Posted in

শেষ মাইক্রোফোন

Spread the love

সোমশুভ্র লাহিড়ী


“এইবার নামো রে, শেষ চিৎকারটুকু রাখ, মাইক-ফাইক ভাঙিস না,” — পেছন থেকে ডাকল তপন, যাত্রাদলের আলো-ধরা ছেলে।
শম্ভুদা হাত তুলে বললেন, “এই শেষবার, তপন, আরেকটা ডায়লগ বলি।”
মঞ্চে দাঁড়িয়ে শম্ভু সেন, বয়স বাহাত্তর, কাঁপা গলায় বললেন—
“জীবনটাই একটা যাত্রা, কিন্তু থিয়েটারটা? ওটা আত্মার আয়না!”
চারদিক নিস্তব্ধ। দর্শক বলতে গুটিকয়েক লোক, সবাই চেয়ারে হেলান দিয়ে আছে। কেউ মোবাইলে, কেউ ঝিমুচ্ছে। কেউ আবার পানের পিক ফেলতে ফেলতে বলছে, “ওই বুড়োটা এখনও মরে না কেন?”
শম্ভুদা নামলেন মঞ্চ থেকে, হাঁটুর ব্যথায় কুঁজো হয়ে পড়েছেন। কিন্তু চোখে একরকম দীপ্তি। যেন কোনও জয় এসেছে।
তপন বলল, “আর কতদিন এইরকম চলবে, দাদা?”
“ততদিন চলবে, যতদিন গলা আছে, কথা আছে, আর একটা পাগল দর্শকও থাকে,” — জবাব দিলেন শম্ভু।

এই ছিল ‘নবজাগরণ যাত্রাদল’। কাশীপুরের এই পাড়ার পুরোনো গর্ব, এখন অবহেলায় ডুবে আছে। পঞ্চাশ বছর আগে এই দলের ডাক ছিল নদিয়া থেকে মেদিনীপুর। তখনকার শম্ভু সেন ছিলেন নায়ক। কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রের মতো। ‘মহিষাসুর বধ’ নাটকে তাঁর ‘দূর্গা’ চরিত্র কাঁপিয়ে দিত মঞ্চ। এখন? এখন কেউ বলেন, “সিরিয়ালই ভাল, এইসব যাত্রা ফাঁকা আওয়াজ।”
একসময় যে ঘরে সাজঘর ছিল, এখন সেখানে গমের বস্তা রাখা। কস্টিউমগুলো ছেঁড়া, মেকআপের কৌটোয় ঝিঁঝিঁ ঢুকে বসে।

তবে, একটা জিনিস এখনও অটুট—শম্ভুর মনের আগুন।
সে প্রতিদিন ৫টা নাগাদ এসে যাত্রাদলের ঘরে বসে, পুরনো স্ক্রিপ্ট পড়ে, পত্রিকা কেটে নতুন সংলাপ তৈরি করে, সুর মেলায়।
তপন বলে, “কার জন্য এত খাটনি করেন, দাদা?”
“যেই একদিন বলবে—আমি তোমার দলটাতে যোগ দিতে চাই, তখন যেন বলি—এটা মরে যায়নি, এই নাও মঞ্চ, অভিনয় করো।”

এই সময় এলাকায় আসেন এক নতুন স্কুলশিক্ষিকা, রিমা দাশগুপ্ত। সদ্য বদলি হয়ে এসেছেন, বয়স কুড়ি সাত-আট। সাহসী, চোখে রোদচশমা, কাঁধে বস্তার মতো ঝোলা।
তিনি প্রথমে স্কুলের পুরনো ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আলোচনা শুরু করেন—”কেউ যাত্রাপালা দেখেছ?”
সবাই মাথা নেড়ে না।
রিমা হেসে বলেন, “তাহলে তোমরা নিজেদের ইতিহাসটাই জানো না। নাট্য হল আমাদের সমাজ বদলের হাতিয়ার ছিল!”
ক্লাসের শেষদিকে সে বলে, “চলো, একদিন যাত্রা দেখতে যাই।”

সেই সন্ধ্যায় পুরো স্কুলের পঁচিশটা ছেলে-মেয়ে নিয়ে রিমা চলে এলেন ‘নবজাগরণ যাত্রাদল’-এর মঞ্চে।
তপন তো হাঁ হয়ে গেল। এমন ভিড় কতদিন পর দেখেছে!
শম্ভুবাবু তখন মঞ্চে বসে আলো পরীক্ষা করছিলেন। হঠাৎ শিশুদের আওয়াজ শুনে থেমে গেলেন।
রিমা এগিয়ে এসে বললেন,
“আপনি শম্ভু সেন তো? আমি রিমা, স্কুলে পড়াই। এরা আপনার নাটক দেখতে এসেছে।”
শম্ভু বললেন, “এখন তো কিছুই নেই, মেয়ে। যাত্রার দিন ফুরিয়েছে।”
রিমা জবাব দিলেন, “কিন্তু ইতিহাস তো কখনো ফুরায় না। ওদের শেখাতে চাই—‘দৃষ্টিকোণ’ বদলাতে হলে ‘মঞ্চ’ লাগে। আপনি সেটা পারেন।”

রাতেই এক্সটেম্পোর একটা স্ক্রিপ্ট বানানো হল—“সত্যবানের দেশে সাবলেট”।
মিথ ও আধুনিকতা মিলিয়ে রিমা ও শম্ভু লিখলেন এক অভিনব পালা—একদিকে যমরাজ, অন্যদিকে ফ্ল্যাট-বাড়ির মালিক!
চিত্রনাট্যে সব চরিত্রে স্কুলের ছাত্রছাত্রী। শম্ভু শুধু নির্দেশনা দেবেন।
তপন আলো, ধ্বনি, কস্টিউম দেখছে। পুরনো সব জিনিস খুঁড়ে আনা হচ্ছে—সিংহাসন, মুকুট, বাঁশের ঢাক।
রিহার্সাল শুরু হয় স্কুলের মাঠে। প্রথমদিকে ছাত্ররা ভুলে যায় সংলাপ, মেয়েরা হাসে, কেউ কেউ বলে—“এইসব করে কী হবে?”
কিন্তু শম্ভুর ধৈর্য অটুট। তিনি বলে চলেন—”ভুল করো, কিন্তু থামো না। মঞ্চে থামা মানেই মৃত্যু।”

শেষমেশ উৎসবের দিন এলো। নাম দেওয়া হয়েছে—“সমাজ ও যাত্রা: নতুন দৃষ্টিতে নাট্য উৎসব”।
দুপুরে মাঠ ভরেছে—লোকজন এসেছে বাইরের স্কুল থেকেও। প্রশাসনের লোক, সাংবাদিক, এমনকি স্থানীয় বিধায়কও।
শম্ভুবাবু সারাদিন বসে ছিলেন কুলগাছের তলায়। রিমা এসে বলল,
“আপনি সিংহাসনে বসেন না কেন?”
শম্ভু হেসে বলল, “আজ ওরা রাজা-রাণী। আমি দর্শক।”

সন্ধ্যায় যখন ছাত্রছাত্রীরা মঞ্চে ওঠে, আলো পড়ে তাদের মুখে, মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে শম্ভু চোখ বন্ধ করে।
তপন ফিসফিস করে, “দাদা, কাঁদছেন?”
শম্ভু বলে, “না রে… আমি শুনছি… এই হল নতুন গলা। আমার শেষ মাইক্রোফোনটা এবার সত্যিই তুলে নিতে পারে কেউ।”

যাত্রাপালা শেষ হওয়ার পর মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে পুরো দল। স্কুলের মেয়েরা হাতে করে তৈরি মালা পরে এসেছে। কেউ কেউ এসে বলে—“দাদু, আপনি আগে এসব করতেন? একদম থিয়েটারের মতো লাগলো!”
শম্ভু মুখে হাসি টানেন, কিন্তু চোখে পানি জমে।
রিমা কাছে এসে বলে, “শুধু অভিনয় নয়, ওরা ইতিহাস শিখল, সাহস শিখল।”
“আমিও শিখলাম, ম্যাডাম,” শম্ভু মাথা নত করে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম শেষ হয়ে গেছি, কিন্তু আসলে তো… নতুন শুরু।”

পরের দিন স্থানীয় পত্রিকায় একটি রিপোর্ট বেরোয়—
শেষ মাইক্রোফোন নয়, শুরু হল নতুন সংলাপ
নিচে বড় করে ছাপা শম্ভুর ছবি, পাশে রিমার বক্তব্য—“শিল্পের মৃত্যু হয় না, শুধু মঞ্চ বদলায়।”

সেই দিনের পর থেকে যেন হাওয়া বদলাতে থাকে কাশীপুরে।
তপন বলে, “এইযে দাদা, আগে রিহার্সাল করতে বললে কেউ আসত না, এখন স্কুল শেষ হলেই ছেলেমেয়েরা এসে হাজির!”
এক এক করে পুরনো দলের তিন-চারজন আবার ফিরতে শুরু করে। নিতাই ঘোষ, যিনি আলোকসজ্জা করতেন, এখন বাজারে মাছ বিক্রি করতেন, এসে বলে—“একটা বার আবার হাত লাগাতে ইচ্ছে করছে।”
পুরনো কস্টিউমগুলো ধুয়ে নতুন করে সেলাই হচ্ছে।
তিনটি নাট্যরূপ তৈরি হয়—‘আলো মানে আমি’, ‘জনগণের যমরাজ’ আর ‘ভাঙা ঘরের স্বপ্ন’।

তবে উৎসাহের মধ্যেও বাধা ছিল।
স্থানীয় ক্লাবের সেক্রেটারি মদন হালদার এসে বলে,
“এইসব যাত্রা-মাত্রা করে কী হবে, এখন তো ফুটবল-নাচের প্রোগ্রাম চলে। নাটক চালিয়ে আবার ভোটারদের কী দেখাবেন?”
রিমা পাল্টা বলেন, “শুধু ঢাকঢোল বাজানো সংস্কৃতি নয়, মানুষ তৈরির সংস্কৃতি চাই।”
মদন মুখ চেপে হাসে—“তবে চালান, দেখা যাক। আমরা আবার নাটক দেখে ভোট দিই না!”

শম্ভু ততদিনে একটা ইন্টারভিউতে বলেছেন—
“আমরা চাই মঞ্চ সবার জন্য হোক। এই মঞ্চে শ্রমিক থাকবে, শিক্ষক থাকবে, মেয়েরাও থাকবে। এই মঞ্চে রাজনীতি নেই, আছে প্রতিবাদ।”
এই কথা ছড়িয়ে পড়ে। পরের মাসেই আসে শহরের এক নামকরা থিয়েটার গ্রুপ, ‘কালবেলা নাট্যচক্র’।
তাদের নির্দেশক রুহি সেন এসে বলে,
“শম্ভুদা, আমরা শুনেছি আপনি এখনও সক্রিয়। যদি ‘কালবেলা’ আর ‘নবজাগরণ’ মিলে একটা কাজ করি?”
শম্ভুর চোখে জল আসে—“তোমাদের মতো বড় গ্রুপের লোক এসে আমার কাছে কাজ চাইছে?”
রুহি জবাব দেন—“আপনার অভিজ্ঞতা, আর নতুনদের উচ্ছ্বাস—এই মিলটাই আজকের থিয়েটারের ভবিষ্যৎ।”

শুরু হয় যৌথ প্রযোজনা—নাম দেওয়া হয় ‘শেষ মাইক্রোফোন’।
নাট্যরূপ তৈরি হয় শম্ভু ও রুহির যৌথ চিত্রনাট্যে। গল্প এক প্রান্তিক যাত্রাশিল্পীর, যে সব হারিয়েও একদিন তার ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে বদল আনে।
পুরো নাটকে শম্ভু নিজে অভিনয় করেন না, বরং নির্দেশনা দেন।
কিন্তু শেষে এক দৃশ্যে, যখন প্রধান চরিত্র বলে—
“তুমি কি আমার গলা শোনো? আমি তো এখনও চিৎকার করতে জানি!”
— ঠিক সেই সময় স্টেজের পিছন থেকে ভেসে আসে শম্ভুর কণ্ঠ।
এইটুকু ডায়লগেই হাততালির ঝড় ওঠে।

রিমা তখনও অবাক হয়ে ভাবেন—একজন মানুষ কেমন করে তার শেষটুকুও শিল্পে ঢেলে দেয়!
তপন তখন মঞ্চের নিচে দাঁড়িয়ে, ফোনে ভিডিও করছে, যেন এই মুহূর্তটুকু হারিয়ে না যায়।
ছাত্রছাত্রীরা বলছে, “আমাদের দাদুকে তো সিনেমার মত লাগে!”
তবে এই গৌরবের পেছনে একটা ক্লান্তি এসে জড়ায়।

একদিন রিহার্সাল শেষে শম্ভু মাঠে বসে আছে, হঠাৎ রিমা গিয়ে দেখে, উনি নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন।
“শম্ভু দা? শরীর খারাপ?”
শম্ভু চোখ মেলে বলেন, “না রে, রিমা… আসলে ভাবছিলাম—এই জীবনটা যেন একটা দীর্ঘ সংলাপ। কিন্তু শেষ বাক্যটা কে বলবে জানি না।”
রিমা বলে, “শেষ বাক্য হয় না, দা। শুধু মানুষ বদলায়, ভাষা বদলায়, কিন্তু সংলাপ চলতেই থাকে।”
শম্ভু হেসে বলেন, “তুই তো আমার নাটকের ‘সমাপ্তি’ হয়ে উঠলি। আবারও শুরু হতে শিখলাম।”

তবে বাস্তব চুপিচুপি চলে আসে।
একদিন সকালে তপন এসে দেখে, যাত্রাশালার ঘরের তালা বন্ধ।
পাশের দোকানদার বলল, “ভোরে শম্ভু দা-র বুকে ব্যথা উঠেছিল। হসপিটাল নিয়ে গেছে।”
রিমা আর তপন দৌড়ে গেল হাসপাতালে।
ডাক্তার জানায়, “কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। বয়স তো হয়েছে। এখন স্টেবল। দেখাতে পারেন।”

শম্ভু শুয়ে আছেন, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, চোখ বন্ধ। তবু শুনে ফেলেন রিমার গলা।
ধীরে ধীরে চোখ মেলে বলেন,
“রিমা, আজ আবার একটা নতুন নাটক লিখেছি… নাম রেখেছি—‘প্রবীণদের প্রস্থান নেই’। শুনবে?”
রিমা হাত চেপে ধরে বলেন, “আজকে তুমি শুধু বিশ্রাম নাও। বাকিটা আমরা বলব মঞ্চে।”
শম্ভু হেসে বলেন, “তাহলে শেষ মাইক্রোফোনটা এবার তোমাদের হাতে।”

হাসপাতালের জানালার ফাঁক দিয়ে সন্ধ্যার আলো এসে পড়ছিল শম্ভুর মুখে। তার গালের কুঁচকানো চামড়া, থেমে থেমে ওঠানামা করা বুক, আর সেই পুরনো অভ্যাসমতো ডান হাতের আঙুলে অদৃশ্য পাণ্ডুলিপির লাইন টানার ভঙ্গি—সব মিলিয়ে রিমা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যায়, সে এক হাসপাতালে দাঁড়িয়ে। মনে হয় যেন রিহার্সালের ঠিক আগের মুহূর্ত, শম্ভু শেষবারের মতো সংলাপ সাজাচ্ছেন।

তপন পাশে বসে মৃদু গলায় বলে, “রিমা দি, ওনার শরীর তো ভীষণ দুর্বল, তাও কথা বলতে চাইছে।”
রিমা গম্ভীর গলায় জবাব দেয়, “ওঁর গলার শক্তিটুকুই তো ওঁর জীবন। ডাক্তাররা কী বলছেন?”
“একটু রেস্ট নিতে বলেছে। তবে ওঁর হার্ট তো অনেকদিন ধরেই দুর্বল ছিল।”

পরদিন হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে রিমা অনুভব করে, সে শুধু একজন স্কুল শিক্ষিকা নয়—সে এখন এক আন্দোলনের মধ্যবর্তী একজন কাণ্ডারী। যাত্রা, নাটক, সংস্কৃতি—সবই যেন শম্ভু সেন নামক এক অদৃশ্য বাতিঘরের আলোয় নিজেদের খুঁজে পেয়েছে।

তৃতীয় দিনের সকালে শম্ভু ছুটি পায়। তবে খুব দুর্বল। রিমা নিজের স্কুটিতে ওঁকে নিয়ে আসে যাত্রাশালায়, যেটা এখন স্কুলেরই এক্সটেনশন ইউনিট হিসেবে কাজ করছে। দেয়ালে দেয়ালে শিশুদের আঁকা পোস্টার—“সংস্কৃতি বাঁচাও”, “আমরাও অভিনয় করি”, “আমাদের দাদু আমাদের নায়ক।”

শম্ভু দেখে, ‘শেষ মাইক্রোফোন’ নাটকের স্ক্রিপ্ট নিয়ে এখন ছাত্রছাত্রীরাই কাজ করছে। রিমা বলেন, “আপনার অনুপস্থিতিতে ওরা নিজেরাই ডায়লগ সাজিয়েছে, দৃশ্য ঠিক করেছে। শুধু আপনাকে দেখানোর অপেক্ষা।”
শম্ভু আবেগ চেপে বলেন, “এই যে ওরা নিজেরা করছে, এটাই তো আমি চাইতাম।”

মঞ্চে উঠে শম্ভু এক কোণে বসে পড়েন। সেই কল্পনাচিত্রে হারিয়ে যান—যেখানে স্কুলের খুদে অভিনেতারা রাজা, মন্ত্রী, কৃষক, কবি হয়ে উঠে দাঁড়ায় সমাজের মঞ্চে।

তবে বাইরে থেকে সমাজও চোখ রেখে চলেছে এই উদ্যোগে। শহরের এক সাংস্কৃতিক সংস্থার সম্পাদক এসে বলে,
“আপনাদের ‘শেষ মাইক্রোফোন’ আমরা কলকাতার রঙমঞ্চ উৎসবে রাখতে চাই। আপনাদের টিম যদি সম্মত হয়, একটা রাতের শো হবে, বড় দর্শকের সামনে।”

রিমা তো অবাক, তপন চিৎকার করে ওঠে, “শম্ভু দা! কলকাতায় আমাদের নাম উঠছে!”
শম্ভু কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, “আমার ছাত্রদের মঞ্চ পেলে, আমি তো তৃপ্ত।”

এরপর শুরু হয় প্রস্তুতি—রিহার্সালের সময় বাড়ে, কস্টিউম পাল্টায়, কণ্ঠস্বরের টোন নিখুঁত করা হয়। রিমা বলেন,
“এই এক রাতের জন্য আমাদের কয়েক দশকের অপমান মুছে দিতে হবে।”

তবে বাধা আবার আসে। প্রশাসনের এক আধিকারিক আসে দেখে, যাত্রাশালায় স্কুল ক্লাস, নাটক, সব চলছে। সে বলেন,
“স্কুলের কার্যক্রমে নাট্যচর্চা কতটা যৌক্তিক? এর তো অনুমতি নেই!”
রিমা সোজা জবাব দেন, “আমরা শুধু বইয়ের পাঠ নয়, জীবনের পাঠ শেখাই। আর শিক্ষা মানে তো সাহস তৈরি করা।”
তপন বলে, “ওরা ভয় পেয়ে গেছে, দিদি। নাটক সত্যি কথা বলে, আর সত্যি কথা শুনতে মানুষ চায় না।”

এই ঘটনার কিছুদিন পর কলকাতা শহরের বড় হলে শুরু হয় ‘রঙমঞ্চ উৎসব’।
‘শেষ মাইক্রোফোন’ রাখা হয়েছে শেষদিনের শেষ শো-তে।

রিমা ট্রেনিং দিচ্ছিলেন ছাত্রছাত্রীদের—
“স্টেজে উঠে ভয় পাবে না। মনে রেখো, এই নাটক শুধু অভিনয় নয়, এটা প্রতিবাদ, স্মৃতি আর স্বপ্নের গল্প।”
তপন আলো আর সাউন্ড সামলাচ্ছে। কলকাতার থিয়েটার টেকনিশিয়ানরা অবাক—“তুমি তো পুরো প্রফেশনালের মতো কাজ করছো!”
তপন হেসে বলে, “শম্ভু দা-র সঙ্গে থাকার মানেই তো শেখা। আমরা তো স্টুডেন্ট, দাদা আমাদের টিচার। তবে পাঠ্যপুস্তক ছাড়াই।”

মঞ্চে যখন ‘শেষ মাইক্রোফোন’ শুরু হয়, তখন দর্শকের ভিড় হল উপচে পড়ছে। সাংবাদিক, থিয়েটার সমালোচক, নাট্যকার—সবাই এসেছে দেখতে এই গ্রামীণ দলের শহরে আগমন।

নাটকে যে মুহূর্তে শিশু-কণ্ঠে সংলাপ আসে—
“আমরা শেষ প্রজন্ম নই, আমরা নতুন সূচনার কণ্ঠস্বর!”
—সেই সময় হাততালির ঝড় ওঠে।

শেষ দৃশ্যে, যেখানে শম্ভুর ভয়েসওভার আসে—
“আমি শেষ মাইক্রোফোন, কিন্তু তোমরা হইয়ে উঠো নতুন শব্দ—যা থামবে না কখনো।”
—সেই মুহূর্তে পুরো হল দাঁড়িয়ে যায়। কেউ চোখ মুছছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ স্রেফ নিশ্চুপ।

নাটক শেষে শম্ভু ধীরে ধীরে হুইলচেয়ারে এসে মঞ্চের সামনে দাঁড়ান।
সব ছাত্রছাত্রী, রিমা, তপন তাঁকে ঘিরে ধরে। রিমা বলে,
“দেখলেন তো, শেষ বলেও কিছু হয় না। আপনি তো শুরু হয়ে গেলেন আমাদের ভেতর।”
শম্ভু মৃদু হেসে বলেন, “তবে এবার সত্যি আমার সংলাপ শেষ… বাকিটা তোমাদের মুখে থাকবে।”

দর্শকদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ সমালোচক বলেন,
“আজ আমি যাত্রার জীবনের শেষ অধ্যায় নয়, নবজন্ম দেখলাম। এই কিশোররাই নতুন নাট্যশিল্পী। আর শম্ভু সেন? উনি তো বাংলা নাটকের শেষ মাইক্রোফোন নয়, প্রথম বাতিঘর।”

উৎসব থেকে ফেরার পরদিন সকালে কাশীপুর যেন আলাদা একটা আলোয় জেগে উঠেছিল। স্টেশন থেকে স্কুল পর্যন্ত যে রাস্তা আগে পলিথিন, পানের পিক আর ছোট ছোট ঝামেলার কথাই বলত, আজ সেই পথের ধারে দেখা গেল রংতুলিতে আঁকা পোস্টার—
নবজাগরণ ফেরেযাত্রায় নয়, জীবনে!”
শেষ মাইক্রোফোন এখনও বাজে!”

রিমা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে এক বৃদ্ধা তাঁকে থামিয়ে বললেন, “আপনিই না রিমা মেমসাহেব? সেই যাত্রার! ওই যে খবরের কাগজে ছবি ছাপা হয়েছিল?”
রিমা মুচকি হেসে বলল, “না, আমি কিছুই নই। সব করেছেন শম্ভু দা আর আমাদের ছেলেমেয়েরা।”
বৃদ্ধা বললেন, “ওনাকে নমস্কার জানাবেন। আগে যাত্রা মানে ছিল গালিগালাজ, এখন আবার শুনি শিশুরা অভিনয় করছে!”

স্কুলে ঢোকার সময় তপন এসে দৌড়ে বলল, “রিমা দি, আপনি শুনেছেন তো? কলকাতা থেকে লোক এসেছে। বলছে—শম্ভু দা-কে থিয়েটার অ্যাকাডেমির সম্মান দেবে!”
রিমা চমকে ওঠে।
“সত্যি? এতবছর ওনার কিছুই হয়নি… আর এখন?”
তপন মাথা নেড়ে বলে, “হয়তো ওঁর শেষ সময়ে এসে প্রাপ্যটা পাচ্ছেন। কিন্তু দিদি, উনি তো খুব চুপচাপ হয়ে গেছেন আজকাল।”

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শম্ভু নিজের পুরোনো বাড়িতে একা থাকছেন। কারও উপর নির্ভর করতে চান না। রিমা, তপন, এমনকি ছাত্ররাও তাঁকে বাড়িতে খাবার দিয়ে যায়, গল্প করে, নাটকের বই এনে দেয়।
তবু শম্ভুর চোখে একটা অপার শূন্যতা ভাসে।

এক সন্ধ্যায় রিমা গিয়ে দেখে, উনি পুরনো নীল খাতা খুলে বসে আছেন। সেখানে পাতা ভরা সংলাপ, নাট্যরূপরেখা, চরিত্র বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে যেন একটা বেঁচে থাকার ইতিহাস।
রিমা ধীরে এসে বলেন, “শম্ভু দা, চলুন একদিন স্কুলে আসুন। সবাই আপনাকে খুব মিস করছে।”
শম্ভু ধীরে মাথা নাড়ে—“রিমা, আমি ভাবছি, এবার সব তোমাদের হাতে ছেড়ে দিই। আমি শুধু একটা কাজ করতে চাই।”
“কি কাজ?”
“আমার সব লেখা, নাটকের স্ক্রিপ্ট, নির্দেশনা, ইতিহাস—সব একটা আর্কাইভে তুলে রেখে যেতে চাই। যাতে ভবিষ্যতের কেউ জানতে চায়—কাশীপুরে একদা এক পাগল নাট্যশিল্পী ছিল—সে যেন খুঁজে পায়।”

রিমার চোখে জল আসে।
“তুমি শুধু নাট্যকার নও, তুমি ইতিহাস হয়ে গেলে, দা।”

এরপর কয়েক সপ্তাহ চলে শম্ভুর স্মৃতির খোঁজ। রিমা, তপন, স্কুলের ছেলেমেয়েরা মিলে খুঁজে আনে পুরনো পোস্টার, স্লাইড প্রজেকশন, ক্যাসেট, হ্যান্ডবিল।
তপন স্কুলের কম্পিউটার ক্লাসের স্যারকে দিয়ে ডিজিটাল আর্কাইভ বানায়—নাম দেওয়া হয় শম্ভু সেন থিয়েটার সংগ্রহশালা

এরই মাঝে কলকাতা থেকে থিয়েটার অ্যাকাডেমির আমন্ত্রণপত্র আসে—
বাংলা নাট্যচর্চায় অমর অবদানের জন্য শম্ভু সেনকেজীবনব্যাপী শিল্পসম্মানপ্রদান করা হবে।

নবজাগরণ যাত্রাশালায় উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়। ছেলেমেয়েরা মঞ্চ সাজাচ্ছে, তপন আলো পরীক্ষা করছে, রিমা কবিতা লিখছে ‘শম্ভুর জন্য’।
শম্ভু প্রথমে যেতে চান না। বলেন, “সম্মান তো আগেই পাওয়া উচিত ছিল। এখন তো শরীরই বলে না।”
রিমা জোর করে বলেন, “আপনার চুপ করে বসে থাকাটা অসম্মান হবে ওই সম্মানটার জন্য।”

শেষমেশ, সংবর্ধনার দিন—শম্ভুকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতার নন্দন চত্বরে।
হুইলচেয়ারে বসে, পেছনে তার ছাত্রছাত্রীরা—সবাই একই রঙের পাঞ্জাবি আর শাড়ি পরে এসেছে। যেন এক যাত্রার দল নয়, এক যাত্রার পরিবার।

মঞ্চে যখন শম্ভুর নাম ডাকা হয়, তখন গ্যালারি থেকে উঠে আসে সংলাপ—
আমি শেষ মাইক্রোফোনকিন্তু আমার কণ্ঠ যে এতগুলো মুখে বাজে!”
—তপনের গলা, কিন্তু যেন গোটা কাশীপুরের কণ্ঠস্বর।

সম্মান গ্রহণ করার সময় শম্ভু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলে ওঠেন—
“একটা কথা বলতে চাই… সংলাপ থামানো যায়, কণ্ঠস্বর দমন করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস? সে বাঁচে অন্যদের কণ্ঠে। আমি সেই বিশ্বাস রেখে যাচ্ছি রিমা আর ওদের ওপর। আমার ছাত্ররা, আমার স্বপ্নরা।”

প্রচণ্ড হাততালি। চোখের কোণে জল। শহরের থিয়েটারও মাথা নোয়ায় এক গ্রামীণ শিল্পীর কাছে।

ফিরে এসে কাশীপুরে আরও বড় নাট্য উৎসব হয়—
শম্ভু সেন নাট্য সপ্তাহ
যেখানে শুধু যাত্রা নয়, আধুনিক নাটক, লোকনাট্য, বাউল গান—সবই স্থান পায়।

রিমা ততদিনে স্কুলের পাশাপাশি কাশীপুর নাট্যকেন্দ্রের পরিচালক হয়েছেন। তপন হয়েছে টেকনিক্যাল ইন্সট্রাক্টর।
আর শম্ভু? তিনি প্রায়ই এসে এক কোণে বসে থাকেন। আরেকবার চোখে চোখ রাখেন সেই আলোর সাথে, যেখানে একদিন তিনি দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—
জীবনটাই একটা যাত্রা।

সেই সন্ধ্যেটা ছিল আশ্বিন মাসের, বাতাসে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। কাশীপুর নাট্যকেন্দ্রের মাঠে আলো ঝলমলে অনুষ্ঠান চলছে—‘শম্ভু সেন নাট্য সপ্তাহ’-এর চতুর্থ দিন। কচিকাঁচা থেকে বৃদ্ধ, স্কুল শিক্ষক থেকে হাটের কুলিও, সব্বাই এসে জড়ো হয়েছে আজকের বিশেষ আয়োজন: একটি সংলাপের ইতিহাস—নাটক, আলোচনা, স্মৃতিচারণ সব মিলিয়ে একটি সন্ধ্যা।

মাঠের এক কোণে একটি দড়ির বেড়া দেওয়া জায়গায় বসে আছেন শম্ভু সেন। আজ আর হুইলচেয়ারেও না, একটা মোটা বেতের চেয়ার। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আছেন, গলায় তুলোর গামছা। চোখে ঘোলা চশমা, হাতে পুরনো খাতা।
তাঁর সামনে দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা ছোটাছুটি করছে—মঞ্চ সাজানো, সাউন্ড টেস্ট, শেষ মুহূর্তের সংলাপ মুখস্থ।
তপন এসে জিজ্ঞেস করল, “দাদা, কিছু দরকার?”
শম্ভু মাথা নাড়িয়ে বলেন, “এই বসেই ভালো লাগছে। সবাই এত ব্যস্ত, যেন আমিই বাড়তি হয়ে গেছি। কেমন লাগে জানিস, তপন? এই প্রথম মনে হচ্ছে, আমি দর্শক।”
তপন একটু থেমে বলে, “আপনি যদি না থাকতেন, তাহলে এই সবটাই তো থাকত না।”
শম্ভু হেসে বলেন, “ঠিক। কিন্তু এটা তো চাই-ই—একদিন গাছ সরে যাবে, ছায়া রয়ে যাবে।”

রিমা তখন মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে, মাইক্রোফোন হাতে। গলায় কাঁপুনি স্পষ্ট, কিন্তু চোখে কঠিন দৃঢ়তা।
“আজকের এই সন্ধ্যা শুধুই নাটকের জন্য নয়, আজকের সন্ধ্যা এক বিশ্বাসের, এক মানুষের, এক কণ্ঠস্বরের জন্য… যার নাম শম্ভু সেন। আমাদের দাদু, আমাদের পথপ্রদর্শক।”
হাততালির গর্জন ওঠে। কিছুটা দীর্ঘ, কিছুটা থেমে থেমে—যেন শব্দ দিয়েই লোকজন বলছে: আমরা তোমাকে চিনি, তুমি আমাদের গল্পে আছো।

এরপর শুরু হয় মূল নাটক—‘একটি সংলাপের ইতিহাস’। পুরো নাটকটি গড়ে উঠেছে শম্ভু সেনের জীবনের খণ্ড খণ্ড মুহূর্ত নিয়ে। তাঁর প্রথম যাত্রার দিন, প্রথম সংলাপ, প্রথম প্রেম—সবই একদম সত্যি গল্পের মতো। চরিত্রে অভিনয় করছে স্কুলের বর্তমান ছাত্র, প্রাক্তনী, এমনকি কয়েকজন গ্রামবাসীও।

সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ আসে যখন নাটকের শেষ দৃশ্যে, এক ছাত্র যিনি ‘শম্ভু সেন’-এর ভূমিকায় আছেন, সংলাপ বলেন—
“যখন আমি আর থাকব না, তখনও যদি কেউ আমার কথাগুলো মনে রাখে—তাহলে আমি হারব না। আমি তো শুধু কণ্ঠ, কিন্তু কণ্ঠ তো বাতাসেই ভাসে।”
এই সংলাপ শেষ হতেই প্রকৃত শম্ভু সেন উঠে দাঁড়ান নিজের চেয়ার থেকে, মঞ্চের দিকে হাত তোলেন। কেউ জানত না, এই মুহূর্তটি নাটকের নয়, বাস্তবের।

তপন ছুটে যায় ওনার পাশে।
“দাদা, মঞ্চে যাবেন?”
শম্ভু ধীরে বলেন, “না রে, মঞ্চে যাওয়ার দরকার নেই। এই আলোটা আমার গায়ে লাগুক… এই শব্দটা আমার কানে থাকুক। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিনয় এই যে আমি আর অভিনয় করছি না।”

রিমা এসে বলেন, “আপনি আমাদের শিক্ষক। আজকের সবটুকু আপনার জন্য।”
শম্ভু বলেন, “তুমি তো এখন শিক্ষক, রিমা। আমি তো আমার চরিত্র শেষ করেছি।”
রিমা জবাব দেয়, “তবে পরের দৃশ্য আপনার জন্য আমরা সবাই তৈরি রাখছি।”

রাত বাড়ে। অনুষ্ঠান শেষ হয়। ধীরে ধীরে ভিড় পাতলা হয়। তপন শম্ভুকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
চুপচাপ একটা রাত। আকাশে চাঁদের পাশে একতারা মতো ঝুলে থাকা তারা। শম্ভু বারান্দায় বসে ছিলেন চাদর গায়ে। খাতার একটা পাতা ছিঁড়ে নিচে নামিয়ে দিলেন।
লেখা ছিল—
শেষ সংলাপ হয় না, শুধু শ্রোতা বদলায়।

পরদিন সকালে রিমা একটা ফোন পায়।
তপনের কণ্ঠস্বর ভারী, অনুচ্চ।
“রিমা দি… শম্ভু দা আর নেই।”
এক মুহূর্তে রিমা থমকে যায়। যেন শব্দ থেমে যায় চারপাশে।
“রাতে ঘুমের মধ্যেই… চোখ বন্ধ করে চলে গেছেন। পাশে খাতা খোলা ছিল। শেষ পৃষ্ঠায় একটা লাইন—
‘আজ আর কণ্ঠ নয়, নিঃশব্দই আমার নাট্যশেষ।’”

দিনটা নিঃশব্দে কেটে যায়।
স্কুল, যাত্রাশালা, নাট্যকেন্দ্র—সব জায়গা যেন এক অদৃশ্য অন্ধকারে ঢাকা পড়ে।
তবু সন্ধ্যায়, ঠিক তাঁর ইচ্ছেমতো, কোনোরকম ধর্মীয় আচার নয়, হয় এক স্মৃতিচারণ পর্ব।
মঞ্চে শুধু রাখা হয় একখানা খালি মাইক। তার পাশে খাতাটা, আর পাশে চেয়ার।
সবাই এসে বসে, কথা বলে, সংলাপ পড়ে—একটি মানুষকে ফিরে পাওয়ার মতো করে।

তপন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলে—
“আজ থেকে এই মাইক আমাদের জন্য নয়, এটা শম্ভু দা’র জন্য। আমরা সবাই যার কণ্ঠে কথা বলি, তিনি থাকবেন এখানেই।”

শেষে রিমা এসে ধীরে গলা নামিয়ে বলেন,
“এই নাটকের নাম ছিল শেষ মাইক্রোফোন… কিন্তু আমরা জানি, এই শব্দ শেষ হবে না।”

কাশীপুরের সেই সন্ধ্যার পর থেকে যেন সময় একটু একটু করে থমকে গেছে। কেউ আর নাটকের শব্দে চমকে ওঠে না, কেউ আর যাত্রাশালার দিকে ফিরে চায় না যেমনটা আগের দিনে হতো, আবার কেউ কেউ এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে নাট্যকেন্দ্রের ঠিক বাইরের লাল ইটের বেঞ্চিতে, যেখানে একদিন হুইলচেয়ারে বসে শম্ভু সেন নীরব হয়ে থাকতেন।

তাঁর মৃত্যুর পর রিমা একদিন স্কুলে ঘোষণা করেন—“এই বছরের নাট্য উৎসব শুধু আর এক অনুষ্ঠান নয়, এটা শম্ভু সেন স্মৃতি উৎসব। এবার থেকে প্রতি বছর, এই স্কুল, এই মাঠ, এই নাট্যকেন্দ্র—সব মিলে আমাদের শিখিয়ে যাবে, কীভাবে একটা কণ্ঠ চিরকাল বেঁচে থাকে।”

স্কুলের ছেলেমেয়েরা জানে না ঠিক কেমন ছিল শম্ভু সেনের যৌবন, কিন্তু তারা জানে, তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি বলতেন—“ভয় পেও না, শব্দ যদি সত্য হয়, তাহলে সমাজ কেঁপে উঠবেই।”

তপন ততদিনে পুরোপুরি নাট্যকেন্দ্রের পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। সে অদ্ভুতভাবে পাল্টে গেছে—এক সময়ের চটপটে আলো-ধরা এখন হয়ে উঠেছে গুরুগম্ভীর নির্দেশক। পুরনো মঞ্চটার কাঠের ফ্লোর এখন নতূন ভাবে পালিশ করা, কুলগাছের নিচে বসার জায়গা করা হয়েছে দর্শকদের জন্য।

তপনের ইচ্ছে, নাট্যকেন্দ্র থেকে একটা ছাপাখানা খোলা হবে, যেখানে গ্রামীণ থিয়েটারের স্ক্রিপ্ট ছাপানো হবে।
রিমা পাশে এসে বলে, “তুই চাইলে আমি ফান্ডিংয়ের চেষ্টা করব। সরকারি অনুদানও লাগতে পারে।”
তপন মুচকি হেসে বলে, “আমরা যে জীবন দিয়ে নাটক করি, তাতে ফান্ডিং আসে দেরিতে। আগে শব্দ ছড়াক, টাকা তারপরে।”
রিমা বলে, “শব্দ তো ছড়িয়েছে, এখন গেঁথে রাখার সময়।”

এইভাবে একদিন সন্ধ্যায় তপন ও রিমা বসে ‘শেষ মাইক্রোফোন’ নাটকের স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করছিল।
রিমা বলেন, “ভাবছো কেন?”
তপন বলে, “চিন্তা করছি—শম্ভু দার সংলাপগুলোর সাথে আধুনিক বাচনভঙ্গির ফারাক কতখানি? নতুন প্রজন্ম কীভাবে নেবে?”
রিমা একটু থেমে বলে, “ভাষা বদলাবে। কিন্তু অনুভব বদলায় না। যে সংলাপ বলে—‘আমি শেষ মাইক্রোফোন’, সেটা তো নিজেই এক সময় অতিক্রম করে যাওয়া সত্য। ওটা কোনো যুগে আটকে থাকবে না।”

সেই বছর ‘শেষ মাইক্রোফোন’ নতুন প্রজন্মের অভিনয়ে আবার মঞ্চস্থ হয়। তবে এইবার প্রথমবারের মতো, নাটকের শেষে এক খালি চেয়ার ও একটি রেকর্ডিং বাজানো হয়—শম্ভু সেনের কণ্ঠে তাঁর সেই চিরকালীন সংলাপ—
আমি শেষ মাইক্রোফোন, কিন্তু কণ্ঠ তো বাতাসেই ভাসে…”
—হলজুড়ে নিস্তব্ধতা। যেন সব দর্শক শোনার জন্য কান পেতে আছে—আছে কি কেউ, যে এই কণ্ঠের উত্তর দেবে?

সেই সন্ধ্যায় নাটকের পর, এক তরুণী দর্শক এগিয়ে এসে বলে, “রিমা দিদি, আমি থিয়েটারে পড়ছি, কলেজে। আমি চাই, এখানে থেকে কাজ করি। কিছু শিখতে চাই।”
রিমার চোখে জল আসে।
“নাম কী তোমার?”
“মৌসুমি,” বলে সে।
রিমা হাত ধরে বলে, “তোমরা তো শম্ভু দার উত্তরসূরি। এসো, এই শব্দধারায় নাম লিখে ফেলো।”

ততদিনে কাশীপুর নাট্যকেন্দ্র শুধু আর একটি নাট্যচর্চার জায়গা নয়, একরকম আন্দোলন। শহরের থিয়েটার গ্রুপগুলো এখানে রিহার্সাল করে, সেমিনার হয় ‘গ্রামীণ নাট্য ভাষা ও প্রতিরোধ’, ওয়ার্কশপে শেখানো হয় আলো-ধ্বনি-চরিত্র নির্মাণ।

একদিন, এক সাংবাদিক এসে রিমার ইন্টারভিউ নেন। প্রশ্ন করেন, “শম্ভু সেন যদি আজ থাকতেন, এই পরিবর্তন দেখে কী বলতেন বলে মনে হয়?”
রিমা থেমে বলেন,
“উনি হয়তো বলতেন—‘ভালো হচ্ছে। কিন্তু সাবধান, সত্যের কণ্ঠ যেন আবার কারও হাতে বন্দি না হয়।’”

সেই ইন্টারভিউটা ছাপা হয় নামি পত্রিকায়—
যাত্রা থেকে যাত্রাকাশীপুরের বিপ্লবী নাট্যআলো
—পাশে একটা ছবি, যেখানে এক খালি মঞ্চে পড়ে আছে একটি মাইক্রোফোন, একধারে চেয়ারে রাখা শম্ভু সেনের খাতাখানি।

এরপর কয়েকমাস পর, কলকাতার নন্দনে আয়োজন হয় শম্ভু সেন স্মরণে তিন দিনের নাট্য উৎসব। তপন, রিমা ও কাশীপুর দলের তরফে একটি নতুন নাটক হয়—
নাটকের নাম: শব্দরথ
চিত্রনাট্য: শম্ভু সেনের জীবনের অলিখিত অধ্যায়।
শেষ দৃশ্যে একজন বৃদ্ধ অভিনেতা, হুইলচেয়ারে বসে, চোখ বন্ধ করে বলেন—
তুমি যদি মনে রাখো, তবে আমি এখনও বেঁচে আছি। কারণ আমি ছিলাম শুধু একজন মঞ্চকর্মী না, আমি ছিলাম একটি কণ্ঠ।

অভিনয়ের পর দর্শকেরা উঠে দাঁড়ায়। কেউ কেউ কাঁদে, কেউ মাথা নিচু করে প্রণাম জানায়।
মঞ্চের পেছন থেকে রিমা ও তপন দাঁড়িয়ে থাকেন, একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকান—এই তো উত্তর এসেছে।

আলো নিভে যায়। শুধু একটা মাইক পড়ে থাকে মঞ্চের কেন্দ্রে, আর দূরে বাজতে থাকে এক পুরনো রেকর্ডিং—
শেষ মাইক্রোফোনশেষ নয়। আমি বাতাসে ভাসি। তুমি যদি বলো, আমি আবার বাজি।

শম্ভু সেনের মৃত্যুর এক বছর পর, কাশীপুর নাট্যকেন্দ্র তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাট্যপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। নাম রাখা হয়—শম্ভু সেন নাট্যচর্চা কেন্দ্র। নতুন ভবন হয় না, পুরনো যাত্রাশালাকেই বদলে ফেলা হয়—মাটির দেয়ালে কচিকাঁচাদের আঁকা পোস্টার, কাঠের দরজার ওপর খোদাই করা লেখা—“সংলাপ যেখানে থামে, সেখানে শুরু হয় নতুন চিন্তা।”

রিমা এখন এখানকার অধ্যক্ষতুল্য, যদিও নিজের পরিচয় দেন ‘সহ-অভিনেত্রী’ হিসেবে। তপন দেখভাল করছে সমস্ত কারিগরি দিক—আলো, ধ্বনি, প্রজেকশন, এমনকি পোস্টার ডিজাইন। নাট্যকেন্দ্রের সদস্যসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। স্কুলের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে শহর থেকে আসা নাট্যপ্রেমী যুবকেরাও এখানে এসে নিয়মিত নাট্যচর্চা করে।

এই নতুন পর্বে রচিত হয় একটি নাট্যচক্র—কণ্ঠ। উদ্দেশ্য একটাই: শম্ভু সেনের দর্শনকে নতুন প্রজন্মের ভাষায় ছড়িয়ে দেওয়া। প্রতি মাসে নতুন নাটক, নতুন মুখ, নতুন ভাষ্য—তবু ভিতরে একটিই মূলসুর—প্রতিবাদ করতে হলে ভাষা শানাতে হয়, আর ভাষা আসে মঞ্চ থেকে।

নতুন ছেলেমেয়েরা যখন নাটকে অভিনয় শেখে, তখন তাদের প্রথম দিন রিমা একটি অনুশীলন করান—
তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকবে এক সারিতে, আর রিমা বলবেন:
“আমি শেষ মাইক্রোফোন…”
সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে বলতে হয়—
“…তুমি যদি বলো, আমি আবার বাজি।
এই ছেলেমেয়েরা জানে না পুরনো দিন, জানে না যাত্রাশালার ভাঙা কাঠ, জানে না শম্ভুর কণ্ঠের গর্জন—তবু তারা জানে একটা বিশ্বাস।

একদিন বিকেলে তপন রিমাকে ডাকে, হাতে পুরনো একটা চিঠি।
“দেখো তো, দিদি। এইটা শম্ভু দা’র আলমারি থেকে পাওয়া।”
চিঠির উপরে লেখা—রিমার জন্য, যখন আমি আর থাকব না।

রিমা নিঃশব্দে খুলে পড়ে—

“রিমা,

_যদি কখনও কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কেন যাত্রা ছাড়িনি—তখন বলবে, আমি কণ্ঠ ছাড়তে পারিনি।

_যদি কেউ বলে, এই নাটকের কী দাম আছে—তখন বলবে, দাম নয়, দৃষ্টিভঙ্গিই তো বদলে যায় নাটকে।

_আর যদি একদিন, মঞ্চ ফাঁকা থাকে, দর্শক না আসে, আলো নিভে যায়—তখন তুমি উঠে দাঁড়াবে।

_তুমি বলবে, ‘আমি শেষ মাইক্রোফোন, আর আমি বাজছি।’

_—শুভেচ্ছায়,
তোমার দাদু, শম্ভু”

রিমার চোখ দিয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। হাতে সেই চিঠি নিয়ে সে নাট্যকেন্দ্রের মঞ্চে উঠে দাঁড়ায়, যেখানে rehearsal চলছিল। সবার সামনে সে চিঠিটা পড়ে শোনায়।
শেষে দাঁড়িয়ে বলে—
“এই চিঠিটা শুধু আমার জন্য নয়, আমাদের সবার জন্য। আমরা কেউই একা নই, কারণ শম্ভু দা আমাদের ভিতরেই রয়েছেন।”

তারপর থেকে নাট্যকেন্দ্রে একটা নতুন রীতি চালু হয়—
প্রতি নতুন নাটক শুরু হওয়ার আগে, একটা মুহূর্ত রাখা হয় ‘নীরব সংলাপ’-এর জন্য।
মঞ্চে আলো নিভে যায়, একটা খালি চেয়ার রাখা থাকে, আর অডিওতে বাজে শম্ভু সেনের সেই কণ্ঠ—
আমি শেষ মাইক্রোফোনকিন্তু কণ্ঠ তো বাতাসেই ভাসে।
—এই নিঃশব্দ সম্মানেই শুরু হয় প্রতিটি নতুন নাটকের যাত্রা।

এই সময় একটি বড় সুযোগ আসে। কলকাতার নামী একটি থিয়েটার ফেস্টিভ্যালে আমন্ত্রণ আসে কাশীপুর নাট্যকেন্দ্রের—‘আন্তর্জাতিক গ্রামীণ থিয়েটার সম্মেলন’।
তাদের অনুরোধ:
“আপনারা ‘শেষ মাইক্রোফোন’ নাটকটি আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে আবার পরিবেশন করুন। সঙ্গে চাই শম্ভু সেন নাট্যদর্শন নিয়ে একটি বক্তৃতা।”

তপন একটু দ্বিধা করে বলে, “আমরা কি পারব রিমা দি? ভাষার সীমা আছে তো।”
রিমা হেসে বলেন, “যেখানে শব্দের সীমা, সেখানে ভঙ্গিমা, চোখ, দৃষ্টি কথা বলে। থিয়েটার তো কোনো একটি ভাষার নয়, এটা তো অনুভবের।”

নতুন রিহার্সাল শুরু হয়। এবার সম্পূর্ণ নাটকটি দু’টি ভাষায়—বাংলা ও ইংরেজিতে।
মৌসুমি ও তার দল অনুবাদ করে শম্ভু সেনের সংলাপ, কিন্তু কোনো সংলাপেই আঘাত পড়ে না।
তারা শিখেছে—কথার মধ্যে কণ্ঠ থাকে না, কণ্ঠ থাকে অভিপ্রায়ে।

শেষ মুহূর্তে তপন মঞ্চের এক কোণে বসে বলে, “দিদি, আজ যদি শম্ভু দা থাকতেন?”
রিমা বলে, “তিনি তো আছেন। দেখ না, ওদিকের আলোটা ঠিক উনার মতো জ্বলছে।”

কলকাতার মঞ্চে যখন ‘শেষ মাইক্রোফোন’ আবার উপস্থাপিত হয়, তখন সেই মঞ্চে শুধু অভিনয় নয়, ইতিহাসও হয়।
শেষ দৃশ্যের পর, যখন সকলেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে, মঞ্চে বাজে শম্ভু সেনের রেকর্ডিং—
তুমি যদি বলো, আমি আবার বাজি।
—তখন পুরো প্রেক্ষাগৃহ দাঁড়িয়ে যায়। বিদেশি প্রতিনিধিরাও চোখের জল চেপে বলেন, “We didn’t understand the language, but we understood the soul.”

মঞ্চে রিমা উঠে দাঁড়ায়, বলে—
“This story is not about an old man and his theatre. It is about all those voices that never got a mic. Today, we carry them within us.”

হাততালির ঝড়।
আন্তর্জাতিক থিয়েটার সংস্থা থেকে ঘোষণা আসে—শেষ মাইক্রোফোন-কে Global Indigenous Theatre Award দেওয়া হবে।

রাতের কলকাতা, মঞ্চের বাইরের ছায়া, ক্যামেরার ঝলকানি—এই সবের মাঝখানে তপন রিমাকে বলে—
“এই তো দিদি, আমাদের কণ্ঠ বাতাস ছাড়িয়ে এখন আকাশ ছুঁয়েছে।”
রিমা মুচকি হেসে বলে—
“তবে এবারও মঞ্চ ফাঁকা রাখা হবে, চেয়ারটা থাকবে, আর বাজবে সেই পুরনো কণ্ঠ—
আমি শেষ মাইক্রোফোন…’

আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার পর ‘শেষ মাইক্রোফোন’ আর শুধু একটি নাটক থাকল না—এটি হয়ে উঠল এক আন্দোলনের নাম, এক চিন্তার মঞ্চ, এক কণ্ঠস্বর যা প্রান্তিক মানুষের গল্প বলে। কলকাতা, শিলিগুড়ি, রাঁচি, আসানসোল, এমনকি অসম ও বাংলাদেশেও ‘শেষ মাইক্রোফোন’ পরিবেশিত হতে লাগল স্থানীয় অনুবাদে, স্থানীয় মুখে। নাটকটা যেন ভাষা বদলাচ্ছে, কিন্তু প্রাণ বদলাচ্ছে না।

এইসবের মধ্যেই রিমা একদিন নাট্যকেন্দ্রের অফিস ঘরে বসে খেয়াল করলেন, মেইলে এসেছে আরও একটি আমন্ত্রণ—“Japan Asian Community Theatre Collective” থেকে।
চিঠিতে লেখা—

We are deeply moved by your theatre model, particularly how ‘Shesher Microphone’ uses collective voice and indigenous culture to build resistance and identity. We invite your team to perform and lead a workshop in Tokyo.

রিমা চুপ করে বসে থাকেন মিনিট পাঁচেক। তারপর তপনকে ফোন করেন, “তোকে একটা জায়গা দেখাতে হবে।”
তপন বলে, “আজ তো রিহার্সাল আছে।”
রিমা বলে, “রিহার্সাল রইল, আগে একটা নতুন নাটকের জন্য লোকেশন দেখে আসা যাক।”

তারা যায় কাশীপুরের একেবারে বাইরে, ছোট্ট একটা ধানের মাঠের পাশে পুরনো কাঠের ঘর। শম্ভু সেনের প্রথম নাটক এই ঘরের উঠোনেই হয়েছিল, সেই আশির দশকে। এখনও দরজার ওপরে কালি মেখে লেখা—“উৎসর্গ: যাত্রা, জীবন ও স্বাধীনতা।”
রিমা চুপ করে দাঁড়িয়ে বলে, “আমি এই জায়গাটাকে রক্ষা করতে চাই, তপন। আমরা এখানে একটা নাট্য জাদুঘর বানাব।”
তপন চোখ বড় করে বলে, “তুই পাগল! টাকাপয়সা কোথা থেকে আসবে?”
রিমা বলে, “টাকা পরে আসবে। আগে চিন্তা আসুক, তারপর তাতে ভাষা দিই, আর শেষে মঞ্চ।”

এভাবেই শুরু হয় শম্ভু সেন থিয়েটার আর্কাইভ অ্যান্ড মিউজিয়াম-এর যাত্রা।
সোশ্যাল মিডিয়াতে ক্যাম্পেইন হয়—“একখানা পুরনো খাতা দান করুন, একটা কণ্ঠ রক্ষা পাবে।”
দেশ-বিদেশ থেকে আসতে থাকে সহানুভূতি, স্ক্রিপ্ট, পোস্টার, ভিডিও।

রিমা চিঠি লেখেন শিল্পীদের—

আমরা শম্ভু সেনের স্বপ্নটা ধরে রাখতে চাই। আপনাদের কোন পুরনো স্ক্রিপ্ট, যাত্রার ফটোগ্রাফ, রেকর্ডিং থাকলে পাঠান। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক, নাটক কীভাবে বাঁচায় মানুষকে।

এরই মাঝে তৈরি হয় এক নতুন প্রজেক্ট—হাওয়ায় কণ্ঠ—এক চলমান ভ্যান থিয়েটার, যা কাশীপুর ছাড়িয়ে আশপাশের গ্রামে ঘুরে ঘুরে নাটক করে।
তপন নিজেই গাড়ি চালায়, ছেলেমেয়েরা বাঁশ-চট-কাগজ দিয়ে সাজায় চলমান মঞ্চ। নাটক হয়:
ধানের সিঁড়ি”, “নারীর পাঁচালী”, “গোয়ালঘরে গীত—সবই গ্রামের ভাষা, জীবনের গল্প।

একদিন একটি ছোট্ট স্কুলে গিয়ে তারা নাটক করে।
শেষে এক বৃদ্ধা উঠে এসে বলে, “আমার ছেলেটা নাটক করত এককালে, আপনারা ওকে ফিরিয়ে আনলেন যেন।”
তপন চুপ করে রইল, রিমা বলল, “এই তো চেয়েছিলাম আমরা—শুধু গল্প নয়, ফিরে আসা।”

এই সময় ‘শেষ মাইক্রোফোন’ নিয়ে তৈরি হয় একটি তথ্যচিত্র—“Ek Swor: A Voice Beyond Curtain”
ডিরেক্টর ছিলেন লন্ডনের বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতা সায়ন্তন রায়। তিনি প্রথম বার কাশীপুরে এসে শম্ভু সেনের ব্যবহৃত একটি চশমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,
“এই চশমার ফ্রেমটা ভাঙা, তবু এর ভিতর দিয়ে দেখা যায় এক অটুট দৃশ্য। আমি এই দৃশ্যটা ধরতে চাই।”

তথ্যচিত্রে থাকে শম্ভুর জীবনের অজানা অনেক অধ্যায়—তাঁর রাজনৈতিক নাটক, সেন্সরের ধাক্কা, যাত্রাপালার পোস্টারে লেখা ছোট্ট বিপ্লবী বার্তা।
তপনের কণ্ঠে আসে সংলাপ—
দাদু বলতেন, আমরা নাটক করি বলে সমাজ আমাদের মঞ্চ দেয় না, আমরা নাটক করি বলে সমাজের আসল মঞ্চটা খুঁজে পাই।

তথ্যচিত্রটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়। কাশীপুরের নাম ছড়িয়ে পড়ে শিল্পচর্চার মানচিত্রে।

রিমা একদিন মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চুপ করে থাকেন। হাত ছুঁইয়ে দেখেন কাঠের তক্তাটা—যেখানে শম্ভু একদিন বলেছিলেন,
জীবনটাই একটা যাত্রা।
হঠাৎ কার যেন পায়ের শব্দ আসে পেছন থেকে। ঘুরে দেখেন, মৌসুমি।
সে চুপচাপ বলে, “আমি একটা নাটক লিখেছি, আপনি পড়ে দেবেন?”
রিমা বলে, “তুই শুরু কর।”

মৌসুমি বলে—
নাটকটার নাম রেখেছি—‘প্রথম কণ্ঠ
এটা একজন কিশোরীর গল্প, যে একদিন নাটক দেখে বুঝতে পারে, তার ভিতরে একটা কণ্ঠ ঘুমিয়ে আছে। সেটাকে জাগাতে তাকে শুধু একটা খালি মঞ্চ দরকার।”

রিমা চুপ করে। চোখের কোনে জল আসে। তারপর বলে—
“তোর নামের নিচে লিখে রাখিস—
শম্ভু সেনের উত্তরসূরি।”

কাশীপুরের আকাশে তখন শরতের আলো। বাতাসে পাকা ধানের গন্ধ, আর ভোরের কুয়াশা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে নীল আকাশে। নাট্যকেন্দ্রের মাঠটায় সকালের রিহার্সাল চলছে। একদল কিশোর কিশোরী সংলাপ উচ্চারণ করছে—”আমরা শব্দ খুঁজি, কারণ আমরা নীরবতার অভিশাপ জানি।”

তপন দূরে দাঁড়িয়ে থেকে আলোর অ্যাঙ্গেল দেখছে। এখন তার মুখে একটা শান্ত আভা, যেন অনেক লড়াইয়ের পর হালকা জয়ের ছায়া এসে ঠেকেছে।
রিমা তখন নাট্যকেন্দ্রের নীচতলার ঘরে বসে মৌসুমির নাটকের প্রিন্টআউট পড়ছে। খাতার পাতায় গুচ্ছ সংলাপ—সবাই নতুন, অথচ কোথাও যেন শম্ভু সেনের ছায়া পড়ে রয়েছে।

হঠাৎ বাইরে একটা হইচই। এক কিশোর ছুটে এসে বলে,
“রিমা দি, একটা লোক এসেছে। বলছে শম্ভু দা’র সঙ্গে একসঙ্গে নাটক করত, নাম বলছে ‘ধনঞ্জয় বাবু’।”
রিমা চোখ তুলে তপনের দিকে তাকাল।
তপন বলল, “চেনা নাম, দিদি। পুরনো পোস্টারে একবার পড়েছিলাম।”

তাঁরা বেরিয়ে এসে দেখে, এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন নাট্যকেন্দ্রের গেটের কাছে। মাথায় সাদা টুপি, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, আর হাতে একটা কাঠের লাঠি। চোখজোড়া ভিজে, কিন্তু উজ্জ্বল।
তিনি বললেন, “আমি ধনঞ্জয় মিত্র। শম্ভু যখন প্রথম যাত্রাপালা লিখতে শুরু করল, তখন আমি সঙ্গ দিতাম। পরে অন্য শহরে চলে যাই। শুনলাম ও চলে গেছে… কিন্তু তোমরা নাকি ওকে ফিরিয়ে এনেছ?”

রিমা সামনে এগিয়ে এসে হাত ধরে বলল, “উনি তো আমাদের মধ্যে রয়েই গেছেন।”
ধনঞ্জয় একটুখানি হাসলেন।
“আমি একবার মঞ্চটা দেখতে চাই। যেখানে ও দাঁড়িয়ে বলেছিল—‘সংলাপ থামলে সমাজ থামে।’”

তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল প্রধান মঞ্চে। সেই কাঠের তক্তার উপর উঠে ধনঞ্জয় দাঁড়িয়ে রইলেন খানিক। তারপর পকেট থেকে একটা চিঠি বের করলেন।
“এইটা শম্ভুর হাতের লেখা। আমাদের শেষ চিঠি চালাচালি। ও বলেছিল, এই চিঠিটা ওর মৃত্যুর পরে যদি আমি কাশীপুরে আসতে পারি, তাহলে নাট্যকেন্দ্রের সামনে পড়ে শোনাতে।”

রিমা মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “আপনি পড়ুন। আমরা সবাই শুনব।”

ধনঞ্জয় গলা পরিষ্কার করে পড়তে শুরু করলেন—

“বন্ধু,

_জানি, অনেক বছর দেখা হয়নি। নাট্যজগতে এসে আমরা আলাদা পথ ধরেছি। তুমি শহরে চলে গেলে, আমি গেঁয়ো রয়ে গেলাম। তবু একটা প্রশ্ন মাঝেমাঝেই আমায় তাড়িয়ে বেড়ায়—আমরা কি হেরে গেছি?

_তারপর রিমাকে পেলাম। ওর চোখে আবার সেই বিশ্বাসটা দেখলাম, যেটা তুই দেখতিস আমার চোখে।

_আমি চলে গেলে, যদি ওরা আমার গল্পটা নিয়ে কিছু করতে চায়, যদি কখনও কেউ এসে বলে—‘আমরা থেমে যাব না’, তখন তুমি দাঁড়িয়ে পড়ো ওদের পাশে। বলো, শম্ভু শুধু একটা নাম নয়, শম্ভু একটা স্বর—যে থেমে গেলেও প্রতিধ্বনি ফেলে যায়।

_ভালো থাকিস। তোর বন্ধু,
শম্ভু”

পিনপতন নিস্তব্ধতা। শুধু দূরে পাখির ডাক, আর কিশোর কণ্ঠে ফিসফাস—“শম্ভু দা আবার ফিরলেন।”

ধনঞ্জয় চিঠি ভাঁজ করে বলেন, “ওর গল্পটা লেখা শেষ হয়নি। ওরা এখন লেখে। আমি দেখব।”

সেই রাতেই নাট্যকেন্দ্রের সভা ডাকা হয়। ধনঞ্জয় বলেন, “শম্ভুর একটা অসমাপ্ত স্ক্রিপ্ট ছিল—‘আলোর নিচে ছায়া’। ও বলত, এটা হবে এমন এক নাটক যেখানে সমাজ নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ভয় পাবে। আমি চাই, তোমরা এটা মঞ্চস্থ করো।”
রিমা উত্তেজিত, তপন উদ্‌গ্রীব।
“আমরা সেটা করবই। কিন্তু আপনারই নির্দেশনায়।”
ধনঞ্জয় প্রথমে রাজি না হলেও পরে বলেন, “এক শর্তে—তোমরা গল্পের শেষে কিছু বদল আনবে। শম্ভু যদি থাকত, তিনিও চাইতেন গল্প বদলাক সময়ের সঙ্গে।”

এইভাবেই ‘আলোর নিচে ছায়া’ নাটকের প্রস্তুতি শুরু হয়।
মৌসুমি ও তার বন্ধুরা রিসার্চ করে গল্পের সামাজিক প্রেক্ষাপট খুঁজে আনে। তপন নতুন আলো ডিজাইন করে, যাতে প্রতিটি দৃশ্যের ছায়া আলোর মতোই চোখে পড়ে।
নাটকটির থিম—‘সমাজের মুখোশ খুললে কী থাকে?’

রিহার্সাল চলাকালীন রিমা একদিন চুপ করে বসে থাকে মঞ্চে। ধনঞ্জয় এসে পাশে বসে বলেন,
“তুমি ভাবছো, শম্ভু এটা দেখে কী বলতেন?”
রিমা মৃদু হাসে, “না, আমি ভাবছি, যদি উনি এই চরিত্রগুলো নিজে পড়তেন, তাহলে কোনটায় নিজেকে খুঁজে পেতেন।”
ধনঞ্জয় বলেন, “সবগুলোতেই। শম্ভু নিজে ছিল একাধিক চরিত্র—অভিনেতা, লেখক, বিপ্লবী, শিক্ষক। কিন্তু সব কিছুর আগে সে ছিল এক শ্রোতা। যে সমাজের কান দিয়ে শুনে, হৃদয়ে মঞ্চ বানাত।”

নাটক শেষ হলে মঞ্চে আর কাউকে দেখা যায় না। শুধু পড়ে থাকে সেই পুরনো মাইক্রোফোন, আর তার সামনে রাখা খোলা খাতার পাতা।
সেই পাতায় লেখা—
শেষ সংলাপ বলে কেউ নেই। সংলাপ বাঁচে যতদিন শ্রোতা থাকে।

কাশীপুরে সেই রাতটা ছিল অদ্ভুতভাবে নীরব। ‘আলোর নিচে ছায়া’ নাটকের মঞ্চায়ন শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই, কিন্তু দর্শকেরা যেন এখনও উঠে যেতে পারছে না। কেউ চুপ করে বসে, কেউ মঞ্চের দিকে তাকিয়ে, কেউ নিজের বুকের ভেতর কিছু অনুভব করছে যা ভাষায় ধরা যায় না।

মঞ্চে তখন আর আলো নেই, শুধু মাঝখানে একটি স্থির লাইট পড়ে রয়েছে শূন্য চেয়ারে রাখা পুরনো মাইক্রোফোনের উপর। তপন নিজে আলো নিভায়নি। রিমা জানে, সে চায় আরও কয়েক মুহূর্ত যেন এই নিস্তব্ধতা মঞ্চে বাজে।

পেছনের ঘরে ধনঞ্জয় মিত্র ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে। তাঁর কাঁধে যেন এক দীর্ঘ সময়ের ভার নেমে এসেছে। তিনি ফিসফিস করে বলেন,
“আমি ভেবেছিলাম শম্ভু চলে যাওয়ার পর এভাবে শব্দ ফিরে আসবে না… কিন্তু আজ আমি জানি, কণ্ঠ কখনও মরে না। শুধু শ্রোতা বদলায়।”

রিমা এসে পাশে বসে। কাঁধে হাত রাখে।
“আপনার নির্দেশনায় নাটকটা এক অন্য মাত্রা পেল। আপনি না থাকলে আমরা সাহস পেতাম না।”
ধনঞ্জয় মাথা নাড়েন, “সাহস তো তোমার চোখে ছিল, রিমা। আমি শুধু আয়না ধরেছি।”

রাত বাড়ে। তপন এসে বলে, “সবাই চলে গেছে। এবার আলো নিভিয়ে দেব?”
ধনঞ্জয় থামায়, “একটু অপেক্ষা করো। কেউ যেন এখনও কথা বলছে ওই মাইক্রোফোনে।”

রাত তিনটে নাগাদ তারা তিনজনই মঞ্চের এক কোণে বসে। বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ, দূরে একটা কুকুরের হালকা ডাকে সময় মনে পড়ে যায়। তপন বলে,
“দাদু এই সময়েই মঞ্চে এসে বসতেন একা। কখনও মুখে সংলাপ চলত, কখনও মুখ বন্ধ, কিন্তু চোখ বলত—‘আমি শুনছি’।”
রিমা চুপ করে শোনে। যেন এখনও শম্ভু সেনের সেই কান পাতার অভ্যাস বাতাসে রয়েছে।

পরদিন সকালে নাট্যকেন্দ্রে মানুষের ভিড়। সবাই দেখতে এসেছে নাটকের পোস্টার, শুনতে চায় আরেকবার সেই সংলাপ। রিমা সিদ্ধান্ত নেন—নাটকের পুরো স্ক্রিপ্ট ছাপা হবে একটি বইয়ে। নাম হবে শেষ মাইক্রোফোন: একটি মঞ্চজীবনের দলিল

ধনঞ্জয় নিজের হাতে ভূমিকা লেখেন—

“এই বই কোনও নাট্যপুস্তক নয়, এটা এক কণ্ঠস্বরের খোঁজ। সেই কণ্ঠ, যাকে সমাজ চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু যিনি মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—‘আমি শেষ মাইক্রোফোন।’”

রিমা ও তপন প্রতিটি সংলাপের পাশে একটি করে ছবি রাখে—পুরনো যাত্রাপালার, স্কুলের রিহার্সালের, মঞ্চের আলোয় মৌসুমির চোখে ভেসে ওঠা আত্মবিশ্বাসের।
বইটি ছাপা হয় স্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা থেকে।
প্রথম সংস্করণেই বইটি ছড়িয়ে পড়ে নাট্যচর্চাকারী মহলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যবিভাগ, ছোট থিয়েটার দল, গবেষক—সবাই বইটিকে একটি রেফারেন্সের মত গ্রহণ করে।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক আসে—‘থিয়েটার অ্যান্ড পলিটিক্স’ কোর্সে মূল পাঠ্য হিসেবে ‘শেষ মাইক্রোফোন’ যুক্ত করা হচ্ছে।
রিমা ছাত্রীদের নিয়ে যায় সেই ক্লাসে, তপন পড়ায় ‘আলো ও ছায়ার ব্যবহার’ নিয়ে। মৌসুমি সেখানে দাঁড়িয়ে বলে—
“শম্ভু দা আমাদের শেখাননি শুধু সংলাপ বলা, তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের গল্পটাকে মঞ্চে তুলতে হয়।”

একদিন রাতে রিমা একা বসে নাট্যকেন্দ্রে। চারদিক নীরব, শুধু বাতাসে কাগজের পাতার শব্দ।
হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়ায় একটি নতুন মেয়ে, চোখে আশ্চর্য দীপ্তি।
সে বলে, “আমি নাটক করতে চাই, দিদি। শুনেছি এখানে কোনও পরীক্ষা লাগে না, শুধু কথা বলার ইচ্ছা লাগে।”
রিমা হেসে বলে, “তাহলে তুই তো অনেক আগেই ভর্তি হয়ে গেছিস।”

পরদিন সকালের ওয়ার্কশপে নতুন মুখগুলো ভরে যায়। তপন তাদের বলছে—“মঞ্চে উঠলে নিজের গল্প বলবে, অন্যের নয়।”
একটা ছেলে প্রশ্ন করে, “তাহলে সংলাপ মুখস্থ করব না?”
তপন বলে, “মুখস্থ করবি, কিন্তু গলার ভিতর থেকে। কণ্ঠ যেন মরে না যায় কেবল মুখে মুখে।”

সেইদিন থেকেই নাট্যকেন্দ্রে শুরু হয় ‘কণ্ঠচর্চা’—শুধু অভিনয় নয়, সমাজ নিয়ে কথা বলার সাহস তৈরি করার প্রশিক্ষণ।
প্রথম ব্যাচের নাম রাখা হয় শম্ভুর প্রথম দল

নাট্যকেন্দ্রের দেওয়ালে একটি নতুন লাইন টাঙানো হয়—
যেখানে শব্দ থামে, সেখান থেকেই শুরু হয় নাটক।

ধনঞ্জয় মিত্র পরে কাশীপুর ছেড়ে যান, কিন্তু যাওয়ার সময় রেখে যান নিজের পুরনো পাণ্ডুলিপির থলে, যার গায়ে লেখা—‘জীবনের মঞ্চ বড়, শুধু নাটক নয়’।
রিমা সেই থলে তুলে রাখে নাট্যকেন্দ্রের সংগ্রহশালায়, শম্ভু সেনের খাতার পাশে।

তপন একদিন রাতে এসে মাইক্রোফোনের তারটা পরিষ্কার করছিল।
রিমা জিজ্ঞেস করে, “আজও ঠিক করছিস?”
তপন মুচকি হেসে বলে, “হ্যাঁ। কে জানে, কবে কোন গলা এসে এই মাইকটা হাতে নেবে। আমি তো শুধু রাখছি, যাতে বাজতে পারে।”

আর তখনই নাট্যকেন্দ্রের পেছন দিক থেকে আসে একটি কিশোরী কণ্ঠ—
আমি শেষ মাইক্রোফোনতুমি যদি বলো, আমি আবার বাজি।

তারা দুজন চমকে তাকায়।
নতুন প্রজন্মের কেউ একজন শিখে ফেলেছে সেই লাইন—নতুন মুখ, নতুন কণ্ঠ, কিন্তু একই আত্মা।

শেষ মাইক্রোফোন আর কোনও যাত্রাদলের শেষ প্রদীপ নয়।
এটা এখন এক চলমান মঞ্চ, এক বেঁচে থাকা কণ্ঠ—
যে বারবার বলে উঠে—
সংলাপ থামে না, শুধু রূপ বদলায়। আমি শেষ মাইক্রোফোনকিন্তু বাতাসে বাজতেই থাকি।

সমাপ্তি

WhatsApp-Image-2025-07-10-at-11.31.17-AM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *