অভিশাপ
-
আন্দামানের নির্জন দ্বীপ
ঋত্বিক দত্ত পার্ট ১: যাত্রার প্রথম সকাল শহরের ভিড়ভাট্টা থেকে সমুদ্রের দিকে যাত্রা শুরু করার মুহূর্তটাই যেন এক অদ্ভুত মুক্তি। কলকাতা বিমানবন্দরের জানালার কাচের ওপার থেকে ভোরবেলা আকাশের নীলচে আলো যখন সোনালি হতে শুরু করছিল, তখন আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখেছিলাম আন্দামান যাওয়া হবে—কেবল হাভলক বা নীল দ্বীপের…
-
ছাই ও শিখা
অরিত্র মুখার্জী পর্ব ১: আগুনের চোখ অমাবস্যার রাতে গ্রামের নিস্তব্ধতা যেন অদৃশ্য কোনো হাত এসে একেবারে চেপে ধরত। গঙ্গার তীরের ছোট্ট জনপদ খয়েরপুরে তখন বাতাসও গায়ে লাগতে চাইত না। মাটির ঘরগুলো মৃদু শ্বাসের মতো নিস্তেজ হয়ে থাকত, পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিফলন তো নেই-ই, তারকারাও যেন আকাশের কালো পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। শুধু মন্দিরের…
-
যমুনা বাগানের গোপন পথ
প্রিয়ম চক্রবর্তী শরতের শেষ ভাগ, আকাশে তুলোর মতো ভাসমান মেঘ আর বাতাসে ধানের গন্ধ মিশে আছে। কলকাতার ইতিহাসবিদ অনিন্দ্য মুখার্জী ও তাঁর স্ত্রী সায়ন্তী ট্রেনে চেপে যাচ্ছেন বীরভূম জেলার এক অখ্যাত গ্রামে, যেখানে স্থানীয় কলেজে আয়োজিত গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোককথা নিয়ে একটি সেমিনারে বক্তৃতা দিতে হবে অনিন্দ্যকে। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সায়ন্তী ক্যামেরা হাতে…
-
হারানো মূর্তি
এক অরিন্দমের পদধ্বনি যখন গ্রামের সরু মাটির পথগুলোতে প্রতিধ্বনিত হলো, তখন তার মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা জন্ম নিল। গ্রামটি এমন একটি স্থানে অবস্থিত, যেখানে সময় যেন নিজেই ধীরে চলার চেষ্টা করছে। চারপাশের ঘরবাড়ি প্রায়শই কাঁকড়া মাটির তৈরি, তার ছাদগুলো বাঁশের খোঁপায় ঘেরা, এবং প্রতিটি ঘর যেন গল্পের অংশ বহন করছে। গ্রামের প্রবেশদ্বার থেকে দেখা যায়…
-
বটতলার ছায়া
রুদ্রনীল মুখোপাধ্যায় পর্ব ১: শীতের ধোঁয়ায় ঢাকা গ্রাম পূর্ব মেদিনীপুরের এক ছোট্ট গ্রাম। শীতকালের ভোর। মাঠে ঘন কুয়াশা নেমে এসেছে। শীতল হাওয়ায় নারকেল গাছের পাতা কাঁপছে। দূর থেকে হেঁটে আসছে কৃষকরা, কাঁধে লাঙল, মাথায় উলের টুপি। পুকুরপাড়ে বসে রয়েছে বুড়ো গোপাল—গাঁয়ের লোক তাকে ডাকে “গোপাল-ঠাকুর” নামে। বয়স আশির কোঠায়। মুখভরা সাদা দাড়ি, চোখ দুটো জ্বলজ্বল…
-
কালো দর্পণ
সঞ্চারী নাগ উত্তরাধিকার চৌধুরী বাড়িটা যেন কলকাতার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক টুকরো ইতিহাস। বাইরের রাস্তায় কোলাহল, গলিপথে ঠেলাঠেলি অটো আর ছেঁড়া পোস্টারের ভিড়, কিন্তু উঁচু পাঁচিল ঘেরা সেই বনেদি বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই যেন সময় একেবারে অন্য গতিতে বয়ে চলে। আঙিনার মাঝখানে একটা বিশাল আমগাছ, তার চারপাশে বিক্ষিপ্ত ছায়া পড়ে আছে, আর সেই ছায়ার মধ্যে…
-
মৃত্যুর তালিকা
শৌনক দে গ্রামের সীমানা অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে অনিরুদ্ধ সেন অনুভব করলেন যে, এখানে কোনো সাধারণ শীতলতা নেই; বরং এক অদ্ভুত শীতলতা আছে, যা হাড় কাঁপানোর মতো ঠান্ডা না হলেও, মনকে স্থির করে, চুপচাপ করে রাখে। গ্রামটি চুপচাপ, রাস্তার ধুলো উঠছে নিঃশব্দে, এবং বাতাসে যেন অদৃশ্য কোনো দমনের গন্ধ ভাসছে। গ্রামের মানুষের চোখে এক অদ্ভুত…
-
গহন বন আর বাঁশির ডাক
তনয়া সেন বিকেলের শেষ আলোয় যখন সূর্য পাহাড়ের গায়ে ধূসর হয়ে গলে আসছিল, তখনই অরণ্যের বাস এসে পৌঁছল ছোট্ট গ্রামটায়। বাস বলতে আসলে একটা পুরোনো মিনিবাস, জানালার কাচ ঝাপসা, সিটের চামড়ায় ফাটল। গাঁয়ের নাম রাধাপুর—এমন নাম মানচিত্রে খুঁজলেও পাওয়া মুশকিল। তবু অরণ্যের মতো ফটোগ্রাফারের কাছে এই জায়গার টান ছিল অন্যরকম। শহরের কোলাহল, নামজাদা প্রকল্প, নামী…
-
রুদ্রাক্ষ চক্র
অংশুমান রায় ঋদ্ধির আগমন কলকাতার শীত তখন পড়তে শুরু করেছে, তবে হাওয়ার ধার এখনো নরম। সন্ধের আলোয় গড়িয়াহাটের মোড় থেকে দক্ষিণে যে রাস্তা নেমে গেছে, সেই ফুটপাথগুলো ভরে উঠছে শালপাতার ধোঁয়া, ভাজা মুড়ির গন্ধ, আর দোকানিদের চেঁচামেচিতে। ড. অনির্বাণ দত্তের চেম্বার এই মোড় থেকে দশ মিনিট হাঁটাপথ। তিনতলা পুরনো বাড়ির দ্বিতীয় তলায়, কাঠের পালিশ করা…
-
ছিন্নমাথার বরযাত্রী
ফাল্গুনী মিশ্র এক গভীর অন্ধকারে ডুবে থাকা সেই গ্রাম, নাম মালঞ্চপুর। দিনের বেলায় এ গ্রাম চিরচেনা ছবির মতো শান্ত, ধানখেতের সবুজ গালিচা, কুঁড়েঘর আর দিঘির জলে ছেলেদের হাসি-ঠাট্টা। কিন্তু সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন অন্য এক ছায়াময় আবহ নামত এখানে। বিশেষত গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পুরোনো বটগাছটি যেন অজস্র রহস্য গিলে রেখেছে। সেই গাছের…
-
নীলচন্দ্রের অগ্নি
রজত মিত্র দূরপাল্লার লোকাল ট্রেনটা ধীরে ধীরে গ্রামের ছোট্ট স্টেশনে এসে থামল। বিকেলের নরম আলোয় প্ল্যাটফর্মটা যেন হালকা সোনালি ধুলোয় মোড়া। ট্রেন থেকে নেমে চারপাশের নিস্তব্ধতা অনুভব করতেই মোহনাদের কলকাতার কোলাহলের সঙ্গে একেবারে বিপরীত এক জগৎ মনে হল। হাতে ছোট্ট ট্রলিব্যাগ, আর কাঁধে স্লিংব্যাগ নিয়ে সে স্টেশনের গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গ্রামের রাস্তা নির্জন,…
-
কালো জানালার ভেতর
উপাসনা রায় উত্তর কলকাতার যে রাস্তার নাম বারবার বদলেছে, সেখানে একটা বাড়ি আছে যার নাম কখনও বদলায়নি—লোকমুখে “কালোজানালা বাড়ি”। অর্পণ যখন প্রথম দিন চাবিটা হাতে পেল, বিকেলের আলো তখন ছেঁকে পড়ছে ছাদের ধুলোতে; সিঁড়ির মুখে জোনাকি বাতির মতো ঝুলছে পুরনো বাল্ব, আর মেঝের কালো-সাদা মোজাইকের ফাঁক থেকে উঠছে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ—আদ্রতা আর শেওলার মিশ্রণ।…












