• Bangla - তন্ত্র

    রক্ততান্ত্রিক

    অধ্যায় ১: উত্তরাধিকার দক্ষিণ কলকাতার শেষ প্রান্তে, গড়িয়ার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো বাড়িগুলোর মধ্যে একটি ছিল “নীলকুঠি”—একটা অর্ধভাঙা, গাঢ় সবুজ পাতাবরণে ঢাকা অদ্ভুত প্রাসাদসদৃশ বাড়ি। বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত, নিঃসঙ্গ সেই বাড়িটির একটিমাত্র প্রহরী ছিল সময়—যার সঙ্গে লড়তে লড়তে ভেঙে পড়েছিল ছাদের কার্নিশ, ভেঙে গিয়েছিল মেঝের সিমেন্ট, আর কড়া নড়তে নড়তে শূন্যতার ভিতরেও এক অচেনা শব্দ তৈরি হত। অনেকেই বলত, ও বাড়ি ভৌতিক। কেউ কেউ বলত, শয়তানের বাড়ি। কিন্তু অদ্বৈত মৈত্র এসব কল্পকাহিনি শুনেই বড় হয়নি। তার শৈশবের কতশত দুপুর আর সন্ধ্যে এই বাড়ির এক কোনায় তার ঠাকুরদার কোলে বসে কেটেছে—পুঁথি আর প্রাচীন কাগজের গন্ধমাখা গল্পের ভিতর। তবে বড়…

  • Bangla - তন্ত্র

    চণ্ডীমণ্ডপের ছায়া

    অরূপ কুমার সেনগুপ্ত এক উৎসব মিত্র গাড়ি থেকে নামতেই তার চোখে পড়ল গ্রামের সেই ধূসর রঙা বিকেল, যেন ছায়ায় মোড়া এক মৃত সময়। গড়ভানিপুর — নামটা যতটা রূপকথার মত, বাস্তবটা যেন ঠিক ততটাই নিঃসাড়। কলকাতা থেকে ট্রেনে এসে তিন ঘণ্টা বাস জার্নি আর এক ঘণ্টা ইজে রিকশার পর, অবশেষে তার গবেষণার গন্তব্যে সে পৌঁছল। একটি পুরনো, প্রায় ভেঙে পড়া পাকা ঘর তার থাকার জায়গা; গ্রামের পাশেই গাছপালার ছায়ায় ঢাকা এই রাজবাড়ির ভগ্নাংশ। ছাদে শালপাতার স্তর, দেওয়ালে ছোপ ছোপ শ্যাওলা, আর মাঝে মাঝে ঘুঘুর ডাক। উৎসব ইতিহাসের ছাত্র— তার থিসিস “উনবিংশ শতকের বাংলার সামন্তপ্রথা ও মন্দির সংস্কৃতি” নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেফারেন্স লাইব্রেরিতে…

  • Bangla - তন্ত্র

    চক্রপুরের চৌরাশি

    ১ শীতের শুরুতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়া সকালটা চক্রপুর রেলস্টেশনে থেমেছিল মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য। ছোট একটা প্ল্যাটফর্ম, দুই পাশে ধানখেত, মাঝখানে লালমাটির পথ—নেমেই অরিজিৎ বুঝে গিয়েছিল, এখানে সময় একটু ধীরে চলে। তার পায়ের কাছে গুটিগুটি করে হেঁটে যাওয়া কুকুরটা যেন তাকিয়ে বলছিল, “তুমি নতুন এসেছো, বুঝি?” সল্টলেক থেকে বেরিয়ে প্রায় ছ’ঘণ্টার সফর শেষে সে পৌঁছেছে এই প্রত্যন্ত গ্রামে, গবেষণার কাজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি বিভাগের অন্তর্গত একটি সাবজেক্ট — “লোকজ তন্ত্র এবং বাংলার গ্রামীণ সমাজে তার প্রভাব” — এর ওপর MPhil থিসিস করছে অরিজিৎ। বহু পড়াশোনার পর ও খোঁজ পেয়েছিল এই চক্রপুর গ্রামের, নদীর ধারে এক অচেনা নাম,…

  • Bangla - তন্ত্র

    অঘোরিণী

    অনির্বাণ বসু পর্ব ১: শ্মশানের আগুনের নিচে শ্মশানের রাতগুলো বড় নিঃশব্দ হয়, কিন্তু সেই রাতে কিছু ছিল যা নিঃশব্দ ছিল না। ছিল আগুনের গর্জন, ছিল মাটির নিচ থেকে উঠে আসা ধোঁয়ার মতো এক দীর্ঘশ্বাস। কাশীপুরের পুরনো শ্মশানঘাটে সেই রাতে আবার জ্বলে উঠেছিল চিতা, অথচ কারো মৃতদেহ ছিল না। অন্তত চোখে দেখা যায়নি। গ্রামের মানুষজন বলত—এই শ্মশানে কেউ যায় না চাঁদ না উঠলে। অথচ সেদিন ছিল অমাবস্যা, আকাশে ছিল না একফোঁটা আলো, কেবল আগুনের দীপ্তি কাঁপিয়ে দিচ্ছিল গাছের ছায়া। কুয়াশা, ধোঁয়া আর ছাই—সব মিশে এক অদ্ভুত গন্ধ তৈরি করছিল। হঠাৎ বাতাস থেমে গেল। চিতার সামনে বসে ছিল সে। সাদা ছাইয়ের মতো…

  • Bangla - তন্ত্র

    শ্মশানতলার পিশাচ

    সৌম্য আইচ অধ্যায় ১: অমাবস্যার আগমন বছর দশেক পরে তমাল আবার ফিরছে গ্রামের দিকে। শহরের ব্যস্ততা, কনক্রিটের জঞ্জাল, অসংখ্য হর্নের আওয়াজের ভিতর থেকেও তার মনটা একধরনের অস্থিরতায় কাঁপছিল কয়েকদিন ধরে। দাদুর হঠাৎ মৃত্যু সংবাদে সে যেন মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল, যদিও শেষ ক’বছর তেমন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু শৈশবের সেই বিকেলগুলো, যখন দাদুর তান্ত্রিক ঘরের ধূপগন্ধে বসে সে ঘুমিয়ে পড়ত—সে স্মৃতি আজো গাঁথা। তমাল জানত, তার দাদু শুধু ঘরের মন্ত্রতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, গ্রামের লোকেরা তাঁকে ভয় করত। কিছুটা শ্রদ্ধায়, কিছুটা আতঙ্কে। ‘বিজনানন্দ ঠাকুর’ নামে পরিচিত তার দাদু নাকি এক পিশাচকে কাবু করেছিলেন—এমন গল্প শুনেছে সে ছোটবেলায় জমিলা বুড়ির মুখে। তমাল…

  • Bangla - তন্ত্র

    তান্ত্রিক.কম

    দেবাশিস চৌধুরী ১ অভ্র সেন দুই বছর আগেও ভাবতে পারেনি তার বানানো অ্যাপ “ChalBeta” এত সহজে ব্যর্থ হয়ে যাবে। ‘মন খারাপ হলে দাদা বকা দেবে’ এই ধারণা নিয়ে বানানো অ্যাপটি প্লে স্টোর থেকে ব্যান হওয়ার পর সে বুঝেছিল—এই সমাজ মজা করতে জানে না, আর কিছু বেশি সিরিয়াস হলে তারা মামলা করে। একবারে শেষ। এখন সে তার একমাত্র সঙ্গী ল্যাপটপ নিয়ে থাকে সল্টলেকের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে, যেখানে তার রুমমেট তপন সারাদিন নিউজলিংক, ইউটিউব ভিডিও আর টিকটকের রিল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অভ্রর কাজ মূলত ফ্রিল্যান্স ডিজাইনিং—যা দিয়ে কোনোমতে ভাড়াবাড়ির খরচ ওঠে আর মাসের শেষে নিজেকে বোঝানো যায় যে “চাকরি খারাপ না, ফ্রিডম…

  • Bangla - তন্ত্র

    পঞ্চভূতের সাধনা

    রূপক চক্রবর্তী এক শহরের ভেতরে থেকেও কিছু মানুষ থাকে সময়ের বাইরে। অম্বরীশ সেন ছিল তেমনই একজন। তার সহপাঠীরা যখন উচ্চতর গবেষণার জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছিল, বা চাকরির খোঁজে দৌড়াচ্ছিল কর্পোরেট কারিডোরে, তখন অম্বরীশ দিনের পর দিন পড়ে থাকত কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের “তরুণ ভারতী গ্রন্থাগার”-এর প্রাচীন, ধূলিধুসর কক্ষে। সে যেসব বই পড়ত, তা বহু আগেই মানুষের স্মৃতির বাইরের জিনিস। হাতে লেখা পুঁথি, ঘুনধরা পাতায় সাঁটানো লাল কালি, শিরোনামে এমনসব শব্দ যা উচ্চারণ করলেই শিরদাঁড়া দিয়ে কাঁপুনি নামে—“অগ্নিতত্ত্ব বেদ”, “মৃত্যুজয় তন্ত্র”, “ভূতকারিক রচনাবলী”। এমনই এক বর্ষার সন্ধ্যায়, কড়কড়ে বিদ্যুৎ-ছিন্ন আকাশের নিচে বসে সে খুঁজে পায় তার ঠাকুরদার রেখে যাওয়া এক পাণ্ডুলিপি—চামড়ার মলাটে…

  • Bangla - তন্ত্র

    তামার পায়ের ছায়া

    অরিজিৎ দে পর্ব ১: কুসুমবাড়ির ডাইনি পাহাড়ের কিনারে ছুঁয়ে বইছে জলঢাকা নদী। নদীর পাড়ে একটা গ্রাম—ছোট্ট, চুপচাপ, নাম তার কুসুমবাড়ি। দিনের বেলা গাছেদের ছায়ায় এখানে শিশুরা খেলে, বুড়োরা বিড়ি টানে আর মহিলারা কলতলায় গান ধরে। কিন্তু রাত নামলে? রাত নামলে কুসুমবাড়ি নিঃশব্দ হয়ে যায়। যেন কেউ বা কিছু পুরো গ্রামটাকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়। এই কুসুমবাড়িতেই এসেছেন কমলিনি বসু। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি লোককাহিনি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার বিষয়—“উত্তরবঙ্গের নারী-কেন্দ্রিক অপ্রাকৃত লোককাহিনির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।” বলতে গেলে, ভূতের গল্প নিয়ে গবেষণা। কিন্তু তিনি বলেন, “আমি গল্প খুঁজি, ভূত না। গল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকা সমাজকে দেখাই আমার কাজ।” গ্রামে পৌঁছে তাকে নিয়ে যাওয়া…

  • Bangla - তন্ত্র

    লন্ডনের সপ্তম চক্র

    অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় পর্ব ১ রাত তখন প্রায় দেড়টা। থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছিল লন্ডনের জানালা বেয়ে, যেমনটা এই শহরে বরাবরই হয়ে থাকে—নীরব অথচ জেদি। এলেনা ব্যাকলে তার ডেস্কে বসে শেষ পর্যন্ত সেই ইমেলটা আবার খুলল। “Attend the séance this Friday. No cameras, no questions. Just watch. – L.S.S.” কোনো সাইনেচার নেই, শুধু নিচে ছায়ার মতো ছাপানো এক গোল রাবার স্ট্যাম্পের চিহ্ন: একটি পেন্টাগ্রামের মাঝে শিখা এবং একটি চোখ। তিনি ‘The Sentinel’–এর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার। ভূত, তান্ত্রিকতা, এবং ডার্ক আর্টসে তার তেমন বিশ্বাস নেই। কিন্তু তিন মাস আগে কেমডেনে এক নিখোঁজ রাজনীতিবিদের মৃত্যু নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে এলেনা এই ক্লাবের নাম প্রথম শুনেছিলেন—The…

  • Bangla - তন্ত্র

    তন্ত্রের নীল খঞ্জন

    সন্দীপ দে অধ্যায় ১ — নদিয়ার ছোট্ট গ্রাম চন্দ্রপুর, গঙ্গার শাখানদী ছোট ছোট খাল বেয়ে ছড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন জনপদ, যেখানে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মাটির রাস্তা, কাঁচা বাড়ি, আর প্রায় ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও সেই গ্রামকে ঘিরে রেখেছে। গাঁয়ের লোকেরা সূর্যাস্তের পর আর বাইরে বেরোয় না। কারণ, চন্দ্রপুরের ঠিক প্রান্তে শুরু হয় শ্মশানঘাট, যার একপাশে প্রাচীন বটগাছ, আর অন্যপাশে সরু খালের কালো জলে প্রতিফলিত হয় জোছনার ভাঙা আলো। সেই শ্মশানের গায়েই ছোট্ট এক কুটিরে থাকে আজিজানন্দ তান্ত্রিক, নদিয়ার বিখ্যাত তান্ত্রিক ও সাধক। কুটিরের ভেতরে ধূপের গন্ধ আর পুঁথি-পত্র, জড়িবুটি, কঙ্কাল, রুদ্রাক্ষ, শঙ্খ—সব মিলিয়ে যেন অন্য জগতের বাতাস। আজিজানন্দ…