সৌম্য কর
১
গ্রামের নাম আড়বেলিয়া, নদীর ধারে ছোট্ট অথচ প্রাণবন্ত এক বসতি। এখানকার মানুষদের জীবন সহজ, হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটিতে ভরা। এই গ্রামেই জন্মেছে আর বড় হয়েছে শশী—পুরো নাম শশীভূষণ। শশীকে যারা চেনে, তারা জানে সে মনের দিক থেকে একেবারে স্বচ্ছ কাচের মতো, কিন্তু মাথার দিক থেকে মাঝে মাঝেই গুবলেট করে ফেলে। শশীর বোকাসোকা স্বভাব গ্রামে বহুল আলোচিত; কখনো গরুকে খড়ের বদলে নিজের নতুন ধুতি খাইয়ে দিয়েছে, কখনো আবার জমির মাপ নিতে গিয়ে লাঠির বদলে খুপরি দিয়ে দাগ কেটেছে। গ্রামের বৃদ্ধেরা বলেন—“শশী ভালো ছেলে, কোনো খারাপ কাজ করে না, কিন্তু বুদ্ধিটা যেন একটু এদিক-ওদিক।” তবে একথা সবাই মানে—শশীর অন্তর সোনার মতো, সে কাউকে কষ্ট দিতে জানে না। তার এই সহজ সরল স্বভাবেই একদল মানুষ তাকে ভালোবাসে, আরেকদল মানুষ তাকে খোঁচা দিয়ে মজা নেয়। শশী ছোটবেলা থেকেই একটু ভীরু প্রকৃতির, পড়াশোনায় খুব একটা ভালো নয়, তবে গান গাইতে পারে, ঢোল বাজাতেও তার জুড়ি মেলা ভার। গ্রামের যেকোনো মেলা, যাত্রাপালা কিংবা নামকীর্তন—সবখানেই শশীকে দেখা যায় ঢোল পেটাতে পেটাতে মুখ খুলে হো হো করে গান ধরতে।
এমনই এক সাধারণ অথচ হাসিখুশি জীবনের মাঝে একদিন খবর রটে গেল—“শশীর বিয়ে ঠিক হয়েছে!” খবরটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে দেরি হলো না। দুপুরে খেয়েদেয়ে লোকজন যখন বটতলায় আড্ডা মারছে, তখনই গোপাল—শশীর শৈশবের বন্ধু—চেঁচিয়ে বলে উঠল, “এই শুনেছিস? শশী নাকি সত্যিই বিয়ে করছে!” মুহূর্তেই কথাটা গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে গেল। আড়বেলিয়ার চায়ের দোকান, হাটের মোড়, এমনকি মাঠের আল—সব জায়গাতেই তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শশীর বিয়ে। অনেকে অবাক হয়ে বলে, “আরে, শশীও আবার বিয়ে করছে নাকি? সে তো আজ অবধি মেয়েদের সঙ্গে দুটো কথা জোড়াতেই পারে না!” আবার কেউ কেউ হাসতে হাসতে বলে, “দেখিস, বিয়ের দিনেও কোনো না কোনো গুবলেট করবেই।” মহিলারা কলসি নিয়ে নদীতে জল তুলতে গিয়েও ফিসফিস করে এই খবর আলোচনা করে। শিশুদের মধ্যে তো উৎসাহ চরমে—তারা ভাবে বিয়ের বাড়ির লাড্ডু আর জিলিপি খাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। গ্রামের পঞ্চায়েতের প্রবীণরা বসে বলেন, “ভালোই হয়েছে, ছেলেটার সংসার হোক, মাথার একটু বুদ্ধিও হয়তো জুটে যাবে।” সারাটা গ্রাম এক অদ্ভুত কৌতূহলে ভরে উঠল, যেন একটা নাটকের প্রথম অঙ্ক শুরু হতে যাচ্ছে।
শশী অবশ্য এই কাণ্ডকারখানার কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে তখনও একটু নার্ভাস হয়ে নিজের মনে ভাবছিল, বিয়ে মানে আসলে কী! আড়বেলিয়ার মতো গ্রামে বিয়ে একটা উৎসব—আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনা, ঢাকঢোল পেটানো, আলপনা আঁকা উঠোন, আর অগাধ খাওয়া-দাওয়া। কিন্তু শশীর মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—“আমি কি ঠিক মতো হবু বউয়ের সামনে বসতে পারব? সবাই যদি তাকিয়ে থাকে, আমার হাত-পা কেঁপে যাবে না তো?” তার মা সুবর্ণা ছেলেকে বারবার বোঝাচ্ছিলেন, “সব ঠিকঠাক হবে বাবা, বেশি ভাবিস না।” আর তার বাবা হরিহর গম্ভীর গলায় বলতেন, “ছেলেটা যদি আবার কোনো লজ্জার কাজ করে, তবে কপালে দাগ লাগবে।” কিন্তু শশীর মন শান্ত হলো না। তার মনে হচ্ছিল বিয়ের দিন সে হয়তো এমন কিছু গুবলেট করবে যা নিয়ে গ্রাম চিরদিন হাসাহাসি করবে। অথচ অজান্তেই গ্রামে সেটাই ঘটতে চলেছিল—একটি এমন ঘটনা, যা নিয়ে আড়বেলিয়ার মানুষ বছরের পর বছর হেসে কুটিকুটি হবে। বিয়ের খবর ছড়াতেই গ্রামের কৌতূহল আরও বেড়ে চলল, আর সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল সেই দিনের জন্য, যখন গ্রামের বোকাসোকা শশী আসলেই বরের সাজে সেজে উঠবে।
২
শশীর বিয়ের খবরে যখন পুরো আড়বেলিয়া গ্রাম সরগরম, তখনই পাশের গ্রাম শালবন থেকে কনের পরিবার এসে পৌঁছল। কনের নাম কল্পনা, শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের এক মেয়ে, যাকে দেখলে মনে হয় যেন তার চোখে-মুখে চিরন্তন লাজ আর সরলতার ছায়া খেলা করছে। কল্পনা ছোট থেকেই বই পড়তে ভালোবাসত, কিন্তু খুব একটা কথা বলত না। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে আর এগোয়নি, কারণ পরিবার চেয়েছিল যত দ্রুত সম্ভব তার বিয়ে হোক। কল্পনার বাবা রমেশচন্দ্র ভদ্র ছিলেন চাষি হলেও ভদ্রলোকসুলভ আচরণে গ্রামে সম্মান পেতেন, আর মা প্রতিমা দেবী ছিলেন গৃহস্থালির যাবতীয় কাজে অভ্যস্ত, পরিশ্রমী নারী। কল্পনা শশীকে দেখেনি কখনো, শুধু শোনেছে যে ছেলেটা একটু গুবলেটপ্রবণ হলেও অন্তরে ভালো মানুষ। তাই তার মনে অল্প অল্প ভয় কাজ করছিল—কেমন হবে তার নতুন সংসার, বরের স্বভাব সে মেনে নিতে পারবে তো? তবে সে স্বভাবতই নীরব, তাই মুখে কিছুই বলত না, শুধু নিঃশব্দে নিজের কাজ করে যেত। কল্পনার জীবনে যেন একটা অব্যক্ত টান ছিল সরলতায়; মৃদু হাসি, লাজুক চোখের চাহনি আর অকারণ চুপ করে থাকার মধ্যে তাকে ভিন্নরকম আকর্ষণীয় লাগত।
অন্যদিকে, এই বাড়িতেই ছিল কল্পনার খুড়তুতো বোন বিনা—পুরো কল্পনার বিপরীত চরিত্র। বিনা ছিল চঞ্চল, দুষ্টু আর নির্ভীক স্বভাবের মেয়ে। তার হাসি এতই সংক্রামক ছিল যে পুরো ঘর মুহূর্তে হেসে উঠত। বয়সে কল্পনার থেকে দুই বছরের ছোট, কিন্তু সাহস ও চপলতায় যেন দশ বছরের বড়। গ্রামের যেকোনো অনুষ্ঠান হলে বিনাকেই দেখা যেত সবার আগে গান গাইতে বা গল্প ফাঁদতে। কল্পনার বিয়ে ঠিক হতেই বিনার মধ্যে যেন আলাদা উত্তেজনা কাজ করছিল—সে শুধু ভাবছিল, বরের পরিবার আসবে, নতুন জামাই আসবে, আর সেই মণ্ডপে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু মজার ঘটনা ঘটবে। বিনা ছিল এমন এক চরিত্র যে নিছক চুপচাপ বিয়ের অনুষ্ঠান মেনে নিত না; সে চাইত একটা গণ্ডগোল, একটু কাণ্ডকারখানা হোক, যাতে সবাই হেসে গড়াগড়ি খায়। তাই সে প্রতিজ্ঞা করল, বিয়ের দিন শশীকে সে একটু না একটু মজা করবেই। এভাবেই দু’টি বোন, একেবারে দুই মেরুর মতো স্বভাব নিয়ে, একসঙ্গে বিয়ের প্রস্তুতির মধ্যে মেতে উঠল।
বিয়ের প্রস্তুতি তখন পুরোদমে শুরু হয়েছে। শশীর পরিবার যেমন আড়বেলিয়া গ্রামে মণ্ডপ সাজাতে ব্যস্ত, তেমনি কল্পনার পরিবারও শালবনের বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন করছে। উঠোনে মাটির আলপনা আঁকা হচ্ছে, নতুন শাড়ি গুছিয়ে রাখা হচ্ছে, আর কলাপাতা ধোয়া হচ্ছে আসন্ন ভোজের জন্য। প্রতিমা দেবী কল্পনাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন গহনা আর শাড়ির প্রস্ত্ততিতে, আর বিনা এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছিল, কখনো ফুল আনছে, কখনো পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে খুনসুটি করছে। তবে সবকিছুর মাঝেই স্পষ্ট হচ্ছিল দুই বোনের পার্থক্য—কল্পনা নিঃশব্দে সব সামলাচ্ছিল, বিনা আবার একেকটা কাজের ফাঁকে দুষ্টুমি করে সবাইকে হাসাচ্ছিল। গ্রামের মানুষজন যারা অতিথি হিসেবে এসেছিল, তারাও বলছিল—“দেখ কল্পনাকে, মেয়ে কত শান্ত! আর ওই বিনাটাকে দেখ, কেমন দুষ্টু, এক মুহূর্ত স্থির হয় না।” বিয়ের দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, শশীর বোকাসোকা স্বভাবের মতো কল্পনার লাজুকতা আর বিনার দুষ্টুমি মিলেমিশে একটা অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করছিল। সবাই বুঝতে পারছিল, এই বিয়ে কেবল সাধারণ বিয়ে নয়, এর মধ্যে কিছু না কিছু মজার গল্প লুকিয়ে আছে, যা হয়তো বিয়ের দিনেই ফাঁস হয়ে যাবে।
৩
বিয়ের দিন ভোর হতেই আড়বেলিয়া গ্রাম যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠল। ঢোল, কাঁসি, শাঁখ বাজতে লাগল চারদিক জুড়ে, বাড়ির উঠোনে কলাপাতায় সাজানো ভোজের আয়োজন, আর মণ্ডপে ফুলের মালা গাঁথার ব্যস্ততা। কিন্তু এই আনন্দ-উৎসবের মধ্যে একমাত্র শশী যেন সুখে নেই। বর সাজানোর প্রস্তুতির আগেই তার কপালে ঘামের বিন্দু টলমল করছে, হাত দুটো কাঁপছে, আর বুকের ভেতর যেন ঢাক বাজছে। শশী সারারাত ঘুমোতে পারেনি, চোখ বুজলেই মনে হচ্ছিল—কোনো না কোনো ভুল করবেই সে। কনে দেখেনি এখনো, শুধু শুনেছে খুব শান্ত আর ভদ্র মেয়ে, কিন্তু সেই লাজুক মেয়ের সামনে গিয়ে যদি হোঁচট খায়, অথবা মণ্ডপে বসে যদি গরমে ঘেমে জবজবে হয়ে যায়? এমনকি নিজের জুতো পরার সময়ও সে তিনবার ভুল পায়ে ঢুকিয়ে ফেলল। শশীর মা সুবর্ণা একদিকে ছেলেকে স্নান করাচ্ছেন, অন্যদিকে বারবার বলছেন—“সব ঠিকঠাক হবে বাবা, এত ভয় পাচ্ছিস কেন?” শশী শুধু গোঁ গোঁ শব্দ করে মাথা নাড়ল, অথচ বুকের ভিতর ভয় যেন ঝড়ের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে।
ঠিক সেই সময় হাজির হলো গোপাল—শশীর শৈশবের বন্ধু আর আড়বেলিয়ার সবচেয়ে বড় দুষ্টু। মুখে খিলখিল হাসি, হাতে একটি ফুলের মালা নিয়ে ঢুকেই সে বলে উঠল, “আরে শশী, তোর কপালে আজ বড় বিপদ আছে রে!” শশী চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল, “কেন রে? কী হয়েছে?” গোপাল গম্ভীর মুখে বলল, “শুনেছি কনে নাকি প্রথমেই বরের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে সে সাহসী কিনা। যদি তুই চোখ নামিয়ে ফেলিস, তবে কিন্তু মেয়ে তোর সঙ্গে সংসার করতে চাইবে না!” এই শুনে শশীর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সে তো এমনিতেই মেয়েদের দিকে তাকাতে পারে না, সবসময় মাথা নিচু করে কথা বলে। এবার যদি সত্যিই চোখের দিকে তাকাতে হয়! গোপাল তখন আরও মজা বাড়াল, বলল, “আরেকটা কথা শুনেছি—যদি বর ফুলের মালা ঠিক মতো না পরাতে পারে, তবে নাকি সংসার টেকেই না।” শশী হা করে তাকিয়ে বলল, “তাহলে তো আমি সর্বনাশ হয়ে গেলাম!” গোপাল হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল, আর শশীর বুকের ভেতর ধুকপুক ধ্বনি যেন আরও দ্রুত হতে লাগল। এদিকে আশেপাশের লোকজন গোপালের এই খোঁচায় হাসাহাসি করছিল, কেউ কেউ আবার শশীর কাঁধে চাপড় মেরে বলছিল, “বাবা, ভয় কিসের? বিয়ে সবার হয়।” কিন্তু শশীর মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব বিপদ যেন তার মাথার ওপর ভেঙে পড়তে চলেছে।
বিয়ের পোশাক পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই শশী আবার নতুন সমস্যায় পড়ল। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, কপালে টকটকে লাল টিপ আর মাথায় টোপর—সবকিছুতেই নিজেকে ভিনগ্রহের মানুষ মনে হচ্ছিল তার। “আমি তো একেবারেই বরের মতো লাগছি না,” বিড়বিড় করে বলল শশী। তার বাবার গম্ভীর মুখ, মায়ের অস্থির দৃষ্টি আর গোপালের খুনসুটি—সব মিলিয়ে শশীর ঘাম যেন থামতেই চাইছিল না। সে ভাবছিল, “যদি আমি মণ্ডপে গিয়ে কনের নাম ভুলে যাই? যদি সিঁদুর দেওয়ার সময় হাত কেঁপে পড়ে যায়? যদি লোকজন হাসাহাসি করে?” এইসব দুশ্চিন্তায় শশীর অবস্থা একেবারে নাজেহাল। তার বুকের ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল—“যদি কোনো ভুল করি?” অথচ সেই ভুল যে আসলেই ঘটতে চলেছে, আর তা পুরো বিয়েবাড়িকে হাসির ঝড় তুলবে, সেটা তখনও তার কল্পনার বাইরে ছিল। গ্রামের মানুষ তখন উল্লাসে বুঁদ হয়ে শশীর বিয়ের প্রস্তুতিতে মেতেছে, কিন্তু শশীর চোখেমুখে কেবল ভয় আর শঙ্কার ছাপ, যেন সে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে চলেছে।
৪
বিকেলের মিষ্টি আলোয় আড়বেলিয়া গ্রাম যেন উৎসবে ভেসে গেল, কারণ আজ শশীর বরযাত্রা বেরোবে। দুপুর গড়াতেই বাড়ির উঠোনে অতিথিদের ভিড় জমে গেল—কে পরেছে রঙিন ধুতি, কার মাথায় ঝকঝকে পাগড়ি, কেউ আবার নেচে নেচে ঢোল-করতালের তালে মাতিয়ে তুলছে চারপাশ। বরযাত্রার সাজানো গাড়ি, তার চারপাশে ঝলমলে আলো আর ফুলের মালা ঝোলানো দেখে গ্রামের ছেলেপুলেরা বিস্ময়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। একদিকে রান্নাঘরে কড়াইতে ভাজা হচ্ছে কচুরি, জিলিপি, লুচি, অন্যদিকে বড় ডেগে ফুটছে খাসির মাংসের ঝোল। খাবারের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তেই বরযাত্রীরা আরও উল্লসিত হয়ে উঠল। শশীকে টোপর পরিয়ে গাড়িতে বসানো হলো, তার পাশে বন্ধুরা, আশেপাশে আত্মীয়স্বজন। ঢাকের শব্দে, শাঁখের ধ্বনিতে আর তুবড়ি পুড়িয়ে আকাশ আলোকিত করার মধ্য দিয়ে বেরোল সেই কাঙ্ক্ষিত বরযাত্রা। গ্রামের ছোটরা হাততালি দিয়ে বলল, “শশী দাদার বিয়ে! শশী দাদার বিয়ে!” উচ্ছ্বাসে মেতে উঠল সবাই।
কিন্তু এই আনন্দের ভিড়ের মাঝখানে শশী যেন একেবারেই অন্য রকম। গাড়ির মধ্যে চুপচাপ বসে আছে সে, হাত-পা শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে, চোখেমুখে অস্বস্তি স্পষ্ট। পাশের লোকজন কেউ গেয়ে উঠছে, কেউ নাচছে, আবার কেউ চিৎকার করে বলছে, “আরে বর, হাততালি দে না!” কিন্তু শশী শুধু একবার অপ্রস্তুত হেসে আবার মাথা নিচু করে ফেলল। গোপাল অবশ্য একেবারে ছাড়বার পাত্র নয়। সে একটু ঝুঁকে শশীর কানে ফিসফিস করে বলল, “দ্যাখ দ্যাখ, গ্রামের মেয়ে-ছেলেরা তোকে দেখছে, যদি এখনই হাসি না, তবে ভাববে তুই বউকে পছন্দ করিস না।” শশীর মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। অন্য বন্ধুরা হেসে গড়িয়ে পড়ল, তারা একে অপরকে খোঁচা দিয়ে বলল, “বর তো একেবারে ভূত দেখে এসেছে!” কেউ আবার শশীর হাত ধরে নাচাতে চাইলে সে কুঁকড়ে গেল। এদিকে বরযাত্রার লোকজন খোশগল্পে মত্ত, কেউ গানের সুর ধরেছে, কেউ আবার তাল মিলিয়ে তালি দিচ্ছে, ঢোলের বাজনা বাড়িয়ে তুলছে উন্মাদনা। কিন্তু শশী সবকিছুর মাঝেই নিজেকে একেবারে গুটিয়ে রেখেছে, যেন উৎসবের এই আনন্দ তার কাছে বিশাল চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শশীর মা সুবর্ণা, যিনি পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির এক কোণে ছেলেকে একনাগাড়ে দেখছিলেন, মাঝে মাঝেই উঠে এসে তার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। “ভয় পাবি না বাবা, সব ঠিকঠাক হবে,” তিনি বারবার বলছিলেন, চোখেমুখে মমতার ছাপ। তবে তার নিজেরও ভেতরে ভেতরে উৎকণ্ঠা কাজ করছিল, কারণ ছেলের চেহারা দেখে বোঝাই যাচ্ছিল সে ভয়ে অস্থির। হরিহর, শশীর বাবা, এদিকে গম্ভীর মুখে সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেন নিজেই পুরো যাত্রার দায়িত্ব নিয়েছেন। গ্রামের অন্য মহিলারা সুবর্ণাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বলছিল, “আহা, ছেলে তোকে ছেড়ে অন্য ঘরে যাবে, মন খারাপ লাগছে নিশ্চয়ই?” সুবর্ণা হালকা হেসে মাথা নাড়লেন, কিন্তু চোখে জল চিকচিক করে উঠল। গাড়ি এগোতে লাগল ধীরে ধীরে, ঢোল আর নাচের তালে গ্রাম থেকে গ্রামান্তর, রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল। আনন্দের এই মিছিলের মাঝে কেবল শশী একাকী, বুকের ভেতর দুশ্চিন্তার পাহাড় বয়ে চলেছে। অথচ সবাই জানত না—এই দুশ্চিন্তাই তাকে এমন এক ভুল করতে বাধ্য করবে, যা পরে পুরো বরযাত্রার চেয়েও বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।
৫
বরযাত্রার ঢোল-শাঁখ বাজতে বাজতে যখন শশীর গাড়ি শালবনের কল্পনাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল, তখন গ্রাম যেন আরও এক দফা উল্লাসে ফেটে পড়ল। বাড়ির আঙিনা আলপনায় সাজানো, বাঁশের খুঁটির ওপর ফুলের মালা ঝোলানো, আর মাটিতে ছড়ানো সুগন্ধি গন্ধরাজ ফুলের পাপড়ি—সব মিলিয়ে পরিবেশটা স্বপ্নের মতো। কনের পরিবার উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে প্রদীপ, ধূপকাঠি আর শঙ্খ। প্রতিমা দেবী নিজে এগিয়ে এসে বরযাত্রাকে বরণ করলেন, আর গ্রামের মহিলারা উঁচু গলায় উলুধ্বনি দিলেন। শশী গাড়ি থেকে নামতেই মুখে টোপর আর হাতে ফুলের মালার ভারে একেবারে অচল হয়ে গেল। সে কেবল মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল, মনে হচ্ছিল পায়ের নিচের মাটি যেন কেঁপে উঠছে। চারদিকে এত আলো, এত মানুষের চোখ, এত শব্দ—শশীর মাথা একেবারে ঝিমঝিম করছিল। সে চেষ্টা করছিল কারও মুখের দিকে না তাকাতে, কিন্তু তার চোখ মাঝে মাঝেই ভয়ে একবার এদিকে, একবার ওদিকে ঘুরে যাচ্ছিল। কোথায় মণ্ডপ, কোথায় কনে, আর কোথায় তার বসবার জায়গা—সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
ঠিক তখনই মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বিনা। চকচকে রঙিন শাড়ি পরা, চুলে ফুল গুঁজে, মুখে দুষ্টু হাসি—সে যেন ইচ্ছে করেই বরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। শশীর ভীত চোখ প্রথমেই গিয়ে পড়ল বিনার ওপর। বিনা কপট গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, অথচ চোখে-মুখে খেলা করছিল মজা। আশেপাশের কেউ খেয়ালও করল না, কিন্তু শশী ভেবে বসল—“হায় হায়, এ-ই কি তবে আমার কনে? কেমন গম্ভীর দাঁড়িয়ে আছে!” তার বুকের ভেতর কাঁপুনি আরও বেড়ে গেল। সে ঠিক করল কোনোভাবেই যেন ভুল না করে, তাই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল বিনার দিকে। গোপাল তখন পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলছিল, “চোখ নামাবি না শশী, কনের চোখের দিকে তাকালেই সব পাকা হবে।” শশীর তো তখন আর মাথা কাজ করছে না, সে শুধু গোপালের উপদেশ মনে রেখে বিনার দিকেই তাকিয়ে থাকল। বিনা বিষয়টা বুঝতে পেরে আরও দুষ্টুমি শুরু করল—মাঝে মাঝে চোখ বড় করে তাকাচ্ছে, আবার হালকা হাসছে, যেন শশীকে বিভ্রান্ত করছে।
এই অদ্ভুত অবস্থার মাঝেই শশীর ভুল শুরু হয়ে গেল। আসল কনে কল্পনা তখন ঘোমটা টেনে, লাজুক ভঙ্গিতে, পরিবারের লোকেদের মাঝে দাঁড়িয়ে মণ্ডপের ভেতরে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু শশীর দৃষ্টি একেবারে আটকে গেছে বিনার ওপর। যখন তাকে মণ্ডপে বসানো হলো, তখনও তার চোখ খুঁজছিল সেই মেয়েকে, যাকে সে কনে ভেবে বসেছে। বিনা পাশ কাটিয়ে আসন বদল করে সামনে গিয়ে দাঁড়াল, আর শশী নিশ্চিন্ত হলো—“হ্যাঁ, এ-ই তো আমার বউ।” আসল কনে কল্পনা একপাশে বসে লাজুকভাবে অপেক্ষা করছিল, অথচ কেউ বুঝতেই পারল না যে শশীর চোখ ভুল দিকে বাঁধা। গ্রামের লোকেরা মজা করে বলছিল, “দ্যাখো দ্যাখো, বর কীভাবে তাকিয়ে আছে!” সুবর্ণা মা বারবার ছেলের কপালে হাত দিয়ে আশীর্বাদ করছিলেন, আর মনে মনে ভেবেছিলেন—ছেলে হয়তো অবশেষে কনেকে দেখে খুশি হয়েছে। অথচ তাদের অজান্তেই সেই মুহূর্তে বিয়ের আসরে তৈরি হচ্ছিল এক ভয়ানক ভুল, যা মুহূর্তেই আনন্দমুখর পরিবেশকে হাসি-ঠাট্টার ঝড়ে ভাসিয়ে দেবে।
৬
মণ্ডপের ভেতরে ঢাক-শাঁখ বাজতে লাগল, পুরুত মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন, আর চারদিকে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। ফুলের গন্ধ, প্রদীপের আলো আর মানুষের কোলাহল মিলেমিশে যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝেই ঘটতে চলল এক অভাবনীয় ঘটনা। শশী, যিনি তখনও ঘেমে-নেয়ে একাকার, নার্ভাস ভঙ্গিতে চোখ কেবল ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই বিনা তার কাছে এসে এমনভাবে দাঁড়াল, যেন সবার চোখ এড়িয়ে শশীকে বিভ্রান্ত করতে চায়। শশীর তো তখন মাথা পুরোই ঘোল হয়ে গেছে। গোপালের উপদেশ মনে করে সে কেবল ভাবছিল—“যাকে সামনে পাব, তাকেই শক্ত করে ধরে বসতে হবে, তাহলেই ভুল হবে না।” কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বিনা দুষ্টু হাসি দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল, আর শশী কোনো দ্বিতীয় চিন্তা না করেই সেই হাত শক্ত করে ধরে মণ্ডপে বসে পড়ল। আসল কনে কল্পনা তখন ঘোমটার আড়ালে একপাশে অপেক্ষা করছিল, আর শশীর এই ভুল কারও চোখেই ধরা পড়ল না। চারদিকে ঢোলের শব্দ, উলুধ্বনি আর আলো-ঝলকানিতে সবাই ব্যস্ত, কারও নজরই পড়ল না যে বর যে হাত ধরে বসেছে, সেটি আসল কনের নয়।
বিনা, যে ছোটবেলা থেকেই দুষ্টুমিতে নামকরা, এবার সত্যি মজা করার সুযোগ পেয়ে গেল। সে কিছুই বলল না, মুখের কোণে চাপা হাসি ফুটিয়ে বসে রইল শশীর পাশে। শশীর অবস্থা তখন বড্ড গম্ভীর—মনে হচ্ছিল সে যেন এক মহাসংকটে জড়িয়ে গেছে, আর এই ভুল করলে পৃথিবী ভেঙে পড়বে। অথচ বিনা তার হাত শক্ত করে ধরে রাখায় শশী আরও নিশ্চিত হয়ে গেল—“হ্যাঁ, এ-ই আমার কনে।” চারপাশের লোকেরা যখন আশীর্বাদ করতে এগিয়ে আসছিল, তখন বিনা কেবল চোখ টিপে তাকাচ্ছিল, আর শশী ভয়ে তাকাতেও সাহস পাচ্ছিল না। পুরুত মন্ত্র পড়তে পড়তে বললেন, “বর-কনে এখন একে অপরের পাশে বসেছে, রীতিনীতি শুরু করা হোক।” এই শুনে সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। শশীর মা সুবর্ণা দূর থেকে হাতজোড় করে চোখ ভিজিয়ে বললেন, “আমার ছেলেটা অবশেষে সংসারে ঢুকল।” অথচ তিনি বুঝতেই পারেননি যে যাকে তিনি বউ হিসেবে দেখছেন, সে আসলে কনের খুড়তুতো বোন বিনা।
এভাবেই রীতিনীতি চলতে থাকল। কেউ মালা হাতে এনে দিল, কেউ আবার ধূপ-প্রদীপ ঘুরিয়ে দিল, আর মণ্ডপের চারদিকে হৈচৈ বাড়তে লাগল। শশী একদম কাঠের পুতুলের মতো বসে ছিল, কেবল বারবার ঘাম মুছছিল আর ঠোঁট কামড়াচ্ছিল। বিনা চুপচাপ সব মেনে নিচ্ছিল, মাঝে মাঝে তার চোখ-মুখের দুষ্টু ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে সে পুরো ঘটনাটা এক বিশাল মজার খেলায় পরিণত করেছে। গ্রামের কয়েকজন যুবক হাসাহাসি করে বলছিল, “দ্যাখো দ্যাখো, বর তো একদম চুপ হয়ে গেছে!” কেউ আবার ফিসফিস করে বলছিল, “বউয়ের লাজের সঙ্গে বরও বুঝি লাজুক হয়ে গেছে।” কিন্তু আসল সত্যিটা যে সম্পূর্ণ অন্য কিছু, তা কেউ তখন টেরই পায়নি। মণ্ডপে ধুপের ধোঁয়া আর আলো-আঁধারির মধ্যে ভুলের বীজটা একেবারে অদৃশ্যভাবে বোনা হয়ে গেল, যা পরক্ষণেই পুরো বিয়ের আসরকে হাসির সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবে।
৭
মণ্ডপে তখন একেবারে উৎসবের আবহ, শাঁখের আওয়াজে আর ঢাকের বাজনায় চারদিক গমগম করছে। অতিথিরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে, কে কেমন শাড়ি পরেছে, কে কী গহনা পরে এসেছে, এসব নিয়ে গল্প চলছে। পুরুত মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন গম্ভীর ভঙ্গিতে, আর শশী কাঠের পুতুলের মতো বসে আছে বিনার পাশে। প্রথমদিকে গোপালও বন্ধুদের সঙ্গে হেসে-খেলে মজা করছিল, মাঝে মাঝে শশীকে খোঁচা দিচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল কনের ওপর। একবার তাকিয়ে সে যেন থমকে গেল—মনে হচ্ছিল কিছু যেন ঠিক মিলছে না। গোপাল কল্পনাকে আগেও দু’একবার দেখেছে, বিশেষ করে বিয়ের আগে কনের পরিবার যখন গ্রামে এসে দেখা করতে এসেছিল, তখন লাজুক ভঙ্গিতে কল্পনা মুখ নিচু করে কথা বলেছিল। আজকের এই “কনে”র চোখে-মুখে সেই লাজুকতার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি, চোখে ঝিলিক, যেন কাউকে নিয়ে খেলছে। গোপাল চুপচাপ শশীর দিকে তাকাল—সে বিনার হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে, আর কপাল দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। গোপালের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে মনে মনে বলল, “না রে, এ মেয়ে কল্পনা হতে পারে না!”
গোপাল ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। এক কোণে সত্যিকারের কনে কল্পনা, ঘোমটা টেনে, লাজুক ভঙ্গিতে বসে আছে পরিবারের মহিলাদের আড়ালে। এ দৃশ্য দেখে গোপালের সন্দেহ পাকা হয়ে গেল। সে এবার ধীরে ধীরে পাশে বসা দুই-তিনজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে ফিসফিস করে বলল, “ওই মণ্ডপে যে বসে আছে, সে আসল কনে নয়!” লোকগুলো প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিল—“আরে গোপাল, তুই আবার শুরু করলি দুষ্টুমি?” কিন্তু গোপালের চোখ-মুখ দেখে বোঝা গেল, সে সত্যিই সিরিয়াস। একে একে কানে কানে খবরটা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কেউ সন্দিহান হয়ে বলল, “হ্যাঁরে, ঠিকই তো, এ মেয়েটা তো একটু বেশি ফুর্তিবাজ লাগছে।” আরেকজন বলল, “আমাদের কল্পনা তো এত সাহসী নয়, সে তো একেবারেই চুপচাপ।” এই ফিসফাস কথা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে মণ্ডপের ভেতর অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করল। চারদিকে উল্লাসের মাঝেই এক ধরনের গোপন কানাঘুষো শুরু হয়ে গেল।
অবশেষে পুরুতজিও বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন। তিনি মন্ত্র পড়তে পড়তে কনের দিকে তাকালেন, তারপর আবার একবার তাকালেন, মুখে গাম্ভীর্য ধরে রাখলেও চোখে স্পষ্ট কৌতূহল। মণ্ডপে বসা মেয়েটির ঠোঁটের কোণে হাসি খেলা করছে, আর পুরুত বুঝতেই পারছেন, এ হাসি কোনো লাজুক কনের হতে পারে না। তিনি একবার বুক ঝাড়া দিয়ে বললেন, “জামাইবাবু, কনের নাম কল্পনা তো?” শশী ভয়ে ঘেমে গড়িয়ে পড়ছে, কিছু বলতেই পারল না। বিনা দুষ্টু হাসি চেপে বসে রইল, মুখে কিছু বলল না, কিন্তু চোখ-মুখে খেলা করছিল আনন্দ। অতিথিদের মধ্যে কয়েকজন তখন সরাসরি ফিসফিস শুরু করে দিয়েছে—“এ বিয়ে কি তবে ভুল কনে দিয়ে হচ্ছে?” সুবর্ণা মা দূর থেকে ছেলের মুখ দেখে আঁতকে উঠলেন, কারণ তিনিও যেন কিছু একটা অস্বাভাবিক টের পাচ্ছেন। গোপাল এবার সামনে এগিয়ে এল, শশীর কাঁধে হাত রেখে গম্ভীরভাবে বলল, “শশী, তুই যাকে বউ ভেবেছিস, সে কিন্তু বউ নয়।” চারদিকে তখন গুঞ্জন চরমে পৌঁছে গেছে, আর মুহূর্তের মধ্যেই পুরো আসর অস্বস্তির ঘূর্ণিতে আটকে গেল। শশীর মাথা তখন একেবারে ঝিমঝিম করছে—সে বুঝতেই পারছে না, তার জীবনের সবচেয়ে বড় দিনে যে ভুলটা ঘটল, সেটা থেকে কীভাবে উদ্ধার পাওয়া যাবে।
৮
মণ্ডপে চারদিক তখন অদ্ভুত চাপে আচ্ছন্ন। অতিথিরা একে অপরের কানে কানে কিছু বলছে, পুরুত বারবার গলা খাঁকারি দিচ্ছেন, আর শশী ঘেমে কাঁপতে কাঁপতে বিনার হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে। যেন কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটছে, কিন্তু সেটি কেউ সরাসরি মুখ ফুটে বলতে পারছে না। গোপাল কেবল চোখে ইশারা করে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, “ভুল হয়ে গেছে!” এর মধ্যেই হঠাৎ বিনার ভেতরে আর দুষ্টুমিটা ধরে রাখা গেল না। এতক্ষণ যেটুকু গম্ভীর হয়ে অভিনয় করছিল, হঠাৎ করেই সে হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসি এত জোরে আর মুক্ত ছিল যে মণ্ডপের প্রতিটি মানুষ মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। কারও শঙ্খ বাজানো থেমে গেল, কারও ঢাক বাজানো মাঝপথে আটকে গেল। সবাই চোখ বড় বড় করে তাকাল কনের আসনে বসা মেয়েটির দিকে। কল্পনা যেমন চুপচাপ লাজুক ভঙ্গিতে বসে আছে, আর বিনা তেমন হেসে কুটিকুটি খাচ্ছে—তফাৎটা আর লুকোনো সম্ভব হলো না।
বিনা একেবারে হাত গুটিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “আহা রে! দ্যাখো দেখি, বরবাবাজি আমাকে কনে ভেবে বসে পড়েছে!” এই কথাটা বের হতেই যেন আগুনে ঘি পড়ল। মণ্ডপজুড়ে হৈচৈ শুরু হয়ে গেল, সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল। কেউ হাত চাপড়ে বলল, “এই শশীও না, কী বোকা রে বাবা!” আবার কেউ বলল, “ওরে! কনের বদলে খুড়তুতো বোনকে বউ করে বসেছে!” হাসির ফোয়ারায় মণ্ডপ গমগম করতে লাগল। পুরুত মন্ত্র পড়া বন্ধ করে মাথা নাড়লেন, আর বললেন, “এ কী সর্বনাশ! আগে ঠিকঠাক কনে-বর বসাও, নইলে মন্ত্রের ফল হবে না।” গ্রামের বুড়োরা গম্ভীর মুখ করে একে অপরের দিকে তাকালেন, আবার যুবকেরা হাসি আটকাতে না পেরে হেসে কুটিকুটি হতে লাগল। শশীর মা সুবর্ণা হাত মাথায় দিয়ে বললেন, “হায় ভগবান! এই ছেলের বুদ্ধি কই গেল?” পুরো আসরে তখন কেবল একটাই শব্দ—অট্টহাসি।
কিন্তু এই হাসির মাঝেই কল্পনার অবস্থা সম্পূর্ণ অন্যরকম। এতক্ষণ লাজুক ভঙ্গিতে বসে থাকলেও হঠাৎ এই ঘটনার পর তার মুখ লাল হয়ে উঠল। রাগে, লজ্জায় আর অপমানে কল্পনার বুক কাঁপছিল। সে মনে মনে ভাবছিল—“এ কেমন বর! আমার জায়গায় অন্যকে কনে ভেবে বসে পড়ে!” তার চোখ ভিজে উঠল, আর ঠোঁট চেপে বসে রইল। শশী একেবারে মাথা নিচু করে বসেছিল, যেন মাটির ভেতর ঢুকে যায়। তার শরীর ঘেমে একাকার, মনে হচ্ছিল চারদিক অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। সবার হাসি-কথা কানে ঢুকছে, কিন্তু কোনো উত্তর দেওয়ার মতো সাহস নেই তার। বিনা আবারও খিলখিল করে হেসে বলল, “শশীদা, বউ চাইছিলে তো? আমায় পেলেই হতো!” এ কথা শুনে আবারও হাসির ঝড় উঠল, কিন্তু সেই হাসির মাঝেই শশীর বুকের ভেতর এক ধরনের তীব্র সংকোচ জমে উঠছিল। কল্পনা তাকে কেমন দৃষ্টিতে দেখছে, তা বুঝতে পেরেই তার বুক কেঁপে উঠল। সেই মুহূর্তে শশী বুঝল—তার বোকাসোকা ভুল আজ তাকে সবার সামনে একেবারে হাসির পাত্র বানিয়ে দিয়েছে।
৯
মণ্ডপে বিনার ফাঁসের পর যে হাসির ঢেউ উঠেছিল, তা মুহূর্তের মধ্যে যেন সুনামির মতো ছড়িয়ে গেল গোটা বিয়েবাড়ি জুড়ে। ঢাকিদের হাত থেকে ঢাক পড়ে যাচ্ছিল, শাঁখওয়ালারা ফুঁ দিতে গিয়েও হেসে ফেলছিল। মেয়েরা উলুধ্বনি করার বদলে খিলখিল করে হেসে উঠছিল, আবার কেউ চোখ মুছে বলছিল, “এমন বিয়ে তো আর কোনোদিন দেখিনি।” ছেলেরা তো আরও বেপরোয়া, কেউ শশীর কাঁধে চাপড়ে দিচ্ছে, কেউ বলছে, “এই শশী, কল্পনা নয়, বিনাকে বউ করে ফেললি!” বাচ্চারা হেসে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, আর কাকিমারা নিজেদের শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ চাপছিলেন, তবুও সেই হাসি চেপে রাখা যাচ্ছিল না। এ যেন বিয়েবাড়ি নয়, যেন নাটকের আসর—যেখানে হঠাৎই কাহিনির মোড় ঘুরে সবাইকে হেসে কুটিকুটি করে দিল। শশী মাথা নিচু করে বসেছিল, তবুও তার কানে একটার পর একটা কটাক্ষ, ঠাট্টা আর হাসির শব্দ ঢুকেই যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সে যেন সারা গ্রামকে আজ এক হাতে হাসির খোরাক দিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এ হাসির ভিড়ে প্রথমে একজনের মুখে আনন্দ আসেনি—কনের বাবা হরিহর। তিনি প্রথমে রাগে গমগম করতে লাগলেন। মণ্ডপের মাঝে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে বললেন, “এ কী কাণ্ড! বিয়ের মতো পবিত্র আসরেও এমন ধোঁকাবাজি চলবে? আমার মেয়েকে নিয়ে কেউ এভাবে খেলবে?” তার গলা শুনে মুহূর্তের জন্য হুল্লোড় থেমে গেল। সবাই চুপচাপ হরিহরের দিকে তাকাল। কিন্তু ঠিক তখনই বিনা আবার হেসে বলল, “মামা, আমি তো শুধু একটু দুষ্টুমি করেছি! শশীদা তো এমনিই ভুল করে আমার হাত ধরে ফেলল।” এই কথায় চারপাশে আবার অট্টহাসি উঠল। হরিহর চেষ্টা করলেন গম্ভীর থাকতে, কিন্তু নিজেরও ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল। চারদিকে যখন সবাই হেসে কুটিকুটি খাচ্ছে, তখন তিনি আর পারলেন না, গম্ভীর মুখ ভেঙে তিনিও হো হো করে হেসে ফেললেন। সেই হাসির মধ্যে যেন জমে থাকা সমস্ত রাগ গলে গেল, আর হাসির আসরে নতুন মাত্রা যোগ হলো। অতিথিরা একে অপরকে বলে উঠল, “এই দৃশ্য তো ইতিহাসে লেখা যাবে! বিয়ের দিন বাবাই হাসিতে ভেঙে পড়লেন!”
শশীর মা সুবর্ণা কিন্তু অন্য জগতে। তিনি মাথায় হাত দিয়ে কপালে চাপড়াতে লাগলেন বারবার। মুখে বলতে লাগলেন, “হায় ভগবান! আমার ছেলের এই কী কাণ্ড! কপালে কি তবে এ-ই লেখা ছিল?” চোখে জল চলে এসেছিল, তবে সেটা অর্ধেকই ছিল লজ্জার, অর্ধেক আবার হাসির চাপে। গ্রামের মায়েরা তাকে সান্ত্বনা দিতে এলে, সেও বলছিলেন, “কী করে যে এ ছেলে সব গুবলেট করে ফেলে, আমার কিছুই মাথায় ঢোকে না।” কিন্তু চারপাশের কান্নাভেজা সান্ত্বনা মুহূর্তেই আবার হেসে উড়ে যাচ্ছিল। আসর জুড়ে হাসি-ঠাট্টার এমন হুল্লোড় চলল যে বিয়ের নিয়ম-নীতি পর্যন্ত কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। পুরুত নিজের মন্ত্রের বই গুটিয়ে নিয়ে মৃদু হাসি লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন বলছেন, “এই বিয়ের কাহিনি তো যুগ যুগ ধরে লোকে মনে রাখবে।” আর শশী তখনও মাথা নিচু করে বসে, ভেতরে ভেতরে ভাবছিল—“মাটি ফুঁড়ে যদি এখনই ঢুকে যাওয়া যেত!” কিন্তু যেভাবেই হোক, সে বুঝে গিয়েছিল যে তার এই ভুল চিরকাল গ্রামে গল্প হয়ে ফিরবে।
১০
হাসির হুল্লোড়, ঠাট্টা-তামাশা আর দুষ্টুমির মাঝে যখন মণ্ডপ একেবারে মেলার মতো হয়ে উঠেছে, তখন অবশেষে গ্রামের প্রবীণরা এবং দুই পরিবারের জ্যেষ্ঠরা এগিয়ে এলেন। তারা বললেন, “যা হওয়ার হয়েছে, কিন্তু এখন আসল কনেকে জায়গায় বসিয়ে নিয়মমতো বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে।” সবাই একসঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। বিনা তখনও হাসি আটকাতে পারছিল না, তবে এবার শশীর হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কল্পনা তখনও লজ্জা, রাগ আর অভিমান নিয়ে বসেছিল। গ্রামের বয়স্কা মায়েরা তার কাছে গিয়ে স্নেহভরা গলায় বললেন, “এইসব কাণ্ডকে সিরিয়াস করে নিস না মা, বিয়েবাড়িতে এমন হুল্লোড় হবেই। শশীও তো মানুষ, ভুল হতেই পারে।” তাদের কথায় কল্পনার মন একটু গলল। শশী মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে বসল। এবার পুরুত আবার মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করলেন, আর মণ্ডপে যেন নতুন করে পবিত্রতা নেমে এল। ঢাক আবার বাজল, শঙ্খ আবার ফুঁকলো, আর উলুধ্বনির সঙ্গে গ্রামবাসীরা উল্লাসে ভরে উঠল—অবশেষে শশী আর কল্পনার আসল বিয়ে সম্পন্ন হলো।
বিয়ের প্রতিটি রীতি এবার যত্ন করে সম্পন্ন হলো। মালা বদল হলো, আগুনের সামনে সাত পাক ঘোরা হলো, আর আশীর্বাদের বর্ষণে যেন পরিবেশ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শশী এবার আর কোনো ভুল করার সাহস পেল না—প্রতিটি কাজে একেবারে মনোযোগ দিয়ে অংশ নিল। কল্পনার মুখেও ধীরে ধীরে একরাশ হাসি ফুটল, যদিও মাঝেমধ্যে তার চোখে এখনো বিনার দুষ্টুমির ছাপ মনে করিয়ে দিচ্ছিল, কী কাণ্ড ঘটে গিয়েছিল একটু আগেই। হরিহর এবার সন্তুষ্ট মনে অতিথিদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা তদারক করছিলেন, আর সুবর্ণা মা বারবার চোখ ভিজিয়ে আশীর্বাদ করছিলেন ছেলেমেয়েকে। এরই মধ্যে বিনা আবার সামনে এসে খিলখিল করে বলে উঠল, “তবে শুনে রাখো, আমি কিন্তু প্রথমে শশীদার পাশে বসেছিলাম। তাই বলতে পারো, আমি-ই শশীর প্রথম বউ হয়ে গেছি!” তার এই কথায় আবারও চারপাশে হাসির রোল উঠল। কল্পনা রাগ ভান করে চোখ পাকাল, শশী লজ্জায় কপাল চুলকাল, আর অতিথিরা হাততালি দিয়ে একেবারে মাতিয়ে দিল। এই হাসি-ঠাট্টার ভিড়েই বিয়ের পরিবেশ যেন আরও মধুর হয়ে উঠল।
রাত গভীর হলো, অতিথিরা ভরা পেট আর ভরা মনে বাড়ি ফিরতে লাগলেন। সবাই মুখে একই কথা—“এ বিয়ে কোনোদিন ভোলার নয়!” গ্রামের যুবকেরা বলছিল, “যা কাণ্ড হলো, এটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গল্প হয়ে থাকবে।” বয়স্করা হাসি চেপে বলছিলেন, “এমন আনন্দমুখর বিয়ে অনেকদিন পর দেখলাম।” কল্পনা আর শশী আশীর্বাদের বন্যায় ভেসে গেল, আর বিনা তার সেই দুষ্টু ভঙ্গিতে আবারও বলল, “শশীদার বিয়ের গল্পে আমার নামটা চিরকাল জড়িয়ে রইল!” সবাই জানত, সত্যিই তাই হবে। কারণ শশীর এই ভুল, বিনার দুষ্টুমি আর সবার মিলিত হাসি এমন এক স্মৃতি গড়ে তুলল, যা সারাজীবন মনে রাখার মতো। গল্পের শেষটা হলো হাসি-ঠাট্টায় ভরা, অথচ স্নেহ, ভালোবাসা আর মিলনে মধুরতায় ভরা এক সমাপ্তি—যেখানে হাসিই হলো সম্পর্কের বাঁধনকে আরও দৃঢ় করার সবচেয়ে সুন্দর সেতু।
___


