ঋষি বন্দ্যোপাধ্যায় হিমালয়ের কোলে অবস্থিত সেই পাহাড়ি গ্রামটির নাম ছিল থোলাং। বহু পুরনো এক মানচিত্রে ছায়ার মতো দাগ কাটা ছিল এই নাম, যার অর্থই আজ আর স্পষ্ট নেই। ঋদ্ধিমান, যিনি নিজেকে একজন হিমালয় গবেষক এবং অ্যাডভেঞ্চার ব্লগার বলে পরিচয় দেন, ঠিক করেছিলেন এইবার ট্রেকিং করবে এমন এক স্থানে, যেটা এখনও পর্যটকের হাতছোঁয়ার বাইরে। তার সঙ্গী হয়েছিল অভিষেক—অভিনব চোখে ছবি তুলতে পারা একজন ভ্রমণ-চিত্রগ্রাহক। থোলাং গ্রামের ঘন মেঘে ঢাকা সরু রাস্তা ধরে তারা যখন পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার রং ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের গায়ে। গ্রামবাসীরা দেখল দুই শহুরে যুবক ব্যাকপ্যাক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, হাতে ধরা ছেঁড়া মানচিত্র, চোখে উত্তেজনার আলো। একজন…
-
-
আত্রেয়ী বন্দ্যোপাধ্যায় অধ্যায় ১: হারানো মুখ হাসপাতালের করিডোরটা ঠান্ডা আর ধূসর, যেন কাঁচের খাঁচায় আবদ্ধ কোনো অদৃশ্য বিষাদ। অর্ঘ্য সান্যাল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল—তার হাতের মুঠোয় একটুকরো পুরনো ছবি, যেখানে ছয় বছর বয়সী একটি মেয়ে হাসছে; পরনে হলুদ ফ্রক, গলায় একটি লাল হৃদয় আকৃতির লকেট। পাশেই এক কিশোর ছেলেকে দেখা যাচ্ছে—চোখেমুখে দায়িত্ব, একরাশ ভালোবাসা। ছবিটার নিচে কালি দিয়ে লেখা—“দাদা আর রাত্রি, পুরুলিয়া ভ্রমণ, ২০০৩।” অর্ঘ্য ছবিটার দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে, গভীর শ্বাস নেয়। তারপর চোখ মেলে চুপিচুপি ফিসফিসিয়ে বলে, “আমি এবারও তোর কাছে পৌঁছাব, রাত্রি।” বিগত বিশ বছর ধরে তার এই কথাটুকু বদলায়নি, শুধু মানুষটা বদলে গেছে—বিজ্ঞানমনস্ক থেকে সে…
-
আর্য বসু অধ্যায় ১ কলকাতার উত্তর শহরের এক পুরনো দোতলা বাড়িতে, ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরমে সন্ধ্যা নেমেছিল ভারী একটা স্তব্ধতা নিয়ে। চারদিকে পূজার আগাম প্রস্তুতির শব্দ, দূরে প্যান্ডেলের বাঁশ বাঁধার ঠুংঠাং আওয়াজ, আর ব্যস্ত রাস্তার ট্রাফিক হর্নের মাঝখানে বই, কাগজ আর কাঠের গন্ধমাখা একটা ঘরে বসে শৌনক রায় পুরোনো আলমারির তালা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন। এটা তাঁর বাবার ঘর — প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও তন্ত্রগবেষক শিবরাম রায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা, যেখানে কোনোদিন কেউ ঢোকার সাহস পেত না। বাবার মৃত্যুর সাত বছর পর, মা’রও চলে যাওয়ার পরে এই ঘরটাকে নতুন করে সাজানোর কথা ভেবেছিলেন শৌনক — কিন্তু ঘর খুলতেই যেন গা ছমছমে কিছুর ছায়া…
-
মণিষা মুখোপাধ্যায় অধ্যায় ১: “চিত্রের টানে” কলকাতার ছিমছাম ফ্ল্যাটে বসে ঐশী সেন তার স্কেচবুক আর ল্যাপটপের মাঝে ডুবে ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনায়। পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প নিয়ে তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল বাঁকুড়ার টেরাকোটা শিল্প, বিশেষ করে চালচিত্র। চালচিত্র—বাংলার মন্দিরের চাল বা চূড়ার নিচে আঁকা একরকম ন্যারেটিভ চিত্রপট, যা দেব-দেবীর কাহিনি বা পুরাণকথা বলে দেয়। কিন্তু বাঁকুড়ার ‘ধনেশ্বরপুর’ নামের একটি ছোট্ট গ্রামে একটি পরিত্যক্ত মন্দির আছে, যার চালচিত্রে নাকি পুরাণ নয়—তান্ত্রিক চিত্র রয়েছে। তার অধ্যাপক, ডঃ রূপক দত্ত, এই মন্দিরের একটি কালো-সাদা ছবির কপি ঐশীকে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “এটা কিছুটা ব্যতিক্রমী। তুই চাইলে এইটার উপর কাজ করতে পারিস, কিন্তু সাবধানে।” ঐশীর মন…
-
রিনি সান্যাল কলকাতা। জীবন এবং মৃত্যুর মাঝখানে আটকে থাকা শহর। এখানে পুরোনো এবং নতুনের মাঝে বিরাট একটি ব্যবধান। হাউমাউ করা শহরের ভিড়ে, যেখানে এক এক করে হারিয়ে যায় প্রতিটি মুখ, সেখানে আমান নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেত না। শহরের পেট ভরা সেসব মোল্লা-মাস্টারের গলির মধ্যে সে চলছিল একা—অতীতের ব্যর্থতা, ভালোবাসার পরাজয়, আর একাকী জীবনের গল্প নিয়ে। একদিন, এমন সময়, সে এল এক পুরনো গলি দিয়ে, যেখানে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল একটি দোকান—একটি অদ্ভুত বইয়ের দোকান। দোকানটি ছিল ঝুপঝাড়, আবছা আলো, আর বইয়ের স্তূপে ভরা। এর সাইনবোর্ডে লেখা ছিল “বিপাশা’র আধ্যাত্মিক বইঘর”। দোকানটির তেমন কোনও আলাদা নাম ছিল না, তবে সে যেন…
-
বর্ণালী দত্ত ১ রোদ তখন নরম, বিকেলের আভায় রাঙা আকাশ ছুঁয়ে আছে বাঁকুড়ার পাহাড়ি রেখা। চারপাশে পলিমাটির গন্ধ আর ধুলোয় মেশা পুরনো সময়ের গল্প, ঠিক যেমনটা চেয়েছিল অর্ণব সেনগুপ্ত। কলকাতার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের গবেষক সে, বিশেষত পূর্বভারতের রাজপরিবারের কিংবদন্তি ও লোকবিশ্বাস তার গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। বহুদিন ধরে সে খুঁজছিল এমন এক জায়গা যেখানে ইতিহাস আর লোককথা মিশে আছে রক্তমাখা কোনো অভিশাপে। বহু পুরনো দলিলপত্র ঘেঁটে, এক তাম্রলিপিতে সে জানতে পারে বাঁকুড়ার সীমান্তবর্তী এক পরিত্যক্ত রাজবাড়ির কথা — যেখানে রয়েছে “নাগকক্ষ” নামে এক গোপন ঘর। কিংবদন্তি বলে, শত বছর আগে এক তান্ত্রিক নারী, যার নাম ছিল নাগবসুন্ধরী, সেই ঘরের ভেতরেই অভিশাপ দিয়ে…
-
রাজীব আচার্য বিশ্বভারতীর লাল মাটির ছায়ায় ঘেরা প্রাচীন গ্রন্থাগারে বসে ছিলেন ড. অমৃতা সেন। তার চোখের সামনে খোলা একটি পুরোনো খাতা, যার পাতাগুলো এতটাই ভঙ্গুর ছিল যেন যেকোনও মুহূর্তে ধুলোয় পরিণত হবে। সকালটা ছিল ঠান্ডা, হালকা কুয়াশা ঘেরা জানালার ওপার থেকে ঝরে পড়া মহুয়া ফুলের গন্ধে ভরে উঠছিল চারপাশ। তবে ড. সেনের মন ছিল অন্যত্র। “তান্ত্রিক ভারতের নারী ইতিহাস” বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়েই তিনি খুঁজে পান একটি অদ্ভুত নাম—নক্রচক্র। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি হয়ত কোনো লোককথা, কোনও সাধুর নাম বা গ্রাম্য আচার। কিন্তু যতই পাতাগুলো পড়ছিলেন, ততই তার বিশ্বাস ভাঙছিল। পুঁথিতে লেখা ছিল, “নক্রচক্র হ’ল সেই তান্ত্রিক প্রবাহ, যা কেবল…
-
অমৃতা রায় চৌধুরী অধ্যায় ১: কলকাতার উত্তরপ্রান্তের এক মফস্বলি ফ্ল্যাটের বারান্দা ধরে ছড়িয়ে পড়া সকালের আলোয় বসে ছিল অর্ণা সেনগুপ্ত, হাতে ছিল এক কাপ লিকার চা আর চোখ ছিল ল্যাপটপের স্ক্রিনে আটকে থাকা। তার চোখে লালচে রেখা, সারারাত ঘুম হয়নি ঠিকঠাক—নিউজরুমের মধ্যরাতের মিটিং, তার পরে হঠাৎ করে সিনিয়র এডিটরের একটি নির্দেশ—“ঝাড়খণ্ডে একটা মেয়ের মৃত্যুর খবর এসেছে, গ্রামবাসীরা বলছে ডাইনি, কিন্তু তুই গিয়ে দেখে আয়। কিন্তু এবার শুধু নিউজ রিপোর্ট নয়, আমি চাই এক্সপোজে—তুই পারবি।” অর্ণা পারবে না? অর্ণা জানে, এই সমাজ কিভাবে নারীর অস্বাভাবিকতা বা স্বাধীনতা দেখলেই তাকে ‘ডাইনি’, ‘অশুভ’, বা ‘অতিমাত্রায় শক্তিশালী’ বলে আখ্যা দেয়। কিন্তু সাংবাদিকতা মানে কি…
-
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এক শহর কখনও কাউকে নিজের করে নেয় না, আবার কখনও কাউকে ছেড়ে দেয় না—এই দুইয়ের মাঝখানে অনন্তভাবে আটকে ছিল সায়ন্তন চৌধুরীর জীবন। কলকাতার এই কর্পোরেট কাঁচের খাঁচায় তার দশ ঘন্টার অফিস, তিন ঘন্টার ট্রাফিক, আর বাকি সময় শুধু দমচাপা ক্লান্তি। ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে শহরের আলোগুলো যেন মৃত্যুর স্বপ্ন দেখায়, বেঁচে থাকার নয়। গত এক বছরে সায়ন্তনের মধ্যে অনেক কিছু ভেঙেছে—প্রেম, আশা, বিশ্বাস, নিজেকে ভালোবাসার ক্ষমতা। নয়নিকার চলে যাওয়া যেন তার আত্মাকে একবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর পরেই শুরু হয় প্যানিক অ্যাটাক, ঘুম না হওয়া, নিজেকেই অচেনা মনে হওয়া। অনেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়েছে, মেডিটেশন অ্যাপ…
-
শুভেন্দু বসাক তান্ত্রিকের অভিশাপ শুভেন্দু বসাক নিষিদ্ধ শক্তি শুভ, এক তরুণ তান্ত্রিক ছাত্র, জীবন থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করছিল। তার সাধনাতে গভীরতার জন্য সে ছটফট করছিল, দিনের পর দিন চূড়ান্ত নিষ্ঠার সাথে তন্ত্র শাস্ত্র অধ্যয়ন করছিল। সে জানত যে তার ভিতরের শক্তি শুধু তাকে নয়, পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, যদি সে সেই শক্তির সঠিক ব্যবহার জানত। কিন্তু কেউ জানত না, যে তার তন্ত্র সাধনা শুধু এক ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এর পরিণতি তাকে এক অন্ধকারে নিয়ে যাবে, যা সে কখনো কল্পনা করতে পারেনি। তন্ত্র সাধনায় দীক্ষিত হওয়ার পর, শুভ একদিন শিখে গেল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মন্ত্র—এটি তার সাধনা…