অর্ঘ্য মৈত্র
পর্ব ১: দোতলার জানালার ধারে
বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ করে। জানালার পাশে বসে চুপচাপ শুনছি সেই শব্দগুলো, ঠিক যেমন করে শোনতাম ছোটবেলায়। সেই দোতলার ঘরটা, যেখানে একটা কাঠের টেবিল ছিল, তার ওপর সাদা কাপড়ে মোড়া একটা গোল ক্যালেন্ডার। জানালার ওপাশে ছিল বকুলগাছ, আর গাছের মাথায় লুকিয়ে থাকত বৃষ্টির ফোঁটাগুলো। আজকের দিনটা যেন সেই পুরোনো দিনের মতই, শুধু বদলে গেছে সময় আর শহর। মনে হচ্ছে, যেন আবার ফিরে গেছি দক্ষিণ কলোনির সেই ছোট্ট বাড়িটায়, যেখানে আমার ছেলেবেলা জমে ছিল একেকটা গল্পের মত।
আমি অর্ঘ্য, জন্মেছিলাম এক শীতের সকালে। মা বলে, সেদিন খুব কুয়াশা ছিল, হাসপাতালের জানালা দিয়ে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু আমার জন্মের পর সবাই নাকি বলেছিল, “এত ঠান্ডায় এত গরম ছেলে!” আমার মা-বাবা সাধারণ মানুষ। বাবা ছিলেন একটা স্কুলের অঙ্কের মাস্টার, মা তখন গৃহিণী। আমাদের বাড়ি ছিল ছিমছাম, সাদা রং করা, ছাদে একটা জলপাই গাছ, যার নিচে আমি খেলতাম আমার ছোট দিদির সঙ্গে।
জীবনের প্রথম স্মৃতি কী? হয়তো সেই জানালার ধারে বসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকা। কিংবা বাবা যখন আমাকে প্রথম স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, আমার হাত শক্ত করে ধরে ছিলেন। আমি কাঁদছিলাম না, শুধু চারপাশটা দেখে অবাক হচ্ছিলাম—নতুন বন্ধু, নতুন ক্লাস, আর নতুন গন্ধ—চকের গন্ধ, স্লেটের গন্ধ। স্কুলের নাম ছিল “ভবানীপুর প্রাইমারি স্কুল।” সাদা জামা, নীল প্যান্ট, আর দু’চুলে তেল দিয়ে আঁচড়ানো চুল। মা খুব যত্ন করে আমাকে রোজ সাজিয়ে দিতেন। সকালে উঠে গরম জল দিয়ে মুখ ধোওয়া, তারপর রান্নাঘর থেকে মায়ের গলা—“অর্ঘ্য, তোর মিল্কটা শেষ কর।” আমি জানি না কেন, ছোটবেলায় দুধ খেতে একেবারেই ভালো লাগত না, কিন্তু মা তখন একটা গল্প বলতেন—“একদিন এক ছোট্ট রাজা ছিল…” আর গল্প শুনতে শুনতে আমি দুধটা গিলে নিতাম।
বাড়ির পেছনে একটা বাগান ছিল। ছোট্ট, কিন্তু আমার স্বপ্নের রাজ্য। একটা কাঁঠালের গাছ, দুটো পেয়ারা গাছ, আর একদিকে একটা গন্ধরাজ ফুলের গাছ। দুপুরবেলা স্কুল থেকে ফিরে আমি ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে সোজা ছুটতাম বাগানে। পায়ে হাওয়া, মাটিতে নরম কাদা, আর মাথার ওপর সোনালী রোদ। কত দিন ধরে সেই বাগানে বসে গল্প লিখেছি, পাতা ছিঁড়ে পাখি বানিয়েছি, আবার কখনো গাছের ছায়ায় বসে কাঁদতাম, যদি স্কুলে কিছু ভুল করে ফেলি। পেয়ারা গাছের পাতার তলায় আমি একদিন একটা পিঁপড়ের দল দেখে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম। জীবন তখন যেন থেমে গিয়েছিল।
আমার প্রথম বন্ধু ছিল রতন। ও ছিল পাশের বাড়ির ছেলে, কিন্তু আমাদের সম্পর্ক ছিল ভাইয়ের মত। রতনের সঙ্গে ছুটে বেড়িয়েছি গলির পর গলি, পয়সা জমিয়ে কিনেছি বরফের লজেন্স, আর দুপুরবেলা লুকিয়ে পুকুরে নেমে সাঁতার কেটেছি। সেই পুকুরটা ছিল বিশাল, কিন্তু আমাদের কাছে সেটা ছিল সাগরের চেয়েও বড়। একদিন সেখানে পড়ে গিয়ে আমি বেশ ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু রতন আমাকে টেনে তুলেছিল—সেদিনই বুঝেছিলাম, বন্ধু মানে শুধু খেলার সঙ্গী নয়, জীবন বাঁচানোর মানুষও।
বাবা ছিলেন শান্ত, ধীর, কিন্তু একেবারে নিয়মের মানুষ। সকাল ছ’টায় উঠে চা, তারপর রেডিওতে খবর, তারপর পেপার পড়া—সব কিছু এক ছকে বাঁধা। কিন্তু তাঁর চোখের মধ্যে একটা কষ্ট লুকিয়ে থাকত, যা আমি অনেক বড় হয়ে বুঝেছি। চাকরির কষ্ট, সংসারের বোঝা—সব তিনি চুপ করে বইয়ের পাতায় লুকিয়ে ফেলতেন। কিন্তু আমার জন্য, তিনি সব কিছু ভুলে যেতেন। আমি যখন ক্লাস ফাইভে অঙ্কে প্রথম হলাম, তিনি চুপচাপ আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন—”ভালো করিস, বাবা, অনেক দূর যেতে হবে তোকে।” তাঁর সেই হাতের স্পর্শে যে আশীর্বাদ ছিল, তা আজও আমার বুকের ভেতর জেগে থাকে।
আমার মা ছিলেন গল্পের ভাণ্ডার। রাত হলেই তিনি বলতেন—“আজকে একটা নতুন রূপকথা বলি।” আমি জানি না সেই রূপকথাগুলো কোথা থেকে আসত, কিন্তু প্রতিটা ছিল অদ্ভুত। একটাতে ছিল ঘুমন্ত রাজা, যিনি শুধু চাঁদের আলোয় জেগে উঠতেন। আরেকটাতে ছিল একটা খরগোশ, যে উড়ে যেতে পারত মেঘের উপর দিয়ে। আমার ছোটবেলাটা যেন সেই গল্পগুলোর মাঝেই গড়ে উঠেছিল। আজও যখন খুব ক্লান্ত লাগে, আমি মনে মনে সেই গল্পগুলোকে খুঁজি, মা’র কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি শুনি।
রবিবার ছিল আমাদের পরিবারে এক পবিত্র উৎসব। সকালের পাঁঠার মাংসের গন্ধ, বাবার হাতে ছাঁটা পেঁয়াজ, মায়ের মুখে এক টুকরো হাসি—সব মিলে সেই দিনগুলো ছিল নির্ভেজাল। দিদি তখন রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনত, আর আমি আমার লাল রঙের টেবিল পাখাটা চালিয়ে ছবি আঁকতাম। সেই ছবিগুলোতে ছিল সাদা মেঘ, রঙিন ঘর, আর একটা জানালা—সব ছবিতেই একটা জানালা থাকত, যেন আমি জানালার ওপার থেকেই আমার কল্পনার জগতে ঢুকে পড়ি।
আজ এত বছর পর, অন্য এক শহরে, অন্য এক জীবনে এসে বসে যখন এইসব মনে পড়ে, তখন একরাশ ভালোলাগা আর মনখারাপ মিশে যায়। মনে হয়, যদি আবার একদিন ফিরে যেতে পারতাম সেই জানালার ধারে, বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে মা’র কণ্ঠস্বর শুনতাম—“অর্ঘ্য, খিচুড়ি রেডি।” স্মৃতির খাতাটা খুলে বসেছি, কারণ এখন মনে হচ্ছে, আমি অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি। হয়তো সেই ভুলে যাওয়ার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় নতুন করে মনে পড়ার ইচ্ছা। আর সেই ইচ্ছাই আমাকে ফের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আমার ছোট্ট দোতলার ঘরে, জানালার ধারে, সেই বকুলগাছের ছায়ায়।
পর্ব ২: বেল বাজল, ছুটির সময়
স্কুল মানেই কি শুধু পড়াশোনা? আমার ছেলেবেলার চোখে স্কুল ছিল একটা রঙিন রঙতুলির বাক্স—যার প্রতিটা দিনে নতুন ছবি আঁকা হত। ‘ভবানীপুর প্রাইমারি স্কুল’ নামটা আজও আমার কানে বাজে। ছোট্ট একটা দোতলা স্কুলবাড়ি, সামনের উঠোনে খেজুর গাছ, আর একটা লাল রঙের ঘণ্টা—যেটা টানলেই পুরো স্কুলটা হইহই করে উঠত।
প্রথম দিন যখন স্কুলে যাই, আমার গালদুটো ছিল ভয় আর কৌতূহলে গোলগাল। মা নিজে হাতে ব্যাগ গুছিয়ে দিয়েছিলেন—তাতে ছিল দুটো খাতা, একটা স্লেট, এক জোড়া চক, আর একটা অ্যালুমিনিয়ামের ডাব্বায় মুড়ি আর নারকেলভাজা। মা বারবার বলছিলেন—“সবাইকে নমস্কার করবি, পড়াশোনা মন দিয়ে করবি।” আমি চুপ করে মাথা নাড়ছিলাম, কিন্তু মনে মনে ভাবছিলাম—যদি ভুলে যাই কোনটা স্লেট আর কোনটা খাতা?
আমার ক্লাসটিচার ছিলেন গঙ্গা মিস। মাথাভরা ঝাঁকড়া চুল, কপালে বড় টিপ, আর গলায় একরাশ শব্দ—যেটা দিয়ে একাই পুরো ক্লাস চালাতেন। প্রথম দিনেই আমাদের শিখিয়েছিলেন—“শৃঙ্খলা ছাড়া মানুষ বড় হতে পারে না।” সেই শব্দটা—‘শৃঙ্খলা’—তখন বুঝতাম না, শুধু মনে হত, এটা বুঝি খুব ভয়ানক কিছু।
কিন্তু স্কুলের আসল রং ধরা পড়ে ছুটির ঘণ্টায়। দুপুর একটা বাজার পর যখন সেই লাল ঘণ্টাটা টানা হত, আমরা সবাই যেন খাঁচা ছাড়া পাখি। দৌড়, হুল্লোড়, কার ব্যাগ আগে ছোঁড়া যায় সেই প্রতিযোগিতা। আমার তখনকার সেরা বন্ধু ছিল তিনজন—রতন, শ্রীমন্ত ও মিলু। আমরা চারজন একসঙ্গে খাবার খেতাম, একসঙ্গে খেলা খেলতাম, আর একসঙ্গে দুষ্টুমি করতাম।
একদিন আমাদের ক্লাসে নতুন একজন পড়ুয়া এলো—নাম সঞ্চিতা। ওর চোখে ছিল একরকম বিস্ময়, আর মুখে অদ্ভুত নরম এক হাসি। আমাদের মাঝে সঞ্চিতা এসেই যেন একটা নতুন হাওয়া নিয়ে এল। ওর সঙ্গে প্রথম কথা বলেছিল রতন—“তুই কোথা থেকে এসেছিস?” সঞ্চিতা বলেছিল, “দিঘা থেকে।” আমরা সবাই একসঙ্গে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম—দিঘা মানে সমুদ্র, সেটা তো শুধু বইয়ে পড়েছি! ওর মুখে সমুদ্রের গল্প শুনে আমাদের ছোট্ট স্কুলঘরটা যেন ঢেউয়ে দুলতে লাগল।
শ্রেণীকক্ষে তখন কাঠের বেঞ্চ, হাত ঘষা টেবিল আর খোলা জানালার পাশে একটা ফ্যান। সেই ফ্যানটা কেমন গোঁ গোঁ করে ঘুরত, আর মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে যেত। কিন্তু তাতে কারও কিছু যেত আসত না, কারণ আমরা তখন ব্যস্ত থাকতাম খাতার মাঝে পেনসিল দিয়ে কার্টুন আঁকতে। গঙ্গা মিস হঠাৎ হেঁটে এলেই তাড়াতাড়ি বইয়ের পাতা উল্টে পড়ার ভান।
মাঝেমধ্যে স্কুলে ‘ড্রিল’ হত। সবাইকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে শিখানো হত—“বাঁ দিক দেখ!”, “ডান দিক দেখ!”, “এক, দুই, এক!” আমি কখনও ঠিকমতো পা মেলাতে পারতাম না, আর মিলু হেসে হেসে বলত—“তুই তো বাঁদরের মত চলিস!” আমি তখন রেগে যেতাম, কিন্তু মনে মনে হেসে ফেলতাম।
স্কুল মানে শুধু ক্লাসরুম না, স্কুল মানে ছিল দুপুরবেলা বেল বাজার পর লুঠপাট খেলার মজা। কেউ মার্বেল নিয়ে আসত, কেউ লাট্টু ঘোরাত, আর আমরা সবাই মিলে ব্যাঙ লাফ দিতাম। একদিন খেলতে খেলতেই হঠাৎ দেখি, একটা গোরু ঢুকে পড়েছে স্কুলের মাঠে! হুলস্থুল পড়ে গেল। গঙ্গা মিস জানালার বাইরে তাকিয়ে শুধু বললেন—“ভগবান! আজকের পাঠ অসমাপ্ত।” আর আমরা সবাই দৌড়ে স্কুলের বারান্দায় উঠে পড়লাম, যেন গোরুটা কোনো দানব!
তবে স্কুলে সব দিন যে আনন্দে কাটত, তা নয়। কিছুদিন ছিল রাগ, কাঁদুনি আর অভিমান দিয়ে ভরা। একবার অঙ্ক পরীক্ষায় আমি পাঁচ পেয়েছিলাম। বাবা চুপ করে রিপোর্ট কার্ডটা দেখে কিছু বলেননি, শুধু বলেছিলেন, “পরে কথা বলব।” সেই রাতে আমি খেয়ে ঘুমোতে পারিনি, বারবার মনে হচ্ছিল, বাবা কি আমাকে আর ভালোবাসবে না? কিন্তু সকালে উঠে দেখি, টেবিলে রাখা একটা নতুন জ্যামিতি বক্স আর একটা চিরকুট—“তুই পারবি, আমি জানি।” সে দিন বুঝেছিলাম, ভালোবাসা কখনও রাগে ফুরিয়ে যায় না।
স্কুল জীবনের আরও একটা বড় জায়গা ছিল অ্যানুয়াল ফাংশন। প্রতি বছর শীতকালে স্কুলে একটা ছোট মেলা হত। বাচ্চারা গান গাইত, নাটক করত, আর শেষে সবাইকে চকলেট দেওয়া হত। আমি একবার ‘রাজা হারু’ নাটকে সৈনিকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। মুখে রং, হাতে কাঠের তরবারি, আর গলায় সেই বিখ্যাত সংলাপ—“মহারাজ, শত্রু এসে গেছে!” স্টেজে দাঁড়িয়ে আমি থরথর করছিলাম, কিন্তু দর্শকদের হাততালি শুনে মনে হল, আমি সত্যিই কোনো যুদ্ধ জিতে এসেছি।
স্মৃতির অলিতে গলিতে ঘুরতে ঘুরতে আজ বুঝি, সেই দিনগুলো কতটা গুছোনো ছিল। তখন চিন্তা ছিল, ছুটির পর খেলতে পাওয়া যাবে তো? কালকের হোমওয়ার্ক শেষ হয়েছে তো? এখনকার মত মোবাইল, পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন, ইমেল—এসব কিছুই ছিল না। ছিল শুধু কিছু খোলা পাতা, রঙিন পেনসিল, আর বন্ধুত্বের শক্তি।
আজ এতদিন পরে, যখন নিজের ছেলেকে স্কুলে পাঠাই, তখন মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট অর্ঘ্যকে, যে ব্যাগে করে শুধু বই নয়, স্বপ্নও নিয়ে যেত স্কুলে। আমি জানি না, আমার ছেলে সেই রকম স্বপ্ন দেখে কিনা, কিন্তু আমি চুপিচুপি তার ব্যাগে একটা গল্পের বই রেখে দিই। হয়তো একদিন সে পড়বে, আর ভেবে উঠবে—“বাবা, তুমিও কি একদিন এমনই স্কুলে যেতে ভালোবাসতে?”
জীবন যতই এগোয়, স্কুল জীবন ততই দূরের একটা হালকা আলো হয়ে যায়। কিন্তু সেই আলোটাই মাঝে মাঝে ফের আমাদের পথ দেখায়। আর আমি, জানালার ধারে বসে, আজও শুনি সেই লাল ঘণ্টার শব্দ—“বেল বাজল… ছুটি!”
পর্ব ৩: লাল ব্যাগ আর প্রথম চিঠি
ছোটবেলায় কিছু কিছু জিনিস থাকে যা অজান্তেই মনের ভেতরে গেঁথে যায়—যেমন একটা লাল রঙের স্কুলব্যাগ, একটা চিঠি যার অক্ষরগুলো আজও কানের ভেতর ফিসফিস করে, কিংবা একটা চোখ যা তাকালে বুকের মধ্যে কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসত।
চতুর্থ শ্রেণিতে উঠেই মা নতুন ব্যাগ কিনে দিলেন। আগেরটা নীল ছিল, এবারেরটা চকচকে লাল। সামনে মিকি মাউসের মুখ, পাশে জিপার, ভেতরে তিনটা আলাদা খোপ। আমি ব্যাগটা পেয়ে গিয়ে যেন রাজা হয়ে গেলাম। স্কুলে গিয়ে সবার আগে ব্যাগটা বেঞ্চের ওপর রাখলাম—যাতে সবাই দেখতে পায়। মিলু বলল, “তোর ব্যাগটা যেন সিনেমার ব্যাগ!” আমি হেসে বললাম, “তোর জন্মদিনে তোকে দোব, কথা দিচ্ছি।” অথচ জানতাম, দোব না। কারণ ওই ব্যাগটা আমার ছিল, আমার একান্ত।
আমার সেই লাল ব্যাগের দিনগুলোতেই জীবনে প্রথম এসেছিল এক নতুন অনুভব—যেটাকে তখন বোঝা যায় না, শুধু বুকের মধ্যে যেন কিছু একটা কাঁপে। আমরা তখন ক্লাস ফোরের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে সামনের বেঞ্চে বসে নতুন বছরের বই গুছাচ্ছিলাম। এমন সময় নতুন ছাত্রী এসে ক্লাসে ঢুকল—নাম রাধিকা। মাথায় দুটো বেণী, হাতে জলরঙে রাঙানো আঁকিবুকি খাতা, আর চোখে এমন এক কৌতূহল যা একটা গোটা দুনিয়াকে গিলে খেতে পারে। সেদিন থেকেই বুঝলাম, কেউ কেউ একটুখানি দেখায়ই মন কেড়ে নিতে পারে।
রাধিকা খুব শান্ত মেয়ে ছিল, পড়াশোনায় ভালো, আঁকায় দুর্দান্ত। ক্লাসের দেয়ালে যখন পুজোর আগে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা হচ্ছিল, তখন ও একা হাতে একটা দুর্গার ছবি এঁকেছিল—যেটা দেখে গঙ্গা মিস বলেছিলেন, “এই মেয়েটা বড় হয়ে নাম করবেই।” আমি তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, চুপচাপ। কিছু বলিনি, শুধু মুগ্ধ হয়ে তার ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
দিন যায়, সপ্তাহ যায়। আমি আর রাধিকা ধীরে ধীরে কাছাকাছি আসি। খেলার সময় পাশে বসি, টিফিন ভাগ করে খাই, আঁকাবাঁকা খাতায় একে অন্যের নাম লেখি। একদিন খেয়াল করলাম, রাধিকা আমাকে একটা ছোট্ট কাগজে ভাঁজ করে কিছু দিল। বলল, “বাড়ি গিয়ে পড়িস, স্কুলে পড়িস না।” আমি বুক ধুকধুক করতে করতে সেই কাগজটা ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে রাখলাম।
সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে দরজা বন্ধ করে ব্যাগটা খুললাম। কাগজটা খুলতেই দেখি, গোলাপি পেনসিলে লেখা—
“তুই ভালো আছিস তো? আমার খুব ভালো লাগে তোর সঙ্গে গল্প করতে।”
তার নিচে একটা ছোট্ট স্মাইলি মুখ আঁকা। সেই চিঠিটা পড়ে আমি বোবা হয়ে গেছিলাম। আমি জানি না কেন, কিন্তু মনে হচ্ছিল, আমার ভিতরটা কেমন জ্বলজ্বল করছে। আমি যেন হঠাৎ বড় হয়ে যাচ্ছিলাম, অথচ তখনও আমার দাঁতের ফাঁকে বাচ্চা দাঁত ঝুলে ছিল।
রাধিকার সেই চিঠি ছিল আমার জীবনের প্রথম ‘ভালো লাগা’র দলিল। আমি পরদিন এক পুরনো সাদা কাগজে লিখলাম—
“আমিও তোকে খুব পছন্দ করি। একদিন একসঙ্গে অনেক ছবি আঁকব।”
কিন্তু সাহস পেলাম না ওকে দেওয়ার। ভাঁজ করে রাখলাম পেন্সিলবক্সে, দিনের পর দিন। তারপর একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল খুব, ক্লাসে সবাই ভিজে এসেছিল, শুধু আমি আর রাধিকা জানালার ধারে বসে ছিলাম। হঠাৎ আমি কাগজটা বের করলাম, চুপিচুপি ওর হাতে দিলাম। রাধিকা কিছু বলল না, শুধু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে একটা মুচকি হাসি দিল। সেই হাসিটা আজও আমার চোখে লেগে আছে।
তারপর থেকে আমরা ছিলাম এক আলাদা বন্ধুত্বে—যেটা কেউ টের পেত না, কেউ জানত না, কিন্তু আমরা জানতাম। আমরা একসঙ্গে আঁকতাম, একে অপরের খাতায় লুকিয়ে লিখে রাখতাম পংক্তি—
“তুই আঁকা শুরু কর, আমি রঙ করব।”
যেন জীবনটাই একটা খাতা, আর আমরা দুজন মিলে তা রাঙাচ্ছিলাম।
একদিন আমাদের স্কুলে ‘স্মৃতি দিবস’ পালিত হচ্ছিল। সবাইকে বলতে বলা হয়েছিল—স্কুলের সেরা স্মৃতি কী? আমি কিছু বলতে পারিনি। কারণ আমার সেরা স্মৃতিটা কাউকে বলা যেত না। আমি শুধু চুপ করে ছিলাম, আর রাধিকা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তখন বুঝেছিলাম, ভালোবাসা বলতে সব সময় বড় শব্দের দরকার হয় না। মাঝে মাঝে শুধু একটা চোখের দৃষ্টিই যথেষ্ট।
চতুর্থ শ্রেণি শেষ হতেই রাধিকা হঠাৎ করেই স্কুল ছেড়ে দিল। কেউ বলল, ওর বাবা বদলি হয়েছেন, কেউ বলল, অন্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে। আমি কিছু জানতাম না। শেষদিন আমি ওর জন্য একটা ছোট্ট চিঠি লিখেছিলাম, নিজের আঁকা একটা রঙিন চিঠি, যার শেষ লাইনে ছিল—
“তুই আমার ছবি হয়ে রয়ে গেলি, চিরকাল।”
ও কি সেই চিঠিটা পেয়েছিল? আজও জানি না। কিন্তু সেই রাধিকা, সেই চিঠি, সেই লাল ব্যাগ, আমার স্মৃতির অ্যালবামের পাতায় এখনো খোলা পড়ে আছে।
বড় হয়ে আমরা অনেক কিছু শিখি—সংযম, বাস্তবতা, যুক্তি। কিন্তু ছোটবেলার সেই নিষ্পাপ ভালো লাগা, সেই গোলাপি কাগজে লেখা ছোট্ট প্রশ্ন—“তুই ভালো আছিস তো?”—এই সবই তো আমাদের মানুষ করে তোলে।
আজও কোথাও যখন বৃষ্টি পড়ে, আমি জানালার ধারে দাঁড়াই, আর মনে পড়ে সেই চিঠি, সেই চোখ, সেই ক্লাসরুম, আর একটা ছেলেবেলার প্রেম—যেটা কোনো প্রেমপত্রে শেষ হয়নি, শুধু মনের খাতায় থেকে গেছে।
পর্ব ৪: ছাদে বসে রেডিও
আমাদের বাড়ির ছাদটা ছিল যেন আমার ছোট্ট রাজ্য। দক্ষিণ কলকাতার সেই একতলা বাড়ির ওপরে সিঁড়ি বেয়ে উঠলে চোখে পড়ত একটা খোলা আকাশ, কিছু তার চেয়েও খোলা পাতা, আর একটা পুরনো রেডিও—যেটা আমার দিদির প্রাণ ছিল, আর আমার কৌতূহলের উৎস।
সেই সময়টায় টেলিভিশন ছিল না। অন্তত আমাদের বাড়িতে ছিল না। শুধু পাশের বাড়ির বাচ্চারা মাঝে মাঝে দূরদর্শনে কার্টুন দেখে এসে আমাদের গল্প শোনাত—“আজকে টম আর জেরি কি করল জানিস?” আমি মন খারাপ করে বলতাম, “আচ্ছা, টমটা সবসময় মারে কেন?” তখন দিদি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলত, “ওরা কার্টুন, ওদের দুঃখ লাগে না।” কিন্তু আমি বুঝতাম, যে কিছু দেখেনি, সে অনেক কিছু কল্পনা করতে পারে।
ছাদে উঠলেই এক কোণে রাখা থাকত সেই রেডিওটা। একটা পুরনো ন্যাশনাল প্যানাসনিক, যার অ্যান্টেনা অনেকটা ঝুঁকে পড়েছিল, আর ভলিউম ঘোরালে ‘ঘঁ-ঘঁ’ আওয়াজ করত। দিদি বিকেলে আমাদের প্রাইভেট টিউশন শেষে ছাদে বসে রেডিও চালাত—বেশিরভাগ সময় অল ইন্ডিয়া রেডিওর রবীন্দ্রসংগীত। আমি তখন বইয়ের ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে দৌড়ে যেতাম ছাদে, আর দিদির পাশে বসে চোখ বন্ধ করে শুনতাম—
“আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে…”
সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ছিল। আমি জানতাম না তখন গান কীভাবে কাজ করে, কিন্তু মনে হত আমার ভেতরের কোনো বন্ধ জানালা খুলে যাচ্ছে। রোদের মধ্যে, দিদির গলার সঙ্গে রেডিওর গলা মিশে যেত। আমার দিদি গান জানত না, তবু কী আশ্চর্য, ওর কণ্ঠস্বর ছিল যেন মেঘলা দুপুরের রোদ।
ছাদের একটা কোণ ছিল দিদির রাজ্য—সেখানে রাখা থাকত কিছু টব, তাতে তুলসি, নিম, একটা পুদিনা গাছ। ও বলত, “তুলসির পাতা সকালে খালি পেটে খেতে হয়, জানিস?” আমি মুখ বেঁকিয়ে বলতাম, “তেতো!” কিন্তু ও জোর করেই আমার মুখে গুঁজে দিত। আর আমি হেসে হেসে দৌড়ে পালাতাম।
বাড়ির ছাদেই আমার জীবনের প্রথম ‘রেডিও নাটক’ শোনা। সন্ধ্যা ছ’টার সময়, রেডিওতে নাটক হত—’বিকেল বেলার গল্প’। একদিন শুনলাম—একটা অন্ধ ছেলের গল্প, যে পাখির ডাকে রং চিনতে পারে। আমি থ মেরে গিয়েছিলাম। সত্যি কি মানুষ শুনে রং বুঝতে পারে? দিদি বলেছিল, “শুধু চোখে নয়, মন দিয়েও দেখা যায়।” তখন বুঝিনি, কিন্তু সেই কথা আজও গায়ে কাঁটা দেয়।
ছাদের ওই এক কোণেই আমি আবিষ্কার করেছিলাম ‘নীরবতা’। কখনও কখনও বিকেলের শেষে, যখন রেডিও বন্ধ, দিদিও নীচে নেমে গেছে, তখন আমি একা বসে থাকতাম। পাখির ডাক, দূরের ট্রামের ঝাঁকুনি, আর মাঝে মাঝে হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ—সব মিলিয়ে একটা নিজের মতন জগৎ। সেই জগতেই আমি প্রথমবার আঁকতে শিখেছিলাম। টবের পেছনে লুকিয়ে থাকা পোকা, পাশের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা, বা পেঁপে গাছে বসা কাক—সবই ছিল আমার ক্যানভাসের চরিত্র।
দিদির সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল খুব মধুর। সে আমার চেয়ে চার বছরের বড়, কিন্তু বন্ধুর মত ব্যবহার করত। আমার স্কুলের খাতায় যে সব কবিতা লিখতাম, ও-ই পড়ত সবার আগে। মাঝে মাঝে হাসত, আবার কখনও বলত, “তোর মধ্যে গল্প বলার একটা ছন্দ আছে।” তখন বুঝতাম না এই কথার মানে কী, কিন্তু মন খুশি হয়ে যেত। ও রেডিওতে ‘ইউভার’ অনুষ্ঠানে চিঠি লিখত, আমার নাম করে। একদিন তো চিঠিটা পড়াও হয়েছিল! “এই চিঠিটি এসেছে দক্ষিণ কলকাতা থেকে, অর্ঘ্য মৈত্র নামের এক কিশোরের কাছ থেকে।” আমি লাফিয়ে উঠেছিলাম—“ওই আমি! ওই আমি!”
মাঝে মাঝে দিদির গলায় শুনতাম অন্যরকম গান—হেমন্ত, মান্না দে, লতা—তখন রেডিওর ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক রাখতে হত বারবার। একটু এদিক ওদিক হলেই গানটা কেটে যেত, শব্দ বিকৃত হত। তবু আমরা শুনতাম। একটা ছোট্ট গানও যেন একটা গোটা সন্ধ্যা জুড়ে রাখত। তখন গান মানে ছিল অনুভব, শব্দ নয়।
একটা বর্ষার দিন মনে পড়ে। চারদিক জলজল করছে, ছাদের কিনারা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। দিদি বলল, “চল, আজ ছাদে বসেই খিচুড়ি খাব।” মা প্রথমে রাজি হননি, কিন্তু দিদির জেদে শেষে মানতে হয়েছিল। ছাদে একটা মাদুর পেতে, চারদিক ছাতা দিয়ে ঢেকে, আমরা খিচুড়ি, বেগুনভাজা আর পাঁপড় নিয়ে বসেছিলাম। আর রেডিওতে বাজছিল—
“আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে…”
সেই মুহূর্তটার কথা ভাবলেই এখনো মনটা ভিজে যায়।
দিদি একটু একটু করে বড় হচ্ছিল। পড়াশোনার চাপে রেডিও শোনার সময় কমে যাচ্ছিল। ছাদের ওই নির্জনতা আমার একার হয়ে যাচ্ছিল। ও বলত, “এই গানগুলো একদিন তোকে বাঁচাবে রে।” আমি তখন হাসতাম। এখন বুঝি, জীবন যত কঠিন হয়েছে, ততই সেই ছাদে বসে শোনা গানগুলো আমাকে আশ্রয় দিয়েছে।
একদিন হঠাৎ করে রেডিওটা নষ্ট হয়ে গেল। ব্যাটারির ঘর পঁচে গেছিল। বাবা মেরামত করাতে নিয়ে গেলেন, কিন্তু তখন রেডিওর দিন শেষের দিকে। টিভি এসে গিয়েছে। দিদি তখন কলেজে, আমি ক্লাস সেভেনে। আমাদের সেই ছাদে একসঙ্গে বসা, গান শোনা, গল্প বলা—সব কিছুই যেন ধীরে ধীরে অতীত হয়ে গেল।
আজও মাঝেমাঝে পুরনো রেডিওর ছবি দেখি, আর শুনি ইউটিউবে সেই গানগুলো। তবু সেসবের মধ্যে সেই ছাদের হাওয়া থাকে না, সেই বিকেলের আলো থাকে না, আর থাকে না দিদির মলিন গলায় গাওয়া গান। তবু মন বলে—“তুই ছাদে চল, ওখানে রেডিও বেজে উঠবে।”
ছোটবেলায় আমরা বুঝি না, কতটা সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো। বুঝি না, সেই পুরনো রেডিওর আওয়াজ কেমন করে একটা হৃদয়ের স্পন্দনে পরিণত হয়ে যায়। এখন শুধু জানি—ছাদ মানে একটা সাদাকালো দিন, আর রেডিও মানে একটা রঙিন স্মৃতি।
পর্ব ৫: জ্বরের ছুটির দিন
জ্বরের দিনগুলো একটা অদ্ভুত সময়। ছোটবেলায় যতটা না শরীর খারাপ হতো, তার চেয়ে অনেক বেশি করে মনটা আলাদা এক ঘোরে চলে যেত। যেন পৃথিবী হঠাৎ একটু ধীরে ঘুরতে শুরু করত, রঙ ফিকে হয়ে আসত, আর সব কিছু ঘুরে ঘুরে একটাই জায়গায় এসে থামত—মায়ের কোলে।
আমার প্রথম মনে থাকা জ্বরটা হয়েছিল ক্লাস থ্রিতে। শরীরটা গরম হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি কাউকে বলছিলাম না। কারণ জানতাম, বললে স্কুলে যেতে দেবে না। আর সেদিন ছিল রাধিকার আঁকা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ। কিন্তু সকালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মা আমার কপালে হাত দিয়ে বলে উঠলেন, “তোর গায়ে জ্বর, স্কুলে যাচ্ছিস না।” আমি চুপ করে রইলাম, কোনো কথা বললাম না। শুধু জানতাম, আজকের দিনটা অন্যরকম হবে।
মা আমার খাটে একটা নরম তোষক বিছিয়ে দিলেন। চারপাশে মশারি টাঙিয়ে, একটা ছোট্ট টেবিলে থার্মোমিটার, জল, একটা সাদা কাপ, আর গ্লুকনের ডিবে রেখে বললেন—“তুই শুয়ে থাক, আমি এসে দেখি।” আমি জানালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাইরের আকাশটা তখন ধোঁয়াটে, গাছে গাছে পাখিরা ডাকছে যেন কারও শরীর খারাপের খবর পেয়ে তারাও হালকা কষ্টে আছে।
সেই প্রথম বুঝেছিলাম, জ্বর মানে শুধু গায়ে তাপ নয়। জ্বর মানে একরকম অলসতা, যেখানে ঘুম আসে না, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই হাজার রকম ছবি ভেসে ওঠে। সে ছবিগুলোর মধ্যে ছিল স্কুলের বেঞ্চ, রাধিকার আঁকা দুর্গা, বাবার মুখের চিন্তার রেখা, আর একটা কাঁথার নিচে মায়ের হাতে বুকে হাত রাখা স্পর্শ।
দুপুরবেলা মা খিচুড়ি রান্না করলেন। সেই খিচুড়ির গন্ধ যেন শুধু পেটে নয়, মনেও শান্তি দিত। বেগুনভাজা আর একটা গরমগরম আলু সেদ্ধ, সঙ্গে ডাল—জ্বরের সময়কার আমার প্রিয় মেনু। কিন্তু মা একবারেই পুরো খাওয়াতে চাইতেন না। বলতেন, “আধপেটা খাবি, বেশি খেলে শরীর ভারী হয়ে যাবে।” আমি আধমুখে মাথা নাড়তাম, আর মনে মনে ভাবতাম—কেন যেন এই দিনগুলোতেই খাবার সবচেয়ে ভালো লাগে।
জ্বর হলে যেটা সবচেয়ে বেশি লাগত, তা হল বই পড়ার সময়। মা বলতেন চোখের ক্ষতি হবে, কিন্তু আমি লুকিয়ে ‘আনন্দমেলা’ বা ‘শুকতারা’ পড়তাম। সেইসব গল্পের মধ্যে হারিয়ে যেতাম—মাসুদ রানা, ফেলুদা, রোমাঞ্চ আর রহস্য। যেন আমার বিছানার চারপাশে বইগুলো ঘোরাঘুরি করত, আর আমিও তাদের সঙ্গে জার্নিতে বেরিয়ে পড়তাম।
সেদিন বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি নামল। মেঘলা দুপুরটা একেবারে কালো হয়ে এল। দিদি স্কুল থেকে ফিরল ভেজা চুলে। এসে বলল, “তুই আজ ছুটি নিয়ে রাজা হয়ে বসে আছিস, আর আমরা পড়ে মরি!” আমি ক্লান্ত মুখ করে বললাম, “আমার মাথা ঘুরছে।” দিদি এগিয়ে এসে কপালে হাত রেখে বলল, “বাবা রে! জ্বরটা তো বেশিই!” তারপর মা এসে কপালে চেপে ধরলেন ঠান্ডা জলের কাপড়। কী শান্তি! সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই স্পর্শটাই আমার একমাত্র ওষুধ।
রাতে ঘুমানোর আগে মা আমার মাথার কাছে বসে গল্প বলতেন। সেই গল্পে থাকত রাজকুমার, ভূত, পাখি, নদী—সব মিলিয়ে এক স্বপ্নের দেশ। মায়ের কণ্ঠস্বর ছিল ধীরে ধীরে তন্দ্রার মত। আমি কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম, নিজেই টের পেতাম না। মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যেও মা’র গলা শুনতে পেতাম, “অর্ঘ্য, জল খা।” আর আমি আধো ঘুমে চোখ না খুলেই বলতাম, “আর খেতে হবে?” মা বলতেন, “একটু, শুধু এক ঢোক।” আমি খেতাম, কারণ জানতাম, মাকে না বলতে নেই।
জ্বরের দিনগুলোয় একটা জিনিস আমি খুব বুঝতাম—ভালোবাসা কতটা নীরবভাবে কাজ করে। মা কিছু না বললেও ওর চোখে সেই চিন্তার রেখা, বাবার মুখে চাপা দুশ্চিন্তা, দিদির মুখে মজা করার ভান—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত সুর। যেন আমি অসুস্থ হলেই সবাই একটু থেমে যেত, একটু ধীরে চলত।
একবার প্রচণ্ড জ্বরে আমার ঘোর লেগে গেছিল। আমি বিড়বিড় করে বলছিলাম—“আমি কোথায় আছি? রতন কোথায়?” মা সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত চেপে ধরেছিলেন—“আমি তোকে ছাড়ছি না, আমি এখানেই আছি।” সেই হাতের চাপেই আমি আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জ্বরের ঘোরে যেমন অনেক কিছু ভুলে যাই, তেমনই কিছু কিছু স্পর্শ মনে থেকে যায় চিরকাল।
জ্বরের ছুটির আরেকটা মজা ছিল টিভির লোভ। তখন আমাদের বাড়িতে টিভি আসেনি, কিন্তু পাশের বাড়ি, মিশ্রবাবুদের ঘরে রঙিন টিভি ছিল। আমি জানালার কপাট ফাঁক করে বসে থাকতাম—দেখার জন্য কিছু একটা, হোক না সাদাকালো বিজ্ঞাপনই। আর মা এসে ধমক দিয়ে বলতেন, “অর্ধেক বসে দেখছিস কেন? চোখে চাপ পড়বে!” আমি বলতাম, “তবে টিভি আমাদের ঘরেও আনো না কেন?” মা হাসতেন, কিছু বলতেন না। পরে বুঝেছিলাম, তখনও টিভি আমাদের সাধ্যের বাইরে ছিল।
জ্বর সেরে যাওয়ার পরে শরীরে ক্লান্তি থাকলেও মনটাকে এক ধরনের বিষণ্নতা ঘিরে রাখত। কারণ আমি জানতাম, আবার নিয়মে ফেরা, আবার স্কুল, পড়া, ব্যাগ টানা শুরু। আর জ্বর মানেই তো ছিল ছুটির ছাতার নিচে একপাটি মায়ের চুমু, কিছু পাতা ওল্টানো পত্রিকা, আর একফালি নিরবতার রোদ।
আজও যখন জ্বর হয়, মন চায় সব ফেলে রেখে মা’র কোলে ফিরে যেতে। কিন্তু এখন তো আমি বড় হয়ে গেছি, অফিস আছে, দায়িত্ব আছে, ওষুধ নিজে খেতে হয়। কেউ এসে আর জল হাতে দাঁড়িয়ে বলে না—“এই জলটা খা।” এখন নিজেকেই নিজের যত্ন নিতে হয়।
তবু কোথাও যেন এক কোণে রয়ে যায় সেই জ্বরের ছুটির দিন। মনে হয়, যদি একদিনের জন্য আবার ফিরে যেতে পারতাম সেই ছোট্ট ঘরে, খাটে মশারির ভিতর, আর মা এসে বলত, “আজ পড়তে হবে না, তুই শুধু ঘুমো। আমি তোকে দেখে রাখছি।”
পর্ব ৬: সাইকেলের ঘুঙুর
সাইকেল। শব্দটা শুনলেই আজও মনে পড়ে সেই ঝিকঝিকে বিকেল, একটা ঢালু রাস্তা আর বুক কাঁপানো সাহস। আমাদের গলিটা ছিল বেশ চওড়া আর শান্ত, পাশের দু’তিনটে বাড়ি ছাড়া খুব একটা গাড়িঘোড়া চলত না। বিকেল হলেই রাস্তাটা খালি হয়ে যেত, আর তখনই শুরু হত পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাইকেল চালানো শেখার ক্লাস। কারও সিটে বাঁধা থাকত রুমাল, কারও হ্যান্ডেলে ঝোলানো ঝুড়ি, কারও পেছনে ‘অজস্র বার পড়ে গেছি’ লেখা অভিজ্ঞতা।
আমার সাইকেল শেখার শুরুর দিনটা আজও মনে পড়ে। বাবা একদিন অফিস থেকে ফিরে বললেন, “তোকে একটা জিনিস দেখাব। চল।” আমি তখন ক্লাস ফাইভে। একটু ঘাবড়ে গেলাম। ভাবলাম, হয়তো পড়াশোনায় গাফিলতির জন্য বকুনি আসছে। কিন্তু বাড়ির গ্যারাজের সামনে গিয়ে দেখলাম একটা চকচকে সবুজ রঙের ছোট সাইজের সাইকেল দাঁড়িয়ে। দু’পাশে ট্রেনিং হুইল, সামনের ঝুড়িতে লাল ফুল আঁকা। আমার চোখ চকচক করে উঠল—“আমার?” বাবা হেসে বললেন, “তুই তো বলেছিলি, রতনের সাইকেলটা চাই? এটা তোর।”
আমি এক লাফে সাইকেলে চেপে বসলাম। কিন্তু ব্যালেন্স রইল না, খানিকটা এগিয়ে গিয়ে গ্যাচাং করে পড়ে গেলাম। হাঁটু ছিঁড়ে গেল, চোখে জল এসে গেল। কিন্তু তার থেকেও বেশি কষ্ট হল বাবা হেসে উঠতেই—আমি ভেবেছিলাম বোধহয় বাবা রেগে যাবেন, কিন্তু তিনি শুধু বললেন, “পড়ে গেলে আবার উঠতে হয়। প্রথম পড়াটাই তো শেখার শুরু।”
সেই থেকে শুরু হল আমার সাইকেল শিক্ষা। প্রতিদিন বিকেলে বাবা পাশে হাঁটতেন, আমি প্যাডেল মারতাম। প্রথমদিকে দু’পাশের ছোট চাকাগুলো ব্যালেন্স দিত, কিন্তু বাবা ধীরে ধীরে খুলে দিলেন একটা, তারপর আরেকটা। তারপর এল সবচেয়ে কঠিন ধাপ—একেবারে নিজের ভারে চলা। আমি বারবার পড়ে যাচ্ছি, হাঁটুতে কাঁটা, কনুইতে ছোঁয়া, তবু প্যাডেল থামাচ্ছি না।
সেদিন বিকেলে মা বকছিলেন—“এইভাবে কাটা ছেঁড়া নিয়ে খেললে কিন্তু কাল স্কুলে যেতে পারবি না!” আর বাবা তখন গম্ভীর মুখে বলছিলেন—“ও শিখছে, পড়ে পড়েই শিখছে।” সেই বাক্যটা যেন আমার জীবনের এক মন্ত্র হয়ে গেল।
একদিন অবশেষে আমি পুরোটা রাস্তা প্যাডেল করে গেলাম, পড়লাম না। বাবা একটু দূর থেকে বললেন, “দেখ, আমি ছাড়িনি তোকে, তুই নিজেই চলেছিস!” তখন আমার গায়ে কাঁটা দিল। মনে হল আমি যেন আকাশে উড়ছি। হাওয়া গায়ে লাগছে, সাইকেলের চাকা ঘুরছে, আর আমার বুকের মধ্যে ঘন্টা বাজছে—“আমি পেরেছি!”
এরপর শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। আমি রোজ স্কুল থেকে ফিরে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম। কখনও রতনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, কখনও দিদিকে পেছনে বসিয়ে বাজারে যাওয়া, কখনও নিজের মনে গান গাইতে গাইতে গলি দিয়ে চলে যাওয়া। আমার সাইকেলটা ছিল আমার নিজের পৃথিবী। সবুজ রঙের শরীরে ধুলো জমে যেত, তবু আমি পরিস্কার করতাম না, কারণ জানতাম, ওই ধুলোই আমার পথচলার চিহ্ন।
একবার দুর্ঘটনাও ঘটেছিল। পাড়ার একটা মোড়ে হঠাৎ এক কুকুর দৌড়ে এসে সামনে পড়ে যায়, আমি ব্রেক টানতে পারিনি। ধপাস করে পড়ে গিয়ে সামনের দাঁতটা নড়ে গেছিল। মা তো চিৎকার করে বলেছিলেন, “এভাবে আর সাইকেল নিয়ে বের হতে দিব না!” কিন্তু আমি চুপ করে ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। তখন দিদি এসে বলেছিল, “তুই তো আসলেই হিরো! দাঁতটাকে স্মৃতি বানিয়ে রাখিস।” আমি দাঁতের ব্যথার মধ্যেও হেসেছিলাম।
সাইকেলের সঙ্গে জুড়ে ছিল পাড়ার গন্ধ, বিকেলের আলো, আর কিছু অদ্ভুত গান—যা আমি তখন ঠিকঠাক গাইতে পারতাম না, শুধু ঠোঁটে ঠোঁটে বুনে রাখতাম। আমাদের গলির শেষে একটা ছোট্ট মন্দির ছিল, যার পাশেই একটা কাঁঠাল গাছ। আমি প্রায়ই সেখানে গিয়ে সাইকেল থামিয়ে বসে থাকতাম। ভাবতাম, আমি একা একটা জাহাজ চালাচ্ছি, যার চাকা সাইকেলের মত, আর আমি একটা যোদ্ধা, যে দুনিয়ার সব রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সেই সাইকেলটাই একদিন বড় হয়ে পড়ে রইল এক কোণে। ক্লাস সেভেন থেকে স্কুল বাসে যাতায়াত শুরু হল, নতুন ব্যাগ, নতুন পড়া, নতুন দায়িত্ব। সাইকেলের চাকা ধুলোতে ঢেকে গেল, চেন মরচে ধরল, আর ঝুড়িতে জমে উঠল শুকনো পাতা। কিন্তু আমি জানতাম, ওখানেই লুকিয়ে আছে আমার প্রথম স্বাধীনতা।
বাবা একদিন বলেছিলেন, “জীবনে প্রথম সাইকেল চালানো শেখা আর প্রথম ভালোবাসা—দুটোই ভুলে যাওয়া যায় না।” আমি জানি না ভালোবাসা তখন কী ছিল, কিন্তু সাইকেলের প্রথম প্যাডেল যে আমার মনটা বদলে দিয়েছিল, সেটা আজও অনুভব করি। আমি তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন দেখি—প্রতিটা পড়ে যাওয়া, প্রতিটা ঘুরে দাঁড়ানো, আর প্রতিটা ‘আমি পারব না’ থেকে ‘আমি পারি’—সব কিছুর মধ্যে ছিল সেই সাইকেলের গল্প।
আজও রাস্তায় কোনও কিশোর সাইকেল চালাতে শেখার চেষ্টা করলে আমি একটু দাঁড়িয়ে পড়ি। যদি পড়ে যায়, মনে মনে বলি—“ওটা দরকার, কারণ পড়ে যাওয়া মানেই থেমে যাওয়া নয়। পড়ে উঠে চলাই তো শিখতে শেখার আসল ক্লাস।”
পর্ব ৭: রেডিওর চিঠি আর দিদির কলেজ
যে সময়গুলো একসাথে কাটাই, তখন তাদের গুরুত্ব বোঝা যায় না। তারা আমাদের মধ্যে মিশে থাকে নিঃশব্দে—একটা রুটিনের মত, একটা নিঃশ্বাসের মত। কিন্তু একদিন, হঠাৎ, কেউ সেই সময় থেকে সরে যায়। তখন বুঝি, কারও উপস্থিতি না থাকাটা কতটা শব্দহীন অথচ কানে বাজে।
দিদি আমার থেকে চার বছরের বড় ছিল, কিন্তু সম্পর্কটা ছিল সমান সমান। বন্ধু, অভিভাবক, সমালোচক, সঙ্গী—সব ভূমিকায় ও ছিল অনায়াস। আমরা একসাথে ছাদে বসতাম, গান শুনতাম, টবের গাছগুলোতে জল দিতাম, আর মাঝে মাঝে রেডিওতে ইউভার প্রোগ্রামে ফোন করতাম।
সেই সময় অল ইন্ডিয়া রেডিওর একটা বিভাগ ছিল যেখানে ওরা ফোন করে গান চাইত, চিঠি পাঠাত। দিদি মাঝে মাঝে আমার নামে চিঠি লিখত, যেন আমি পাঠিয়েছি। আমার নাম, আমার স্কুল, আমার প্রিয় গান—সব লিখে পাঠিয়ে দিত। আর তারপর যখন চিঠি পড়া হত, তখন দিদি আমাকে ডাকত, “দৌড়ে আয়, শুন, এবার তোর নাম পড়বে!” আমি লাফ দিয়ে যেতাম, মনে হত গোটা পৃথিবী যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
একদিন হঠাৎ করে দিদি বলল, “আমি বাইরে পড়তে যাব।” আমি চুপ করে গেছিলাম। ‘বাইরে’ শব্দটা তখন এতটা ভয়ংকর শোনায়নি কোনোদিন। কোথায় যাবে? কত দূর? কতদিনের জন্য? এসব প্রশ্ন করতে পারিনি, শুধু একরাশ ভয় জমে উঠেছিল। মা একটু কাঁদছিলেন, বাবা অদ্ভুত চুপচাপ ছিলেন, আর দিদি? সে হাসছিল, বলছিল, “ভয় পাস না, আমি আসব, ফোন করব, চিঠি লিখব।”
কিন্তু আমি জানতাম, এই ‘আসব’ আর ‘চিঠি’—এসব শব্দগুলো খুব আলগা। ওরা আসল সত্যিকে ঢেকে রাখে।
যেদিন দিদি ট্রেনে চেপে গেল, আমি স্টেশনে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিলাম। সে জানালার পাশে বসে ছিল, আর আমি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রেললাইনের ধারে ধারে পড়ে থাকা কাগজের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ট্রেন ছাড়ার সময় দিদি হাত নাড়ছিল, আমি শুধু একবার বলেছিলাম, “রেডিওতে চিঠি লিখবি তো?” ও হেসে বলেছিল, “লিখব।”
সেই রাতে বাড়ি ফিরেই আমি ছাদে উঠেছিলাম। মেঘলা আকাশ, তারার আলো নেই, রেডিওটাও নীরব। একা ছাদটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। টবের গাছগুলোও যেন চুপ করে গিয়েছিল। তখন বুঝেছিলাম, শুধু একজন মানুষ না থাকলেই নয়, তার অভ্যাসটাও চলে যায়, তার স্পর্শটা হারিয়ে যায় চারপাশ থেকে।
পরদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি চুপচাপ একটা খাম রাখা আছে টেবিলে। দিদির হাতের লেখা—“অর্ঘ্যর জন্য।” তাড়াতাড়ি খুলে পড়তে শুরু করলাম।
চিঠিটা লেখা ছিল রঙিন কাগজে, দিদির আঁকাবাঁকা হাতের লেখা।
“অর্ঘ্য,
এই প্রথমবার বাড়ি ছেড়ে এত দূরে এসেছি। ট্রেন থেকে নামার পর মনে হল আমি যেন সিনেমার মধ্যে ঢুকে পড়েছি। এত অচেনা মুখ, এত হট্টগোল, আর আমি একা। কিন্তু জানিস? তুই আমার ভেতরে সবসময় আছিস। আমার ডায়েরির প্রথম পাতায় তোর ছবি আঁকা আছে—সেই যে তুই সাইকেল নিয়ে পড়ে যাচ্ছিলি, আর আমি হেসে বলেছিলাম, ‘হিরো!’
আমি এখানে নতুন বন্ধু পেয়েছি, কিন্তু তাদের সঙ্গে গল্প করতে গেলেই তোকে মনে পড়ে। রেডিওতে এখন আর চিঠি পড়া হয় না, কিন্তু আমি তোর জন্য একটা নতুন রেডিও কিনেছি, খুব ছোট, কিন্তু খুব স্পষ্ট শব্দ। আমি জানি, তুই একদিন নিজের গল্প রেডিওতে বলবি। আর আমি অনেক দূর থেকেও সেটা শুনব।
ভালো থেকিস,
দিদি।”
চিঠিটা পড়ে আমি চুপ করে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ। কাগজটার গায়ে যেন দিদির গন্ধ ছিল—একধরনের পুরনো বইয়ের ঘ্রাণ, যার মধ্যে মেশা থাকে শীতের রোদ আর ছুটির সকাল। সেই রাতটা আমি ঘুমোতে পারিনি। একটানা চিঠিটা পড়ে গেছি বারবার। বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী হচ্ছে—শুধু মনে হচ্ছিল, কিছু একটা বদলে যাচ্ছে আমার মধ্যে।
এরপর রোজ বিকেলে আমি ছাদে উঠতাম, দিদির না থাকা সত্ত্বেও। ওর সেই জায়গায় বসতাম, রেডিও চালাতাম, গাছগুলোতে জল দিতাম। একদিন রেডিও চালিয়ে শুনলাম—
“আজকের গানটা সেইসব ভাইবোনদের জন্য, যারা দূরে থেকেও একে অপরের খুব কাছে থাকে।”
আমি জানি না সেটা কাকতালীয় ছিল কিনা, কিন্তু গানটা শুনেই চোখে জল এসে গেছিল।
পরে দিদির পাঠানো আরও চিঠিতে ছিল নতুন শহরের গল্প, নতুন লাইব্রেরি, নতুন বন্ধু, আর কিছুটা হোমসিকনেস। আমি তখনও তার জবাবে চিঠি লিখতাম না। মনে হত, লিখে ফেললে ওর দূরে থাকার কথা মেনে নিতে হবে। তাই আমি শুধু ওর চিঠিগুলো যত্ন করে জমিয়ে রাখতাম, যেন ওর অনুপস্থিতি কিছুটা হলেও ছুঁয়ে থাকা যায়।
একদিন সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ মা ঘরে এসে বললেন, “চিঠি এল তোকে আবার।” আমি খুশিতে তড়িঘড়ি খামটা খুললাম। এই চিঠির মধ্যে একটা ছোট্ট কাগজের টুকরো ছিল, তাতে লেখা—
“পরের মাসে পুজোর ছুটিতে বাড়ি আসছি। রেডিওটা চালিয়ে রাখিস।”
সে চিঠি পড়েই আমি ছুটে ছাদে উঠলাম। রেডিও চালিয়ে দিলাম পুরনো ভলিউম ঘোরানো শব্দে। সন্ধ্যা গলে রাত্রি নামছিল, আর আমার মনে হচ্ছিল, এই রেডিও যেন দিদির কণ্ঠস্বর, দূর থেকে ডাকছে—“আমি ফিরছি, আমি আছি।”
পর্ব ৮: শেষ চিঠির বৃষ্টি
পুজোর ছুটি এসে গেল। আশ্বিনের সেই হালকা হাওয়া, বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ, আর গলির মোড়ে মোড়ে কাঁথা-কাঁথা আলোর মালা—সব কিছু যেন জানিয়ে দিচ্ছে কারা আসছে, কে ফিরে আসছে। দিদি সেই চিঠিতে লিখেছিল, “আসছি”—আর আমি তার পর থেকেই দিন গুনছিলাম। ভেতরে ভেতরে একটা রোমাঞ্চ, যেন কোনো হারিয়ে যাওয়া জিনিস আবার পাওয়া যাবে। মা খুন্তি বুলিয়ে মাংস রান্না করছিলেন, বাবা বাজার থেকে দিদির প্রিয় ফল আনলেন, আর আমি? আমি ছাদের রেডিওটা পরিষ্কার করে নতুন ব্যাটারি বসালাম।
যেদিন দিদি ফিরল, তখন বিকেলের আলো ধূসর হয়ে এসেছে। অটো থেকে নামল, একটা বড় ব্যাগ হাতে, আর চোখে সেই পুরনো চেনা হাসি। আমি কিছু বলার আগেই দিদি বলল, “তুই কতটা লম্বা হয়ে গেছিস রে!” আমি হেসে বললাম, “তুইও তো চশমা পড়ে বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছিস।” আমরা দুই ভাইবোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম, যেন এই কয়েকটা মাসে জমে থাকা সমস্ত কথা শরীরের স্পর্শে মিশে গেল।
সেই রাতটা ছিল আমাদের ছাদের রাত। টিনের ছাদের ওপর পায়ের শব্দ, হাওয়ায় পাতা উড়ে যাওয়া, আর মাঝখানে আমরা দুই ভাইবোন—একটা রেডিও চালিয়ে বসে আছি, যেন কিছুই বদলায়নি।
“তুই আমার পাঠানো সব চিঠি রেখেছিস?” দিদি জিজ্ঞেস করল।
আমি বললাম, “সব। একটা খামও বাদ দিইনি।”
ও হেসে বলল, “তুই তো মজার! আমি ভেবেছিলাম একটা দুটো হয়তো কেটে ফেলেছিস।”
আমি বললাম, “কিন্তু তুই কি জানিস, আমি একটা চিঠিরও জবাব দিইনি?”
দিদি একটু চুপ করল। তারপর বলল, “জানি। কিন্তু তোর জবাব আমি প্রতিদিন রেডিওতে শুনেছি।”
সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গেলাম, চিঠি শুধু কাগজে লেখা হয় না, চিঠি কখনও কখনও হয়ে ওঠে চুপচাপ অপেক্ষা, ছাদের ওপরে বসে থাকা দুই চোখ, বা রেডিওর হালকা আওয়াজে নিজের নাম খোঁজা।
পরদিন সকালে দিদি ঘরের এক কোণে বসে ডায়েরি লিখছিল। আমি তার পাশে চুপ করে বসে বললাম, “তুই বড় হয়ে যাচ্ছিস। আমি কি তোর থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ছি?” দিদি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “পিছিয়ে পড়া আর থেমে যাওয়া এক না। তুই তো নিজের মত চলছিস, তোর গতি আলাদা। আর আমি জানি, তুই একদিন তোর গল্প লিখবি। শুধু লেখার সময় ভুলে যাস না, কাকে নিয়ে শুরু করেছিলি।”
আমি কিছু বলিনি। শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আকাশটা তখন ঘন নীল, যেন কিছু বলার আগে জমে উঠেছে।
তৃতীয় পুজোর দিন, দুপুরবেলা হঠাৎ বৃষ্টি নামল। কাগজের অলপনার ওপর ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে মুছে যেতে লাগল। মা ছুটে এসে বললেন, “সব বন্ধ করো, ভিজে যাবে!” আর দিদি হেসে বলল, “আরে বৃষ্টি তো এসে গেল! এবার খিচুড়ি বানাও মা!” বৃষ্টির মধ্যে খিচুড়ি, পেঁয়াজভাজা, আর রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত—এই তিনে মিলল এক ছুটির ম্যাজিক।
সেই বৃষ্টিতে আমরা ছাদে উঠলাম, ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে, দিদির হাতে রেডিও। পুরনো প্লাস্টিক মোড়ানো সেই রেডিওটা আজও বাজছিল। তাতে তখন বাজছিল—
“এই পথ যদি না শেষ হয়…”
আমরা চুপ করে শুনছিলাম। তারপর দিদি বলল, “তোর প্রথম গল্পের নাম রাখিস এই লাইনটা দিয়ে, কেমন?” আমি বললাম, “তুই থাকবি তো তখন?” দিদি বলল, “থাকব, শুধু এই রূপে না।”
সেই শেষ দিনটার কথা আজও মনে পড়ে। দিদি যাবার সময় আমার হাতে একটা খাম গুঁজে দিয়ে বলল, “এটা একটু পরে খুলিস।” আমি সেদিন কিছু বলতে পারিনি। শুধু নিচু গলায় বলেছিলাম, “তুই আবার ফিরে আসবি তো?”
দিদি হেসে বলেছিল, “ফিরে আসা মানেই তো একেবারে চলে যাওয়া নয়।”
ট্রেন ছেড়ে দিল। দিদি চলে গেল। আমি বাড়ি ফিরে এসে চুপচাপ ঘরে ঢুকে খামটা খুললাম। একটা চিঠি ছিল, আর সঙ্গে একটা ছবি—দু’জনের ছাদের ছায়া, রেডিওর পাশে বসা।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“অর্ঘ্য,
আমি জানি, তুই এখন অনেক বড় হচ্ছিস। কিন্তু মনে রাখিস, তুই যেখানে থামবি, আমি ঠিক ওখানেই থাকব। আমার ছায়া তোর গল্পে থাকবে, তোর প্রতিটা লেখায় থাকবে একটা পেছনের জানালার শব্দ—যেটা বৃষ্টিতে বাজে।
তুই একদিন লিখবি, আমি জানি। আর আমি পড়ব, ঠিক পড়ব।
ভালোবাসা সহ
দিদি।”
আমি জানালার পাশে বসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ফোঁটার শব্দে তখনো চলছিল সেই লাইন—
“এই পথ যদি না শেষ হয়…”
আমার বৃষ্টি ভেজা ছেলেবেলার জানালায় তখন চুপচাপ বসে ছিল একটা পুরনো রেডিও, আর একটা হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর।
শেষ


