Posted in

আকুল মাছের আত্মা

Spread the love

দেবাংশু গুপ্ত


রবীন্দ্রনাথ গ্রামের এক অতি সাধারণ মাছ শিকারী। ছোটবেলা থেকেই তিনি মাছ ধরতেন, এবং সারা জীবনে এর চেয়ে বড় কোনো কাজ তার ছিল না। গ্রামটির পাশ দিয়ে চলে যাওয়া নদী, জলে ভাসমান ডাঙার পাশে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন সকালে মাছ শিকার করতেন। তার হাতে ছিল এক বিশেষ নেট, একটি পুরনো কাঠের ডিঙি, আর তার চোখে সবসময় এক ধরনের আশ্চর্য শান্তি ছিল। গ্রামবাসীরা তাকে ‘রবি’ বলে ডাকতো, আর তার কাজের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ছিল অদ্ভুত। কোনো মাছ শিকারী যখন খালি হাতে ফিরত, রবীন্দ্রনাথ তখন তার কাঁধে ভালো মাছের নেট ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরত। তবে একদিন, এক পূর্ণিমা রাতে এমন একটি মাছ ধরল যা তাকে সারা জীবন বদলে দেবে, আর তা এক অজানা অভিশাপের শুরু হবে। রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, এবং নদী শান্ত ছিল, ঠিক যেন কোনো বিপদ আসছে। রবি নদীতে ডিঙি ভাসিয়ে একটি মাছের দিক লক্ষ্য করেছিল, যার চোখ ছিল আশ্চর্য। মাছটি ছিল প্রচণ্ড বড়, এবং এর গায়ের শিমলা রঙ যেন কিছুটা ভয়ের অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। রবি মাছটিকে প্রথমে চিনতে পারেনি, তবে তার গভীর তলানি, তার চোখের মায়া এবং গাঢ় সবুজ রঙ দেখে তার মনে এক অজানা শঙ্কা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। মাছটি যেন ছলনাময়ী। আর ঠিক তখনই, সে হঠাৎই অনুভব করে যে কিছু একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু তখনও বুঝতে পারেনি তা কি। মাছটি টেনে এনে ডিঙিতে তুলে নেয় সে। কিন্তু সেই মাছ যখন তার হাতে আসে, তখন তার মনে এক তীব্র অস্বস্তি বাসা বাঁধে। এই মাছটি সাধারণ ছিল না। এর গায়ের ত্বক ছিল পুরু, এবং চোখগুলো যেন জীবন্ত প্রাণীর মতো ঝলমল করছিল। তার মধ্যে কিছু ছিল, যা অনুভব করছিল না সে—কিন্তু সেই অজানা কিছু তাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল। মাছটি ডিঙিতে উঠানোর পর তার ভেতরে এক অদ্ভুত তীব্রতা ছড়িয়ে পড়তে থাকে, যেন সেটি কিছু বলার জন্য তার কাছে অধীর হয়ে আছে।

রবীন্দ্রনাথ বাড়ি ফিরল, কিন্তু সেই মাছের উপস্থিতি তাকে যেন তাড়া করতে থাকল। তার মনে হচ্ছিল, সারা রাত তার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথম প্রথম, সে কিছু মনে করেনি। পরদিন সকালে, যখন সে মাছটি বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যায়, গ্রামের অনেকেই তার কাছে সেই অদ্ভুত মাছটি দেখতে চায়। তবে রবীন্দ্রনাথ মাছটি বিক্রি করতে অস্বীকার করে, কারণ তার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা তাকে প্রবলভাবে ভয় দেখাচ্ছিল। রাতে, সে কিছুই বুঝতে পারছিল না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল যে মাছটি তার ওপর নজর রেখেছে। রাতে ঘুমের মধ্যে, সে মনে করে মাছটির চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঘরেও এক ধরনের অদ্ভুত শক্তি অনুভব হয়, যেন কিছু গভীর অশুভ ঘটছে। রাতের অন্ধকারে, প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয়কে থেমে যেতে বাধ্য করছিল। মাঝরাতে, সে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায়, মাছটি যেন তার ঘরের মাঝখানে এক অদৃশ্য শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও তা ছিল শুধুমাত্র তার ভাবনা, তবুও রবি নিজেকে ভয় পেতে থাকে। পরদিন সকালে, তার মনের অজানা ভয় আরও বাড়ে। সে বুঝতে পারে যে কিছু একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু সে জানে না কি। মন্দিরের পুরোহিতের কাছে গিয়ে, সে জানতে চায় যে কি কারণে তাকে এত ভয় পাচ্ছে। পুরোহিত তাকে বলেন, “যে মাছ তুমি ধরেছ, তা কোনও সাধারণ মাছ নয়। এই মাছের আত্মা এক সময় ভয়ঙ্কর ছিল, এবং যার উপর তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সে ফিরে এসেছে। তুমি যদি এর অভিশাপ থেকে মুক্তি না পাও, তবে এক ভয়ঙ্কর পরিণতি তোমার অপেক্ষা করছে।” রবীন্দ্রনাথ প্রথমে বিশ্বাস করেনি, কিন্তু পুরোহিতের কথা তার মনে দাগ কাটে। এরপর থেকে রবি অনুভব করতে থাকে, মাছটির আত্মা তাকে তাড়া করতে শুরু করেছে। রাতের অন্ধকারে এবং দিনে, তাকে মনে হতো মাছটি তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন তাকে কোন একভাবে আঘাত করতে চায়। এক সপ্তাহের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের অবস্থা বেগতিক হয়ে যায়। সে রাতের বেলা ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না, খাবার খেতে পারে না, আর সবসময় তার মনে হতে থাকে, মাছটির চোখ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। একদিন, তিনি আর পারলেন না। মাছটির প্রভাব তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে তার জীবন থেকে কিছু হারিয়ে ফেলেছে, আর সেই হারানো কিছু তাকে এই পৃথিবীতে বন্দী করে রেখেছে। গ্রামবাসীরা তাকে দেখতে এলে, তারা তার অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে চমকে ওঠে, এবং তারা জানায়, রবীন্দ্রনাথ যেন আর সেই পুরনো রবি নেই। তার মধ্যে কিছু বদলে গেছে, কিছু অদৃশ্য শক্তি তাকে গ্রাস করেছে। কিন্তু তখনও, রবীন্দ্রনাথ জানত না, সেই মাছের আত্মা আসলে তার জীবনে কীভাবে প্রবাহিত হবে, আর তার পরিণতি কী হবে।

গ্রামের বাতাসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটেছিল। রবীন্দ্রনাথের বাড়ির চারপাশে প্রতিদিনই একটি অশান্ত পরিবেশ দেখা যাচ্ছিল। গ্রামবাসীরা বলছিল, তার মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন কোনো অজানা ভয় তাকে গ্রাস করেছে। তার চোখের দৃষ্টি নিস্তেজ হয়ে গেছে, শরীরও কাঁপছিল, আর সে পুরোপুরি আলাদা হয়ে উঠেছিল। একদিকে, তার স্ত্রী মালতী তাকে বারবার শান্ত করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেন কিছুই বুঝতে পারছিল না। এক রাতে, মালতী তাকে জোর করে ঘুমাতে বলে, কিন্তু সে কিছুতেই ঘুমাতে পারে না। তার মাথায় এক ভয়ংকর ধারণা ঘুরতে থাকে—মাছটির আত্মা তাকে আক্রমণ করতে আসছে।

একমাত্র রবীন্দ্রনাথ জানত না, সেই মাছের আত্মার প্রভাব আসলে এতটাই গভীর ছিল যে, এটি তার দৈনন্দিন জীবনকেও বদলে ফেলবে। পরদিন সকালে, মালতী যখন ঘর পরিষ্কার করতে যায়, তখন সে দেখতে পায়, রবীন্দ্রনাথ এক অদ্ভুত অবস্থায় আছে। তার চোখে আতঙ্ক এবং বিষাদ মিশ্রিত ছিল, এবং তার মনের মধ্যে এক অন্ধকার ছড়িয়ে ছিল। সে কোনো কথা বলছিল না, তবে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছিল। মালতী তাকে তার কাছের পুরোহিত শঙ্করের কাছে নিয়ে যেতে চায়, তবে রবীন্দ্রনাথ সেদিন কোনো কিছুই করতে ইচ্ছুক ছিল না। সে মনে করেছিল, সেই মাছের আত্মা তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

একদিন, গ্রামে একটি বড় জমি নিয়ে আলোচনা চলছিল। গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে পুকুরের পাশে বসেছিল, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোনো কারণে সেদিকে যেতে পারছিল না। হঠাৎ, তার চোখের সামনে এক বিস্ময়কর দৃশ্য ঘটে—একটি মাছ, সেই মাছটির মতো দেখতে, পুকুরের দিকে এগিয়ে আসছে। রবীন্দ্রনাথ চিৎকার করে ওঠে, “এটা সে! এটা সে!” সে পুকুরের দিকে ছুটে যায়, কিন্তু মাছটি তখন সেখানে নেই। তার মনে হয়, সে মন্দিরের পুরোহিতের কথা ভুলে যায়নি। “তুমি যদি এই মাছটির আত্মাকে শান্ত না করতে পার, তবে এক ভয়ঙ্কর পরিণতি তোমার অপেক্ষা করছে,” পুরোহিতের কথা তার মনে বাজতে থাকে। শঙ্করের কথা অনুযায়ী, মাছটির আত্মা প্রতিশোধ নিতে এসেছে, এবং সে একে একে গ্রামবাসীদের জীবনেও প্রবেশ করবে। রবীন্দ্রনাথের অস্থিরতা তখন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

গ্রামবাসীরা প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও, রাতের অন্ধকারে তারা নিজ চোখে কিছু অদ্ভুত ঘটনা দেখতে পায়। এক রাতে, এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী শোনে, পুকুরের পাশ থেকে অদ্ভুত আওয়াজ আসছে। সে আতঙ্কিত হয়ে ফিরে আসে। পরদিন সকালে, গ্রামবাসীরা পুকুরের আশপাশে কিছু রহস্যজনক চিহ্ন দেখতে পায়। কিছু অসম্পূর্ণ আকারের ছায়া, কিছু অদ্ভুত শব্দ, এবং যে মাছটি রবীন্দ্রনাথ ধরেছিল, তার প্রতি সবাই যেন আরও বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করে, মাছটির আত্মা কিছু একটা করছে। কেউ কেউ বলছিল, এটি শুধুই একটি গাঁজাখুরি গল্প, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছে এর সত্যতা ছিল স্পষ্ট।

গ্রামবাসীরা তাকে ঘিরে ধরে, এবং এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী, যিনি একসময় পুণ্যাথী ছিলেন, বলেন, “তুমি যদি এই মাছটির অভিশাপ থেকে মুক্তি চাও, তবে তোমাকে একটি তন্ত্রসাধনা করতে হবে। মাছটির আত্মা শুধুমাত্র তন্ত্রের মাধ্যমে শান্ত হতে পারে।” রবীন্দ্রনাথ তীব্রভাবে ভয় পেয়ে যায়, তবে সে বুঝতে পারে যে, যদি সে নিজের জীবনকে পুনরুদ্ধার করতে চায়, তবে তাকে কিছু করতেই হবে। পুরোহিত শঙ্কর তাকে তন্ত্রসাধনার জন্য প্রস্তুতির কথা বলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মনে ছিল অনেক প্রশ্ন। সে জানত না, সেই তন্ত্রসাধনা সফল হবে কিনা, বা সেই মাছের আত্মার ক্ষিপ্ততা কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

এক রাত, পূর্ণিমার চাঁদ যখন আকাশে ছিল, রবীন্দ্রনাথ সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাকে শঙ্করের কথা অনুসরণ করেই মাছের আত্মাকে শান্ত করতে হবে। সে মন্দিরের দিকে রওনা হয়, তার মনে অনেক ধরনের ভয় ও শঙ্কা। তবুও, তার মধ্যে এক শক্তি ছিল, যা তাকে এই পথ অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। রাত গভীর হয়ে আসে, এবং রবি মন্দিরের কাছে গিয়ে, শঙ্করের নির্দেশিত তন্ত্রসাধনা শুরু করে। কিন্তু তন্ত্রসাধনার সাথে সাথেই, তাকে ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়—মন্দিরের ভেতর থেকে অদৃশ্য কিছু তাকে ঘিরে নেয়। সে অনুভব করে, মাছের আত্মা তখনও তার কাছে রয়েছে। আর তার মনে হয়, তার জীবনে আরও অনেক কঠিন সময় আসতে চলেছে।

WhatsApp-Image-2025-07-08-at-2.28.55-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *