মৈনাক সেন ডঃ নীরব মুখার্জীর জীবনে আজকের দিনটি অন্যরকম একটি দিনের মতো মনে হচ্ছিল। প্রত্নতত্ত্বের প্রতি তার আগ্রহ এবং অতীতের অজানা ইতিহাসকে উদঘাটনের তৃষ্ণা তাকে প্রাচীন রাজবাড়ির দিকে নিয়ে এসেছিল। বর্ধমান জেলার কোলাহলপূর্ণ শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত এই রাজবাড়ি প্রায় শত বছরের ইতিহাস লুকিয়ে রেখেছিল। স্থানীয়রা তাকে সতর্ক করেছিল, গুজবের ছায়ায় ভরা এই প্রাসাদে প্রবেশ করলে অজানা বিপদের মুখোমুখি হতে হতে পারে, কিন্তু নীরবের কৌতূহল তাকে থামাতে পারেনি। প্রবেশদ্বার পেরোতেই, তার চোখে ধরা পড়ল বিশাল পাথরের দেয়াল, যেগুলোতে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। পাথরের গায়ে খোদাই করা অদ্ভুত প্রতীক এবং ধূসর রঙের পাপড়ির মতো ছোপ তাকে এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্যে নিক্ষেপ…
-
-
সুজন মুখোপাধ্যায় অধ্যায় ১: অর্পিতা ছিলো ইতিহাসের ছাত্রী, গবেষণার কাজে তার এক বিশেষ আগ্রহ ছিলো লোকাচার, লোকবিশ্বাস আর প্রাচীন দেবীসাধনা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন—অসম্পূর্ণ একটি প্রবন্ধের জন্য মাঠপর্যায়ের কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সেই সূত্রেই সে পৌঁছাল এক বহু পুরোনো, প্রায় ভগ্নদশা মন্দিরে, যা এখন আর কারও তীর্থক্ষেত্র নয়, কেবলমাত্র গ্রামবাসীদের চোখে ভয়ের প্রতীক। চারিদিকে বুনো লতাগুল্মে ঢাকা, মন্দিরের প্রাচীর ভেঙে গেছে অনেক জায়গায়, পাথরের মূর্তি গুলো অর্ধেক মাটির নিচে চাপা পড়েছে। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করতেই অর্পিতা অনুভব করল এক অদ্ভুত শীতলতা, যদিও বাইরের রোদ ছিলো প্রবল। বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি জেগে উঠল তার, তবুও সে এগোলো—কারণ গবেষণার…
-
সঞ্চারী নাগ উত্তরাধিকার চৌধুরী বাড়িটা যেন কলকাতার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক টুকরো ইতিহাস। বাইরের রাস্তায় কোলাহল, গলিপথে ঠেলাঠেলি অটো আর ছেঁড়া পোস্টারের ভিড়, কিন্তু উঁচু পাঁচিল ঘেরা সেই বনেদি বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই যেন সময় একেবারে অন্য গতিতে বয়ে চলে। আঙিনার মাঝখানে একটা বিশাল আমগাছ, তার চারপাশে বিক্ষিপ্ত ছায়া পড়ে আছে, আর সেই ছায়ার মধ্যে পড়ে আছে বহু প্রজন্মের অগণিত স্মৃতি। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেই প্রথমেই চোখে পড়ে একপাশের শীতল ঘরখানা, যেখানে ঢাকা দেওয়া আছে পুরোনো কাঠের আসবাবপত্র। ধুলো জমে থাকা পর্দার ফাঁক গলে আসা আলোয় দেখা যায় দেয়ালের কোণায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল আয়না, লম্বা কাঠের ফ্রেমে বসানো, যার…
-
সুশান্ত নস্কর গ্রামটা ছোট হলেও রহস্যে ভরা। চারদিকে সবুজ ধানখেত, মাঝে কাঁচা রাস্তা আর পাড়াগাঁয়ের সেই স্নিগ্ধ নীরবতা—দিনে যত শান্ত, রাতে ঠিক ততটাই অদ্ভুত। শীতের শেষ আর গরমের শুরু, মাঝের সময়ে হঠাৎই গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে লাগল এক ভয়ানক গুজব। মানুষ বলে, মাটির ভেতর থেকে ভেসে আসে কণ্ঠস্বর—কখনো বিলাপের মতো, কখনো প্রার্থনার মতো, আবার কখনো এমন এক অস্পষ্ট আহ্বান, যা শুনে শরীরে কাঁটা দেয়। প্রথম প্রথম দু-একজন গ্রামবাসী শুনলেও পরে অনেকে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে লাগল। কৃষক নিত্যানন্দ একরাতে গরু ঘরে বাঁধতে গিয়ে শুনেছিল অচেনা কারও কান্না। ভাবল হয়তো পাশের জমির খাঁজে কোনো মানুষ আটকে আছে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখে কিছুই…
-
শৌনক দে গ্রামের সীমানা অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে অনিরুদ্ধ সেন অনুভব করলেন যে, এখানে কোনো সাধারণ শীতলতা নেই; বরং এক অদ্ভুত শীতলতা আছে, যা হাড় কাঁপানোর মতো ঠান্ডা না হলেও, মনকে স্থির করে, চুপচাপ করে রাখে। গ্রামটি চুপচাপ, রাস্তার ধুলো উঠছে নিঃশব্দে, এবং বাতাসে যেন অদৃশ্য কোনো দমনের গন্ধ ভাসছে। গ্রামের মানুষের চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক, যা তাদের মুখের হাসিকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। তারা খুব সাবধানভাবে চলাফেরা করে, যেন কোনো অদৃশ্য চোখ তাদের প্রতি তাকিয়ে আছে। অনিরুদ্ধ একটি ছোট কুঁড়েঘরের কাছে রিকশা থামালেন, যেখানে গ্রামের মানুষ সাধারণ জীবনযাপন করছে বলে মনে হলেও, তাদের আচরণে যেন প্রতিটি মুহূর্তে এক অনিশ্চয়তার চাপ…
-
কল্যাণ মুখার্জী শ্মশান ঘাটে সেই রাতে যেন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। চারিদিকে ঘন কুয়াশার চাদর, দূরে শ্মশানের পুরনো বটগাছের ডালে ডালে বাদুড়ের কর্কশ ডাক, আর মাঝেমধ্যেই কুকুরের হাহাকার যেন ভয়কে আরও ঘনীভূত করে তুলছিল। অমাবস্যার ঘন অন্ধকার নয়, তবু পূর্ণিমার আলোয় চারদিক সাদা হয়ে উঠলেও সেই আলোতে ছিল এক অস্বাভাবিক রক্তাভ আভা। যেন চাঁদ নিজেও এই রাতের সাক্ষী হতে গিয়ে অচেনা কোনো রূপ ধারণ করেছে। গ্রামের মানুষজন শ্মশানের সীমানা থেকে দূরে, পুকুরপাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে তাকিয়ে ছিল। কারও চোখে ভীতি, কারও চোখে কৌতূহল, কিন্তু সবার মনে একই প্রশ্ন—আজ রাতেই কি ভৈরবনাথ তাঁর বহুদিনের সাধনার সফলতা অর্জন করতে চলেছে? সেই…
-
অর্কদীপ সেন পর্ব ১ : আগুনের পুঁথি রুদ্রর বয়স তখন সাতাশ। কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানে তার গবেষণা শেষ পর্যায়ে। তার বিষয়—বাংলার লোকবিশ্বাস, ভূতপ্রেত, তন্ত্রমন্ত্র আর আচার। এই শহরে যাদের কাছে তন্ত্র কেবল এক অদ্ভুত ভয়ের প্রতীক, তাদের চোখে রুদ্র ছিল খানিকটা অদ্ভুতুড়ে। সে পুরোনো গ্রন্থাগারে বসে দিনের পর দিন প্রাচীন পুঁথি ঘাঁটতে ভালোবাসত, রাতে ঘরে ফিরে নিজের নোটবইয়ে লিখে রাখত অদ্ভুত সব ছেঁড়া ছেঁড়া তথ্য—যেন একটি ভাঙা আয়নার টুকরো একত্র করছে, কিন্তু আয়নার প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। এক বিকেলে, গরমের ধুলোয় ভরা মে মাসে, রুদ্র যায় নীলরতন লাইব্রেরির আর্কাইভ বিভাগে। আর্কাইভের ভেতর ঢুকলেই ম্লান আলোয় অদ্ভুত গন্ধ ছড়িয়ে থাকে—পুরোনো কাগজ,…
-
অংশুমান রায় ঋদ্ধির আগমন কলকাতার শীত তখন পড়তে শুরু করেছে, তবে হাওয়ার ধার এখনো নরম। সন্ধের আলোয় গড়িয়াহাটের মোড় থেকে দক্ষিণে যে রাস্তা নেমে গেছে, সেই ফুটপাথগুলো ভরে উঠছে শালপাতার ধোঁয়া, ভাজা মুড়ির গন্ধ, আর দোকানিদের চেঁচামেচিতে। ড. অনির্বাণ দত্তের চেম্বার এই মোড় থেকে দশ মিনিট হাঁটাপথ। তিনতলা পুরনো বাড়ির দ্বিতীয় তলায়, কাঠের পালিশ করা দরজা, পাশে ছোট পিতলের নেমপ্লেট — Dr. Anirban Dutta, Consultant Psychologist. চেম্বারের ঘড়িতে তখন সাড়ে সাতটা। দিনের শেষ রোগী চলে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। অনির্বাণ ডেস্কে হেলান দিয়ে কাগজপত্র গুছাচ্ছিলেন, তখনই নিচের দারোয়ান কাঁচা গলায় ডাকল, — “ডাক্তারবাবু, একজন এসেছেন… বলছেন খুব জরুরি।” তিনি চোখ তুলে…
-
সন্দীপন বিশ্বাস অন্ধকারে মোড়া সেই গ্রামে দীপঙ্কর সেনের আগমন যেন এক অদ্ভুত পূর্বাভাসের মতো ছিল। কলকাতার ইতিহাসবিদ ও লেখক হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল, আর তাই গবেষণার তাগিদেই সে এই দূরবর্তী গ্রামে আসে। গ্রামের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কালী মন্দিরের পাশে কূপটির কথা সে অনেক আগে থেকেই শুনে এসেছে—লোকমুখে কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে থাকা গল্প যে, রাত নামলেই এই কূপ থেকে অশুভ ছায়ারা বেরিয়ে আসে। শোনা যায়, বহু বছর আগে এখানে এক তান্ত্রিক সাধক তপস্যা করত, আর কূপের অন্ধকার গভীরে তার আত্মা এখনও বন্দী আছে। দীপঙ্কর প্রথম দিনেই গ্রামে পৌঁছে বুঝতে পারে, এখানকার মানুষদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। দিনের আলোতে গ্রামটি দেখতে…
-
গৌরব মিত্র কলকাতার আর্চিওলজি ডিপার্টমেন্টের সেমিনার রুমে বসেছিলেন দীপাংশু মুখার্জী। দেওয়ালের একপাশে প্রাচীন শিবমূর্তির ছবি, অন্যপাশে মধ্যযুগীয় মন্দিরের স্থাপত্যের স্লাইড প্রজেক্টর থেকে আলো ফেলে ঝলমল করছে। টেবিলের ওপর ছড়ানো নোটবুক, কাগজপত্র, আর তার হাতের পরিচিত সিগারেটের ধোঁয়া মিলেমিশে যেন কক্ষটিকে এক অদ্ভুত আবহে ভরিয়ে তুলেছিল। সেমিনার চলাকালীনই দপ্তরের এক চতুর্থশ্রেণির কর্মী এসে একটি খাম দিয়ে গেল—সাধারণ বাদামি রঙের, কোন প্রেরকের নাম নেই, কেবল কালো কালিতে লেখা তাঁর নাম আর ডিপার্টমেন্টের ঠিকানা। খানিকটা অবাক হয়ে খাম খুলতেই চোখ আটকে গেল মাত্র এক লাইন লেখায়—“চৌষট্টি যোগিনীর পূজা অসমাপ্ত, তুমি কি দেখতে চাও?”। মুহূর্তেই শরীরের ভেতর শিরশিরে একটা শীতলতা ছড়িয়ে গেল। ‘চৌষট্টি যোগিনী’…