Bangla - ভূতের গল্প

শেষ বার্তা

Spread the love

রাজীব আচার্য


শহরের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙা টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি যেন এক মৃত স্মৃতিস্তম্ভ। আশপাশে আধুনিক উঁচু কাঁচের দালান উঠে গেছে, তবুও এই এক্সচেঞ্জ তার ভগ্নদশা নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে—চুপচাপ, অন্ধকার, আর ভৌতিক নীরবতা জড়িয়ে। লোহার গেটের মরচেধরা খাঁচা, দেওয়ালে উঠে আসা লতাগুল্ম, জানালার কাঁচ ভেঙে তৈরি হওয়া খালি ফাঁক—সব মিলিয়ে ভবনটি যেন সময়ের কাছে পরাজিত এক সৈনিক। দিনের বেলায় মানুষজন কদাচিৎ এর সামনে দিয়ে যায়, আর রাত নামলেই এই জায়গাটা একেবারেই শুনশান হয়ে পড়ে। একসময় এটাই ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র, হাজারো কল এখান দিয়ে যেত, অফিসঘরে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত কর্মীরা কাজ করত, যেন এক সুরেলা সিম্ফনি। কিন্তু সেইসব স্মৃতি এখন শুধু ভাঙা ইটের স্তূপে আর ধুলো জমা করিডোরে আটকে আছে। এক্সচেঞ্জটি যেন শহরের বুকে গজিয়ে ওঠা এক ভূতের বাড়ি, যাকে আর ছুঁতে চায় না কেউ।

২০২৫ সালের গ্রীষ্মে আসা ভয়াবহ ঝড়ই এর শেষ কফিনে পেরেক পুঁতে দেয়। ঝড়ের রাতে বজ্রপাত সরাসরি আঘাত করে ভবনের উপরিভাগে। বিশাল এক বিদ্যুতের ঝলকানি মুহূর্তের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল পুরনো তার আর যন্ত্রপাতিতে। ভেতরের সার্কিট প্যানেলগুলো পুড়ে যায়, টেলিফোন লাইনগুলো কেটে যায়, আর পুরো এক্সচেঞ্জ অকেজো হয়ে পড়ে। সেই রাতটায় আশেপাশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, কারও বাড়ির ছাদ উড়ে গিয়েছিল, কারও জানালার কাঁচ ভেঙে গিয়েছিল। পরদিন সকালে দেখা যায় টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি শুধু ধ্বংসস্তূপ নয়, তার ভেতরে ছড়িয়ে আছে অদ্ভুত এক কালচে পোড়া গন্ধ। সরকারী অফিস থেকে ঘোষণা এল—এই ভবন আর মেরামত করা সম্ভব নয়, এক্সচেঞ্জ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হলো। তারপর থেকে ভবনটা ক্রমে জনমানবশূন্য হয়ে গেল। শুধু বাতাস বইলে ভেতরের ফাঁপা কক্ষগুলো থেকে একধরনের হাহাকারের মতো শব্দ বেরোতে থাকত। শহরের লোকেরা একে ভূতের আস্তানা বলতে শুরু করল, আর সন্ধ্যার পর এ রাস্তা এড়িয়ে যাওয়া রীতি হয়ে গেল।

কিন্তু শহরের এই ভয় আর কুসংস্কারের মধ্যেই প্রথম ঘটনাটা ঘটে একদম নিঃশব্দ রাতে। রাত প্রায় বারোটা। ফাঁকা রাস্তায় সুজয় তার পুরনো ট্যাক্সি নিয়ে ফিরছিল গ্যারেজের দিকে। সেদিন কোনো যাত্রী ছিল না, শহর যেন নিদ্রিত, শুধু বাতাসে ভেসে আসছিল শুকনো পাতার খসখসানি। হঠাৎ যখন এক্সচেঞ্জের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই সে শুনতে পায় অচেনা এক শব্দ। প্রথমে ভেবেছিল বাতাসে দুলে ওঠা গেটের শব্দ হবে। কিন্তু না, শব্দটা ছিল স্পষ্ট, যেন কোথাও থেকে ভেসে আসছে একটানা রিং হওয়া টেলিফোনের আওয়াজ—ট্রিং ট্রিং ট্রিং। সুজয় প্রথমে থমকে দাঁড়ায়, কারণ এতদিন সে কখনো এই ভবন থেকে কোনো শব্দ শুনেনি। ভেতরে ঢুকে যাওয়া তার সাহসে কুলোয় না, কিন্তু গাড়ির হেডলাইটের আলোয় সে খেয়াল করে, ভবনের অন্ধকার জানালার ফাঁক থেকে যেন ক্ষীণ আলোর ঝলক বেরোচ্ছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে হতভম্ব হয়ে যায়, তারপর হঠাৎ ভয় তাকে গ্রাস করে। দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সোজা ছুটে যায় গ্যারেজের দিকে, কিন্তু সেই ফোন বাজবার শব্দটা তার কানে বাজতেই থাকে, যেন কেউ অচেনা দুনিয়া থেকে ডাক দিচ্ছে।

সেই রাতের পর থেকে সুজয়ের শান্তি যেন উধাও হয়ে গেল। সে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ নয়, এমন কিছু শুনেছে যা অন্যেরা বিশ্বাস করতে চাইবে না। ট্যাক্সিচালক জীবনে সে অনেক অদ্ভুত ঘটনা দেখেছে, রাতের রাস্তায় মাতাল ঝগড়া, দুর্ঘটনার আওয়াজ, কিংবা নিঃসঙ্গ যাত্রীদের গল্প—কিন্তু ভাঙা এক্সচেঞ্জের ভেতরে ফোন বাজা, এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভোরবেলা গ্যারেজে বসে সে ঘটনাটা এক-দু’জন সহকর্মীকে বলেছিল, তারা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল—“আরো মদ কম খাস সুজয়, রাতে ভ্রম হয়।” কিন্তু নিজের মনে সে জানে, সে কোনো ভ্রম শোনেনি, শব্দটা একেবারে পরিষ্কার ছিল। আরও অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, কিছুদিন পরপরই শহরের আরও কয়েকজন দাবি করল তারা ওই এক্সচেঞ্জের দিক থেকে একইরকম ফোন বাজবার শব্দ শুনেছে। কেউ কেউ নাকি বলেছে, ফোন ধরার পর ওপাশে প্রিয়জনের মৃত কণ্ঠ ভেসে এসেছে। এসব গুজব ছড়িয়ে পড়তেই সুজয় বুঝল, তার সেই রাতের অভিজ্ঞতা হয়তো ছিল এই রহস্যময় ঘটনার শুরু মাত্র। আর এই ভাঙা এক্সচেঞ্জ আবারও জীবিত হয়ে উঠতে চাইছে—কিন্তু সে জীবিত হওয়ার মানে কি, তা বোঝা বাকি রইল।

অনির্বাণ সেন শহরের বিশৃঙ্খলার মধ্যে একজন পরিচিত সাংবাদিক। সে বরাবরই এমন বিষয় খুঁজে বেড়ায়, যেগুলিতে রহস্য ও অস্বাভাবিকতা মিশে থাকে। শহরের মানুষ যখন “পরিত্যক্ত ভবন”-এর অদ্ভুত ঘটনার কথা শুনে আতঙ্কিত হচ্ছে, তখন অনির্বাণের কানে পৌঁছায় খবর—একটি মৃত মেয়ের ফোন কেউ পেয়েছে বলে দাবি করেছে। বিষয়টি তার কৌতূহলকে তীব্র করে তোলে। সে ভাবে, তার চলমান রিপোর্ট সিরিজ “শহরের পরিত্যক্ত স্থাপনার রহস্য”-এর সঙ্গে এই খবর দারুণভাবে মিশে যাবে। সিরিজটির জন্য সে আগেও অনেক ভগ্নদশা, পুরনো সিনেমাহল, অর্ধেক ভেঙে যাওয়া হাসপাতাল আর ফাঁকা কারখানার ছবি তুলেছে। পাঠকদের প্রতিক্রিয়া ছিল চমকপ্রদ, অনেকেই তাকে ‘আধুনিক কালের গোয়েন্দা সাংবাদিক’ বলে ডাকতে শুরু করেছিল। এই নতুন ঘটনার মধ্যে তাই সে এক অদ্ভুত সম্ভাবনা দেখতে পেল—একদিকে মানুষের আতঙ্ক, অন্যদিকে মৃত্যুর পরও জীবনের ছায়া থেকে যাওয়া কোনো মেয়ের ফোনকলের মতো রহস্যময় কাহিনি।

তদন্ত শুরু করতে অনির্বাণ খোঁজ করল কল্যাণী সেনগুপ্ত নামে এক মহিলাকে, যিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে, তার মেয়ে মৃত্যুর পরেও ফোন করেছিলেন। শহরে গুজব রটে গিয়েছিল, কিন্তু কল্যাণী সেনগুপ্ত সাহস করে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অনির্বাণ প্রথমেই তার ফ্ল্যাটে পৌঁছায়। অল্প আলো-আঁধারিতে ঢাকা এক পুরনো আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলায় কল্যাণীর বাসা। দরজা খুলে তাকে দেখা গেল শোকাহত কিন্তু দৃঢ়চেতা এক নারী হিসেবে। অনির্বাণ ভেতরে বসতেই তিনি চা পরিবেশন করেন, তবে তার চোখে এখনও কান্নার ছাপ স্পষ্ট। প্রশ্ন শুরু হতেই কল্যাণী কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরে ধীরে খুলে বলেন—“আমার মেয়ে তৃষা ছ’মাস আগে মারা গেছে। রোড অ্যাকসিডেন্টে। আমি নিজেই তাকে আগুনে দগ্ধ হতে দেখেছি। কিন্তু হঠাৎ, গত সপ্তাহে, রাত বারোটার সময় আমার ফোন বেজে ওঠে। নাম্বারটা ছিল আমার মেয়ের পুরনো নম্বর, যেটা তখনই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি শিউরে উঠেছিলাম। ফোন ধরতেই আমি স্পষ্ট শুনতে পাই ওর গলা। একেবারে তৃষার মতো। সে শুধু বলল—‘মা, আমি এখানে আছি।’ তারপর লাইন কেটে যায়।”

এই বর্ণনা শোনার পর অনির্বাণের শরীরেও একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় সে জানত, অনেক সময়ে মানুষ কল্পনাকে বাস্তব ভেবে ফেলে। কিন্তু কল্যাণীর বর্ণনা ছিল এতটাই স্বচ্ছ ও দৃঢ়, যেন সেখানে মিথ্যার কোনো স্থান নেই। তাছাড়া, তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করেননি—যা অনেকেই সাধারণত করেন না, কারণ সমাজে ‘পাগল’ তকমা লাগার ভয় থাকে। অনির্বাণ মনে মনে নোট নিচ্ছিল—একদিকে এই ঘটনার সামাজিক প্রভাব, অন্যদিকে পরিত্যক্ত ভবনের অদ্ভুত কাহিনির সঙ্গে এর যোগসূত্র। সে জিজ্ঞেস করল, “আপনার কি মনে হয়, এই ফোনকল কোনোভাবে ওই পরিত্যক্ত ভবনের সঙ্গে যুক্ত?” কল্যাণী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “তৃষা মৃত্যুর আগে সেই ভবনে ছবি তুলতে গিয়েছিল। ও বলেছিল, ওখানে নাকি অনেক গোপন কিছু লুকোনো আছে। আমি তেমন পাত্তা দিইনি। কিন্তু এখন মনে হয়, ওর মৃত্যু, আর এই ফোনকল—সবকিছুর সূত্র সেই ভবনের ভেতরেই।”

অনির্বাণ সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে। সাংবাদিক হিসেবে সে জানত, এই কাহিনিকে অতিপ্রাকৃত রহস্য হিসেবে উপস্থাপন করলে পাঠকের আগ্রহ তুঙ্গে উঠবে। কিন্তু একইসঙ্গে তার ভেতরে একটা তীব্র কৌতূহল জন্ম নিল—আসলে সত্যিই কি মৃত মানুষ ফোন করতে পারে? নাকি এখানে কোনো প্রযুক্তিগত প্রতারণা, কোনো দুষ্ট খেলা লুকিয়ে আছে? কল্যাণীর শোকাহত মুখ, ভরাট অথচ কাঁপা কণ্ঠস্বর, আর মৃত তৃষার অদৃশ্য ছায়া যেন তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। সে সিদ্ধান্ত নিল, এই ঘটনা শুধু রিপোর্ট নয়—এটি হবে তার নিজের অনুসন্ধান, তার নিজের লড়াই। সেই রাতে নিজের ডেস্কে বসে সে চেইন-স্মোকারের মতো একটার পর একটা সিগারেট ধরাল, আর ল্যাপটপে নোট লিখতে লাগল—“অধ্যায় দুই শুরু হলো। সাংবাদিকের কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর সীমার ওপারে।”

কল্যাণী সেনগুপ্তর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা অনির্বাণকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। শহরের ভেতরে এমন সব অদ্ভুত কাহিনি লুকিয়ে আছে, যা সাধারণ মানুষ হয়তো গুজব বলে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে তার কৌতূহল আরও বাড়িয়ে তোলে। এই রহস্যের গভীরে ঢুকতে গিয়ে সে যোগাযোগ করল এক বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে—মেঘলা দত্ত। মেঘলা মূলত শহরের আরবান ফোকলোর বা নগরকথা নিয়ে গবেষণা করে, পুরনো বই, স্থানীয় আখ্যান, কিংবদন্তি, এমনকি শহরের অন্ধকার গলি-ঘুপচির অশরীরী কাহিনি সংগ্রহ করে। একবার তার লেখা একটি প্রবন্ধ অনির্বাণ পড়েছিল, যেখানে তিনি লিখেছিলেন কলকাতার টেলিফোন লাইনে নাকি একসময় মৃত মানুষের কণ্ঠ শোনা যেত। তখন বিষয়টি পাঠ্যরূপেই মনে হয়েছিল, কিন্তু এখন, এই এক্সচেঞ্জের কাণ্ডকারখানা শুনে অনির্বাণ মনে করল মেঘলাই হয়তো সঠিক মানুষ। এক বিকেলে তারা দেখা করল কলেজ স্ট্রিটের এক পুরনো কফিহাউসে। মেঘলা বই আর কাগজপত্রে ভরা একটি ব্যাগ নিয়ে এসেছিল। তার চোখে চশমা, চুল খোঁপা করে বাঁধা, আর মুখে এক ধরণের স্থির দৃঢ়তা।

প্রথম কথোপকথনেই মেঘলা স্পষ্ট করে দিল যে সে ঘটনাটিকে নিছক গুজব বলে মনে করছে না। সে বলল, “শহরে ভূতুড়ে যোগাযোগের ইতিহাস অনেক পুরোনো। ব্রিটিশ আমলেই টেলিগ্রাফ অফিস থেকে নাকি মৃত সৈন্যদের বার্তা আসত। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় কয়েকজন টেলিফোন অপারেটর দাবি করেছিলেন, তারা মৃত আত্মীয়ের কণ্ঠ শুনেছেন। এগুলো কোনো রূপকথা নয়, স্থানীয় আখ্যানগুলোতে বারবার ফিরে আসে।” অনির্বাণ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আপনি বিশ্বাস করেন, এই এক্সচেঞ্জে সত্যিই মৃতরা ফোন করছে?” মেঘলা একটু হাসল। “বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়। আমি বলছি, এই শহরে এমন সব গল্প বারবার এসেছে। আর গল্পের পেছনে কোনো না কোনো সত্যি থাকে। হতে পারে প্রযুক্তির অজানা খেলা, হতে পারে আত্মার অস্তিত্বের ছায়া। কিন্তু ঘটনাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।” অনির্বাণ তার খাতায় দ্রুত লিখে রাখছিল প্রতিটি লাইন। তার সাংবাদিক সত্তা সন্দেহ করছিল, কিন্তু গবেষকের যুক্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তাকে নাড়া দিচ্ছিল।

তাদের কথোপকথন চলতে থাকল আরও গভীরে। মেঘলা জানাল, সে নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এইসব ঘটনাকে নিছক কৌতূহলের বিষয় হিসেবে নেয় না। ধীরে ধীরে তার গলা ভারী হয়ে এল। “আমার একটা ছোট বোন ছিল—অর্পিতা। দুই বছর আগে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। আমি তখন ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সময়মতো পৌঁছাতে পারিনি। সেই থেকে আমার মনে হয়, কিছু না কিছু অজানা সংযোগ থেকে যায় জীবিত আর মৃতের মধ্যে। অনেক রাতে, আমি ঘুমের মধ্যে কখনও কখনও ওর গলা শুনি। আমার যুক্তিবাদী মস্তিষ্ক বলে—এগুলো স্বপ্ন। কিন্তু হৃদয় বলে—ও এখনো কোথাও আছে, শুধু আমাদের ছোঁয়ার বাইরে।” অনির্বাণ গভীর মনোযোগে তাকিয়ে রইল তার দিকে। সাংবাদিক হিসেবে সে জানত, ব্যক্তিগত বেদনা অনেক সময় মানুষকে বিশ্বাসপ্রবণ করে তোলে। কিন্তু একইসঙ্গে, মেঘলার চোখে যে যন্ত্রণা সে দেখল, তা কোনো কল্পনার খেলা নয়। এই গবেষক শুধু তথ্য খোঁজেনি, নিজের জীবনের ক্ষতও বয়ে বেড়াচ্ছে। আর তাই সে ঘটনাটিকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

সেদিন কফিহাউস থেকে বেরিয়ে আসার সময় অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, এই রহস্য তার একার আর অনুসন্ধান নয়। সে জানে, যুক্তি আর প্রমাণ দিয়ে এই ধাঁধাঁর সমাধান করতে হবে, কিন্তু মেঘলার উপস্থিতি তার সামনে এক নতুন পথ খুলে দিল। মেঘলা শহরের লোককথা, প্রাচীন নথি, মানুষের ভয় আর কল্পনার গল্পগুলো জড়ো করে দেখছে ঘটনাটিকে, আর অনির্বাণ যুক্তি আর তথ্য দিয়ে খণ্ডন করার চেষ্টা করছে। দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি এক জায়গায় এসে মিলল। তবে দুজনের মধ্যেই এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হলো—কৌতূহল, বেদনা, আর উত্তর খোঁজার অদম্য তাগিদ। রাত নামতে নামতে তারা সিদ্ধান্ত নিল, একসঙ্গে তারা ওই ভাঙা এক্সচেঞ্জে যাবে। মৃতরা সত্যিই কি ফিরে আসছে, নাকি প্রযুক্তি ও প্রতারণার ফাঁদে আটকে আছে শহর—তার উত্তর তারা খুঁজে বের করবে। আর অনির্বাণ অনুভব করল, এ শুধু সাংবাদিকতার খোঁজ নয়, এক অচেনা পথে পা বাড়ানো, যেখানে জীবিত আর মৃতের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে।

টেলিফোন এক্সচেঞ্জের আধো-অন্ধকার কক্ষের ভেতরে বাতাসে যেন অন্যরকম এক ঘনত্ব ছিল। রাত নামার পরেও বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে আসছিল, কিন্তু ঘরের ভেতরে সময় থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। দীপ আর শুভায়ন বসে আছে টেবিলের একপাশে, চোখ নিবদ্ধ পুরোনো এক চশমাধারী মানুষের দিকে। লোকটির বয়স ষাটের কোঠায়, কিন্তু চোখে-মুখে ক্লান্তির সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। এ-ই মানুষ অরুণাভ মুখার্জী—পূর্বে এই টেলিফোন এক্সচেঞ্জের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। দীপ অনেক খোঁজাখুঁজি করেই তাঁকে খুঁজে বের করেছে। অরুণাভর কণ্ঠ ভাঙা ভাঙা হলেও প্রতিটি শব্দ যেন কোনো লুকোনো ভয়ের দরজা খুলে দেয়। তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—“তোমরা যেটাকে নতুন ঘটনা ভাবছো, আসলে তা অনেক পুরোনো। এই এক্সচেঞ্জে আগে থেকেই অদ্ভুত ত্রুটি দেখা দিত। অনেক সময় বিদ্যুৎ ছাড়াই হঠাৎ ফোন বাজত। প্রথমে ভেবেছিলাম যান্ত্রিক গণ্ডগোল, কিন্তু পরবর্তীতে বুঝলাম বিষয়টা শুধু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় ব্যাখ্যা করা যায় না।” তাঁর কণ্ঠস্বরের ফাঁকে ফাঁকে অস্বস্তি ঝরে পড়ছিল। শুভায়ন একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল, ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেসে উঠতে থাকল অরুণাভর ভয়ার্ত চোখের সামনে, আর দীপ সযত্নে তাঁর প্রতিটি কথা নোট করে নিচ্ছিল।

অরুণাভ মুখার্জীর গল্পে উঠে এল অতীতের স্মৃতি। আশি-নব্বই দশকে যখন এই এক্সচেঞ্জে ম্যানুয়াল সুইচিং ব্যবস্থার পরিবর্তে ইলেকট্রনিক সিস্টেম চালু হয়, তখন থেকেই শুরু হয় সমস্যার ঝামেলা। মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে সংযোগ এমন সব নম্বরের সঙ্গে হয়ে যেত, যা রেকর্ডে ছিল না। ফোন বাজত গভীর রাতে, অথচ কোনো লাইনে কারও উপস্থিতি পাওয়া যেত না। অরুণাভ ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো সিগন্যাল ওভারল্যাপ হচ্ছে বা মেশিনে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। কিন্তু যেটা তাঁদের ভড়কে দিয়েছিল, তা হলো—অনেক কর্মচারীই জানিয়েছিল, ওই ফোন ধরলে অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসত অচেনা কণ্ঠস্বর। কখনও সেটা একেবারে অস্পষ্ট গুঞ্জন, কখনও আবার একদম স্পষ্ট স্বরে ‘হ্যালো’ বলা। একজন অপারেটর তো একদিন অফিসেই কান্না করে ফেলেছিল—কারণ সে নাকি ফোনের ওপাশে তার মৃত মায়ের ডাক শুনেছিল। দীপ আর শুভায়নের দিকে তাকিয়ে অরুণাভ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “তখনই বুঝেছিলাম, বিষয়টা কেবল সার্কিট বোর্ডের নয়, এর ভেতরে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে।” তাঁর হাত সামান্য কাঁপছিল, টেবিলে রাখা জলের গ্লাস তিনি তুলে খালি করলেন এক ঢোকে, যেন নিজের আতঙ্ককে গিলে ফেলার চেষ্টা করছেন।

এরপর তিনি নীরব হয়ে গেলেন কিছুক্ষণ। বাইরে থেকে হাওয়া এসে জানালার শিক কাঁপিয়ে তুলছিল। অরুণাভের মুখে ছায়া পড়েছিল হলদেটে আলোয়। একটু পরে তিনি ফিসফিস করে বললেন—“আমি নিজেও একবার শুনেছিলাম এমন কণ্ঠ। অনেক বছর আগের কথা। অফিস থেকে রাত করে ফিরছিলাম, এক্সচেঞ্জের কন্ট্রোল রুমে শেষবারের মতো সবকিছু পরীক্ষা করছিলাম। হঠাৎ দেখি একটানা একটি ফোন বাজছে। তখন কোনো বিদ্যুৎ ছিল না—লোডশেডিং চলছিল পুরো এলাকায়। তবু সেই পুরোনো রোটারি ফোনের ঘণ্টা ঝনঝন করে বেজে উঠল। প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো ব্যাটারির অবশিষ্ট শক্তিতে কিছু হচ্ছে। কিন্তু যখন রিসিভারটা কানে নিলাম…” অরুণাভ থেমে গেলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছিল, চোখে ভেসে উঠছিল আতঙ্কের ঝিলিক। দীপ শান্তভাবে তাঁকে বলল, “আপনি শুনেছিলেন কার কণ্ঠ?” অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমার ছেলের। সেই ছেলে, যে বছর দুয়েক আগে এক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। ফোনের ওপাশ থেকে স্পষ্ট শুনেছিলাম—‘বাবা’। আমি ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিলাম, যেন রক্ত হিম হয়ে গেছে শরীরে। এরপর কোনো শব্দ আসেনি, শুধু নিস্তব্ধতা।” ঘরে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। শুভায়নের হাতে ধরা সিগারেট প্রায় নিভে এসেছে, কিন্তু সে খেয়াল করেনি।

অরুণাভর স্বীকারোক্তি শোনার পর দীপ বুঝল, এই কেস শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, এর পেছনে আরও গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে। পুরোনো এক্সচেঞ্জের দেয়াল, যন্ত্র, তারের ভেতরে যেন আটকে আছে অতীতের কোনো অদৃশ্য সত্তা। মানুষের ভয়, আকাঙ্ক্ষা আর হারানো সম্পর্কের প্রতিধ্বনি হয়তো সেখানে বন্দি হয়ে থেকে গেছে, আর সেই প্রতিধ্বনি মাঝেমধ্যে ফোনের মাধ্যমে ফিরে আসে জীবিতদের কাছে। দীপ নিজের মনে ভাবছিল, একে কি ব্যাখ্যা করা সম্ভব বিজ্ঞানের আলোকে? নাকি সত্যিই এটা অন্য কোনো জগতের ছায়া? অরুণাভকে শান্ত করার চেষ্টা করল সে, বলল, “আপনার অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে, এখানে যা ঘটছে তা কেবল যান্ত্রিক গোলযোগ নয়। আমাদের আরও গভীরে খুঁজে দেখতে হবে।” অরুণাভ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন, কিন্তু চোখে ভেসে উঠল এক অজানা আতঙ্ক—যেন তিনি আরও কিছু জানেন, কিন্তু তা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। শুভায়ন ধোঁয়ায় ভরা ঘরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “তাহলে এখানেই শুরু সেই রহস্যের অন্ধকার।” দীপ জানত, সামনের পথ সহজ নয়। পুরোনো ইঞ্জিনিয়ারের এই স্বীকারোক্তিই যেন তদন্তের এক নতুন দরজা খুলে দিল। এখান থেকে রহস্যের জাল আরও ঘন হয়ে আসবে, আর সেই জালে ধরা পড়বে অতীত আর বর্তমানের ভয়ঙ্কর যোগসূত্র।

রাত নামতেই এক্সচেঞ্জ বিল্ডিং যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে গেল। চারদিক ফাঁকা, অচেনা শূন্যতা, কেবল বাইরে রাস্তার এক-আধটা কুকুরের হাহাকার ভেসে আসছিল। অনির্বাণ, মেঘলা আর সুজয়—তিনজনেই একটা পুরনো ঘরে নিজেদের আশ্রয় নিল। টেবিল-চেয়ার, দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরনো ক্যালেন্ডার আর জং ধরা ফাইলের আলমারি এই ঘরের একমাত্র সঙ্গী। আলো বলতে কেবল ম্লান টিউবলাইট, যার ঝাপসা আলোতে ছায়ারা আরও গাঢ় হয়ে উঠছিল। সবাই চুপচাপ বসে আছে, যেন একে অপরের চোখে ভরসা খুঁজছে। বাইরে হাওয়া বইছে, জানলার ফাঁক দিয়ে সোঁ সোঁ শব্দ এসে কানে লাগছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল কেউ যেন করিডর দিয়ে হাঁটছে, অথচ দরজা খুলে তাকালে শূন্যতা ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। অনির্বাণ সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী তুলল, যেন মনকে স্থির রাখার চেষ্টা করছে। সে জানে এই রাতের অপেক্ষাই আসল পরীক্ষা, আর এখানেই হয়তো সেই রহস্যের প্রথম সূত্র মিলবে।

ঘড়ির কাঁটা যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে রাত বারোটার দিকে পৌঁছোল, তখন পরিবেশের নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে উঠল। সুজয় বিছানার উপর হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল, আর মেঘলা নিঃশব্দে চাদর মুড়ে বসেছিল জানলার ধারে। অনির্বাণ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন নির্দিষ্ট মুহূর্তের প্রতীক্ষায়। আর ঠিক তখনই—অপ্রত্যাশিতভাবে এক্সচেঞ্জ বিল্ডিংয়ের পুরনো ল্যান্ডলাইন ফোনটা বেজে উঠল। শব্দটা এত হঠাৎ আর তীক্ষ্ণ ছিল যে তিনজনেই চমকে উঠল। সাদা কালো রঙের সেই ফোন যেটা বহুদিন ধরে ব্যবহার হয়নি, তার রিসিভার যেন হঠাৎ কোনো অদৃশ্য হাত তুলতে চাইছে। অনির্বাণ দ্রুত উঠে গেল ফোন ধরতে। তার হাত কেঁপে উঠছিল না, কিন্তু চোখের ভেতরে ছিল স্পষ্ট উত্তেজনা। ফোন ধরতেই ভেসে এল এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর, ভাঙা টোনে যেন অর্ধেকটা মানুষি, অর্ধেকটা যান্ত্রিক। কণ্ঠ বলল—“আমরা ফিরে আসব।” শুধু এই তিনটি শব্দ, তবুও তার প্রতিধ্বনি যেন গোটা ঘরকে কাঁপিয়ে দিল। রিসিভার নামানোর আগেই ফোন লাইনটা কেটে গেল, আর ঘরটা আবার ভরে গেল এক শূন্য, আতঙ্কিত নীরবতায়।

মেঘলা আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। সে কাঁপা গলায় বলল, “এটা… এটা ভূত না তো, অনির্বাণ?” সুজয়ও গলা শুকিয়ে ফেলল, তার শরীরে এক অদ্ভুত শীতল স্রোত বইছিল। কিন্তু অনির্বাণের মুখে বিস্ময়ের ছাপ থাকলেও ভয় ছিল না। বরং তার চোখে ঝলসে উঠেছিল অনুসন্ধিৎসার আগুন। সে ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। যেন ভেতরে ভেতরে সে ভাবছে, এই কণ্ঠের পেছনে আসলেই কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে নাকি এ সবকিছু নিছক একটা সুপরিকল্পিত খেলা। সে মেঘলার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ভয় পেও না। ভূত যদি থেকেও থাকে, তারও একটা ইতিহাস আছে। আর ইতিহাস মানেই সত্য। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে সেই সত্যটা।” তার কথায় অল্প হলেও সাহস ফিরে পেল মেঘলা আর সুজয়। কিন্তু তবুও বাতাসের ভেতর যেন এক অদ্ভুত চাপা আতঙ্ক লুকিয়ে রইল, যা প্রতিমুহূর্তে তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল—এই জায়গায় কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটছে।

রাত এগোতে থাকল, কিন্তু আর কোনো ফোন বাজল না। তবে প্রত্যেকটা মিনিট যেন এক একটি ঘন্টার মতো লম্বা হয়ে উঠছিল। বাইরে বাতাসে ঝড়ো স্রোত বয়ে যাচ্ছিল, জানলার কাচ কাঁপছিল, মাঝে মাঝে দরজার পাল্লা ঠকঠক করে শব্দ করছিল। সুজয় অনেক চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারছিল না, মেঘলার হাতের আঙুল কাঁপছিল, আর অনির্বাণ নিঃশব্দে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছিল, চোখ স্থির ফোনটার দিকে। সে মনে মনে বুঝে ফেলেছিল—এই রাতের রহস্য এখানেই শেষ নয়, বরং এর শুরু মাত্র। সেই কণ্ঠস্বরের প্রতিশ্রুতি—“আমরা ফিরে আসব”—শুধু একটা ভয় দেখানো কথা নয়, এটা নিশ্চয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে কোনো বড়ো ঘটনার দিকে। রাতের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ একরকম নিশ্চিত হয়ে গেল, এ এক্সচেঞ্জ বিল্ডিং শুধু ভুতুড়ে গুজবের জায়গা নয়—এখানে লুকিয়ে আছে এমন এক অন্ধকার সত্য, যা ভোর হওয়ার আগে ধীরে ধীরে মাথা তুলতে শুরু করেছে। আর সে, মেঘলা আর সুজয়—তিনজনই এখন সেই অজানা অন্ধকারের প্রথম সাক্ষী।

শহর যেন হঠাৎ এক অদ্ভুত কৌতূহল আর ভয়ের ভেতর ঢুকে পড়ল। ভোরবেলা প্রথমে কয়েকজন মুদিখানার দোকানদার, তারপর রিকশাওয়ালা, এমনকি কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েরাও ফিসফিস করে বলতে শুরু করল—“মৃতরা নাকি ফিরে আসছে।” খবরটা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না; সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড আর রাস্তায় চায়ের দোকানের আড্ডা মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে গোটা শহর জেনে গেল। মানুষ ছুটে এল সেই জায়গায়—শহরের পুরোনো এক্সচেঞ্জ বিল্ডিংয়ের সামনে, যেখানে কিছুদিন ধরে রহস্যময় কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। ভিড় ক্রমেই বাড়তে লাগল, চোখেমুখে আতঙ্ক, বিস্ময় আর অদ্ভুত আশার ঝিলিক। অনেকেই বলল তারা তাদের মৃত প্রিয়জনের ডাক শুনেছে—কেউ বাবার গলা চিনেছে, কেউ হারানো ভাইয়ের, আবার কেউ অশ্রুসিক্ত হয়ে দাবি করল মায়ের কণ্ঠ ভেসে এসেছে সেই অদৃশ্য তারের ভেতর থেকে। হাওয়ায় কেমন এক গা-ছমছমে অস্থিরতা, যেন শহরটা অদৃশ্য অশরীরী ছায়ায় ভরে উঠছে।

কিন্তু সত্যি বলতে কেউই দীর্ঘ আলাপ করতে পারছে না। যারা দাবি করছিল প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের বয়ান অদ্ভুতভাবে মিলছে—প্রথমে এক পরিচিত ডাক, তারপর হয়তো দু-একটা বাক্য, তার পর হঠাৎ নিস্তব্ধতা। এক মুহূর্তে গলা শোনা গেল, পরের মুহূর্তেই কেবল স্ট্যাটিক শব্দ, ভাঙাচোরা আওয়াজ, যেন দূরে কোথাও থেকে বাতাসে কেটে আসছে। এক নারী কাঁদতে কাঁদতে বলছিল—“ও আমার ছেলেটা, ও-ই ডাকছিল আমাকে… কিন্তু আমি কিছু জিজ্ঞেস করতেই গলা মিলিয়ে গেল।” ভিড়ের ভেতরে কেউ ফিসফিস করছিল—“এটা হয়তো শহরের পুরনো ল্যান্ডলাইন নেটওয়ার্কের কোনো খেলা, অথবা ভূতের ছল।” আবার কারও গলায় ভরসাহীন বিশ্বাস—“মৃতরা ফিরে আসছে, আমরা আবার কথা বলতে পারব।” পুলিশের গাড়ি এসে ভিড় সামলাতে চেষ্টা করলেও লোকজন থামছিল না, বরং আরও বেশি সংখ্যায় ছুটে আসছিল। যেন এই গুজব তাদের ভেতরে সুপ্ত বিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলেছে যে মৃত্যু কোনো শেষ নয়।

সন্ধ্যা নামতেই এক্সচেঞ্জ বিল্ডিংয়ের চারপাশ আরও ঘন কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল, আর ভিড় যেন উন্মত্ততার দিকে গড়িয়ে গেল। শত শত মোবাইল ফোন একসাথে রেকর্ডিং চালাল, সবাই প্রমাণ রাখতে চাইছিল—কেউ যেন বলতে না পারে এটা নিছক কল্পনা। বাতাসে প্রতিধ্বনি হতে লাগল অদ্ভুত ভাঙা ভাঙা শব্দের, যেন অনেকগুলো কণ্ঠ একসাথে ভেসে আসছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। এক বৃদ্ধ হঠাৎই চিৎকার করে উঠলেন—“ও আমার স্ত্রীর গলা! আমি চিনেছি, আমি শুনেছি!” তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়াতে লাগল, ভিড় স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকাল। আবার এক মুহূর্তে কেউ ফোন হাতে কেঁপে উঠল—হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস নোটে ভেসে এসেছে মৃত বন্ধুর গলা। এসব ঘটনার প্রমাণ কারও কাছে স্পষ্টভাবে জমা থাকছিল না, তবু জনতার আবেগ থামছিল না। শহরের প্রত্যেকটি অলিগলিতে, বাসস্টপে, ট্রামে—শুধুই সেই কথার প্রতিধ্বনি ঘুরতে লাগল: “মৃতরা ফিরে আসছে।”

তবে সন্দেহ আর ভয়ের স্রোতও সমানভাবে বাড়ছিল। সবাই উপলব্ধি করছিল, এই কণ্ঠস্বরগুলো যতটা আশার, ততটাই ভয়েরও। মানুষ যাদের হারিয়েছে, তারা কি সত্যিই ফিরছে? নাকি অজানা কোনো শক্তি মানুষের আবেগকে নিয়ে খেলছে? বিজ্ঞানমনস্করা বলছিল এটা নিতান্তই টেলিকম নেটওয়ার্কের ত্রুটি, তবে তাদের গলার দৃঢ়তায়ও টান ছিল না। রাস্তায় আগরবাতি, ফুল, প্রদীপ জ্বালানো শুরু হলো—মানুষ বিশ্বাস করছিল আত্মারা কথা বলছে। কেউ দাঁড়িয়ে হাত জোড় করছিল, কেউ অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা করছিল আবার একবার প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা পাওয়ার আশায়। কিন্তু সেই অর্ধেক বাক্য, ভাঙাচোরা গলা আর হঠাৎ মিলিয়ে যাওয়া শব্দের রহস্য থেকেই যাচ্ছিল অমীমাংসিত। শহরের আকাশে যেন অদৃশ্য প্রশ্ন ঝুলে রইল—এই গুজব কি শুধুই গুজব, নাকি সত্যিই মৃত্যু আর জীবনের সীমানা ভেঙে গেছে? রাত বাড়তে থাকল, ভিড় কমল না, আর এক্সচেঞ্জের চারপাশে নেমে এল এক ভয়ংকর নৈঃশব্দ, যার ফাঁক দিয়ে বারবার ভেসে আসছিল মৃতদের অনিশ্চিত, ক্ষণস্থায়ী কণ্ঠ।

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। কলকাতার আকাশে ভারী মেঘের আস্তরণ নেমে এসেছে, চারদিক যেন চুপচাপ নিস্তব্ধ। কেবল মাঝে মাঝে দূরে হাউসফুল বাজারের রাস্তার কুকুরদের চিৎকার, আর ভাঙাচোরা বিদ্যুতের খুঁটির তারে বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ। এমনই রাতে অনির্বাণ ল্যাপটপ খুলে বসেছিল। মেঘলার মুখোমুখি। ঘরে আর কারো উপস্থিতি নেই। অনির্বাণ যুক্তি টেনে একের পর এক ব্যাখ্যা সাজিয়ে চলল—“শোনো, এগুলো সবই মানুষের তৈরি প্রযুক্তিগত কৌশল। ভূতপ্রেত, আত্মা—এসব কিছু নেই। আমাদের চোখের ভ্রম, কানে ধ্বনি প্রতিধ্বনি আর মস্তিষ্কের বিভ্রমই এসবের জন্ম দেয়।” সে উদাহরণ টানল—কিভাবে আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী অডিও ফ্রিকোয়েন্সি আর আলোর বিচ্ছুরণ দিয়ে ‘ভূতের উপস্থিতি’ তৈরি করেছিলেন পরীক্ষাগারে। সেই একই রকম শব্দ হয়তো এখানে শোনা যাচ্ছে। “তুমি ভেবো না আত্মারা আমাদের ডাকছে। এ তো নিছক প্রতারণা।” অনির্বাণের গলায় একধরনের দৃঢ়তা, যেন বিজ্ঞানই শেষ সত্য।

কিন্তু মেঘলার চোখে চোখ রাখলেই বোঝা যায় তার অবস্থান একেবারেই আলাদা। সে ধীরস্বরে বলল—“তুমি সবকিছু বিজ্ঞানের চোখে দেখছো, তাই আত্মার অস্তিত্ব মানতে পারছো না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই বাড়ির ভেতরে যে অদ্ভুত শব্দগুলো, যে শীতল হাওয়া, যে অদ্ভুত স্পর্শ অনুভব করছি—এসব কোনো যন্ত্র তৈরি করা নয়। আত্মারা কথা বলতে চাইছে। তারা কিছু জানাতে চাইছে।” মেঘলার গলার স্বর কেঁপে উঠল। তার কাছে ঘটনাগুলো নিছক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়, বরং অভিজ্ঞতা, অনুভূতি। সে বলল, “আমি রাতে স্পষ্ট শুনেছি, একটা মেয়ের কান্না। তুমি যদি তা কানে না পেয়ে থাকো, তবে তার মানে এই নয় যে তা ঘটেনি। আমি জানি, আত্মারা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।” অনির্বাণ তখন ব্যঙ্গ করে হেসে উঠল—“আচ্ছা, তাহলে পরেরবার রেকর্ড করে আমাকে শোনাবে। আমি দেখব সেটা কোনো ‘ফ্রিকোয়েন্সি নইজ’ নাকি সত্যিই তোমার বলা আত্মা।” তাদের কথোপকথন ধীরে ধীরে তর্কে রূপ নিল।

এই বিতর্কের মাঝেই, ঘরের কোণে চুপচাপ বসে থাকা কল্যাণী হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল। এতক্ষণ সে দু’জনের বিতর্ক শোনায় যেন চুপ ছিল, কিন্তু এবার আর নিজেকে আটকাতে পারল না। তার চোখ ভিজে গিয়েছিল, হাতদুটো কাঁপছিল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল—“ও আমার মেয়ে… আমি জানি, ও মারা গেলেও ফিরে আসবে। বাঁচতে হলে ফিরবেই। মা কি কখনো সন্তানের ডাক অস্বীকার করতে পারে? আমি তার কান্না শুনি প্রতিদিন, তোমরা শোনো না? প্রতিদিন রাত্তিরে সে আমাকে ডাকে, জানলার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। ও বলছে—‘মা, আমি ফিরতে চাই।’ তোমরা বিজ্ঞানের হিসেব কষো, বা আত্মার বিশ্বাস করো—আমার কানে তো স্পষ্ট বাজে সেই ডাক।” কল্যাণীর এই কথা ঘরের ভারী পরিবেশকে আরও ভারী করে তোলে। অনির্বাণ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বৈজ্ঞানিক যুক্তি যেন এখানে এসে থমকালো। একজন মায়ের অশ্রুসিক্ত বিশ্বাসকে কোনো সমীকরণ দিয়ে মাপা যায় না। মেঘলা আস্তে এসে কল্যাণীর কাঁধে হাত রাখল, যেন তার বিশ্বাসে সমর্থন দিল।

তর্ক, কান্না, আর নীরব রাতের অদৃশ্য চাপ—সব মিলিয়ে সেই রাতটা অন্য রকম হয়ে উঠল। অনির্বাণ জানালার বাইরে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল। তার মাথায় এখনও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু মেঘলার চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, আর কল্যাণীর বিশ্বাস তাকে ভাবাচ্ছে। হয়তো বিজ্ঞানের সব প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই। হয়তো আত্মাদের অস্তিত্বকে সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঘরের বাতাসে যেন এক অদৃশ্য স্রোত বইছিল, যা প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ভাবে নাড়া দিচ্ছিল। অনির্বাণ ধীরে সিগারেট ধরাল, ধোঁয়ার রেখা অন্ধকারে মিশে গেল। মেঘলা জানালার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—“তুমি যদি সত্যিই থাকো, তবে একটা চিহ্ন দাও।” আর কল্যাণী নিঃশব্দে প্রার্থনা করছিল—তার হারানো মেয়েটি কোনো না কোনো ভাবে যেন ফিরে আসে। সেই অদ্ভুত রাতে বিজ্ঞান ও বিশ্বাস মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল, আর মাঝখানে ঝুলে রইল অজানা সত্য।

অরুণাভ সিগারেটের ধোঁয়া একটুখানি আকাশে ভাসিয়ে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল এক্সচেঞ্জের ভেতরকার অন্ধকারে। ইট-সিমেন্টের পুরোনো দেওয়ালে ধুলো জমে রয়েছে, ভেতরে ঢুকলেই এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে লাগে। অনির্বাণ পাশে এসে দাঁড়াল, হাতে টর্চলাইট। আলো ফেলার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল—পুরোনো সুইচবোর্ড আর তারের গুচ্ছ, যেগুলো এক সময় কলের সংযোগ চালু রাখত। এখন এগুলো অব্যবহৃত, অথচ অরুণাভ এক ঝলকে দেখে নিল যে কয়েকটা লাইন এখনও সক্রিয়। “দেখছিস অনির্বাণ? এগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বহু বছর আগে। কিন্তু কে যেন এগুলো চালু করে রেখেছে,” অরুণাভের গলায় উদ্বেগের সুর। অনির্বাণ নিচু হয়ে তারগুলো পরীক্ষা করল, আর অবাক হয়ে খেয়াল করল—তাজা স্পর্শে কিছুটা উষ্ণতা আছে, যেন সম্প্রতি এদের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়েছে। সে মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল, “মানে, কেউ ইচ্ছে করেই এগুলো চালু রেখেছে। প্রশ্ন হচ্ছে কেন?” টর্চের আলোয় তারা খুঁজে দেখল ঘরের কোণে অচেনা কিছু দাগ, যেগুলো কারও উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ধুলোয় পায়ের ছাপ, আর সেই ছাপ যেন খুব সাম্প্রতিক।

ঠিক তখনই অনির্বাণের টর্চের আলো হঠাৎ গিয়ে পড়ল এক নড়াচড়ার ওপর। দরজার আড়াল থেকে যেন কারও ছায়া বেরিয়ে এল। দু’জনেই এক মুহূর্ত থমকে গেল। অচেনা এক ছায়ামূর্তি দ্রুত ভেতরে ঢুকে আবার পালানোর চেষ্টা করছে। তার চলাফেরার ভঙ্গি অস্বাভাবিক দ্রুত, যেন অনেকদিন ধরেই এই জায়গার পথঘাট চেনে। অরুণাভ ঝটপট টর্চের আলো সেই দিকেই ফেলল, কিন্তু ছায়াটা ইতিমধ্যেই অর্ধেক অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। এক্সচেঞ্জের সঙ্কীর্ণ গলিপথে দৌড়ে সে বেরিয়ে গেল বাইরের দিকে। অনির্বাণ চিৎকার করে উঠল, “কে ওখানে? দাঁড়াও!” কিন্তু ছায়া থামল না। পায়ের আওয়াজ ক্রমে মিলিয়ে গেল বাইরের রাতের নিস্তব্ধতায়। অরুণাভ আর অনির্বাণ দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকাল। মুখে আতঙ্ক আর সন্দেহ জমে উঠেছে। এর মানে, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এখানে আসে, পুরোনো লাইনগুলো চালু রাখে, আর সম্ভবত সেই ফোন কলের অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে এর যোগসাজশ রয়েছে।

তারা আবার ভিতরে ফিরে এলো। পুরোনো যন্ত্রপাতির দিকে তাকিয়ে অরুণাভ গভীর গলায় বলল, “এটা নিছক কাকতালীয় কিছু নয়, অনির্বাণ। কেউ এই সিস্টেম ব্যবহার করছে।” টেবিলের ওপর ছড়ানো ছিল তারের জট, তার মধ্যে কয়েকটা নতুন জোড়া লাগানো দাগ পাওয়া গেল। বোঝা গেল—এগুলো সম্প্রতি কেউ কাজ করেছে। অনির্বাণ কপালে হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “মানে, এই লাইন দিয়ে শুধু শব্দ বা কল নয়, আরও কিছু আদান-প্রদান হচ্ছে। হয়তো সংকেত, হয়তো নির্দেশ।” অরুণাভ ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাল। রাত প্রায় দেড়টা। বাইরে হাওয়া বইছে, জানলার ফাঁক দিয়ে হালকা সোঁদা গন্ধ আসছে। এই পরিস্থিতিতে তাদের মনে হচ্ছিল—যেন কেউ দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে তাদের প্রতিটি নড়াচড়া দেখছে। অদৃশ্য এক চাপা উত্তেজনা ভর করেছে চারপাশে। ছায়ামূর্তির পালিয়ে যাওয়ার ছবি যেন দু’জনের চোখে ভেসে উঠছে বারবার, আর প্রতিবারই তাদের মনে হচ্ছে এই অচেনা মানুষটিই হয়তো রহস্যের চাবিকাঠি।

শেষে অরুণাভ সিগারেট জ্বালাল আবার, ঠোঁট থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে এসে বাতাসে মিশে গেল। অন্ধকার ঘরে সেই ধোঁয়ার রেখা যেন আলোর মতো পথ নির্দেশ করছে। “আমাদের সাবধানে এগোতে হবে,” সে ফিসফিস করে বলল, “কারণ যে-ই হোক, সে আমাদের থেকে এক ধাপ এগিয়ে। আমরা যা খুঁজে পাচ্ছি, সে আগেই জানে।” অনির্বাণ জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। রাস্তায় অল্প আলো, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—সেই ছায়া এখনও হয়তো কাছাকাছি কোথাও দাঁড়িয়ে আছে, নজর রাখছে তাদের ওপর। ভেতরে গুমোট নীরবতা, আর বাইরে ঘন রাতের অন্ধকার—মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু যেন অনুভব করছিল রহস্যের আঁচ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। এ এক খেলার শুরু, যেখানে প্রতিপক্ষের মুখ দেখা যায়নি, কিন্তু তার উপস্থিতি চারদিকে ছড়িয়ে আছে। ফোনের পুরোনো লাইনের ভেতরে লুকিয়ে আছে সেই গোপন শক্তি, আর অচেনা ছায়ার রহস্য তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অজানা গহ্বরের দিকে।

অনির্বাণের চোখে তখন শুধু একটাই লক্ষ্য—কীভাবে মেঘলার জীবনের এই অদ্ভুত রহস্যের আসল ভিত্তি উন্মোচিত করা যায়। দিন রাতের পরিশ্রমে, পুলিশের সূত্র ধরে, সে খুঁজে পেয়েছিল কিছু প্রমাণ। মেঘলার ফোনে আসা ভয়ংকর কলগুলো আসলে কোনো আত্মার বা অলৌকিক ঘটনার ফল নয়, বরং বাইরের কোনো অচেনা উৎস থেকে কৃত্রিমভাবে পাঠানো সিগন্যাল। সার্ভার ট্রেস করে দেখা গেল, প্রতি রাতে নির্দিষ্ট সময়েই একটি অজানা ডিভাইস থেকে অডিও সিগন্যাল মেঘলার মোবাইলে পাঠানো হচ্ছে। অনির্বাণ বুঝল—এটা নিছক কাকতাল নয়, বরং পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। সে নিজের সিগারেটের ধোঁয়া একবারে গভীরভাবে টেনে নিল, যেন ভেতরে জমে থাকা চাপ একটু হালকা হয়। তার মস্তিষ্কে তখন দ্রুত ভেসে আসছে একের পর এক প্রশ্ন—কেন কেউ ইচ্ছা করে মেঘলাকে ভয় দেখাবে? কেন সেই কণ্ঠটা তার মৃত বোনের মতো? আর আসলেই যদি প্রযুক্তির কৌশল হয়, তবে কার কাছে সেই রেকর্ডিং ছিল? কে বা কারা এই কাজ করছে?

কিন্তু ঠিক তখনই সব যুক্তি ও প্রমাণের জগৎকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল এক রাতের ঘটনা। মেঘলা সেদিন বারান্দায় বসে ছিল, আকাশে ভেসে থাকা কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে। বৃষ্টির গন্ধে ভিজে উঠেছিল চারদিক। ঘরের ভেতর আলো-আঁধারির ফাঁকে মোবাইলটা কাঁপতে শুরু করল। অচেনা সেই নম্বর—যা সে গত কয়েক সপ্তাহে অগণিতবার দেখেছে। হাত কাঁপতে কাঁপতে সে ফোনটা ধরল। ওপাশে ভেসে এলো তার বোন মায়ার কণ্ঠ—সেই কণ্ঠ, যা সে একসময় হাসিতে, রাগে, ভালোবাসায় এতবার শুনেছে। “মেঘলা, আমি মায়া… তুমি আমাকে ভুলে গেলে?”—এই বাক্য শোনার পর যেন মেঘলার বুকটা ভেঙে গেল। অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল অবিরাম। যুক্তি, প্রমাণ, অনির্বাণের সব কথা সে মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে গেল। কারণ যে কণ্ঠটা তার শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত হৃদয়ে গেঁথে আছে, সেই কণ্ঠকে সে ভুলতে পারবে না। প্রযুক্তি দিয়ে কি এমন নিখুঁতভাবে কণ্ঠ অনুকরণ করা সম্ভব? সন্দেহ তার মনকে খেয়ে ফেলল, কিন্তু অনুভূতি তাকে দ্বিধার অতলে টেনে নিয়ে গেল।

অনির্বাণ যখন মেঘলার চোখে ভেজা অশ্রু দেখল, তার বুকটা হাহাকার করে উঠল। সে জানত, সত্য আসলে একটাই, কিন্তু মেঘলাকে তা বোঝানো সহজ হবে না। মেঘলার বিশ্বাস টলে গেলেও তার হৃদয় এখনো বোনের স্মৃতিতে বাঁধা পড়ে আছে। অনির্বাণ চেষ্টা করল যুক্তির কাঠামো দিয়ে মেঘলার মন গড়তে—“শোনো মেঘলা, আমি নিশ্চিত, এটা মানুষ করছে। প্রযুক্তি দিয়ে আজকাল মানুষের কণ্ঠ এমনভাবে নকল করা যায় যে আসল আর নকলের পার্থক্য বোঝা মুশকিল। ওরা চাইছে তোমাকে দুর্বল করে দিতে, যেন তুমি নিজেই ভেঙে পড়ো।” কিন্তু মেঘলা শুধু মাথা নাড়ল। তার চোখের ভেতরে তখন এক ভয়ংকর দোটানার ছবি—বিশ্বাস আর অনুভূতির সংঘর্ষ। একদিকে অনির্বাণের প্রমাণ, অন্যদিকে নিজের রক্তের সম্পর্কের টান। তার মনে হতে লাগল, যদি সত্যিই মায়া কোনোভাবে ফিরে এসে তাকে ডাকছে? হয়তো কোনো অদ্ভুত সত্য এই পৃথিবীর বাইরে লুকিয়ে আছে, যা অনির্বাণও বোঝে না।

সেই রাতের পর দু’জনের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হলো। অনির্বাণ জানত, সে সত্যের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু সেই দরজা ভাঙতে হলে মেঘলাকে পাশে পাওয়া জরুরি। অথচ মেঘলার মন এখন বিভ্রান্তির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, হয়তো অনির্বাণ অতি বাস্তববাদী হয়ে কিছু দেখতে পাচ্ছে না, আর হয়তো তার বোনের ডাকই আসল সত্য। রাত গভীর হতে হতে মেঘলা বারবার ফোনটার দিকে তাকাচ্ছিল—আবার কি সেই কণ্ঠ ফিরে আসবে? অনির্বাণ তখন সিগারেটের আগুনে অন্ধকার ঘরে ক্ষীণ আলো জ্বালিয়ে বসেছিল, চোখ স্থির ল্যাপটপের স্ক্রিনে। প্রমাণগুলো একদিকে তাকে সত্যের কাছে টেনে আনছিল, কিন্তু মেঘলার চোখে জমে থাকা বিশ্বাসের দ্বিধা তাকে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। সত্যি বলতে, এই অধ্যায়েই তাদের সম্পর্ক আর অনুসন্ধান এক ভয়ংকর বাঁক নিল—একদিকে যুক্তি, অন্যদিকে অনুভূতি। এবং সেই দ্বন্দ্বের মাঝেই লুকিয়ে রইল রহস্যের আসল পর্দা উন্মোচনের ইঙ্গিত।

১০

শহরের বাতাসে তখন অদ্ভুত এক অস্থিরতা। পুরনো টেলিফোন এক্সচেঞ্জটা রাতের আঁধারে দাঁড়িয়ে আছে নিথর দানবের মতো, ভাঙা কাঁচে চাঁদের আলো ঝলসে উঠছে। এই জায়গার ভেতরে যেন সময় থমকে আছে। অনির্বাণ, মেঘলা, অরুণাভ আর সুজয় চারজন মিলে শেষবারের মতো সিদ্ধান্ত নিল—আজ রাতেই তারা রহস্যের মূলে পৌঁছোবে। কাঁধে টর্চ, হাতে পুরনো নোটবুক, সাথে কিছু তার ও যন্ত্রপাতি নিয়ে তারা ঢুকল ভাঙাচোরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে। ভেতরের পরিবেশ ভারী, ধুলো আর স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সবাই জানত আজ রাতটাই হয়তো চূড়ান্ত উত্তর দেবে—এটা নিছক প্রতারণা, নাকি সত্যিই মৃতরা ফিরে আসার চেষ্টা করছে। সুজয়ের হাতে কাঁপা লন্ঠন, আলো ঝলসে উঠল ভাঙা কেবিনের দিকে, যেখানে একসময় অসংখ্য ফোনের কল চলত। সবাই নীরবে অপেক্ষা করল। রাত তখন ঠিক বারোটা বাজল। হঠাৎই নীরবতা ভেঙে উঠল সেই পরিচিত শব্দে—ফোনের কর্কশ রিংটোন।

প্রথমে সুজয় ফোনটা ধরল। তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল, ঠোঁট কাঁপছিল—ওপাশে ছিল তার বাবার কণ্ঠ, যিনি বহু বছর আগে মারা গেছেন। কণ্ঠ বলল, “বাবা, তুই ঠিক আছিস তো? আমি ফিরব।” সুজয়ের হাত কাঁপতে লাগল, চোখে জল এসে গেল। এরপর মেঘলা এগিয়ে গেল। সে ফোন ধরতেই শুনল—তার বোন মায়ার কণ্ঠ। ফিসফিস করে বলছে, “মেঘ, আমি একা নই। আমরা সবাই ফিরব।” মেঘলার বুক কেঁপে উঠল, চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়তে লাগল। অনির্বাণ তখন দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, তার চোখে অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব। বিজ্ঞানী মস্তিষ্ক বলছে—এ সবই কৃত্রিম সিগন্যাল, কিন্তু মানুষের আবেগ ভিন্ন কথা বলছে। হঠাৎ অরুণাভ ফোন ধরল। ওপাশে তার মৃত ছেলের কণ্ঠ ভেসে এলো—“বাবা, আমায় চিনতে পারছো? আমি ফিরছি।” চারজনই স্তব্ধ হয়ে গেল। এই মুহূর্তে যেন চারপাশের দেয়ালগুলোও নিশ্বাস ফেলছে।

কিন্তু অনির্বাণের মাথা তখনও ঠাণ্ডা। সে দ্রুত কেবিনের ভেতর খুঁজতে লাগল, তার টর্চের আলো পড়ে গেল এক অদ্ভুত যন্ত্রের ওপর। ভাঙা কাঠের আলমারির পেছনে লুকানো ছিল একটা ছোট মেশিন, তার সাথে জোড়া অসংখ্য পুরনো তার। যন্ত্রটার ভেতরে একাধিক রেকর্ডিং চিপ বসানো ছিল, যেখানে মৃতদের কণ্ঠ রেকর্ড করা হয়েছিল। অনির্বাণ বুঝল, কেউ অনেক দিন ধরে এই ভয়ংকর প্রতারণা চালাচ্ছিল। সে এক ঝটকায় যন্ত্রটা খুলে ফেলল, আর সবাইকে দেখাল—“এটাই আসল দোষী। মৃতরা ফিরে আসছে না। এগুলো মানুষের তৈরি প্রতারণা।” সুজয় হতাশায় মাথা নুইয়ে ফেলল, অরুণাভ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, আর মেঘলার চোখে ভেসে উঠল অবিশ্বাস। তার মনে হচ্ছিল—তাহলে এতদিন যা শুনে এসেছে, সবই কি মিথ্যে? তার বোনের কান্না, ডাকো, সবই কি মানুষের হাতে তৈরি প্রতারণা? অনির্বাণ গভীর শ্বাস ফেলল। সত্য উন্মোচিত হলো, কিন্তু তাতে আশার বদলে ছড়িয়ে পড়ল শূন্যতা।

কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। যন্ত্রটা খুলে ফেলার পরও হঠাৎ করে আরেকটা ফোন বেজে উঠল। ঘরের ভেতর সবার বুক কেঁপে উঠল। অনির্বাণ দ্বিধা না করে ফোনটা ধরল। ওপাশ থেকে শোনা গেল এক অচেনা কণ্ঠ—না সেটা সুজয়ের বাবা, না মেঘলার বোন, না অরুণাভর ছেলে। কণ্ঠটা অদ্ভুত ঠান্ডা, কিন্তু একই সঙ্গে ভয়ার্ত এবং জীবন্ত। কণ্ঠ বলল, “আমরা ফিরে আসব…” তারপর হঠাৎ সব নীরব হয়ে গেল। যন্ত্রটা তখনও খোলা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিল, কোনো সংযোগ নেই, কোনো রেকর্ড নেই। সবাই আতঙ্কে একে অপরের দিকে তাকাল। এই কণ্ঠটা কারও রেকর্ড করা নয়, কারও বানানো নয়। ঘরের ভেতর হিমেল বাতাস বয়ে গেল, ফোনটা নিজেই নিথর হয়ে ঝুলে রইল। অনির্বাণের শরীরে শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল—বিজ্ঞান দিয়ে সে ব্যাখ্যা করতে পারে অনেক কিছু, কিন্তু এই শেষ ঘটনাটার ব্যাখ্যা তার হাতের বাইরে। মেঘলার ঠোঁটে কেঁপে উঠল অল্পস্বরে এক বাক্য—“দেখলে? সবটা প্রতারণা নয়।” ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এল, আর চারজনই বুঝল, হয়তো সত্যটা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে লুকিয়ে আছে। রহস্যের পর্দা আংশিক সরে গেলেও অন্ধকারে রইল সেই শেষ প্রশ্ন—প্রযুক্তি, না কি সত্যিই আত্মারা ফিরে আসছে?

সমাপ্ত

WhatsApp-Image-2025-08-23-at-12.29.18-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *