অভিষেক মজুমদার ১ কলকাতার ব্যস্ত নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার দূরে শান্তিনিকেতনের উপকণ্ঠে ছোট্ট একটি গ্রাম। নাম তার—চৌরঙ্গীডাঙা। বাইরে থেকে এ গ্রাম দেখতে সাধারণ, কাঁচা রাস্তা, ধানের ক্ষেত, গরুর গাড়ি, বিকেলের আড্ডায় চায়ের দোকান, মেলার সময় পুতুলনাচ বা বাউল গান। কিন্তু এই গ্রামকে ঘিরে এক অদ্ভুত গল্প বহুদিন ধরে চলে আসছে, যা শুনে আশেপাশের গ্রামও শিহরিত হয়ে ওঠে। কথিত আছে, বর্ষা নামার আগে, বিশেষ করে আষাঢ় মাসের শেষ রাতে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের বাঁশবনে এক অদ্ভুত আচার হয়। সেই বাঁশবন খুব পুরোনো, অন্ধকারাচ্ছন্ন, সূর্যের আলোও সেখানে খুব বেশি প্রবেশ করে না। দিনের বেলায় সাধারণ মনে হলেও রাত নামলে তার…
-
-
কলকাতার পুরনো শহরের অলিগলি পেরিয়ে যখন গঙ্গার ধারের কাছাকাছি এক মন্দিরের ভগ্নাবশেষে প্রত্নতত্ত্ব খনন শুরু হয়, তখন সৌরভ সেনগুপ্ত তার গবেষক দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভোরের আলোয় ভেজা গম্ভীর মন্দিরপ্রাঙ্গণটিতে শূন্য নীরবতা নেমে ছিল, শুধু কাকের ডাক আর হাওয়া বয়ে যাওয়া পাতার শব্দ ছাড়া। সৌরভ ছিলেন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক, বহুদিন ধরে প্রাচীন মুদ্রা ও শিলালিপি নিয়ে কাজ করছেন, তবে এ রকম গোপন শক্তির গুজব জড়ানো কোনো নিদর্শন তিনি হাতে পাননি। খননের কাজ এগোতে এগোতে যখন মাটির গভীরে পাথরের স্তূপ সরানো হলো, হঠাৎই কারও হাতের আঘাতে ধাতব আওয়াজ বেজে উঠল। সবাই থমকে দাঁড়াল, আর সৌরভ ধীরে ধীরে নিচু হয়ে সেই…
-
অর্ঘ্য বিশ্বাস রূপসা শহরের ভিড় আর হট্টগোল থেকে ফিরে গ্রামে পা রাখতেই সে অনুভব করল এক অদ্ভুত শান্তি আর একই সঙ্গে অচেনা উত্তেজনা। দুর্গাপূজার রাতের রং এবং উজ্জ্বল আলো গ্রামের প্রতিটি ঘর-মাঠে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকের মৃদু গর্জন, মাটির পথ ঘেঁষে দোলা দুলন্তের কাঁপুনি, এবং দেহে ধীরে ধীরে প্রবাহিত উৎসবের উচ্ছ্বাস—সবকিছু এক অসাধারণ মিলন ঘটাচ্ছিল। রূপসার চোখে গ্রামের ঘরবাড়ির রঙিন বাতি, দুর্গার মূর্তির দিকে মানুষদের ভিড়, শিশুদের দৌড়ঝাপ, নারীদের শাড়ির ঝাঁকুনি—সব মিলিয়ে এক জোয়ারময় দৃশ্য। কিন্তু এই সাধারণ উৎসবের সৌন্দর্যের মাঝেই কিছু অদ্ভুততার ছায়া ভেসে উঠছিল। গ্রামের প্রান্তের দিকে ধূসর ধোঁয়া আর জ্বলন্ত আলো দেখতে পেয়ে সে প্রথমে ভাবল হয়তো কেউ…
-
সুব্রত গুহ অধ্যায় ১ – গুরু ও শিষ্যের সাক্ষাৎ প্রাচীন অরণ্যের ভেতর নিস্তব্ধতার মাঝে আশ্রমটি দাঁড়িয়ে ছিল যেন সময়ের স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। ঘন বৃক্ষরাজির আড়ালে লুকোনো এই স্থানে পৌঁছতে হলে সাধারণ মানুষের অনেক সাহস প্রয়োজন, কারণ গ্রামের মানুষজন বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পায়। অরণ্যের পথে যতই গভীরে প্রবেশ করা যায়, ততই প্রকৃতির এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা অনুভূত হয়—পাখির ডাক ক্ষীণ হয়ে আসে, বাতাস যেন ধীর হয়ে পড়ে, আর প্রতিটি ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকে অজানা আতঙ্ক। ঠিক এই নীরবতার ভেতর দিয়েই অর্জুন এগিয়ে আসে, তার অন্তরে ভয় ও কৌতূহলের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। বয়স মাত্র…
-
ঋত্বিক বসু পর্ব ১ শ্মশানের ধোঁয়া যেমন ধীরে ধীরে রাতের বাতাসে মিলিয়ে যায়, তেমনই গোপালচন্দ্রর জীবনও এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মিশে গেছে। সে এই শ্মশানকর্তার কাজ করছে প্রায় পনেরো বছর। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত—কখনও কফিনে ঢাকা শরীর, কখনও শবযাত্রার সানাই, আবার কখনও হাহাকার করা আত্মীয়দের চোখের জলে ভিজে যাওয়া কাঠের চৌকি। তার কাছে সব যেন একই রকম। শ্মশান মানেই মৃত্যু, মৃত্যু মানেই চুপচাপ এক ছায়ার দিকে মিলিয়ে যাওয়া। কিন্তু সে রাতে কিছু যেন অন্যরকম ছিল। আগুন নিভে এসেছে, শেষ কাঠটুকু ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। গোপালচন্দ্র বাঁশের ঝুড়ি হাতে গঙ্গার জলে ভিজিয়ে ছাই ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চারদিক নির্জন, কেবল রাতের পেঁচার ডাক আর…
-
সুজন কর্মকার ১ কলকাতার এক শীতল বিকেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অডিটোরিয়ামে জমে উঠেছিল এক বিশেষ বক্তৃতা। উপস্থিত দর্শকদের ভিড় ভরিয়ে দিয়েছিল সাদা দেয়ালঘেরা হলে, যেখানে একদিকে ছাত্রছাত্রীরা তাদের খাতায় দ্রুত নোট নিচ্ছিল, অন্যদিকে কিছু অধ্যাপক কপালে ভাঁজ ফেলে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলেন ড. অরিত্র মুখার্জী—একজন প্রখ্যাত পদার্থবিদ, যিনি গবেষণায় যেমন কড়া, তেমনি মতামতে দৃঢ়। লম্বাটে চেহারা, নাকের উপর সোনালি ফ্রেমের চশমা, আর হাতে একটি সাদা চক—এমন ভঙ্গিমায় তিনি যেন একাই এক অদম্য শক্তি। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল স্বচ্ছ, কঠিন অথচ প্রলুব্ধকর। তিনি বোর্ডে জটিল সমীকরণ লিখে বলছিলেন, “এই মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটছে, তার পেছনে আছে গণনা, সূত্র, এবং ব্যাখ্যাযোগ্য পদার্থবিদ্যা।…
-
ভাস্কর চক্রবর্তী কলকাতার জনবহুল শহরের বুকেই যেন অধ্যাপক অরিন্দম মুখার্জীর জীবন বাঁধা ছিল বই, গবেষণাপত্র আর ছাত্রছাত্রীদের ব্যস্ত ভিড়ের মাঝে। নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে তিনি বহুদিন ধরেই আদিবাসী সমাজ, লোকাচার, লোকসংগীত ও তন্ত্রসংক্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁর ডেস্কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা নথি, পুরনো গ্রন্থ আর নোটবইতে বারবার উঠে এসেছে এক শব্দ—“শবর মন্ত্র।” এই শব্দটি তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে টানছিল, কারণ এ নিয়ে খুব বেশি লিখিত তথ্য পাওয়া যায়নি, কেবল অস্পষ্ট কিছু উল্লেখ রয়েছে প্রাচীন পুঁথি আর কয়েকটি বিদেশি ভ্রমণকারীর ডায়েরিতে। যতই তিনি এ বিষয়ে পড়েছেন, ততই তাঁর মনে হয়েছে যে এর আসল সূত্র কেবল বইয়ে নয়, লোকসমাজের বুকে লুকিয়ে আছে।…
-
রূপসী সেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী, লোককথা ও পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে গবেষণা করছে। তার প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল এমন কিছু কাহিনি খুঁজে বের করা যা আধুনিক সমাজে হারিয়ে যেতে বসেছে। স্থানীয় গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষদের সঙ্গে কথা বলার সময় সে শুনেছে এক রহস্যময় মঠের কথা, যেখানে অতিপ্রাকৃত ঘটনা সংঘটিত হয় বলে মানুষের মধ্যে ভীতি ও কৌতূহল দুটোই বিরাজ করে। গ্রামের প্রবীণরা বারবার তাকে সতর্ক করেছে, “মঠে যেও না, রূপসী। সেখানে যে ঘটনা ঘটে, তা কল্পনার অতীতেও নেই।” রূপসী শুরুর দিকে ভয় পেয়েও গবেষণার প্রতি তার আকর্ষণ তাকে পিছনে সরাতে পারেনি। প্রতিটি লোককথা তাকে আরও গভীরে টানছে, যেন মঠের প্রতি একটি অদৃশ্য…
-
ঋতব্রত চক্রবর্তী পর্ব ১ : স্বপ্নের শুরু রাতের নিষ্প্রভতা যেন লালচে ছাই হয়ে উঠে বসে আছে স্বপ্নের ভেতরে—একটা শ্মশান, পাঁচটি নিবিড় প্রদীপ, নিরাবেগ নদীর ধারে কাঁসার থালায় রাখা কালচে ধূলি, আর কোথাও থেকে ভেসে আসা অসম্পূর্ণ শব্দ: “হ্রীং… ক্রৌঁ… শৌঃ… ন—” তারপরই ফাঁকা, এমন এক ফাঁকা যা নিঃশব্দ নয়; অদৃশ্য কণ্ঠের ভাঙন-ধ্বনি সেখানে ঘণ্টার মতো পাক খেতে থাকে, মাটির নিচে চোরা জলের শব্দের মতো সরে যায়, আবার ফিরে আসে। সেই স্বপ্ন থেকে পাঁচজন পাঁচ জায়গায়, পাঁচটি শরীর ভিন্ন ভিন্ন ঘামে, একই আতঙ্কে জেগে উঠল—যেন কোনো অদেখা আঙুল তাদের বুকের ওপর অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে লিখে রেখে গেল একটি মাত্র বৃত্ত, যার ভিতরে…
-
সায়ন্তন ঘোষ সন্ধ্যার আলো তখন পাহাড়ের ঢালে মিশে যাচ্ছে। সিলেট শহর ছেড়ে চন্দ্রনাথের পথে এগোতে এগোতে রুদ্র অনুভব করছিল এক অদ্ভুত গা ছমছমে শূন্যতা। পাহাড়ের রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে, শুধু কোথাও কোথাও ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে—গ্রামের বাড়িগুলোতে পূর্ণিমার পূজা চলছে। ট্যাক্সির ভেতরে বসে অনন্যা জানলার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকার দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, পাহাড় যেন অদৃশ্য চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। —“এই জায়গাটার মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক আছে, তাই না?” হঠাৎ ফিসফিস করে বলল তিথি। অভিষেক হেসে উত্তর দিল, —“তুমি আবার ভূতের গল্প শুরু করছো নাকি? আমরা এসেছি বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। কালো জলের খনিজ উপাদান বের করলে হয়তো একটা…