পাহাড় ডাকে চুপিচুপি

Spread the love Post Views: 218 উন্মেশ বসু অধ্যায় ১: ছেলেবেলার কোনো এক দুপুরে তারা চারজন একসাথে গাছের ছায়ায় বসে স্বপ্ন দেখেছিল—একদিন পালিয়ে যাবে কোথাও, যেখানে কোনো নিয়ম নেই, যেখানে…

Spread the love

উন্মেশ বসু


অধ্যায় ১:

ছেলেবেলার কোনো এক দুপুরে তারা চারজন একসাথে গাছের ছায়ায় বসে স্বপ্ন দেখেছিল—একদিন পালিয়ে যাবে কোথাও, যেখানে কোনো নিয়ম নেই, যেখানে কেউ বলবে না “এই করিস না”, “ওটা ঠিক নয়”, “তুই বড় হয়ে যা”। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতে আজকের সকালটাই তাদের জন্য নিযুক্ত ছিল। স্কুলের ইউনিফর্ম পরে বেরিয়ে পড়া হলেও, গন্তব্য ছিল না ক্লাসরুম; বরং শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে। সৌরভের লাল কালো পালসার বাইক, তিয়াসার বাবার ফেলে যাওয়া ফুজি ক্যামেরা, অভির ছোট্ট নোটবুক আর ঋষভের মাথাভর্তি পাগলামি—এই ছিল তাদের রসদ। স্টেশনের ফুটওভার ব্রিজের পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে অভি একবার শেষবারের মতো বলল, “আচ্ছা, আমরা ঠিক তো করছি তো?” ঋষভ এক গাল হেসে বলল, “জীবনে কিছু ভুল করতেই হয়… সেটা না করলে কাহিনীই নেই!” তিয়াসা চায়ের কাপটা ক্যামেরার লেন্সের সামনে ধরে বলল, “ভ্লগের নাম রাখবো ‘পালাবার দিন’… ঠিক আছে তো?” সৌরভ বাইকটা স্ট্যান্ড থেকে উঠিয়ে বলল, “চল, এবার শুরু করি।”

যাত্রার শুরুটা ঠিক সিনেমার মতো ছিল। ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় তাদের তিনজনের মুখে ছিল অদ্ভুত রোমাঞ্চ, যেন এক অনিশ্চিত অভিযানে যাওয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলেনি—একেকজনের মনে আলাদা আলাদা ঝড়। অভি জানে, তার মায়ের চোখে আজ সকালটা খুব ভারী হবে, কারণ সে চুপিচুপি এক চিঠি রেখে এসেছে ‘আমি ভাল আছি’ লেখা। তিয়াসা জানে, এই ট্রিপ তার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট—যেখানে তার পরিচয় আর সাহসের গল্প তৈরি হবে। আর ঋষভ—সে শুধু জানে, যদি এখন না করে, তাহলে আর কখনই নয়। ট্রেনটা মালদহ পেরিয়ে যখন পাহাড়ের রেখা চোখে পড়তে শুরু করল, তখন হঠাৎ সৌরভ বলে উঠল, “তোমরা জানো? আমার দাদাও একদিন এমন করেই চলে গেছিলো। তারপর আর ফেরেনি।” বাকিরা চুপ করে যায়। ট্রেনের জানালা দিয়ে আসা হাওয়ায় তখন একটা অন্যরকম গন্ধ—যেন নিজের জীবনের কোনো বন্ধ দরজা খুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

দিন গড়ায়, ট্রেন গড়ায়, আর ধীরে ধীরে খুলে যেতে থাকে তাদের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো। নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছনোর পর তারা ঠিক করে শিলিগুড়ির দিক ধরে বাইকে আরও এগোবে। ঋষভ বলল, “এই রোডটা ধরে নাকি এক জায়গায় একটা পরিত্যক্ত বাংলো আছে, যা নাকি হন্টেড।” তিয়াসা চোখ চকচক করে বলে, “সিরিয়াসলি? তাহলে আজ রাতটা সেখানেই কাটাবো?” অভি মাথা নাড়ে, “আমরা রোড ট্রিপ করতে এসেছি, ভূতের গল্প শুনতে না।” কিন্তু ততক্ষণে রোদের তীব্রতা কিছুটা কমে এসেছে, আর পাহাড়ি পথের দু’ধারে সবুজের আলপনা যেন রূপকথার চিত্র এঁকে রেখেছে। সৌরভ বাইকের গতি বাড়িয়ে দেয়, পিছনে বসে ঋষভ চিৎকার করে গান গাইতে থাকে, আর অন্যদুই ট্রেনে আসা বন্ধুরা বাইক আসার কথা ভেবে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে বসে পড়ে। হঠাৎ দূর থেকে এক বৃদ্ধ লোক এসে বলে, “এই রোডে আজ রাতে থাকিস না বাবা… একবার কেউ পাহাড়ের ওপারে গেলে আর ফেরে না।” কথাটা শুনে তারা হেসে ফেলে—এটা তো সেই অ্যাডভেঞ্চারেরই শুরু, যার অপর নামই “অপর নাম অ্যাডভেঞ্চার”।

অধ্যায় ২:

সন্ধে নামতে নামতেই তারা পৌঁছে গেল সেই পুরনো বাংলোটার সামনে, যার কথা ঋষভ শুনেছিল এক ট্রেকার বন্ধুর কাছ থেকে। বাংলোটার গায়ে ফাটল ধরা রঙ, ভাঙাচোরা দরজা আর জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা পাতাঝরা গাছের ডাল যেন নিঃশব্দে বলছে — এখানে সময় থেমে গেছে। রাস্তার পাশেই ছিল এক সরু কাঁচা পথ, যেটা বনে মিশে গিয়েছিল। সৌরভ গাড়ি থামিয়ে বলল, “এখানে রাত্রি কাটাবো? সত্যি?” অভি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তিয়াসা ইতিমধ্যে ক্যামেরা নিয়ে নেমে পড়েছে। “এই তো সেই কন্টেন্ট যা আমার ভ্লগের হেডলাইন হতে পারে — ‘চার কিশোর আর একটি ভূতুড়ে রাত!’” সে উত্তেজিতভাবে বলে ওঠে। ঋষভ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। এক মুহূর্তের জন্য যেন বাতাস থেমে যায়, একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, কাঠের চিড়বিড় শব্দ আর কোথাও একটা যেন কুকুর ডেকে ওঠে দূরে। “ভয় পাচ্ছিস না তো?” ঋষভ পেছনে তাকিয়ে বলে। সৌরভ শান্তভাবে বলে, “ভয় পেলে তো চলবে না… আমরা তো এসেছি নিয়ম ভাঙতে।”

ভিতরের ঘরটা অনেকটা ধুলোয় মোড়া হলেও দেওয়ালে টাঙানো পুরনো ফ্রেমে এক ব্রিটিশ যুগের পরিবারের ছবি এখনো টিকে আছে। তিয়াসা মজা করে বলে, “দেখেছো, এরা আমাদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিল।” অভি কিছুটা অস্বস্তিতে বলে, “এসব জায়গা নিয়ে এত রসিকতা করিস না… কখন কী ঘটে কে জানে।” তারা মোমবাতি জ্বালিয়ে, থার্মোকলের কাপ-নুডলস গরম করে, নিজেদের মতন করে একটা রাতের শিবির তৈরি করে। আলোছায়ায় মুখগুলো যেন আর একটু পরিণত হয়ে ওঠে। সেই রাতে অনেক অজানা কথা বলা হয় — অভি জানায় তার বাবার চলে যাওয়ার গল্প, তিয়াসা বলে সে কিভাবে তার মায়ের না বলা দুঃখের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করে। ঋষভ, সবসময় হাসিখুশি, আজ একটু থমকে বলে — “আমি এই ট্রিপে এসেছি কারণ প্রতিদিন একটা করে মুখোশ পরে বাঁচতে ভালো লাগে না আর… একবার হলেও নিজের মতো থাকতে চেয়েছিলাম।” সৌরভ অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল — “দাদার চলে যাওয়ার পর মা শুধু এক কথা বলত — ‘তুমি ঠিক থেকো, ভুল কোরো না।’ কিন্তু আমি জানি, ঠিক ভুল কোনো মানদণ্ডে মাপা যায় না সবকিছু।”

রাত বাড়তে থাকে। বাইরে হাওয়া বেড়ে যায়, জানালার কাঁচে টোকা পড়ে যেন কেউ ডাকছে। হঠাৎই দরজার ফাঁক দিয়ে একটা হালকা আওয়াজ আসে, যেন কেউ সিঁড়ি দিয়ে নামছে। সবাই চুপ। ক্যামেরা হাতে তিয়াসা উঠে দাঁড়ায়, ঋষভ বলে, “আমি যাচ্ছি দেখে আসি।” অভি বাধা দেয়, “বোকামি করিস না!” সৌরভ টর্চ নিয়ে এগিয়ে যায়—কিন্তু নিচে গিয়ে দেখে, কিছু নেই। শুধু ফাঁকা সিঁড়ির গায়ে পড়ে আছে একটা পুরনো কাঠের বাক্স। সৌরভ বাক্সটা খুলে দেখে তার ভেতরে একটা ছেঁড়া চিঠি — ইংরেজিতে লেখা, অনেকটাই ঝাপসা, কিন্তু পড়ে বোঝা যায় কোনো এক ‘জনাথন’ তার স্ত্রীকে লিখেছিল, “আমি যদি ফিরে না আসি, জানবে—এই পাহাড় আমার শেষ আশ্রয়…” বাকিরা বাক্স ঘিরে দাঁড়ায়। অভি ফিসফিস করে বলে, “এই জায়গাটা সত্যিই কিছু লুকিয়ে রাখে…” ঋষভ হেসে বলে, “আর এটাই হলো আমাদের সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চার — যেখানে ইতিহাস, রহস্য আর নিজের ভয় একসাথে হাত ধরেছে।” বাইরে তখন এক পশলা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আর চার কিশোর-কিশোরীর চোখে ফুটে উঠেছে এক নতুন উপলব্ধি — এই রোড ট্রিপ শুধু জায়গা বদল নয়, বরং তারা নিজেরাই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

অধ্যায় ৩:

সকালের সূর্য উঠলেও পাহাড়ি অঞ্চলের কুয়াশা যেন সেই পুরনো বাংলোটার রহস্যময়তা মুছে দেয়নি একটুও। রাত্রির অদ্ভুত ঘটনাগুলো নিয়ে চারজনই নীরব ছিল — কেউ পরিষ্কারভাবে কিছু দেখেনি, কিন্তু অনুভব করেছিল কিছু একটা যেন ঠিক ছিল না। ঋষভ তখনও সেই ছেঁড়া চিঠিটার ওপর চিন্তা করছিল, অভি বারবার বলছিল, “চলো, এবার যাই… আমরা যা খুঁজছিলাম, সেটা হয়তো পেয়েও গেছি।” কিন্তু তিয়াসা ভিন্নমত — সে এই জায়গা নিয়ে একটা সম্পূর্ণ ডকুমেন্টারি বানাতে চায়। “চিঠিটা তো একটা ইঙ্গিত মাত্র,” সে বলল, “এর পিছনে নিশ্চয়ই আরও কিছু আছে। হয়তো ওই জনাথন নামের মানুষটা কিছু লুকিয়ে রেখে গেছে।” সৌরভ কিছু না বলে বাংলোটার পিছনের বাগানটায় হেঁটে যায়। ঘাসভরা ভেজা জমিতে হাঁটতে হাঁটতে সে হঠাৎ একটা পাথরের নীচে কিছু লক্ষ্য করে — একটা ধুলো জমা ছোট কাঠের বাক্স, অনেকটা সময়ের সাথে মিশে যাওয়া। বাক্স খুলতেই ভেতর থেকে বেরোয় একটা হাতের আঁকা মানচিত্র, যার উপরে লেখা — “The Forgotten Tunnel – behind the seventh stone.”

চারজন একসঙ্গে মানচিত্রটা ঘিরে দাঁড়ায়। পাহাড়ি টেরেইন, কিছু নির্দিষ্ট চিহ্ন, আর এক অদ্ভুত পথ যা শেষ হয় ‘Seventh Stone’ নামক জায়গায়। অভি সন্দেহভরে বলে, “তুমি কীভাবে নিশ্চিত এটা স্রেফ সাজানো কিছু না?” সৌরভ হালকা হেসে বলে, “আমি নিশ্চিত না… কিন্তু তুমি জানোই তো, এই ট্রিপে আমরা নিশ্চিত হতে আসিনি।” মানচিত্রে নির্দেশ অনুসারে, তারা বাইকে চেপে আরও এক ঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিয়ে পৌঁছয় পাহাড়ের এক নির্জন ঘন জঙ্গলের ধারে। সেখানে কিছু পাথর সারি দিয়ে রাখা, যার মধ্যে সপ্তম পাথরটা তুলনায় বড় এবং কিছুটা ঢালু। পাথরটা সরাতেই তিয়াসা চেঁচিয়ে ওঠে — নিচে একটা ছোট গুহার মুখ দেখা যায়, গুহার ভেতরে নেমে যাওয়া সিঁড়ি, প্রাচীন আর ধূলিধূসরিত। ঋষভ প্রথমে নেমে যায়, তারপর একে একে বাকিরাও।

ভেতরটা যেন বহু বছর অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকা ইতিহাসের এক চিলতে দরজা। সিঁড়ি ধরে নেমে এক ফাঁকা ঘরে পৌঁছায় তারা — যেখানে কয়েকটি টিনের ট্রাঙ্ক, পুরনো ব্রিটিশ আমলের ক্যালেন্ডার, আর একটি আধভাঙা টাইপরাইটার পরে আছে। দেওয়ালে একটি ম্লান ছবি—এক সেনানায়ক, যার চোখের দৃষ্টিতে আশ্চর্য কষ্ট ও গর্বের মিশেল। “এটা নিশ্চয়ই সেই জনাথনের ঘর,” অভি নিচু স্বরে বলে। হঠাৎ সৌরভ একটি ট্রাঙ্ক খুলে দেখে — তার ভিতর কয়েকটি চিঠি, একটি ছোট ডায়েরি, আর কিছু অদ্ভুত লাল রঙের সিল-বন্ধ খাম। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা — “If you are reading this, you’ve crossed the wall of fear. Welcome.” বাকিরা স্তব্ধ। বাইরে তখন বাতাস গাঢ় হচ্ছে, আর কুয়াশা নেমে আসছে নিচের জঙ্গলে। তিয়াসা ক্যামেরা অন করে ফিসফিস করে বলে, “এই রোড ট্রিপে আমরা নিজেরা তো হারিয়ে যাচ্ছি… কিন্তু কে জানে, হয়তো কাউকে খুঁজেও পাচ্ছি।” সিঁড়ির গা বেয়ে হঠাৎ এক তীক্ষ্ণ আওয়াজ আসে। সবাই পেছনে ঘুরে তাকায় — কিন্তু গুহার দরজাটা তখন আর খোলা নেই। অন্ধকার ঘরে তাদের চারজনকে নিয়ে শুরু হচ্ছে নতুন এক অজানা অধ্যায়।

অধ্যায় ৪:

অন্ধকার ঘরে হঠাৎ করে দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্কের ছায়া। মাটির নিচের সেই স্যাঁতসেঁতে কক্ষে বাতাস ভারি, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তিয়াসা ক্যামেরার আলো জ্বালিয়ে আশপাশে তাকায় — দরজার গায়ে ভেতর দিক থেকে কোনো হাতল নেই। “দরজা বন্ধ হলো কীভাবে?” অভির কণ্ঠ কাঁপছিল, “আমরা তো কাউকে দেখিনি উপরে!” ঋষভ গম্ভীর গলায় বলে, “হয়তো কেউ নেইও… হয়তো এই জায়গাটাই চাইছে আমরা এখানে থাকি।” সৌরভ চুপচাপ ডায়েরিটা নিয়ে একটা কোণায় বসে পড়ে — পাতাগুলো ভেজা, অক্ষরগুলো কিছুটা অস্পষ্ট, কিন্তু তবুও পড়ার মতো। তাতে লেখা ছিল জনাথনের হাতের লেখা — “এই বাঙ্কারে আমি আশ্রয় নিয়েছিলাম যুদ্ধের পরে। আমি জানতাম, হয়তো ফিরে যাব না। তাই রেখে গেলাম আমার জীবনের সবটুকু কথা এখানে, যেখানে কেউ একদিন এসে পৌঁছাবে।”

তারা ধীরে ধীরে ঘরটা ঘুরে দেখতে থাকে — একটা পুরনো লোহার সিন্দুকের মধ্যে কয়েকটা ম্যাপ, কিছু সোনালী রঙের টোকেন, আর একটি ধাতব বক্স — যেটা খুলতে গেলে অভি বলে ওঠে, “এই জিনিসটা রয়ে যাক। সব খোলা মানে সব জানা নয়।” কিন্তু তিয়াসা তা মানতে নারাজ। সে ফিসফিস করে বলে, “আমরা যদি এখনই না জানি কী লুকিয়ে আছে এখানে, তাহলে এই গোটা ট্রিপটাই অর্ধেক থেকে যাবে।” অবশেষে ঋষভ ধাতব বক্সটা খোলে — ভিতরে একটা পাণ্ডুলিপির মতো পুরনো বই, যার নাম — The Wall Beyond. প্রথম পাতায় লেখা: “This is not just a story of war. This is a story of four shadows, who will return one day.” বাকিরা চমকে যায়। “চার ছায়া?” অভি প্রশ্ন করে। সৌরভ মুখ তোলে, “আমাদের কথা বলছে?” হঠাৎ করে ঘরের এক কোণায় থাকা পুরনো টাইপরাইটার থেকে টুং করে একটা শব্দ হয়, যদিও কেউ স্পর্শ করেনি। সবার চোখ বড় হয়ে যায়, তিয়াসা ক্যামেরা ঘুরিয়ে ধরতেই দেখা যায় টাইপরাইটারে উঠেছে একটি বাক্য: “You are the ones. Now remember.”

ভেতরের হাওয়া বদলে যায়। হঠাৎ যেন চেম্বারের দেওয়ালগুলো ফিসফিস করতে শুরু করে — অসম্পূর্ণ ইতিহাস, না বলা গল্প, ভুলে যাওয়া অপরাধ আর আত্মগ্লানিতে ডুবে থাকা চিৎকার। অভি মাথা চেপে ধরে বলে, “আমার মাথায় একটা অদ্ভুত আওয়াজ বাজছে… যেন কেউ বলছে, আমি কিছু ভুলে গেছি।” তিয়াসার চোখে জল এসে যায়, “আমার মনে পড়ছে… ছোটবেলায় একবার একটা লোক আমাদের বাড়িতে এসেছিল… মুখ মনে নেই, শুধু চোখ দুটো মনে আছে। সেই একই চোখ আমি ওই ছবিটার লোকটার মধ্যে দেখছি।” ঋষভ বলল, “আমরা তো একটা অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছিলাম, কিন্তু এই জায়গা যেন আমাদের নিজেদের ভেতরে এনে ফেলছে… অতীতে টেনে নিচ্ছে।” সৌরভ ধাতব সিন্দুকের গায়ে খোঁজে দেখতে পায় ছোট্ট একটা ছিদ্র, যার মধ্যে একটা পুরনো চাবি বসানো ছিল। সে চাবিটা ঘোরায়, আর তারপরই দেয়ালের ঠিক পেছনে একটা স্লাইডিং পাথর সরে যায়। তার পেছনে আরেকটা সুড়ঙ্গ — দীর্ঘ, আঁধারে ঢাকা। তারা একে একে তাকিয়ে থাকে সেই অন্ধকারে, আর কেউ কাউকে কিছু না বলেই বুঝে যায় — এটা ফেরা নয়, এটা আরও গভীরে যাওয়ার ডাক। একটা ইতিহাসের, একটা অভিশাপের, আর হয়তো… নিজেদের ভিতরের সত্যের। তারা এগিয়ে চলে, এবং দেওয়ালের ওপারের সেই ছায়া তাদের অনুসরণ করতে থাকে নিঃশব্দে।

অধ্যায় ৫:

সুড়ঙ্গটা যেন শেষ হতে চায় না। তার অন্ধকার শুধু বাইরের নয় — যেন ভেতরেরও। দেওয়ালের ফাটল দিয়ে মাঝে মাঝে ফিসফিস আওয়াজ আসে, যেন শতাব্দী পেরিয়ে আসা কণ্ঠস্বরেরা অপেক্ষা করছে। টর্চের আলো ফিকে হয়ে আসছে, তবুও চারজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে চলেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামার পর তারা এক অদ্ভুত গম্বুজাকৃতি ঘরে পৌঁছয়। দেওয়ালের গায়ে জ্যামিতিক চিহ্ন, লাল রঙে আঁকা কিছু প্রতীক — যেন কোনো গোপন সংগঠনের বার্তা। মাঝখানে একটি টেবিল, আর তার উপর রাখা চারটি মুখোশ — কাঠের তৈরি, প্রতিটা একেক রকম অভিব্যক্তি নিয়ে। তিয়াসা ধীরে এগিয়ে যায়, তার ক্যামেরার আলোয় মুখোশগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। “এগুলো কী?” সে ফিসফিস করে। সৌরভ পেছন থেকে বলে, “হয়তো এগুলোই সেই ‘চার ছায়া’র প্রতীক, যাদের নিয়ে বইয়ে লেখা ছিল।” অভি এগিয়ে এসে মুখোশের গায়ে স্পর্শ করতেই হঠাৎ ঘরের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়, আর গম্ভীর এক কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে আসে — “শুরু হয়েছে নির্বাচনের খেলা।”

আলো নিভে যায়, শুধু চারটি মুখোশের চোখদুটো জ্বলে ওঠে অদ্ভুত নীলাভ আলোয়। ঘরের চার কোনায় হালকা ঝাঁকুনি অনুভূত হয়, মেঝে যেন কেঁপে ওঠে। তারপরই একের পর এক দৃশ্য ফুটে ওঠে দেওয়ালের উপর — প্রজেকশনের মতো, কিন্তু আরও বাস্তব। প্রথমে দেখা যায় ঋষভ — স্কুলের মাঠে এক জুনিয়র ছেলেকে চেপে ধরে আছে, হাসছে, কিন্তু সেই হাসির পেছনে চাপা ক্রোধ। তারপর তিয়াসা — তার মা রাতে কাঁদছেন, আর সে ঘরে বসে ভ্লগ বানাচ্ছে, কান ঝাঁকাচ্ছে গান শুনে। অভি — তার মা চুপচাপ চিঠি পড়ছেন, আর সে নিজের ঘরের জানালা বন্ধ করে বসে আছে, চোখে অভিমান। সৌরভ — সে দাদার পুরনো ঘরে ঢুকে তাকিয়ে আছে সেই ফাঁকা খাটের দিকে, যেখানে আর কেউ ফেরেনি। একে একে চারজনের মুখে মুখোশ বসে যায় — যেন তাদের নিজস্ব ভুল, গ্লানি আর অবচেতন স্মৃতি আজ মুখোশ হয়ে গেছে।

ঘরটা হঠাৎ কুয়াশায় ভরে যায় — কিন্তু সেই কুয়াশা শুধুই ঠাণ্ডা নয়, সে যেন চেনা। সেই কুয়াশার ভেতরে তারা চারজন একে অপরকে হারিয়ে ফেলে। কেউ কাউকে দেখতে পায় না, শুধু নিজেদের ভিতরের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। তিয়াসা শুনতে পায় ছোটবেলার সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ — মা যখন বলেছিলেন, “ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখনকার আনন্দ বিসর্জন দে।” অভি শুনতে পায় বাবার সেই ফোনকল — “তোমাদের জন্য আর থাকা হবে না।” ঋষভ নিজের মুখোশের নিচে দেখতে পায় সেই অভিমানী মুখ — নিজের উপরই রাগ, কারণ সে আসলে ভয় পায়। আর সৌরভ, সে হঠাৎ শুনতে পায় নিজের দাদার কণ্ঠ — “ভাই, আমি পালাইনি। আমি খুঁজছিলাম সেই জায়গা, যেখানে সত্যি নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়।” হঠাৎ কুয়াশা পাতলা হয়, তারা আবার একে অপরকে দেখতে পায় — কিন্তু এবার যেন একটু বদলে গেছে, একটু বেশি চুপচাপ, একটু বেশি প্রাপ্তবয়স্ক। মুখোশগুলো নিঃশব্দে খুলে পড়ে পড়ে যায় মেঝেতে। আবার সেই কণ্ঠস্বর শোনা যায় — “তোমরা এখন জানো তোমাদের মুখোশ কী ছিল। এখন ঠিক করো — এগোবে, নাকি ফিরে যাবে।” তারা একে অপরের চোখে চোখ রাখে, তারপর ঋষভ ধীরে বলে, “আমরা পালাতে আসিনি। আমরা খুঁজতে এসেছি। তাহলে শেষ দেখেই ফিরবো।” ঘরের এক পাশে দেওয়াল আবার খুলে যায়, এবার সামনে ধরা দেয় একটি সরু সিঁড়ি, যা নীচে নেমে যায় আরও গভীরতর অজানার দিকে — যেখানে হয়তো সত্যি অপেক্ষা করছে সেই প্রশ্নের উত্তর, যেটা তারা এতদিন নিজেদের কাছেই করতে সাহস পায়নি।

অধ্যায় ৬:

সিঁড়িটা যত নীচে নামে, বাতাসের তীব্রতা তত বাড়তে থাকে — যেন প্রতিটি ধাপে তারা ছুঁয়ে যাচ্ছে এমন কোনো অতীত, যা কেবল ইতিহাসে লেখা ছিল না, বরং তাদের রক্তে, স্মৃতিতে ও ভয়-আশঙ্কার মধ্যে লুকিয়ে ছিল। আলো ছিল না, ছিল কেবল সৌরভের ফোনের শেষ আলোটা আর তিয়াসার ক্যামেরার জিরজিরে টর্চ। দেয়ালের গায়ে হাত রেখে চারজন ধীরে ধীরে নামতে থাকে। অভি হঠাৎ বলল, “এই জায়গাটাকে মনে হচ্ছে যেন কেউ তৈরি করেছিল আমাদের জন্যই।” ঋষভ হাসল, “হয়তো অনেক আগে কেউ জানত, আমরা একদিন এখানে আসব।” সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছেই সামনে দেখা যায় একটা খোলা কক্ষ — কিন্তু এই কক্ষ ছিল আগেরগুলো থেকে আলাদা। নিস্তব্ধ, পরিষ্কার, যেন কেউ খুব যত্ন করে এখানে অপেক্ষা করছিল। মেঝেতে একটা বৃত্ত আঁকা, এবং তার চারপাশে চারটা ছোট চেয়ার। বৃত্তের মাঝখানে একটা পাথরের স্তম্ভ, তার উপর একটি বন্ধ খাতা। পাশে লেখা একটা পাথরের ফলকে উৎকীর্ণ — “এখানে এসে যারা বসবে, তারা শুনবে সেইসব প্রশ্ন, যা কোনোদিন জিজ্ঞাসা করার সাহস হয়নি। এবং যার উত্তর পেলে আর ফেরা যায় না।”

তারা নিঃশব্দে চারটি চেয়ারে বসে পড়ে। এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর ঘরের বাতাস গম্ভীর হয়ে ওঠে। প্রথমে অভির সামনে ভেসে ওঠে এক দৃশ্য — তার মা রাতের খাবার টেবিলে একা বসে আছে, তার চেয়ারে হাত রাখছে কিন্তু কেউ সেখানে বসছে না। “তুই কেন দূরে থাকিস, অভি?” — মায়ের সেই মৃদু প্রশ্ন যেন দেওয়াল চিরে এসে ওর কানে বাজে। অভি ফিসফিস করে বলে, “কারণ আমি ভয় পাই… ভালবাসা হারানোর ভয়, তাই দূরে থাকি।” তারপর তিয়াসার সামনে দেখা যায় ছোটবেলার দৃশ্য — সে মঞ্চে নাচছে, দর্শকের সারিতে তার মা নেই। “তোর সাফল্য আমি দেখতে পারিনি বলে তোকে পছন্দ করতে পারিনি?” — একটা কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর বলে ওঠে। তিয়াসা বলে, “তুমি আমার গল্পের ছায়া হয়ে থেকেছো… আর আমি সব সময় নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছি।” ঋষভের সামনে উঠে আসে তার বাবা — কঠোর মুখে বসে, পাশে দাঁড়িয়ে ছেলে বলছে, “আমার গলা জ্বলে যায়… আমি আর মুখোশ পরে থাকতে পারি না।” বাবা বলছে, “পুরুষ কাঁদে না।” আর ঋষভ বলে ওঠে, “তাই আমি সব সময় হাসি — কারণ কাঁদা মানেই দুর্বলতা, সেটা শিখিয়েছিলেন আপনি।”

সব শেষে সৌরভ। তার সামনে ফাঁকা ঘর। দাদা নেই, মা নেই, কেউ নেই। শুধু ঘরের এক কোণে একটা গিটার পড়ে আছে, আর দরজার বাইরে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে বলছে, “তুই খুঁজে পাবি আমাকে, যদি সাহস থাকে সত্যি জানার।” সৌরভ চিৎকার করে বলে, “তুই পালাস নি! তুই খুঁজতে গেছিস এমন কিছু, যা তোকে নিজের মত হতে সাহায্য করবে। আমি ভেবেছিলাম তুই আমায় ফেলে গেছিস।” এক মুহূর্তে ঘরের বাতাস স্তব্ধ হয়ে যায়। চারটি চেয়ার ঘুরে যায় স্তম্ভের দিকে। সেই খাতা খুলে যায়, পাতার পর পাতা যেন উল্টে যায় হাওয়ায়। এবং শেষে একটি পাতায় লেখা হয় — “তোমরা এখন জানো কে তোমরা। এবার ফিরতে পারো, অথবা চলতে পারো আরও গভীরে — যেখানে গল্প আর বাস্তবের সীমা মুছে যায়।”

তারা চারজন একে অপরের দিকে তাকায় — চোখে জল নেই, কিন্তু কিছু যেন ভেঙে পড়ে গেছে, আবার গড়েও উঠেছে নতুনভাবে। তিয়াসা বলে, “এটাই তো গল্প, তাই না? নিজের ভিতরে নেমে যাওয়া, যতক্ষণ না সত্যিটা চোখে পড়ে।” অভি মাথা নাড়ে, “আমরা কেউ পালাতে আসিনি, আমরা এসেছিলাম নিজেদের মুখোমুখি হতে।” ঋষভ বলে, “আর এখন আমরা জানি, ঠিক কোন ব্যথা থেকে অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয়েছিল।” সৌরভ শান্ত গলায় বলে, “তাহলে চল… এবার উপরে ওঠা যাক।” ঠিক তখনই স্তম্ভটা নিজে থেকে নিচে নেমে যায়, আর সামনে খুলে যায় একটি সিঁড়ি — কিন্তু এবার উপরের দিকে। কুয়াশার মধ্য দিয়ে তারা উঠে চলেছে, পিছনে রেখে এসেছে সেই রহস্যঘেরা ইতিহাস, মুখোশ, আর নিজেদের ভাঙা অংশ। কিন্তু তারা জানে — এই উঠে যাওয়া মানে মুক্তি নয়, বরং এক নতুন যাত্রা — যেখানে সত্য জানা হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন এখনও ফুরোয়নি।

অধ্যায় ৭:

উপরে ওঠার সিঁড়িগুলো যেন যেনতেনভাবে তৈরি, প্রতিটি ধাপে পাথরের গায়ে লতাপাতা লেগে আছে, ঘন কুয়াশা এভাবে মিশে গেছে চারপাশে যে কিছুদূর ছাড়া দৃষ্টিসীমা নেই। আলোটা আসছিল একটা সরু ফাঁক দিয়ে, যেটা দিনের আলো না—বরং আকাশ ফাঁকা, তার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা চাঁদের আলো। ঘোর লাগা আলোয় চারজনের মনে হচ্ছিল তারা যেন স্বপ্নে হাঁটছে। উপরে উঠে এসে তারা পায় একটা ছোট টিলা, যার চারদিকে উঁচু পাথরের দেওয়াল—যেন কোনো পরিত্যক্ত দুর্গের ভগ্নাংশ। দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা — “Those who return, never remain the same.” অভি পড়ে বলল, “আমরা ফিরছি ঠিকই, কিন্তু আমরা কি আর আগের মানুষ আছি?” সৌরভ নিচু গলায় বলে, “আসলে আমরা কখনই আগের মানুষ ছিলাম না… শুধু এখন সেটা বুঝতে শিখেছি।” তিয়াসা চারপাশে ক্যামেরা ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “সবচেয়ে অবাক করা কথা জানো কী? আমার ক্যামেরার মেমোরি খালি। সব রেকর্ড মুছে গেছে।” ঋষভ তার দিকে তাকিয়ে বলে, “তবে এটা আসল অ্যাডভেঞ্চার ছিল, যেটা স্মৃতি হয়ে থাকবে… শুধুই আমাদের জন্য।”

তারা বুঝতে পারে, পথ যতই ফেরা হোক না কেন, পৃথিবী ঠিক আগের মতো থাকবে না। পেছনে রেখে আসা সেই গুহা, সেই মুখোশ, সেই প্রশ্ন—সব মিলিয়ে একটা গভীর ছায়া এখন তাদের চারপাশে লেগে আছে। টিলার পাশে ছোট একটা কাচের দরজা দেখতে পায় সৌরভ। দরজার গায়ে আবার সেই চেনা প্রতীক — চারটি রেখা, মাঝখানে একটি বৃত্ত। তারা দরজাটা ঠেলে খোলে—পাশেই পাহাড়ি রাস্তা দেখা যায়, নিচে দূরে টিম টিম আলো, হয়তো সেটাই শিলিগুড়ির কোনো গ্রাম। তারা নিচে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ঠিক তখনই এক অদ্ভুত আওয়াজ আসে—বাঁশির মত, মৃদু, অথচ টানাটানা। অভি থেমে যায়, “শোনো, এই আওয়াজটা আগেও শুনেছি, কোথায় যেন…” তিয়াসা কপালে হাত দিয়ে বলে, “এই সুরটা… এটা আমি শুনতাম যখন ছোটবেলায় ঘুম ভেঙে যেত রাতে… মনে পড়ছে এখন।” হঠাৎ পেছনের দিক থেকে ঝোপের মধ্যে সাদা পোশাক পরা একজন লোক বেরিয়ে আসে। মুখ ঢাকা, শুধু চোখজোড়া দেখা যায়—তীব্র, শান্ত, গভীর। সে কিছু বলে না, শুধু হাতে দেয় একটি চিঠি। খামের উপরে লেখা: “For the Four.”

ঋষভ কাঁপা হাতে চিঠিটা খোলে। তার ভিতরে লেখা — “তোমরা ফিরে যাচ্ছো, কিন্তু ভুলে যেও না এই পথ তোমাদের ডাকবে আবার। কারণ একবার যে নিজেকে দেখে ফেলেছে, সে আর চোখ বন্ধ রাখতে পারে না। পাহাড় শুধু জায়গা নয়, এটা একটা দরজা—আর তোমরা তার চাবি।” তারা একে একে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। চিঠির নিচে সই — Jonathan E. অভি চিৎকার করে বলে, “এই লোক তো… মৃত! আমরা তার কথা পড়েছি, সেই বাঙ্কারে!” কিন্তু ততক্ষণে সাদা পোশাক পরা লোকটা নেই, যেন কখনো ছিলই না। আশেপাশের হাওয়া থেমে গেছে, নিশ্বাস বন্ধ করা নিঃশব্দতা নেমে এসেছে। তারা কিছু না বলে পাথরের ধাপ বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে।

রাস্তা শেষে দেখা যায় — সৌরভের বাইকটা ঠিক আগের জায়গাতেই রাখা, টাকাওয়ালা দোকানদার চুপচাপ বসে আছে চায়ের স্টলে। ঘড়ির কাঁটা সকাল আটটা দেখাচ্ছে — অথচ তারা অনুভব করছিল, যেন দিন পেরিয়ে গেছে, রাত গড়িয়েছে শতবার। দোকানদার শুধু বলল, “তোমরা একরকমই ফিরলে… কেমন যেন আলাদা হয়ে গেছো।” কেউ উত্তর দিল না। চারজনে বাইকে চেপে শহরের দিকে চলল। তারা জানে, স্কুলে তারা থাকবে আগের বেঞ্চে, আগের ইউনিফর্মে, আগের বন্ধুদের ভিড়ে — কিন্তু প্রতিটি কথায়, প্রতিটি চুপে তারা বহন করবে সেই পাহাড়ের আওয়াজ, সেই মুখোশের সত্য, সেই পথের ডাক, যা একবার শুরু হলে কখনো সত্যিই ফুরোয় না। অপর নাম অ্যাডভেঞ্চার — এখন তাদের নিজের নাম।

অধ্যায় ৮:

শহরের চেনা রাস্তাগুলোতে ফেরার পরেও যেন কিছুই আর চেনা থাকল না। স্কুলের গেট, মাঠ, সিঁড়ি, ক্লাসরুম—সবই আগের মতো, তবু তাদের চোখে পড়ে অন্যরকম। যেন এই জায়গাগুলো তারা দেখে এসেছে বাইরের একটা জানালা দিয়ে। শিক্ষক কিছু না জিজ্ঞাসা করেই চুপচাপ ক্লাসে ঢুকতে দেয় তাদের। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে, “কোথায় ছিলে এতদিন?” — তারা হেসে বলে, “একটা ছোট ট্রিপে গিয়েছিলাম।” কিন্তু তারা জানে, সেটি কোনও ‘ছোট ট্রিপ’ ছিল না। ওই রোড ট্রিপের গায়ে লেগে আছে ইতিহাস, অস্তিত্ব, এবং এমন কিছু মুহূর্ত যা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না। তিয়াসা তার ক্যামেরা অন করে আবার চেষ্টা করে স্মৃতি ধরে রাখার — কিন্তু এখন তার ক্যামেরার ফোকাস পাল্টে গেছে। সে আর শুধু দৃশ্য ধরে রাখে না, সে বোঝে দৃশ্যের ভিতরের ব্যথা। অভি ঘরে ফেরার পর প্রথমবার মাকে জড়িয়ে ধরে — বিনা শব্দে। মা তাকে জিজ্ঞাসা করেন না কিছুই, শুধু বলেন, “তুই পালিয়ে যাচ্ছিলি না, খুঁজছিলি, আমি জানি।” সৌরভ তার দাদার পুরনো ঘরে গিয়ে একটা চিঠি লেখে — যার উপরে সে কিছু লেখে না, শুধু ভিতরে লিখে, “আমি এখন বুঝি, তুই কেন পালিয়ে গেছিলি। আমি যদি আগে বুঝতাম…” চিঠিটা সে রেখে আসে সেই কাঠের বাক্সে, যেখানে তার দাদার গিটার রাখা ছিল। ঋষভ ঘুমের আগে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বলে, “আজ আমি হাসি, কারণ আমি কান্না করতে শিখেছি।”

এক সপ্তাহ পর এক অদ্ভুত ডাক আসে — একটি স্কুল পত্রিকার তরফে। তিয়াসাকে বলা হয়, তার ভ্লগের ক্লিপগুলোর একটি অংশ কোনওভাবে পৌঁছে গেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, এবং সেটা এখন ভাইরাল। কিন্তু সে তো জানত, সব মেমোরি মুছে গেছিল। সে যখন ভিডিও ক্লিপ দেখে, চমকে যায় — ক্যামেরার কোনাটায় ধরা পড়েছে সেই সাদা পোশাকের লোকটা, যাকে কেউ চিনত না। ভিডিওর শেষ ফ্রেমে দেখা যায় পাহাড়ের উপরে চারটে ছায়া দাঁড়িয়ে আছে, যাদের পিছনে সূর্য উদিত হচ্ছে। কিন্তু ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই ছায়াগুলো যেন তাদের নিজেদেরই ছায়া নয় — বরং সেই চারজন, যারা ভবিষ্যতে হবে তারা। মানে, এ যেন সময়ের ফাঁকে ফাঁকে দেখা এক প্রতিচ্ছবি। অভি বলে, “তাহলে এ ট্রিপ শুধু অতীত নয়… এটা ভবিষ্যতের দিকেও পথ দেখাচ্ছে?” সৌরভ মাথা নাড়ে, “হয়তো এই কারণেই জনাথন বলেছিল — ফেরাও ফেরা নয়, এটা নতুন যাত্রার শুরু।” ঋষভ সেই ভাইরাল ভিডিও দেখে ক্লাসের বোর্ডে লিখে রাখে — “অ্যাডভেঞ্চার মানে শুধু জঙ্গল বা গুহা নয়। অ্যাডভেঞ্চার মানে সাহস করে নিজেকে দেখা, নিজের ছায়ার মুখোমুখি হওয়া।”

শেষ বিকেলে তারা চারজন আবার একবার দেখা করে স্কুলের মাঠে। তিয়াসা ব্যাগ থেকে বের করে সেই খালি খাতাটা — যেটা জনাথনের বাঙ্কারে ছিল। পাতাগুলো এবার ভরা — কিন্তু তাদের হাতে কোনো কলমই ছিল না। পাতাগুলোতে লেখা—তাদের চারজনের গল্প, যেভাবে তারা চিনেছে নিজেকে, মুখোশ ছেড়েছে, ভালোবেসেছে নিজের অতীতকে। তিয়াসা ধীরে বলে, “এই বইটা কেউ লিখে গেছে, হয়তো আমরা নিজেরাই। হয়তো এইসব পথ আমাদের আগেই ঠিক করা ছিল।” হাওয়ায় পাতাগুলো উল্টে যায়, শেষ পাতায় লেখা —
“When the road ends, the journey begins again.
Those who dare to ask, live twice.”

তারা একসাথে হাঁটতে থাকে — শহরের চেনা গলিগুলো দিয়ে, কিন্তু চোখে এক নতুন দৃষ্টি নিয়ে। এবার আর তারা পালিয়ে যায় না, বরং এগিয়ে চলে সামনে, জানে — আবার কোনো একদিন, কোনো এক পাহাড় তাদের ডাকবে। কারণ, “অপর নাম অ্যাডভেঞ্চার”—এখন শুধু তাদের গল্প নয়, তাদের জীবন। এবং জীবন মানেই তো প্রশ্নের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, ছায়ার ভিতর আলো খোঁজা, আর প্রতিটি মুহূর্তে একটু করে নিজেকে আবিষ্কার করা।

___

1000033947.png

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *