Posted in

অদৃশ্য কোষ

Spread the love

অরিন্দম বসু


পর্ব –

কলকাতার উত্তর শহরের একটি নিভৃত ল্যাবরেটরি। বাইরে রাতের আকাশে ম্লান তারা, ভেতরে আলো-ঝলমলে কাঁচঘেরা ঘর, সারি সারি কাচের টেস্টটিউব আর ধাতব বাক্সে ঠাসা যন্ত্রপাতি। টেবিলের উপর রাখা একটি ছোট্ট কাঁচের শিশি—যার ভেতরে মৃদু নীলচে আভা ছড়িয়ে রয়েছে। এই নীল আভাটাই আসলে সেই আবিষ্কার—“অদৃশ্য কোষ”।

ডক্টর সমর সেন, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন সেই শিশিটির দিকে। তিনি জানেন, এর ভেতরে লুকোনো শক্তি কেবল জীববিজ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়ে মানুষের সভ্যতার সংজ্ঞাই পাল্টে দিতে পারে। কোষটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করলেই এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ত্বকের প্রতিটি সেল আলোকে শোষণ করতে শুরু করে, আর প্রতিসরিত আলো অদৃশ্যতার মোড়ক গড়ে তোলে। মানে—মানুষটি দৃষ্টির বাইরে চলে যায়।

কিন্তু এই আবিষ্কারটা নিছক কোনো বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়। এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের চাপ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বারবার চিঠি পাঠিয়েছে—এটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য চাই। অদৃশ্য সৈনিক মানেই শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে এক অদম্য অস্ত্র। সমরবাবু দ্বিধায় ভুগছেন—বিজ্ঞান কি কেবল ধ্বংসের জন্য তৈরি হবে, না মানুষের উন্নতির জন্য?

এই দ্বিধার মাঝেই গল্পে প্রবেশ করে পঞ্চদশী কিশোরী অন্বেষা। অন্বেষা কাছের এক স্কুলের ছাত্রী। তার বাবা সমরবাবুর ল্যাবরেটরিতে সিকিউরিটি গার্ড। অন্বেষা পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে এক দুর্নিবার কৌতূহল—অজানা জিনিস ছুঁয়ে দেখার, নিষিদ্ধ জায়গায় পা রাখার।

সেই রাতে, যখন সমরবাবু একান্তে গবেষণার কাগজপত্র গোছাচ্ছেন, ল্যাবের বাইরে দাঁড়িয়ে অন্বেষা কাঁচের জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। নীলচে শিশির মতো আলো তাকে ভেতরে টেনে নেয়। ভেতরে ঢোকার কড়া নিষেধ থাকলেও সে সাহস করে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে যায়।

সমরবাবু প্রথমে খেয়াল করেননি। কিন্তু একসময় ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি দেখলেন—একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অবাক চোখে তাকিয়ে আছে কাঁচের শিশিটির দিকে।
—“কে তুমি?” কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন সমরবাবু।

অন্বেষা ইতস্তত করে বলল, “আমি অন্বেষা… আমার বাবা এখানে সিকিউরিটি দেন। ওই আলোটা… খুব অদ্ভুত লাগছে।”

সমরবাবু চটে গেলেন। “এটা খেলার জিনিস নয়। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাও।”

কিন্তু নিয়তির খেলা কেউ জানে না। অন্বেষা হঠাৎ হোঁচট খেয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে পড়ে গেল। তার হাত লাগল সেই শিশিতে। কাঁচের বোতল মেঝেতে আছড়ে পড়ল। নীল আভা যেন মুহূর্তে বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। ধোঁয়ার ভেতর কিশোরীর দেহ ঢেকে গেল।

সমরবাবু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধোঁয়া কেটে গেল। টেবিলের পাশে পড়ে থাকা অন্বেষার স্কুলব্যাগ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মেয়ে নেই।

তিনি ছুটে গিয়ে ডাকলেন—“অন্বেষা…! তুমি কোথায়?”

চারদিক নিস্তব্ধ। তারপর হঠাৎ শোনা গেল মেয়েটির আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর—কিন্তু দেখা যাচ্ছে না।
—“ডক্টর… আমি এখানে… কিন্তু… আমি তো… আমি তো নেই!”

সমরবাবুর হাত কেঁপে উঠল। তিনি বুঝলেন, অদৃশ্য কোষের প্রথম মানব পরীক্ষাটা ঘটেই গেল, আর সেটা ঘটেছে সম্পূর্ণ দুর্ঘটনায়।

এবার সামনে এক নতুন অধ্যায় খুলে গেল। এক কিশোরী মেয়ে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে—এটা কি কেবল বৈজ্ঞানিক আশ্চর্য, না সমাজের জন্য এক অদ্ভুত ভয়াবহ সংকেত?

অন্বেষার কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে উঠছে—
“আমি কি কোনোদিন আবার… স্বাভাবিক হবো, ডক্টর?”

সমরবাবু জানেন, এর উত্তর তিনি নিজেও জানেন না।

পর্ব –

ল্যাবরেটরির নিস্তব্ধতা যেন এক ঝটকায় ভেঙে পড়েছিল। সমরবাবুর হাতের আঙুল কাঁপছিল, কপালে ঘাম জমে উঠেছিল। চোখের সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না—কিন্তু ঠিক পাশ থেকে ভেসে আসছে অন্বেষার কণ্ঠস্বর। কিশোরীর গলা কাঁপছে, ভয়ে আর বিস্ময়ে মিশ্রিত, “ডক্টর… আমি এখানে… আমি নেই কেন?”

সমরবাবু কাঁপা গলায় বললেন, “শান্ত হও অন্বেষা। তুমি আছো, শুধু… দৃষ্টির বাইরে চলে গেছ। তোমার শরীর এখন আলো প্রতিফলিত করছে না।”

“মানে… আমি অদৃশ্য হয়ে গেছি?” মেয়েটির গলায় অস্বস্তি।

সমরবাবু জানেন—যা ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। কিন্তু তিনি এটাও বুঝতে পারছেন, বিপদটা শুধু বৈজ্ঞানিক নয়—এটা এখন নৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক এক জটিলতা।

তিনি তড়িঘড়ি কম্পিউটারের সামনে বসলেন, কোষের প্রতিক্রিয়ার নোটগুলো খুঁজে বের করলেন। তাঁর অনুমান ছিল—এই কোষ কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণ ইনজেকশনে দিলে কাজ করবে। কিন্তু অন্বেষা পুরো শিশির সংস্পর্শে এসেছে, মানে পুরো শরীর সিক্ত হয়েছে। এর প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে তিনি জানেন না।

হঠাৎ, পায়ের শব্দ পেলেন তিনি। বাইরে থেকে সিকিউরিটি গার্ড দৌড়ে আসছে। অন্বেষার বাবা—মহেশ।
“স্যার, কী হলো? আওয়াজ পেলাম।”

সমরবাবু মুহূর্তে থমকে গেলেন। তিনি জানেন, এখন যদি মহেশ বুঝতে পারে তার মেয়ের উপর এমন ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে, তবে পরিস্থিতি সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠবে।

অদৃশ্য অন্বেষা ফিসফিস করে বলল, “বাবা এসেছে… আমাকে ওর কাছে যেতে হবে।”

“না!” সমরবাবু তীক্ষ্ণ গলায় থামালেন। “তুমি যদি এখন তোমার বাবার সামনে যাও, ও ভয় পাবে, আর হয়তো চিৎকার করবে। রাষ্ট্র এই খবর পেলে তোমার আর মুক্তি নেই। তোমাকে বন্দি করে ফেলা হবে পরীক্ষাগারে।”

অন্বেষা থমকে গেল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, যেন ঘাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

মহেশ দরজা ঠেলে ঢুকল। “স্যার, কিছু ভাঙল নাকি?”

সমরবাবু শিশির ভাঙা কাঁচ মেঝে থেকে তুলে নিলেন। ঠোঁটে কষ্টে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “না না, হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। কোনো সমস্যা নেই।”

মহেশ কিছুক্ষণ সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, তারপর মাথা নেড়ে চলে গেল। দরজা বন্ধ হতেই অন্বেষা হাঁপ ছাড়ল।

“ডক্টর, আমি… আমি এখন কী করব?”

সমরবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “প্রথমে তোমাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। আমরা সমাধান খুঁজব।”

পরের কয়েক ঘণ্টা ছিল অস্থিরতায় ভরা। সমরবাবু বারবার স্ক্রিনে কোষের মলিকিউলার স্ট্রাকচার টেনে আনছেন, নতুন নতুন হিসাব কষছেন। কিন্তু কোনো সমাধান আসছে না।

অন্বেষা একা কোণে বসে আছে। তার অস্তিত্ব কেউ দেখে না, কিন্তু সে আছে। গলার স্বরে আতঙ্ক মিশে আছে—“ডক্টর, আমি যদি কোনোদিন ফিরতে না পারি?”

সমরবাবু নীরবে তাকিয়ে রইলেন শূন্যে। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন—একজন বিজ্ঞানী কি ঈশ্বরের জায়গায় দাঁড়িয়ে মানুষের দেহ অদৃশ্য করার অধিকার রাখে?

ঠিক তখনই, বাইরে আবার গাড়ির শব্দ। কেউ ল্যাবের গেটে নেমেছে। সমরবাবুর মন দমে গেল। এতো রাতে কে আসতে পারে?

কিছুক্ষণের মধ্যে দরজা খুলে ঢুকল দুইজন। কালো স্যুট, কানে ওয়্যারলেস—সরকারি এজেন্ট।

“ডক্টর সেন,” একজন গম্ভীর গলায় বলল, “আমরা শুনেছি আপনার গবেষণা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আমরা এসেছি ফলাফল দেখতে।”

সমরবাবু বুঝলেন, এটাই আসল বিপদ। সরকারের হাতে যদি এই দুর্ঘটনার খবর যায়, তবে অন্বেষা আর তাঁর হাতের বাইরে থাকবে না।

অদৃশ্য অন্বেষা ফিসফিস করে বলল, “ডক্টর… তারা যদি আমাকে খুঁজে পায়?”

সমরবাবুর কণ্ঠস্বর ভেতরে কেঁপে উঠল। “চুপ করে থেকো। কিছু বলো না। এখন থেকে তোমার অস্তিত্ব গোপন করাই আমাদের প্রথম কাজ।”

কিন্তু তিনি জানেন না, কতদিন এই গোপন রাখা সম্ভব হবে। কারণ অদৃশ্য হলেও অন্বেষা যে একদিন না একদিন পৃথিবীর সামনে এসে দাঁড়াবেই। আর সেই দিনই শুরু হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অদৃশ্য মানুষ সমাজে কতটা নিরাপদ?

পর্ব –

ল্যাবরেটরির বাতাসে এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা জমে আছে। কালো স্যুট পরা সরকারি এজেন্টরা ঘরে ঢুকেই চারপাশ ঘুরে দেখতে লাগল। তাদের চোখে সন্দেহ, কণ্ঠে কড়া কর্তৃত্ব। একজন কাগজের ফাইল খুলে বলল,
“ডক্টর সেন, আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল গবেষণা দ্রুত শেষ করে রিপোর্ট দিতে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ফলাফল দেখতে চায়। এখনই।”

সমরবাবু শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “গবেষণা চলছে। এখনও মানব পরীক্ষার পর্যায়ে যাওয়া হয়নি। আমি কিছু তথ্য প্রস্তুত করেছি, কিন্তু এগুলো প্রকাশ করার মতো সম্পূর্ণ নয়।”

এজেন্ট ঠাণ্ডা চোখে তাকাল। “অর্ধেক কথা নয়, ডক্টর। দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন। আপনাকে সময় দেওয়া হয়েছে যথেষ্ট। এখন আমাদের হাতে কিছু স্পষ্ট ফলাফল দিতে হবে।”

ঘরের কোণে অদৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অন্বেষা। তার বুক ধড়ফড় করছে। সে বুঝছে, কথা হচ্ছে সেই আবিষ্কার নিয়ে যা তাকে এ অবস্থায় এনেছে। ভয় আর অপরাধবোধ মিলেমিশে তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।

এজেন্টরা একসময় টেবিলের কাছে এসে শিশির ভাঙা কাঁচ লক্ষ্য করল। “এটা কী?”

সমরবাবুর কপালে ঘাম। তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, “এক্সপেরিমেন্টাল সলিউশন ছিল। ভেঙে গেছে, তবে তাতে কোনো ক্ষতি হয়নি।”

এজেন্টদের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। “আপনি নিশ্চিত? কোনো কিছু নষ্ট হয়নি তো?”

“না,” সমরবাবু জোর দিয়ে বললেন।

তারা কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল, তারপর একজন ফিসফিস করে আরেকজনকে বলল, “উপরের দফতরে জানাতে হবে। এখানে আরও নজরদারি বসাতে হবে।”

এজেন্টরা বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই নিস্তব্ধতা নেমে এল ঘরে। সমরবাবু চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, কপাল মুছে বললেন, “আমাদের সময় খুব কম, অন্বেষা। সরকার এখন থেকেই নজর রাখবে। তুমি যদি ধরা পড়ে যাও, তারা তোমাকে গবেষণার উপাদান বানিয়ে দেবে।”

অদৃশ্য কিশোরীর কণ্ঠস্বর ভাঙল, “কিন্তু আমি তো কোথাও পালাতে পারব না। আমি তো আছিই না…”

“না,” সমরবাবু দৃঢ় গলায় বললেন। “তুমি আছো। শুধু পৃথিবী তোমাকে দেখতে পাচ্ছে না।”

তারপর তিনি ডেস্কে ছড়িয়ে থাকা নোটবুকগুলো খুলে বসলেন। কোষের রাসায়নিক গঠন, আলোর প্রতিসরণ সূত্র, সবকিছু আবার নতুন করে পরীক্ষা করতে লাগলেন। হয়তো এর কোনো প্রতিষেধক তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু সেই প্রতিষেধক বানাতে সময় লাগবে, আর সরকারের চোখ ফাঁকি দেওয়া আরও কঠিন হবে।

অন্বেষা একসময় ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, “ডক্টর, আমি কি অন্তত আমার বাড়ি যেতে পারি? মা তো আমাকে খুঁজবে।”

সমরবাবু থমকে গেলেন। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়। যদি সে বাড়ি যায়, কেউ হয়তো টের পাবে—চায়ের কাপ নড়ছে, দরজার কপাট খুলছে অথচ কেউ নেই। প্রতিবেশীদের কানে গেলে খবর ছড়িয়ে পড়বে। আর তাতে শুধু সরকারের হাতে ধরা পড়াই নয়, সাধারণ মানুষও ভয় পেতে শুরু করবে। অদৃশ্য মানুষ মানেই আতঙ্ক, অবিশ্বাস।

“না অন্বেষা,” তিনি ধীরে বললেন। “তুমি এখন কোথাও যেতে পারবে না। এই ল্যাবই তোমার একমাত্র আশ্রয়।”

মেয়েটি নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার অস্তিত্ব যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, কিন্তু চারপাশে তার দম নেওয়ার শব্দই প্রমাণ দিচ্ছে—সে আছে, সে বেঁচে আছে।

ঠিক তখনই ল্যাবের বাইরে ফোনের ঘণ্টা বেজে উঠল। সমরবাবু ফোন তুলতেই ওপাশে শোনা গেল এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর, “ডক্টর সেন, আপনি আমাদের সঙ্গে খেলছেন না তো? মনে রাখবেন, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে ফল ভালো হবে না।”

ফোন কেটে গেল।

সমরবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানলেন—এখন থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ হবে এক অদৃশ্য যুদ্ধ। বিজ্ঞানী হিসেবে নয়, একজন রক্ষক হিসেবে তাকে লড়তে হবে—এক কিশোরী মেয়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য।

আর ঘরের এক অদৃশ্য কোণে বসে থাকা অন্বেষা প্রথমবার উপলব্ধি করল—তার জীবন আর কোনোদিন আগের মতো হবে না।

পর্ব –

রাত কেটে ভোর হলো। ল্যাবরেটরির জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে, কিন্তু সেই আলোয়ও দেখা যাচ্ছে না অন্বেষাকে। সমরবাবু ডেস্কে ঝুঁকে সারারাত লিখেছেন, সূত্র কষেছেন, নতুন নতুন সমীকরণ এঁকেছেন। ক্লান্ত চোখে তিনি জানালার বাইরে তাকালেন—রাস্তার উপর সাধারণ মানুষের চলাফেরা। তারা কেউ জানে না, শহরের বুকেই এক অদৃশ্য প্রাণী হাঁটছে, শ্বাস নিচ্ছে।

অন্বেষা চুপচাপ বসে ছিল। তার গলা শুকনো, আর চোখে (যদি দেখা যেত) হতাশার ছায়া। হঠাৎ সে ফিসফিস করে বলল,
“ডক্টর, আমি কেমন আছি দেখতে পারবেন? আয়না ধরুন… আমি অন্তত নিজের ছায়া দেখতে চাই।”

সমরবাবু মৃদু কষ্টে হেসে বললেন, “আয়না এখন কোনো কাজের নয়। তুমি নিজেকেই দেখতে পাচ্ছ না, কারণ আলো তোমাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। তবে তুমি আছো। তোমার স্পর্শ, তোমার কণ্ঠ, তোমার দম—এসব প্রমাণ।”

অন্বেষা থেমে গেল। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা ভরে উঠছে।
“তাহলে কি আমি মরে গেছি?”

“না,” সমরবাবু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন। “তুমি জীবিত। কিন্তু তোমার অস্তিত্ব এখন এক নতুন রূপে।”

এই কথার মাঝেই বাইরে আবার গাড়ির শব্দ। ভোরের আলোয় কালো গাড়ি এসে থামল ল্যাবের সামনে। সমরবাবু উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়ালেন। দরজা খুলে ঢুকল তিনজন সেনা অফিসার। তাদের চোখ কড়া, হাতে কাগজপত্র।

“ডক্টর সেন,” প্রধান অফিসার বললেন, “আজই আপনাকে আবিষ্কারের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দিতে হবে। আমরা জানি আপনি গবেষণায় সফল হয়েছেন। আমাদের ধৈর্য সীমিত।”

সমরবাবু ঠান্ডা মাথায় বললেন, “গবেষণা অসম্পূর্ণ। এখনই কাউকে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেললে ভয়াবহ বিপদ হতে পারে।”

অফিসার কঠিন হেসে বললেন, “আপনার ভয় অমূলক। রাষ্ট্র যা চায় তা দেরি করে পাওয়া যাবে না। আমরা প্রয়োজনে নিজেরাই পরীক্ষা চালাব।”

এই কথাটা শুনেই অন্বেষার বুক কেঁপে উঠল। সে বুঝল, যদি সরকার নিজে পরীক্ষা চালায়, তবে আরও অনেক মানুষ তার মতো অদৃশ্য হয়ে যাবে, হয়তো আর ফিরে আসবে না।

অদৃশ্য মেয়েটি হঠাৎ কেঁপে কেঁপে বলে উঠল, “ডক্টর… তাদের আটকান!”

সমরবাবু চমকে উঠলেন। কণ্ঠস্বর শোনার মতো জোরে হয়নি বটে, কিন্তু সামান্য শব্দ বেরিয়ে গিয়েছে। অফিসাররা থমকে গেল।
“এটা কার গলা?”

সমরবাবুর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। “কোনো গলা নয়। হয়তো আপনারা ভুল শুনেছেন।”

কিন্তু অফিসারদের চোখ তীক্ষ্ণ হলো। তারা চারদিকে তাকাল, সন্দেহের গন্ধ পেল। প্রধান অফিসার গম্ভীর গলায় বলল, “এখানে কেউ আছে। আমরা পুরো ল্যাব তল্লাশি করব।”

সমরবাবুর গলা শুকিয়ে এল। তিনি জানলেন, আর একটু ভুল হলেই অন্বেষা ধরা পড়বে।

অদৃশ্য মেয়েটি আতঙ্কে নিঃশব্দে ল্যাবের এক কোণে সরে গেল। তার মনে হলো, তার অস্তিত্ব এখন শুধু বিজ্ঞানীর গোপন বিষয় নয়—এটা রাষ্ট্রের শিকার হয়ে ওঠার অপেক্ষায়।

সমরবাবু দাঁত চেপে মনে মনে বললেন, না, আমি ওকে হারাতে দেব না। শুধু এক্সপেরিমেন্ট নয়—একটা মানুষ, একটা প্রাণ।

এদিকে অফিসাররা ল্যাব ঘুরে ঘুরে খুঁজতে শুরু করল। যন্ত্রপাতি সরাচ্ছে, টেবিলের নিচে দেখছে। সমরবাবুর হৃদস্পন্দন বেড়ে উঠছে।

এবং ঠিক তখনই, দরজার বাইরে হট্টগোল—বস্তুত কেউ ল্যাবের বাইরে ভিড় করেছে। প্রতিবেশী কিছু মানুষ চিৎকার করছে—
“কাল রাতে ভেতরে আলো ফেটে বেরোচ্ছে দেখেছি!”
“নিশ্চয়ই কিছু গোপন পরীক্ষা হচ্ছে!”
“আমরা জানতে চাই!”

অফিসাররা চমকে বাইরে তাকাল। পরিস্থিতি এখন বিপজ্জনক। ভেতরে অদৃশ্য কিশোরী, বাইরে সন্দেহে ভরা জনতা।

সমরবাবু বুঝলেন—এই খেলা এখন কেবল বিজ্ঞান বা রাজনীতির নয়। এটা মানুষের ভয়ের খেলা।

পর্ব –

ল্যাবরেটরির ভেতরে উত্তেজনা তুঙ্গে। বাইরে প্রতিবেশীদের গলা ভেসে আসছে—“আমরা জানতে চাই! কী হচ্ছে ভেতরে?” সেনা অফিসাররা একে অপরের দিকে তাকাল। একজন গম্ভীর গলায় বলল,
“ডক্টর সেন, বাইরে ভিড় জমছে। আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। আপনাকে অনুরোধ করছি—যা কিছু আবিষ্কার করেছেন, আমাদের হাতে তুলে দিন।”

সমরবাবু ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিলেন, “গবেষণা অসম্পূর্ণ। আমি কিছুই তুলে দেব না।”

প্রধান অফিসারের চোখে রাগের ঝলক। “ডক্টর, রাষ্ট্রের নির্দেশ মানতে আপনি বাধ্য।”

এই কথার মাঝেই ল্যাবের ভেতরে হঠাৎ শব্দ হলো—একটা চেয়ার সরে গেল নিজে নিজে। সবাই চমকে তাকাল। অফিসারদের মুখে বিস্ময়ের ছাপ।
“এটা কী?”

অদৃশ্য অন্বেষা বুঝতে পারল, তার অজান্তেই চেয়ার ঠেলে দিয়েছে। আতঙ্কে সে পিছু হটল, কিন্তু ততক্ষণে অফিসাররা আরও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠেছে।

“এখানে কেউ আছে,” প্রধান অফিসার গর্জে উঠল। “তল্লাশি করো!”

সমরবাবুর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তিনি জানেন, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অন্বেষা ধরা পড়তে পারে। তিনি তড়িঘড়ি বলে উঠলেন,
“শুনুন, এখানে বিপজ্জনক রাসায়নিক রাখা আছে। অকারণে ঘাঁটলে দুর্ঘটনা ঘটবে।”

অফিসাররা থমকাল, কিন্তু তাদের চোখে অবিশ্বাস। বাইরে জনতার কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হচ্ছে—
“আমরা ভেতরে ঢুকব!”
“গোপন পরীক্ষা চলবে না!”

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই অন্বেষার কণ্ঠস্বর ভেসে এল—শান্ত কিন্তু দৃঢ়, “ডক্টর, আমি পালাতে চাই।”

সমরবাবু চমকে উঠলেন। ফিসফিস করে বললেন, “না! বাইরে গেলে তুমি ভিড়ের মাঝে ধরা পড়বে।”

“কিন্তু এখানে থাকলে আরও বিপদ। তারা আমাকে খুঁজে পাবে। আমি… আমি চেষ্টা করতে চাই।”

কথা শেষ হতেই দরজার ফাঁক দিয়ে বাতাস কেঁপে উঠল। অফিসাররা একসাথে ঘুরে তাকাল, যেন অদৃশ্য কিছুর চলাচল টের পেয়েছে।

সমরবাবু শ্বাস আটকে রাখলেন। অন্বেষা নিঃশব্দে দরজার দিকে এগোচ্ছে। বাইরে জনতার ভিড়, কৌতূহল, ভয়। সে জানে, তার অস্তিত্ব প্রমাণ হয়ে গেলে পৃথিবীর কাছে সে আর মানুষ থাকবে না—সে হবে এক ‘বস্তু’, এক ‘অস্ত্র’।

কিন্তু অদৃশ্যতার ভেতরেও সে অনুভব করছে—সে বেঁচে আছে, তার নিজের ইচ্ছা আছে।

অফিসাররা চিৎকার করে উঠল, “দরজা বন্ধ করো!”

কিন্তু ততক্ষণে দমকা হাওয়া বইয়ে দরজা অল্প ফাঁক হয়ে গেল। কেউ বুঝে ওঠার আগেই অদৃশ্য অন্বেষা সেই ফাঁক গলিয়ে বাইরে চলে গেল।

বাইরে জনতার গলাগলি। তারা টের পাচ্ছে, কিছু অদ্ভুত জিনিস পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে—কেউ কেউ ভয় পেয়ে চিৎকার করছে, “ভূত! ভূত!”

অফিসাররা দৌড়ে বেরোল, সমরবাবু হতাশ হয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন। তাঁর বুকের ভেতর একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
সে কোথায় যাবে? এই পৃথিবী কি তাকে মেনে নেবে?

অদৃশ্য অন্বেষা জনতার ভিড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেল—তার শরীর নেই, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে সে শুনছে মানুষের ভয়ের প্রতিধ্বনি। আর তার নিজের বুকেও জন্ম নিচ্ছে এক গভীর প্রশ্ন—
অস্তিত্ব মানে আসলে কী?

পর্ব –

শহরের রাস্তায় ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। চায়ের দোকানে ভিড় জমেছে, লোকজন রুটির দোকানের সামনে সারি দিয়েছে। সেই ভিড়ের মাঝেই নিঃশব্দে হাঁটছে অদৃশ্য অন্বেষা। কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু তার স্পর্শে হঠাৎ কোনো কাপ উল্টে যাচ্ছে, হাওয়ার ঝাপটা লাগছে মানুষের গায়ে। মানুষ চমকে উঠছে—
“ওই! কে গেল?”
“ভূত নাকি?”

অল্প সময়ের মধ্যেই গুজব ছড়িয়ে পড়ল—কলকাতার রাস্তায় নাকি অদৃশ্য প্রেত ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষজন ভয়ে ফিসফিস করছে, আবার কৌতূহল নিয়ে খুঁজছে অদ্ভুত ঘটনাগুলো।

অন্যদিকে সমরবাবু ল্যাবে বসে আছেন, চোখে নিদ্রাহীন ক্লান্তি। তিনি জানেন, অন্বেষা বাইরে বেরিয়ে গেছে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা—সরকার, সংবাদমাধ্যম, সাধারণ মানুষ—সবাই একদিন না একদিন জানতে পারবে, শহরের বুকেই অদৃশ্য এক কিশোরী ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তিনি কম্পিউটারের স্ক্রিনে নতুন সমীকরণ আঁকছেন। প্রতিষেধক তৈরি করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কিন্তু এর জন্য তাঁর দরকার সময়, যেটা তাঁর হাতে নেই। ফোনের টেবিলটা হঠাৎ বেজে উঠল। ওপাশে এক ঠাণ্ডা কণ্ঠ—
“ডক্টর সেন, শহরে গুজব ছড়াচ্ছে। যদি আমরা প্রমাণ পাই যে আপনার গবেষণা জনসমক্ষে ফাঁস হয়েছে, তবে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।”

সমরবাবু ফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমি কি বিজ্ঞানী হিসেবে ব্যর্থ হচ্ছি, নাকি মানুষ হিসেবে?

এদিকে অন্বেষা হাঁটতে হাঁটতে কলেজ স্ট্রিটে চলে এসেছে। বইয়ের দোকানের ভিড়, লাল ইটের বাড়ির গলি। তার চোখে জল এসে গেল। সে মনে করল নিজের মা’কে—সকালবেলা হয়তো খুঁজছে, ডেকে ডেকে হাহাকার করছে। কিন্তু সে যদি ফিরে যায়, মা শুধু শুনতে পাবে তার কণ্ঠ, দেখতে পাবে না মুখ। সেই দৃশ্য সহ্য করতে পারবে কি?

হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে এক কিশোর ছেলেকে দেখল (যদিও সে দেখতে পাচ্ছে, ছেলে তাকে দেখতে পাচ্ছে না)। অন্বেষার মনে হলো—কতটা সহজ জীবন ওর, কতটা স্বাভাবিক। আমার মতো কেউ থাকলে, কি ভয় পেত, না বন্ধুত্ব করত?

এক অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে।

কিন্তু মানুষের ভিড় ততক্ষণে টের পাচ্ছে কিছু অস্বাভাবিক। এক দোকানদার হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “এই যে! বইগুলো কে ফেলে দিল?” বইয়ের গাদা নিজে থেকেই পড়ে যাচ্ছে। লোকজন দৌড়ে এলো। “এটা তো ভূতের কাজ!”

মুহূর্তে চারপাশে ভিড়, আতঙ্ক, অস্থিরতা। কেউ পাথর ছুড়ল বাতাসে, কেউ মন্ত্র পড়তে শুরু করল। অন্বেষা ভয়ে সরে গেল।

তার মনে হলো—আমি কি সত্যিই ভূত হয়ে যাচ্ছি মানুষের চোখে?

ঠিক তখনই একটি ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল। সংবাদমাধ্যমের এক লোক ছবি তুলছে। যদিও কিছুই ধরা পড়ল না, কিন্তু ভিড়ের হুলস্থুল আর সাংবাদিকদের গুজবে শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠল।

“কলকাতায় অদৃশ্য ছায়া!”—শিরোনাম ছাপা হতে দেরি হলো না।

ল্যাবে বসে সমরবাবু খবর শুনে মাথা হাতে নিলেন। এখন অন্বেষা শুধু একটি দুর্ঘটনার শিকার নয়—সে হয়ে উঠছে এক জনশ্রুতি, এক ভয়াবহ রহস্য।

আর ঠিক তখনই, দরজার সামনে দাঁড়াল দু’জন এজেন্ট।
“ডক্টর সেন, আপনার গবেষণা এবার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যাবে। শহরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আর আপনার লুকোনোর চেষ্টা এখানেই শেষ।”

সমরবাবুর বুক কেঁপে উঠল। তিনি বুঝলেন—এবার তাকে বিজ্ঞানী হিসেবে নয়, অভিভাবক হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অদৃশ্য অন্বেষা এদিকে শহরের ভিড় থেকে দূরে সরে হাঁটছে। তার বুকের ভেতরে একটাই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—
আমি কি মানুষ, না কেবল ভয়?”

পর্ব –

কলকাতা শহর যেন হঠাৎ এক অদ্ভুত আতঙ্কে ভরে উঠল। রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান, এমনকি বাসের জানালার আড়াল থেকেও মানুষ ফিসফিস করছে—
“সত্যিই কি অদৃশ্য ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছে?”
“কাল রাতে বইয়ের দোকানে নিজের চোখে দেখেছি—কেউ নেই, অথচ বই উড়ে পড়ছে!”
“এটা নিশ্চয়ই সরকারের গোপন পরীক্ষা!”

সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বড় শিরোনাম—
অদৃশ্য ছায়া: গুজব না বিজ্ঞান?”

এই সব শিরোনামের নিচেই লুকিয়ে আছে সমরবাবুর আতঙ্ক। তাঁর বুকের ভেতর কাঁপন থামছে না। তিনি জানেন, শহরে যত গুজব ছড়াবে, সরকারের চাপ তত বাড়বে। আর সেই চাপের প্রথম শিকার হবে তিনি নিজে।

ল্যাবরেটরির ভেতরে বসে তিনি নিজের ডায়েরিতে লিখলেন—
আমি যা তৈরি করেছি, সেটা হয়তো মানবজাতির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আবিষ্কার। আলো শোষণ করে শরীরকে অদৃশ্য করে দেওয়া, শুনতে যতটা অলৌকিক, বাস্তবে ততটাই বিপজ্জনক। মানুষ এর ব্যবহার শিখলে একে অপরকে বিশ্বাস করার সব দেয়াল ভেঙে যাবে। তখন সমাজ ভেঙে পড়বে।”

ঠিক তখনই ভেতরে হালকা শব্দ হলো। চেয়ার টলল।
“ডক্টর…” অন্বেষার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“তুমি ফিরে এসেছ?” সমরবাবুর কণ্ঠে স্বস্তি আর আতঙ্ক মিশ্রিত।

“হ্যাঁ,” অন্বেষা বলল, নিঃশ্বাস ভারী শোনাচ্ছে। “শহরে সবাই ভয়ে চিৎকার করছে। আমি… আমি মানুষের সামনে আর যেতে চাই না।”

সমরবাবু তার দিকে তাকালেন—যদিও তাকানোর মতো কিছু নেই, কেবল শূন্যতা।
“তুমি এখানে নিরাপদ থাকবে, অন্বেষা। কিন্তু…” তাঁর গলায় কষ্ট মিশে গেল, “আমার হাতে সময় নেই। সরকার খুব শিগগির ল্যাব দখল করে নেবে। তখন তোমার অস্তিত্ব গোপন রাখা অসম্ভব।”

“তাহলে কী হবে?” অন্বেষার কণ্ঠে কাঁপন।

সমরবাবু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আমাকে প্রতিষেধক তৈরি করতেই হবে। কোনোভাবে তোমাকে আবার দৃশ্যমান করে তুলতে হবে।”

অন্বেষা নিশ্চুপ। তার মনে হয়—যদি আমি আবার দৃশ্যমান না হই? যদি সারা জীবন এভাবেই থাকতে হয়?

কিন্তু তার চিন্তার মাঝেই বাইরে দরজায় ধাক্কা। একদল লোক গলা চড়িয়ে বলছে,
“ডক্টর সেন, আপনি আমাদের কাছে জবাব দেবেন! ভেতরে কী গোপন হচ্ছে?”

এবার শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সঙ্গে এসেছে স্থানীয় এক সংবাদ চ্যানেল। ক্যামেরা তাক করা, মাইক্রোফোন এগিয়ে ধরা।

সমরবাবুর বুক ধকধক করছে। তিনি জানেন, ল্যাব খুললেই জনতার সামনে সত্যি ফাঁস হয়ে যাবে।

অদৃশ্য অন্বেষা ধীরে ধীরে তাঁর কানের কাছে এসে ফিসফিস করল,
“ডক্টর, যদি আমার অস্তিত্ব মানুষ জানতে পারে, তারা আমাকে মানুষ হিসেবে মানবে না। তারা আমাকে ভয় পাবে… ব্যবহার করবে… বন্দি করবে। আমি কি কখনো আবার মানুষ হয়ে উঠতে পারব?”

সমরবাবুর চোখ ভিজে এল। তিনি ঠোঁট কামড়ে নীরবে বললেন,
“অস্তিত্ব মানে শুধু দেখা নয়, অন্বেষা। তুমি আছো—তোমার কণ্ঠে, তোমার অনুভূতিতে, তোমার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায়।”

কিন্তু বাইরে জনতার গর্জন বাড়ছে। সরকারও যে কোনো মুহূর্তে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারে।

আর তখনই সমরবাবুর মাথায় এক ঝটকা আইডিয়া এলো। যদি তিনি গবেষণার ডেটা নষ্ট করে দেন? যদি সমস্ত সূত্র মুছে দেন, তবে অন্তত রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র যাবে না। কিন্তু তাতে অন্বেষাকে ফেরানোর উপায়ও হারিয়ে যাবে।

তিনি দ্বিধার মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলেন—বিজ্ঞানী হিসেবে নাকি অভিভাবক হিসেবে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন?

পর্ব –

ল্যাবরেটরির চারপাশে মানুষের ভিড় আরও ঘন হতে লাগল। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা ঝলসে উঠছে, মাইক্রোফোনে রিপোর্টাররা চেঁচাচ্ছে—
“ডক্টর সেন কিছু লুকোচ্ছেন!”
“সরকারের গোপন পরীক্ষা মানুষের সামনে আনতেই হবে!”

ভেতরে সমরবাবু চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। চোখেমুখে নিদ্রাহীন ক্লান্তি, বুকের ভেতর তীব্র দ্বিধা। তাঁর সামনে কম্পিউটারের স্ক্রিনে জ্বলছে অদৃশ্য কোষের জেনেটিক কোড—বহু বছরের গবেষণার ফল। কেবল একটি বোতামে চাপলেই সব ডেটা ধ্বংস হয়ে যাবে।

অদৃশ্য অন্বেষা তাঁর পাশেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে—
“ডক্টর, আপনি যদি সব নষ্ট করে দেন, তবে আমি কখনো আর ফিরতে পারব না।”

সমরবাবু চোখ বন্ধ করলেন।
“হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু যদি এই সূত্র রাষ্ট্রের হাতে যায়, তবে পৃথিবীতে আর কেউ নিরাপদ থাকবে না। বিশ্বাস ভেঙে যাবে, প্রতিটি ঘরে শত্রু লুকিয়ে থাকবে। অদৃশ্যতার অস্ত্র মানেই সভ্যতার পতন।”

বাইরে তখন গলা চড়াচ্ছে ভিড়—
“দরজা খোলো!”
“আমরা জানতে চাই!”

ঠিক তখনই এক তীব্র সাইরেনের শব্দ। কালো ভ্যানে ভিড় ঠেলে নেমে এল সরকারি এজেন্টরা। মুহূর্তে ল্যাব ঘিরে ফেলা হলো। সশস্ত্র বাহিনী ভেতরে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্বেষার শ্বাস কেঁপে উঠল।
“ডক্টর, ওরা আমাকে পেলে নিয়ে যাবে। আমি আর মানুষ থাকব না, শুধু পরীক্ষার বস্তু হয়ে যাব।”

সমরবাবুর মস্তিষ্কে যেন বজ্রাঘাত হলো। তিনি জানলেন—এখন আর মাঝামাঝি পথ নেই। হয় অন্বেষার অস্তিত্ব রক্ষা করবেন, নয় নিজের আবিষ্কার রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবেন।

তিনি কাঁপা হাতে কীবোর্ডের দিকে ঝুঁকলেন। ডিলিট বাটনের ওপর আঙুল স্থির হলো।
কিন্তু তখনই অন্বেষা হঠাৎ বলল—
“না ডক্টর! এটা করবেন না। আপনি যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন আমি মানুষ, তবে আমার অস্তিত্বও প্রমাণ করতে হবে পৃথিবীর সামনে। আমাকে গোপন করে রাখলে আমি অর্ধেক হয়ে যাব। আমি চাই, সবাই জানুক—আমি আছি, আমি মানুষ।”

সমরবাবু স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল—সে কি প্রস্তুত? মানুষ তাকে গ্রহণ করবে, না ভয় পাবে?

বাইরে এজেন্টরা দরজায় লাথি মারছে। ভেতরে আলো ঝলসে উঠছে কম্পিউটার স্ক্রিনে।

ঠিক তখনই সমরবাবু এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সমস্ত ডেটা ধ্বংস না করে এক গোপন ড্রাইভে স্থানান্তর করলেন। আর প্রকাশ করলেন কেবল অর্ধেক সত্য—যাতে রাষ্ট্র বুঝতে পারে গবেষণা চলছে, কিন্তু আসল ফলাফল এখনও অসম্পূর্ণ।

দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল এজেন্টরা। বন্দুক তাক করা, চোখে সন্দেহ।
“ডক্টর সেন, সব তথ্য আমাদের হাতে তুলে দিন।”

সমরবাবু শান্ত স্বরে বললেন,
“গবেষণা অসম্পূর্ণ। আপনারা চাইলে কাগজপত্র দেখতে পারেন।”

এজেন্টরা নথি ঘাঁটতে লাগল। তাদের চোখে সন্তুষ্টি নেই, কিন্তু প্রমাণও নেই।

আর ঘরের এক অদৃশ্য কোণে দাঁড়িয়ে অন্বেষা অনুভব করল—তার জীবন এখন শুধু এক বিজ্ঞানীর গোপন রহস্য নয়, বরং এক প্রশ্নচিহ্ন পৃথিবীর সামনে।
অদৃশ্য হলেও সে বেঁচে আছে। আর সেই বেঁচে থাকাটাই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।

পর্ব –

ল্যাবরেটরির ভেতরে এখন যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা। সরকারি এজেন্টরা নথি উল্টেপাল্টে দেখছে, যন্ত্রপাতির ছবি তুলছে, আর বারবার সন্দেহভরা চোখে সমরবাবুর দিকে তাকাচ্ছে।

প্রধান এজেন্ট বলল, “ডক্টর সেন, আমরা উপরতলায় রিপোর্ট দেব। যদি প্রমাণ পাই আপনি কিছু লুকোচ্ছেন, তবে আপনার ল্যাব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে।”

সমরবাবু ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিলেন, “আমি বিজ্ঞানী। আমি গবেষণা গোপন করি না, অসম্পূর্ণ থাকলে শুধু প্রকাশ করি না।”

এজেন্টরা বেরিয়ে গেলেও চারপাশে টের পাওয়া যাচ্ছিল—ল্যাব এখন নজরদারির আওতায়। জানালার বাইরে কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে, রাস্তায় লোকজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

অদৃশ্য অন্বেষা নিঃশব্দে সমরবাবুর পাশে এসে দাঁড়াল। তার গলা বিষণ্ন, “ডক্টর, আমি কি চিরদিন এভাবেই থাকব? মানুষের চোখে অদৃশ্য?”

সমরবাবু চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “আমি প্রতিষেধকের কাজ শুরু করেছি। কিন্তু ভয় পাচ্ছি, হয়তো তোমাকে ফিরিয়ে আনতে পারব না।”

অন্বেষা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ বলল, “যদি আমি ফিরতে না পারি, তবে অন্তত চাই মানুষ জানুক আমি আছি। আমি শুধু এক্সপেরিমেন্ট নই—আমি একজন মানুষ।”

সমরবাবুর বুক ভারী হয়ে গেল। তিনি জানেন, সমাজ হয়তো তাকে মেনে নেবে না। অদৃশ্য মানুষ মানেই আতঙ্ক, সন্দেহ, শত্রু। কিন্তু অন্বেষার কণ্ঠে যে দৃঢ়তা, সেটা উপেক্ষা করার মতো নয়।

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ওপাশে সাংবাদিকের কণ্ঠ—
“ডক্টর সেন, শুনেছি আপনার ল্যাবে অদ্ভুত পরীক্ষা চলছে। শহরে ভূতের গুজব ছড়িয়েছে। আপনি কি ব্যাখ্যা দেবেন?”

সমরবাবু ফোন কেটে দিলেন। কিন্তু তিনি বুঝলেন, সময় ফুরিয়ে আসছে।

রাত নামল। ল্যাবের আলো নিভে এল, শুধু কম্পিউটারের স্ক্রিনে কোষের গ্রাফ ভেসে উঠছে। সমরবাবু তাতে ডুবে আছেন, সমাধান খুঁজছেন।

হঠাৎ তিনি কানে ফিসফিস শুনলেন।
“ডক্টর… জানেন, অদৃশ্য হয়ে আমি প্রথমবার বুঝলাম, মানুষকে দেখা আর মানুষ হওয়া আলাদা বিষয়। কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না, তবু আমি আছি। আমার ভয় আছে, ভালোবাসা আছে, ইচ্ছে আছে। তাহলে আমি অদৃশ্য হলেও মানুষ, তাই না?”

সমরবাবুর চোখ ভিজে উঠল। তিনি ধীরে বললেন,
“হ্যাঁ অন্বেষা, তুমি মানুষ। আর তোমার এই প্রশ্নই হয়তো আমাদের সভ্যতার আয়না।”

কিন্তু সেই মুহূর্তেই বাইরে সাইরেনের শব্দ। ল্যাব ঘিরে ফেলেছে সেনা। মাইক্রোফোনে ঘোষণা—
“ডক্টর সেন, দরজা খুলুন। রাষ্ট্রের নির্দেশ অমান্য করলে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।”

সমরবাবু কাঁপা হাতে কম্পিউটারের পাশে দাঁড়ালেন। একদিকে গবেষণার ডেটা, অন্যদিকে অদৃশ্য অন্বেষার অস্তিত্ব।

তিনি জানেন, আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর সবকিছু বদলে যাবে।

আর অন্বেষা নিঃশব্দে ফিসফিস করল—
ডক্টর, আমাকে বাঁচানোর চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—আমার অস্তিত্ব কি পৃথিবী মেনে নেবে?”

পর্ব – ১০

ল্যাবরেটরির দরজার বাইরে সাইরেনের শব্দ তীব্রতর হচ্ছিল। লাল আলো ঝলসে উঠছে, মাইক্রোফোনে চিৎকার ভেসে আসছে—
“ডক্টর সেন, দরজা খুলুন! গবেষণা রাষ্ট্রের সম্পত্তি। অবিলম্বে সমর্পণ করুন।”

ভেতরে সমরবাবু স্থির দাঁড়িয়ে, কপাল ভিজে গেছে ঘামে। একদিকে তাঁর কম্পিউটারের স্ক্রিনে ঝলসে উঠছে বছরের পর বছর পরিশ্রমের ফল—অদৃশ্য কোষের সূত্র। অন্যদিকে ল্যাবের অদৃশ্য কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে অন্বেষা—এক কিশোরী, যে দুর্ঘটনায় হয়ে গেছে অস্তিত্বের নতুন সংজ্ঞা।

“ডক্টর,” অন্বেষার গলা ফিসফিস করে কাঁপছিল, “ওরা ভেতরে ঢুকলে আমাকে নিয়ে যাবে। আমি পরীক্ষার বস্তু হয়ে যাব। আমি কি কখনো মানুষ থাকতে পারব?”

সমরবাবুর বুকের ভেতরে বজ্রপাত হলো। তিনি জানলেন, আজ কোনো মধ্যপথ নেই। হয় তিনি রাষ্ট্রকে সবকিছু দিয়ে দেবেন, নয়তো অন্বেষাকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে বলি দিতে হবে।

তিনি হঠাৎ ডেস্কের দিকে ঝুঁকলেন। দ্রুত টাইপ করতে লাগলেন। অদৃশ্য কোষের সব তথ্য এক গোপন এনক্রিপ্টেড ড্রাইভে স্থানান্তর করলেন। তারপর কম্পিউটারের মূল হার্ডড্রাইভে চাপ দিলেন ডিলিট বোতামে। মুহূর্তে স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।

ঠিক তখনই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল এজেন্টরা। বন্দুক তাক করা, চোখে আগুন।
“ডক্টর সেন, ডেটা কোথায়?”

সমরবাবু শান্ত গলায় বললেন, “গবেষণা ব্যর্থ হয়েছে। কোনো কার্যকর ফল আসেনি।”

এজেন্টরা চেঁচিয়ে উঠল, “আপনি মিথ্যে বলছেন!” তারা চারদিকে খুঁজতে লাগল, যন্ত্রপাতি ওলটপালট করে দেখল। কিন্তু আসল তথ্য তাদের হাতে এল না।

এদিকে অন্বেষা নিঃশব্দে পিছু হটল। বাইরে এখনো ভিড়, সংবাদমাধ্যম, আতঙ্কে কাঁপা জনতা। সে বুঝল, তার সামনে একমাত্র পথ—নিজেকে পৃথিবীর সামনে প্রকাশ করা।

সে ফিসফিস করে বলল, “ডক্টর, আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারব না। আমি বের হব।”

সমরবাবু চমকে উঠলেন। “না অন্বেষা! বাইরে মানুষ তোমাকে মেনে নেবে না। তারা তোমাকে ভয় পাবে।”

কিন্তু কিশোরীর কণ্ঠ দৃঢ় হলো, “ভয় যদি সত্যিই থাকে, তবে সেই ভয় ভাঙতে হবে। আমি অদৃশ্য হলেও মানুষ। এটা আমাকে সবাইকে দেখাতে হবে।”

দরজার ফাঁক গলে সে বাইরে চলে গেল। মানুষ হঠাৎ চমকে উঠল—কেউ নেই, অথচ পদক্ষেপ শোনা যাচ্ছে, বাতাস কাঁপছে। সাংবাদিকরা চিৎকার করল,
“দেখুন! অদৃশ্য ছায়া!”

জনতার ভিড় একসাথে চেঁচিয়ে উঠল—“ভূত! ভূত!”
আবার কেউ ফিসফিস করে বলল—“না… হয়তো এটা বিজ্ঞান।”

অন্বেষা গলা চড়াল, তার কণ্ঠ ভিড়ের উপর দিয়ে ভেসে উঠল—
“আমি ভূত নই। আমি একজন মানুষ। আমি আছি। তোমরা আমাকে দেখতে পাচ্ছ না, তবুও আমার ভয় আছে, স্বপ্ন আছে, বাঁচার ইচ্ছে আছে। অদৃশ্য হলেই মানুষ হওয়া বন্ধ হয় না।”

মুহূর্তে চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। সাংবাদিকদের ক্যামেরা অকারণে ঝলসে উঠছে, মানুষ অবিশ্বাসে তাকিয়ে আছে শূন্যে।

সমরবাবু ল্যাবের ভেতর থেকে দাঁড়িয়ে শুনলেন এই ঘোষণা। তাঁর চোখে জল চলে এল। সে অদৃশ্য হয়েও নিজেকে দৃশ্যমান করে তুলেছে—শুধু কণ্ঠের শক্তিতে।

সরকারি এজেন্টরা হতভম্ব। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। এক অফিসার ঠোঁট কামড়ে বলল, “ওকে আমরা আটকাতে পারব না। মানুষ এখন ওকে অস্ত্র নয়, প্রতীকে দেখছে।”

রাত নামার আগেই খবর ছড়িয়ে পড়ল—কলকাতায় অদৃশ্য কিশোরী: বিজ্ঞান না নতুন মানব?”

সমরবাবু জানলেন, তাঁর আবিষ্কার হয়তো আর কোনোদিন লুকিয়ে রাখা যাবে না। কিন্তু তিনি এটাও জানলেন, অন্বেষা প্রমাণ করে দিয়েছে—অস্তিত্ব মানে কেবল দেখা নয়, বরং অনুভব করা, শোনার মতো কণ্ঠ থাকা, বেঁচে থাকার দাবি রাখা।

সেদিন রাতের শেষে শহরের আকাশে অদৃশ্য কিশোরীর কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—
আমি আছি। আমি মানুষ।”

এবং সমরবাবু নিঃশব্দে ফিসফিস করে বললেন,
“হ্যাঁ অন্বেষা, তুমি মানুষ। আর হয়তো তুমিই আমাদের আগামী পৃথিবীর আয়না।”

শেষ

WhatsApp-Image-2025-09-01-at-2.28.01-AM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *