ছত্তিসগড়ের গভীর জঙ্গলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারদিকটা যেন অদৃশ্য কোনো চাপা রহস্যে ঘেরা—গা ছমছমে নিরবতা, ঘন কুয়াশা আর মাঝে মাঝে শোনা যায় অজানা পাখির ডানার শব্দ। ডঃ নীলয় সেনগুপ্ত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান, জিপ থেকে নেমেই চারপাশটা একবার ঠান্ডা চোখে স্ক্যান করলেন। পিছনে তাঁর দলের বাকি সদস্যরা: তরুণ তথ্যচিত্র নির্মাতা অরিন্দম পাল, প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্র বিশারদ ডঃ শ্রুতি দত্ত, ইতিহাসের গবেষক তনুশ্রী মুখার্জী এবং স্থানীয় গাইড兼ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট রাহুল কোসলে। তাঁরা আজ যে জায়গায় এসে পৌঁছেছেন, তার হদিশ পেয়েছিলেন কিছু দুর্লভ আদিবাসী নকশা বিশ্লেষণ করে। কথিত আছে, এই নির্জন জঙ্গলের মধ্যেই আছে এক প্রাচীন মন্দির, যার অবস্থান এতদিন…
-
-
অগ্নিভ বসু ১ মেঘে ঢাকা আকাশ, ছেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশার চাদরে মোড়া বাঁকুড়ার পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটি জিপ। স্টিয়ারিংয়ের পাশে বসে ডঃ নীলাভ মুখার্জী ডায়েরির পাতায় অস্থির হাতে কিছু নোট নিচ্ছিলেন—যার বেশির ভাগই ছিল স্থানীয় পুরাতাত্ত্বিক মানচিত্রের হালনাগাদ তথ্য। তাঁর মুখে সিগারেট, চোখে ক্লান্তির ছাপ। পেছনে বসে ছিলেন গবেষক মালবিকা রায়, যিনি জানালার কাঁচ সরিয়ে বাইরের পাহাড়ঘেরা দিগন্তে তাকিয়ে ছিলেন, যেন কোন কিছু চেনার চেষ্টা করছেন—যা হয়তো কোনো ছবি বা কাহিনি পড়ে মনে গেঁথে গিয়েছিল। গাড়িচালক রঘু হাঁসদা হঠাৎ বলে উঠল, “আর একটু সামনে গেলেই গোবিন্দপাহাড়পুর, বাবু। আপনারা যেই দেউলের খোঁজ করছেন, সেটার ধ্বংসস্তূপ ওই গ্রামের ওপারেই। তবে লোকজন…
-
দেবযানী চৌধুরী কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদগামী বাসটা যখন রাতের অন্ধকারে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে এগোচ্ছিল, তখন অভিষেক মুখার্জি জানালার কাঁচের বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল, সে কি সত্যিই এমন কিছু পাবে যেটা রিপোর্টে ব্যবহারযোগ্য? বছর দুয়েক হল সে এক অনলাইন নিউজ চ্যানেলে কাজ করছে—”রিয়েল শ্যাডো”—যেখানে তাকে পাঠানো হয় গ্রামীণ অলৌকিক ঘটনার অনুসন্ধানে। ভূত, প্রেত, চুড়েল, পেত্নী—এইসব নিয়ে সাধারণত ভিডিও বানানো হয়, আর টাইটেল হয় “Real Ghost Spotted in West Bengal” টাইপের। কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা কৌতূহল নিয়েই সে এসেছিল। কিন্তু এইবারের গন্তব্য একটু আলাদা। মুর্শিদাবাদের এক অজপাড়া গ্রাম—ভাঙ্গাড়িপুর, যেখানে এক বৃদ্ধা থাকেন একা, শ্মশানের পাশে। গ্রামবাসীরা বলেন, তার ঘরে মৃতরা কথা বলেন। তাকে সবাই…
-
মৈনাক ভৌমিক ১ পুরুলিয়ার চন্দনবন — নামটি আজও অনেকের কাছে অজানা, যদিও লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা বহু গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এই অরণ্য। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলটি আদিবাসী জনপদের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ঘন জঙ্গলে ভরপুর, যেখানে আজও সূর্যাস্তের পর কেউ একা পথ মাড়ায় না। অথচ সেখানেই, এক শতাব্দী পুরনো ব্রিটিশ জরিপ মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া এক দাগচিহ্ন—“K.T. Akhra (Abandoned)”—ডঃ ঋত্বিক বসুর চোখে পড়ে। বহুদিন ধরে প্রাচীন ভারতীয় তন্ত্রচর্চা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসা এই প্রত্নতত্ত্ববিদ তার টিম নিয়ে রওনা দেন চন্দনবনের উদ্দেশ্যে। তাঁর দলের সঙ্গে ছিলেন ইতিহাসের গবেষক ইরা সেনগুপ্ত, ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর অভীক মণ্ডল, তথ্যলিপিকার তৃষা দে এবং স্থানীয় গাইড হিসেবে নিযুক্ত হন নিতাই মাহাতো,…
-
তুষার বন্দ্যোপাধ্যায় ১ ঝাড়গ্রামের একদম প্রান্তে, যেখানে লোকালয়ের আলো শেষ হয়ে গভীর অরণ্যের কালো ছায়া শুরু হয়, সেখানেই ছিল আগ্নিমালীর সাধনাস্থল—এক প্রাচীন পাথরের গুহা। গুহার ভেতরে বাতাস থমকে থাকত, যেন কালও সেখানে থেমে গেছে। অমাবস্যার সেই রাতটিতে আকাশে একটিও তারা ছিল না, মেঘ ঢাকা চাঁদের নিচে আগ্নিমালীর চোখদুটো যেন জ্বলছিল আগুনের মত। তাঁর চারপাশে ছড়ানো ছিটানো কঙ্কাল, পশুর রক্ত, লাল সিঁদুরে ঢাকা মাটির গন্ধে এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি হয়েছিল। আগ্নিমালী তন্ত্রের এমন এক স্তরে পৌঁছেছিলেন যেখানে জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান ক্ষীণ হয়ে যায়। বহু যুগ ধরে তাঁর একটাই লক্ষ্য—একটি এমন বস্তু সৃষ্টি করা যা ভবিষ্যতের মৃত্যু দেখাতে পারে, এমন এক…
-
সৌমিক ভট্টাচার্য ১ পাহাড়ি রাস্তাগুলো যেন কোনও অজানা গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল অভিজিৎ সেনগুপ্তকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক, লোকবিশ্বাস এবং পাহাড়ি সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিনের আগ্রহ ছিল তার। একটি গবেষণা প্রকল্পের সূত্রে সে এবার রওনা দিয়েছিল উত্তরবঙ্গের এক অদ্ভুত দূরবর্তী গ্রামে—সিংরিপাহাড়। ট্রেন থেকে নামার পর পায়ে হেঁটে, জিপে চড়ে, শেষমেশ খচ্চর পিঠে চেপে পৌঁছাতে হয়েছিল তাকে সেই দুর্গম স্থানে। পাহাড়গুলো যেন দাঁড়িয়ে ছিল এক অভেদ্য প্রাচীর হয়ে—মানুষের সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন, অথচ নিজেদের মতো করে সাজানো এক অলৌকিক গ্রাম। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত ছোট্ট গ্রামটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ল ছায়াঘেরা গাছপালা, পাথরের বাড়ি, আর সন্ধ্যার আগেই বন্ধ হয়ে আসা কুড়িটি দরজা-জানালা। অভিজিৎ…
-
অন্বেষা সেন নীল করচা, নীল চোখ বৃষ্টি থেমেছে। ঝাঁঝালো এক নীরবতা জমে আছে নদিয়ার ঠাকুরবাড়ির চারদেয়ালে। বাড়ির ভাঙা ভাঙা বারান্দায় দাঁড়িয়ে শ্রেয়া মনে মনে ভাবল, “সব রহস্যের শব্দ হয় না—কিছু শুধু নীরবতা দিয়ে ডাকে।” তিন দিন ধরে সে এই পুরনো জমিদারবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গবেষণার বিষয়: “উনবিংশ শতাব্দীর নারীলোকের গোপন আখ্যান ও অলিখিত তান্ত্রিক প্রথা।” ইতিহাস বিভাগ এহেন ‘পপুলার’ বিষয়ে নাক সিঁটকোলেও শ্রেয়ার গবেষণা গতি থামেনি। বরং গতকাল রাতে পুরনো আলমারির পেছনে এক নীল কাপড়ে মোড়া ডায়েরি পেয়ে তার গবেষণা হঠাৎই ধাঁধা হয়ে উঠেছে। আজ সকালে সে ধুলো ঝেড়ে সেই নীল করচা খুলে পড়তে শুরু করে। “শ্রীশ্রী বগলা মহাবিদ্যায় নমঃ। এ…
-
বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় হিমালয়ের বুক চিরে উঠে যাওয়া সেই সরু আঁকাবাঁকা পথটায় যখন চারজন অভিযাত্রী প্রথম পা রাখল, তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। আকাশের রঙ ধূসর, তবে মেঘের আড়ালে সূর্য মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যেন সতর্ক করে দিচ্ছে—এই পথে চলা সহজ হবে না। অভিজিৎ সেনগুপ্ত, অভিযানের দলনেতা, একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে বহু দুর্গম পাহাড়, পরিত্যক্ত গুহা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজপ্রাসাদ চষে বেড়িয়েছেন, কিন্তু আজকের গন্তব্য নিয়ে তাঁর মনে সন্দেহ কাজ করছিল। এই ‘তপোবন’ সম্পর্কে যা কিছু জানা গেছে, তার সবটাই টুকরো টুকরো, বিপজ্জনকভাবে অস্পষ্ট। ঋদ্ধিমা ধর, তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং নৃবিজ্ঞানী, এক প্রাচীন পোড়াদেওয়ালের গায়ে পাওয়া খোদাই দেখে এই তপোবনের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন।…
-
অভ্র মিত্র অধ্যায় ১: অমাবস্যার আগে শ্যামনগর—পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এক নিঃস্তব্ধ গ্রাম, যেখানে রাত নামে আগেভাগেই আর কুকুর ডাকে না। চারদিকে যেন অদৃশ্য কিছু চেপে বসে, হাওয়া নিঃশব্দ হয়, আর মাটির ঘরের জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হয় না কোনও আলো। অমাবস্যা ঘনিয়ে এলে গ্রামের জীবন থমকে যায়, শিশুদের মুখে হাঁসি থাকে না, আর মায়েরা বাচ্চাদের চোখে কাজল পরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, যেন অজানা কিছু চোখে না পড়ে। শতবর্ষ আগের কথা, এক চণ্ডীপাঠের মঞ্চে নাকি অদ্ভুত এক যজ্ঞ হয়েছিল, যেখান থেকে এক আগুন উঠে পুরো মন্দির গ্রাস করে নেয়। তখন থেকেই চণ্ডীমণ্ডপ ধ্বংসপ্রাপ্ত, আর ওই দিনটিকেই অনেকে গ্রাম ইতিহাসের বিভীষিকা বলে চিহ্নিত করে।…
-
সুবীর পাল কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো এক পরিত্যক্ত সংগ্রহশালার দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলোর এক নিঃশব্দ ঝড় যেন আছড়ে পড়ল অরিত্র মুখার্জীর চোখে-মুখে। দিনের আলো সেখানে পৌঁছায় না, আর বিদ্যুৎ সংযোগও প্রায় নিস্ক্রিয়— কেবল মাঝেমধ্যে পুরোনো টিউবলাইটগুলো একটানা ঝিম মেরে জ্বলে ওঠে আবার নিভে যায়, যেন জীর্ণ শরীরের মাঝে অসহায় প্রাণের শেষ ছটফটানি। অরিত্রর বয়স বয়াল্লিশের কোঠায়, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর কপালের মাঝে গাঁথা একটা হালকা কাটা দাগ, যেটা অতীতের কোনো দুর্ঘটনার স্মারক। তিনি কলকাতা হেরিটেজ মিউজিয়ামের প্রধান কিউরেটর, তবে তার আসল পরিচয় একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে— যিনি ইতিহাসের গায়ে জমে থাকা ধুলো সরিয়ে মৃত কালচক্রের মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পান না।…