তুষার অধিকারী এক আষাঢ় মাসের শেষভাগ। ঘন মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে চিংড়িঘাটের ঘোলা জল থেমে থাকলেও বাতাস কাঁপিয়ে চলেছে। বোটের ইঞ্জিনের একটানা গর্জন ঠেলে, গহীন ম্যানগ্রোভের মধ্যে ঢুকে পড়ছে এক গবেষক দলের চার সদস্য—ড. অদিতি সেন, সম্রাট দে, জয়ন্ত ঘোষ ও স্থানীয় গাইড বীরাজ মুখার্জি। চারপাশে থমথমে নিরবতা। মাঝে মাঝে দূরে শোনা যায় ময়ূরের ডাক, আবার কোথাও চাঁদিয়ালের তীক্ষ্ণ শব্দ। গঙ্গার শাখা নদী ঘেঁষে বোটটা এগোচ্ছে, সঙ্গে করে যাওয়া খাবার, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন, ল্যাপটপ, আর একরাশ কৌতূহল। অদিতি চোখ মেলে দেখছেন—দু’পাশে যে বন, সেটাকে শুধুই গবেষণার বিষয় বলে মনে করা ভুল হবে। একটা অলিখিত অনুভব যেন সঙ্গী হয়ে এসেছে—এই বনের…
-
-
নির্মাল্য বসু এক হেমন্তের সকালে কলকাতার আকাশ ছিল ধোঁয়াটে, যেন স্মৃতি জমা ধুলোয় ধরা পড়ে আছে। ড. অনিরুদ্ধ বসু তার বাগুইআটির ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে সিগারেট ধরালেন, সামনে একটা পুরনো কাঠের টেবিলে ছড়ানো ইতিহাসের বইপত্র আর হিন্দু-মিথলজির লিপিবদ্ধ নথি। গত কয়েক বছর ধরে তিনি সক্রিয় গবেষণা থেকে দূরে ছিলেন, কিন্তু পুরনো অভ্যাসটা এখনও যায়নি—প্রতিদিন ভোরবেলা ধোঁয়ায় মিশে যাওয়া শহরটাকে দেখতে দেখতে কল্পনায় ফিরে যেতেন হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার দিকে। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। কেয়ারটেকার কমল একটা বাদামি খাম এগিয়ে দিল—অদ্ভুত ধরনের মোটা কাগজে মোড়া, প্রেরকের নাম নেই, শুধু লেখা: “ড. অনিরুদ্ধ বসু, পুরাতত্ত্ব গবেষক, কলকাতা।” খাম খুলে অনিরুদ্ধ প্রথমে দেখলেন একটা…
-
তন্ময় পাল ঘটনাটা শুরু হয়েছিল বর্ষার ঠিক আগের সময়ে, যখন আকাশ সারাদিন ধরেই ঝিম মেরে থাকে আর বাতাসে একটা ভিজে মাটির গন্ধ হালকা হালকা দোলা দেয়। আমি, শীর্ষ, তখন সদ্য কলেজে উঠেছি। আমার বাবা একজন পুরাতত্ত্ববিদ, মাটি খুঁড়ে ইতিহাসের হাড়গোড় জোগাড় করাই তার কাজ। সেবার বাবার এক বন্ধুর আমন্ত্রণে আমরা গেলাম নদিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে, নাম—চৌবাগান। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা ভাঙাচোরা খাজাঞ্চিঘর, যেখানে ব্রিটিশ আমলে নাকি রাজবাড়ির সম্পদ রক্ষিত থাকত। সেই ঘরটা নিয়েই যত রহস্য। আমরা যে বাড়িটায় উঠলাম, সেটা ছিল একটা পুরোনো বনেদি দোতলা, লাল ইটের দেয়াল, আর জংধরা লোহার দরজা। ঘরের চারদিকে ঘন অশ্বত্থ আর পাকুড় গাছ, আর…
-
উন্মেশ বসু অধ্যায় ১: ছেলেবেলার কোনো এক দুপুরে তারা চারজন একসাথে গাছের ছায়ায় বসে স্বপ্ন দেখেছিল—একদিন পালিয়ে যাবে কোথাও, যেখানে কোনো নিয়ম নেই, যেখানে কেউ বলবে না “এই করিস না”, “ওটা ঠিক নয়”, “তুই বড় হয়ে যা”। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতে আজকের সকালটাই তাদের জন্য নিযুক্ত ছিল। স্কুলের ইউনিফর্ম পরে বেরিয়ে পড়া হলেও, গন্তব্য ছিল না ক্লাসরুম; বরং শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে। সৌরভের লাল কালো পালসার বাইক, তিয়াসার বাবার ফেলে যাওয়া ফুজি ক্যামেরা, অভির ছোট্ট নোটবুক আর ঋষভের মাথাভর্তি পাগলামি—এই ছিল তাদের রসদ। স্টেশনের ফুটওভার ব্রিজের পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে অভি একবার শেষবারের মতো বলল, “আচ্ছা, আমরা ঠিক তো…