নারীবিষয়ক গল্প
-
নীল জ্যোৎস্নার রাজকন্যা
অদিতি সাহা ১ নীল আভাসের আলোকছটায় জ্যোৎস্নার রাজ্য যেন এক স্বপ্নিল জগৎ। সকাল বেলা, সূর্য ক্রমশ উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে হালকা নীল কুয়াশা রাজ্যের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, যা জমিনের নরম সবুজ এবং আকাশের সাদা মেঘের সঙ্গে মিশে এক অনন্য সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। রাজ্যের প্রতিটি গলি, প্রতিটি চত্বর যেন এক সুরের মতো নরম নরম নীল আলো…
-
অচেনা পাতা
প্রাপ্তি দাস ১ জীবন যেন একঘেয়েমি স্রোতে ভেসে চলছিল অন্বেষার। সকালবেলা চোখ মেললেই রান্নাঘরের ধোঁয়া, বয়স্ক মায়ের বকুনি আর সমাজের অলিখিত নিয়মের চাপ তাকে ঘিরে ধরত। বইয়ের তাক ভর্তি অসংখ্য খাতা, ডায়েরি, অর্ধলিখিত গল্প—সবকিছু যেন নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার দমিয়ে রাখা কণ্ঠের। লেখার হাত তার থেমে গেছে, অথচ ভেতরে জমে থাকা শব্দেরা ক্রমাগত…
-
প্রান্তির স্বপ্ন
অনিন্দিতা ঘোষ পাল ১ প্রান্তি ছিল গ্রামের একেবারে সাধারণ মেয়ে। কাঁচা মাটির ঘর, উঠোনে মাটির চুলা, আর সারাদিন খাটুনি খাটা বাবা-মা—এই ছিল তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ। তবে তার মধ্যে এক অন্য রকম প্রাণ ছিল। চারপাশের মেয়েরা যখন মাঠের ধারেই লাজুক হয়ে বসে থাকত বা পুতুল নিয়ে খেলত, তখন প্রান্তি ছেলেদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করতে বেশি ভালোবাসত।…
-
নদীর গোপন নাম
ঋতুপর্ণা দাশগুপ্ত পর্ব ১: নদীর ডাক গাঁটা যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মোড়ানো ছিল। শীতল দমকা হাওয়া ভোরের আকাশে নীলচে ছাপ রেখে দিত আর দূরে শাল-সেগুনের বনের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসত নদীর গুঞ্জন। এই নদীর নাম ছিল কুলেশ্বরী। তবে মাধুরী ছোটবেলা থেকেই জানত, নামটা পুরোটা নয়—এই নদীর আরেকটা নাম আছে, একেবারে গোপন নাম, যা শুধু রাতের আঁধারেই…
-
বনলতা
১ শহরের সকাল সবসময়ই ব্যস্ততার সঙ্গে শুরু হয়—বসন্তপুর নামের এই আধুনিক নগরীটা যেন ঘুমায় না। উঁচু উঁচু বহুতল ভবনের জানালা থেকে সূর্যের আলো গড়িয়ে এসে পড়ছে নিচের ব্যস্ত রাস্তায়, যেখানে গাড়ির হর্ন আর মানুষের ভিড় মিলেমিশে এক অদ্ভুত কোলাহল তৈরি করেছে। এই ভিড়ের মাঝেই প্রতিদিনের মতো পথ হাঁটছে বনলতা—পঁচিশ বছরের এক তরুণী, যার চেহারায় ক্লান্তির…
-
মেঘের ভেতর রোদ্দুর
মৌসুমী সেনগুপ্ত এক অর্পিতা সেনগুপ্তের জীবনে যেন এক অচেনা ঝড় নেমে এসেছে হঠাৎই। বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় সম্পর্ক ভাঙনের সিলমোহর এসে পড়ল তার কপালে। চারপাশের মানুষজনের মুখে একরাশ ফিসফিসানি, একরাশ হাহাকার, আর হাজারো প্রশ্ন—সবকিছুই যেন তাকে এক নিমেষে নীচে ফেলে দিল। দিন কয়েক আগেও যে সংসারের স্বপ্ন চোখে ভাসতো, ঘর সাজানোর পরিকল্পনা করতো, মনের…
-
অগ্নিশিখা
প্রেরণা দত্ত এক সকালবেলা স্কুলের ঘণ্টা বাজতেই মফস্বল শহরের মেয়েদের স্কুলের ক্লাসরুম ভরে ওঠে কোলাহলে। দেয়ালের রং অনেক জায়গায় খসে পড়েছে, বেঞ্চিগুলো পুরনো আর খটখটে, জানালার কাচ ভাঙা বলে আলো ঢোকে টুকরো টুকরো হয়ে। এই ক্লাসেই দাঁড়িয়ে থাকেন ইতিহাসের শিক্ষিকা সুবর্ণা দত্ত। বয়স ত্রিশের কোঠা পেরোলেও চোখে যেন এক আশ্চর্য দীপ্তি লেগে আছে। তিনি যখন…
-
সুবর্ণযাত্রা
ঐশানী সেন পর্ব ১: দাসীর যাত্রা শুরু আরাকানের ছোট্ট এক উপকূলগ্রাম। চারদিকে পাহাড় আর সমুদ্রের মিলন, নারকেল গাছের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে কুটির। সেই গ্রামেই বাস করত কিশোরী মেয়ে মায়ারী। বয়স মাত্র ষোলো, চোখদুটো ঝকঝকে কালো, কপালে যেন সর্বদা একটা অবুঝ কৌতূহলের রেখা। মায়ারী ছিল মৎস্যজীবীর মেয়ে। প্রতিদিন সকালবেলা বাবার সঙ্গে সাগরে মাছ ধরতে যেত,…
-
অদৃশ্য উত্তরাধিকার
সোনালী দেব ১ রায়চৌধুরী বাড়ি যেন ইতিহাসের এক প্রাচীন দলিল, যার প্রতিটি দেয়ালে লুকিয়ে আছে গৌরব ও ক্ষয়ের মিলেমিশে থাকা কাহিনি। বিশাল ফটক পেরোলেই চোখে পড়ে দোতলা প্রাসাদের মতো বিশাল বাড়ি—উঁচু খিলানওয়ালা জানালা, বারান্দার লোহার গ্রিলের কাজ, আর সিঁড়ির মাথায় শ্বেতপাথরের সিংহমূর্তি। একসময় এ বাড়ির জমিদারি ছড়িয়েছিল আশেপাশের বহু গ্রামে, ঘোড়ার গাড়ি, হস্তিদল, পালকি, এবং…
-
নীলপদ্মের শপথ
অন্তরা মান্না নীলমালা রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরে দাঁড়িয়ে আছে, চারপাশে বিশাল সোনার ঝলমলে আলো, রত্নজড়িত আসবাবপত্র, সোনার কাঁটা-পালিশ করা দরজা, কিন্তু সবকিছুই যেন তার হৃদয়ে খাঁড়া স্রোতের মতো বোঝাপড়া ছিনিয়ে নেয়। ভেতরের নিস্তব্ধতা, সিলিং থেকে ঝুলানো ক্রিস্টালের ঝুমকাগুলি হালকা হেলায় নড়ে ওঠার সময় যে মৃদু আওয়াজ করে, তা নীলমালার কানে এক অদ্ভুত সংকেতের মতো বাজে। সে দেখছে—তার…
-
ছাদবাগানের লুকোনো আকাশ
অনিতা রায় কলকাতার দক্ষিণের ব্যস্ত এলাকায় দশতলা এক বহুতলের চতুর্থ তলায় মৌসুমি সেনগুপ্তের ফ্ল্যাট। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এ এক স্বপ্নময় শহুরে সংসার—সাদা দেয়ালের পরিপাটি ফ্ল্যাট, বারান্দায় কিছু শুকনো টব রাখা, জানালার পাশে গামছা শুকোতে দেওয়া, আর ভেতরে এক স্বামী-স্ত্রী ও তাদের স্কুলপড়ুয়া ছেলের নিখুঁত রুটিন। কিন্তু সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর থেকে রাত অবধি…
-
অদম্য
নিবেদিতা বসু অনন্যার শৈশবটা অন্য সবার থেকে আলাদা ছিল। যেখানে বেশিরভাগ মেয়েরা পুতুল সাজাতে, রান্নাবান্না খেলতে কিংবা চকচকে চুলের ফিতেতে মেতে থাকে, সেখানে অনন্যার চোখ জ্বলে উঠত ব্যাট-বলের নাম শুনলেই। পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকেই তার খেলার সঙ্গী ছিল পাশের গলির ছেলেরা। তারা যখন ক্রিকেট খেলতে মাঠে নামত, অনন্যা কাঁধের ব্যাট ঝুলিয়ে দৌড়ে যেত। প্রথমে ছেলেরা…












