১ শহরের সেই দিনটি ছিল অদ্ভুত নীরবতায় ভরা। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছিল, চারপাশে যেন অচেনা অন্ধকার ঘনিয়ে উঠছিল। শশাঙ্ক তার ছোট্ট দর্জির দোকানে বসে সুঁই-সুতোর কাজে ডুবে ছিল, জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল, আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি বাইরে ভৌতিক আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল। দোকানের চারদিকে কাপড়ের গন্ধ, কেটে রাখা কাপড়ের স্তূপ আর এক কোণে পুরোনো সেলাই মেশিনের শব্দ যেন একঘেয়েমির সুর তুলেছিল। হঠাৎ করেই দরজার ঘণ্টা টুং করে বাজল, আর শশাঙ্ক তাকিয়ে দেখল—এক অচেনা বয়স্কা মহিলা দোকানে প্রবেশ করছেন। তিনি লম্বা গড়নের, শরীর শুকনো, কিন্তু মুখে এমন এক দৃঢ়তা আর শীতলতা ছিল, যা প্রথম দর্শনেই ভয়ের স্রোত বইয়ে…
-
-
অধ্যায় ১ – রাতের যাত্রী শহীদুল আলি সেই রাতের ট্যাক্সি চালানোর অভিজ্ঞতা কখনো ভুলবেন না—যেমন কোনো অদ্ভুত স্বপ্ন বাস্তবের আড়ালে ঝুঁকে থাকে, ঠিক তেমনই। রাত গভীর, পার্ক স্ট্রিটের আলো ফিকে, দোকানগুলোর ঘুমে ঢেকে থাকা রঙিন নৈশপ্রদীপ যেন আংশিক জ্বলছে। শহীদুলের চোখ সারাদিনের ক্লান্তি সঞ্চয় করে ঠিক তেমনই ম্লান, কিন্তু তিনি সচেতন ছিলেন—রাতের শহর তাঁর জন্য এক বিশেষ অবসান নয়, বরং একটি নতুন দিনের শুরু। হঠাৎ, মোহনগলি পার্কের কাছে, ফুটপাথে দাঁড়ানো এক মহিলা তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সাদা শাড়ি, যার ধূসর আলোয় প্রায়ই নরম ক্রীমের আভা ফুটে উঠছে, এবং নরম হাসি যা যেন অন্ধকারের মধ্যে আলো ছড়াচ্ছে। তিনি ট্যাক্সিতে উঠে বসলেন…
-
উৎসব তরফদার ১ গ্রামের উত্তর প্রান্তে ভাঙাচোরা ইটের দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে সেই অদ্ভুত জমিদারবাড়ি—যেন সময়ের আঘাতে ক্ষয়ে যাওয়া এক প্রাচীন স্মারক। একসময় এখানে ছিল উজ্জ্বল আলো, অতিথিদের কোলাহল, শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের তালে উৎসবের জোয়ার। আজ সবই ম্লান হয়ে গেছে। পুরু দরজায় মরচে, জানালার শিক ভাঙা, ঘাস-লতাপাতা ক্রমে ঢেকে ফেলেছে সিঁড়ির পাটাতন। দিনের বেলায়ও ভেতরে ঢোকার সাহস করে না কেউ, কারণ ভাঙা ছাদের ফাঁক দিয়ে আলো এলেও, ঘরগুলোতে যেন চাপা অন্ধকার জমে থাকে। অথচ এই অন্ধকারের মাঝেই আছে সেই রহস্যময় বাগান—যা এখনো গ্রামজুড়ে লোককথার বিষয়। বাড়ির পিছনের দিক থেকে শুরু হয়েছে এক বিশাল বাগান, যেখানে আজ আর নিয়মিত যত্ন হয়…
-
সৌম্য বসাক ১ বর্ষার প্রথম বজ্রবিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গে আকাশের বুক ফুঁড়ে যখন জলধারা নেমে আসে, তখনই পুরো গ্রাম যেন কেঁপে ওঠে সেই আওয়াজে। চারিদিকে গাছের পাতার ফাঁকে জমে থাকা ফোঁটা ঝরে পড়তে থাকে, কাদামাটি ভিজে যায় আর ছোট ছোট খালবিলগুলো ফুলে ওঠে। ঠিক তখনই, গ্রামের প্রাচীনতম স্থান—শিবতলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মা মহামায়ার মন্দিরটিকে ঘিরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মন্দিরের গর্ভগৃহ, যেখানে বছরের পর বছর দেবীর কালো পাথরের মূর্তি স্থাপিত আছে, বর্ষার প্রথম দিকেই জলে ভেসে যায়। মন্দিরের চৌহদ্দিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন দেখে—গর্ভগৃহের পাটাতন পর্যন্ত জলে ডুবে যাচ্ছে, আর জ্যোৎস্নার মতো দীপশিখা ম্লান হয়ে উঠছে সেই স্যাঁতসেঁতে আবছায়ায়। গ্রামের…
-
অমিতাভ মাইতি কলকাতার পুরনো রেলস্টেশনের সেই নির্জন প্ল্যাটফর্মে প্রথম পা রাখতেই অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের মনে অদ্ভুত এক উত্তেজনা জেগে ওঠে। সকালবেলার হালকা কুয়াশার মধ্যে প্ল্যাটফর্মের ধুলো জমে থাকা সিমেন্টের রঙ ধূসর এবং শীতল, যেন সময় নিজেই এখানে থমকে গেছে। চারপাশে ভিড়ের কোনো চিহ্ন নেই, শুধু কখনো কানে ভেসে আসে দূরের ট্রেনের হালকা সড়কঘর্ষণ বা মাটিতে ধ্বনিত ধাতব চাকার শব্দ। অনির্বাণের চোখে ধরা পড়ে প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে ছায়ামূর্তি—একটি অচেনা ছায়া, যা ঠিক মানুষের মতো হলেও বিস্তৃত আলোয় মিলিয়ে গেলে স্পষ্ট রূপ বোঝা যায় না। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে অদ্ভুতভাবে শান্ত। বাতাসে একটি নিঃশব্দ, ভীষণ ঘন নীরবতা ভেসে বেড়াচ্ছে, যা যেন…
-
দেবাশিস রায় পুরোনো নদীর ঘাটটি এখন যেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া একটি জায়গা। দিনের বেলায়ও মানুষের পদচারণা খুবই কম, রাতে তা যেন আরও একাকী হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মের তীব্র রোদ কিংবা বর্ষার ঝড়—সবকিছু মিলিয়ে ঘাটের কাঠের ডেক, ছেঁড়া দোলনা, এবং ভাঙা নৌকা-সবকিছুই অবহেলিত ও পরিত্যক্ত। নদীর ধারে ধুলো মিশ্রিত কাদামাটি, নরম বাতাসে পানি ধীরে ধীরে ধোঁয়া হয়ে ওঠে, আর নীরবতা এতটাই ঘন যে মাঝে মাঝে দূরের জঙ্গলের পাতা হেলানো শব্দও স্পষ্ট মনে হয়। রাতের অন্ধকারে ঘাট যেন এক রহস্যময় স্থান, যেখানে সময় থেমে গেছে—প্রতিটি সোপান, প্রতিটি নৌকা যেন অতীতের কোনো গল্পের সাক্ষী। অরুণ, একমাত্র নৌকাওয়ালা, এখানে দিনরাত কাটায়। সে নিজেকে এই…
-
১ শান্তিপুর গ্রাম যেন একদিকে শান্ত, অন্যদিকে ভয়ঙ্কর রহস্যে মোড়া। গ্রামটি ছোট, কিন্তু চারদিকে বিস্তৃত ধানক্ষেত, ঘনবনের মাঝখানে পেঁচানো কাঁচা রাস্তা আর দিগন্তজোড়া নীরবতা যেন একে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। দিনের বেলায় এই গ্রাম প্রাণচঞ্চল—কৃষকের হালচাষ, বাচ্চাদের খেলা, মহিলাদের কুয়োয় ভিড় জমা, আর বিকেলের পর আড্ডায় মেতে ওঠা যুবকরা। কিন্তু রাত নামলেই অন্য ছবি। গ্রামের মানুষদের মুখে একটা অনবরত ফিসফিস—সোনালি পালকির গল্প। বহু প্রজন্ম ধরে চলা এই কাহিনি এতটাই শক্তভাবে গ্রামের মাটিতে গেঁথে গেছে যে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে সাহস পায় না কেউ। গল্পটা হলো, মধ্যরাতের অন্ধকারে কেবল একবার দেখা যায় অদ্ভুত এক সোনালি পালকি। মাটির রাস্তার ধুলোয় যেন আলো…
-
আকাশে হঠাৎ করেই যেন অদ্ভুত এক পরিবর্তন দেখা দিল। বিকেলের শেষ আলোটুকু ম্লান হয়ে যেতেই গ্রামের আকাশ ভরে উঠল কালো মেঘে। দূর থেকে আসা বজ্রপাতের গর্জন যেন ঘুমন্ত প্রকৃতিকে এক এক করে জাগিয়ে তুলছিল। চারপাশের গাছপালার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক এসে পুরো আকাশকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো আলোকিত করে তুলছিল। গ্রাম্য জনজীবন এতদিন ছিল শান্ত ও ধীর—যেখানে সন্ধ্যা মানেই ধূপকাঠির গন্ধ, দূরে কুঁড়েঘরে আলোর ক্ষীণ দীপশিখা আর গৃহস্থালির ছোটখাটো ব্যস্ততা। কিন্তু এই দিনটি যেন ভিন্ন কিছু ঘোষণা করছিল। বাতাসে অদ্ভুত শিরশিরানি, শীতলতা আর অস্থিরতা জমে উঠতে লাগল। ঝড়ের আগমনী সঙ্কেতকে কেউই সাধারণ চোখে নিতে পারল না। বর্ষার দিনে ঝড়-বৃষ্টি নতুন…
-
১ অন্ধকার নেমে এসেছে গ্রামের উপর, চারদিকে নিস্তব্ধতা আর ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আকাশে তখন অর্ধচন্দ্র, তার আলোয় গাঢ় ছায়ার মতো ঘিরে আছে তালগাছ আর বাঁশঝাড়। গ্রামের মাঝখানে পুরোনো সেই পুকুর, যেটি নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত থাকলেও এতদিন কেউ বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু সেদিন রাতে হঠাৎ করেই অদ্ভুত কিছু ঘটে। প্রথমে ভেবেছিল হয়তো চাঁদের প্রতিফলন, কিন্তু দেখা গেল পুকুরের তলদেশ থেকে অস্বাভাবিক নীল আলো উঠছে—ধীরে ধীরে জলের উপরিতলে ছড়িয়ে পড়ছে। আলো এতটাই অচেনা আর মায়াবী ছিল যে গ্রামের লোকেরা ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। বাতাস যেন হিম হয়ে গেল, পুকুরপাড়ের কুকুরগুলো হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,…
-
গ্রামের কালীমন্দিরে দুর্গাপূজার অষ্টমীর রাত মানেই এক অন্যরকম আবহ। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত এই মন্দিরের পুজো দেখতে। সন্ধ্যা থেকেই মন্দিরের চত্বর আলোয় ভরে উঠেছিল, শঙ্খধ্বনি, ঢাকের শব্দ, কাশীর বাঁশির সুর আর ধূপকাঠির ধোঁয়া মিলেমিশে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছিল। গ্রামের ছোটো থেকে বড়ো সবাই নতুন কাপড় পরে এসেছিল, কেউ প্রণাম দিতে, কেউ আবার প্রতিমা দর্শন করে আনন্দ পেতে। মন্দিরের সামনের উঠোনে তখন নাচগানের আসর বসেছিল, কচিকাঁচারা ধুনুচি হাতে ঘুরছিল আর মায়ের আরাধনায় মেতে উঠেছিল। একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কুমুদিনী দেবী, গ্রামের জমিদারবাড়ির বিধবা, তাঁর চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা, যেন উৎসবের আনন্দের ভেতরও কোথাও এক অজানা ভয় তাঁর বুক চেপে ধরেছিল। পুরোহিত…