Posted in

শেয়ার বাজারের দালাল

Spread the love

অর্ণব দাশগুপ্ত


পর্ব ১: লাল সূচকের সকাল

শেয়ার বাজারের দালালদের জীবনকে বাইরের লোকেরা চকচকে ভেবে নেয়। যেন প্রতিদিনই টাকার বৃষ্টি হয়, প্রতিটি ডাকে লেনদেনের ঝলমলে খেলা। কিন্তু ভেতরে যারা থাকে, তারা জানে আসলে কেমন চাপ, কেমন দমবন্ধ করা দৌড়, আর কেমন গোপন ভয়ের সঙ্গে প্রতিদিনের হিসাব মেলাতে হয়। সৌমিক চৌধুরী সেই ভেতরের মানুষ। সবার কাছে সে “সৌমিক দা”—কলকাতার ডালহৌসির এক পুরোনো শেয়ার ব্রোকারেজ অফিসের নির্ভরযোগ্য দালাল। তার হাতে ক্লায়েন্টরা তাদের সঞ্চয় তুলে দেয়, তাদের স্বপ্ন, তাদের ভরসা।

আজকের সকালটা শুরু হয়েছিল আশ্চর্যভাবে ভারী এক নীরবতায়। টিভির স্ক্রিনে তখনও বাজার খোলেনি, কিন্তু সূচকের আগে-পরে ছুটে চলা লাল আর সবুজ রেখাগুলো যেন দপদপ করে উঠছিল। সৌমিক নিজের চশমা মুছে আবার চোখ রাখল স্ক্রিনে। কপালে ঘাম জমে উঠেছে। আজ সকালে মার্কিন বাজারে হঠাৎ ধস নেমেছে, আর তার রেশ ইতিমধ্যেই এশিয়ার বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। সবুজ রেখাগুলো একে একে লালে ঢেকে যাচ্ছে।

অফিসের ভেতরটায় ফ্যান ঘুরছে হাল্কা শব্দে, ডেস্কের ওপরে ছড়ানো খবরের কাগজে কেবল একটা শিরোনাম সৌমিকের চোখে বারবার ধাক্কা মারছে— বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীদের দিশেহারা অবস্থা।”

সৌমিক চুপচাপ মোবাইল হাতে নিয়ে কয়েকজন বড় ক্লায়েন্টকে ফোন করল। তার অভ্যাস হলো ঝড় নামার আগেই খবর দেওয়া। কিন্তু আজ ফোনের ওপারে কেউ সাড়া দিচ্ছে না। হয়তো সবাই আতঙ্কে ফোন কেটে দিয়েছে, কিংবা তারা নিজেরাই কী করবে ভেবে উঠতে পারছে না।

সকালের কড়া রোদ জানলার কাঁচ ভেদ করে ডেস্কে এসে পড়েছে। তবুও সৌমিকের গায়ে এক অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছে। সে জানে, এই সকাল তার পঁচিশ বছরের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ভয়াবহ হতে চলেছে।

অল্পক্ষণ পর বাজার খোলার ঘণ্টা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে শুরু হলো লাল রঙের আতঙ্ক। একে একে নামছে শেয়ার, দাম পড়ছে ধাপে ধাপে। অফিসের অন্য কর্মচারীরা হইচই শুরু করে দিল। কেউ চিৎকার করছে, কেউ আবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে বসে আছে।

কিন্তু সৌমিকের মুখে কোনো শব্দ নেই। তার চোখ শুধু স্থির হয়ে আছে এক জায়গায়—একটি কোম্পানির শেয়ারে। সেটাই তার সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্টের বিনিয়োগ। নাম ইস্টার্ন ইনফ্রাটেক

কয়েকদিন আগেও শেয়ারের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। সবাই ভেবেছিল এটা হবে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। সেই আশাতেই সৌমিক ক্লায়েন্টকে রাজি করিয়েছিল। কিন্তু আজ, কয়েক মিনিটের মধ্যে দাম নেমে গেল অর্ধেকেরও নিচে। তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। যদি এই ধস থামানো না যায়, তবে শুধু ক্লায়েন্টই নয়, তার নিজের সম্মানও ধসে পড়বে।

ডেস্কের টেলিফোন কাঁপতে শুরু করল। রিংটোনটা যেন হাড় কাঁপানো শব্দে অফিসের বাতাস চিরে দিচ্ছিল। সৌমিক হাত বাড়িয়ে ফোন তুলল। ওপাশে তার বড় ক্লায়েন্ট—অরিন্দম বসু। গলায় আতঙ্কের কম্পন—
“সৌমিক দা, কী হচ্ছে এগুলো? কালও তুমি বলেছিলে সব ঠিক আছে!”

সৌমিক গলা শুকনো রেখে উত্তর দিল, “অরিন্দম, বাজারের ঝড় কেউ আটকাতে পারে না। আমি দেখছি, চিন্তা কোরো না।”

কিন্তু নিজেই জানে, এই কথার ভরসা কতটা ফাঁপা। স্ক্রিনের লাল রেখাগুলো যেন তার নিজের বুকের রক্ত চুষে নিচ্ছে।

অফিসের এক কোণে তখন হইচই বেড়ে গেছে। কয়েকজন জুনিয়র ব্রোকার হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বলছে—
“দাদা, সব বিক্রি করে দিন! যতক্ষণ পারি বাঁচাই!”

সৌমিক জানে, আতঙ্কের সময় সবাই বিক্রি শুরু করলে ধস আরও গভীর হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে কাউকে বোঝানো অসম্ভব। সবাই শুধু বাঁচতে চাইছে।

সে নিজের চেয়ারে হেলান দিল, চোখ বুজল এক মুহূর্তের জন্য। মনে পড়ল অনেক পুরোনো দিনের কথা। ১৯৯২ সালের হার্শদ মেহতা কেলেঙ্কারি, তখনও সে নতুন দালাল। কেমন ভয়াবহ ধস নেমেছিল, মানুষ আত্মহত্যা করেছিল টাকার ক্ষতির ধাক্কায়। আজও সেই ছবি যেন আবার ফিরে আসছে।

হঠাৎ পাশে বসা এক জুনিয়র তাকে বলল, “দাদা, আমাদের শেয়ারগুলোও নামছে। কী করব?”

সৌমিক একদম ঠান্ডা গলায় বলল, “এখন কেউ আতঙ্কে কোনো ডিসিশন নেবে না। বাজারের খেলা স্রেফ মিনিটে মিনিটে বদলায়। অপেক্ষা করো।”

কিন্তু অন্তরে সে জানে, এই ধস থামবে না। হয়তো আজকের দিনটা তার জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দেবে।

ঠিক সেই সময় মোবাইলের স্ক্রিনে একটা নতুন নোটিফিকেশন ভেসে উঠল—
ইস্টার্ন ইনফ্রাটেক-এর ম্যানেজমেন্টে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে, তদন্ত শুরু।”

সৌমিকের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। সে জানে, এই খবরে শেয়ার আর কোনোদিন আগের জায়গায় ফিরবে না। তার সামনে এক অন্ধকার পথ খুলে যাচ্ছে।

ক্লায়েন্টদের ফোন একের পর এক আসতে শুরু করল। সবার গলাতেই আতঙ্ক, দোষারোপ, অভিশাপ। সৌমিক কেবল চুপচাপ বসে রইল। তার চোখ তখনও সেই লাল সূচকের দিকে স্থির হয়ে আছে—যেন পুরো জীবনটাই এক নিমিষে লাল হয়ে যাচ্ছে।

বাইরে সূর্য তখনও উজ্জ্বল। কিন্তু সৌমিকের ভেতরে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ অন্ধকার সকাল।

পর্ব ২: ধসের ভিতরে মানুষ

সৌমিক চৌধুরীর হাতে তখন মোবাইল ফোন যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো গরম হয়ে উঠেছে। ক্লায়েন্টদের একটার পর একটা কল। প্রত্যেকেরই একই প্রশ্ন—“আমাদের টাকা বাঁচবে তো? এখনই বিক্রি করে দিন না হলে সব শেষ।” কিন্তু সে জানে, এখন বিক্রি করলে দাম একেবারেই শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে। তার কণ্ঠে যে দৃঢ়তা থাকা উচিত, তা নেই। কেবল ক্লান্ত, শুকনো স্বর—“অপেক্ষা করো, আতঙ্কে ডিসিশন নিও না।”

কিন্তু কারও কানেই সে কথা ঢুকছে না। অরিন্দম বসু আবার ফোন করল, এবার প্রায় চিৎকার করে—
“তুমি আমার জীবন শেষ করে দিলে! আমি ভেবেছিলাম তুমি অভিজ্ঞ, তোমার কথায় ভরসা করেছিলাম। এখন দেখো কী হল!”

সৌমিক চুপ করে রইল। মনে মনে ভাবল, এই মানুষটাই তো বছর দুয়েক আগে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গেল তার পরামর্শ মেনে। তখন কত গর্ব, কত কৃতজ্ঞতা! অথচ এখন সেই মানুষই তাকে বিশ্বাসঘাতক মনে করছে। বাজারের দালালের ভাগ্যই এ—যখন মুনাফা হয় তখন তুমি ঈশ্বর, আর ক্ষতি হলেই শয়তান।

অফিসের ভেতরে হট্টগোল থামছে না। জুনিয়র ব্রোকাররা কেউ হঠাৎ চেয়ারে বসে মাথায় হাত দিয়েছে, কেউ আবার কম্পিউটারের স্ক্রিনে চিৎকার করে উঠছে। চোখের সামনে লাল সংখ্যার স্রোত। পনেরো বছরের অভিজ্ঞ ব্রোকারও যেন আজ স্কুলছাত্রের মতো দিশেহারা।

সৌমিকের মনে পড়ল তার নিজের শুরুর দিনগুলোর কথা। একসময় সেও এমন আতঙ্কে কাঁপত, রাত জেগে খবরের কাগজ খুঁজত, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি ওঠানামা খুঁটিয়ে দেখত। কিন্তু এত বছর পরও বোঝা গেল, মানুষ যত অভিজ্ঞই হোক, ধসের মুখোমুখি হলে ভয় একই থাকে।

সে ডেস্ক থেকে উঠে দাঁড়াল। এক কাপ চা চাইছিল, কিন্তু পিয়নও কোথায় যেন গায়েব। হয়তো আতঙ্কে বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। সৌমিক জানলার ধারে গিয়ে বাইরে তাকাল। ডালহৌসির রাস্তায় তখনও সাধারণ মানুষের ভিড়, দোকানপাট খোলা, ট্রাম চলছে, রোদে ভিজছে শহর। যেন বাইরের পৃথিবী একেবারেই আলাদা, এই আতঙ্কের কোনো ছায়াই সেখানে নেই। অথচ এই অফিসঘরে যেন আগুন লেগেছে।

হঠাৎ পিছন থেকে এক সহকর্মী—অভিজিৎ, বয়সে অনেকটা ছোট—বলল,
“দাদা, আপনি তো অভিজ্ঞ। বলুন না, কী করব আমরা? সব বিক্রি করে দেব?”

সৌমিক মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“সব বিক্রি করলে কিছুই থাকবে না। বাজার মানে শুধু আজকের দাম নয়, আগামী দিনেরও আশা। কিন্তু হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো বাঁচানো সম্ভব নয়। সেটা বেছে নিতে হবে।”

অভিজিৎ হতাশ চোখে তাকাল। বলল, “আপনারা তো জানেন, আমার নিজেরও কিছু টাকা ফেঁসে আছে। সব শেষ হয়ে গেলে আমি তো পথে বসব।”

সৌমিক তার কাঁধে হাত রাখল। কোনো উত্তর দিল না। কারণ সে জানে, আসলে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কিছু নেই।

ঠিক তখনই তার নিজের মেয়ে রূপার ফোন এল। কলেজে পড়ে, বয়স কুড়ি। চঞ্চল, প্রাণবন্ত। গলায় কৌতূহল—
“বাবা, টিভিতে দেখাচ্ছে শেয়ার বাজার নাকি ভেঙে পড়েছে! তোমার কিছু হবে না তো?”

সৌমিক অনেক কষ্টে গলা সামলে উত্তর দিল,
“তুই চিন্তা করিস না মা। এগুলো বাজারের খেলা। আমি সামলে নেব।”

ফোন কেটে দেওয়ার পর চোখে হালকা জল চলে এল। মেয়ে জানে না, এই খেলায় হেরে গেলে তার পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ সবকিছু হয়তো অনিশ্চিত হয়ে যাবে।

অফিসে ফিরে এসে সে আবার স্ক্রিনে চোখ রাখল। ইস্টার্ন ইনফ্রাটেক নামটা এখন তার কাছে বিষের মতো। কোম্পানির বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর ছড়িয়ে পড়তেই শেয়ার একেবারে ধ্বসে গেছে। একসময় যেটা ছিল আকাশছোঁয়া, সেটা এখন মাটির তলায়।

হঠাৎ তার মনে হল, এই খবরটা হয়তো আগে জানা উচিত ছিল। কেউ না কেউ তো আগেই টের পেয়েছিল। হয়তো বড় লোকেরা নিজেদের শেয়ার গোপনে বেচে দিয়েছে, আর সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলেছে। এটাই তো হয় বারবার—ভিতরের লোকেরা রক্ষা পায়, বাইরের মানুষ ডুবে যায়।

দুপুর গড়াল। বাজারের অবস্থা আরও খারাপ হলো। একে একে সমস্ত ক্লায়েন্টের ফোন আসছে। সৌমিকের মনে হচ্ছে, ফোনটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু সে জানে, এই ফোনই তার জীবন। প্রতিটি রিংটোন মানে নতুন ঝড়।

অবশেষে বিকেলের দিকে বাজার বন্ধ হলো। সূচক তখন লাল রঙে রক্তাক্ত। দেড় হাজার পয়েন্ট একদিনে ধসে গেছে। কলকাতার ইতিহাসে এমন ধস কমই দেখা গেছে। অফিসের ভেতরটা নিস্তব্ধ। সবাই অবসন্ন, মুখে কোনো কথা নেই।

সৌমিক নিজের চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। শরীর ভারী লাগছে। মাথার ভেতর যেন শূন্যতা। ডেস্কের ড্রয়ার থেকে পুরোনো সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা ধরাল। টানতে টানতে ভাবল—আজকের দিনটা হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের শুরু।

বাইরে তখন সন্ধে নেমেছে। ডালহৌসির আলো জ্বলছে, লোকজন ফিরছে বাড়ি। সৌমিকও ধীর পায়ে সিঁড়ি নামল। মনে হলো, পৃথিবী যেন বদলে গেছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। তার পায়ের শব্দ ভারী হয়ে বাজল, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে কোনো অদৃশ্য ঋণের বোঝা চাপছে।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে বুঝল, এই ধস কেবল শেয়ারের দাম কমিয়ে দেয় না, মানুষের ভরসা, বিশ্বাস, সম্পর্ক সবকিছুকেই ভেঙে দেয়। আর এই ভাঙনের ধাক্কা সামলাতে হয় সেই মানুষটিকে, যার নাম ব্রোকার।

এখন প্রশ্ন হলো—আগামীকাল সে আবার অফিসে গিয়ে ক্লায়েন্টদের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারবে তো? নাকি এই ধস তার সমস্ত সুনাম, সমস্ত ভবিষ্যৎ গ্রাস করে নেবে?

পর্ব ৩: অরিন্দমের অভিশাপ

রাতটা সৌমিক প্রায় জেগেই কাটাল। বিছানায় শুয়ে বারবার চোখ বন্ধ করলেও ঘুম আসেনি। মাথার ভেতর ঘুরছিল কেবল একটা প্রশ্ন—আগামীকাল কীভাবে ক্লায়েন্টদের সামনে দাঁড়াবে? টাকার ক্ষতি শুধু অঙ্ক নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের আশা, স্বপ্ন, কখনো কখনো সংসারের শেষ অবলম্বন। আর সেই ক্ষতির দায় সরাসরি দালালের কাঁধে গিয়ে পড়ে।

ভোরে জানলা দিয়ে আলো ঢোকার আগেই তার চোখ খুলে যায়। ঘরে স্ত্রীর শান্ত নিদ্রা আর মেয়ের পড়াশোনার বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এতদিন ধরে সে সংসারের ভিত গড়েছে টাকার উপর, অথচ আজ মনে হচ্ছে এই ভিতই বালির উপর দাঁড়িয়ে।

সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়। চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ানোও ভারী লাগছিল। খবরের কাগজে প্রথম পাতার শিরোনাম— ধসে বিপর্যস্ত ভারতীয় শেয়ার বাজার”। সৌমিক জানত, আজ অফিসে পা রাখা মানে যুদ্ধক্ষেত্রে নামা।

অফিসে ঢুকতেই পরিবেশটা স্পষ্ট হয়ে গেল। একেকজন ব্রোকার যেন যুদ্ধহারা সৈনিকের মতো বসে আছে। টেবিল জুড়ে ছড়ানো কাগজপত্র, ফাঁকা চায়ের কাপ, আর স্ক্রিনে লাল সংখ্যা—সবকিছু মিলিয়ে হাহাকারের ছবি।

কিন্তু এই হাহাকারকে ছাপিয়ে গেল এক চেনা কণ্ঠস্বর। অরিন্দম বসু সোজা সৌমিকের ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ রক্তবর্ণ, মুখ বিকৃত। সে আর ফোনে চিৎকার করছে না, এবার সামনে দাঁড়িয়েই গর্জন—
“তুমি আমার সব শেষ করে দিলে সৌমিক! আমি তোমার উপর ভরসা করেছিলাম। আমার মেয়ের বিয়ের জন্য রাখা টাকা, আমার বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসার জন্য সঞ্চয়—সব তুমি ডুবিয়ে দিলে।”

অফিস এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই তাকিয়ে আছে। সৌমিক চেষ্টা করল শান্ত থাকতে, গলায় যেন কোনো কম্পন না আসে। সে বলল,
“অরিন্দম, আমি তোমাকে ঠকাইনি। বাজারের এই ধস আমি আগে থেকে জানতাম না। আমি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।”

কিন্তু অরিন্দম শুনল না। সে টেবিলে হাত মেরে উঠল—
“নিজের ক্ষতি হয়েছে? আমি তাতে কী করব? আমার তো সংসার আছে, দায়িত্ব আছে। তোমার অভিজ্ঞতার কথা ভেবে আমি শেয়ার কিনেছিলাম। আজ তুমি আমাকে পথে বসালে। মনে রেখো সৌমিক, তোমার জন্য যদি আমার পরিবার ধ্বংস হয়, আমি তোমাকে ছাড়ব না।”

সৌমিকের ভেতরে এক অদ্ভুত চাপ তৈরি হলো। এত বছর ধরে অরিন্দম তার সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্ট, প্রায় বন্ধু বলা চলে। তার বাড়ির অনুষ্ঠানে সৌমিক গেছে, একসাথে মদ খেয়েছে। অথচ আজ সেই মানুষই তাকে শত্রু মনে করছে।

অফিসের অন্য সহকর্মীরা অস্বস্তি নিয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। কেউ সাহস পেল না কিছু বলার। অরিন্দম আরও একবার টেবিল চাপড়াল, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে গেল। দরজা ধাক্কা মেরে বন্ধ হলো।

সৌমিক দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তার মনে হলো, এই ধস কেবল টাকার ক্ষতি নয়, সম্পর্ক ভাঙারও পরীক্ষা। মানুষ যখন ডুবে যায়, তখন সবার আগে যার হাত ধরে ছিল তাকেই দোষারোপ করে।

সে চুপচাপ এক গ্লাস জল খেল। কিন্তু বুকের ভেতরটা এখনও শুকিয়ে আছে। মনে পড়ল, প্রথম যখন দালালির লাইসেন্স পেল, তখন কী উচ্ছ্বাস ছিল! মনে হয়েছিল মানুষের স্বপ্ন পূরণে সে সেতু হয়ে থাকবে। কিন্তু আজ বুঝতে পারল, এই সেতু আসলে কাচের তৈরি—একবার ভাঙলে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

দুপুরের দিকে সৌমিককে ঘিরে ধরল আরও কয়েকজন ছোট ক্লায়েন্ট। কারও চোখে জল, কারও মুখে দোষারোপ। কেউ বলল,
“দাদা, আমরা তো সাধারণ মানুষ। আপনার কথায় ভরসা করেছিলাম। এখন কীভাবে বাঁচব?”

সৌমিক মাথা নিচু করে রইল। সে জানে, তাদের টাকার ক্ষতি তার হাতে ফেরানো সম্ভব নয়। শেয়ার বাজার কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয় যে ক্ষতিপূরণ দেবে। কিন্তু তার নিজের বিবেক তাকে দংশন করছে।

অফিসের এক কোণে তখন ফিসফাস শুরু হলো। কেউ কেউ বলছে, সৌমিক নাকি আগেই খবর জেনেছিল, তবুও শেয়ার কিনিয়েছে। কেউ বলছে, সে হয়তো বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে মিলে গেছে। গুজবের এই আগুন আরও ভয়াবহ।

বিকেলের দিকে সৌমিক বেরিয়ে এল অফিস থেকে। ডালহৌসির ভিড়ভাট্টা পেরিয়ে ধীরে হাঁটছিল। মাথায় তখনও অরিন্দমের চোখের দৃষ্টি ভাসছে—সে দৃষ্টি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নয়, প্রতিশোধপরায়ণ মানুষের।

রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভাবল, সত্যিই তো—এই বাজারের খেলার ভেতরে মানুষ আসলে পুতুল। যাদের হাতে টাকা, তারা সুতো টানে। আর ব্রোকারদের মতো লোকেরা মাঝখানে পড়ে যায়। ক্ষতি হলে ক্লায়েন্ট দোষ দেয় দালালকে, কিন্তু আসল কারচুপি থেকে যায় আড়ালে।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে আকাশ কালো হয়ে এলো। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল মাথায়। সৌমিকের মনে হলো, এই বৃষ্টি যেন তার জীবনের অশুভ সূচনা। মেয়ে রূপা দরজা খুলে দিল, হেসে বলল,
“বাবা, ভিজে গেছো! আসো, তোয়ালে দিই।”

সৌমিক মেয়ের হাসি দেখে এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু ভুলে গেল। ভেতরে ঢুকে স্ত্রীর দিকে তাকাল। তার চোখেও চিন্তার ছায়া। কিন্তু সে কিছু জিজ্ঞেস করল না। যেন বুঝে গেছে, এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।

রাতে ডিনার টেবিলে সৌমিক চুপচাপ খাচ্ছিল। স্ত্রী হালকা গলায় বলল,
“অরিন্দমদা ফোন করেছিল। খুব রাগী গলায় কথা বলল। বলল, তোমার জন্য নাকি সব শেষ।”

সৌমিক মাথা নিচু করল। স্ত্রী আর কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখে যে ভয় জমে আছে, তা স্পষ্ট।

খাওয়ার পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে সৌমিক আকাশের দিকে তাকাল। দূরে বিদ্যুতের ঝলকানি। মনে হলো, এই ঝড় বৃষ্টি কেবল আকাশে নয়, তার জীবনেও নেমে এসেছে।

সে জানে, আগামী দিনগুলো আরও কঠিন হবে। অরিন্দম শুধু রাগ করেনি, অভিশাপ দিয়েছে। আর অভিশাপ কখনো কখনো ভয়াবহ সত্য হয়ে দাঁড়ায়।

পর্ব ৪: গুজবের আগুন

পরের দিন সকালেই সৌমিকের মনে হলো, আজকের দিনটা আরও ভয়ঙ্কর হবে। আগের দিনের ধস যেন শুধু শুরু। তার ভেতরে ভেতরে একটা শঙ্কা কাজ করছিল—বাজারে যত না ক্ষতি, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে মানুষের আতঙ্ক আর গুজব।

অফিসে পৌঁছেই সে বুঝল, শঙ্কাটা ভুল নয়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন ক্লায়েন্ট, কারও মুখে অস্থিরতা, কারও মুখে ক্রোধ। সৌমিককে দেখেই একজন বলে উঠল,
“এই যে আমাদের টাকার কি হবে? আপনি নাকি আগেই জানতেন কোম্পানির কেলেঙ্কারির খবর!”

সৌমিক থমকে গেল। তার গায়ে যেন কেউ বিষ ঢেলে দিল। মিথ্যে অভিযোগও মানুষ এমন জোর গলায় বলে যে, সত্যিই মনে হয় যেন ঘটেছে। ভেতরে ঢুকতেই অফিসের বাতাস বোঝা গেল—জুনিয়র ব্রোকাররা ফিসফিস করছে, কেউ কাগজে মুখ গুঁজে রাখছে, কেউ আবার চোখ সরাচ্ছে। যেন সবাই কিছু শুনেছে, কিন্তু কেউ সরাসরি মুখোমুখি হতে চাইছে না।

অফিসের মালিক মধুসূদন বাবুও এসে দাঁড়ালেন সৌমিকের সামনে। তিনি প্রবীণ, বাজারের অনেক ওঠাপড়া দেখেছেন। তবুও চোখে উদ্বেগ—
“সৌমিক, বাইরে অনেক কথা উঠছে। ক্লায়েন্টরা বলছে তুমি নাকি আগে থেকেই খবর পেয়েছিলে, তবুও তাদের শেয়ার কিনিয়েছ। বলো, ব্যাপারটা কী?”

সৌমিক শান্ত স্বরে বলল,
“মধুদা, আমি কিছু জানতাম না। আমিও তো টাকা ঢেলেছিলাম ওই কোম্পানিতে। আমারও ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করতে চাইছে না।”

মধুসূদন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“এই সময় মানুষ যুক্তি শুনতে চায় না, তারা শুধু দোষী খুঁজে। সাবধানে থেকো। বাজারের বাইরে যেমন খেলা চলে, তেমনি ভিতরেও রাজনীতি আছে।”

কথাগুলো কানে বাজতে থাকল। সৌমিক জানল, আসল বিপদ এখন শুরু।

সকাল থেকেই ফোনের পর ফোন আসছে। ক্লায়েন্টরা হাহাকার করছে। কেউ বলছে, বাচ্চার পড়ার ফি দিতে পারবে না, কেউ বলছে হাসপাতালের বিল মেটাতে পারবে না। সৌমিক উত্তর দিচ্ছে যতটা পারে, কিন্তু প্রতিটি কথাই যেন তার বুকের ভেতর ছুরি মারছে।

অফিসের ভেতরে তখন আরও এক সমস্যা দেখা দিল। অভিজিৎ—যে জুনিয়র ব্রোকার আগের দিন তার কাছে সাহায্য চাইছিল—হঠাৎ বলে উঠল,
“দাদা, আমি শুনেছি আপনার কাছে আগে থেকে খবর ছিল। নইলে এত বড় কোম্পানি কেন আপনি সবাইকে এত আগ্রহ করে কিনতে বললেন?”

অফিস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সৌমিকের চোখে বিস্ময় আর রাগ মেশানো দৃষ্টি। সে চুপ করে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল,
“তুইও? তুই এতদিন আমার সঙ্গে কাজ করিস, জানিস আমি কারও ক্ষতি চাই না। তবুও এমনটা ভাবলি?”

অভিজিৎ চোখ নামিয়ে নিল। হয়তো তার নিজের ক্ষতির যন্ত্রণা তাকে সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছে। কিন্তু সৌমিক বুঝল, বিশ্বাস ভেঙে গেলে সম্পর্কের ভিত এক মুহূর্তেই নড়ে যায়।

দুপুরে যখন বাজার আবার খুলল, ধস আরও গভীর হলো। এবার শুধু ইস্টার্ন ইনফ্রাটেক নয়, একে একে অন্য কোম্পানির শেয়ারও নামতে শুরু করল। এটা যেন চেইন রিঅ্যাকশনের মতো—একটি ভেঙে পড়লে অন্যরা টিকতে পারে না। অফিসে তখন কান্না, চিৎকার, অভিশাপের স্রোত।

বিকেলের দিকে হঠাৎ একটা খবর ছড়িয়ে পড়ল—
“ইস্টার্ন ইনফ্রাটেক কেলেঙ্কারির সঙ্গে নাকি কয়েকজন ব্রোকারের যোগ আছে। তাদের নাকি গোপনে টাকা দেওয়া হয়েছিল।”

সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই কয়েকজন সরাসরি সৌমিকের দিকে তাকাল। কেউ কিছু বলল না, কিন্তু দৃষ্টিই যথেষ্ট। যেন সবাই ভাবছে—দোষী এই মানুষটাই।

সৌমিক মনে করল, বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে জানে, তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু গুজবের আগুন যুক্তি মানে না। বাজারে গুজবই আসল সত্য হয়ে ওঠে।

অফিস থেকে বেরিয়ে যখন ডালহৌসির ভিড়ে হাঁটছিল, মনে হচ্ছিল লোকজনের চোখ তাকে বিদ্ধ করছে। হয়তো তারা চিনতে পারছে না, কিন্তু তার ভেতরের অপরাধবোধ তাকে এমন অনুভব করাচ্ছে।

রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা চা খেল। চায়ের দোকানে কয়েকজন লোকও শেয়ার বাজারের কথা বলছিল। একজন বলল,
“শুনেছি ব্রোকাররাই খেলাটা করেছে। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু ঠকছি।”

সৌমিক চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। মনে হলো, তার অস্তিত্বটাই এখন সন্দেহে ভরা।

সন্ধে নামতে শুরু করেছে। আকাশে কালো মেঘ জমছে। সৌমিক ধীরে ধীরে বাড়ির পথে হাঁটছিল। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, গুজবের এই আগুন থেকে সে পালাতে পারবে না। অরিন্দমের অভিশাপের পর আজ এই গুজব যেন তাকে ঘিরে ধরছে।

বাড়ি ফিরে মেয়ের মুখের হাসি দেখেই বুকটা কেঁপে উঠল। রূপা বলল,
“বাবা, তুমি ভালো তো? খবরের কাগজে তোমাদের নিয়ে অনেক খারাপ লেখা এসেছে।”

সৌমিক মেয়ের চোখে তাকাতে পারল না। শুধু মাথায় হাত রেখে বলল,
“চিন্তা করিস না মা। আমি সামলে নেব।”

কিন্তু সে জানে, এই আগুন সামলানো এত সহজ নয়। আগামীকাল হয়তো আরও বড় বিস্ফোরণ অপেক্ষা করছে।

পর্ব ৫: থানার নোটিশ

সকালের বাতাসে কলকাতা তখনও ভেজা বৃষ্টির গন্ধে ভরপুর। কিন্তু সৌমিকের মনে কোনো সতেজতা নেই। রাতভর ঘুম আসেনি। বারবার মনে হয়েছে—অরিন্দমের চিৎকার, ক্লায়েন্টদের কান্না, সহকর্মীদের সন্দেহ। আজ আবার অফিসে গেলে কী হবে কে জানে!

কাপের চায়ে চুমুক দিতে দিতে স্ত্রীর চোখে সে লক্ষ্য করল উদ্বেগের ছায়া। স্ত্রী ফিসফিস করে বলল,
“কাল রাতে অরিন্দম আবার ফোন করেছিল। বলছিল, তোমার বিরুদ্ধে থানায় যাবে।”

সৌমিক স্তব্ধ হয়ে গেল। গলাটা শুকিয়ে এলো। এত বছর ধরে সৎভাবে কাজ করেছে, তবুও আজ তাকে কি পুলিশি জবাবদিহি করতে হবে?

অফিসে পৌঁছাতেই মধুসূদন বাবু তাকে ডেকে নিলেন। মুখে গম্ভীর ছায়া—
“সৌমিক, আজ সকালে থানার লোক এসেছে। তারা তোমার খোঁজ করছে। ক্লায়েন্টদের কয়েকজন অভিযোগ করেছে, তুমি নাকি ইস্টার্ন ইনফ্রাটেক-এর সঙ্গে যোগসাজশ করে তাদের ঠকিয়েছ।”

শুনে সৌমিকের বুকটা হিম হয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারল না। মধুসূদন বাবু আবার বললেন,
“আমি তোমাকে চিনি। তুই ইচ্ছে করে কারও ক্ষতি করিস না। কিন্তু বাইরে যা গুজব উঠেছে, পুলিশও তো তদন্ত করবেই। এখন তোকে প্রস্তুত থাকতে হবে।”

অফিসজুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হলো না। সহকর্মীরা ফিসফিস করতে লাগল—“সত্যিই কি সৌমিক জড়িত?” কেউ আবার আড়ালে বলল, “এটাই তো হবার ছিল।”

হঠাৎ বেলা দশটার দিকে দুজন পুলিশ অফিসার এসে হাজির হলো। একজন বললেন,
“সৌমিক চৌধুরী?”

সৌমিক সামনে এগিয়ে গেল। অফিসে সবাই তাকিয়ে আছে। পুলিশের কণ্ঠ কঠিন—
“আপনার নামে লিখিত অভিযোগ হয়েছে। আপনাকে থানায় গিয়ে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”

কথাগুলো শুনে তার মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। এত বছর ধরে যাদের জন্য দিনরাত খেটেছে, সেই ক্লায়েন্টেরাই আজ তাকে আইনের কাঠগড়ায় টেনে এনেছে।

পুলিশদের সঙ্গে থানায় গিয়ে বসল সে। টেবিলের ওপাশে এক ইন্সপেক্টর ফাইল খুলে বসেছেন। ভেতরে কয়েকজন অভিযোগকারীর নাম লেখা—অরিন্দম বসু, সমীর ঘোষ, রমেশ আগরওয়াল। প্রত্যেকেই সৌমিকের দীর্ঘদিনের ক্লায়েন্ট।

ইন্সপেক্টর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি কি জানতেন ইস্টার্ন ইনফ্রাটেক দুর্নীতিতে জড়িত?”

সৌমিক মাথা নেড়ে বলল,
“না স্যার। আমি নিজেও ওই শেয়ারে বিনিয়োগ করেছি। আমারও ক্ষতি হয়েছে।”

“তাহলে কেন এত জোর করে ক্লায়েন্টদের কিনতে বলেছিলেন?”

সৌমিক স্তব্ধ হয়ে গেল। কীভাবে বোঝাবে যে তখন শেয়ারটা বাজারে সোনার ডিম মনে হচ্ছিল? সবাই কিনছিল, তিনিও ভেবেছিলেন সুযোগটা কাজে লাগানো উচিত।

“আমার উদ্দেশ্য ছিল মুনাফা করানো। কিন্তু এই ধস হঠাৎই এলো। আমি কারও সঙ্গে যোগসাজশ করিনি।”

ইন্সপেক্টর কাগজে কলম ঠুকতে ঠুকতে বললেন,
“আমরা তদন্ত করব। প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আপনাকে দোষী বলা যাবে না। তবে সতর্ক থাকুন, আপনার বিরুদ্ধে চাপ বাড়ছে।”

থানা থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে সৌমিকের মনে হলো, তার পৃথিবীটা ভেঙে পড়ছে। বাজারের ধস, ক্লায়েন্টদের রাগ, এখন আবার পুলিশের জেরা—সব মিলিয়ে এক অন্ধকার গহ্বরে সে পড়ে যাচ্ছে।

বিকেলের দিকে সে আবার অফিসে ফিরল। সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল। কেউ সরাসরি কিছু বলল না, কিন্তু তাদের চোখেই লেখা—“সে দোষী।”

মধুসূদন বাবু তাকে আলাদা করে ডেকে বললেন,
“সৌমিক, আমি তোকে চিনি। কিন্তু এই সময় তোকে সামলে চলতে হবে। ক্লায়েন্টরা খুব উত্তেজিত। কেউ কেউ হুমকিও দিচ্ছে।”

সৌমিক মাথা নেড়ে বলল,
“আমি সত্যিই কিছু করিনি মধুদা। বাজারের খেলায় হারজিত থাকে। কিন্তু মানুষ এখন শুধু দোষী খুঁজছে।”

অফিস থেকে বেরোনোর সময় তার মোবাইলে মেসেজ এলো—একটা অচেনা নম্বর থেকে। তাতে লেখা:
সতর্ক হও। এবার শুধু গুজব নয়, জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।”

মেসেজ দেখে তার শরীর কেঁপে উঠল। কে পাঠাল এটা? অরিন্দম? নাকি অন্য কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ক্লায়েন্ট?

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে দীর্ঘক্ষণ আকাশের দিকে তাকাল। মেয়ে রূপা পড়াশোনা করছে, স্ত্রী রান্নাঘরে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ এক অদ্ভুত ভয় তার বুক চেপে ধরল। যদি সত্যিই কেউ তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে? যদি কোনো ক্ষিপ্ত মানুষ তার পরিবারকে আঘাত করে?

রাতে শোয়ার আগে স্ত্রীর হাত ধরে সে বলল,
“যা-ই হোক, আমি কিছু লুকোইনি। কিন্তু যদি কিছু হয়ে যায়, তুমি আর রূপা যেন ভেঙে পড়িস না।”

স্ত্রী চমকে তাকাল, চোখে জল এসে গেল।
“এমন কথা বলো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু সৌমিক জানে, সব ঠিক হবে না। এই থানার নোটিশ শুধু শুরু। সামনে হয়তো আরও ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করছে।

পর্ব ৬: কালো ছায়ার শুরু

রাতভর বৃষ্টির শব্দে কলকাতা ভিজে আছে, কিন্তু সৌমিকের মাথার ভেতর যেন খরার আগুন। বিছানায় শুয়ে বারবার ঘুরছিল, ঘুম আসছিল না। থানার নোটিশ, ক্লায়েন্টদের অভিযোগ, অচেনা নম্বর থেকে আসা সেই হুমকির মেসেজ—সব মিলে তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল।

ভোর হতেই উঠে বসে জানলার বাইরে তাকাল। রাস্তার ধুলো ধুয়ে গেছে, পুকুরের জলে রোদের ঝিলিক পড়ছে। কিন্তু তার কাছে সবকিছু ম্লান। বুকের ভেতর কেবল একটা শব্দ ঘুরছে—“অভিযুক্ত।”

সকালের নাশতা খেতে খেতেই স্ত্রী বলল,
“কাল রাতেও আবার ফোন এলো। কেউ গালি দিল, হুমকি দিল। বলল, তোমাকে ছাড়বে না। আমি খুব ভয় পাচ্ছি।”

সৌমিক স্ত্রীর হাত চেপে ধরল। গলায় এক অদ্ভুত কঠিনতা এনে বলল,
“ভয় পেও না। আমি কিছু ভুল করিনি। কিন্তু হ্যাঁ, সাবধান থাকতে হবে।”

অফিসে পৌঁছে দেখল, পরিবেশ আরও অশান্ত। দরজার বাইরে কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ক্লায়েন্ট জড়ো হয়ে আছে। তাদের কারও চোখে কান্না, কারও মুখে রাগ। তারা তাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল—
“আমাদের টাকা ফেরত দাও!”
“চোর! সব দালাল এক!”

অফিসের নিরাপত্তারক্ষী কষ্ট করে তাদের সরাল। ভেতরে ঢুকে সৌমিক দেখল সহকর্মীরাও আজ আরও দূরে সরে গেছে। কেউ সরাসরি কথা বলছে না, কেউ চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। গুজব যেন তার চারপাশে ঘন কুয়াশার মতো।

দুপুর নাগাদ থানার ইন্সপেক্টরের আবার ফোন এলো। গলা ঠান্ডা, কিন্তু তাতে চাপা ইঙ্গিত—
“আপনাকে আবার আসতে হবে। নতুন কিছু নথি পেয়েছি।”

সৌমিক ফোন কেটে দিল, কিন্তু বুক ধড়ফড় করে উঠল। কেমন নথি? কে দিয়েছে? কেউ কি ইচ্ছে করে তাকে ফাঁসাচ্ছে?

ঠিক তখনই অরিন্দম বসু অফিসে ঢুকল। সঙ্গে দুজন অচেনা লোক। অরিন্দমের চোখ লাল, ঠোঁটে তাচ্ছিল্য।
“সৌমিক দা, এবারও কি বলবে কিছু জানতেন না? তোমার জন্য আমার সর্বনাশ হয়েছে। আমি থানায় গেছি, কোর্টেও যাব। তুমি যদি জেলে না যাও, তবে আমার নাম অরিন্দম নয়।”

তার কণ্ঠে এত রাগ যে অফিসের অন্যরা চুপ করে গেল। সৌমিক শান্ত থাকার চেষ্টা করল।
“অরিন্দম, আমি জানতাম না। আমি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত।”

কিন্তু অরিন্দম শুনল না। সে শুধু বিদ্বেষভরা চোখে তাকাল। তারপর ঠোঁটে হেসে বলল,
“শুধু টাকা নয়, মান-সম্মানও হারাবি। প্রস্তুত থেকো।”

অরিন্দম চলে যেতেই অফিসে গুঞ্জন শুরু হলো। কেউ ফিসফিস করে বলল, “সত্যিই হয়তো দোষী।” আরেকজন বলল, “এবার বাঁচবে না।”

সৌমিক চেয়ারে বসে মাথা দুই হাতে চেপে ধরল। চারপাশে সবকিছু ঘুরছে। মনে হলো, সে একা। সবাই তার বিরুদ্ধে।

সন্ধের দিকে বেরোবার সময় আবার সেই অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এলো—
শুধু থানাই নয়, রাস্তার লোকও তোমাকে শাস্তি দেবে।”

তার বুক কেঁপে উঠল। চারদিকে তাকাল। ভিড়ের মধ্যে যেন কয়েকটা অচেনা চোখ তাকে অনুসরণ করছে।

বাড়ি ফিরতেই রূপা ছুটে এলো। মেয়ের কণ্ঠে উদ্বেগ—
“বাবা, খবরের কাগজে তোমার নাম এসেছে। লিখেছে, কয়েকজন ব্রোকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।”

সৌমিক মেয়ে আর স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। কী উত্তর দেবে? সত্যিই কি মানুষ বিশ্বাস করবে যে সে দোষী নয়?

রাতে খাবার টেবিলে স্ত্রীর গলা কেঁপে উঠল।
“আমরা কি নিরাপদ আছি? যদি সত্যিই কেউ আক্রমণ করে?”

সৌমিক কোনো জবাব দিল না। শুধু মনে মনে ভাবল, এই কালো ছায়া এখন তার সংসারকেও ঘিরে ফেলছে।

ঘুমোতে যাওয়ার আগে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল। মেঘের আড়ালে চাঁদ লুকিয়েছে। মনে হলো, তার জীবন থেকেও আলো হারিয়ে যাচ্ছে।

তার কানে তখনও বাজছে অরিন্দমের কথা— মান-সম্মানও হারাবি।”

সে বুঝল, ধস শুধু শেয়ারের দাম নামায় না। ধস নামায় মানুষের বিশ্বাস, সুনাম, এমনকি জীবনকেও।

আর সেই ধসের ভেতর সে এখন একা, অসহায়, অন্ধকারে আটকে।

পর্ব ৭: পতনের ঢেউ

সকাল থেকে সৌমিকের বুক কেমন হালকা ব্যথায় ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে, হৃদপিণ্ডটা যেন লাফাচ্ছে বুক ভেঙে বেরিয়ে আসবে। আয়নায় মুখ দেখে নিজেই ভয় পেল—চোখের নীচে কালি, দাড়ি অগোছালো, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। তবুও অফিসে যেতেই হবে। না গেলে গুজব আরও বেড়ে যাবে।

ট্যাক্সিতে চেপে ডালহৌসির পথে যেতে যেতে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। মানুষজন হেঁটে যাচ্ছে, দোকান খোলা হচ্ছে, ট্রামের ঘণ্টা বাজছে। সব কিছু স্বাভাবিক, অথচ তার ভেতরে ঝড় বইছে। সে ভাবল, আশ্চর্য ব্যাপার—পৃথিবী কখনো কারও বিপদে থেমে যায় না।

অফিসে ঢুকতেই সে বুঝল, আজ দিনটা আরও কঠিন হবে। রিসেপশনের সামনেই কয়েকজন ক্লায়েন্ট দাঁড়িয়ে। তাদের মুখে হতাশা, চোখে বিদ্বেষ। সৌমিককে দেখেই একজন চেঁচিয়ে উঠল—
“আমাদের টাকা ফেরত দাও! তুমি চোর!”

কেউ তার শার্টের কলার ধরে টান দিল, অন্যরা চেঁচিয়ে উঠল। অফিসের নিরাপত্তারক্ষীরা হস্তক্ষেপ করল, মধুসূদন বাবু এসে পরিস্থিতি সামলালেন। তবুও আঘাতটা লেগে গেল গভীরভাবে।

ডেস্কে বসতেই ফোন বেজে উঠল। ওপাশে সাংবাদিকের কণ্ঠ—
“সৌমিক বাবু, আপনার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ হয়েছে। আমরা একটি রিপোর্ট করছি। আপনি কী বলবেন?”

সৌমিক ফোন কেটে দিল। সাংবাদিকদের সাথে কথা বললে বিপদ আরও বাড়বে। কিন্তু সে জানে, এবার গণমাধ্যমও তাকে টেনে নামাবে।

বাজার খোলার সাথে সাথে আবার শুরু হলো লাল সংখ্যার ঝড়। এবার শুধু শেয়ার দাম কমছে না, মানুষের বিশ্বাসও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অফিসে এক সহকর্মী হঠাৎ বলল,
“এভাবে চললে আমরা সবাই শেষ হয়ে যাব। এর দায় কার?”

তার দৃষ্টিটা সরাসরি সৌমিকের দিকে। যেন সবার কাছে সে-ই আসল অপরাধী।

সৌমিক কিছু বলল না। শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। লাল রঙের স্রোতে তার ভেতরটা জমে যাচ্ছে।

দুপুরে হঠাৎ এক খবর এল—অরিন্দম বসু আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। টিভি স্ক্রিনে ফ্ল্যাশ নিউজ চলছে:
শেয়ার বাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী অরিন্দম বসু আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। হাসপাতালে ভর্তি।”

অফিস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। কয়েকজন আবার ফিসফিস করে বলল,
“অরিন্দম তো সৌমিকের ক্লায়েন্ট ছিল। এখন সবাই বলবে ওর জন্যই এই সর্বনাশ।”

সৌমিকের মাথা ঘুরে গেল। সে চেয়ারে বসে পড়ল। মনে হলো বুকটা ফেটে যাবে। কানে বাজছে সেই দিনকার অরিন্দমের কথা— তোমার জন্য যদি আমার পরিবার ধ্বংস হয়, আমি তোমাকে ছাড়ব না।”

এখন যদি অরিন্দম বাঁচে না, তবে সত্যিই সে-ই কি দায়ী হয়ে যাবে? আইন, সমাজ, মিডিয়া—সবাই তাকে অপরাধী করে দেবে।

বিকেলের দিকে থানার ইন্সপেক্টরের আবার ফোন এল। এবার কণ্ঠে স্পষ্ট কঠোরতা—
“আপনার নাম নতুন এফআইআরে এসেছে। কাল আপনাকে হাজিরা দিতে হবে।”

ফোন নামাতেই অফিসের ভেতর সবাই তাকিয়ে রইল। তাদের চোখের দৃষ্টি যেন বলে দিল—এবার বাঁচার উপায় নেই।

সন্ধে নামতেই সে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বেরোল। ডালহৌসির রাস্তা ভিজে আছে হালকা বৃষ্টিতে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ভেজা অ্যাসফাল্ট চকচক করছে। তার মনে হলো, শহরটাই যেন তার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাস্তা পেরোতেই আবার সেই অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এলো—
অরিন্দম মরে গেলে তুইও মরবি।”

তার হাত কাঁপতে লাগল। মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে চারদিকে তাকাল। ভিড়ের মধ্যে কয়েকটা মুখ অচেনা, চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি।

বাড়ি ফিরতেই স্ত্রী আতঙ্কিত চোখে তাকাল।
“খবর দেখেছো? অরিন্দম হাসপাতালেই আছে। সবাই তোমার নাম নিচ্ছে। আমরা কী করব?”

রূপা কাছে এসে বাবার হাত ধরল।
“বাবা, তুমি কিছু করনি তো? সবাই বলছে তুমি দোষী।”

সৌমিক মেয়ে আর স্ত্রীর চোখে তাকিয়ে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে বলল,
“আমি কিছু করিনি। কিন্তু দোষ প্রমাণ করা আর নির্দোষ প্রমাণ করা এক জিনিস নয়।”

রাতভর বিছানায় এপাশ-ওপাশ করল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, ভেতরে বুকের ধুকপুকানি। মনে হলো, পতনের ঢেউ তাকে আছড়ে ফেলছে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কি তবে সত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছি?”

পর্ব ৮: আদালতের সিঁড়ি

সকালটা শুরু হলো এক ভয়াবহ খবর দিয়ে—অরিন্দম বসু হাসপাতাল থেকে বেঁচে ফিরেছে, কিন্তু এখন মিডিয়ার সামনে তার পরিবারের লোকজন একটাই কথা বলছে—“অরিন্দম সর্বনাশ হয়েছে সৌমিক চৌধুরীর জন্য। তারাই দায়ী।”

টিভি স্ক্রিনে বারবার ভেসে আসছিল অরিন্দমের স্ত্রীর কান্নাভেজা মুখ।
“আমার স্বামী সবসময় সৌমিক দাকে ভরসা করত। সে বলেছিল শেয়ার কিনলে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে। আজ আমার স্বামী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আমাদের সংসার শেষ হয়ে গেছে।”

এই দৃশ্য দেখে সৌমিকের বুকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু তার চেয়ে ভয়ঙ্কর হলো নিচে নেমে আসা নোটিশ। থানার লোক এসে জানাল—আজই তাকে আদালতে হাজির হতে হবে।

স্ত্রী দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে আতঙ্ক, মুখে কোনো কথা নেই। রূপা বাবার হাতে আঁকড়ে ধরে বলল,
“বাবা, তুমি যাবে তো একা? আমি যেতে চাই।”

সৌমিক মৃদু হেসে মাথা নেড়ে দিল।
“না মা, এগুলো তোমাদের দেখার জায়গা নয়। আমি সামলে নেব।”

কিন্তু ভেতরে সে জানত, সামলানো আর সম্ভব হচ্ছে না।

ডালহৌসি পেরিয়ে সোজা আদালতে পৌঁছাল সে। পুরোনো দালান, ভিড়ভাট্টা, উকিলদের কালো কোটে গিজগিজ করছে জায়গাটা। লোকজনের কৌতূহলী দৃষ্টি তাকে যেন বিদ্ধ করছিল। অনেকেই চিনতে পারল—“এই তো সেই ব্রোকার, যার নামে কেস হয়েছে।”

কোর্টরুমের ভেতরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তার মনে হচ্ছিল পায়ের তলা থেকে জমি সরে যাচ্ছে। বিচারকের সামনে উকিলরা তর্ক করছে। একপাশে সরকারি উকিল চেঁচিয়ে বলল,
“মাই লর্ড, এইসব ব্রোকাররাই বাজারের ধস ঘটায়। সাধারণ মানুষ ঠকেছে, আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”

তারপর তার নাম উচ্চারণ করা হলো—
“সৌমিক চৌধুরী।”

সব চোখ তার দিকে ঘুরল। সে উঠে দাঁড়াল। গলা শুকনো, বুক কাঁপছে। তার উকিল খুব শান্ত গলায় বলল,
“মাই লর্ড, আমার মক্কেল নির্দোষ। বাজারের ওঠা-নামা স্বাভাবিক। তিনি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারও সঙ্গে যোগসাজশ প্রমাণ করার কোনো কাগজ নেই।”

বিচারক ঠান্ডা চোখে ফাইল উল্টেপাল্টে দেখলেন। তারপর বললেন,
“তদন্ত চলবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত জামিন মঞ্জুর।”

একটা দীর্ঘশ্বাস যেন বুক থেকে বেরিয়ে এলো। অন্তত জেলে যেতে হলো না। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে থেকে লোকজনের কানাকানি কানে এল—“জামিনে ছাড়া পেলেই কি দোষ মুছে যায়?”

আদালত থেকে বেরোতেই কয়েকজন সাংবাদিক মাইক্রোফোন এগিয়ে দিল।
“সৌমিক বাবু, আপনি কি সত্যিই ইস্টার্ন ইনফ্রাটেক-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?”
“মানুষের টাকা নষ্ট করেছেন—আপনার জবাব কী?”

সৌমিক কিছু না বলে মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগল। ফ্ল্যাশ লাইট, ক্যামেরা, প্রশ্নের বন্যা—সবকিছু মিলিয়ে মনে হলো যেন তার মর্যাদা কাদা মাখানো হয়ে যাচ্ছে।

বিকেলে অফিসে ফিরলেও কাজের পরিবেশ আর আগের মতো নেই। সহকর্মীরা দূরে সরে গেছে, কেউ চোখাচোখি করছে না। মধুসূদন বাবু তাকে আলাদা করে বললেন,
“তুই এখন অফিসে বেশি আসিস না সৌমিক। ক্লায়েন্টরা খুব চাপ দিচ্ছে। তোর নাম থাকলে সবাই ভয় পাচ্ছে।”

এই কথাটা তার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধল। এতদিন ধরে যেই অফিসটাকে ঘর মনে করত, আজ সেখানেই সে অবাঞ্ছিত।

সন্ধের দিকে যখন ফিরছিল, তখন আবার সেই অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এলো—
আদালতে ছাড়া পেলেও রাস্তায় পাবি শাস্তি।”

সৌমিক মোবাইল বন্ধ করে দিল। তার বুকের ভেতর ভয় জমাট বেঁধে গেল। কে এই ছায়ার মতো পিছু করছে?

বাড়ি ফিরে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। রূপা তখন পড়াশোনা করছে, কিন্তু বাবার মুখ দেখে বুঝল কিছু একটা ভয়াবহ হয়েছে।
“বাবা, তুমি কাঁদছো?”

সৌমিক মৃদু হাসল।
“না মা, কাঁদি কেন? আমি শুধু ক্লান্ত।”

কিন্তু তার চোখে যে জল, সেটা ঢাকতে পারল না। স্ত্রী রান্নাঘর থেকে এসে চুপ করে দাঁড়াল। চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন—এখন কী হবে?”

রাতের আকাশে মেঘ জমেছে। হাওয়ার ঝাপটা বইছে। বিছানায় শুয়ে সৌমিক ভাবছিল—আজকের এই আদালতের সিঁড়ি হয়তো তার জীবনের এক বাঁক। এখান থেকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব নয়।

সে জানে, আগামী দিনগুলো শুধু আইন নয়, মানুষের বিচারও বহন করতে হবে। আর সেই বিচারের সামনে কোনো যুক্তি, কোনো সত্যই হয়তো টিকবে না।

পর্ব ৯: অন্ধকার রাতের কণ্ঠস্বর

আদালতের দিন কেটে গেছে, কিন্তু সেই ধাক্কা এখনও সৌমিকের মাথায় বাজছে। জামিনে ছাড়া পেলেও তার চোখে এখন চারপাশ অন্ধকার। বাজারে যাওয়ার সাহস আর পাচ্ছে না। অফিসেও ঢোকার পর সবাই যেন আড়চোখে তাকায়, কেউ মুখে কিছু বলে না, কিন্তু তাদের নীরবতাই অনেক বড় অভিযোগ।

সন্ধ্যার পর থেকে তার মনে হচ্ছিল শহরটা অন্য রকম। ফুটপাতের আলো, ট্রামের টুংটাং, মানুষের কোলাহল—সবই যেন অচেনা, শত্রুভাবাপন্ন। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি অচেনা মুখ তার দিকে তাকিয়ে আছে, প্রতিটি পা ফেলার শব্দ তার পেছনে আসছে।

বাড়ি ফেরার পথে একসময় সে সত্যিই টের পেল কেউ তাকে অনুসরণ করছে। পেছনে দুই-তিনজন ছায়ামূর্তি। তাদের পদশব্দ ভারী। সে হাঁটা বাড়াল, তারাও বাড়াল। বুকের ভেতর ধকধক শুরু হলো। হঠাৎ একটা অন্ধকার গলিতে ঢুকে গেল সৌমিক। কিন্তু সেখানেই তাকে ঘিরে ফেলল তিনটে মানুষ। মুখে রুমাল বাঁধা, চোখে বিদ্বেষ।

একজন ঠান্ডা গলায় বলল,
“তুই আমাদের শেষ করে দিয়েছিস। আজ তোকে ছাড়ব না।”

দ্বিতীয়জনের হাতে লোহার রড। সে আঘাত করল পাশের দেওয়ালে, শব্দটা অন্ধকারে ছিটকে গেল। সৌমিকের শরীর কেঁপে উঠল। সে বলল,
“শোনো, আমি দোষী নই। আমিও ক্ষতিগ্রস্ত। আমি কারও টাকা খাইনি।”

কিন্তু তারা হাসল।
“সত্যি-মিথ্যা শুনতে আসিনি। আমাদের টাকার দাম তুই জানিস না। আজ তুই শিখবি।”

এক ধাক্কায় তাকে মাটিতে ফেলে দিল। লাথি, ঘুষি, লোহার রড—মুহূর্তের মধ্যে তার শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেল। বুক ফেটে ব্যথা উঠল, গলা শুকিয়ে গেল। চিৎকার করার শক্তিও নেই।

হঠাৎ দূর থেকে পুলিশের বাঁশির শব্দ ভেসে এলো। তিনজন আতঙ্কে দৌড়ে পালাল। সৌমিক রক্তাক্ত শরীর নিয়ে মাটিতে পড়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর এক পথচারী এসে তাকে তুলল। ট্যাক্সিতে বসিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেল। জরুরি বিভাগে শুয়ে সে শুনতে পেল ডাক্তারের গম্ভীর গলা—
“বুকের হাড়ে চোট লেগেছে, কিন্তু বেঁচে যাবে।”

চোখের কোণে জল জমে এলো। সে ভাবল, আজ সত্যিই মরতে পারত। তাহলে সব শেষ হয়ে যেত। কিন্তু মৃত্যু আসেনি—বরং তাকে আরও বড় অন্ধকারে ঠেলে দিল।

হাসপাতালে খবর পৌঁছে গেল পরিবারে। স্ত্রী ছুটে এল, চোখে জল, কণ্ঠ কাঁপছে।
“এ কী করেছ তুমি? আমাদের কী হবে?”

রূপা বাবার হাত চেপে ধরল।
“বাবা, তোমাকে ওরা মেরে ফেলতে চাইছে। আমরা এভাবে বাঁচব কীভাবে?”

সৌমিক গলা ভারী করে বলল,
“আমি তো কিছু করিনি। তবুও কেন সবাই আমার শত্রু হয়ে যাচ্ছে?”

ডাক্তার তাকে এক রাত হাসপাতালে রাখতে বললেন। স্যালাইনের নীচে শুয়ে থাকতে থাকতে সে শুনতে পেল বাইরের শব্দ—সাংবাদিকরা এসে জড়ো হয়েছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ চেঁচাচ্ছে—
“এটাই কি বিনিয়োগকারীদের প্রতিশোধ?”

মনে হলো, সে আর মানুষ নেই, সে এক সংবাদ শিরোনাম হয়ে গেছে।

রাতে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকল। দূরে আলো ঝিলমিল করছে, কিন্তু তার কাছে সব অন্ধকার। বুকের ভেতর শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে—জীবন আর কতদিন চলবে?”

সকালে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল। পুলিশের রিপোর্ট হলো—“অজ্ঞাত দুষ্কৃতী আক্রমণ।” কিন্তু সে জানে, তারা অজ্ঞাত নয়, তারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের রূপ।

বাড়ি ফিরে স্ত্রীর মুখে ভয়ের ছায়া।
“আমরা কি শহর ছেড়ে চলে যাব? এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়।”

সৌমিক উত্তর দিতে পারল না। সে জানে, পালালেও ছায়া পিছু ছাড়বে না।

রাতে বারান্দায় বসে ছিল। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল। সেই অচেনা নম্বর থেকে ভয়াল কণ্ঠস্বর—
“আজ বেঁচে গেলি। কিন্তু পরের বার রক্ষা পাবি না।”

তার শরীর কেঁপে উঠল। ফোন বন্ধ করে দিল, কিন্তু গলার স্বরটা মাথার ভেতর বাজতে থাকল।

সে বুঝল, এই অন্ধকার রাতের কণ্ঠস্বর কেবল হুমকি নয়—এ তার জীবনের নতুন অধ্যায়। যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে।

পর্ব ১০: শেষ লেনদেন

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কয়েকদিন সৌমিক প্রায় ঘরবন্দি হয়ে রইল। শরীরের চোট কিছুটা সারলেও ভেতরের ক্ষত সারেনি। আয়নায় নিজের মুখ দেখলে সে চিনতে পারে না—চোখের নীচে গভীর দাগ, মুখ শুকিয়ে গিয়েছে, ঠোঁটে অদ্ভুত কাঁপুনি। একসময় যিনি সারা শহরের ক্লায়েন্টদের আস্থার জায়গা ছিলেন, আজ তিনি শত্রু।

স্ত্রী বারবার বলছে,
“চলো, আমরা শহর ছেড়ে অন্য কোথাও যাই। গ্রামে থাকব, ছোট কাজ করব। কিন্তু অন্তত বেঁচে থাকব।”

সৌমিক নীরব থাকে। ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব চলছে। পালালে সত্যিই কি রক্ষা পাবে? নাকি এই শহর, এই বাজারই তার নিয়তি?

একদিন সকালে হঠাৎ মধুসূদন বাবু নিজে এসে হাজির হলেন। কণ্ঠে ক্লান্তি।
“সৌমিক, তোকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে না। কিন্তু জানিসই তো, অফিসে তোর নামটা এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্লায়েন্টরা চাপ দিচ্ছে। তাই আমি ভেবেছি, কিছুদিন তুই অফিসে না এলেই ভালো।”

সৌমিক মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে জানে, এটা কেবল ‘কিছুদিন’-এর ব্যাপার নয়। এটা আসলে তার ক্যারিয়ারের ইতি।

সেদিন বিকেলে সে একাই বেরোল। ডালহৌসির রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। ট্রামের ঘণ্টা বাজছে, দোকান খোলা, মানুষের ভিড়—সব কিছু যেন একই রকম, অথচ তার কাছে সব অচেনা। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা চা খেল। দোকানদারও চুপচাপ চা এগিয়ে দিল, আগে যেমন হাসি মুখে গল্প করত এখন আর তা নেই। সমাজের বিচ্ছিন্নতা মানুষকে কীভাবে মেরে ফেলে, আজ সে টের পাচ্ছে।

হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠল। এবার অচেনা নম্বর নয়, অরিন্দম বসুর নিজের নম্বর। কণ্ঠ দুর্বল, কিন্তু বিষে ভরা।
“সৌমিক দা, আমি বেঁচে গেছি। কিন্তু তোমাকে ছাড়ব না। আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। তুমি আমার জীবনের শেষ বিশ্বাসটাকে ধ্বংস করেছ। মনে রেখো, তোমার জীবনেও শান্তি থাকবে না।”

কল কেটে গেল। সৌমিক স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে মানুষের ভিড়, অথচ তার কাছে সব ফাঁকা। মনে হলো, তার জীবনের পথ শেষ হয়ে এসেছে।

রাতে বাড়ি ফিরে মেয়েকে কোলে নিল। রূপা অবাক হয়ে বলল,
“বাবা, তুমি কাঁদছো?”

সৌমিক মাথা নেড়ে বলল,
“না মা, কাঁদি কেন? শুধু একটু ভাবছি।”

কিন্তু চোখের জলে তার বুক ভিজে যাচ্ছিল।

সেদিন রাতে সে একা বারান্দায় বসে পুরোনো কাগজপত্র বের করল। শেয়ার বাজারের পুরোনো রিপোর্ট, নোটবুক, ক্লায়েন্টদের খতিয়ান। একসময় এই কাগজগুলো তার জীবনের গর্ব ছিল। আজ সেগুলোই বোঝা।

একটার পর একটা কাগজ ছিঁড়ে ফেলল। বাতাসে উড়ে গেল কাগজের টুকরো। মনে হলো, তার অতীত ভেঙে যাচ্ছে।

পরের দিন সকালে স্ত্রীর কাছে বলল,
“শুনো, আমি আজকে শেষবারের মতো বাজারে যাচ্ছি। তারপর সব শেষ। আমি আর ব্রোকার থাকব না।”

স্ত্রী আতঙ্কিত হয়ে বলল,
“তুমি কেন যাচ্ছ? যদি আবার আক্রমণ করে?”

সৌমিক শান্ত গলায় বলল,
“আমি পালাতে চাই না। আমি একসময় লড়াই করেছি বাজারের সঙ্গে। আজ যদি শেষও হয়, লড়াই করেই হবে।”

সে বেরোল। ডালহৌসির অফিসে ঢুকল। সবার চোখে বিস্ময়। কেউ ভেবেছিল সে আর ফিরবে না।

সৌমিক সোজা নিজের ডেস্কে গিয়ে বসে পড়ল। কম্পিউটার অন করল। সূচক আবার লাল। বাজার এখনও অস্থির। কিন্তু আজ তার চোখে কোনো ভয় নেই।

অফিসের অন্যরা অবাক হয়ে দেখল—সে হঠাৎ কিছু শেয়ার কিনছে। ছোট কোম্পানির, যেগুলো এখন তলানিতে। কেউ বলল,
“এ কী করছে? এবার তো সব ডুবে যাবে।”

কিন্তু সৌমিক শান্ত গলায় বলল,
“বাজার মানে শুধু ধস নয়, আশা-ও। আমি আজ শেষ লেনদেন করছি। যদি মরে যাই, তবে আশা নিয়েই মরব।”

সন্ধে নামল। অফিস ফাঁকা হয়ে এলো। সে চুপচাপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সূচকের লাল রঙের ভেতরে এক ফোঁটা সবুজ দেখা দিল—কিছু শেয়ার উঠতে শুরু করেছে।

মুখে হালকা হাসি ফুটল। অনেকদিন পর।

বাড়ি ফেরার সময় আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। হাওয়ায় শীতের গন্ধ। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সে একবার চারপাশে তাকাল। অচেনা চোখ, অচেনা ছায়া এখনও আছে। কিন্তু আজ তার ভয় করছে না।

মনে হলো, জীবন যতই অন্ধকারে ডুবে যাক, কোথাও না কোথাও আলো জ্বলে ওঠে।

বাড়ি ফিরে স্ত্রীর হাতে মেয়ের মাথায় হাত রাখল। শান্ত গলায় বলল,
“আজ আমি শেষবার ব্রোকার ছিলাম। কাল থেকে আমি শুধু একজন সাধারণ মানুষ।”

স্ত্রী তার হাত ধরে রইল। রূপা বাবার বুকে মুখ গুঁজে দিল।

বাইরে শহর তখনও ব্যস্ত। বাজারের ধস, উত্থান, গুজব—সবই চলবে। কিন্তু সৌমিক জানল, তার জীবনের শেষ লেনদেন হয়ে গেছে।

সে হয়তো আর কোনোদিন মানুষের ভরসার জায়গা হবে না। কিন্তু অন্তত আজ রাতে সে নিজেকে প্রতারক ভাবছে না।

চোখ বন্ধ করে সে ফিসফিস করল—
“শেষ পর্যন্ত আমি লড়েছি।”

আকাশে চাঁদ তখন আলো ছড়াচ্ছে। যেন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দালালের শেষ লেনদেনের।

WhatsApp-Image-2025-08-26-at-4.32.44-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *