Posted in

তালপাতার দিনলিপি

Spread the love

মহুয়া দত্ত


এক

কলকাতার বাতাসে সেই দিনটায় একটা পুরোনো কালি আর ধুলোর গন্ধ ছিল। শরতের রোদ জানালার কাঁচে আটকে পড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল টেবিলের ওপর ছড়ানো নোট আর পাণ্ডুলিপির উপর। ঋদ্ধিমা চৌধুরী চশমার ফ্রেম একটু উঁচু করে বসল, তার সামনে রাখা একটি চোরা ধুলিধূসরিত তালপাতার পুঁথির দিকে তাকিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর এবং কালচারাল স্টাডিজ বিভাগে মাস্টার্সের শেষ বর্ষের ছাত্রী সে, আর তার গবেষণার বিষয় – “হারিয়ে যাওয়া লোকগোষ্ঠীর মৌখিক সংস্কৃতি ও চিত্রভাষা”। পুঁথিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব সংগ্রহশালার একটি উপেক্ষিত তাকে ধুলোর নিচে ছিল; কেউই এর গুরুত্ব বোঝেনি, যতক্ষণ না ঋদ্ধিমার নজরে পড়ে। পাতাগুলো ছুঁয়ে দেখতে গিয়ে সে অনুভব করেছিল এক অদ্ভুত শীতলতা – যেন পাতাগুলোর গায়ে সময় জমে আছে। পাতায় কিছু অদ্ভুত প্রতীচিহ্ন, অচেনা লিপি, আর আঁকাবাঁকা রেখা, যা বাংলা, সংস্কৃত বা পালি কোন ভাষারই নয়। পুঁথির শেষে একটা পাতা ছিল অর্ধেক ছেঁড়া – সেখানে একটি নাম লেখা ছিল রক্তের মতো লাল কালিতে – ‘তালজং’। এই নামই ছিল রহস্যের সূচনা।

তার শিক্ষক অধ্যাপক দেবর্ষি মুখার্জি এই পুঁথি দেখে বলেছিলেন, “ঋদ্ধিমা, হয় এটা কোন বিলুপ্ত গোষ্ঠীর নিজস্ব লিপি, নয়তো পুরো ব্যাপারটাই কোনো কল্পনাবিলাসী পণ্ডিতের তৈরি। তবে যদি তুমি চাও, একটা গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতে পারো।” ঋদ্ধিমা চেয়েছিল – শুধু গবেষণা নয়, একটা সত্যিকারের অভিযানে নামতে। কারণ তার শৈশব কেটেছে ঠাকুমার মুখে কুসুমডাঙ্গা নামের এক গ্রাম ও তার আশেপাশের হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা শুনে। সেই মানুষগুলোর উৎসব ছিল গানের, প্রার্থনা ছিল পাতায় আঁকা প্রতীকে। ঠাকুমা বলতেন, “ওদের নাম তালজং, মেয়েরা গানের ছন্দে বৃষ্টির ডাক দিত, আর ছেলেরা পাথরের ভাষা পড়ত।” তখন ছোট ঋদ্ধিমা ভেবেছিল ঠাকুমা শুধু গল্প বানাচ্ছেন, কিন্তু এখন সেই ‘তালজং’ নামটাই দাঁড়িয়ে ছিল তার সামনে, তালপাতার পাতায় রক্তছাপের মতো লিখে। তার মনে হতে থাকে, এটা কোন কাকতাল নয়—এটাই হয়তো সেই অজানা ইতিহাসের সূত্র যা কেউ ধরতে পারেনি। গবেষণার আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পর, সে নিজেই ঠিক করে ফেলে – তাকে যেতে হবে সেই হারিয়ে যাওয়া নামের ধ্বংসস্তূপে, যেখান থেকে এই পাতাগুলো একসময় উঠে এসেছিল।

এক মাসের মধ্যে প্রস্তুতি সেরে, ঋদ্ধিমা ট্রেনে চড়ে রওনা দেয় পুরুলিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রামাঞ্চলের দিকে, যেখানে লোককথা বলে একদা তালজংরা বাস করত। তার ব্যাগে কিছু নোটবই, রেকর্ডার, ক্যামেরা, আর সেই পুঁথির নকল ছিল। রাস্তা ছিল খাঁজকাটা, সময় ছিল ভরা জ্যৈষ্ঠ – চারদিকে ধুলো আর ঝাঁঝালো হাওয়া। ট্রেন থেকে নামার পর তাকে নিতে আসে একটি অটো, চালক জানায় গ্রামের নাম “কুন্দগ্রাম”—সেই কুসুমডাঙ্গার আশেপাশের অঞ্চলই। গ্রামে ঢুকতেই সে অনুভব করে এক অচেনা স্তব্ধতা—কোথাও যেন সময় থেমে গেছে। কুন্দগ্রামের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার চোখে পড়ে ভাঙাচোরা ঘর, খড়ের চালের নিচে কালি পড়া ছবি, আর কিছু মুখ—যারা যেন তাকিয়ে আছে এক আগন্তুক ইতিহাস-খোঁজার মেয়ের দিকে। গ্রামের এক কোণে সে পায় একটি পোড়োবাড়ি, যেখানে দেয়ালে আঁকা প্রতীকগুলি তার পুঁথির আঁকাবাঁকা চিহ্নের সঙ্গে মিলে যায়। হঠাৎ তার মনে হয়—সে শুধু গবেষণার জন্য আসেনি, এসেছেন যেন সেই ঘুমন্ত ভাষা, সেই নিঃশব্দ গানের কাছে ক্ষমা চাইতে। তালপাতার দিনলিপি তখনও তার ব্যাগে, কিন্তু তার শব্দেরা ধীরে ধীরে ঋদ্ধিমার চেতনায় প্রবেশ করতে শুরু করে।

দুই

ভোরের আলো যখন গ্রামের কুঁড়েঘরগুলোর চালের ফাঁক দিয়ে ঢুকছিল, তখন ঋদ্ধিমা সজাগ হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। সারারাত নরম কুঁচকে আসা নেটের ভেতরে একটা স্বপ্ন আটকে ছিল—সেই পুরোনো গানের সুর, এক নারীর দীর্ঘশ্বাস, আর তালপাতায় লেখা নামহীন অক্ষর। কুন্দগ্রামের নির্জন অতিথিশালায় একা রাত কাটানো সহজ ছিল না। কিন্তু ঋদ্ধিমা অনুভব করেছিল, এই নিঃস্তব্ধতা তাকে ভয় দেখাচ্ছে না; বরং আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সকালের আলোয় গ্রামের মেঠো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছে যায় স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যেখানে কয়েকজন প্রবীণ শিক্ষক গোষ্ঠীর ইতিহাস জানতেন বলে শুনেছিল। কিন্তু তাদের মুখেও পাওয়া গেল না স্পষ্ট কিছু—তারা বলল, “তালজং তো বহুকাল আগেই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, মেয়ে। এখন ওসব খুঁড়ে লাভ কী?” তবে একজন বৃদ্ধ, জীর্ণ শরীর আর সাদা দাড়ির ভেতর চোখদুটো চমৎকার দীপ্ত—নাম ধারাপ্রসাদ। তিনি বললেন, “তুমি যদি সত্যিই খুঁজতে চাও, তবে শব্দে নয়, প্রতীকে কথা বলো। তালজংরা কথা বলত পাতার মধ্য দিয়ে।”

ধারাপ্রসাদ এক সময় এলাকার লোকজ সংগীতের শিক্ষক ছিলেন, পরে নির্জনতাকে আলিঙ্গন করে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন জনজীবন থেকে। ঋদ্ধিমার আগ্রহ দেখে তিনি প্রথমে একটু মুচকি হেসে বললেন, “তুমি যদি সত্যি সত্যি বুঝতে চাও, তাহলে চলো, আমি তোমায় নিয়ে যাব এক জায়গায়।” সেখান থেকে তারা হাঁটল প্রায় আধঘণ্টা—কাঁকরভরা পথ, ধানের খেতের পাশ দিয়ে, একটা ছোট্ট শুকনো খাল পেরিয়ে। শেষমেশ তারা এসে দাঁড়ায় এক পোড়োবাড়ির সামনে, যার ছাদ ভেঙে পড়েছে, দেয়ালে খয়েরি পাতা ঝুলছে, আর দরজার দুইপাশে তালপাতার মতো বাঁকানো দুটি খোদাই। ধারাপ্রসাদ বললেন, “এখানেই এক সময় তালজংদের পাঠশালা ছিল—তারা গানে, প্রতীকে আর লিপিতে শিক্ষা নিত। এই বাড়িটার নাম ছিল ‘ধুংসেত’।” ঋদ্ধিমা অভিভূত হয়ে দেখে, বাড়ির এক কোণে কিছু ছেঁড়া কাঠের বাক্স, আর তার ভেতরে পাতার মতো পাতলা কাঠে আঁকা কিছু ছবি—একটি নদী, একটি নারীমূর্তি যার চোখে জলে গড়া চিহ্ন, আর একটি প্রতীক—আঁকাবাঁকা লিপি যার অর্থ আজও অজানা।

ঋদ্ধিমা সেদিন সন্ধ্যায় ফিরে আসে অতিথিশালায়, হাতে নিয়ে আসে একটি পাতার চিত্র—যেটি ধারাপ্রসাদ তাকে তুলে দিয়েছিলেন। ছবিটা ছিল সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের মুখে ফুঁ দিয়ে কিছু ছড়ানো চিহ্ন—যেন শব্দের জন্ম মুহূর্ত ধরা আছে সেখানে। রাতে নিজের টেবিলে বসে, সে খুলে বসে তালপাতার পুঁথি আর ধারাপ্রসাদের দেওয়া ছবি। একটা মিল খুঁজতে গিয়ে দেখে—পুঁথির চতুর্থ পাতায় একটি প্রতীক রয়েছে যেটি ধারাপ্রসাদের ছবির ঠিক নিচে খোদাই করা প্রতীকের মতোই। সে তখনই বুঝতে পারে, এই প্রতীক কেবল আলংকারিক নয়—এটি একধরনের লিপি, এক ভাষা—যা চোখে না, মনে পড়ে নিতে হয়। সেদিন সে ডায়েরিতে লেখে—“তালজংরা মৃত নয়, তারা ঘুমিয়ে আছে এই প্রতীকের গভীরে। তাদের ভাষা এখনও নিঃশব্দে কথা বলে, শুধু শুনে ওঠার জন্য প্রস্তুত থাকা দরকার।” বাইরে তখন ঝিঁঝিঁর ডাক বাড়ছে, কুন্দগ্রামের আকাশে জোনাকিরা উড়ছে—আর ঋদ্ধিমা অনুভব করে, সে শুধু গবেষক নয়, সে এক বার্তাবাহক—হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের কান্না আর সুর বয়ে আনার দায়ভার তার কাঁধে বর্তেছে।

তিন

দ্বিতীয় দিনের সকালের আলো ছিল আগের চেয়েও শান্ত, মৃদু। ঋদ্ধিমা জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখছিল গাছের পাতায় জমা শিশির ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে। তার মনে হচ্ছিল, তালপাতার সেই প্রতীক যেন তার চেতনার গভীরে ঢুকে গিয়েছে। আগের রাতের প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি রেখা—সে বারবার দেখে গেছে। সকালে ধারাপ্রসাদের ডাকে সে বেরিয়ে পড়ে আবার। এবার তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের এক প্রান্তে, যেখানে জঙ্গলের ধারে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর। ঘরটা যেন সময়ের এক কোণায় আটকে আছে, দেয়ালে ঝুলে থাকা তামার ঘণ্টা, মাটির প্রদীপ, কিছু কাঠের তৈরি মুখোশ, আর এক কোণায় রাখা অতি পুরাতন এক যন্ত্র—যেটা দেখতে কিছুর সঙ্গে মেলে না। ধারাপ্রসাদ মৃদু গলায় বলেন, “এই হল তালজংদের চিত্রবর্ণন পদ্ধতি—তারা শব্দ ব্যবহার করত না, প্রতীক আর ছন্দ দিয়েই কথা বলত। লিপির জন্য তারা বানিয়েছিল এই কাঠের ঘূর্ণনচক্র—প্রতিটি চিহ্ন ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে আলাদা এক গল্প বলত। কেউ জানত না ঠিক ভাষা কী, শুধু অনুভব করত।” তিনি জানালেন, এ জাতি ছিল বেশিরভাগই নিরক্ষর, কিন্তু তাদের মনে ছিল অবিশ্বাস্য সৃজনক্ষমতা। ঋদ্ধিমা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে—তালজংদের সমাজে নারী-পুরুষের কোনো ভেদ ছিল না, শিশুরা গান গেয়ে শেখত ইতিহাস, বুড়োরা মুখোশ পরে বলত বৃষ্টির গল্প।

ধারাপ্রসাদের কথা থেকে ধীরে ধীরে খোলসা হতে থাকে তালজংদের কাহিনি—এক আদিবাসী জাতি, যারা বাস করত পাহাড়, নদী ও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে থাকা অঞ্চল জুড়ে। একসময় তারা ছিল উৎসবপ্রিয়, গীতিপ্রেমী, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তারা বিশ্বাস করত প্রতিটি গাছের প্রাণ আছে, প্রতিটি শব্দ একেকটা আত্মা। তাদের ধর্ম ছিল না, কিন্তু রীতির মধ্যে ছড়িয়ে ছিল একধরনের আধ্যাত্মিকতা—যাকে এখন কেউ ব্যাখ্যা দিতে পারবে না। তবে এই শান্তিপ্রিয় জাতির ওপর নেমে আসে সর্বনাশ, যখন এক বহিরাগত শাসক—যার নাম ইতিহাসে নেই, শুধু স্থানীয় ভাষায় “চৌধুরী বাহাদুর” নামে পরিচিত—তাদের ভূমি দখল করে নেয়। এই চৌধুরী বাহাদুর তাদের পাহাড়ে দুর্গ বানিয়ে বাস করত, আর তালজংদের বাধ্য করত কর দিতে, গৃহত্যাগ করতে। যাদের আপত্তি ছিল, তাদের নাম চিরতরে মুছে দেওয়া হত। তখন থেকেই শুরু হয় তালজংদের অস্তিত্ব বিলুপ্তির পর্ব। ধারাপ্রসাদ বলেন, “ওরা লড়ত না অস্ত্র দিয়ে, ওরা লড়ত গানে। কিন্তু শাসকরা তা বুঝত না। তাই ওদের গানকে ‘বিদ্রোহ’ বলে চিহ্নিত করা হয়। ওদের প্রতীকী চিত্রগুলোকে বলা হত ‘তান্ত্রিক অপদেবতা’। সেই থেকে একে একে পুড়িয়ে ফেলা হয় পুঁথি, গুহা, শিল্প—শুধু থেকে যায় কিছু মুখে মুখে ফেরে যাওয়া কথা।”

ঋদ্ধিমা তখনো নিশ্চুপ, তার রেকর্ডার চলছিল, কিন্তু সে জানত এই মুহূর্তের সবটা কোনো যন্ত্রে ধারণ করা সম্ভব নয়। তার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছিল সেই দৃশ্য—বৃদ্ধ তালজংরা গাছের নিচে বসে গাইছে “জল-ভাষা”, বাচ্চারা শিখছে নদীর বাঁকে বাঁকে জীবনের মানে, আর দূরে দাঁড়িয়ে রাজশক্তির সৈন্যেরা পুড়িয়ে দিচ্ছে পুঁথি। ধারাপ্রসাদ জানান, সেই সময়ই একজন নেতা উঠে আসেন—তালজং নামেই পরিচিত—যিনি ছিলেন একজন কবি, চিত্রকর, ও জাতির আত্মা। তিনি পুঁথি লিখতেন তালপাতায়, প্রতীক আঁকতেন ছাই দিয়ে, আর রাতের আঁধারে ছড়িয়ে দিতেন মানুষের ঘরে ঘরে। তার দিনলিপির কিছু অংশ এখনও রয়ে গেছে, যেগুলো কেউ পড়তে জানে না। সেই দিনলিপির ভাষা ছিল ‘নির্বাচ্চার প্রতীকধ্বনি’—যেখানে শব্দ নয়, প্রতীকই ভাষা। ঋদ্ধিমা জানতে চায়, এই ভাষা কেউ শেখে কীভাবে? তখন ধারাপ্রসাদ চোখ বন্ধ করে বলেন, “এই ভাষা শুনতে হয় হৃদয় দিয়ে, চোখ দিয়ে নয়। তালজংরা বলত, ‘যে কান না শুনে প্রতীকের শব্দ শুনতে পায়, সে-ই উত্তরাধিকারী।’” সেই মুহূর্তে ঋদ্ধিমা বুঝে যায়—তার সামনে শুধু ইতিহাস নেই, আছে উত্তরাধিকারের দাবি। তার গবেষণা নয়, তার আত্মিক প্রস্তুতি দরকার এই ভাষা আত্মস্থ করার জন্য।

সন্ধ্যায় ফিরে এসে ঋদ্ধিমা নিজের ঘরে তালপাতার সেই প্রতীচিহ্নগুলো আবার দেখতে শুরু করে। একটার সঙ্গে একটার অর্থ মিলিয়ে, একটার প্রতিক্রিয়া অন্যটায় বুঝে সে দেখতে পায়, প্রতিটি চিহ্ন আসলে একেকটা অনুভূতির রূপ। যেমন: একটা বৃত্তচিহ্নের মাঝখানে ছোট্ট রেখা মানে ছিল ‘মৌন প্রতিশ্রুতি’, আবার একে বক্ররেখায় রূপ দিলে তা হয়ে যেত ‘নিঃশব্দ প্রতিবাদ’। প্রতীক দিয়ে জীবন গাঁথা—এ ছিল তালজংদের ভাষা, যা এখন শুধু মৃত পাণ্ডুলিপি নয়, বরং জীবন্ত অভিধান হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। সে নিজের ডায়েরিতে লেখে, “আমার ভেতরে শব্দ নেই, কিন্তু অক্ষরের ঘ্রাণ আছে। আমি বুঝতে পারছি—তালজংরা মৃত নয়। তারা আমায় ডাকছে।” সেদিন রাতে, ঘুমোবার আগে ঋদ্ধিমা পুঁথির শেষ পাতায় সেই অর্ধলিপির পাশে নিজের হাতে একটা নতুন প্রতীক আঁকে—দুই বাঁকা রেখা, মাঝখানে একটি বিন্দু। এর মানে? সে জানে না। কিন্তু কোথাও ভেতরে থেকে কেউ যেন বলছে—“এই প্রতীকই শুরু।”

চার

তৃতীয় দিনের দুপুরে কুন্দগ্রামের বাতাসে একরকম গন্ধ ছিল—পুরোনো কাঠ, ধোঁয়ার, আর শুকনো পাতা পুড়লে যেমন হয়। ঋদ্ধিমা মাটির রাস্তা ধরে হাঁটছিল ধীরে, হাতে ছিল তার নোটপ্যাড, আর মনে ছিল অবসন্নতা আর কৌতূহলের এক জটিল সংমিশ্রণ। ধারাপ্রসাদ জানিয়েছিলেন যে গ্রামের এক প্রান্তে, উত্তর পাড়ার শেষ ঘরে, থাকেন শ্যামলী বৌদি—এক মধ্যবয়সী নারী, যিনি নাকি এখনও গান জানেন তালজংদের। “ওর কণ্ঠে এখনো বাজে পুরোনো সুর, কিন্তু কেউ আর শোনে না,” বলেছিলেন ধারাপ্রসাদ। সেই কথায় ঋদ্ধিমা পৌঁছাল একটি খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট বাড়ির সামনে। মাটির উঠোনে বসে ছিলেন শ্যামলী বৌদি, হাতে গামছা, সামনে একটা কুলখাওয়া হাঁড়ি, আর পাশে ঝুঁকে থাকা কাঁঠাল গাছের ছায়া। তার মুখে ছিল একটা নির্ভার শান্তি, কিন্তু চোখে ছিল জমে থাকা সময়ের গভীরতা। ঋদ্ধিমা পরিচয় দিয়ে তার উদ্দেশ্য বলতেই তিনি একটু হেসে বললেন, “ওসব পুরোনো গান নিয়ে কে আর মাথা ঘামায়, মা? সবাই তো এখন মোবাইল আর মাইক চেনে।” কিন্তু ঋদ্ধিমার প্রশ্ন, তার কণ্ঠের নম্রতা, আর চোখের আগ্রহ দেখে একসময় শ্যামলী চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “একটা গান ছিল, ছোটবেলায় আমার ঠাকুমা গাইতেন, তালজংদের এক নারী দেবীর কথা… তুমিই যদি শুনতে চাও, শোনো।”

শ্যামলী তার পাশে থাকা খড়ের পিঁড়িতে বসে গলা একটু খাঁকারি দিয়ে গেয়ে উঠলেন—গলার স্বর প্রথমে কাঁপছিল, তারপর আস্তে আস্তে এক ধ্রুপদী ছন্দে জমে উঠল। “তালজং তো তানারা, শুই ঘুমের খনিরে / জলছায়া ডাকে তাকে, মেঘ পাড়ি দিয়ে।”
এই গানটি শুনেই ঋদ্ধিমা স্তব্ধ হয়ে গেল। গানটি ছিল যেন কবিতার মতো, অথচ ভাষায় এমন কিছু শব্দ ছিল যা সে আগে শুনেনি—“তানারা”, “ঘুমের খনি”, “জলছায়া”। সে গান থেমে যেতেই জিজ্ঞেস করল, “এই শব্দগুলো কি আপনার নিজের বানানো?” শ্যামলী মাথা নাড়লেন, “না মা, ওগুলো তালজংদের শব্দ। ওই গানগুলোতে ওরা নিজেদের ভাষা লুকিয়ে রাখত। আমার ঠাকুমা বলতেন, একেকটা শব্দ মানে একেকটা গল্প। যেমন—‘তানারা’ মানে ‘ভুলে যাওয়া পথ’, আর ‘ঘুমের খনি’ মানে মৃতদের স্মৃতি।”
ঋদ্ধিমা কাঁপা হাতে রেকর্ডার চালু করল, সেই গানটা আবার গাইতে বলল। শ্যামলী দ্বিতীয়বার গাইতে গাইতে বললেন, “ওরা বিশ্বাস করত, মৃত্যুর পর আত্মা জলছায়া হয়ে যায়, আর তালপাতার পুঁথিতে থাকে সেই ছায়ার ছাপ। গান ছিল আত্মার ডাক। যে গাইতে জানে, সে শুনতে পায়।”
ঋদ্ধিমা শুনতে শুনতে ভাবছিল, এ তো নিছক একটা লিরিক নয়, এ যেন এক জাতির জীবনদর্শন—তাদের মৃত্যু, জন্ম, বেঁচে থাকা সবই গানের মাঝে লুকিয়ে।

শ্যামলী জানান, তার ঠাকুমা একসময় এই গানের দলেই ছিলেন, যারা গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিয়ের আগে কনেদের গান শেখাতেন, নদীতে উৎসবের সময় ভাসান দিতেন গানের ছন্দে। সেই দলের নাম ছিল ‘বর্ণবীণা’। দলের প্রধান ছিলেন ‘অংগন বুড়ি’, যিনি নাকি তালজংদের শেষ গায়িকা ছিলেন। শ্যামলী বলেন, “শেষবার যখন বর্ণবীণার গান বাজে, তখন ওই চৌধুরী বাহাদুরের সৈন্যরা আমাদের গ্রামে হানা দেয়। আমার ঠাকুমা তখন বলেছিলেন, ‘জলছায়া ফিরবে না আর, আমরা শুধু পাতা গুনে দিন কাটাব।’ তারপর থেকে কেউ আর গায়নি।”
ঋদ্ধিমা এইসব শুনে যেমন মুগ্ধ হচ্ছিল, তেমনি একরকম ভেতরের খোঁচাও পাচ্ছিল—কেন এই সংস্কৃতি কেউ রক্ষা করল না? কেন এইসব মূল্যবান সুর এত সহজে হারিয়ে যেতে দেওয়া হল? কিন্তু তখনই শ্যামলী বললেন, “মা, তুমি তো কাগজে লিখবে, কিন্তু জানো? এই গান শুধু লেখার না, এই গান গাওয়া দরকার। একদিন যদি কেউ আবার আমাদের গান গায়, তাহলে জলছায়ারা ফিরে আসবে।”
এই কথাগুলো যেন তালজংদের শেষ চিহ্নের মতো হৃদয়ে গেঁথে গেল ঋদ্ধিমার। সে বুঝে গেল—এই গান, এই সুর শুধু একটি তথ্য নয়—এ এক আত্মা, যা এখনো জেগে আছে কিছু মানুষের কণ্ঠে, কিছু দৃষ্টিতে, আর কিছু পুড়িয়ে ফেলা পুঁথির ছাইয়ের মাঝে।

ঋদ্ধিমা সেদিন রাতে লিখল—“আমি আজ একটি গান শুনলাম, যেটা মৃত নয়। শ্যামলী বৌদি হচ্ছেন সেই শেষ বার্তাবাহক, যাঁর কণ্ঠে এখনও নড়ে ওঠে তালজংদের জলে ভেসে থাকা আত্মারা। আমি জানি এখন—এই গান লিখে রাখলেই হবে না, আমাকে এটিকে শোনাতে হবে, ছড়িয়ে দিতে হবে, আবার জীবন্ত করে তুলতে হবে।”
রাতের আকাশে তখন পূর্ণিমার আলো, মেঘের গায়ে ছায়া। বাতাসে শোনা যাচ্ছে পেঁচার ডাক, দূরের কোনো বাঁশবনে রাতজাগা শালিকের শব্দ। আর ঋদ্ধিমা জানে—এই সব শব্দ, এই সব নিঃশব্দতাও একেকটা প্রতীক, ঠিক তালপাতার সেই অক্ষরের মতো, যা সেদিন শ্যামলী বৌদির গলায় নতুন করে বাজল। গান হারায় না—সে শুধু অপেক্ষা করে, আবার শোনার জন্য।

পাঁচ

তালপাতার প্রতীকে বোনা যে ইতিহাস, তার কেন্দ্র যেন ক্রমশ আবিষ্কৃত হচ্ছিল এক পায়ের পদচিহ্নে, এক অক্ষরের গায়ে জমে থাকা ধুলোর মধ্যে। ঋদ্ধিমা এখন আর কেবল এক গবেষক নয়, যেন এক বার্তাবাহক—হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরের, নিঃশব্দে উচ্চারিত এক ভাষার। গানের পর গান, প্রতীকের পর প্রতীক, গল্পের ভেতর গল্প—সব মিলে তৈরি হচ্ছিল এক দুর্বোধ্য অথচ চেনা পরিধি, যার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ছিল মাত্র এক নাম—তালজং। এই নাম শুধু একজন মানুষ নয়, এক আদর্শ, এক আন্দোলন, এক গোপন আত্মপরিচয়। শ্যামলী বৌদির গান কিংবা ধারাপ্রসাদের স্মৃতি—সবখানে সে ছিল ছায়ার মতো জড়িয়ে। অবশেষে এক সন্ধ্যায় ঋদ্ধিমা অনুরোধ করে বসে, “আমায় নিয়ে চলুন সেই জায়গায়—যেখানে তালজং নিজ হাতে লিখেছিলেন, আঁকেছিলেন, হয়তো কেঁদেও ছিলেন।”
ধারাপ্রসাদের কণ্ঠে ছিল দীর্ঘ নিঃশ্বাস, “এক জায়গা আছে। যেখানে আমি নিজেও খুব কম গেছি। কারণ ওখানে ঢুকলে মন বদলে যায়।”
পরদিন ভোরে তারা বেরিয়ে পড়ে পাহাড়ের পায়ের তলায় লুকানো সেই গুহার দিকে। নাম—অর্ণ্যপত্র। প্রকৃতি যেন সেখানে কাগজ হয়ে উঠেছে, প্রতিটি পাথর যেন রেখেছে একেকটি স্মৃতিচিহ্ন।

গুহার প্রবেশপথে বাতাস থমকে থাকে। আলো আর অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকে তারা, যেখানে শব্দও নিঃশব্দ হয়ে যায়। গুহার দেওয়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে এক বিশাল প্রতীকচক্র—মধ্যবর্তী একটি বৃত্ত, চারপাশে অসংখ্য ভাঙা-গড়া রেখা, যার প্রতিটি যেন একেকটা দুঃখ, প্রতিরোধ কিংবা প্রার্থনার আকার। ধারাপ্রসাদ বলেন, “এটাই তালজং-এর প্রথম ‘দিনলিপি প্রতীক’। ও বলত—এই প্রতীক যদি কেউ হৃদয়ে বয়ে বেড়ায়, তবে সে নিজেই একটি জীবন্ত পাণ্ডুলিপি।”
ঋদ্ধিমা হাঁটু গেড়ে বসে, আঙুল বুলিয়ে যায় প্রতীকের গায়ে—পাথরের ঠাণ্ডায় সে টের পায় একটা স্পন্দন, যেন অনেক কাল আগে আঁকা এই রেখাগুলো এখনও জীবিত। এরপর তারা গুহার এক গভীর খাঁজে খুঁজে পায় একটি কাঠের বাক্স। তাতে ছিল তিনটি তালপাতার পাতা—জীর্ণ, ঝুরঝুরে, অথচ অস্পষ্ট নয়। ধারাপ্রসাদ খুব যত্নে তা খুলে বলেন, “এই তিনটি পাতাই তালজং-এর শেষ লেখা। একে বলে তার ‘নির্বচন’। প্রতিটি চিহ্ন মানে শুধু কথা নয়, সে একেকটি চেতনার অনুরণন।”

প্রথম পাতায় লেখা ছিল, প্রতীকের আকারে—একটি ঢেউয়ের মধ্য থেকে উদিত সূর্য। তার নিচে অনুবাদ করে ধারাপ্রসাদ বলেন: “যারা গান গায়, তারা কাঁদে না—তারা মনে রাখে।”
দ্বিতীয় পাতায় ছিল এক জটিল চক্রচিহ্ন, তার ভেতরে খচিত: “প্রতীকের মৃত্যু নেই, যতক্ষণ একজনও তাকে হৃদয়ে ধারণ করে।”
তৃতীয় পাতায় ছিল শুধু একটি রেখা—সরল, অথচ বাঁকে বাঁকে ছিন্ন। তার নিচে লেখা ছিল তালজং-এর স্বহস্তাক্ষর: “আগুন দিয়ো না স্মৃতিতে, ছায়া ফিরবে।”
এই বাক্যগুলো কেবল ভাষা নয়, যেন ইতিহাসের দীর্ঘ আর্তনাদ। ঋদ্ধিমা যেন এক মুহূর্তে বুঝে যায়, এই পাণ্ডুলিপি শুধু তথ্য নয়—এ এক আত্মার সংলাপ, নিঃশব্দ আহ্বান।

ফিরে আসার সময়, পাহাড়ের কাঁধে দাঁড়িয়ে, ঋদ্ধিমা গুহার দিকে ফিরে তাকায়। যেন তালজং এখনও দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে পুঁথি, চোখে সেই প্রশ্ন—“তুমি কি শুনতে পেয়েছো?” সে জানে, শুনেছে। সে জানে, এই প্রতীকের ভাষা তাকে বদলে দিয়েছে। কুন্দগ্রামের প্রতিটি পাতা, প্রতিটি মুখ, প্রতিটি প্রতীক এখন তার হৃদয়ে গেঁথে গেছে।
সেই রাতে, সে ডায়েরিতে লেখে—
“তালজং-এর দিনলিপি আসলে একটি প্রতিরোধের অক্ষর।
এটি সময়ের বিরুদ্ধে এক মৌন উচ্চারণ,
যা পুড়ে যাওয়ার বদলে ছায়ার মতো ছড়িয়ে পড়ে।
আজ থেকে আমি শুধু গবেষক নই—আমি একজন বাহক।”

ছয়

গুহার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা তালজং-এর পুঁথি যেন এখনও নিশ্বাস নিচ্ছিল। ঋদ্ধিমা আর ধারাপ্রসাদ সেদিন ফিরে এসেছিলেন একরকম বাকরুদ্ধ অবস্থায়। সেই প্রতীকের দেওয়াল, সেই অচেনা অক্ষর, আর সেই প্রতিমার চোখের ভাষা—সব মিলিয়ে যেন ঋদ্ধিমার সমস্ত যুক্তিবোধ টলিয়ে দিয়েছিল। সে বুঝতে পারছিল, এ আর নিছক গবেষণা নয়। এটা তার নিজস্ব আত্মিক যাত্রা হয়ে উঠছে। কিন্তু সেই গভীরতায় যখন সে একা নিমজ্জিত, তখনই হঠাৎ এক সন্ধ্যায়, কুন্দগ্রামের বাজারে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এক চেনা মুখের—অঞ্জন ঘোষ। বছর দুয়েক আগে একটি লোকসংস্কৃতি সম্মেলনে অঞ্জনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তার। অঞ্জন একজন স্বাধীন তথ্যচিত্র নির্মাতা, যিনি লোকগাথা, পরিত্যক্ত গ্রাম ও হারিয়ে যাওয়া মানুষের কাহিনি নিয়ে কাজ করেন।
ঋদ্ধিমাকে দেখে সে হাসি হেসে বলে, “তুমি এখানে? একা একা গবেষণা করছো? খবর পেয়েছিলাম, কেউ একজন তালজং নিয়ে কাজ করছে। ভাবলাম দেখে যাই।” অঞ্জনের উপস্থিতি প্রথমে ঋদ্ধিমার কাছে স্বস্তিকর মনে হলেও, মনের ভিতরে কোথাও একটুখানি অস্বস্তিও জন্ম নেয়। কারণ তার কাজটা এতটাই ব্যক্তিগত আর সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছে, সেখানে বাইরের চোখ সে ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না। তবু অঞ্জনের অভিজ্ঞতা আর আগ্রহ তাকে অবহেলা করা কঠিন ছিল। তার ক্যামেরা, ড্রোন, আর প্রশ্নের সূক্ষ্মতা বুঝিয়ে দিচ্ছিল—এই মানুষটা শুধু চিত্র ধারণ করতে জানে না, সে বুঝতেও পারে।

পরদিন ভোরেই অঞ্জন তার ক্যামেরা নিয়ে গ্রাম চষে বেড়াতে থাকে। সে যেমন চিত্র সংগ্রহ করছিল, তেমনি ঋদ্ধিমাকে সাহায্যও করছিল—প্রতীক বিশ্লেষণে, মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে, এমনকি তালজং-এর প্রতিকৃতি ডিজিটাইজ করতেও। অঞ্জনের এক বিশাল ল্যাপটপে যখন সেই প্রতীকগুলো একে একে গুছিয়ে উঠতে লাগল, তখন ঋদ্ধিমার কাজ আরও গতি পেল। একদিন বিকেলে, তারা দুজনে গিয়েছিল সেই পরিত্যক্ত মন্দিরটিতে, যার দেয়ালে তালপাতার মতো বাঁকানো চিহ্ন ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অঞ্জনের চোখে পড়ে যায় একটি পাথরের খাঁজের নিচে লুকোনো কিছু চিত্রফলক। সেটি বের করে আনার পর দেখা যায়—তাতে খোদাই করা আছে একটি বিশাল প্রতীকচক্র, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তালজং-এর নাম, এবং চারপাশে ছিল বহু অচেনা প্রতীক। ঋদ্ধিমা তখন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল—এই সেই ‘চূড়ান্ত প্রতীক’, যা হয়তো তালজং তার জীবনের শেষে তৈরি করেছিলেন। অঞ্জনের চোখে তখন উজ্জ্বল আগ্রহ—সে যেন বুঝে গেছে, এখানেই তৈরি হতে পারে তার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ডকুমেন্টারি।

তবে অঞ্জনের আগ্রহ ধীরে ধীরে এক ভিন্ন রূপ নিতে থাকে। এক সন্ধ্যায়, যখন ঋদ্ধিমা তার নোটস সাজাচ্ছিল, অঞ্জন জানায়—সে চায় এই পুরো গবেষণা ও যাত্রাকে নিয়ে একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র তৈরি করতে, যেখানে ঋদ্ধিমা হবেন মুখ্য চরিত্র। তার যুক্তি—“এটা শুধু এক হারিয়ে যাওয়া জাতির গল্প নয়, এটা তোমার ভিতরের ট্রান্সফরমেশন, এটা দর্শকের কাছে এক আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা হতে পারে।” ঋদ্ধিমা কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যায়। সে বুঝতে পারে, অঞ্জনের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবসম্মত, কিন্তু একই সঙ্গে নিজস্ব গোপন আবেগ হারানোর ভয়ও তাকে পেয়ে বসে। অঞ্জনের আগমন তাকে সাহায্য করলেও, কোথাও যেন তার একান্ত অনুভবের জায়গাটায় দখল নিয়ে ফেলছে। সে ভেবে পায় না, সে কি একজন অংশীদার পেয়েছে, না কি দর্শকের সামনে উন্মোচিত হবার এক অনিচ্ছুক পরিণতির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

তবু, দিন যেতে থাকে। অঞ্জন আর ঋদ্ধিমা একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায় গ্রাম, মাঠ, গুহা, আর পরিত্যক্ত অক্ষরের ভাণ্ডার। প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি চিত্র এক এক করে জীবন্ত হয়ে ওঠে তাদের চোখে। অঞ্জন যখন ভিডিও করে শ্যামলীর গান, ঋদ্ধিমা তখন দেখতে পায়—কীভাবে এক ‘স্মৃতি’ আবার ছড়িয়ে পড়ছে নতুন চোখে। এক রাতে, তারা দুজন মাটির ঘরের সামনে বসে চা খাচ্ছিল। চাঁদের আলোয় চারপাশে ছায়া নাচছিল। অঞ্জন হঠাৎ বলল, “তুমি জানো, একসময় আমি শুধু চিত্র তৈরি করতাম ক্যামেরায়। এখন মনে হচ্ছে, শব্দ দিয়েই হয়তো সত্যি ছবি আঁকা যায়। তোমার মুখে যেভাবে তালজং-এর গল্প শুনি, তাতে ক্যামেরা অন করতেই ভয় লাগে—কোনও কিছু মিস না হয়ে যায়।”
ঋদ্ধিমা চুপ করে শুনছিল। তার ভেতরে তখন আর দ্বন্দ্ব ছিল না। সে বুঝে গিয়েছিল—এই যাত্রায় কেউ একজন তার পাশে হাঁটছে, তবুও সেই হাঁটা সে একা একাই করতে হবে। কারণ তালজং-এর প্রতীক কেবল বুঝে ওঠা নয়, তা ধারণ করতে হয়, আর সেই দায়িত্ব সে নিজেই নিয়েছে। অঞ্জন এসেছে আলোর মতন—পথ দেখাতে, কিন্তু হাঁটতে হবে তার নিজের প্রতিচ্ছবির ছায়ায়।

সাত

অঞ্জনের আগমনের পর ঋদ্ধিমার যাত্রায় যেন এক নতুন গতি এসেছিল। ক্যামেরার চোখ, প্রশ্নের তীক্ষ্ণতা আর ভাবনার সূক্ষ্মতা—সব মিলিয়ে অঞ্জন শুধু একজন নির্মাতা নয়, যেন সে-ও তালজং-এর প্রতীক থেকে কিছু বুঝে ফেলেছে। তারা মিলে গেছেন গুহা, গ্রামের প্রান্ত, পুরোনো মুখ আর নিঃশব্দ স্মৃতির পিছনে। কিন্তু সময় যত গড়ায়, কুন্দগ্রামের বাতাসে একটা অদ্ভুত ভার ঘনীভূত হতে থাকে। লোকজন হঠাৎ চোখ এড়িয়ে চলতে শুরু করে, বাজারের মোড়ের চায়ের দোকানে কেউ তাদের দিকে তাকায় না, আর কখনও যাদের মুখে তালজং-এর কথা শোনা যেত, তারাও যেন বেমালুম ভুলে গেছে ইতিহাস।
একদিন সকালে, ধারাপ্রসাদ অস্থির গলায় বলে ওঠেন, “একটু সাবধানে চলাফেরা করো মা। গ্রামের বড় ঘরের লোকেরা এইসব পুঁথি, প্রতীক, আর গান নিয়ে খুশি নয়। তারা চায় না কেউ পুরোনো কবর খুঁড়ে বার করুক।”
ঋদ্ধিমা স্তব্ধ হয়ে যান। তিনি জানতেন, সংস্কৃতি যেমন বাঁচিয়ে রাখে, তেমনি তাকে আড়াল করতেও শেখায়—বিশেষত যদি সেই ইতিহাসে থাকে ক্ষমতার লজ্জা, নিপীড়নের ছায়া। তালজং হয়তো শুধু প্রতীকের বাহক ছিলেন না, হয়তো তিনি বিদ্রোহের প্রতিচ্ছবিও। এবং সেই স্মৃতি আজও কিছু মানুষের চোখে নিষিদ্ধ।

এক সন্ধ্যায়, যখন অঞ্জন তার ক্যামেরায় শ্যামলীর গানের দৃশ্য সম্পাদনা করছিল, তখন বাইরে হঠাৎ কিছু লোক এসে দাঁড়ায়। তাদের চোখে প্রশ্ন নয়, হুমকি। তারা জিজ্ঞেস করে, “এত ভিডিও করেন কেন? কার অনুমতিতে করেন? এত পুঁথি, এত প্রতীক—সবই তো ভগবান আর পুরোহিতদের অপমান।”
ঋদ্ধিমা শান্ত গলায় বোঝাতে চায়—তারা কোনও অবমাননা করছে না, বরং লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি উদ্ধার করছে। কিন্তু তাতেও লাভ হয় না। এক বয়স্ক মানুষ বলেন, “তালজংদের প্রতীক মানেই অশুভ চিহ্ন। অনেক বছর আগে একবার এদের গানের পর আমাদের খেত জ্বলে গিয়েছিল।”
অঞ্জন তৎক্ষণাৎ ফোন করে থানায় জানায়, কিন্তু ধারাপ্রসাদ তাকে শান্ত করে বলেন, “এখানে আইন নয়, বিশ্বাস চলে। বিশ্বাস ভাঙলে কিছুই আটকাবে না।”
এই ঘটনার পর, তারা বুঝে যায়—শুধু প্রতীকের ভাষা জানা বা তার সৌন্দর্য অনুধাবন করলেই হয় না, তার ইতিহাসকে সম্মান করতে হয়। আর ইতিহাস যদি কষ্টের হয়, তবে তার ঘা এখনও রয়ে যায় মনে। তালজং ছিল যন্ত্রণার স্মারক, আর সেই স্মৃতি অনেকের কাছে ভয়ঙ্কর।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে, অঞ্জন একদিন প্রস্তাব দেয়—এই তথ্যচিত্র এখনই প্রকাশ না করা হোক। বরং তারা একটি গবেষণাপত্র তৈরি করুক, যেখানে প্রতীকগুলো বিশ্লেষণ করা হবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে। ঋদ্ধিমা দ্বিধাগ্রস্ত হলেও বুঝতে পারে—এখন চুপ থাকাই শ্রেয়। শ্যামলী বৌদিও বলেন, “মা, গান তো বাতাসে আছে। ওকে জোর করে বাজালে সে রাগ করে।”
ঋদ্ধিমা এবার প্রতীকগুলোকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করে—একটি সুরের মতো, যা বাজে খুব আস্তে, খুব নিজের ভিতর। প্রতিটি বৃত্ত, প্রতিটি রেখা এখন তার কাছে আর নিছক চিত্র নয়, বরং একেকটা ব্যথার নোট, যেগুলো একত্র হলে তৈরি হয় তালজং-এর জাতিগত আত্মজীবনী।
সেই রাতে, ঋদ্ধিমা লিখে ফেলে একটি ছোট্ট অনুচ্ছেদ—
“প্রতিটি নিঃশব্দতা আসলে এক ধরনের গান,
যা শোনে শুধু তারা—
যারা শুনতে চায় হৃদয় দিয়ে, চোখ নয়।
তালজং-এর পুঁথি এখনও বাজে বাতাসে,
তবে তার শ্রোতা দরকার শুদ্ধ।”

পরদিন, তারা গোপনে প্রতীকগুলোর একটি সংরক্ষিত অনুলিপি তৈরি করে। সেই নথি কোথাও প্রকাশ হবে না এখনই, শুধু থাকবে ভবিষ্যতের কোনও সময়ের জন্য।
অঞ্জন কলকাতায় ফিরে যাওয়ার আগে বলে, “এই গল্প শুধু গবেষণার নয়, এটা সময়ের কাছে দায়বদ্ধতা। তুমি এক কাজ করেছো ঋদ্ধি, যেটা হয়তো এখন বোঝা যাবে না। কিন্তু একদিন, যখন সত্যি কেউ তালজং-এর গান গাইবে, তখন এই স্মৃতি আর নিষিদ্ধ থাকবে না—তখন তা হবে উত্তরাধিকার।”
ঋদ্ধিমা তার ক্যামেরার দিকে তাকায়, তারপর গুহার প্রতীকের ছবি খুলে রাখে হাতে। মনে মনে ভাবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়তো এই—স্মৃতিকে যন্ত্রণাময় না করে, শ্রুতিময় করে তোলা।

আট

শীতের একটি সকাল। কুন্দগ্রামের মাঠে শিশিরে ভেজা ধানের গন্ধে মিশে আছে নিঃশব্দ শ্বাস। অঞ্জন চলে গেছে, ধারাপ্রসাদ মৃদু অসুস্থ, আর শ্যামলী বৌদি আগের থেকে অনেকটাই চুপচাপ। সেই স্তব্ধতার মাঝেও ঋদ্ধিমা থেমে থাকেনি। দিনের পর দিন যে ভাষা সে আবিষ্কার করেছে, সেই প্রতীকের গভীরতাই তাকে টেনে নিয়ে যায় তালজং-এর ছায়া অনুসরণে। প্রতীক আর পুঁথির মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে নিঃশব্দ সুর, তা যেন আজও বাতাসে গুঞ্জরিত। কিন্তু ঠিক তখনই, হঠাৎ একদিন—গ্রামের উত্তর প্রান্তে ধ্বংসপ্রাপ্ত এক পুরাতন জমিদারবাড়ির ভগ্ন কোণায় কাজ করতে গিয়ে এক গ্রামবাসী খুঁজে পায় কিছু ছেঁড়া কাপড়ের মধ্যে মোড়া একটি কাঠের বাক্স। খবর পেয়ে ঋদ্ধিমা ছুটে যায় সেখানে। বাক্সটি খুলতেই দেখা যায়, ভেতরে রয়েছে কিছু ঝকঝকে তালপাতা—অপ্রচলিত, কিন্তু অক্ষরগুলি স্পষ্ট। সেই মুহূর্তে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
এই লিপি, এই আঁকা—এই প্রতীকগুলোর কোনোটিই তার পরিচিত নয়। এগুলো যেন তালজং-এর ভাষার একটি নবরূপ, যা সে আগে কখনো দেখেনি। পাতার এক প্রান্তে লেখা: “উত্তরণচক্র – তালজং ২য়”।

ঋদ্ধিমা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে, সেই পাতাগুলোর প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি অক্ষরে নতুন আলো ফুটে উঠছে তার মনে। এই ‘উত্তরণচক্র’ ছিল হয়তো তালজং-এর সেই চূড়ান্ত দর্শন, যা সে শেষ মুহূর্তে রচনা করেছিলেন—যেখানে প্রতীক ছিল না শুধু অস্তিত্বের রেকর্ড, ছিল পুনর্জন্মের পথনির্দেশ। প্রতিটি চিহ্নে দেখা যাচ্ছিল আগুন, জল, পাতা, ঘুম, আর ঘুরে ফিরে আসা একটি নির্দিষ্ট রেখা—যা শুরু হয়ে আবার নিজের কাছেই ফিরে আসে। এক জায়গায় লেখা ছিল:
“স্মৃতি যখন আর দাহ হয় না, তখন সে বীজে পরিণত হয়।
তালপাতা তখন শুধু ইতিহাস নয়—সে ভবিষ্যতের মানচিত্র।”
এই অনুচ্ছেদ যেন তালজং-এর সমস্ত চিন্তাধারার নির্যাস। ঋদ্ধিমা প্রথমবার বুঝতে পারে, তালজং যে প্রতিরোধ করেছিলেন, তা কেবল অতীত রক্ষার জন্য নয়, তা ভবিষ্যতের পুনর্গঠনেরও ভিত্তি।

বিকেলে শ্যামলী বৌদি এসে দেখে সেই পুঁথি। চুপ করে কিছুক্ষণ পড়ে থেকে হঠাৎ বলে ওঠেন, “এইটা আমি একবার স্বপ্নে দেখেছিলাম মা। এই প্রতীকগুলো যেন আগুনের ওপর আঁকা হয়েছিল। আমার ঠাকুমা বলতেন, তালজং শেষ যাত্রার আগে বলেছিলেন—‘একদিন কেউ আসবে, যে তালপাতায় আবার আলো আঁকবে।’ তুমি বুঝলে মা, এই তুমি।”
ঋদ্ধিমা নিঃশ্বাস নিতে পারে না কিছুক্ষণ। তার মনে হয়—এই গল্প, এই সংগ্রহ, এই পাণ্ডুলিপি—সবই যেন তাকে খুঁজে নিয়েছে। সে শুধু তথ্য সংগ্রহ করেনি, সে নিজেই পরিণত হয়েছে তালজং-এর উত্তরাধিকারীর প্রতীকে।
সে সিদ্ধান্ত নেয়, এই পুঁথি এখনই কাউকে দেখাবে না, কোনও তথ্যচিত্র বা গবেষণাপত্রে প্রকাশ করবে না। বরং সে এটা নিয়ে ফিরে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তৈরি করবে এমন একটি পাঠক্রম, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রতীকের সমন্বয়ে শিক্ষার এক নতুন ধারায় তালজং-এর চিন্তা প্রোথিত থাকবে।
সে লিখে রাখে:
“প্রতিটি প্রতীক একেকটি আলো।
তালজং সেই আলোগুলো বপন করে গিয়েছেন পাতায় পাতায়।
আজ আমি সেই আলো কুড়িয়ে, নতুন বাতি জ্বালাব।”

সন্ধ্যার মুখে সে শেষবারের মতো গুহার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরে পাহাড়ের ছায়া গাঢ় হয়েছে, পাখিরা ডাকে না। তালপাতার সেই তিন পাতার পাশাপাশি এখন ‘উত্তরণচক্র’-এর পাতাগুলো এক নতুন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। যেন পূর্বের স্মৃতি আর বর্তমানের স্বপ্ন মিশে যাচ্ছে একই রেখায়।
সে প্রতীকগুলো দেখে আবার মনে মনে পাঠ করে—“আগুন দিয়ো না স্মৃতিতে, ছায়া ফিরবে।”
আজ সে বুঝেছে, ছায়া ফিরছে। তালজং ফিরে এসেছেন—এই পঁচিশ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে দিয়ে।

নয়

ফেরার দিন যত এগিয়ে আসে, কুন্দগ্রামের প্রতিটি জিনিস যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় ঋদ্ধিমার মনে—শ্যামলীর গলায় সেই ম্লান গান, ধারাপ্রসাদের কপালের ভাঁজ, আর তালজং-এর প্রতীকের আকারে জমে থাকা শতাব্দীর গুমরে থাকা ইতিহাস। ‘উত্তরণচক্র’-এর পাণ্ডুলিপি তার ব্যাগে রাখা ছিল যেন নিজের হৃদয়বাক্স। কিন্তু তার ঠিক আগের রাতেই, যখন সে ভোরের গাড়ির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, গ্রামে ভিন্ন কিছু চলছিল। দু’দিন ধরে একটা কুৎসা ছড়িয়ে পড়েছিল—ঋদ্ধিমা নাকি গ্রামের দেবস্থানের গোপন চিহ্ন চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে, তার লেখালিখির কারণে গ্রামের ‘ভাগ্য খারাপ’ হবে।
সকালে, গাড়ি ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে, সে বুঝতে পারে তার ব্যাগ খোলা। প্রথমে সে কিছু টের পায় না, কিন্তু মিনিট দশেক পর তালজং-এর সেই অমূল্য তিন পাতার মূল পাণ্ডুলিপি ও ‘উত্তরণচক্র’—উভয়ই নেই।
সে হিম হয়ে যায়।
ব্যাগ, চাদর, ট্রাঙ্ক—সব উলটে ফেলে, কিন্তু কিছুই নেই।
অঞ্জন তখন ফোনে বলে, “বেশ কিছু লোকের মনোভাব আমি আগেই বুঝেছিলাম। তারা চায় না এটা বাইরে যাক। হয়তো কেউ ইচ্ছে করেই চুরি করেছে, কিংবা পুড়িয়ে দিয়েছে।”

ঋদ্ধিমা ছুটে যায় ধারাপ্রসাদের বাড়ি, তারপর শ্যামলীর কাছে, তারপর সেই পুরোনো গুহার দিকে। কিন্তু কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। এক সময় ধারাপ্রসাদ নিঃশব্দে বলেন, “এই গুহা যেমন গোপন ইতিহাস রাখে, তেমনি সে আবার নিজের অঙ্গ রক্ষা করতেও জানে। হয়তো তালজং-এর প্রতীক আবার মাটিতে ফিরে গেছে।”
ঋদ্ধিমার চোখে জল এসে পড়ে। এতদিন ধরে যাকে সে রক্ষা করেছে, নিজের হাতে স্পর্শ করেছে, হৃদয়ে ধারণ করেছে—সেই পাণ্ডুলিপিই যেন ফসকে গেল সময়ের ফাঁক দিয়ে। কিন্তু সেই মুহূর্তে শ্যামলী এক আশ্চর্য কথা বলেন, “তুমি তো ওগুলো হারাওনি মা। তুমি তো ওগুলো নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে যাচ্ছো। তুমি নিজেই এখন এক চলমান পুঁথি।”
ঋদ্ধিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডায়েরির শেষ পাতায় লেখে:
“স্মৃতি পুড়ে যায়, কিন্তু প্রতীক বাঁচে।
তালপাতা ছিঁড়ে যায়, কিন্তু দিনলিপি রয়ে যায় মনের রেখায়।”

কলকাতা ফিরে যাওয়ার পথে ট্রেনের জানালায় ভেসে আসে কুন্দগ্রামের শেষ ছবি—নির্জন মাঠ, অন্ধকার গুহা, আর বাতাসে ভেসে আসা এক অসমাপ্ত গান। সে জানে, যা হারিয়েছে তা কাগজে, কিন্তু যা অর্জিত হয়েছে তা অক্ষরে নয়, অস্তিত্বে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে সে অধ্যাপকের কাছে সব জানায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়—কিন্তু গ্রাম থেকে কিছুই উদ্ধার করা যায় না। পাণ্ডুলিপি যেন গিলে নিয়েছে মাটি।
তবে কিছু দিন পর এক বিস্ময় ঘটে।
কলেজের এক ছাত্রী, শ্রেয়া, একটি ছবি আঁকে—একটি বৃত্ত, তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান রেখা। তার আঁকা দেখে চমকে ওঠে ঋদ্ধিমা। এই প্রতীকটি ছিল ‘উত্তরণচক্র’-এর এক পাতায়, যা সে কাউকে দেখায়নি।
শ্রেয়া বলে, “স্বপ্নে দেখেছিলাম… এক গুহায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, একটা আলোয় ভেসে ছিল এই প্রতীকটা।”
ঋদ্ধিমা তখন বুঝে যায়—প্রতীক হারায় না, সে জন্ম নেয় নতুন মনে, নতুন দৃষ্টিতে, নতুন হাতের রেখায়।

ঋদ্ধিমা আবার কাজ শুরু করে। পাণ্ডুলিপি ছাড়া, শুধু স্মৃতি আর হৃদয়ের বর্ণনা দিয়েই সে লিখে ফেলতে থাকে একটি প্রবন্ধ—“তালপাতার ছায়া: প্রতীকের ভিতর দিয়ে আত্মপরিচয়ের সন্ধান”। তার সেই লেখা পড়ে অনেকেই আগ্রহ দেখায়, অনেকে সন্দেহও করে, কেউ কেউ কটাক্ষ করে, “প্রমাণ নেই, কল্পনা!”
কিন্তু ঋদ্ধিমা জানে—সব প্রমাণ লিপিবদ্ধ হয় না, কিছু প্রমাণ হয় অন্তর্জাগতিক, আত্মিক, অনুভবের।
শেষ অনুচ্ছেদে সে লেখে:
“তালজং বলেছিলেন—প্রতীক শুধু আঁকা নয়, তা অনুভবের দ্যোতক।
আমিও আঁকিনি, কিন্তু প্রতীকটি এখন আমার শিরায় প্রবাহিত।”

দশ

কয়েক মাস কেটে গেছে কুন্দগ্রামের সেই অন্ধকার গুহা আর আলো-মাখা প্রতীকগুলোর ছায়া ঋদ্ধিমার মনে গেঁথে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্স হলে এখন সাজসজ্জা চলছে—সামনে “Forgotten Scripts, Living Symbols” শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। আয়োজকদের অনুরোধে ঋদ্ধিমা সম্মতি দিয়েছে একটি প্রদর্শনী ইনস্টলেশনের, যার নাম—”Uttaronchakra: A Symbol of Revival”।
এই প্রদর্শনীর জন্য সে তৈরি করেছে কয়েকটি চিত্র, প্রতীক ও শব্দের সহাবস্থান—যা কাগজের নয়, স্মৃতির উপর দাঁড়ানো এক উপস্থাপনা। অডিও-ভিজ্যুয়াল ইনস্টলেশনে থাকবে শ্যামলীর গলা, গুহার প্রক্ষেপিত প্রতিচ্ছবি, আর ছাত্রী শ্রেয়ার আঁকা প্রতীকগুলোর ডিজিটাল অ্যানিমেশন।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনের দিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট গবেষকরা যখন সেই গানের সঙ্গে প্রতীক ঘূর্ণন দেখে অভিভূত হচ্ছেন, তখন একজন প্রশ্ন করেন, “এই প্রতীকগুলোর উৎস যদি হারিয়ে যায়, তবে এই অভিজ্ঞতা কি বৈধ?”
ঋদ্ধিমা শান্তভাবে বলেন,
“সংস্কৃতি হারিয়ে যায় না, সে রূপান্তরিত হয়।
প্রতীক মৃত নয়, সে অন্য কারও হৃদয়ে পুনর্জন্ম নেয়।
তালজং ছিলেন না শুধু এক ব্যক্তি, ছিলেন এক ধারা।
আর আমি—আমি কেবল তার বার্তাবাহক।”

আচমকা হলঘরে আলো নিভে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য। প্রকল্পরের আলোতে দেখা যায় গুহার দেয়ালে আঁকা সেই চিহ্নটি—যে বৃত্ত ফিরে আসে নিজের কাছেই। সঙ্গে সঙ্গে বাজতে থাকে সেই গান, যা একদিন ভেসে এসেছিল শ্যামলীর ঠোঁটে।
সেই মুহূর্তে কেউ চোখে জল ধরে রাখতে পারে না। এক মৃদু নিঃশব্দ শ্রদ্ধা ভেসে ওঠে ঘরের বাতাসে। একজন বিদেশি অধ্যাপক বলেন, “This is not history. This is a living archive of a soul.”
ঋদ্ধিমার চোখ তখন তাকিয়ে থাকে ছাদের দিকে—সে যেন দেখতে পায় তালজং-এর সেই পরিচিত ছায়া, গুহার প্রান্ত থেকে তাকিয়ে আছে তাকে দেখে। কোনো শব্দ নেই, কোনো প্রতীক নেই—শুধু এক স্নিগ্ধ প্রশ্রয়।

এরপর আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, এবং লোকসংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান ঋদ্ধিমাকে আমন্ত্রণ জানায়। সে প্রতিবারই নিয়ে যায় এক নতুন চিত্র, নতুন ভাবনার অনুবাদ—তবে প্রতিবারই কেন্দ্রে থাকে তালজং, কুন্দগ্রাম, আর সেই দিনলিপির উত্তরাধিকার।
একটি নতুন জার্নাল—“LokSmriti”—প্রতিষ্ঠিত হয় তার তত্ত্বাবধানে, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা হারিয়ে যাওয়া প্রতীকের ভাষা নিয়ে গবেষণা করে, অ্যানিমেশন বানায়, সুর রচনা করে।
একজন ছাত্র একবার বলে, “ম্যাম, প্রতীক কি শুধুই অতীত বোঝাতে হয়?”
ঋদ্ধিমা হাসেন—“না। প্রতীক আসলে ভবিষ্যতের পথ দেখায়।”

এক রাতে, একা ঘরে বসে ঋদ্ধিমা নিজের ডায়েরির পুরোনো পাতা উলটে দেখতে দেখতে পেয়ে যায় সেই বাক্য:
“আগুন দিয়ো না স্মৃতিতে, ছায়া ফিরবে।”
সে এবার পাশে লিখে ফেলে—
“ছায়া ফিরে এসেছে।
তবে এবার সে আলো হয়ে উঠছে।”
তার চোখে তখন আর প্রতিক্রিয়া নেই, আছে স্থিরতা। যে পথ সে শুরু করেছিল একটি গবেষণার প্রয়োজনে, সেটি পরিণত হয়েছে তার জীবনের দর্শনে। তালপাতা, প্রতীক, তালজং—সব এক হয়ে গেছে তার শিরায়।

বহু বছর পরে, এক শীতের সকালে, কুন্দগ্রামের পাশের সেই গুহার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল একটি নতুন প্রজন্মের মেয়ে। হাতে ছিল খাতা, চোখে ছিল প্রশ্ন। সে এসেছিল কোনও থিসিস বা গবেষণার জন্য নয়, এসেছিল কারণ তার দিদিমা একসময় একটা গল্প বলতেন—তালপাতার পুঁথি, প্রতীকের ভাষা, আর এক মহিলার কথা, যিনি হারিয়ে যাওয়া কিছুকে নতুন করে লিখেছিলেন বাতাসে।

গুহার দেওয়ালে তখনও ঝাপসা হয়ে থাকা সেই চিহ্ন—একটি গোল বৃত্ত, তার মাঝখানে ফিরে আসা রেখা। সে আঙুল ছুঁইয়ে দেয় প্রতীকে, আর ঠিক তখনই বাতাসে ভেসে আসে হালকা এক সুর—যেন দূরে কোথাও কেউ গাইছে…
“আলোর মতো প্রতীক ফিরে আসে ছায়া পেরিয়ে…”

ঋদ্ধিমার লেখা সেই দিনলিপি এখন আর বইয়ের পাতায় নেই, সে ছড়িয়ে আছে মানুষের গল্পে, চিত্রে, সুরে, এবং প্রতীকচর্চার এক ধারায়। কেউ তাকে বলে ইতিহাস, কেউ বলে কল্পনা, কেউ আবার বলে আত্মদর্শন।
কিন্তু সত্যি বলতে—তালপাতার দিনলিপি ছিল না শুধু এক গবেষণার গল্প, তা ছিল আত্মাকে খুঁজে পাওয়ার এক মৌন অক্ষর।

তালজং হারিয়ে যাননি।
তিনি রয়ে গেছেন…
প্রতীক হয়ে, প্রতিধ্বনি হয়ে,
আর প্রতিটি হৃদয়ে—
যেখানে কেউ সত্যিকারের স্মৃতিকে ছুঁতে চায়।

 

সমাপ্ত

1000031911.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *