১ শহরের একেবারে প্রান্তে, ব্যস্ততা ও জনবসতির বাইরে যেন পৃথিবীর ভিন্ন এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো শ্মশান। চারদিক ঘন গাছপালা দিয়ে ঢাকা, লতাগুল্মে জড়ানো ভাঙাচোরা ঘাট, অর্ধেক ডুবে থাকা শিলাস্তম্ভ আর শেওলা ধরা সিঁড়ি—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন সময়ের হাতে পরিত্যক্ত। দিনের আলোয়ও এখানে এক অদ্ভুত গা ছমছমে পরিবেশ বিরাজ করে, আর রাতের অন্ধকারে শ্মশান হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ অন্য রূপে। বহু বছর আগে এখানে চিতা জ্বলত নিয়মিত, শবদেহ সৎকারের জন্য আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষ আসত, কিন্তু এখন অনেক বছর হলো কেউ আর এখানে শবদাহ করতে আসে না। ধীরে ধীরে জায়গাটা জনশূন্য হয়ে পড়ে, শুধু কাক, শেয়াল আর বাদুড়েরা এটিকে নিজেদের…
-
-
জয়ন্ত চক্রবর্তী অধ্যায় ১ – নতুন বাড়ি অর্পিতা নতুন ভাড়া বাড়িতে ওঠার দিনটি ছিল এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির। শহরের রাস্তায় গাড়ি, মানুষ আর চেনা ভিড়ের মধ্যে থেকে বের হয়ে নতুন ঠিকানায় পৌঁছানো, মনে একধরনের অচেনা উত্তেজনা এবং অজ্ঞাত ভয়ের সংমিশ্রণ তৈরি করেছিল। বাড়ির বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, এটি যেন এক সাধারণ, পুরনো শহরের বাড়ি—সাদা দাগ, ছেঁড়া রঙের দেয়াল, এবং অল্প গাছপালার ছায়া—কিন্তু ভেতরে ঢুকেই সবকিছু বদলে যায়। লম্বা করিডর, ফাঁকা ঘরের নিস্তব্ধতা এবং ধুলোমাখা জানালার কাচের মাঝে ধীরে ধীরে রোদ পড়া, তার মনকে এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি দিয়ে ভরিয়ে দেয়। অর্পিতা ভাড়া বাড়িতে ওঠার আগে যেমন অনেক সময় চিন্তিত…
-
অধ্যায় ১ : পুরনো ডাকঘর অরিন্দম চক্রবর্তী শহুরে মানুষ। কলকাতার ভিড় আর ব্যস্ততার ভেতর বহু বছর চাকরি করে হঠাৎই একদিন ট্রান্সফারের চিঠি এসে যায় তার হাতে—পশ্চিমবঙ্গের এক অখ্যাত গ্রামে তাকে বদলি করা হয়েছে নতুন পোস্টমাস্টার হিসেবে। প্রথমে একটু মন খারাপ হয়েছিল, কেননা শহরের আরাম, বন্ধুদের আড্ডা, সিনেমা হল বা বইয়ের দোকান সব কিছুই ছেড়ে আসতে হবে। তবু ভেতরে ভেতরে কৌতূহলও ছিল, গ্রামীণ জীবনের স্বাদ নেওয়া যাবে, আর নতুন জায়গার নতুন অভিজ্ঞতাও তো একরকম রোমাঞ্চ। ট্রেন থেকে নামতেই গ্রামের ছবিটা তার চোখে ধরা দেয়—চওড়া কাঁচা রাস্তা, দুই পাশে ধানক্ষেত, হাওয়ায় ভেসে আসা খড়ের গন্ধ, আর দূরে সাদা মন্দিরের শিখর। এমন সরল…
-
অয়ন দত্ত অধ্যায় ১ – মেলার ডাক গ্রামের বার্ষিক মেলার দিনটি এসেছে, এবং পুরো গ্রাম যেন এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে। সকাল থেকেই মাটির রাস্তাগুলো জমে ওঠে মানুষের পদচারণায়, বেচাকেনা এবং উৎসবের আওয়াজে। হরেক রকমের দোকান সাজানো হয়েছে মেলার মূলমাঠে—ফুলের গলায়, রঙিন বাতির সারিতে, মাটির খেলনা, কাঠের পুতুল, হাতের কাজের ঝুলনা, আর দেশী ও বিদেশী খাবারের তামাশা সব মিলিয়ে যেন গ্রামের প্রতিটি মানুষকে আকৃষ্ট করছে। শিশুরা উল্লাসে দৌড়াচ্ছে, মুখে হেসে খেলে এবং নাগরদোলার ধোঁয়া ও লাল, সবুজ, নীল বাতি তাদের চোখকে মুগ্ধ করছে। গ্রামের বৃদ্ধা-বৃদ্ধরা মাটির বেঞ্চে বসে এই দৃশ্যটি দেখছে, আর তাদের চোখে এক অদ্ভুত ভাব—একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে কিছুটা…
-
নীলাক্ষি বসু বর্ষার রাত। আকাশ যেন কারও অন্তহীন শোক মেখে ভিজে উঠেছে। জানালার কাচের ওপরে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, ছোট ছোট দাগ টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে, আর তার সাথে মিশে যাচ্ছে দূরের বজ্রপাতের সাদা ঝলকানি। হোস্টেলের পুরনো দালানটা বৃষ্টির ঝাপটায় কাঁপছে, বাতাসের ঠান্ডা স্রোত বারবার জানালা ভেদ করে ঢুকে পড়ছে ছোট ঘরটায়। কক্ষের ভেতরে ম্লান আলোয় এক কোণে বসে আছে অর্পণ, সামনের টেবিলে খোলা সরকারি চাকরির প্রস্তুতির মোটা বই। পৃষ্ঠাগুলো ভিজে যাচ্ছে আর্দ্রতায়, মাঝে মাঝে পাতার কিনারা উল্টে উঠছে বাতাসে। অর্পণ খেয়াল করে, প্রতিবার জানালার কাচে বৃষ্টির আঘাত হলে তার বুকের ভেতরটাও অদ্ভুতভাবে ধকধক করে ওঠে। এ যেন…
-
শ্যামল মণ্ডল শান্তিনিকেতনের উপকণ্ঠে বিস্তৃত মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট আশ্রম, যার বয়স অন্তত একশো বছরের কাছাকাছি। চারপাশে তাল, শাল আর আমগাছের ছায়ায় আশ্রমটিকে দূর থেকে মনে হয় যেন সময়ের থেকে আলাদা কোনো টুকরো জায়গা, যেখানে আধুনিকতার কোলাহল ঢুকতে পারেনি। আশ্রমের মূল প্রবেশপথের কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল করবীর গাছ—গোটা এলাকার সবচেয়ে বেশি আলোচিত আর ভয়ভীতির কেন্দ্রবিন্দু। আশ্রমের সন্ন্যাসী আর আশ্রমে পড়তে আসা অনাথ ছেলেমেয়েরা সবাই জানে, দিনের বেলায় করবীর গাছ স্বাভাবিক মনে হলেও সন্ধ্যা নামলেই তার চেহারা পাল্টে যায়। প্রতিদিনই গাছের ডালে ফোটে অদ্ভুত টকটকে লাল ফুল, যার রং এতটাই গাঢ় যে অনেকেই বলে, রক্তের মতো দেখায়। আশ্রমের…
-
সুপ্রিয় মল্লিক অধ্যায় ১: রহস্যময় ডাকঘর গ্রামের প্রান্তে, পুরনো কাঁঠালগাছের ছায়ায় ঢাকা এক বিরাট ডাকঘর দাঁড়িয়ে আছে, যেটি বছর কয়েক ধরে কার্যত উপেক্ষিত অবস্থায় ছিল। দিনের আলোয় ডাকঘরটি দেখতে যেন অতীতের এক ছায়াময় স্মৃতি—ধুলো জমে আছে চারপাশের প্রাচীরের ফাটলগুলোর মধ্যে, ছাদে কোথাও কোথাও মাটি ও কাদা জমে রয়েছে, এবং জানালার কাচগুলো ভাঙা ও ছেঁড়া। গ্রামের মানুষ দূরে দিয়ে হাঁটলেও ডাকঘরের দিকে তাকাতে অস্বস্তি বোধ করে; কেউ কেউ বলতো, “এখানে আর কোনো কাজকর্ম হয় না, শুধু রাতের বেলা ডাকঘরের প্রহরী হয়তো যাদুকরীর মতো নিজে নিজে ঘুরে বেড়ায়।” ডাকঘরের চারপাশে বেড়ে থাকা খড়ের গাদাগুলি ও ঝোপঝাড় যেন আরও ভয়াল একটি পরিবেশ তৈরি…
-
সুবর্ণ সাহা অধ্যায় ১: পাহাড়ি শহরের গল্প উত্তরবঙ্গের ছোট্ট পাহাড়ি শহরটির নাম মানুষজন খুব একটা জানে না, অথচ তার বুকজুড়ে ইতিহাসের চাপা স্তর জমে আছে বছরের পর বছর ধরে। চা-বাগানের মাঝখানে, খরস্রোতা নদীর ধার ঘেঁষে আর কুয়াশায় ঢাকা বনানীর ভেতর দিয়ে ছোটো রাস্তাগুলো ছড়িয়ে আছে। পাহাড়ি হাওয়ায় ভেসে আসে কাঠের গন্ধ, আর মাটির ভেতর থেকে উঠে আসা একধরনের আর্দ্র শীতলতা মানুষকে অচেনা এক আতঙ্কে আবদ্ধ করে রাখে। শহরের বাসিন্দারা দিনের বেলা যতটা সরগরম থাকে, রাত নামলেই ততটাই নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তবে এই নিস্তব্ধতার ভেতরে আছে এক অদ্ভুত শূন্যতা—যেটাকে তারা বরাবরই এক পুরনো ভবনের নামের সঙ্গে জুড়ে দেয়। সেটি হলো পাহাড়ি…
-
অতিন্দ্র মুখার্জী অধ্যায় ১ – ঝড়ের রাত সুন্দরবনের গভীর অরণ্যের ভেতর যখন ভাটা নামে, তখন গোটা অঞ্চলের নদী, খাঁড়ি আর নোনা জল যেন অন্য এক সুরে বেজে ওঠে। দিনের শেষে জোয়ারের স্রোত সরে গিয়ে জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে কেবল মাটির গন্ধ আর ভেজা বাতাস ভেসে বেড়ায়। এ সময় মাছ ধরতে বের হওয়া জেলেদের জন্য কাজটা যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি ভয়ংকরও বটে, কারণ ভাটার পরে আসা ঝড় বা ঘূর্ণি হঠাৎ করেই সবকিছু গ্রাস করতে পারে। হরিদাস মণ্ডল, চেহারায় বলিষ্ঠ কিন্তু জীবনে দুঃখে জর্জরিত, এই রাতেও নিজের ভাঙাচোরা নৌকায় জাল নিয়ে নদীতে নামে। আকাশে তখন কালো মেঘ জমে উঠেছে, বাতাসের গায়ে লবণাক্ত কটু স্বাদ,…
-
ঋত্বিক বসু কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের গলির ভেতরে অচেনা এক দোকান হঠাৎ চোখে পড়ল অরুণবাবুর। কাঠের পুরনো বোর্ডে লেখা—‘কালান্তর এন্টিকস’। চারপাশে আধুনিক দোকানের ঝলমলে সাইনবোর্ডের ভিড়ে এই অক্ষরগুলো যেন একেবারে উনিশ শতকের চিহ্ন। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। দোকানের ভেতরটা অদ্ভুত অন্ধকার, জানালার কাচে ধুলো জমে আছে, কিন্তু ভেতর থেকে ক্ষীণ হলুদ আলো বেরিয়ে আসছে। এক অদ্ভুত টান অনুভব করলেন, যেন কেউ ডাকছে। অরুণবাবু পেশায় শিক্ষক, ইতিহাসের মানুষ। পুরোনো জিনিসপত্র তাঁর দুর্বলতা। তাই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। ভেতরে প্রবেশ করতেই কপালে ঠান্ডা বাতাস লাগল, যেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো ঘরে ঢুকেছেন, অথচ জানেন এই দোকানে সেরকম কিছু নেই। চারদিকে ভাঙাচোরা কাঠের আলমারি, পুরোনো…