• Bangla - তন্ত্র

    শব্দের তন্ত্র

    সৌরভ মিত্র অরিজিত ঘোষ, কলকাতার একজন প্রখ্যাত সঙ্গীত কম্পোজার, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গীত ছিল তার জীবনের রক্ত, তার অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। জন্ম থেকেই সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেছিল সে। কলকাতার অভিজ্ঞান শ্রোতাদের কাছে অরিজিতের সুরের এক নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল—যেখানে সুরের মধ্যে মায়াবী একটি শক্তি অনুভূত হত, যা মানুষের মনকে জড়িয়ে ফেলত। একদিন, কাজের মধ্যেই সে একটি পুরনো গ্রন্থ পায়, যা তন্ত্র ও মন্ত্রের ভীষণ অদ্ভুত উপাদান নিয়ে লেখা। বইটি দেখতে যতটা সাধারণ মনে হয়েছিল, তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক অজানা শক্তি, যা অরিজিতের কাছে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। তিনি প্রথমবার অনুভব করেন, সঙ্গীতের…

  • Bangla - তন্ত্র

    নবচণ্ডী কাহিনী

    প্ৰনব দত্ত এক পত্রটা এসেছিল একেবারে অচেনা কাগজে, যেন তালপাতার কপি, তাতে আঁচড়ে আঁকা অদ্ভুত সব অক্ষর — সংস্কৃতের মতো, কিন্তু অচেনা ছন্দে বাঁধা। কলকাতার কলেজ স্টাফরুমে বসে চা খেতে খেতে যখন ঋদ্ধিমান ভট্টাচার্য চিঠিখানা খোলে, তখন সে ভাবেনি এমন কিছুর মুখোমুখি হবে। “আপনার পাণ্ডিত্য ও ঋগ্বেদের উপর আপনার বিশেষ জ্ঞান সমীহ জাগায়। অতএব, আপনাকে ত্রয়োদশ তিথির নবচণ্ডী যজ্ঞে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি — মহাভৈরবী মন্দির, দক্ষিণ নবগ্রাম।” চিঠির নিচে কোনো নাম নেই, শুধু একটা সিলমোহর — গাঢ় লাল, আর তার উপর খোদাই করা এক নারীর মুখ, যার কপালে শূন্য। প্রথমে মজা ভেবেছিলেন ঋদ্ধিমান, কেউ হয়তো বানিয়ে পাঠিয়েছে। কিন্তু জায়গাটার…

  • Bangla - তন্ত্র

    অষ্টভয়ার অন্তর্গত

    অভিজিৎ দাস পর্ব ১: আগমনী কলকাতার বিখ্যাত নাট্যদল ‘অভিনয়নগর’ তাদের পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহরের বাইরে একটা থিয়েটার রিট্রিটের আয়োজন করেছিল। স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল বিষ্ণুপুর—ইতিহাস আর সঙ্গীতের শহর। সেখানে গিয়ে নাটকের মহড়া, স্ক্রিপ্ট রিডিং, ওয়ার্কশপ, আর প্রকৃতির মধ্যে কিছুটা সময় কাটানো—এই ছিল উদ্দেশ্য। দলের অন্যতম প্রবীণ সদস্য অভিজিৎদা বলেছিলেন, “বিষ্ণুপুরে একটা পুরনো রাজবাড়ির মন্দির আছে। বহুদিন কেউ যায় না, একটু ভৌতিক, কিন্তু জায়গাটা একেবারে থিয়েটার-যোগ্য।” সবার কৌতূহল জাগল। নাটকের ছায়া পড়ার জন্য এমন পরিবেশই তো চাই। রওনা হয়েছিল দশজন—আটজন অভিনেত্রী, একজন মেকআপ আর্টিস্ট, আর রুদ্র—স্ক্রিপ্ট লেখক এবং নির্দেশক। দলটির গঠন ছিল যেন এক থ্রিলারের চাবিকাঠি। সকলেই নিজস্ব জীবনযন্ত্রণা…

  • Bangla - তন্ত্র

    পঞ্চতন্ত্র

    জয় সাহা ১ কলকাতার শীতল জানুয়ারির সকালে ঘন কুয়াশা ঢাকা দিয়েছিল কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া। রাস্তার ধারে পুরনো বইয়ের দোকানগুলো থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়া আর চায়ের গন্ধ মিশে গিয়েছিল শহরের আর্দ্র নিঃশ্বাসে। ড. শৌণক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গা-ছমছমে নীল টweed কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিলেন ‘শর্মা রেয়ার কালেকশন’-এর দিকে—একটি আধাভগ্ন, অন্ধকার বইয়ের দোকান যা শহরের বহু ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে। দোকানের দরজায় ঝুলন্ত ঘণ্টা বেজে উঠল ক্লান্ত সুরে, আর ভিতর থেকে উঠে এল ধুলোমাখা কাগজের গন্ধ। শৌণক জানতেন কেন তিনি এসেছেন। তিন দিন আগে এক নামহীন খামে পাঠানো চিঠিতে শুধু একটি লাইন লেখা ছিল—“তোমার বাবার শুরু যেখানে শেষ হয়েছিল, পঞ্চতন্ত্রের প্রথম…

  • Bangla - তন্ত্র

    পঞ্চম মুখ

    অনিরুদ্ধ গোস্বামী পর্ব ১: ছাই ও প্রত্যাবর্তনতালপুকুরে ফিরে আসার দিনটা কুয়াশায় ডুবে ছিল। সকালের আলোও যেন পায়ের নিচে পচে যাওয়া পাতা। বাস থেকে নামতেই একরাশ গন্ধ এসে নাকে লাগে—পুরনো ঘামের, সোঁদা মাটির, আর মৃত কিছু একটা। দেবদান মুখার্জি, একসময় নামকরা ডকুমেন্টারি নির্মাতা, এখন এক মানসিক ভাঙনের পর নিজেকে গুটিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তালপুকুরে তার ঠাকুরদার বাড়ি—এমন একটা জায়গা যেখানে কেউ আর থাকেনা, শুধু দেয়ালের ফাটলে সময় জমে আছে। সে একটা সাদা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে রিকশা ধরে, রিকশাওয়ালা কিছু না বলে মাথা নিচু করে চালায়। যেন সে দেবদানকে দেখেই চিনে ফেলেছে, কিন্তু মুখে কিছু বলবে না। শহরটা কেমন যেন কুঁকড়ে আছে,…

  • Bangla - তন্ত্র

    অঘোরীর চোখ

    শুভাশীষ পাল                                         পর্ব ১: পাহাড়ের গা থেকে যাত্রা শিলিগুড়ি থেকে জিপ ছাড়ল সকাল আটটায়। ঋষভ জানালার ধারে বসে রেকর্ডারটা হাতে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে একটা লাইন বলল, “আজ আমরা যাচ্ছি দার্জিলিং জেলার গভীর এক গ্রামে, যেখানে এখনও লোকমুখে ভয়ের সুরে উচ্চারিত হয় এক অঘোরী তান্ত্রিকের নাম—ভৃগুনাথ।” শান পিছনের সিটে বসে ক্যামেরার ব্যাগ আঁকড়ে ধরেছিল। মাথায় হালকা ঠান্ডা, বাইরে কুয়াশা। সামনে বসে গাইড টেমবা চুপচাপ পাহাড়ি রাস্তা দেখে গাড়ি চালাচ্ছিল, তার চোখে ছিল একটা অদ্ভুত স্থিরতা, যেন সে জানে তারা কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু চায় না তারা সেখানে পৌঁছাক। চিলোংবস্তির নামটা প্রথম শোনা গিয়েছিল এক পুরোনো তান্ত্রিক পাণ্ডুলিপিতে, যেটা ঋষভ সংগ্রহ করেছিল…

  • Bangla - তন্ত্র

    কালো রুদ্রাক্ষ

    রিতা সুর চৌধুরী এক শ্মশানের নরম সাদা ছাই আর কালো পাথরের ফাঁক দিয়ে বেরোনো ধোঁয়ার মতোই নিঃশ্বাস নিত রুদ্রনাথ—যেন প্রাচীন কালের অন্ধকার তাকে গ্রাস করে নিয়েছে আর ছাড়তে চায় না। এক সময় তান্ত্রিকদের মধ্যে যার নাম ছিল সম্মানের, সেই রুদ্রনাথ আজ শুধু অন্ধকার আর ব্যর্থতার এক জীবন্ত প্রতিমা। চোখের তলায় গভীর গর্ত, কপালে কালি আর রক্তের তিলক, ছেঁড়া গেরুয়া বসনে জড়ানো দেহ আর হাতের শিরাগুলোতে শুকিয়ে যাওয়া তেলের গন্ধ—সব মিলিয়ে এক পচন ধরা সাধকের চেহারা। শ্মশানটি সেই সময় প্রায় পরিত্যক্ত; মাঝে মধ্যে শুধু মৃতদেহের মিছিল এসে পুড়ে যায়, ধোঁয়ার সাথে মিলিয়ে যায় কান্নার শব্দগুলো। রুদ্রনাথের তন্ত্রের আসন সেই চিতা ভস্মের…

  • Bangla - তন্ত্র

    তান্ত্রিকের চিহ্ন

    সুশ্রী ব্যানার্জী প্রথম পর্ব: চণ্ডীপাঠের রাতে রাত তখন ঠিক পৌনে বারোটা। বীরভূমের কান্দিরবাঁধ গ্রামে সেই রাতে চাঁদের আলো নেই। আকাশে কেবল মেঘ আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমক। গ্রামের শেষ মাথার জঙ্গলঘেরা পুরনো ঠাকুরদালানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঋজু—কলকাতা থেকে আসা নৃতত্ত্ব বিভাগের গবেষক। তার গবেষণার বিষয়: “বাংলার অন্তর্হিত তান্ত্রিক সম্প্রদায় ও তাদের আধুনিক ছায়া।” গ্রামে ঢোকার পর থেকেই একটা অদ্ভুত গন্ধ টের পাচ্ছে সে। ধূপ আর পোড়া মাটির মিশ্র গন্ধ। বাড়ির বৃদ্ধ জমিদারপুত্র হরিপদবাবু বলেছিলেন, “পৌষ মাসে, চণ্ডীপাঠের রাতে কেউ ওই পুরনো ঠাকুরদালানের পাশে ঘেঁষে না। শুনেছি, এক সময় ওখানে এক তান্ত্রিকের তপস্যা হত। তাকে সবাই ডাকত ‘রক্তনাথ।’ কে জানে, সে…

  • Bangla - ছোটগল্প - তন্ত্র

    দক্ষিণাগ্নি

    ১ ঋভু সেনগুপ্ত ভোরবেলা কলকাতা থেকে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেই বুঝে গিয়েছিল—এই যাত্রা তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত আর অন্ধকার পথে নিয়ে যাবে। সাংবাদিক জীবনে সে বহু ঘটনা দেখেছে, বহু মানুষ, কিন্তু এমন এক গুহার অস্তিত্ব—যেখানে আজও ‘দক্ষিণাগ্নি’ নামে তান্ত্রিক যজ্ঞ হয়, তা শুনে প্রথমে অবিশ্বাসই করেছিল। কয়েক সপ্তাহ আগেই তার হাতে এসে পড়েছিল এক পুরনো চিঠি, যা লিখেছিলেন একজন মৃত প্রত্নতত্ত্ববিদ—ড. বিভাস মুখোপাধ্যায়। চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল ঝাড়খণ্ডের অন্তর্গত এক অরণ্যঘেরা গুহার, যেখানে “দেহান্তরণ” নামক এক প্রাচীন তন্ত্রচর্চা আজও গোপনে চলে। চিঠিতে লেখা ছিল একটি মাত্র লাইন: “যদি সত্য জানতে চাও, তবে আগুনকে ভয় পেও না। দক্ষিণাগ্নি সব জানে।” সেই লাইন…

  • Bangla - তন্ত্র

    ডার্ক চা ও এক ডাকিনির ডায়েরি

    অর্ঘ্য মজুমদার পর্ব ১: চায়ের দোকানটা অদ্ভুত ছিল শিলিগুড়ির হিলকার্ট রোডের ঠিক এক কোণায় একটা ছোট্ট চায়ের দোকান আছে, নাম—”ডার্ক চা”। দোকানটা যতটা ছোট, ততটাই অদ্ভুত। এখানে চা বানানো হয় একটা পুরনো কেতলিতে, যার মুখে লাল রঙের একটা পাথর বসানো। দোকানের মালিক একটা তরুণী—নির্মা, বছর সাতাশের মতন বয়স। লম্বা কালো চুল, সিঁথিতে লাল সুতো, চোখে অদ্ভুত ঠান্ডা দৃষ্টি। তার চা খেলে কেউ না কেউ কিছু একটা ভুলে যায়—পুরনো প্রেমিকের নাম, নিজের মোবাইলের পাসওয়ার্ড, বা একটা দুঃস্বপ্ন। শহরের কিছু মানুষ হাসতে হাসতে বলেন, “ও চা না, ডাকিনির পান!” কিন্তু কেউই অদ্ভুতভাবে দূরে থাকে না। বরং সন্ধে হতেই দোকানটা জমে ওঠে—কলেজ পড়ুয়া…