রিতা সুর চৌধুরী
এক
শ্মশানের নরম সাদা ছাই আর কালো পাথরের ফাঁক দিয়ে বেরোনো ধোঁয়ার মতোই নিঃশ্বাস নিত রুদ্রনাথ—যেন প্রাচীন কালের অন্ধকার তাকে গ্রাস করে নিয়েছে আর ছাড়তে চায় না। এক সময় তান্ত্রিকদের মধ্যে যার নাম ছিল সম্মানের, সেই রুদ্রনাথ আজ শুধু অন্ধকার আর ব্যর্থতার এক জীবন্ত প্রতিমা। চোখের তলায় গভীর গর্ত, কপালে কালি আর রক্তের তিলক, ছেঁড়া গেরুয়া বসনে জড়ানো দেহ আর হাতের শিরাগুলোতে শুকিয়ে যাওয়া তেলের গন্ধ—সব মিলিয়ে এক পচন ধরা সাধকের চেহারা। শ্মশানটি সেই সময় প্রায় পরিত্যক্ত; মাঝে মধ্যে শুধু মৃতদেহের মিছিল এসে পুড়ে যায়, ধোঁয়ার সাথে মিলিয়ে যায় কান্নার শব্দগুলো। রুদ্রনাথের তন্ত্রের আসন সেই চিতা ভস্মের উপরে, চারদিকে ছড়ানো কঙ্কাল, পোড়া কাঠ আর ভাঙা মাটির পাত্রে তেল আর কালি মিশিয়ে তৈরি তান্ত্রিক চিহ্ন। আজকের রাত তার জন্য শেষ সুযোগ—এ কথা সে জানে, কারণ শরীর তাকে আর সইছে না, রক্তে আর আগের মতো আগুন নেই, চোখে ঝাপসা দেখা যায়, অথচ মনের মধ্যে সেই অদম্য ক্ষুধা জেগে থাকে: মৃত্যুর পরেও থেকে যাওয়ার, মৃত্যুকে বশ্যতা করানোর, মৃত্যুর উপরে জয়ী হওয়ার। গোপন শাস্ত্র থেকে পাওয়া এক অতি দুর্লভ উপায়ের কথা তার মনে আছে—যা প্রায় কেউই শেষ পর্যন্ত করতে পারে না, আত্মাকে বেঁধে রাখা এক বিশেষ রুদ্রাক্ষে। শত বছরের সাধনা, নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ, আর প্রবল ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন এ কাজে, কিন্তু রুদ্রনাথ জানে তার কাছে নিঃস্বার্থ কিছুই নেই, আছে শুধু মৃত্যু-ভয় আর এক অন্ধকার অভিশাপের মতো লালসা। রাত যত গাঢ় হয়, শ্মশানের বাতাসে তীব্র হয়ে ওঠে ধূপের গন্ধ, আর রুদ্রনাথের মন্ত্রোচ্চারণ ঘনিয়ে তোলে অন্ধকার—তার কণ্ঠস্বর ফাটতে ফাটতে শেষমেশ রক্তাক্ত কফ হয়ে বেরিয়ে আসে, তবু সে থামে না। সে জানে, আর যদি না পারে, কাল সূর্যোদয়ের আগেই তাকে চলে যেতে হবে সেই অজানা অন্ধকারে, যেখান থেকে ফেরার রাস্তা নেই।
কিছুক্ষণ পরেই শ্মশানের এক কোণে বাতাস ঘুরে যায়, মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায়, আর রুদ্রনাথ অনুভব করে, তার সাধনা আস্তে আস্তে ফল দিতে শুরু করেছে। বুকের মধ্যে অজানা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ে, রুদ্রাক্ষটি তার সামনে শুয়ে থাকে মৃত মানুষের চোখের মতোই নির্লিপ্ত, অথচ ভেতরে জমে থাকা অন্ধকারে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে এক অদৃশ্য আগুন। এই রুদ্রাক্ষ একদা কোনো গহন অরণ্যের প্রাচীন বটগাছের নীচে পড়ে ছিল—তাদের বিশ্বাস, এর ভেতরেই লুকানো আছে দেবতা বা দানবের নিঃশ্বাস। রুদ্রনাথ নিজেই বহু বছর ধরে একে কাছে রেখেছিল, এখন সে নিজের আত্মাকে এর মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে চায়—জীবনের শেষ খেলায় জেতার জন্য। তার মন্ত্র ধীরে ধীরে রুদ্রাক্ষের চারপাশে জড়িয়ে এক অদৃশ্য জাল তৈরি করে, আর সেই জালের ভেতরেই সে নিজেকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু ঠিক তখনই তার ভিতরকার ভয় মাথা তোলে—যদি মন্ত্র ব্যর্থ হয়, যদি তার আত্মা চিরতরে দংশিত হয়, যদি শ্মশানের অশরীরী আত্মারা তাকে টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারে? সে অনুভব করে শরীর ঘেমে ভিজে গেছে, চোখে অন্ধকার দুলছে, তবু সে থামে না। মুহূর্তের জন্য মনে হয়, নিজের শ্বাস সে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না; কণ্ঠ রুদ্ধ, বুক ভারী, চোখের সামনে অদ্ভুত ছায়া নাচছে, যেন মৃত মানুষের মুখ। হঠাৎ সে দেখে রুদ্রাক্ষের কালো চকচকে পৃষ্ঠে এক অদ্ভুত প্রতিফলন—নিজের চেহারা নয়, বরং এক বিকৃত, অর্ধেক পুড়ে যাওয়া মুখ, যার চোখ জ্বলছে লাল আগুনে। সেই মুহূর্তেই সে বুঝে যায়, তার আত্মা বদ্ধ হতে শুরু করেছে, রুদ্রাক্ষ তাকে গ্রাস করছে, বা সে-ই রুদ্রাক্ষকে গ্রাস করছে—দুটোর সীমা মিলিয়ে যায়। চারপাশের শ্মশান নিস্তব্ধ, দূরে রাতের পাখির কান্না আর শিয়ালের ডাক; অথচ রুদ্রনাথের মন যেন বধির হয়ে গেছে, সে শুনতে পায় শুধু নিজের হৃদস্পন্দন আর সেই ছায়ার শ্বাসের শব্দ।
রাতের শেষ প্রহরে হঠাৎ বাতাস থমকে যায়, শ্মশানের ছাই যেন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়, আর তখনই রুদ্রনাথ জানে, সে তার সাধনা শেষ করেছে। মুখে তৃপ্তির হাসি আসে—একটি চোখে এখনও অদম্য লোভ, আর অন্য চোখে নিস্তব্ধ আতঙ্ক। সে জানে, মৃত্যুর পরও সে হারাবে না, তার আত্মা থেকে যাবে এই কালো রুদ্রাক্ষের মধ্যে বন্দী হয়ে—যা কেউ পাবে, তার মাধ্যমে সে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার দেহের শক্তি সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়; সে ঝুঁকে পড়ে, শ্বাস বন্ধ হতে থাকে, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে রক্ত আর ছাই। অন্ধকারে মিলিয়ে যায় তার শেষ নিঃশ্বাস, আর রুদ্রাক্ষের গায়ে এক অদৃশ্য ছায়া জন্ম নেয়—এক বিক্ষুব্ধ আত্মা, অভিশপ্ত, কিন্তু অমর। শতাব্দীর পর শতাব্দী সেই রুদ্রাক্ষ পড়ে থাকবে মাটির নীচে, শিকড় আর পাথরের ভেতরে, যতদিন না নতুন কেউ তার কাছে আসবে, যতদিন না নতুন এক মানব মনকে গ্রাস করবে সেই ছায়া। আর তখনই আবার জেগে উঠবে রুদ্রনাথ, জেগে উঠবে তার লোভ, তার অন্ধকার, আর শুরু হবে এক নতুন অশান্তির গল্প, যেখানে পুরনো অভিশাপ ছুঁয়ে যাবে নতুন জীবনের আকাশ।
দুই
সদ্য বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্মের ঢুকে পড়া দুপুরগুলোয় শহরের বাতাসে যেন এক অদৃশ্য ধুলো আর নোনা ঘাম মিশে থাকে, আর এই গরম দুপুরেই ইতিহাসের ছাত্র অয়ন চক্রবর্তী একদিন পায় তার জীবনের অদ্ভুততম বস্তু—একটা পুরনো কালো রুদ্রাক্ষ, যার গায়ে অজানা অক্ষরে আঁকা দাগগুলো তাকে প্রথম দেখাতেই কেমন এক শীতল স্পর্শ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র অয়ন, যাকে বন্ধুবান্ধব একটু উদাস, বইয়ের পোকা আর অতীতপ্রীতি নিয়ে মাঝেমধ্যে মজা করত, সেই অয়ন ইদানীং একা একা প্রাচীন মন্দির আর ধ্বংসস্তূপে ঘুরে বেড়াত। শহরের উপকণ্ঠে, যেখানে এখন কেবল কাক, কুকুর আর কিছু ছিন্নমূল মানুষের আনাগোনা, সেখানেই এক ভগ্ন মন্দিরের অন্ধকার কুঠুরিতে অয়ন প্রথম দেখতে পায় অর্ধেক ধুলো মাটি আর শিকড়ের ভিতর লুকিয়ে থাকা সেই রুদ্রাক্ষ। ছোঁয়ার মুহূর্তেই মনে হয়েছিল, তালুর মধ্যে শীতল কোনো কিছু ঢুকে পড়ছে রক্তের শিরায়, আর অজানা এক স্পন্দন অনুভূত হচ্ছিল, যেন তার বুকের ধুকধুকানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। চোখের সামনে মন্দিরের দেয়ালের জীর্ণ শিলালিপি, ছাদের ধ্বংসাবশেষ আর জং ধরা লোহার ঘণ্টা—সবই ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল এক মুহূর্তের জন্য। সেই প্রথমবার অয়নের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্মায়—যা সে নিজেই ঠিকভাবে বুঝতে পারে না: এটি শুধুমাত্র একটা পবিত্র রুদ্রাক্ষ নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নিঃশব্দ গল্প, যা হয়তো শোনার জন্যই ওর মতো একজনকে খুঁজছিল বছরের পর বছর, শতকের পর শতক।
রুদ্রাক্ষটি পকেটে নিয়ে ফেরার পথটুকুতে অয়নের বুক ধড়ফড় করে, যেন সে চুরি করেছে, অথচ কার কাছ থেকে সে নিজেই জানে না। সাইকেলে করে ফিরতে ফিরতে বারবার পকেটে হাত দেয়—রুদ্রাক্ষটি সত্যিই আছে কিনা দেখে নেয়, আর হঠাৎ তার গায়ে কাঁটা দেয়; দুপুরের রোদে গরমে ক্লান্ত হয়েও মাথায় ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত কুয়াশার মতো ছবি: ছাইমাখা শ্মশান, কালো আগুনের শিখা আর অদ্ভুত মন্ত্রোচ্চারণের আওয়াজ। অয়ন নিজেকে বোঝায়, হয়তো রোদ আর গরমে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। কিন্তু ঘরে ফিরে, দরজা বন্ধ করে রুদ্রাক্ষটিকে যতবার হাতে নেয়, স্পর্শ করে, ততবারই তার ভিতরে এক অদ্ভুত আলোড়ন বোধ করে—যা ভয়ের চেয়ে কৌতূহল বাড়ায়। ছোট্ট ঘর, জানালার পাশের টেবিলে ছড়ানো ইতিহাসের বই, নোটখাতা আর পেন্সিলের মধ্যে সেই রুদ্রাক্ষ এমন এক ধরনের উপস্থিতি তৈরি করে, যা সে কোনো পাথর বা তাবিজে পায়নি। প্রথম রাতে অয়ন ঘুমাতে গিয়ে স্বপ্ন দেখে—স্বপ্নে সে হেঁটে যাচ্ছে এক ফ্যাকাশে শ্মশানের ভেতর, চারপাশে অদৃশ্য ছায়া, আর দূরে কোথাও মন্ত্রোচ্চারণের গলা ভেসে আসছে; সেখানে সে এক লাল চোখের মানুষকে দেখতে পায়, যার অর্ধেক মুখ ছাইয়ে ঢাকা। ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ, বুক ধড়ফড় করে, আর ঘাম ভিজে যায় গলা অবধি। তবু সে রুদ্রাক্ষটিকে আলাদা করতে পারে না—বরং তার ভেতরে জন্ম নেয় এক অদম্য আকর্ষণ, যে আকর্ষণ তাকে বলে, ‘তুই আমাকে রাখ, তুই আমাকে চেনে, তুই আমার জন্য।’ অয়ন জানে না কেন, কিন্তু অনুভব করে এই রুদ্রাক্ষের সঙ্গে তার এক অদৃশ্য যোগ আছে—যা অন্য কেউ বুঝবে না, এমনকি তৃষাও না।
পরের দিনগুলোয় অয়নের মধ্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে—যা প্রথমে সে নিজেও টের পায় না। ক্লাসে সে আগের মতো মনোযোগ দেয় না, বরং বারবার রুদ্রাক্ষের কথা ভাবে; রাতে ঘুমোতে গেলে স্বপ্নে সেই ছায়া, সেই শ্মশান আর সেই লাল চোখের ছায়ামূর্তিটা ফিরে আসে, আর স্বপ্ন ভেঙে গেলেও সেই গন্ধ, সেই অদ্ভুত ধোঁয়ার স্বাদ যেন থেকে যায় গলা ও নাকে। বন্ধুরা খেয়াল করে, অয়ন ইদানীং চুপচাপ হয়ে গেছে, কথায় কথা বলে না, চোখে এক অজানা কঠোরতা। তৃষা, যে শুধু সহপাঠী নয়, বরং চুপিসারে অয়নের মনের অনেক কাছের মানুষ, সে প্রথম টের পায় অয়নের চোখে অদ্ভুত এক শীতলতা—যা আগে ছিল না। তৃষা প্রশ্ন করে, অয়ন টালবাহানা করে, আর মনে মনে ভাবে, এই অনুভূতিটা সে কাউকে বলতে পারবে না; কারণ এর মধ্যে এমন এক মাদকতা আছে, যা তার নিজেরও ভয় করে, তবু ছাড়তে পারে না। অয়ন বুঝতে পারে না, ঠিক কখন থেকে সে এই রুদ্রাক্ষের কথা না ভেবে থাকতে পারে না; কখনও পড়াশোনার মাঝেই বুকের ভেতর যেন শূন্যতা তৈরি হয়, যা রুদ্রাক্ষকে হাতে না নিয়ে পূর্ণ হয় না। এই নিরীহ ছাত্রের জীবনে শুরু হয় এক অদৃশ্য অশান্তির ঝড়, যা কেবল তার ভিতরেই নয়, চারপাশের বাতাসেও অজানা ছায়া ছড়িয়ে দিতে থাকে—যার শব্দ, গন্ধ, ছায়া কেবল অয়নেরই টের পাওয়ার কথা, কিন্তু হয়তো অন্য কারো চোখেও ধরা দেবে শিগগিরই। আর অয়ন তখনও জানে না, এই রুদ্রাক্ষ শুধু এক অভিশপ্ত পাথর নয়, বরং এক তান্ত্রিক আত্মার বন্দীশালা—যা আবার নতুন এক মানব মনের মাধ্যমে জেগে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।
তিন
রাত যত গাঢ় হতে থাকে, অয়নের ঘরে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে অদ্ভুত এক ভয় আর কুয়াশার মতো অদৃশ্য ভার; বাইরে রাস্তার আলোয় জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় দূরের পুরনো গাছগুলোর ছায়া যেন নড়ছে বাতাসের টানে, অথচ ঘরের ভিতরে কোনো হাওয়া নেই, কোনো শব্দ নেই—তবু অয়ন অনুভব করে, সে একা নেই। বিছানায় শুয়ে থেকে ঘুমোবার চেষ্টা করেও চোখ বন্ধ করতে গিয়ে সে দেখে সেই একই ছবি—ছাইঢাকা শ্মশান, ম্লান চন্দ্রালোকে ভেসে থাকা অর্ধপোড়া কাঠের গন্ধ, আর সেই আগুনের লাল চোখের মানুষটা, যার ঠোঁটের কোণায় বিদ্রূপের হাসি। এই স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমানা যেন মুছে যেতে থাকে; হঠাৎ সে মনে করে শোনে নিজের নাম ধরে কেউ ডাকছে—গলা যেন শোঁ শোঁ বাতাসের মতো, তবু স্পষ্টভাবে শোনা যায় “অয়ন…”। হাড়ের মধ্যে শীতলতা ছড়িয়ে পড়ে, সে এক ঝটকায় উঠে বসে, ঘরে তাকায়, কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না; কেবল জানালার পাশে রাখা টেবিলের উপর রুদ্রাক্ষের চকচকে কালো গায়ে এক ঝলক প্রতিফলন দেখে—যেখানে আলো নেই, অথচ আলো আছে। সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তে অয়নের মনে হয়, রুদ্রাক্ষের ভেতর থেকে কে যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে, আর সেই চাহনিতে লুকিয়ে আছে এক নিঃশব্দ দাবি—যা অয়নের রক্ত আর শিরায় ঢুকে যায়। ভয়, বিস্ময় আর অজানা এক প্রলুব্ধ করা শক্তির টান মিশে যায়; বুকের ভেতরে শ্বাস ঘনিয়ে আসে, তবু সে দৃষ্টি ফেরাতে পারে না, হাত বাড়িয়ে আবার রুদ্রাক্ষটাকে স্পর্শ করে, আর সেই মুহূর্তেই গায়ে কাঁটা দেয়—কারণ মনে হয়, এই পাথরের তাপমাত্রা মানুষের মতোই উষ্ণ।
পরের দিন সকালবেলায় ক্লাসে বসে থাকা অয়নের চোখ আর মন বারবার চলে যায় সেই রুদ্রাক্ষের দিকে, যা সে বুকের কাছের পকেটে রাখে; বন্ধুরা মজা করে, কেউ খেয়ালও করে না, কিন্তু তৃষার চোখ এড়ায় না অয়নের অস্বাভাবিক মনোযোগ আর কপালের অদ্ভুত দৃঢ়তা। অয়ন আগের মতো হেসে কথা বলে না, বইয়ের পাতা উল্টিয়ে গেলেও চোখ থমকে থাকে শুন্যে, আর হাত বারবার অজান্তেই পকেটে চলে যায়। তৃষা যখন জিজ্ঞাসা করে, “সব ঠিক আছে তো?”—অয়ন ম্লান হেসে উত্তর দেয়, “সবই ঠিক আছে, শুধু একটু ক্লান্ত।” কিন্তু সে জানে, এ শুধু ক্লান্তি নয়, বরং এক অদ্ভুত আকর্ষণ, যা তাকে প্রতিদিন একটু করে নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে, আর সেই টান ছাড়া বাকি সবকিছু তুচ্ছ মনে হয়। দুপুরের পর, একাকী গ্রন্থাগারের কোণে বসে যখন সে রুদ্রাক্ষটাকে বের করে হাতের মধ্যে রাখে, তখন মনে হয় যেন কোনো এক পুরনো বন্ধুর স্পর্শ পেল—যার নিঃশ্বাস সে নিজের শিরায় অনুভব করতে পারে। তার মাথার ভেতরে কে যেন ফিসফিস করে, প্রলোভন দেখায়: “তুই পারবি, তুই আলাদা, তুই এই পথের যোগ্য।” অয়ন জানে না, এই কণ্ঠস্বর বাস্তব, স্বপ্ন, না তার নিজের মন; শুধু জানে, এই স্বর তার নিজের থেকেও আপন হয়ে উঠছে, আর তাতে এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পায়, যেমন অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা মানুষ পায় গভীর ঘুমের প্রতিশ্রুতি।
রাত যত এগোয়, অয়নের উপর সেই কণ্ঠস্বরের প্রভাব তত গভীর হয়—সে আর নিজের ভাবনা স্পষ্ট করতে পারে না, স্বপ্ন আর জাগরণের মধ্যে তফাত ভুলে যায়। এক রাতে ঘুম ভেঙে উঠে দেখে, নিজের অজান্তেই মেঝেতে বসে রুদ্রাক্ষটাকে সামনে রেখে ফিসফিস করে কিছু বলছে—যেমন শিখে নেয়া মন্ত্র, অথচ সে কোনোদিন শেখেনি এমন ভাষা। তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে, চোখ লাল হয়ে ওঠে, তবু থামে না; যেন সেই কণ্ঠস্বর তাকে চালাচ্ছে, আর তার ইচ্ছাশক্তি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ভোরের আলোয় সে ক্লান্ত শরীরে আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে চমকে যায়—কারণ সেখানে ক্ষীণ এক ছায়া দেখতে পায়, যা তার নয়, বরং অন্য কারো চোখের মধ্যে লুকিয়ে আছে, যার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ আর নির্মম। অয়ন জানে, এই রুদ্রাক্ষ শুধু পাথর নয়, এ এক জীবন্ত বস্তু—যার ভেতর লুকিয়ে আছে কারো স্মৃতি, কারো শ্বাস, আর অয়ন সেই ছায়ার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে এক অদৃশ্য বন্ধনে। তবু সে ছাড়তে পারে না; কারণ যতই ভয় পাক, যতই বোঝে ধ্বংসের পথ, তার হৃদয়ের গভীরে এই অন্ধকার তাকে দেয় এক অজানা শক্তির স্বাদ, এক অমোঘ নেশা—যা ছাড়া এখন আর কিছুই পূর্ণ মনে হয় না।
চার
তৃষা প্রথমে ভাবছিল এটা শুধু পরীক্ষার চাপ বা অয়নের স্বাভাবিক গম্ভীর মনের কারণেই হয়েছে, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে অয়নের চোখের মধ্যে যে অদ্ভুত শীতলতা, আর কথায় অদ্ভুত উগ্রতা লক্ষ্য করল, তাতে তার বুকের ভিতর এক অজানা আশঙ্কা জমে উঠল; কদিন আগেও অয়ন যার সঙ্গে খোলাখুলি নিজের স্বপ্ন, ভয় আর হতাশার কথা বলত, সেই অয়ন এখন যেন তার থেকে অনেক দূরের কেউ, যার মন এক অদৃশ্য অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। তৃষা একদিন সরাসরি অয়নকে জিজ্ঞাসা করল, “তুই ঠিক আছিস তো?” অয়ন চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, “সব ঠিক আছে, শুধু একটু ক্লান্ত লাগছে,” কিন্তু সেই হাসিতে এমন একটা কৃত্রিমতা ছিল, যা তৃষাকে আর নিশ্চিত করতে পারল না। সেদিন রাতে তৃষা ঘুমোতে গিয়ে এক অজানা দুঃস্বপ্ন দেখল—সাদা ছাইয়ের শ্মশান, কালো আগুন আর তার মধ্যে অয়নের মুখ, যার চোখ আগুনের মতো লাল। ঘুম ভেঙে বুক ধড়ফড় করছিল, কপাল ঘামে ভিজে গিয়েছিল, আর মনে হচ্ছিল অয়ন কিছু একটার মধ্যে আটকা পড়েছে, যা ওকে প্রতিনিয়ত নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে, আর তৃষা চাইলেও তাকে ছাড়াতে পারছে না। পরদিন ক্লাস শেষে তৃষা অয়নের ব্যাগ থেকে উঁকি মেরে দেখল, আর তখনই প্রথমবার রুদ্রাক্ষটাকে স্পষ্ট দেখতে পেল—অসামান্য চকচকে কালো, যার গায়ে অজানা চিহ্ন আঁকা, আর সেই রুদ্রাক্ষের দিকে তাকিয়েই তৃষার মনে হল, যেন ওর বুকের ভেতর শীতল বাতাস বয়ে গেল, আর কারো নিঃশ্বাস যেন ওর কান ছুঁয়ে বলল, “তুই থামাতে পারবি না…”।
তৃষা সেই রাতে সিদ্ধান্ত নিল কিছু একটা করতেই হবে, শুধু দূর থেকে দেখা আর ভাবলে হবে না; ও জানত অয়ন কখনোই নিজের মুখে স্বীকার করবে না, তাই সে শহরের এক প্রাচীন মন্দিরের পাশে থাকা বয়স্ক পন্ডিত দেবব্রত মুখার্জীর কাছে গেল, যার কথা শুনেছিল লোকমুখে—যে নাকি তন্ত্র, পুরাণ আর অভিশাপের অনেক রহস্য জানে। পন্ডিত ভুরু কুঁচকে শুনল তৃষার কথা, রুদ্রাক্ষের বর্ণনা শুনে গম্ভীর হয়ে বলল, “এটা কোনো সাধারণ জিনিস নয় মা, এটার ভেতর কারো আত্মা বন্ধ রয়েছে, যা নতুন মালিকের মনকে গ্রাস করতে পারে, আর একবার দখল নিলে তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।” তৃষার হাত ঠাণ্ডা হয়ে এল, গলা শুকিয়ে গেল, তবু সে জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে কী করা যায়?” পন্ডিত ধীরে বলল, “তোর বন্ধুকে রক্ষা করতে হলে ওকে বোঝাতে হবে যে এই পাথর ছাড়া ও বাঁচতে পারবে, আর ওর মন শক্ত রাখতে হবে—কিন্তু যদি ও মন থেকে স্বীকার না করে যে ওর জীবনে অন্ধকার ঢুকেছে, তখন তন্ত্র বা মন্ত্র কিছুই কাজে দেবে না।” তৃষা জানত অয়ন কখনোই সহজে স্বীকার করবে না, তবু তৃষার চোখে ভয় আর দৃঢ়তা পাশাপাশি ফুটে উঠল; সে বুঝল, এ লড়াই শুধু রুদ্রাক্ষের নয়, অয়নের আত্মার জন্যও।
পরের দিন তৃষা আবার অয়নের কাছে গেল, তার হাতে হাত রাখল, চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “আমি জানি তুই বদলে যাচ্ছিস, আমি জানি তোর মধ্যে কিছু ঢুকে পড়েছে, যা তোর নয়—আমাকে বিশ্বাস কর, আমি তোর সঙ্গে আছি, যাই হোক।” অয়ন প্রথমে চমকে তাকাল, তারপর চোখ সরিয়ে নিল, আর হাসল সেই চেনা কৃত্রিম হাসি, কিন্তু তৃষা তার হাত শক্ত করে চেপে ধরল; সেই মুহূর্তে অয়নের চোখের কোণায় এক ঝলক দেখা গেল লাল রঙের ঝিলিক, যা তৃষাকে শিউরে তুলল, কিন্তু তৃষা হাত ছাড়ল না। অয়ন ঠোঁট নড়িয়ে কী যেন বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই মনে হল যেন কারো অদৃশ্য হাত ওর গলা চেপে ধরল, আর সে থেমে গেল। তৃষা বুঝতে পারল, লড়াই শুরু হয়ে গেছে—এখন শুধু অয়নের সঙ্গে নয়, বরং সেই পুরনো তান্ত্রিক ছায়ার সাথেও, যা শতাব্দীর অন্ধকার পেরিয়ে অয়নকে নিজের করে নিতে চাইছে।
পাঁচ
সন্ধ্যের আবছা আলোয় পন্ডিত দেবব্রত মুখার্জীর ছোট্ট ঘরটা যেন আরও রহস্যময় মনে হল, যেখানে চারদিকে ঝোলানো তামার ঘণ্টা, পুরনো গ্রন্থ আর ধূপের গন্ধে ভরা বাতাস অদ্ভুত এক আবহ তৈরি করে। তৃষা ধীরে ধীরে অয়নকে নিয়ে গেল সেই ঘরে; অয়নের চোখে তৃষার আস্থা আর ভয়ের মিশ্র ছায়া দেখে পন্ডিত গভীর দৃষ্টি মেলাল, আর অয়নের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “তুই কি জানিস, কী নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস?” অয়ন প্রথমে চুপ করে থাকল, চোখ নামিয়ে নিল, তারপর আস্তে বলল, “আমি জানি এটা অস্বাভাবিক, কিন্তু এটা আমাকে এক অদ্ভুত শক্তি দেয়—যা আগে কোনোদিন পাইনি।” পন্ডিত চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকাল, তারপর বলল, “এ রুদ্রাক্ষ সাধারণ রুদ্রাক্ষ নয়, এ এক অভিশপ্ত আত্মার শিকল, যা নতুন মন খুঁজে পেলে তার ভেতরে ঢুকে বসে, আর শেষ পর্যন্ত ওকে নিজের মতো করে গড়ে তোলে।” অয়ন ধীরে বলল, “কিন্তু আমি তো শুধু খুঁজে পেয়েছিলাম, আমি কিছু করিনি।” পন্ডিত বলল, “তুই তোর ইচ্ছায় একে ছাড়তে পারবি? যদি পারিস, তাহলে মুক্তি পেতে পারিস; না পারলে ও তোর সমস্ত শক্তি শুষে নেবে, আর একসময় তুই আর তুই থাকবি না—তুই হয়ে যাবি সেই তান্ত্রিকের হাতিয়ার।”
ঘরের মধ্যে ধূপের ধোঁয়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল, আর অয়ন টের পাচ্ছিল বুক ভারী হয়ে আসছে, মাথার মধ্যে কে যেন ফিসফিস করছে, “ওর কথা শুনিস না, তুই আমাকে ছাড়বি না, আমি তোকেই বেছে নিয়েছি…”। অয়ন এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল, কপালের রগ দপদপ করছিল, কিন্তু হঠাৎ তৃষার হাতের স্পর্শ টের পেয়ে সে চোখ খুলল; তৃষার চোখে সেই চেনা মমতা আর উদ্বেগের ছাপ দেখে অয়ন টের পেল, সে একাই নয়। পন্ডিত তখন ধীরে ধীরে বলছিল, “তুই যদি সত্যিই মুক্তি পেতে চাস, প্রথমেই তোর মন থেকে একে ছাড়তে হবে—কারণ তন্ত্র বা মন্ত্র ততক্ষণ কাজ করবে না, যতক্ষণ তুই নিজে না চাইবি। আর মনে রাখ, এ আত্মা ছলনায় পারদর্শী; ও তোকে এমন দেখাবে, যা তুই দেখতে চাস—তোর লোভ, তোর ভয়, তোর অন্ধকার।” অয়নের মাথা নিচু, চোখে যেন লড়াই চলছে, মনে হচ্ছে বলতে চায়, “আমি পারব না ছাড়তে…” কিন্তু তৃষার হাত আবার শক্ত করে ধরল, আর সেই একটুখানি স্পর্শে অয়ন মনে মনে ঠিক করল, অন্তত চেষ্টা করবে।
পন্ডিত তখন বলল, “আমাদের হাতে সময় বেশি নেই; যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে মুক্ত করতে হবে, কিন্তু তোর বন্ধুর মন যদি না মানে, ওর শরীর আর আত্মা তখন ভেঙে পড়বে।” তৃষা অয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুই পারবি, আমি তোর সঙ্গে আছি।” অয়ন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল তৃষার চোখে, তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আস্তে মাথা নাড়ল। পন্ডিত ততক্ষণে মাটির উপর ত্রিভুজ আঁকতে শুরু করেছে, ধূপকাঠি জ্বালিয়েছে আর ফিসফিস করে কিছু মন্ত্র বলতে শুরু করেছে; ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এল, আর অয়ন মনে মনে অনুভব করল, ভেতরের সেই ছায়া যেন অস্থির হয়ে উঠেছে, ফোঁপাচ্ছে, গর্জন করছে, কিন্তু তৃষার হাতের গরম আর স্পর্শ তাকে ভেঙে পড়তে দিচ্ছে না। অয়নের বুকের গভীরে এক অজানা আশা জেগে উঠল—হয়তো এখনো খুব দেরি হয়ে যায়নি।
ছয়
রাত্রির নিস্তব্ধতায় অয়নের ঘর যেন এক অদৃশ্য লড়াইয়ের মঞ্চে পরিণত হয়; বাইরের শহর তখন নিস্তব্ধ, দূরের গলির কুকুরের ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই, কিন্তু অয়নের বুকের মধ্যে যেন বজ্রপাতের মতো প্রতিধ্বনি, প্রতিটি নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। তার হাতে ধরা থাকে সেই অভিশপ্ত কালো রুদ্রাক্ষ, আর মনে হয় পাথরটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা ছায়া তাকে স্পষ্ট করে ডাকছে—“তুই একা নোস, আমি তোর ভিতরেই আছি… তুই যা চাস, আমি দিতে পারি…”। অয়ন জানে এই ডাকের মধ্যে মিথ্যা আর সত্যের অদ্ভুত মিশেল আছে; একদিকে সীমাহীন শক্তির প্রলোভন, অন্যদিকে নিজের মানুষটাকে, নিজের মনটাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। পন্ডিত দেবব্রত মুখার্জীর কথাগুলো বারবার মনে পড়ে—“তোর মন যদি একে সত্যিই ছাড়তে না চায়, কিছুতেই তোর মুক্তি হবে না…”। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অয়ন নিজেই বুঝতে পারে না তার মন আসলে কী চায়; কারণ এই রুদ্রাক্ষই যেন তাকে আগের চেয়ে সাহসী, আত্মবিশ্বাসী আর অদম্য করে তুলেছে, অথচ সেই সঙ্গে ধ্বংসের দিকে ঠেলছে। তার স্বপ্নগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—লাল চোখের ছায়া, শ্মশান আর ছাইয়ের মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অয়ন নিজেকেই দেখে অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক ছায়া হয়ে গেছে।
তৃষার মুখ মনে পড়ে অয়নের; সেই উজ্জ্বল চোখ, যার মধ্যে এখনো আছে তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, যেটা হয়তো অয়ন নিজেও নিজের জন্য রাখতে পারছে না। তৃষা যেদিন পন্ডিতের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, অয়ন মনে মনে প্রথমবার চেয়েছিল এই ছায়ার হাত থেকে বাঁচতে, কিন্তু যতবারই মনে করে রুদ্রাক্ষ ফেলে দেবে বা পুড়িয়ে দেবে, অদৃশ্য কণ্ঠস্বরের শীতল ফিসফিসানি তাকে কাঁপিয়ে দেয়—“তুই ছাড়া পারবি না, তুই তোর চেয়েও বড় কিছু হতে পারিস… ভাব, কত শক্তি তোর হাতে থাকতে পারে…”। এক রাতে অয়ন নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে আয়নায় দেখে, চোখের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে সেই ছায়া; হঠাৎ ঠোঁটের কোণায় এক তৃপ্তির অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে, যেটা ওর নিজের নয়, বরং কারো অতিপরিচিত অভিশপ্ত হাসি। অয়ন শিউরে ওঠে, পেছনে সরে যায়, কিন্তু জানে এই ছায়া শুধু বাইরের নয়, বরং এখন ওর ভেতরেই আছে—আর এ লড়াই বাইরের নয়, নিজের সাথেই।
পরের দিন সকালে ক্লাসে তৃষা অয়নকে দেখে বুঝতে পারে কিছু একটার পরিবর্তন ঘটেছে; অয়নের কণ্ঠে এক ধরনের তীব্রতা, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে উন্মত্ততার ছাপ, আর চোখে অদ্ভুত লালচে আভা। তৃষা আবার বলার চেষ্টা করে, “তুই পারবি, আমি তোকে সাহায্য করব”—কিন্তু অয়ন রেগে গিয়ে বলে ফেলে, “আমাকে সাহায্য করতে হবে না! আমি যা করছি, জানি কেন করছি!” সেই মুহূর্তে তৃষা টের পায়, তার অয়নের মধ্যে আরেক অয়ন জেগে উঠেছে, যে অয়ন তৃষাকে চেনে না, বুঝতে চায় না। কিন্তু তৃষা জানে, এই অন্ধকার যতই গভীর হোক, সে হাল ছাড়বে না; অয়নের চোখে একবারের জন্যও যদি সেই পুরনো মানুষের ছায়া ফিরে আসে, সে ঠিক ধরে রাখবে। আর অয়নও জানে, তার ভিতরের ছায়া যতই শক্তিশালী হোক, কোথাও গোপনে সে এখনো চায় তৃষার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে, অন্তত একটুখানি আলো তার জন্য বেঁচে থাকুক।
সাত
রাত গভীর হতেই অয়ন নিজের ঘরে মেঝেতে বসে রুদ্রাক্ষটা সামনে রাখল, চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু জানালার বাইরে দূর থেকে ভেসে আসা রাতজাগা পাখির ডাক। আজ অয়ন ঠিক করেছে, সে সরাসরি মুখোমুখি হবে সেই ছায়ার, যা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। রুদ্রাক্ষের দিকে গভীর দৃষ্টি মেলতেই মনে হল বাতাস ঘন হয়ে আসছে, আলো নিভু নিভু, আর অদৃশ্য একটা শীতলতা ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ রুদ্রাক্ষের কালো পৃষ্ঠে দেখা গেল এক প্রতিফলন, যা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে হতে অয়নের সামনে দাঁড়াল—অর্ধেক ছাইমাখা মুখ, চোখে লাল আগুনের শিখা, আর ঠোঁটে সেই অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। অয়ন প্রথমে চমকে গেল, গা ঘামতে লাগল, কিন্তু তারপর সাহস করে বলল, “তুই কে?” ছায়াটি হাসল, আর ফিসফিসিয়ে বলল, “আমি রুদ্রনাথ… সেই তান্ত্রিক, যে মৃত্যুর পরও মরে না… আর তুই আমার নতুন আশ্রয়।”
অয়ন টের পায়, ছায়ার গলায় আছে অনন্তকালের ক্লান্তি আর ভয়ের ছায়া, কিন্তু সেই সঙ্গে এক অদম্য ক্ষমতার অহঙ্কার। রুদ্রনাথ তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়, “তুই যা চাস, সব দিতে পারি—জ্ঞান, শক্তি, ভয়হীনতা… শুধু আমায় ঢুকতে দে, তোর শরীর আর মন আমার হতে দে…”। অয়নের বুকের ভিতর দপদপ করে ওঠে, কারণ সত্যিই তার ভেতর এক তীব্র লোভ জাগে—যদি সে সত্যিই সব পারে? তবু একই সঙ্গে তৃষার মুখ ভেসে ওঠে মনে, আর এক অদ্ভুত ব্যথা ছুঁয়ে যায় বুকের ভিতর। অয়ন ধীরে ধীরে বলে, “তুই কেন চাইছিস আমার ভেতর ঢুকতে?” ছায়া এক ঝলক হেসে বলে, “কারণ তুই দুর্বল, তোর ভেতরেই ফাঁকা জায়গা আছে… আর তুই জানিস, তোর হৃদয়ের একটুখানি অংশ আমায় চায়…”
কিছুক্ষণ দুই চোখে চোখ রাখে অয়ন আর সেই ছায়া; মনে হয় অন্ধকার গা ঘিরে আসছে, মাথা ভারী হয়ে যাচ্ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। রুদ্রনাথ এগিয়ে আসে, ফিসফিসিয়ে বলে, “তুই হ্যা বল, সব পেয়ে যাবি…”। অয়ন শোনে নিজের বুকের ভেতর সেই শব্দ—হ্যা বল… কিন্তু হঠাৎ দূর থেকে মনে হয় তৃষার গলা ভেসে এল, “তুই পারবি, তুই ছাড়তে পারিস…” সেই এক মুহূর্তের আলোকরেখায় অয়ন নিজের ভেতরে ফিরে আসে, চোখ মেলে দেখে ছায়ার চোখের আগুন নিভে যাচ্ছে। ছায়া গর্জন করে ওঠে, “তুই আমায় ফিরিয়ে দিচ্ছিস?… মনে রাখিস, তুই একা পারবি না…”। ঘরের বাতাস ঠান্ডা হয়ে যায়, আলো নিভে যায়, আর রুদ্রাক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, কিন্তু অয়ন জানে, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।
আট
পরদিন সন্ধ্যায় তৃষা আর পন্ডিত দেবব্রত মুখার্জীর সঙ্গে অয়ন আবার আসে সেই ছোট্ট ঘরে, যেখানে মাটির উপর আঁকা থাকে ত্রিভুজ, তার মধ্যে রুদ্রাক্ষ রাখা হয়, আর চারপাশে ধূপকাঠির ধোঁয়া ঘুরতে থাকে। পন্ডিত ধীরে ধীরে শুরু করে কঠিন তন্ত্রমন্ত্র, যার শব্দ অয়নের কানে প্রথমে অচেনা মনে হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে যেন সেই শব্দের ভেতর থেকে একটা পরিচিত ঢেউ ওঠে—যা অয়নের রক্তে গিয়ে মেশে। পন্ডিত বলে, “তুই রুদ্রাক্ষের দিকে তাকিয়ে বল, তুই একে ছাড়তে চাস…” অয়নের ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু কিছু বলতে পারে না; মাথার মধ্যে রুদ্রনাথের গর্জন শোনা যায়, “না! আমি তোরই অংশ! তুই আমায় ছাড়তে পারিস না…”
তৃষা অয়নের হাত শক্ত করে ধরে, চোখে চোখ রাখে, আর ফিসফিসিয়ে বলে, “তুই পারবি…” সেই স্পর্শে, সেই বিশ্বাসে অয়নের ভেতরের দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে—একদিকে রুদ্রনাথের লোভ আর অন্ধকার, অন্যদিকে তৃষার আলো। এক ঝটকায় অয়ন চিৎকার করে ওঠে, “আমি ছাড়তে চাই! আমি তুই নয়!” সেই মুহূর্তে রুদ্রাক্ষের উপর অদ্ভুত কম্পন হয়, ঘরের বাতাস ঘূর্ণির মতো ঘুরতে থাকে, ধূপের ধোঁয়া ঘন হয়ে ওঠে। পন্ডিতের মন্ত্র তীব্র হয়, তৃষা চোখ বন্ধ করে অয়নের হাত চেপে ধরে, আর অয়নের বুকের মধ্যে মনে হয় অদৃশ্য কোনো কিছু ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে—যেমন শিকড় ছিঁড়ে ফেলে গাছ।
এক অদ্ভুত আর্তনাদ ভেসে আসে, যা শোনা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়; রুদ্রাক্ষ হঠাৎ তপ্ত হয়ে ওঠে, আর তারপর নিস্তব্ধ। অয়ন ঘামে ভিজে হাপাতে থাকে, চোখ মেলে দেখে রুদ্রাক্ষ নিস্তেজ, আর ছায়ার কোনো চিহ্ন নেই। পন্ডিত গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “শেষ হয়েছে… আপাতত।” তৃষা চোখে জল নিয়ে অয়নকে জড়িয়ে ধরে, আর অয়ন প্রথমবার অনুভব করে বুকের মধ্যে এক ধরনের হালকা শূন্যতা—যেটা ভয়ের নয়, বরং মুক্তির।
নয়
কিন্তু রাতের গভীরে, যখন সবাই ঘুমিয়েছে, অয়ন বিছানায় শুয়ে টের পায় বুকের মধ্যে সেই ছায়া একেবারে চলে যায়নি—অন্তত এক ক্ষুদ্র অংশ এখনো রয়ে গেছে; কণ্ঠস্বর আর নেই, কিন্তু মন এখনো টানে সেই অন্ধকারের দিকে। অয়ন জানে, মুক্তি পেতে হলে শেষ পর্যন্ত একটিই উপায়—রুদ্রাক্ষটিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে হবে। সেই রাতে সে একা যায় শহরের বাইরে পুরনো শ্মশানে, যেখানে প্রথম রুদ্রনাথ তার সাধনা করেছিল, হাতে রুদ্রাক্ষ নিয়ে দাঁড়ায় আগুনের সামনে।
হাত কাঁপে, কারণ সেই অন্ধকার টানে, ফিসফিস করে বলে, “আমায় ফেলিস না… তুই একা হয়ে যাবি…”। অয়ন চোখ বন্ধ করে ভাবে তৃষার মুখ, তার চোখের সেই অটল বিশ্বাস, আর নিজের ভেতরের সেই আলো, যা এখনো নিভে যায়নি। এক ঝটকায় সে রুদ্রাক্ষটাকে আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে দেয়; আগুন তীব্রভাবে জ্বলে ওঠে, আর অয়ন মনে মনে অনুভব করে, বুকের গভীর কোনো বন্ধন ছিঁড়ে গেল। সেই ছিঁড়ে যাওয়ার ব্যথা অসহ্য, চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে, হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে পড়ে, কিন্তু সেই ব্যথার ভেতরেই অয়ন টের পায় এক অজানা হালকাভাব—যেন অনেক বছর ধরে বয়ে চলা বোঝা এক মুহূর্তে নামিয়ে রেখেছে।
আগুনের লেলিহান শিখায় রুদ্রাক্ষ ধীরে ধীরে ভস্ম হয়ে যায়, আর অয়ন চুপচাপ বসে থাকে, যতক্ষণ না শেষ অঙ্গারটুকু নিভে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে প্রথমবার ভাবে, তার জীবন আবার শুরু হতে পারে, তৃষার সঙ্গে, নিজের সঙ্গে; যদিও সে জানে, এই ছায়া তাকে চিরকাল ছুঁয়ে থাকবে, কিন্তু সেই ছায়াকে আর সে ভয় পায় না—কারণ সে জানে, নিজেকেই জয় করতে হয়।
দশ
পরদিন সূর্য ওঠে; অয়ন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দেখে রোদ ভিজিয়ে দিচ্ছে ঘরটাকে। তৃষা আসে, চোখে উদ্বেগ আর আনন্দ মেশানো হাসি নিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “সব ঠিক তো?” অয়ন হাসে—সেই পুরনো, নিঃস্বার্থ হাসি, যার মধ্যে আর কোনো লুকানো ছায়া নেই। তৃষা বুঝে যায়, অয়ন ফিরে এসেছে—পুরোপুরি না হলেও, নিজের ভেতরের অন্ধকারটাকে চিনে নিয়েছে, তাকে জয় করার লড়াইতে জিতেছে।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অয়ন ভাবে, এই অভিজ্ঞতা তাকে আর আগের মতো থাকতে দেবে না; শ্মশানের ধোঁয়া, লাল চোখের ছায়া, রুদ্রনাথের কণ্ঠস্বর—সবই এখন স্মৃতি, কিন্তু সেই স্মৃতি তাকে শেখায় মানুষ আসলে কতো সহজেই অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে, আর কত বড় শক্তি লাগে সেই অন্ধকার থেকে ফিরে আসতে। তৃষা হাত ধরে বলে, “এখন কেমন লাগছে?” অয়ন চুপ করে থেকে বলে, “হালকা… আর ভয় নেই।”
সন্ধ্যা নামে; শহরের বাতাসে দূরের মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসে। অয়ন জানে, রুদ্রনাথের ছায়া হয়তো কোনো না কোনো সময় ফিরে আসতে পারে, অন্য কোথাও, অন্য কোনো দুর্বল মনে— কিন্তু সে জানে, মানুষের ভেতরের আলো যদি জ্বলতে থাকে, সেই ছায়া চিরকাল রাজত্ব করতে পারে না। আর সেই ভিড়ের মধ্যেই অয়ন আর তৃষা হাঁটে—পাশাপাশি, একসঙ্গে, ছায়াহীন এক নতুন সকালের দিকে।


