সৌম্যজিত লাহিড়ী ১ অক্টোবরের সূর্য তখন রক্তিম হয়ে অস্ত যাচ্ছে, বিষ্ণুপুর শহরের উপর ধীরে ধীরে নেমে আসছে পুজোর সন্ধ্যা। বাঁকুড়ার ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে ঋষভ সেনগুপ্ত তার DSLR-টা কাঁধে ঝুলিয়ে নামল লোকাল বাস থেকে। বেশ কিছুদিন ধরেই সে পরিকল্পনা করছিল দুর্গাপুজোর এক বিশেষ সিরিজ করবে — শহর থেকে দূরে, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এমন পুজো, যেগুলো এখন কেবল ইতিহাসের পাতায় টিকে আছে। বিষ্ণুপুরের এক স্থানীয় গাইড তাকে বলেছিল, শহরের প্রান্তে একটা পোড়া রাজবাড়ি আছে যেখানে কোনো এক সময় দুর্গাপুজো হত, আজ আর কেউ যায় না, কিন্তু একটা প্রতিমা নাকি এখনও প্রতি বছর বানানো হয় এবং অল্প কিছু মানুষ সেখানে পুজো করে। কৌতূহলবশত…
-
-
দেবায়ন মুখোপাধ্যায় এক পিতার মৃত্যুর পরে বছরখানেক কেটে গেছে, কিন্তু ঋষভের জীবনে সেই শূন্যতা যেন আজও পুরোপুরি ভরেনি। শহরের ব্যস্ততা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ আর বন্ধুদের হাসিঠাট্টার মাঝেও কিছু একটা চুপচাপ গুমরে গুমরে উঠত ভেতরে—একটা অপূর্ণতা, একরকম গোপন আর অজানা অভাব। এবার গ্রীষ্মের ছুটিতে সে ফিরে এসেছে পুরনো বাড়িতে—উত্তর কলকাতার অন্ধকার আর ধূলিধূসর অট্টালিকা, যার প্রতিটি দেয়ালে, জানালায়, এমনকি বাতাসে লেগে আছে সেই মানুষটার ছায়া, যাঁকে সে পুরোপুরি চিনতেই পারেনি কখনও। দেবদ্যুতি সেন—ঋষভের বাবা—ছিলেন এক সময়ের বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত, কিন্তু পরবর্তী জীবনে তাঁর আচরণ হয়ে উঠেছিল রহস্যময়, চাপা, এমনকি ভীতিকরও কিছুটা। নিজের ঘরে একা একা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা, কুঠুরি বন্ধ…
-
ঋদ্ধি চক্রবর্তী পর্ব ১: কালির চোখ কলকাতা শহরের মধ্যভাগে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরোনো পাঠাগার—“রায় রে’ডিং রুম”—তেমন কোনও বিখ্যাত জায়গা নয়। অথচ সেখানে প্রতিদিন দুপুর তিনটার সময় ঠিক এক জন মহিলা এসে বসেন, বাম দিকের দ্বিতীয় সারির তৃতীয় টেবিলে। তাঁর নাম অনামিকা বাগচী। বয়স আটাশ। পেশায় গবেষক, জাদুবিদ্যা ও তন্ত্রশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে তাঁর আসল কাজ শুরু হয় যখন বইয়ের পাতাগুলো শেষ হয়, আর প্রশ্নগুলো মুখে না থেকে ঢুকে পড়ে মগজে। সেদিন দুপুরেও অনামিকা এসে বসেছিল টেবিলটায়। লাল কাপড়ে মোড়া একটা পুরনো খাতা তার সামনে। নাম নেই, লেখকের উল্লেখ নেই। পাতাগুলোতে শুধুই আঁকা—ত্রিকোণ, মন্ডল,…
-
তাপস মিত্র ১ কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো, প্রায় পরিত্যক্ত স্টুডিও—যার নাম ‘নৃত্যনিকেতন’—সেখানে প্রায় ছয় বছর পর ফিরে এল অর্ণবী সেন। একসময় এই স্টুডিও তার প্রথম নাচ শেখার জায়গা ছিল, যেখানে প্রতিটি কাঠের মেঝে, প্রতিটি আয়না তাকে শিখিয়েছিল শরীরের ভাষা। এখন সে দেশের খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী, দেশে-বিদেশে শো করে বেড়ায়, অথচ মনটা ফিরে আসে এই পুরোনো কাঠের দরজার নিচে জমে থাকা ধুলোর গন্ধে। গুরু মীরা বসুর ডাকে এসেছিল আজ, স্টুডিওর নীচের পুরোনো ঘরে কিছু পুরনো উপকরণ খুঁজে বের করতে হবে—পুরোনো পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, কিছু অলঙ্কার—যেগুলো তাদের নতুন নাট্য প্রযোজনায় ব্যবহৃত হবে। অর্ণবী একাই ঢুকেছিল সেই ঘরে। জানালার ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে…
-
তীর্থঙ্কর সেন ১ ঘরের ভেতর তখন মাঝরাত পার হয়ে গেছে। অভিষেক ধর একা বসে ছিল তার পুরোনো ডেস্কটপের সামনে, চোখের নিচে হালকা কালি, ঠোঁটে ক্লান্তির চিহ্ন, তবু মনোযোগ অটুট। কোড লেখার থেকে বেশি আজ তার আগ্রহ ছিল ডার্ক ওয়েবের অদ্ভুত সব ফোরাম ঘাঁটাঘাঁটিতে। টর ব্রাউজারে ‘Deep Onion’ রাউট দিয়ে সে ঢুকেছিল এমন এক সাইটে যেখানে হ্যাকিং টুল, অস্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট, এমনকি কালো বাজারে বিক্রি হওয়া মানুষের ডেটা পাওয়া যায়। এসব তার কাছে নতুন নয়, বরং নেশার মতো। হঠাৎ সে এক লিংকে ক্লিক করল— “TantraDoc.net – Unlock Ancient Tantra Through Live Sessions”. চোখ কুঁচকে পড়ল সে। তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে ওয়েবে এমন সাইট সে…
-
নীলাদ্রী সেনগুপ্ত ১ রুদ্র বসুর চোখে নদিয়ার এই ছোট্ট গ্রামটা ছিল শুধু আরেকটা বিনিয়োগের জায়গা, অথচ আজ যখন সে ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে পুরনো তাঁতকলের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তার বুকের ভেতর যেন কিছু একটা গুমরে ওঠে। শহরের কোলাহল, ব্যস্ত কর্পোরেট দুনিয়া আর অবিরাম ডেডলাইনের জীবন থেকে বেরিয়ে রুদ্র এবার নিজের মতো করে কিছু শুরু করতে চায়—নিজের তৈরি কিছু, নিজের সিদ্ধান্তে। তাই তো সে কিনে নিয়েছে এই বহু বছর ধরে বন্ধ পড়ে থাকা, ধুলো-জমা এক তাঁতকল, যেটার ইটের গায়ে এখনও পুরোনো মসৃণতা আর গুমোট ঘামের গন্ধ লেগে আছে। কলের কেয়ারটেকার, বৃদ্ধ মদন, তাকে চাবি তুলে দেয় এক কথাও না বলে—শুধু একবার…
-
তনিমা বসাক পর্ব ১: অজ্ঞাত সংলাপ কলকাতার গ্রীষ্মের বিকেল যখন কাচে ধাক্কা মারে, মনের ভেতরের অতীত-বর্তমানও তখন এক অদ্ভুত তাপমাত্রায় কাঁপে। ড. অরণ্য সেন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বাইরের ঝিম ধরা রোদ আর ঘামচাপা শহরের ভাঁজে ভাঁজে যতসব অদেখা গল্প জমা হচ্ছে, তার দিকে তাকিয়ে। তাঁর চেম্বারটি শহরের দক্ষিণে, বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছাকাছি, চতুর্থ তলায়, চুনে ধরা দেওয়ালের পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া বিবর্ণ সিঁড়ির শেষ প্রান্তে এক প্রাইভেট চেম্বার। এইখানেই তিনি মানুষের মন পড়েন—যেমন দারোয়ান পড়ে কাগজে মোড়া চা, কিংবা বইয়ের দোকানের ছেলে পড়ে পৃষ্ঠার ভাঁজ। আজ তাঁর টেবিলের সামনে বসে রয়েছে এক অদ্ভুত মেয়ে—নিপা বসু। চোখে সুরের মতো নরম অস্থিরতা,…
-
জয়ন্ত পাল ১ কলকাতার আকাশে সেদিন অদ্ভুত এক মেঘ ছিল, যেন কেউ কালির কুয়াশা ছড়িয়ে দিয়েছে শহরের উপর। দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া মোড়ের চতুষ্পথে বিকেলবেলার ব্যস্ত ট্রাফিক হঠাৎ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল, যখন এক ভবঘুরে মানুষ মাঝ রাস্তায় এসে দাঁড়াল। তার গায়ে ছিল মলিন গেরুয়া পোশাক, মাথাভর্তি উসকো চুল, আর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। কেউ কেউ বলেছিল, সে হয়ত ভবঘুরে কোনও পাগল সাধু; আবার কেউ চোখ কপালে তুলে দেখছিল, তার চোখে যেন আগুনের ঝলকানি। লোকটা দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা জপতে লাগল, ভাষা বোঝা যাচ্ছিল না—কিন্তু আশেপাশে এক অদ্ভুত গুঞ্জন সৃষ্টি হচ্ছিল, যেন শব্দ নয়, ধ্বনি নয়, বরং সময়…
-
দেবাশিস রুদ্র ১ ভবানীপুরের গলিপথে ঢুকে গেলে একসময় মনে হয়, যেন শহর থমকে গেছে এক শীতল অভিশপ্ত নিঃশব্দে। এখানকার পুরনো পাঁচিল, দোতলা দালানগুলো, টালির ছাদের ফাঁক গলে ঢুকে পড়া আগাছা, আর ভিজে অন্ধকার ঘরের জানলা থেকে যেন ইতিহাসের অতীত গন্ধ বেরিয়ে আসে। এমনি এক বিকেলে, প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করে, মল্লিকবাজার থেকে ট্যাক্সি করে নামলেন মহুয়া পাল। এক হাতে সুটকেস, অন্য হাতে ছাতা। চোখে কৌতূহলের দীপ্তি। ভবানীপুরের ‘শ্রীগুরু নিবাস’ নামক প্রাচীন বোর্ডিং হাউসটি তার নতুন ঠিকানা হতে চলেছে। কলেজে পড়ার সুবাদে আত্মীয়-স্বজনের থেকে কিছুটা দূরে থাকার সুযোগ পেয়ে সে খুশি হয়েছিল, কারণ তার ভেতরের অনুসন্ধিৎসু মন চেয়েছিল একান্তে কিছুটা সময়…
-
স্নেহা মুখার্জী অধ্যায় ১: আগমন পৃথিবীতে কিছু আগমন নিতান্তই ঘটনাক্রম নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত ছক, যা কারও অজান্তে বুনে চলে ভাগ্যের জাল। অরিন্দম মুখার্জির শান্তিনিকেতনে আগমন তেমনই এক আগমন। আপাতদৃষ্টিতে গবেষণার জন্য শান্ত, নির্জন পরিবেশে এসে লোকসাহিত্য নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে এসেছেন তিনি, কিন্তু বাস্তবে—এই যাত্রা ছিল অতীতের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়ের টান। এক মেঘলা শরতের দুপুর। খোলা রিকশায় বসে অরিন্দম শান্তিনিকেতনের দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার ধারে লালমাটির পথ, পাশে শাল-পলাশের অরণ্য, মাঝে মাঝে কাঁঠালের গন্ধ ভেসে আসে বাতাসে। আকাশে রোদ-আলোর সঙ্গে মিশে আছে হালকা কুয়াশা, যেন প্রকৃতিই কিছু লুকিয়ে রেখেছে। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, — “আপনার বাড়ি কোথায়, বাবু?” — “কলকাতা। তবে এখন…