শৌনক দে গ্রামের সীমানা অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে অনিরুদ্ধ সেন অনুভব করলেন যে, এখানে কোনো সাধারণ শীতলতা নেই; বরং এক অদ্ভুত শীতলতা আছে, যা হাড় কাঁপানোর মতো ঠান্ডা না হলেও, মনকে স্থির করে, চুপচাপ করে রাখে। গ্রামটি চুপচাপ, রাস্তার ধুলো উঠছে নিঃশব্দে, এবং বাতাসে যেন অদৃশ্য কোনো দমনের গন্ধ ভাসছে। গ্রামের মানুষের চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক, যা তাদের মুখের হাসিকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। তারা খুব সাবধানভাবে চলাফেরা করে, যেন কোনো অদৃশ্য চোখ তাদের প্রতি তাকিয়ে আছে। অনিরুদ্ধ একটি ছোট কুঁড়েঘরের কাছে রিকশা থামালেন, যেখানে গ্রামের মানুষ সাধারণ জীবনযাপন করছে বলে মনে হলেও, তাদের আচরণে যেন প্রতিটি মুহূর্তে এক অনিশ্চয়তার চাপ…
-
-
তনয়া সেন বিকেলের শেষ আলোয় যখন সূর্য পাহাড়ের গায়ে ধূসর হয়ে গলে আসছিল, তখনই অরণ্যের বাস এসে পৌঁছল ছোট্ট গ্রামটায়। বাস বলতে আসলে একটা পুরোনো মিনিবাস, জানালার কাচ ঝাপসা, সিটের চামড়ায় ফাটল। গাঁয়ের নাম রাধাপুর—এমন নাম মানচিত্রে খুঁজলেও পাওয়া মুশকিল। তবু অরণ্যের মতো ফটোগ্রাফারের কাছে এই জায়গার টান ছিল অন্যরকম। শহরের কোলাহল, নামজাদা প্রকল্প, নামী রিসর্ট নয়—বরং অচেনা, অনাবিষ্কৃত জায়গার মধ্যে লুকোনো প্রকৃতির ছবি তুলতে তার সবচেয়ে ভালো লাগে। অরণ্যের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা ভারী, ভিতরে ক্যামেরা, লেন্স, ত্রিপড আর কিছু নোটবুক। বাসস্ট্যান্ডে নেমে চারপাশে তাকাতেই সে বুঝল, এই গ্রাম যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচা রাস্তা, খড়ের চালের ঘর, বাচ্চাদের…
-
অংশুমান রায় ঋদ্ধির আগমন কলকাতার শীত তখন পড়তে শুরু করেছে, তবে হাওয়ার ধার এখনো নরম। সন্ধের আলোয় গড়িয়াহাটের মোড় থেকে দক্ষিণে যে রাস্তা নেমে গেছে, সেই ফুটপাথগুলো ভরে উঠছে শালপাতার ধোঁয়া, ভাজা মুড়ির গন্ধ, আর দোকানিদের চেঁচামেচিতে। ড. অনির্বাণ দত্তের চেম্বার এই মোড় থেকে দশ মিনিট হাঁটাপথ। তিনতলা পুরনো বাড়ির দ্বিতীয় তলায়, কাঠের পালিশ করা দরজা, পাশে ছোট পিতলের নেমপ্লেট — Dr. Anirban Dutta, Consultant Psychologist. চেম্বারের ঘড়িতে তখন সাড়ে সাতটা। দিনের শেষ রোগী চলে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। অনির্বাণ ডেস্কে হেলান দিয়ে কাগজপত্র গুছাচ্ছিলেন, তখনই নিচের দারোয়ান কাঁচা গলায় ডাকল, — “ডাক্তারবাবু, একজন এসেছেন… বলছেন খুব জরুরি।” তিনি চোখ তুলে…
-
ফাল্গুনী মিশ্র এক গভীর অন্ধকারে ডুবে থাকা সেই গ্রাম, নাম মালঞ্চপুর। দিনের বেলায় এ গ্রাম চিরচেনা ছবির মতো শান্ত, ধানখেতের সবুজ গালিচা, কুঁড়েঘর আর দিঘির জলে ছেলেদের হাসি-ঠাট্টা। কিন্তু সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন অন্য এক ছায়াময় আবহ নামত এখানে। বিশেষত গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পুরোনো বটগাছটি যেন অজস্র রহস্য গিলে রেখেছে। সেই গাছের নিচে প্রতিদিন সন্ধের পরে ভিড় জমত, গল্পগুজব করতে করতে গ্রামের লোকেরা আসত, কেউ কেউ তামাক টানত, কেউবা পাকা পান চিবোতে চিবোতে নিজের শোনা লোককথা খুলে ধরত। আর এইসব গল্পকথার ভিড়েই ছিলেন গদাধর কাকা—আশি ছুঁইছুঁই এক বুড়ো মানুষ, সাদা দাড়ি বুক অবধি নেমে এসেছে, চোখদুটো যেন…
-
রজত মিত্র দূরপাল্লার লোকাল ট্রেনটা ধীরে ধীরে গ্রামের ছোট্ট স্টেশনে এসে থামল। বিকেলের নরম আলোয় প্ল্যাটফর্মটা যেন হালকা সোনালি ধুলোয় মোড়া। ট্রেন থেকে নেমে চারপাশের নিস্তব্ধতা অনুভব করতেই মোহনাদের কলকাতার কোলাহলের সঙ্গে একেবারে বিপরীত এক জগৎ মনে হল। হাতে ছোট্ট ট্রলিব্যাগ, আর কাঁধে স্লিংব্যাগ নিয়ে সে স্টেশনের গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গ্রামের রাস্তা নির্জন, দু’পাশে শিউলি আর শালবনের সারি। দূরে দেখা যায়, ধূসর এক প্রাসাদসদৃশ বাড়ি, আকাশের নিচে একাকী দাঁড়িয়ে আছে—সেটাই রায়চৌধুরী বাড়ি। বাবার মুখে অনেক শুনেছে এ বাড়ির গল্প, কিন্তু বাস্তবে দেখে যেন বুকের ভিতরে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। অটোরিকশা চালক যখন ভাড়া নেওয়ার পর তার দিকে একবার…
-
উপাসনা রায় উত্তর কলকাতার যে রাস্তার নাম বারবার বদলেছে, সেখানে একটা বাড়ি আছে যার নাম কখনও বদলায়নি—লোকমুখে “কালোজানালা বাড়ি”। অর্পণ যখন প্রথম দিন চাবিটা হাতে পেল, বিকেলের আলো তখন ছেঁকে পড়ছে ছাদের ধুলোতে; সিঁড়ির মুখে জোনাকি বাতির মতো ঝুলছে পুরনো বাল্ব, আর মেঝের কালো-সাদা মোজাইকের ফাঁক থেকে উঠছে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ—আদ্রতা আর শেওলার মিশ্রণ। বাড়িওয়ালার সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই, দালাল বাবু বলেছিল, “এখানে যারা থাকে তারা নিজ দায়িত্বে থাকে। পানীয় জল নিজের মতো জোগাড় করবেন, আর… কালো জানালাগুলো বন্ধ রাখবেন।” কথাটা বলে একটু থেমে হেসেছিল, যেন মজা করছে। অর্পণ ভেবেছিল, পুরনো বাড়ির দোষ। কিন্তু যে জানালাগুলোর কাঠে সরু লোহার…
-
স্নেহা মুখার্জী অধ্যায় ১: আগমন পৃথিবীতে কিছু আগমন নিতান্তই ঘটনাক্রম নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত ছক, যা কারও অজান্তে বুনে চলে ভাগ্যের জাল। অরিন্দম মুখার্জির শান্তিনিকেতনে আগমন তেমনই এক আগমন। আপাতদৃষ্টিতে গবেষণার জন্য শান্ত, নির্জন পরিবেশে এসে লোকসাহিত্য নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে এসেছেন তিনি, কিন্তু বাস্তবে—এই যাত্রা ছিল অতীতের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়ের টান। এক মেঘলা শরতের দুপুর। খোলা রিকশায় বসে অরিন্দম শান্তিনিকেতনের দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার ধারে লালমাটির পথ, পাশে শাল-পলাশের অরণ্য, মাঝে মাঝে কাঁঠালের গন্ধ ভেসে আসে বাতাসে। আকাশে রোদ-আলোর সঙ্গে মিশে আছে হালকা কুয়াশা, যেন প্রকৃতিই কিছু লুকিয়ে রেখেছে। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, — “আপনার বাড়ি কোথায়, বাবু?” — “কলকাতা। তবে এখন…
-
শুভেন্দু বসাক তান্ত্রিকের অভিশাপ শুভেন্দু বসাক নিষিদ্ধ শক্তি শুভ, এক তরুণ তান্ত্রিক ছাত্র, জীবন থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করছিল। তার সাধনাতে গভীরতার জন্য সে ছটফট করছিল, দিনের পর দিন চূড়ান্ত নিষ্ঠার সাথে তন্ত্র শাস্ত্র অধ্যয়ন করছিল। সে জানত যে তার ভিতরের শক্তি শুধু তাকে নয়, পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, যদি সে সেই শক্তির সঠিক ব্যবহার জানত। কিন্তু কেউ জানত না, যে তার তন্ত্র সাধনা শুধু এক ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এর পরিণতি তাকে এক অন্ধকারে নিয়ে যাবে, যা সে কখনো কল্পনা করতে পারেনি। তন্ত্র সাধনায় দীক্ষিত হওয়ার পর, শুভ একদিন শিখে গেল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মন্ত্র—এটি তার সাধনা…
-
দেবাংশু গুপ্ত ১ রবীন্দ্রনাথ গ্রামের এক অতি সাধারণ মাছ শিকারী। ছোটবেলা থেকেই তিনি মাছ ধরতেন, এবং সারা জীবনে এর চেয়ে বড় কোনো কাজ তার ছিল না। গ্রামটির পাশ দিয়ে চলে যাওয়া নদী, জলে ভাসমান ডাঙার পাশে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন সকালে মাছ শিকার করতেন। তার হাতে ছিল এক বিশেষ নেট, একটি পুরনো কাঠের ডিঙি, আর তার চোখে সবসময় এক ধরনের আশ্চর্য শান্তি ছিল। গ্রামবাসীরা তাকে ‘রবি’ বলে ডাকতো, আর তার কাজের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ছিল অদ্ভুত। কোনো মাছ শিকারী যখন খালি হাতে ফিরত, রবীন্দ্রনাথ তখন তার কাঁধে ভালো মাছের নেট ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরত। তবে একদিন, এক পূর্ণিমা রাতে এমন একটি মাছ…
-
অনির্বাণ ঘোষ অদ্ভুত ধ্বনি গাঁয়ের শেষ সীমানায়, ঘন জঙ্গল আর বুনো পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল বহুতলা ভুতের বাড়ি, যেখানে কোনোদিন মানুষের পা পড়েনি। গাঁয়ের বয়স্করা বলতেন, “এ বাড়ি শাপিত, এখানে বাস করা লোকের ভাগ্য বিপর্যস্ত।” কিন্তু আধুনিক যুবকরা এসব অন্ধবিশ্বাসকে গা ছেড়ে দিয়েছিল, আর তার মধ্যে এক জন ছিল আরিফ। এক রহস্যপ্রেমী সাংবাদিক, যিনি শহর থেকে এই গ্রামে এসেছিলেন কিছু অদ্ভুত ঘটনা অনুসন্ধান করতে। আরিফের প্রথম দিনের সন্ধ্যায় যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে অস্ত যাচ্ছিল, তখন গাঁয়ের বাজারের এক কনফেকশনারি দোকানে বসে শুপ্রা নামক এক স্থানীয় মেয়ের সাথে পরিচয় হলো। শুপ্রা কথায় কথায় বলল, “আপনি কি বহুতলা ভুতের বাড়ি সম্পর্কে জানেন?”…