• Bangla - তন্ত্র

    মায়াবী তাবিজ

    শুভ্রা গুহ রায় ১ রঘু ওঝা সেই রাতটি কখনও ভুলতে পারবে না। মেঘঢাকা আকাশে বজ্রপাতের শব্দ বেজে চলছিল, আর বৃষ্টির মতোই ঝড়ো হাওয়া বনভূমির গহীনতার মধ্যে প্রবেশ করেছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে তার পায়ের নীচে ভেজা পাতা ফেটে যেত, আর বাতাসের দমকা তাকে সামান্যই সামলাতে দিচ্ছিল। সে জানত, এমন সময় বনের মধ্যে একা থাকা বিপজ্জনক, কিন্তু মানসিক উদ্যম এবং অনুসন্ধিৎসা তাকে থামতে দিতে পারছিল না। হঠাৎ, একটি অদ্ভুত আলো তার চোখে ধরা দিল—এক ধরণের ঝলমলে চকমক যা ঘিরে ছিল ঘন অন্ধকার। রঘু প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো এটি কোনো দ্যুতি বা দূর থেকে পড়া বজ্রপাতের প্রতিফলন, কিন্তু যত কাছে গেল, ততই বুঝতে পারল এটি…

  • Bangla - তন্ত্র

    অঘোরীর উত্তরাধিকার

    বিপ্লব দে ১ বারাণসীর নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গঙ্গার ধারে মণিকর্ণিকা ঘাটে সেই রাতটা যেন মৃত্যুর গন্ধে মোড়া। শতাব্দীপ্রাচীন ঘাটের ভাঙাচোরা সিঁড়িগুলোয় অগ্নিশিখা নেচে বেড়াচ্ছে, মৃতদেহ দাহের ধোঁয়া গঙ্গার কুয়াশার সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে ভয়ঙ্কর অথচ পবিত্র আবহ। আগুনের লাল আভায় নদীর জল কালো রঙে চকচক করছে, যেন গঙ্গাই আজ এক মহাশ্মশান। সেই শ্মশানের প্রান্তে, এক জরাজীর্ণ ঘাটঘরে শায়িত মহেশ্বর নাথ—অঘোর তন্ত্রের এক প্রবীণ সাধক। তাঁর শরীর ক্ষয়ে গেছে, হাড়গোড় বেরিয়ে এসেছে, তবুও মুখে এমন এক দীপ্তি যা মৃত্যুকেও হার মানায়। বুক ওঠানামা করছে কষ্টে, চোখের গভীরে জ্বলছে অন্তিম আলো। পাশে বসে অরিন্দম, গুরুপ্রেমে ভিজে চোখে জল। শিষ্য হাত দিয়ে গুরুজীর পা…

  • Bangla - তন্ত্র

    শিবের দশম দরজা

    রুদ্রনীল চক্রবর্তী ১ কলকাতার এক বর্ষণ-ভেজা সন্ধ্যা। শীতের কুয়াশা তখনও নামেনি, কিন্তু বাতাসে একটা আর্দ্র শীতলতা ভাসছে। অর্ণব মুখোপাধ্যায়, শহরের এক জনপ্রিয় দৈনিকের তরুণ অনুসন্ধানী সাংবাদিক, ডেস্কে বসে খুঁটিয়ে দেখছিলো কিছু খবরের কাটিং। বেশ কয়েকদিন ধরেই তার মন অস্থির—একটি নাম বারবার কানে আসছে, এক অদ্ভুত সংবাদ হিসেবে। নামটি—শ্রীশরণানন্দ মহারাজ। তারাপীঠের এই সাধুর সম্পর্কে শোনা যাচ্ছে এমন সব দাবি, যা সাধারণ মানুষ যেমন বিশ্বাস করতে পারছে না, তেমনি অস্বীকারও করতে পারছে না। নাকি তিনি এমন এক আচার জানেন, যা “দশম দরজা” খুলে দিতে পারে। এই দরজা, কথিত আছে, শুধু মৃত্যু-পরবর্তী আত্মাদের জন্য নয়—এটি নরক ও পৃথিবীর মাঝের গোপন পথ, যা মানবচক্ষুর…

  • Bangla - তন্ত্র

    রক্তমন্ত্র

    অগ্নিভ চক্রবর্তী ১ কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের পুরনো ভবনটার করিডোর সবসময়ই যেন একটু অন্ধকার আর আর্দ্র গন্ধে ভরা থাকে, বিশেষ করে বর্ষার রাতে। বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ, জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসছে ঠান্ডা বাতাস, আর কোথাও দূরে হাসপাতালের করিডোরে ভিজে স্লিপারের শব্দ ভেসে আসছে। অয়ন মুখার্জী, তৃতীয় বর্ষের মেডিকেল ছাত্র, নিজের ঘরে বসে নোটস লিখছিল, কিন্তু মনটা অস্থির। সেদিন বিকেল থেকে বন্ধুর ফোনে কোনো উত্তর নেই—ঋত্বিক সেন, যে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, সবসময় সময়মতো খবর দেয়, তার এই নীরবতা অয়নকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। রাত প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ হঠাৎ পাশের ঘর থেকে আসা একটা ধাক্কার শব্দ অয়নকে চমকে দিল। শব্দটা…

  • Bangla - তন্ত্র

    শ্মশানের সিংহাসন

    শৌর্য সেনগুপ্ত অধ্যায় ১ অরিন্দম সেন কলকাতার এক নামী দৈনিকের অনুসন্ধানী সাংবাদিক, যার জীবনের মূল নীতি হলো—কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করে তা প্রকাশ করা নয়। এক বর্ষার বিকেলে অফিসের কাজ শেষ করে সে যখন চা খেতে রাস্তার ধারের ছোট্ট দোকানে দাঁড়িয়েছিল, তখনই পরিচিত এক বৃদ্ধ লোক, হরিদাসবাবু, এসে বসে পড়েন তার পাশে। হরিদাসবাবু একসময় পত্রিকার ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার ছিলেন, তবে গত কয়েক বছর ধরে তিনি গ্রামের নানা রহস্যময় কাহিনি ও লোকগাথা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। সেদিন কথায় কথায় তিনি এক অদ্ভুত ঘটনার উল্লেখ করেন—তারাপীঠের কাছের এক পুরোনো শ্মশানে, প্রতি পূর্ণিমার রাতে, নাকি কিছু তান্ত্রিক গুরুদের গোপন সভা বসে। লোকমুখে শোনা যায়,…

  • Bangla - তন্ত্র

    নীলচন্দ্রের অগ্নি

    রজত মিত্র দূরপাল্লার লোকাল ট্রেনটা ধীরে ধীরে গ্রামের ছোট্ট স্টেশনে এসে থামল। বিকেলের নরম আলোয় প্ল্যাটফর্মটা যেন হালকা সোনালি ধুলোয় মোড়া। ট্রেন থেকে নেমে চারপাশের নিস্তব্ধতা অনুভব করতেই মোহনাদের কলকাতার কোলাহলের সঙ্গে একেবারে বিপরীত এক জগৎ মনে হল। হাতে ছোট্ট ট্রলিব্যাগ, আর কাঁধে স্লিংব্যাগ নিয়ে সে স্টেশনের গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গ্রামের রাস্তা নির্জন, দু’পাশে শিউলি আর শালবনের সারি। দূরে দেখা যায়, ধূসর এক প্রাসাদসদৃশ বাড়ি, আকাশের নিচে একাকী দাঁড়িয়ে আছে—সেটাই রায়চৌধুরী বাড়ি। বাবার মুখে অনেক শুনেছে এ বাড়ির গল্প, কিন্তু বাস্তবে দেখে যেন বুকের ভিতরে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। অটোরিকশা চালক যখন ভাড়া নেওয়ার পর তার দিকে একবার…

  • Bangla - তন্ত্র

    চন্দ্রমণ্ডপ

    তপন কুমার মুখার্জী ১ শীতের শেষ দিকের একটি সকাল। কলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে বর্ধমানগামী লোকাল ট্রেনটি ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে এগোচ্ছে। জানালার ধারে বসে আছেন ড. অরিন্দম মুখার্জি—চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, কোলের উপর মোটা নোটবুক আর কলম। বাইরে শস্যক্ষেত, তালগাছ, আর মাঝেমাঝে কুয়াশা ভেদ করে দেখা যাচ্ছে গ্রামীণ কুঁড়েঘর। অরিন্দম ইতিহাসের ছাত্র নন, বরং ইতিহাস তাঁর জীবনের অনিবার্য এক নেশা। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক, পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে এখন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। তাঁর থিসিসের বিষয়—বঙ্গের জমিদারি যুগের শেষভাগে তান্ত্রিক আচার ও স্থাপত্য। মাসখানেক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে পুরনো নথি ঘাঁটতে গিয়ে তিনি প্রথম ‘চন্দ্রমণ্ডপ’-এর উল্লেখ পান—একটি পাথরের বেদি,…

  • Bangla - তন্ত্র

    তন্ত্রপীঠের অগ্নিপরীক্ষা

    ১ প্রাচীন কাল থেকে গ্রামটির নাম শিউলিবাড়ি, তবে এই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে বহু গোপন কাহিনি। গ্রামের উত্তর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষ প্রাচীন তন্ত্রপীঠ মন্দির, যার কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কানে কানে পৌঁছেছে। লাল ইটের গায়ে শ্যাওলা জমে গেছে, ফাটল ধরা প্রাচীর থেকে গাছের শিকড় নেমে এসেছে যেন সময়ের আঁচড়। জনশ্রুতি আছে, এই মন্দির একসময় এক তান্ত্রিক রাজা নির্মাণ করেছিলেন, যিনি দেবীর কৃপা পাওয়ার জন্য নরবলি পর্যন্ত দিতেন। গ্রামের বয়স্করা বলেন, মন্দিরের অন্তঃকক্ষে এক গোপন দরজা আছে, যার ওপারে বন্দি রয়েছে এক অদ্ভুত অলৌকিক শক্তি—শক্তি, যা একবার মুক্তি পেলে সমগ্র অঞ্চলকে ধ্বংস করে দিতে পারে। দিনের বেলাতেও মন্দিরের ভেতরে…

  • Bangla - তন্ত্র

    মৃত্যুমণ্ডল

    অরুণাভ বসু অমাবস্যার সন্ধ্যা নামার অনেক আগেই আকাশে অদ্ভুত একটা চাপা গুমোট তৈরি হয়েছিল, যেন দিনের আলোও বাতাসে লুকিয়ে থাকা অজানা আশঙ্কাকে অস্বীকার করতে পারছিল না। নীরজ সেই সকাল থেকেই গুরুর নির্দেশমতো ঘর ছাড়িয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি জিনিস জোগাড় করতে বেরিয়েছিল—একটি প্রাচীন লাল কাপড়ের টুকরো, কালো মোমবাতি, শিবের জীর্ণ মূর্তি, আর সেই দুর্লভ পুঁতির মালাটি, যা এক সময় গুরুর গুরু তার হাতে তুলেছিলেন। প্রতিটি জিনিস যেন নিজের ভেতর গোপন কোনো স্পন্দন বহন করছিল, নীরজ মনে মনে বুঝতে পারছিল, এ রাত শুধু আরেকটা সাধনার রাত নয়; এ রাতে এমন কিছু ঘটতে চলেছে, যার ওজন বহন করা সহজ নয়। শহরের ভাঙা প্রাচীন অলিগলি,…

  • Bangla - তন্ত্র

    অগ্নিবিন্দু মন্ত্র

    তনিমা বসাক রুদ্রাক্ষী জানত না ঠিক কোন মুহূর্তে তার রোগীর মুখে উঠে আসে সেই চিহ্নটা—একটা বৃত্তের মধ্যে ঘূর্ণায়মান চারটি রেখা, যেটা দেখে মনে হয় যেন কালি ছড়ানো হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে কিন্তু ভেতরে কোনও গাণিতিক ছন্দ লুকিয়ে আছে। রোগীটির নাম ছিল অনুকূল বসু—৬৫ বছরের এক প্রাক্তন স্কুলশিক্ষক, যার স্মৃতিভ্রংশের উপসর্গেই রুদ্রাক্ষী প্রথমে সন্দেহ করেছিল আলঝেইমার, কিন্তু দ্বিতীয় সেশনে সেই কাগজটা হাতে এল। পুরোনো, হলুদ হয়ে যাওয়া একটা ডায়েরির ভাঁজে তোলা সেই চিহ্ন দেখে হঠাৎ তার মনে পড়ে গিয়েছিল মায়ের শেষদিনগুলো—যখন মা অজান্তে কিছু চিহ্ন আঁকতেন বাতাসে, চুপ করে থাকতেন, বলতেন, “এই লেখাগুলো কারো জন্য নয়, শুধুই অগ্নির জন্য।” মা ছিলেন একসময় রবীন্দ্রভারতীর…