে…”

তার কণ্ঠস্বরের সঙ্গে আরও অনেকগুলো কণ্ঠ মিশে যাচ্ছে।

“তারপর আমাকে বন্ধ করে রাখল…”

“শ্বাস নিতে পারছিলাম না…”

“অন্ধকার…”

“খুব অন্ধকার…”

রিমির কান দিয়ে যেন রক্ত বেরোবে। সে দরজায় ধাক্কা মারছিল। ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরেকটা গলা শোনা গেল।

“রিমি!”

তুহিন।

দরজা হঠাৎ খুলে গেল। রিমি প্রায় পড়ে বেরিয়ে এলো। তুহিন তাকে ধরে ফেলল।

“তুই এখানে কী করছিস!”

রিমি হাঁপাচ্ছিল। সে পিছনে তাকাল।

ঘরটা খালি।

কেউ নেই।

শুধু কাঠের চেয়ারটা দুলছে।

তুহিন টর্চের আলো ঘরের ভেতরে ফেলল। তারপর তার মুখ সাদা হয়ে গেল।

“এটা তো…” সে থেমে গেল।

“কী?”

তুহিন ধীরে দেওয়ালের দিকে আলো ফেলল।

সেখানে নতুন করে রক্ত দিয়ে একটা বাক্য লেখা হয়েছে।

“ও এখনও বাড়ির ভেতরেই আছে।”

ঠিক তখনই করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছায়া নড়ল।

লম্বা।

অস্বাভাবিক রোগা।

আর তার মুখটা অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

অরিন্দম চৌধুরী।

যে মানুষটা মারা যায়নি

করিডোরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে রিমির বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল। লম্বা, শুকনো চেহারা। সাদা পাঞ্জাবি। মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। কিন্তু চোখদুটো—

সম্পূর্ণ কালো।

তুহিন ফিসফিস করে বলল, “ও… মানুষ না।”

অরিন্দম স্থিরভাবে তাকিয়ে ছিল তাদের দিকে। তারপর খুব ধীরে হাসল।

সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না।

কেবল ঠোঁট দুটো অস্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে গেল।

করিডোরের বাতাস মুহূর্তে বরফঠান্ডা হয়ে উঠল।

রিমি পিছিয়ে এল। “ও তো… অনেক বছর আগে চলে গেছে!”

তুহিন উত্তর দিল না। তার হাত কাঁপছিল।

অরিন্দম এবার ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল তাদের দিকে।

টক।

টক।

টক।

খালি পায়ের শব্দ।

কিন্তু অদ্ভুত বিষয়— তার পা মেঝেতে পুরোপুরি ছুঁচ্ছিল না। যেন সামান্য ভেসে হাঁটছে।

তুহিন হঠাৎ রিমির হাত ধরে টান দিল। “দৌড়!”

দুজন একসঙ্গে সিঁড়ির দিকে ছুটল। পেছন থেকে পায়ের শব্দ আসছে। দ্রুত। আরও দ্রুত।

টকটকটকটক।

রিমি একবার পেছনে তাকিয়েছিল।

অরিন্দম আর মানুষটার মতো নেই।

তার শরীর অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে গেছে। হাতদুটো প্রায় মেঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে। মুখের চামড়া টানটান। আর চোখের জায়গায় শুধু কালো ফাঁকা।

দুজন প্রায় পড়ে যেতে যেতে নীচে নেমে এল।

ঠিক তখনই ওপর থেকে প্রচণ্ড শব্দ হলো।

ধামমম।

যেন পুরো দোতলায় কিছু ভেঙে পড়ল।

তারপর আচমকা সব চুপ।

তুহিন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এই বাড়িতে কিছু একটা আটকে আছে।”

রিমি কাঁপা গলায় বলল, “ওগুলো কী?”

তুহিন উত্তর দেওয়ার আগে সরযুবালা দেবীর দরজা খুলল। বৃদ্ধা যেন আগেই সব জানতেন। তাদের দেখে তিনি ফিসফিস করে বললেন, “ও জেগে উঠেছে।”

“ও কে?” তুহিন জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধা ধীরে বসে পড়লেন। তারপর বহু বছরের জমে থাকা ভয় নিয়ে বলতে শুরু করলেন।

“অরিন্দম ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুত ছিল। এই বাড়ির দোতলায় একা খেলত। বলত, জানালার ওপাশে একজন বন্ধু আছে। আমরা ভেবেছিলাম কাল্পনিক।”

“তারপর?” রিমি জিজ্ঞেস করল।

“বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ও বদলাতে থাকে। মাঝরাতে কথা বলত। একা হাসত। তারপর একদিন বলল, বাড়ির ভেতরে একটা ‘ঘর’ আছে যেখানে মৃত মানুষরা থাকে।”

তুহিন চুপচাপ শুনছিল।

“প্রথম বউ আসার পর থেকেই সমস্যা শুরু হয়,” বৃদ্ধা বললেন। “মেয়েটা কয়েক মাসের মধ্যেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বলত, অরিন্দম রাতে তাকে সেই ঘরে নিয়ে যায়।”

“তারপর সে নিখোঁজ হয়ে যায়,” তুহিন ফিসফিস করল।

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।

“আর নন্দিতা?”

সরযুবালা দেবীর চোখে জল এসে গেল। “নন্দিতা পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু ও পারেনি।”

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

ঠিক তখনই বাড়ির ওপরের দিক থেকে খুব আস্তে গুনগুন গান ভেসে এলো।

“ঘুম ঘুম চাঁদ…”

রিমির গা কাঁটা দিয়ে উঠল।

বৃদ্ধা আতঙ্কে ফিসফিস করলেন, “আজ ও দরজা খুলে ফেলেছে।”

“কোন দরজা?”

“যেটা খোলা উচিত নয়।”

হঠাৎ পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল।

দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়তে লাগল। ওপর থেকে মহিলাদের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। অনেকগুলো কণ্ঠ একসঙ্গে।

রিমি দেখল সিঁড়ির দেওয়ালে জল গড়িয়ে পড়ছে।

না।

জল নয়।

গাঢ় লাল রক্ত।

তুহিন পিছিয়ে গেল। “আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”

ঠিক তখনই সদর দরজা নিজে থেকে ধাম করে বন্ধ হয়ে গেল।

বাইরে ঝড় শুরু হয়েছে।

ঘরের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

অন্ধকারের ভেতর ওপরতলা থেকে ধীরে ধীরে কারও পায়ের শব্দ নামতে শুরু করল।

টক।

টক।

টক।

আর সেই সঙ্গে একটা পুরুষ কণ্ঠ—

“এবার কেউ যাবে না।”

জানালার ওপাশে

পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেছে। বাইরে ঝড়ের শব্দ। পুরোনো জানালাগুলো কাঁপছে। আর সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে কেউ নেমে আসছে।

টক।

টক।

টক।

প্রতিটা শব্দ যেন রিমির বুকের ভেতর আঘাত করছিল।

তুহিন মোবাইলের টর্চ জ্বালাতে গেল, কিন্তু স্ক্রিন বারবার নিভে যাচ্ছে। সরযুবালা দেবী ঠাকুরঘরের সামনে বসে কাঁপা গলায় মন্ত্র পড়ছিলেন।

তারপর সিঁড়ির অন্ধকারে একটা ছায়া দেখা গেল।

অরিন্দম।

কিন্তু এবার তার চেহারা আরও ভয়ঙ্কর। মুখের চামড়া যেন গলতে শুরু করেছে। চোখের ভেতর গভীর কালো গর্ত। ঠোঁটের কোণে টানটান হাসি।

সে ধীরে বলল, “ওরা এখনও কথা বলে।”

কণ্ঠস্বরটা মানুষের মতো নয়। যেন অনেকগুলো গলা একসঙ্গে।

তুহিন চিৎকার করল, “তুমি কী করেছিলে তাদের সঙ্গে!”

অরিন্দম মাথা কাত করল। “আমি কিছু করিনি। ঘরটাই ওদের চেয়েছিল।”

“কোন ঘর?”

অরিন্দম ধীরে সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল। যেন বহুদিনের ক্লান্তি তার শরীরে। তারপর ফিসফিস করে বলল—

“বাড়িটার নিচে একটা পুরোনো কক্ষ আছে। ইংরেজ আমলেরও আগে। চৌধুরীরা ওটা বন্ধ করে দিয়েছিল। বলত, ওখানে যারা মারা যায় তারা বেরোতে পারে না।”

রিমির নিঃশ্বাস আটকে গেল।

“তুমি দরজা খুলেছিলে?”

অরিন্দম হাসল।

“ছোটবেলায় জানালার ওপাশে ওদের দেখতাম। ওরা ডাকত আমাকে। বলত, একা লাগছে।”

বাড়ির ওপরতলা থেকে আচমকা মহিলাদের কান্না ভেসে এলো।

অরিন্দম চোখ বন্ধ করল।

“প্রথমবার দরজা খোলার পর আর বন্ধ করতে পারিনি।”

“তুমি তোমার স্ত্রীদের মেরেছ!” তুহিন চিৎকার করল।

অরিন্দমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“আমি না।”

তারপর খুব ধীরে সে মাথা তুলল।

“ওরা।”

ঠিক তখনই দোতলার দিক থেকে প্রচণ্ড শব্দ এলো।

ধামমমম।

যেন সব দরজা একসঙ্গে খুলে গেছে।

তারপর মহিলাদের ফিসফিস—

“ওকে নিয়ে এসো…”

“ওকে নিচে নিয়ে এসো…”

“ও এখন আমাদের…”

রিমির শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল। সে অনুভব করছিল কেউ যেন তার মাথার ভেতরে কথা বলছে।

নন্দিতার গলা।

“জানালাটা খোলো…”

হঠাৎ সে বুঝতে পারল দোতলার জানালাটা এখনও খোলা।

বৃষ্টির হাওয়া ভেতরে ঢুকছে।

আর সেই জানালার ওপারে—

অনেকগুলো মুখ দাঁড়িয়ে।

ফ্যাকাশে।

স্থির।

সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে।

রিমি হাঁপাতে লাগল। সে চোখ সরাতে পারছিল না। মুখগুলো ধীরে ধীরে কাছে আসছিল। যেন জানালার ওপাশে আরেকটা পৃথিবী।

অরিন্দম ফিসফিস করল, “ওরা কাউকে ছাড়ে না।”

ঠিক তখনই সরযুবালা দেবী আচমকা উঠে দাঁড়ালেন।

“আজ শেষ করতে হবে।”

বৃদ্ধার গলায় এমন দৃঢ়তা আগে কেউ শোনেনি। তিনি একটা পুরোনো চাবি বের করলেন।

“নিচের কক্ষটা বন্ধ করতে হবে। না হলে পুরো বাড়িটা ওদের হয়ে যাবে।”

“কোথায় সেই কক্ষ?” তুহিন জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধা ধীরে সিঁড়ির নিচের অন্ধকারের দিকে আঙুল তুললেন।

“যেখানে কেউ তাকায় না।”

রিমি প্রথমবার খেয়াল করল— সিঁড়ির নিচে দেওয়ালের একটা অংশ অদ্ভুতভাবে ফুলে আছে। যেন ভেতরে ফাঁকা জায়গা।

ঠিক তখনই অরিন্দম হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।

“না!”

তার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। মুখের চামড়া আরও গলে যাচ্ছে।

“ওরা রাগ করবে!”

দেওয়ালের ভেতর থেকে প্রচণ্ড আঘাতের শব্দ এলো।

ধাম।

ধাম।

ধাম।

যেন শত শত মানুষ একসঙ্গে বেরোতে চাইছে।

সরযুবালা দেবী কাঁপা হাতে চাবিটা রিমির দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

“তুমিই পারবে।”

“আমি?”

“ওরা তোমাকে বেছে নিয়েছে।”

বাড়ির সব জানালা একসঙ্গে খুলে গেল।

ঝড়ের হাওয়া ভেতরে ঢুকে পুরো বাড়িটা কাঁপিয়ে তুলল।

আর দোতলার সেই জানালার ওপাশ থেকে নন্দিতার গলা ভেসে এলো—

“তাড়াতাড়ি করো…”

নিচের কক্ষ

চাবিটা হাতে নিয়েই রিমির মনে হলো ধাতব জিনিসটা অস্বাভাবিক গরম। যেন বহু বছর ধরে কারও হাতের অপেক্ষায় ছিল। বাড়ির ভেতর তখন এক ভয়ংকর শব্দ উঠেছে। দেওয়ালের ভেতর থেকে ধাক্কা। কান্না। ফিসফিস। আর তার মাঝখানে অরিন্দমের বিকৃত চিৎকার।

“দরজা খুলো না!”

তুহিন রিমির হাত শক্ত করে ধরল। “আমরা একসঙ্গে যাব।”

সিঁড়ির নীচের ফুলে ওঠা দেওয়ালটার সামনে গিয়ে রিমি থেমে গেল। কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, ওটা আসলে একটা লুকোনো দরজা। বহু বছরের চুনকাম আর কাঠের আলমারি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল।

দেওয়ালের ভেতর থেকে আবার শব্দ এলো।

ধাম।

ধাম।

ধাম।

এবার যেন কেউ নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে।

সরযুবালা দেবী ফিসফিস করলেন, “ওরা বেরিয়ে আসার আগে শেষ করো।”

রিমি কাঁপা হাতে চাবিটা ঢুকাল।

ক্যাঁচ…

দরজাটা ধীরে খুলতেই ভেতর থেকে পচা বাতাস বেরিয়ে এলো। নিচের দিকে সরু সিঁড়ি নেমে গেছে। সম্পূর্ণ অন্ধকার।

তুহিন মোবাইলের আলো ফেলল।

দেওয়ালজুড়ে পুরোনো লাল দাগ।

রক্ত।

তারা ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল। প্রতিটা ধাপ ভেজা। বাতাসে এমন একটা গন্ধ যেন বহু বছর ধরে কিছু পচে আছে।

নিচে পৌঁছে রিমি বুঝল এটা কোনো সাধারণ ঘর নয়।

একটা গোলাকার কক্ষ।

মাটির দেওয়াল।

চারদিকে অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা।

ঘরের মাঝখানে একটা কুয়োর মতো গভীর গর্ত।

আর গর্তের চারপাশে—

মানুষের হাড়।

অনেকগুলো।

রিমির গা শিউরে উঠল।

ঠিক তখনই ওপরে দরজা ধাম করে বন্ধ হয়ে গেল।

তুহিন চমকে উঠল। “কে বন্ধ করল!”

তারপর অন্ধকারে একটা হাসির শব্দ ভেসে এলো।

অরিন্দম।

“ওরা তোমাদের যেতে দেবে না।”

গলার শব্দটা চারদিক থেকে আসছে। যেন পুরো ঘরের ভেতর সে ছড়িয়ে আছে।

হঠাৎ কক্ষের দেওয়ালে আঁকা চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে লাল হয়ে জ্বলতে শুরু করল।

গর্তের ভেতর থেকে ঠান্ডা হাওয়া বেরোচ্ছে।

আর সেই সঙ্গে অসংখ্য ফিসফিস।

“নেমে আসো…”

“আমাদের সঙ্গে থাকো…”

“খুব একা লাগে…”

রিমির মাথা ঘুরছিল। সে গর্তটার দিকে তাকাতেই দেখল ভেতরে কিছু নড়ছে।

অন্ধকারের ভেতর শত শত মুখ।

মানুষের মুখ।

বিকৃত।

কান্নাভেজা।

সবাই উপরের দিকে তাকিয়ে আছে।

তারপর সে তাদের মধ্যে নন্দিতাকে দেখতে পেল।

নন্দিতা ধীরে বলল, “ও আমাকে ঠেলে ফেলেছিল।”

রিমির বুক জমে গেল।

“অরিন্দম?”

নন্দিতা মাথা নেড়ে হাসল। “ও ভাবছিল দরজা বন্ধ করলে সব শেষ হয়ে যাবে।”

গর্তের ভেতর থেকে আরও হাত বেরোতে শুরু করেছে।

কালচে।

লম্বা।

অস্বাভাবিক।

তুহিন পিছিয়ে এল। “আমাদের বেরোতে হবে!”

কিন্তু ঠিক তখনই ওপরে থেকে অরিন্দমের বিকৃত গলা ভেসে এলো—

“ওরা ক্ষুধার্ত।”

কক্ষের চারপাশে আচমকা ছায়াগুলো নড়তে শুরু করল।

দেওয়াল থেকে একের পর এক মহিলা বেরিয়ে আসছে।

ফ্যাকাশে মুখ।

গলায় দাগ।

ফাঁকা চোখ।

প্রথম স্ত্রী।

নন্দিতা।

আরও অনেকে।

তারা ধীরে ধীরে রিমিকে ঘিরে ধরল।

নন্দিতা এগিয়ে এসে খুব আস্তে বলল—

“একজনকে থাকতে হবে।”

“কেন?” রিমি কাঁপছিল।

“না হলে দরজা বন্ধ হবে না।”

তুহিন চিৎকার করল, “না!”

কিন্তু ঠিক তখনই অরিন্দমের হাসি পুরো কক্ষ কাঁপিয়ে দিল।

“এবার বুঝলে?”

হঠাৎ ওপরের মাটি ফেটে যেতে শুরু করল। পুরো বাড়ি কাঁপছে। গর্তের ভেতর থেকে শত শত হাত বেরিয়ে আসছে।

সরযুবালা দেবীর কণ্ঠ দূর থেকে ভেসে এলো—

“দরজা বন্ধ করো!”

নন্দিতা রিমির চোখের দিকে তাকাল।

প্রথমবার তার মুখে ভয় দেখা গেল।

“তাড়াতাড়ি…” সে ফিসফিস করল।

“ও উঠে আসছে।”

দোতলার জানালা

পুরো কক্ষটা তখন কাঁপছে। দেওয়ালের মাটি ঝরে পড়ছে। গর্তের ভেতর থেকে অসংখ্য হাত বেরিয়ে আসছে— লম্বা, পচা, অস্বাভাবিক। তাদের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে কিছু একটা ওপরে উঠছে।

কিছু একটা বিশাল।

অন্ধকার।

মানুষ নয়।

রিমির বুকের ভেতর নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছিল। চারপাশে মৃত মহিলাদের মুখ। নন্দিতা তার সামনে দাঁড়িয়ে। চোখে আতঙ্ক।

“দরজা বন্ধ করো,” সে আবার বলল।

“কীভাবে?” রিমি চিৎকার করল।

নন্দিতা ধীরে গর্তটার দিকে তাকাল।

“যে খুলেছে, তাকে ফিরতে হবে।”

ঠিক তখনই ওপর থেকে অরিন্দমের ভয়ংকর হাসি শোনা গেল।

“আমি তো অনেক আগেই মরে গেছি।”

তুহিন থেমে গেল। “কী?”

অন্ধকারের ভেতর অরিন্দমের ছায়া দেখা গেল। সে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। কিন্তু এখন আর মানুষটার শরীর মানুষের মতো নেই। বুক ফেটে ভেতরের কালো শূন্যতা দেখা যাচ্ছে। হাতদুটো অস্বাভাবিক লম্বা। চোখের জায়গায় নড়ছে অন্ধকার।

“প্রথম রাতে,” সে ফিসফিস করল, “ওরা আমাকে ডেকেছিল।”

সে হাসল।

“আমি ভেবেছিলাম আমি ওদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।”

নন্দিতা চোখ বন্ধ করল।

“কিন্তু ওরা আগে ওকেই নিয়েছিল,” সে বলল।

রিমি বুঝতে পারল সত্যিটা।

অরিন্দম বহু বছর আগেই মারা গেছে।

এই বাড়ির ভেতরে শুধু তার শরীরটা হাঁটছিল।

গর্তের ভেতর থেকে এবার সেই জিনিসটা উঠে এলো।

রিমি তাকিয়েই জমে গেল।

অসংখ্য মানুষের শরীর জোড়া লেগে তৈরি এক বিকৃত অন্ধকার দেহ। শত শত মুখ তার গায়ে আটকে আছে। কেউ কাঁদছে। কেউ হাসছে। কেউ ফিসফিস করছে।

আর তাদের মাঝখানে—

অরিন্দমের আসল মুখ।

বিকৃত।

পচে যাওয়া।

“ও আমাদের,” অসংখ্য গলা একসঙ্গে বলল।

কক্ষের বাতাস হঠাৎ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। তুহিন রিমিকে টেনে পিছিয়ে নিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মাটির নীচ থেকে একটা হাত উঠে তার পা ধরে ফেলল।

তুহিন পড়ে গেল।

“রিমি!” সে চিৎকার করল।

আরও হাত বেরিয়ে এসে তাকে টানতে লাগল গর্তের দিকে।

রিমি দৌড়ে গেল। কিন্তু নন্দিতা তাকে থামাল।

“সময় নেই।”

“আমি ওকে ফেলে যাব না!”

নন্দিতার চোখে জল চলে এলো।

“আমি-ও কাউকে ফেলে যেতে চাইনি।”

গর্তের ভেতরের জিনিসটা আরও ওপরে উঠছে। এখন প্রায় পুরো কক্ষ জুড়ে। তার ভেতর থেকে শত শত গলা একসঙ্গে ডাকছে—

“থেকে যাও…”

“থেকে যাও…”

“থেকে যাও…”

ঠিক তখনই সরযুবালা দেবীর কণ্ঠ ওপরে থেকে ভেসে এলো—

“জানালাটা বন্ধ করো!”

রিমি থেমে গেল।

দোতলার জানালা।

সবকিছুর শুরু ওখানেই।

নন্দিতা ধীরে মাথা নাড়ল। “ওটাই দরজা।”

কক্ষের দেওয়াল ফেটে যাচ্ছে। সময় শেষ।

রিমি শেষবার তুহিনের দিকে তাকাল। তুহিন তখনও হাতগুলো সরানোর চেষ্টা করছে।

“যাও!” সে চিৎকার করল।

রিমি দৌড়াতে শুরু করল।

অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে। পিছনে সেই জিনিসটার গর্জন। পুরো বাড়ি কাঁপছে। দেয়াল থেকে রক্ত ঝরছে।

দোতলায় পৌঁছে সে দেখল করিডোরের সব দরজা খুলে গেছে। প্রতিটা ঘরের ভেতরে অন্ধকারে কেউ দাঁড়িয়ে।

সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে।

দোতলার শেষের জানালাটা পুরো খোলা।

বাইরে ভয়ংকর ঝড়।

আর জানালার ওপাশে—

অন্তহীন অন্ধকার।

যেন আকাশ নেই।

শুধু গভীর শূন্যতা।

নন্দিতার গলা তার কানের পাশে শোনা গেল।

“বন্ধ করো।”

রিমি জানালার কাছে এগিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের ভেতর থেকে শত শত হাত বেরিয়ে এলো।

তার হাত চেপে ধরল।

টানতে লাগল বাইরে।

নিচে কোথাও তুহিনের চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

বাড়ি ভেঙে পড়ছে।

রিমি প্রাণপণে জানালার পাল্লা টানল।

একটা পাল্লা বন্ধ হলো।

অন্ধকার গর্জে উঠল।

আরও হাত বেরিয়ে এলো।

তার গলার দাগটা জ্বলতে শুরু করেছে।

নন্দিতা হঠাৎ তার পাশে এসে দাঁড়াল।

প্রথমবার তার মুখটা শান্ত লাগছিল।

“ধন্যবাদ,” সে ফিসফিস করল।

তারপর নন্দিতা নিজের দুহাতে জানালার দ্বিতীয় পাল্লাটা ঠেলে দিল।

ধামমম।

জানালা বন্ধ।

সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।

একটা বিকট চিৎকার চারদিক ভরে দিল।

তারপর—

সব চুপ।

ভোরবেলা লোকজন যখন চৌধুরী ভিলার সামনে জড়ো হয়েছিল, তখন বাড়িটার অর্ধেক ভেঙে পড়েছে। পুলিশ ধ্বংসস্তূপের ভেতর কাউকে খুঁজে পায়নি।

না রিমিকে।

না তুহিনকে।

না কোনো মৃতদেহ।

শুধু দোতলার সেই জানালাটা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।

আর তার কাঠের ওপরে ভেতর দিক থেকে নখ দিয়ে আঁচড় কাটা একটা বাক্য—

“এখনও কেউ তাকিয়ে আছে।”

WhatsApp-Image-2026-05-18-at-7.42.28-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *