Posted in

অগ্নিকুণ্ডের ভিতর

Spread the love

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়


প্রথম পর্ব

বৃষ্টিটা শুরু হয়েছিল সন্ধের একটু আগে। কলকাতা থেকে বোলপুরগামী লোকাল ট্রেনটা যখন ধীরে ধীরে প্রান্তরের ভিতর ঢুকছিল, জানলার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাঁপতে কাঁপতে নেমে আসছিল নিচে। ঈশানী সেন কাঁচের ওপারে তাকিয়ে ছিল অন্যমনস্কভাবে। পাঁচ ঘণ্টার যাত্রার পরে শরীর ক্লান্ত, কিন্তু তার ভিতরের অস্বস্তিটা ঘুমোতে দিচ্ছিল না। ব্যাগের ভিতরে রাখা পুরোনো ডায়েরিটার কথা বারবার মনে পড়ছিল। তার বাবার হাতের লেখা। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন আগে লেখা শেষ কয়েকটা পৃষ্ঠা। সেখানে শুধু একটাই শব্দ ঘুরে ফিরে এসেছে— “অগ্নিকুণ্ড।”

ট্রেন থামল। প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। রাত বাড়ছে। বৃষ্টির মধ্যে স্টেশনটার হলুদ আলোকে দূর থেকে মৃত মানুষের চোখের মতো লাগছিল। ঈশানী ছাতা খুলে নামতেই দেখল একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা। হাতে কেরোসিন লণ্ঠন। লোকটা এগিয়ে এসে বলল, “আপনি কি কলকাতা থেকে এসেছেন?”

ঈশানী একটু চমকে উঠল। “জি। কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?”

লোকটা উত্তর দিল না। শুধু বলল, “গাড়ি এনেছি। এই বৃষ্টিতে ওদিকের রাস্তা ভালো নয়।”

দ্বিতীয় পর্ব
দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”
তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।
“খুলবেন না।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”
ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”
লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”
দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”
হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”
সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।
ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”
“ভিতরে ঢোকা মানে?”
অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।
“ওটা কী?”
অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”
ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।
মানুষের গলা।
তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

দ্বিতীয় পর্ব
দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”
তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।
“খুলবেন না।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”
ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”
লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”
দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”
হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”
সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।
ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”
“ভিতরে ঢোকা মানে?”
অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।
“ওটা কী?”
অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”
ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।
মানুষের গলা।
তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

দ্বিতীয় পর্ব
দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”
তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।
“খুলবেন না।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”
ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”
লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”
দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”
হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”
সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।
ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”
“ভিতরে ঢোকা মানে?”
অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।
“ওটা কী?”
অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”
ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।
মানুষের গলা।
তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

দ্বিতীয় পর্ব
দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”
তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।
“খুলবেন না।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”
ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”
লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”
দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”
হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”
সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।
ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”
“ভিতরে ঢোকা মানে?”
অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।
“ওটা কী?”
অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”
ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।
মানুষের গলা।
তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

দ্বিতীয় পর্ব
দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”
তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।
“খুলবেন না।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”
ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”
লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”
দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”
হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”
সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।
ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”
“ভিতরে ঢোকা মানে?”
অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।
“ওটা কী?”
অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”
ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।
মানুষের গলা।
তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

দ্বিতীয় পর্ব
দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”
তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।
“খুলবেন না।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”
ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”
লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”
দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”
হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”
সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।
ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”
“ভিতরে ঢোকা মানে?”
অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।
“ওটা কী?”
অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”
ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।
মানুষের গলা।
তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

দ্বিতীয় পর্ব
দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”
তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।
“খুলবেন না।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”
ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”
লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”
দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”
হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”
সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।
ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”
“ভিতরে ঢোকা মানে?”
অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।
“ওটা কী?”
অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”
ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।
মানুষের গলা।
তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

শেষ

স্টেশন ছেড়ে গাড়িটা যখন কাঁচা রাস্তার দিকে ঢুকল, চারপাশের অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। দূরে দূরে তালগাছের মাথা বিদ্যুতের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য দেখা দিচ্ছিল আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল। লোকটা খুব কম কথা বলছিল। শুধু একবার বলল, “ওই বাড়ির কাছে রাতে জানলা খুলবেন না।”

“কোন বাড়ি?”

“যেখানে উঠবেন।”

ঈশানী আর প্রশ্ন করল না। তার মনে হচ্ছিল এই গ্রামের বাতাসের মধ্যেই যেন কোনো চাপা শব্দ আছে। এমন এক শব্দ যা ঠিক শোনা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে গাড়ি থামল। সামনে বিশাল এক ভাঙাচোরা জমিদারবাড়ি। কালো দেয়ালের গায়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। বাড়িটার একাংশ পুড়ে গেছে। পোড়া গন্ধ এখনও বাতাসে। ঈশানী গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই তার বুকের ভিতর হঠাৎ কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। কারণ এই বাড়িটাকে সে আগে দেখেছে।

স্বপ্নে।

একই ভাঙা বারান্দা। একই অন্ধকার জানলা। আর দোতলার শেষ ঘরের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা আগুনের মতো লাল একটা আলো।

“আপনার বাবা এসেছিলেন এখানে,” বৃদ্ধ লোকটা হঠাৎ বলল। “অনেক বছর আগে।”

ঈশানী ঘুরে তাকাল। “আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”

লোকটা উত্তর দিল না। শুধু বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “সবাই ফিরে যায় না।”

বৃষ্টির শব্দটা হঠাৎ আরও বেড়ে গেল।

বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল। পুরোনো কাঠ, ধুলো, পোড়া দেওয়াল আর বহুদিনের বন্ধ অন্ধকারের গন্ধ। একজন মধ্যবয়সী মহিলা এসে ঈশানীকে ঘর দেখিয়ে দিলেন। নাম কমলা। খুব কম কথা বলেন। শুধু বিছানায় চাদর পেতে দিতে দিতে বললেন, “রাতে যদি কারও হাঁটার শব্দ শুনতে পান, দরজা খুলবেন না।”

ঈশানী ক্লান্ত ছিল। কিন্তু ঘুম এল না। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। দূরে কোথাও শিয়ালের ডাক। সে ব্যাগ খুলে বাবার ডায়েরিটা বের করল। শেষ পাতায় কাঁপা হাতে লেখা—

“আগুন কখনও নিভে যায় না। ওরা তাকে জাগিয়ে রাখে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে দোতলার করিডোরে কারও হাঁটার শব্দ শোনা গেল।

ধীরে। ভারী। টেনে টেনে হাঁটার শব্দ।

ঈশানী স্থির হয়ে শুনতে লাগল। শব্দটা তার দরজার সামনে এসে থামল। তারপর কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নীরবতা।

হঠাৎ দরজার ওপারে খুব নিচু গলায় কেউ বলল—

“ঈশানী…”

সে জমে গেল। কারণ গলাটা তার বাবার।

দ্বিতীয় পর্ব

দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”

তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।

সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।

“খুলবেন না।”

সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”

ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”

লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”

দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”

অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”

হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”

ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”

সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।

হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।

পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।

কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।

ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।

“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।

ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।

“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”

“ভিতরে ঢোকা মানে?”

অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।

ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।

“ওটা কী?”

অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”

ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।

মানুষের গলা।

তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

দ্বিতীয় পর্ব
দরজার ওপারে আবার সেই গলা শোনা গেল। খুব আস্তে। যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। “ঈশানী… দরজা খোলো…”
তার বুকের ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। দশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মানুষের গলা এভাবে রাতদুপুরে শোনা সম্ভব নয়। এটা ভুল। নিশ্চয়ই ভুল। কিন্তু গলার ভিতরের সেই পরিচিত ক্লান্তি, শব্দের শেষে হালকা কাশি— সবকিছু এতটাই সত্যি যে ঈশানীর শরীর কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানলার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকে ঘরের মোমবাতির আলো দুলে উঠছে। দরজার ঠিক ওপাশে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাসের খুব ক্ষীণ শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ঈশানী হাত বাড়িয়ে কপাট ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।
“খুলবেন না।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। জানলার পাশে একজন দাঁড়িয়ে। কখন যে ঘরে ঢুকেছে বোঝাই যায়নি। লম্বা চেহারা। ভিজে সাদা পাঞ্জাবি। মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা অভিব্যক্তি। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। লোকটা আবার বলল, “যা শুনছেন, সেটা মানুষ নয়।”
ঈশানী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। “আপনি কে?”
লোকটা জানলার বাইরে তাকাল। “আমার নাম অদ্বৈত। এই বাড়ির মন্দির দেখাশোনা করি।”
দরজার ওপাশে তখনও মৃদু শব্দ হচ্ছে। যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠে ঘষছে। ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল। “ওটা কে?”
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এই বাড়ি মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। কখনও কখনও মৃত মানুষের কণ্ঠও।”
হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর সেই গলা— “আমি খুব ঠান্ডায় আছি, মা…”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল। এই কথাটা তার বাবা ছোটবেলায় মজা করে বলতেন। পৃথিবীর আর কেউ জানার কথা নয়। সে দরজার দিকে এগোতেই অদ্বৈত শক্ত হাতে তার কবজি ধরে ফেলল। “দেখুন।”
সে মোমবাতিটা তুলে দরজার নিচে ধরল। দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ছায়া দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার। অথচ গলাটা এখনও শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ শব্দ থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
কয়েক মুহূর্ত পরে করিডোরে আবার সেই ভারী পায়ের শব্দ শুরু হল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। যেন কেউ টেনে টেনে হাঁটছে। তারপর সব শান্ত।
ঈশানী ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছে। অদ্বৈত জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাতেই এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ আলোকিত হল। অদ্ভুত ফ্যাকাশে মুখ। চোখের নীচে গভীর কালি।
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার ডায়েরিটার কথা বলল। অগ্নিকুণ্ড শব্দটার কথা বলল। সব শুনে অদ্বৈতের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আপনার বাবা যা খুঁজছিলেন, সেটা খুঁজে পাওয়া উচিত নয়,” সে আস্তে বলল। “এই গ্রামে আগে এক তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল। তারা বিশ্বাস করত ভয় মানুষের আত্মাকে খুলে দেয়। ভয় যত গভীর হবে, তত সহজে মানুষের ভিতরে ঢোকা যায়।”
“ভিতরে ঢোকা মানে?”
অদ্বৈত উত্তর দিল না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ঈশানী লক্ষ্য করল বৃষ্টির মধ্যে দূরে, জমিদারবাড়ির পিছনের পোড়া অংশটার কাছে একটা ক্ষীণ লাল আলো জ্বলছে। আগুনের মতো।
“ওটা কী?”
অদ্বৈতের চোখ মুহূর্তে বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ অমাবস্যা নয়…”
ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল।
মানুষের গলা।
তারপর হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।

 

1000037682.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *