Posted in

লাল বাসের ডায়েরি

Spread the love

সাদমান হাসান তুর্য


আমি একটি বাস। না, স্রেফ যান্ত্রিক এক বস্তু হিসেবে নয়, আমি আত্মাসম্পন্ন, অনুভব-সক্ষম এক যাত্রীভরা জীবনরথ। আমার জন্ম হয়েছিল ২০০৩ সালের এক গরম দুপুরে, নারায়ণগঞ্জের একটি ছোট্ট কিন্তু ব্যস্ত কারখানায়। তখন চারদিকে শিল্পকলার এক উৎসব চলছিল। মিস্ত্রির হাতের করাঘাতে গড়ে উঠছিল আমার শরীর, আমার হাড়-গোড়, আমার চাকার পাটাতন। আমি ছিলাম “মেট্রো পরিবহন” কোম্পানির সবচেয়ে নতুন সংযোজন।

কারখানা থেকে বের হতেই দেখি রাস্তাজুড়ে জ্যাম, গাড়ি, হর্নের শব্দ। কিন্তু আমার মনে চলছিল কেবল উত্তেজনা—আজ আমি যাত্রী বহন করব, মানুষের হাসি-কান্নার অংশ হব।

আমার প্রথম দিন ছিল গাবতলী থেকে সায়েদাবাদ রুটে। সকাল সাতটা। ড্রাইভার রশিদ ভাই সিগারেট খাচ্ছিলেন। হেল্পার ছেলেটার নাম ছিল বাবলু। বাবলুর বয়স মাত্র পনেরো, চোখে টাটকা স্বপ্ন। সে আদুরে গলায় বলল, “এইটা আমাদের নতুন বাস, লাল রঙের, দেখতে কি ঝকঝকে না?”

সে দিন আমার গায়ে সূর্যের আলো পড়ে যেন রূপ নেমে এসেছিল। যাত্রীরা একে একে উঠলেন, কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ কলেজে, কেউ হাসপাতালে। এক মা কোলে বাচ্চা নিয়ে উঠলেন, কষ্ট করে সামনের সিটে বসলেন। আমি থরথর করে চলতে থাকলাম ঢাকার রাস্তায়, গর্ত পেরিয়ে, ধুলো মাড়িয়ে।

কিন্তু, প্রতিদিনের সঙ্গী বলতে যাত্রী নয়, বরং শহরের শ্বাসরুদ্ধকর হর্ন, ধোঁয়া, আর হুঙ্কার। তবুও আমি ভালোবাসতাম এই ব্যস্ততা, কারণ এর মাঝেই ছিল জীবনের স্পন্দন। একদিন আমি বর্ষার মধ্যে জ্যামে আটকে আছি মতিঝিলে। হঠাৎ দেখি, জানালার কাচে চোখ রেখেছে একটি ছোট্ট মেয়ে। তার চোখে বিস্ময়, কৌতূহল। আমি যেন ওর কাছে এক রূপকথার ঘোড়া, উজ্জ্বল লাল রঙের বীর। মেয়েটি তার মাকে বলল, “মা, আমি এই বাসে চড়তে চাই।” আমি গর্বে কেঁপে উঠেছিলাম।

দিন যায়, মাস পেরোয়, বছর পালটে যায়। আমার রঙ ম্লান হতে থাকে। জানালার পর্দা মলিন, সিটের কাপড়ে ছেঁড়া। কিন্তু আমি তো এখনো বেঁচে আছি, তাই না? চলতে পারছি, মানুষের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছি।

তবে ধীরে ধীরে আমার রুট পালটে যায়। গাবতলী-সায়েদাবাদ রুট থেকে সরিয়ে আমাকে পাঠানো হয় গুলিস্তান-আজিমপুরের ছোট্ট রুটে। কিছু বাস ভাই হেসে বলত, “তুই এখন রিজার্ভ বেঞ্চে আছিস।” আমি কিছু বলতাম না, শুধু ভাবতাম—একটা বাসের জীবনে কি শুধু রুট-পরিবর্তনই নিয়তি?

তবুও, আজিমপুরের রাস্তাগুলো আমাকে আপন করে নেয়। সকালবেলার স্কুল ছাত্রছাত্রী, বিকেলের ব্যস্ততা, কিংবা ইফতারের সময় ঘরে ফেরার তাড়া—সবই আমার জীবনের অংশ হয়ে যায়। একবার, শীতকালের একটি দিনে, হেল্পার ছেলেটি হঠাৎ করে বাসের পেছনের সিটে গিয়ে বসল। আমি আয়নায় দেখে বুঝতে পারলাম, সে কাঁদছে। তার বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়েছে মোবাইলে। সে বলল, “এই বাসই আমার সব, বাবা তো আগেই চলে গেল, এখন তুই আছিস।” সে দিন আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তার পাশে, কারণ আমি কাঁপছিলাম ভিতর থেকে।

আরেকদিন, রাত্রির শেষ ট্রিপ। একজন বৃদ্ধ উঠে এলেন। কেউ ছিল না বাসে। তিনি নিরবে শেষ সিটে বসলেন। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এরপর উঠে সামনে এসে জানালার পাশে একটি চিরকুট রেখে নামলেন। চিরকুটে লেখা ছিল—

“এই বাসে আজ থেকে তেইশ বছর আগে আমি আমার স্ত্রীর সাথে প্রথমবার ঘুরতে গিয়েছিলাম। এখন সে নেই। কিন্তু তোমার ভেতর তার গন্ধ এখনো লেগে আছে।”

আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সেই রাতে আমার ইঞ্জিনটা যেন শব্দ করতে চাইছিল না। আমার শরীরে আর অনেক চিহ্ন। হরতালের সময় ভাঙা কাচ, প্রতিবাদের সময় উঠা গালি, প্রেমিক-প্রেমিকার খোদাই করে লেখা নাম—সবই জমে আছে আমার গায়ে। এক জোড়া ছেলে-মেয়ে একবার আমার সিটে লিখেছিল, “তুমি ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ – ২০১১/১৪ ফেব্রুয়ারি”। সেই লেখা আজো রয়ে গেছে, কেউ মোছেনি।

তবে আমার সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ছিল এক দুর্ঘটনায়। ২০১৬ সালের এক সকালে শাহবাগের মোড় পেরোচ্ছি, হঠাৎ একটি বাইক ছুটে এলো, আমার সামনের চাকায় ধাক্কা। ছেলেটি পড়ে গেল। আমি থমকে গেলাম। চারদিকে লোক জড়ো হলো, কেউ গালাগালি, কেউ দৌড়ে ছুটে গেল হাসপাতালে। ছেলেটি বেঁচে গিয়েছিল শেষমেশ। কিন্তু আমি সেইদিন নিজেকে অপরাধী মনে করেছিলাম।

আমার ড্রাইভাররাও বদলেছে বহুবার। কেউ হাসিখুশি, কেউ রাগী, কেউ দায়িত্ববান, কেউ দায়িত্বহীন। একজনের নাম ছিল আজহার ভাই। তিনি সব সময় আমার সিটে পিঠে হাত বুলিয়ে বলতেন, “তুই আমার ঘোড়া, চল রে!” আমি যেন সত্যিই ছুটতাম তখন।

আমার গায়ে আজকাল নতুন বাসদের কটূ মন্তব্য শুনি। তারা বলে, “এইটা তো স্ক্র্যাপ হবার যোগ্য।” কেউ কেউ বলে, “এত ধোঁয়া বেরোয়! এইটা রাস্তায় থাকার কথা না।” আমি চুপ করে থাকি। আমি তো জানি, আমিও একদিন নতুন ছিলাম। আজ ওরা যা, কাল তারাও এভাবেই থাকবে। কিন্তু সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না।

ডিপোতে একদিন শুনলাম, আমাকে আর বেশিদিন চালানো যাবে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মে পুরনো বাস তুলে ফেলা হবে। আমার গায়ে কাটা পড়বে, আমার ইঞ্জিন খুলে বিক্রি হবে, হয়তো কাচগুলো দিয়ে মসজিদের জানালা বানানো হবে।

আমি প্রস্তুত। কিন্তু মন মানে না। আমি তো শুধুমাত্র একটি লোহা-লোহার যন্ত্র নই। আমি তো আত্মা-সংবলিত!
আমার ভেতর যে হাজারো স্মৃতি জমে আছে—সেই মায়ের কোলে ঘুমিয়ে যাওয়া শিশু, সেই প্রেমিকের চোখে চোখ রাখা মুহূর্ত, সেই ছাত্রের পরীক্ষার ফল শুনে ভেঙে পড়া, সেই কবির খাতা থেকে হুট করে লেখা কবিতা—এগুলো কি কোথাও সংরক্ষিত হবে?

শেষের দিকে আমি আমার চালকদের অনেকবার অনুরোধ করতাম—“আমাকে আরেকটু ধীরে চালাও, আরেকটু যত্নে।”
আমি যে চিরকাল চলতে চাই না, শুধু চাই, কেউ আমার নাম মনে রাখুক।

আর তাই আজ এই আত্মকথা লিখছি—যদি কেউ পড়ে, কেউ জানে, যে এক লাল বাসও কাঁদে, হাসে, ভালোবাসে।

আমি একটি বাস। পুরনো, ক্লান্ত, অবহেলিত।
তবুও, আমি হাজারো মানুষের জীবনের ছোট্ট এক অধ্যায়।
জানি, আর কিছুদিন পরেই আমি রাস্তায় থাকব না।
তবুও, আমি চলেছি যতদিন পেরেছি—জীবনের চাকা ঘুরিয়ে, গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে, ভালোবাসা সঞ্চয় করে।

একবার একজন যাত্রী বলেছিলেন, “এই বাসটা আমার ছেলেবেলার অংশ।”
সেই কথাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

1000022429.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *