Bangla - তন্ত্র - ভূতের গল্প

অরণ্যতন্ত্র

Spread the love

শুভ্রনীল ধর


জুলাই মাসের ঘন মেঘলা এক সকালে পুরুলিয়ার পাহাড়ঘেরা রাস্তায় এগিয়ে চলেছে একটি সাদা জিপ—ড্রাইভারের সিটে বসে বছর পঁয়ত্রিশের এক লোক, কাঁধে গামছা ঝোলানো, কপালে রোদচশমা তুলে, মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় কিছু গুনগুন করছিল। তার পেছনে জানালার পাশে বসে অদ্বৈত চ্যাটার্জি দূরের দিকে তাকিয়ে ছিল—বৃষ্টির ধোঁয়া-ধোঁয়া কুয়াশার পর্দার আড়ালে যেন গাছগুলোর গায়ে একটা ধোঁয়াটে সুরভি জড়িয়ে আছে। অদ্বৈত কলকাতা থেকে আগত এক পরিবেশকর্মী, শহুরে সভ্যতার মাঝে বড় হওয়া অথচ মনেপ্রাণে প্রকৃতির ভক্ত। বনজীবনের সঙ্গে পরিচয় তার দীর্ঘদিনের, কিন্তু জঙ্গল, বিশেষ করে আদিবাসী সংস্কৃতি ও লোকবিশ্বাসের গভীরে ঢোকার এই প্রথম। সে এসেছে একটি প্রকল্পের আওতায়—”বৃক্ষজীবন”—যার মূল উদ্দেশ্য স্থানীয় গাছ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের গবেষণা। কিন্তু যতই সে গ্রামে কাছে পৌঁছচ্ছিল, ততই যেন চারপাশের প্রকৃতি পাল্টে যাচ্ছিল—বৃক্ষরা আরও উঁচু হয়ে উঠছে, আকাশ আরও চাপা হয়ে আসছে, আর রাস্তার ধারে দাঁড়ানো মহিষের চোখ যেন তাকে অনুসরণ করছে। হঠাৎ ড্রাইভার ভোলানাথ বলল, “বাবু, সন্ধ্যার আগে পৌঁছানো দরকার। সূর্য ডোবার পর এই জঙ্গলে কেউ থাকে না… না বাইরের লোক, না ভেতরের।” অদ্বৈতের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। “ভেতরের মানে?” ভোলানাথ কেবল মৃদু হেসে বলল, “এইখানে গাছেরা নাকি কথা কয়… শোনা যায়, পেছন ফিরে তাকালে কারা যেন ডাক দেয় নাম ধরে।”

বিকেলের ছায়া নেমে এলে জিপ গাড়িটা এক কাঁচা রাস্তার ধারে থামল। সামনে ছড়ানো এক আদিবাসী গ্রামের চিত্র—মাটির ঘর, চালার চাল বাঁশ আর খড় দিয়ে তৈরি, আর চারপাশে উঁচু শাল ও মহুয়া গাছের সারি। অদ্বৈত নেমে দেখল, গ্রামের এককোনে ছোট্ট একটা অফিস ঘর বানানো হয়েছে “বৃক্ষজীবন প্রকল্প”-এর জন্য। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এল জবা হাঁসদা—একজন স্থানীয় স্কুল শিক্ষিকা, বয়সে ত্রিশের কাছাকাছি, চোখে স্থিরতা আর মুখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। জবা তাকে বলল, “আপনাকে এখানেই কিছুদিন থাকতে হবে, প্রকল্পের দল পুরোপুরি আসতে দেরি করবে। তবে আপনি যদি জঙ্গল বুঝতে চান, তাহলে শুধু কাগজে কলমে হবে না—বনের ভাষা শুনতে হয়।” কথাটা শুনে অদ্বৈত খানিকটা হেসে বলেছিল, “আমি পরিবেশবাদী, জঙ্গলের ভাষা বলতে পাখির ডাক, বৃষ্টির শব্দ, গাছের পাতার নড়াচড়া বুঝি। এর বেশি কিছু…” কিন্তু বাকিটা শেষ করতে পারেনি—হঠাৎ এক বৃদ্ধ এগিয়ে এল, চোখে সাদা ছানি, কানে ঝুলন্ত তান্ত্রিক মালা, গায়ে গামছা ও ছিন্ন কাপড়। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ অদ্বৈতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, “নতুন প্রাণ এসেছে। পুরনো ঋণ এখনও চুকোনো হয়নি।” অদ্বৈতের গা কেঁপে উঠল। সে কিছু বলার আগেই বৃদ্ধ হেঁটে চলে গেল গ্রামের বাইরের দিকে। জবা কেবল বলল, “উনি দেওমনি ঠাকুর। উনি সব কিছু আগেই টের পান।” রাতের খাবারের পর অদ্বৈত নিজের কুঁড়েঘরে ঘুমাতে গেল। বাইরে তখন হাওয়ার গতি বেড়েছে। হঠাৎ জানালার গা ঘেঁষে পাতা ঝরে পড়ল—এক অদ্ভুত ছায়া যেন দ্রুত সরে গেল জানালার পাশ থেকে। সে উঠে জানালা বন্ধ করতে গিয়ে দেখল—মাটিতে একটা বড় শালপাতা পড়ে আছে, তার ওপরে আঁকা অদ্ভুত এক চিহ্ন—তিনটি বৃত্ত, একে অপরের সঙ্গে জোড়া, মাঝখানে রক্তের মতো লাল রঙে আঁকা ছোট্ট বিন্দু।

পরদিন সকালে জঙ্গলের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে জবা বলল, “এই গাছেরা শুধু অক্সিজেন দেয় না, আত্মাও নেয়। আর যারা বোঝে না, তারা জঙ্গলের ভেতরে হারিয়ে যায়—চিরতরে।” অদ্বৈত হাঁটতে হাঁটতে বুঝল, চারপাশের বন কত নিঃসঙ্গ আর নিঃশব্দ। এমনকি পাখিরাও যেন দূরে দূরে উড়ে বেড়াচ্ছে। সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “কাল রাতে জানালার পাশে কে ছিল?” জবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর বলল, “এখানে কিছু ছায়া আছে, যারা নতুন আগন্তুকদের দেখে নেয়। তবে ভয় পাবেন না, আপনি এখনও ‘নির্বাচিত’ হননি।” “নির্বাচিত?” অদ্বৈতের চোখে বিস্ময়। জবা হেসে বলল, “পূর্ণিমা এলেই বোঝা যাবে।” সেই মুহূর্তে একটা বিশাল শালগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধা একহাত তুলে আশীর্বাদ করল, আর বলল, “ওই গাছটা তোমার চোখে দেখবে। সে যা দেখে, তা আর ভুলে না।” অদ্বৈতের গলা শুকিয়ে এল। সন্ধে নামছিল, আর জঙ্গল যেন ঘন হয়ে উঠছিল। দূর থেকে ভেসে এল এক বাচ্চা মেয়ের হাসির শব্দ। অদ্বৈতের মাথার ভেতর ঘুরে গেল সেই বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর: “পুরনো ঋণ এখনও চুকোনো হয়নি…”

রাত গভীর হলে চারপাশের নিস্তব্ধতা এমন এক স্তরে পৌঁছে যায়, যেখানে বাতাসের শব্দও ভারী মনে হয়। অদ্বৈত চ্যাটার্জি সেই রাতে ঘুমোতে পারেনি। বাঁশের জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলে দেখা যেত শুধু অন্ধকার বনভূমি, যার মাঝে মাঝে ছোট ছোট আলো জ্বলে উঠে আবার মিলিয়ে যায়—যেন চোখ রগড়ে তাকালেই বোঝা যাবে তা ছিল কি না। অদ্বৈতের মাথায় ঘুরছিল দেওমনি ঠাকুরের কথাগুলো—“নতুন প্রাণ এসেছে… ঋণ এখনও চুকোনো হয়নি।” সেই কথাগুলোর মধ্যে এমন একটা চাপা ভবিষ্যদ্বাণীর রেশ ছিল, যা যেকোনো যুক্তিবাদীকেও অস্থির করে তুলতে পারে। হঠাৎ করেই জানালার বাইরে থেকে শোনা গেল পাতার শব্দ—না, সাধারণ ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার নড়াচড়া নয়, বরং যেন কারও পা ঘষে ঘষে হাঁটার আওয়াজ। শব্দটা ধীরে ধীরে ঘরের পেছনের দিকে সরতে লাগল। অদ্বৈত কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, তারপর সাহস করে দরজা খুলে বাইরে বেরোল। বনের মধ্যে রাতের নিঃস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে থাকা, এক অজানা সাহসে ভরা কাজ। সে চারপাশে তাকাল—কিছুই নেই। কেবল দূরে, একটা শালগাছের তলায় ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়ামূর্তি। অদ্বৈত ডাকল, “কে?” কিন্তু কোনো উত্তর নেই। সে একটু এগিয়ে গেল, আর তখনই ছায়াটা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। অদ্বৈতের কাঁধে একটা হিমেল হাওয়া এসে লাগল—আর তখনই সেই গাছটা যেন কেঁপে উঠল হালকা করে। সে বুঝতে পারল—এটা সাধারণ গাছ নয়। যেন কিছু একটা তার দৃষ্টির বাইরে থেকেও তার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।

পরদিন সকালবেলায়, জবা হাঁসদার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অদ্বৈত আগের রাতের ঘটনাগুলো বলল। জবা থেমে গেল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “তুমি ওকে দেখেছো?” অদ্বৈত বলল, “কে ‘ও’?”—জবা উত্তর দিল না। বরং একবার চারপাশ দেখে নিল, যেন কেউ শুনছে কি না। তারপর মৃদুস্বরে বলল, “বছর চারেক আগে একজন কিশোরী মেয়েকে বলি দেওয়া হয়েছিল এই গাঁয়ে—সে ছিল আমাদেরই স্কুলের ছাত্রী। মুখে কেউ কিছু বলে না, কিন্তু আমরা জানি, ও এখনও জঙ্গলের মধ্যে রয়ে গেছে—একটা আত্মা হয়ে।” অদ্বৈতের মুখ শুকিয়ে এল। “বলি?” জবা বলল, “পূর্ণিমার রাতে আত্মাদের তুষ্ট করতে কিছু প্রাণ উৎসর্গ করা হয়—আগে পশু দেওয়া হতো, এখন মাঝে মাঝে মানুষ… যদি বন সন্তুষ্ট না থাকে।” অদ্বৈতের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু রাতে দেখা সেই ছায়া, গাছের নড়াচড়া, আর সেই অদ্ভুত শালপাতার চিহ্ন—সব মিলিয়ে তার যুক্তি কেমন দুলে উঠছিল। জবা বলল, “তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও এই জঙ্গলের ভাষা, তবে কেবল গবেষণা করলেই হবে না—তোমায় ‘অনুমতি’ নিতে হবে বনদেবতার কাছ থেকে।” তখনই দূর থেকে এক বৃদ্ধা ছুটে এল—হাতের পাটায় অদ্ভুত ধূসর কিছু ধুলো, তার মুখে আতঙ্ক, “দেওমনি বলেছে—পূর্ণিমা আসছে, গাছেরা নাকি আজ কথা বলছে। বন কারো নাম নিয়েছে!” তার গলার স্বর থরথর করে কাঁপছিল। অদ্বৈতের বুকেও যেন হঠাৎ জমে উঠল এক অদ্ভুত আতঙ্ক।

বিকেলের দিকে, জঙ্গল একটু বেশি গাঢ় হয়ে উঠল। পাখিরা যেন গাছে বসে নেই, বরং জঙ্গলের আশেপাশে চক্কর কাটছে। অদ্বৈত তখন তার ল্যাপটপে কিছু নোট নিচ্ছিল, গাছের গঠন, জলবায়ু, পরিবেশগত ক্ষয়প্রাপ্তির হিসাব। হঠাৎ জানালার কাছে এসে দাঁড়াল ছোট্ট এক মেয়ে—সে মুখে কিছু বলল না, কিন্তু চোখে এক গভীর শূন্যতা। অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?” মেয়েটি বলল, “আমার নাম মুন্নি। আমার গাছ আমাকে খুঁজছে।” বলেই চলে গেল। অদ্বৈত ছুটে বেরোল, কিন্তু বাইরে কেউ নেই—না মেয়ে, না কোনো চলাচলের চিহ্ন। সে ফিরে এসে জবা’কে বললে জবা চুপ করে গেল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “মুন্নি ছিল সেই বলির মেয়ে।” অদ্বৈতের শরীর থেকে যেন হাওয়া বেরিয়ে গেল। এই জঙ্গল কেবল গাছ আর পাখিদের জায়গা নয়, এখানে সময় জমে থাকে, আত্মা মিশে থাকে পাতায়, আর রাত নামলে সেইসব ছায়ারা ফিরে আসে, যাদের রক্ত একদিন ঢালা হয়েছিল মাটির গায়ে। আর এখন, সেই রক্ত কি আবার চাওয়া হচ্ছে?

পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পর থেকেই অদ্বৈতের মনে হচ্ছিল যেন তার শরীরের কোথাও একটা ভার জমে আছে—ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কোথায়, কিন্তু কিছু একটা যেন তার স্নায়ু টেনে ধরছে। চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা। কেবল দূরে কোথাও বনের গভীরে কেউ যেন বাঁশি বাজাচ্ছে—মিহি, কাঁপা কাঁপা এক সুর। অদ্বৈত জানত গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ এখন কাজে চলে যায়, কেউ কেউ গাছের ছাল ও ফল তুলতে জঙ্গলে যায়, কিন্তু আজ সকালের পরিবেশ অস্বাভাবিক ঠান্ডা। জবা তাকে ডেকে বলল, “চলুন, আপনাকে এক জনের সঙ্গে দেখা করাতে হবে।” অদ্বৈত অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হলো। তারা জঙ্গলের ভিতরের দিকে হাঁটতে লাগল, যেখানে গাছগুলো ঘন হয়ে গেছে, সূর্যের আলো মাটি ছুঁতে পারে না। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখা মিলল একটা প্রাচীন পোড়া মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের পাশে, এক বৃদ্ধ বসে আছে—মাটিতে দড়ির উপরে ধ্যানরত ভঙ্গিমায়, তার শরীর জড়ানো ছিন্ন সাদা কাপড়, গলায় তান্ত্রিক রুদ্রাক্ষের মালা, চোখ আধবোজা, মুখে গোঁফ-দাড়ির জট। এই লোকটিই ‘দেওমনি ঠাকুর’। অদ্বৈতের মনে পড়ল প্রথম দিন এই মানুষটি তাকে দেখেই বলেছিল, “ঋণ চুকোনো হয়নি।” আজ তার মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তার আশেপাশে যেন বাতাসও থেমে গেছে।

জবা একটু সামনে গিয়ে মাথা নত করে বলল, “ঠাকুর, উনি অদ্বৈত। কলকাতা থেকে এসেছে আমাদের প্রকল্পে সাহায্য করতে।” দেওমনি ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার দৃষ্টিতে এমন এক স্থিরতা, যা দেখে হঠাৎ বুক ধকধক করে ওঠে। তিনি নিচু গলায় বললেন, “নাম অদ্বৈত… অ-দ্বৈত… এই জঙ্গলে দ্বৈততা নেই, আত্মা আর দেহ আলাদা নয়। এখানে যা আছে, সব এক।” কথাটা শুনে অদ্বৈত বিরক্তিতে গলা খাঁকারি দিল, “আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, ঠাকুর। এসব বিশ্বাস করি না।” দেওমনি হালকা হেসে বললেন, “তাই তো বলি, তোমাকে বন ডাকবে। তখন বুঝবে শরীর কোন দিকে যায়, আর আত্মা কোন দিকে।” জবা সতর্ক দৃষ্টিতে অদ্বৈতের দিকে তাকাল। হঠাৎ দেওমনি তার হাত বাড়িয়ে এক মুঠো ধুলো তুললেন, সেটা ছুঁড়ে দিলেন বাতাসে। অদ্বৈতের চোখে ধুলো লাগল, আর ঠিক তখনই সে দেখতে পেল—এক মুহূর্তের জন্য সবুজ জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক নরনারী, তাদের মুখ নেই, চোখ শূন্য, আর হাত ধরে আছে এক পুড়ে যাওয়া শিশু। মুহূর্তের মধ্যেই সব মিলিয়ে গেল। অদ্বৈত হকচকিয়ে পিছিয়ে গেল। “আপনি কী করলেন?” দেওমনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “স্মৃতি খুলে দিলাম—তোমার নয়, এই বনের। এটা তোমার প্রথম পাঠ, অদ্বৈত।” অদ্বৈতের মাথায় যেন হঠাৎ বজ্রাঘাত হল। সে চিৎকার করতে পারত, কিন্তু পারল না—গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।

সন্ধ্যার দিকে অদ্বৈত একা বসে নিজের ঘরে ল্যাপটপ খুলে নোটস নিচ্ছিল—তার মাথায় যুক্তিগুলো স্পষ্ট ছিল না, বরং এলোমেলো। এই গ্রামে এসে যত ঘটনাই ঘটেছে, তার ব্যাখ্যা সে পাচ্ছিল না—না বিজ্ঞান দিয়ে, না তর্ক দিয়ে। জানালার বাইরের বনে আজ যেন শব্দ নেই—একটি পাখিও ডাকছে না। হঠাৎ তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। দরজা খুলতেই দেখা গেল, একজন কিশোর দাঁড়িয়ে আছে, গায়ে মাটি মাখা, চোখে কেবল আতঙ্ক। সে বলল, “আমার মা বলেছে, আপনি এখানে থাকবেন না। আপনাকে নিয়ে বন রেগে যাচ্ছে।” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল, “তোমার মা কে?” কিশোর বলল, “আমার মা শুধু পূর্ণিমায় কথা বলেন, তখন উনি অন্য কেউ হয়ে যান। উনি বলেন, আপনাকে দেখতে গাছ নেমে আসবে।” কথাগুলো শুনে অদ্বৈতের সারা শরীর দিয়ে ঠান্ডা ঘাম বেরিয়ে এলো। সেই রাতে ঘুমোতে পারল না। জানালার বাইরে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে ছিল বহুক্ষণ, অস্থিরভাবে কাঁপছিল পাতার ছায়া। হঠাৎ এক মুহূর্তে মনে হলো—ছায়াটার মাথা নেই। পরদিন ভোরে, দেওমনি ঠাকুরের কথাগুলো আবার মনে পড়ে গেল—“এই জঙ্গলে আত্মা আর দেহ আলাদা নয়… এখানে সব এক।”
এই বনের ভিতর, হয়তো কোনো এক ভয়ংকর সত্য ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। অদ্বৈতের জানা পৃথিবীর সীমা হয়তো এখানেই শেষ।

জঙ্গলের সেই নিঃশব্দ দুপুরে অদ্বৈত হাঁটছিল একা, জবা কোথাও বেরিয়েছে, গ্রামের লোকজন বনে কাজ করছে, আর দেওমনি ঠাকুর বসে আছেন তাঁর ধ্যানস্থানে—তবু কেমন এক অস্পষ্ট চাপা সুর ভেসে আসছে বাতাসে, যেন অদূরে কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে, তবে মানুষের মতো নয়, যেন গাছের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা বাতাসই সুর তুলছে। আজ পূর্ণিমা। সকালের আলোয় গাছের ছায়া আরও ঘন, আর অদ্বৈতের মনে হচ্ছে বনের মধ্যকার আলো-আঁধারি যেন তাকে কোথাও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তার হাতে থাকা ক্যামেরার স্ক্রিনে হঠাৎ চোখে পড়ল—একটি শালগাছের ডালে বসে থাকা একটি ছায়ামূর্তি, অস্পষ্ট মুখ, সাদা কাপড়। সে ক্যামেরা সরিয়ে চোখে তাকাল—কিছুই নেই। তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আগের রাতের সেই ছায়া, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুখহীন অবয়ব, বারবার ঘুরে আসছিল স্মৃতিতে। অদ্বৈত অনুভব করছিল, তার যুক্তি, শিক্ষা, সচেতনতা—সব যেন এখানে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। হঠাৎ সে শুনল, গ্রামের মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠেছে—টিনের ঘণ্টা, ছাপা ছাপা শব্দে। কিছু একটা শুরু হতে চলেছে।

সন্ধ্যা নামার আগে গ্রামে ফিরে এসে সে দেখল, প্রায় সব মানুষ নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়েছে, দরজায় কাঁটাঝাঁটি, কেউ কেউ গরুকে ঘরের ভিতর এনেছে, যেন কোনো ভয়ংকর ঝড় আসতে চলেছে। শুধু দেওমনি ঠাকুর, তার গৃহশিষ্য ঘনশ্যাম মুন্ডা এবং আরও কয়েকজন প্রবীণ পুরুষ একত্রিত হয়েছে গ্রামের প্রান্তে—একটি পাথরের বেদির সামনে, যেখানে আগুন জ্বলছে। আগুনের পাশে পাতা হয়েছে কিছু শুকনো ফুল, কাটা পাতা, ও একটি পশু—একটি কালো ছাগল, চোখে রক্তাভ ছায়া। অদ্বৈত সেই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ঘনশ্যাম তাকে দেখে বলল, “আপনি দেখতে চাইলে থাকতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, এই বনের নিয়ম আপনাদের শহরের মতো নয়।” জবা এসে অদ্বৈতের পাশে দাঁড়াল, তার মুখে কোনো ভাব প্রকাশ নেই, কিন্তু গলায় ছিল কেমন এক শীতলতা, “আজ বনের আত্মাদের খুশি করতে হবে। না হলে তারা কাউকে নেয়। আপনি এটা বিশ্বাস না করলেও, ওরা বিশ্বাস করে। আর এখানে বিশ্বাসই বাস্তব।” অদ্বৈতের মনে পড়ল মুন্নি নামের সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা, যে বলেছিল, “আমার গাছ আমাকে খুঁজছে।” পূর্ণিমার চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বেদির সামনে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু হল—ভাষাটা বোঝা যায় না, কিন্তু মনে হয়, সেটা গাছের পাতায়, বাতাসে, মাটির নিচে ছড়িয়ে পড়ছে। আচমকা সেই কালো ছাগলটা তীব্র চিৎকার করে উঠল, আর অদ্বৈত দেখল—তার গলা থেকে এক ফোঁটা রক্ত পড়ছে, এবং ঠিক সেই মুহূর্তে পেছনের বন থেকে ভেসে এল হাওয়ার হু হু আওয়াজ—কিন্তু সেটা যেন শুধুই বাতাসের শব্দ নয়—মিশে আছে হাহাকার, কান্না, আর এক অন্তহীন আকুতি।

রাত যত গভীর হল, অদ্বৈতের ভেতরকার কৌতূহল এক অদ্ভুত আতঙ্কে রূপ নিতে লাগল। সে একা ফিরে যাচ্ছিল তার থাকার ঘরের দিকে, কিন্তু আচমকাই তার পেছন থেকে কেউ ধীরে ধীরে ডাকল, “অদ্বৈত…” গলা শুনেই বোঝা গেল সেটা কোনো গ্রামবাসীর নয়। সে থেমে দাঁড়াল—পেছনে তাকাতে ভয় হচ্ছিল। পেছনে তাকালে অনেক সময় চোখে পড়ে যায় এমন কিছু, যেটা জীবনভর আর ঘুমোতে দেয় না। সে এগিয়ে চলল দ্রুত, কিন্তু হঠাৎ একটা গাছের পাশ দিয়ে যেতে যেতে সে আবার শুনল—“অদ্বৈত… ঋণ শোধ করো।” গলার স্বর বদলে গেছে—এবার যেন সেই পুড়ে যাওয়া মেয়েটির, যাকে সে প্রথম দেখেছিল দেওমনির ধুলোর মায়ায়। তার ঘাড়ের পেছনটা ঠান্ডা হয়ে গেল, হাওয়া নয়—যেন কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে গায়ে। সে দৌড় দিল। ঘরে পৌঁছে দরজা বন্ধ করে বসে পড়ল মেঝেতে, বুক ধড়ফড় করছে, মাথার ভেতর বাজছে সেই ঘণ্টাধ্বনি, সেই মন্ত্রোচ্চারণ, আর মেয়েটির ছায়া। জানালার বাইরে চাঁদের আলোতে সে দেখল—শালগাছগুলোর ডাল যেন একটু একটু করে নড়ছে, বাতাসহীন রাতেও। গাছেরা কি ওকে খুঁজছে? আত্মারা কি তার কাছে কিছু চাইছে? তাকে কি শুধু একজন ‘পর্যবেক্ষক’ ভাবা হচ্ছে, নাকি সে হয়ে উঠছে পরবর্তী উৎসর্গ?

সকালে ঘুম ভাঙতেই অদ্বৈতের মনে হল, তার শরীর যেন কেউ চেপে ধরেছিল রাতভর। বুকটা ভারী, মাথায় ঝিমঝিম। বাইরে পূর্ণিমার রাত পেরনোর পরের নীরবতা—যে নীরবতা শান্ত নয়, বরং ঠান্ডা ও মৃত্যুর মতো ধীর। গাছেদের পাতায় আজ যেন কম নড়াচড়া, বাতাস নেই, পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে না। যেন বনের ভেতর একধরনের ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। অদ্বৈত চেষ্টা করল স্বাভাবিক হতে, ল্যাপটপ খুলে আগের দিনকার কিছু নোট দেখতে গিয়ে হঠাৎ সে আবিষ্কার করল, তার স্ক্রিনশট ফোল্ডারে একটা অদ্ভুত ছবি আছে—শালগাছের গায়ে অদ্ভুত এক প্রতীক আঁকা, যা সে তুলেছে বলে মনে পড়ে না। ছবিটার মধ্যে এমন এক অস্পষ্টতা, যেন সেটি তুলেছে কোনো তৃতীয় চোখ, না সে নিজে। সে জবাকে ডেকে পাঠাল, ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই প্রতীকটা কী?” জবা মুখ গম্ভীর করে বলল, “ওটা ‘বোধিচক্র’—যে গাছ একবার আত্মা ধরে ফেলে, সে চিহ্নটা ধারণ করে। সেই গাছ কথা বলে, কান্না করে, আর শোনে… তার নিচে দাঁড়ালে কখনো কখনো তুমি শুনতে পাবে এক কণ্ঠস্বর। সে ডাকে। সে চায়।” অদ্বৈত কিছু বলল না, কিন্তু ছবি দেখতে দেখতে তার মনে হল, এই গাছটাই… হ্যাঁ, এই গাছটাই তো সে দেখেছিল প্রথম দিন রাতে—যার ছায়ার পেছনে দাঁড়িয়েছিল সেই মূর্তিটা।

দুপুরবেলা একা বেরিয়ে পড়ল সে। জঙ্গলের যে অংশে ছবির গাছটি রয়েছে, সেখানে যেতে গেলে পেরোতে হয় কিছু কাদামাটি আর জঙ্গলের গভীর ছায়া—এমন একটা জায়গা, যেখানে সূর্যের আলোও ছুঁতে চায় না। সেই গাছটির নিচে পৌঁছে দাঁড়াতেই একটা অদ্ভুত শীতলতা অনুভব করল শরীরে, যেন গাছটা বাতাস থেকে সব তাপ চুষে নিচ্ছে। সে কাছে গিয়ে হাত রাখল গাছের গায়ে। গাছের গায়ে চিহ্ন স্পষ্ট—তিনটি বৃত্ত, একে অন্যকে ছুঁয়ে আছে, মাঝখানে রক্তমাখা বিন্দু, যেন কেউ রক্ত দিয়ে আঁকেছে। হঠাৎ তার বুকের মধ্যে একটা চাপা ধুকধুক শুরু হল। এবং তারপর—এক অদ্ভুত, অস্পষ্ট, ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল—গাছের ভেতর থেকে, যেন কারও গলা, দূর থেকে আসা, কিন্তু স্পষ্টভাবে নাম ধরে ডাকা, “অ-দ্বৈ-ত…” অদ্বৈতের চোখ কপালে। সে চমকে পিছিয়ে এল, কিন্তু আওয়াজ থামল না—কোনও না কোনও ভাষায় সে কণ্ঠস্বর বলে চলেছে, “তুমি ফিরে এসেছো… ঋণ চুকোবে?” হঠাৎ, চোখের সামনে দৃশ্যপট বদলে গেল—এক পুড়ে যাওয়া ঝুপড়ি ঘর, আগুনের শিখায় দগ্ধ এক কিশোরী আর তার কাঁধে হাতে গাঁথা ফুলের মালা… সে কার মুখ? কে এই মেয়েটি? দৃশ্য মিলিয়ে গেল। অদ্বৈত হুঁশ ফিরে পেল, তার গায়ে কাদা, কাঁধে লতা, চোখে জল, মুখে মৃতপ্রায় ক্লান্তি। সে বুঝতে পারল—গাছটা শুধু প্রতীক নয়, এটা একটা সংরক্ষিত স্মৃতি, অথবা অভিশাপ, যেটার কাছে গেলে তুমি তার চিহ্ন হয়ে ওঠো।

সন্ধ্যায় জবা এসে তাকে দেখে চমকে উঠল—“আপনার মুখে কী হয়েছে? গায়ে তো গাছের আঁচড়! আপনি গেছেন বোধিচক্রের গাছে?” অদ্বৈত শুধু মাথা নাড়ল। জবা তাকে বসিয়ে জল খাওয়াল। অদ্বৈত ফিসফিস করে বলল, “সে ডেকেছে আমাকে… নাম ধরে… বলেছে আমি ফিরে এসেছি…” জবা থেমে গেল, তারপর ধীরে বলল, “আপনি কি কখনো এই জায়গায় ছিলেন আগে?” অদ্বৈত মাথা নেড়ে বলল, “না… কখনো না।” কিন্তু সেই দৃশ্য… সেই মেয়েটির পুড়ে যাওয়া মুখ… তার মনে হচ্ছিল, সে মুখটা কোথাও দেখেছে, অথবা কোনও স্বপ্নে, বা হয়তো কোনও পুরনো জন্মের রেশে। হঠাৎ দেওমনি ঠাকুরের কথাগুলো মনে পড়ল—“এই জঙ্গলে আত্মা আর দেহ আলাদা নয়… সব এক।” রাত নামছিল, চাঁদ আজ পুরো নেই, কিন্তু আলো ছিল। গাছের ছায়া যেন আজ একটু বেশি লম্বা, একটু বেশি জীবন্ত। আর অদ্বৈতের গলার ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেই কণ্ঠস্বর—”তুমি ঋণ শোধ করবে, না ঋণই তোমায় শুষে নেবে?”

বিকেলের দিকে জঙ্গলের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে এলে জবা হঠাৎ অদ্বৈতকে বলল, “আজ আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব—যেখানে অনেকের যাওয়ার অনুমতি নেই। কিন্তু আপনি যদি সত্যিই জানতে চান, আপনি কে, কেন আপনি এসেছেন, আর এই বন আপনার নাম জানে কেন—তাহলে আপনাকে সেই গুহায় যেতেই হবে।” অদ্বৈতের মুখ বিবর্ণ, তবু সে রাজি হলো। তারা দুজন একটি পায়ে হাঁটা পথ ধরে জঙ্গলের উত্তর দিকে এগোল, পথ ক্রমেই কঠিন হতে লাগল—কাঁটা ঝোপ, গাছের গুঁড়ির নিচে লতা, আর কিছুদূর পর এমন এক নির্জনতা, যা প্রকৃতি নয়, বরং ইচ্ছাকৃত প্রতিস্থাপিত—যেন কেউ চায় না কেউ এখানে আসুক। জবা বলল, “এই গুহার নাম ‘গন্ধর্বগুহা’, তবে স্থানীয়রা বলে ‘মৃতগর্ভ’। এখানেই শুরু হয়েছিল অরণ্যতন্ত্রের মূল রীতি। এখানেই প্রথম ‘উৎসর্গ’ হয়েছিল মানুষ। আর এখানেই বনের প্রথম আত্মারা আশ্রয় নিয়েছিল।” হেঁটে হেঁটে তারা পৌঁছল এক টিলা আকৃতির ঢিবির নিচে, যেখানে মাটি ফেটে গিয়েছে—তাঁর মাঝেই গুহার ফাঁক, অন্ধকার গহ্বরের মতো। এক পাথরের ফলকে খোদাই করা এক প্রতীক—চেনা সেই বোধিচক্র চিহ্ন, কিন্তু এবার তার পাশে মুখহীন নারীর খণ্ডিত দেহাবশেষের ছবি আঁকা। অদ্বৈতের কণ্ঠ শুকিয়ে এল। তারা গুহার মধ্যে ঢুকল হাতে হ্যারিকেন নিয়ে—ভিতরে ঢুকতেই অদ্বৈতের মনে হল, তার শরীরের ভেতর দিয়ে সময় প্রবাহিত হচ্ছে উল্টো দিকে—শীতলতা নয়, বরং এক মৃত আত্মার নিঃশ্বাস যেন তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।

ভিতরে একে একে আবিষ্কৃত হল দেওয়ালের গায়ে আঁকা এক রহস্যময় গল্প—প্রতিটি গাছে আত্মা ছিল, প্রতিটি পূর্ণিমায় উৎসর্গ হত প্রাণ, এবং এক সময়, এক কিশোরী আত্মা—নাম লেখা নেই—বনে হারিয়ে যায়। সে ফিরে আসে রাত্রির ছায়ায়, আর তখন থেকে শুরু হয় এক অভিশপ্ত চক্র, যাকে বলা হয় ‘অরণ্যতন্ত্র’। দেয়ালে লেখা আছে, “যে ফিরে আসে, সে বনের ঋণ নিয়ে আসে। যদি সে ঋণ শোধ না করে, বন নিজেই তার শরীর ধার করে।” অদ্বৈতের পায়ে পায়ে কাঁপুনি শুরু হল। হঠাৎ গুহার গভীর থেকে এক সুরেলা কিন্তু বিষণ্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এল—“আমায় ফিরিয়ে দাও।” জবা চমকে উঠল, হ্যারিকেন এগিয়ে নিয়ে গুহার গা ঘেঁষে দাঁড়াল—এক প্রাচীন কাঠের বাক্স, বন্ধ, কিন্তু চারদিক ঘিরে বোধিচক্র আঁকা, আর চারপাশে ছড়ানো মানুষের চুলের দলা, রক্তের দাগে লেপ্টে থাকা মাটি। জবা বলল, “এটা সেই বাক্স, যেখানে শেষ উৎসর্গের নিদর্শন আছে। মুন্নির। সেই মেয়েটার আত্মা এখনও বনে ঘোরে। আপনি যেদিন এসেছেন, সেই দিনটাই ছিল তার মৃত্যুর বার্ষিকী। বনের আত্মারা আপনাকে দেখে চমকে গিয়েছে কারণ—তারা মনে করছে, আপনি সেই ঋণ ফেরত দিতে এসেছেন।” অদ্বৈতের শরীর জমে এল, ঠোঁট শুকিয়ে গেল। হঠাৎ তার মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হল সেই মেয়েটির কণ্ঠস্বর—“আমার শরীর পুড়েছিল, কিন্তু আত্মা থেকে গেছিল এই গাছের গায়ে। তুমি ছিলে সেখানে। তুমি দেখেছিলে, কিছু করোনি।”

অদ্বৈত সিঁড়ির ধাপের মতো ব্যথা অনুভব করল মাথায়। তার চোখের সামনে আবার সেই দৃশ্য—আগুনে জ্বলছে একটা কুঁড়েঘর, বাইরে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ—ছায়াময় মুখ, চোখ নেই, দাঁড়িয়ে দেখছে আগুন। ভেতর থেকে মেয়েটির চিৎকার, “বাঁচাও…” সেই পুরুষ কি… সে নিজে? দৃশ্য মিলিয়ে গেল। জবা তাকে ধরে ফেলল। “আপনার চোখে কি ভেসে উঠছে?”—অদ্বৈত কাঁপা কণ্ঠে বলল, “আমি মনে করতে পারছি না, কিন্তু আমি যেন… ছিলাম ওখানে। আমি হয়তো দেখেছিলাম, হয়তো ফিরেও গিয়েছিলাম।” তখনই গুহার ভিতর বাতাস থেমে গেল। পেছন থেকে একটা ঠান্ডা স্পর্শ যেন তার ঘাড়ে এসে লাগল। সে ফিরে তাকাল—কেউ নেই, কেবল সেই পুরনো বাক্সের ওপর ছায়া নড়ছে। জবা ধীরে ধীরে বলল, “আপনি যদি ফিরে এসেই থাকেন, তবে আপনাকে বেছে নেবে বন। আপনি যদি ঋণ ফেরত দিতে না পারেন, তাহলে আপনি বন হবেন।” অদ্বৈত চুপ করে রইল। মনে হচ্ছিল, সে ঠিক এই জায়গাতেই ছিল, বহু বছর আগে, হয়তো অন্য নামে, অন্য শরীরে।
আর এখন—এই বন তার চেনা নয়।
এই বন তার ভিতরেই জন্ম নিচ্ছে।

জঙ্গলের রাতের চাঁদ আজ স্বাভাবিকের চেয়ে উজ্জ্বল, অথচ আলোটা যেন মৃত। গাছের পাতায় সেই আলো পড়ছে না, বরং গাছেরা যেন নিজস্ব ছায়া দিয়ে সব আলো গিলে নিচ্ছে। অদ্বৈত ঘরে ফিরে এসেও স্বস্তি পাচ্ছিল না। তার মগজে এখন এক বিভ্রান্ত জাল—সে কি সত্যিই আগে কখনো এই গ্রামে এসেছিল? নাকি এই বন তার স্মৃতির অতল থেকে কিছু ছেঁচে তুলছে? তার শরীর চলেছে বাস্তবতার নিয়মে, অথচ মন—একটানা ঘুরপাক খাচ্ছে সেই বিকৃত মুখ, সেই ধোঁয়ার ভেতরে পুড়ে যাওয়া দেহ, আর সেই কণ্ঠস্বর যা গাছের নিচে ফিসফিস করে ডাকে। সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজেকে দেখল। প্রথমে নিজের চোখের দৃষ্টিতে, তারপর একটু পেছনে গিয়ে… হঠাৎ আয়নায় যেন তার চোখ নয়, আরেক জোড়া চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেয়েলি চোখ। পুড়ে যাওয়া পাতার মতো মুখের কোণে ছাই। সে চিৎকার করে পিছিয়ে এলো। কিন্তু আয়না এখন সাদামাটা। কিছু নেই। কেবল একটা টান রয়ে গেল ঘাড়ের পেছনে—যেন কেউ তাকে ভিতর থেকে দখল করতে চাইছে। কেউ… অথবা… সে নিজেই?

পরদিন সকালবেলা, জঙ্গলের দিকে যেতে যেতে অদ্বৈত নিজের শরীরকে অচেনা লাগছিল। পায়ে কাদা লেগে থাকলেও অনুভব করছিল না, হাওয়ার গায়ে গন্ধ এলেও বুঝতে পারছিল না—তবে গাছের গায়ে হাত রাখতেই মনে হচ্ছিল, সে যেন কেঁপে উঠছে ভেতরে ভেতরে। বোধিচক্র চিহ্ন দেখলেই বুক ধড়ফড় করে উঠছে। সে জবাকে জিজ্ঞেস করল, “আমার শরীরের ভেতর কি কিছু ঢুকে যেতে পারে?” জবা তার দিকে তাকিয়ে একটানা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি কি খেয়াল করেছো, তোমার ঘুমের মধ্যে তুমি কারও নাম বলো?” অদ্বৈত থমকে গেল। “কোন নাম?” —“মুন্নি।” অদ্বৈতের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। জবা এগিয়ে এল, গলায় ঝুলন্ত এক ছোট্ট তাবিজ খুলে তার হাতে দিয়ে বলল, “এটা পরো। এটা শরীরের ভেতর থেকে আত্মার ঢোকা বন্ধ রাখতে পারে… যদি না সে তোমাকেই চায়।” অদ্বৈত বলল, “সে কে?” জবা চোখ সরিয়ে বলল, “মেয়েটির আত্মা নয়, সে আত্মাদের রাণী। মুন্নি তার বাহক ছিল। এখন… হয়তো তুমি।”
অদ্বৈতের মনে হতে লাগল, তার শরীর যেন দুই সত্তার যুদ্ধক্ষেত্র। সে দেখতে পাচ্ছে ছায়াগুলো, শুনতে পাচ্ছে ফিসফিস শব্দ, এমনকি মনে পড়ছে এমন স্মৃতি—যা তার নয়। এক বয়স্কা মহিলা তাকে কপালে চুমু খাচ্ছেন, এক মাটির ঘরে সে খেলা করছে অন্য এক বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে—মুন্নি? না কি… অন্য কেউ? স্মৃতিরা এখন ঝাপসা আর হিংস্র।

সন্ধ্যা নামলে সে একা একবার বেরোল বনের গভীরে, সেই বোধিচক্র চিহ্ন আঁকা গাছটার নিচে দাঁড়াতে। সেখানে পৌঁছাতেই সে যেন শুনতে পেল নিজের গলার আওয়াজ, কিন্তু কথা বলছে অন্য কেউ। “আমি ফিরে এসেছি… আমাকে খুঁজবে না আর।” গাছ কেঁপে উঠল। বাতাস নেই, অথচ পাতারা নড়ছে। হঠাৎ তার হাত ঘাড়ের কাছে উঠে গেল নিজের অজান্তেই, নিজেই নিজের গলা চেপে ধরল কিছুক্ষণ। তারপর ছেড়ে দিল। সে হাঁপাচ্ছে। সে বোঝে—তার শরীর আর একার নেই। গভীর জঙ্গলের ভিতরে বসে আত্মারা শরীর খুঁজছে। এই শরীর, যেটা হয়তো কোনো এক ঋণের বোঝা নিয়ে ফিরেছে। ঘরে ফিরে আসার সময়, হঠাৎ সে শুনল নিজের পায়ের পেছনে এক জোড়া অতিরিক্ত পায়ের শব্দ। সে থেমে গেল। শব্দ থেমে গেল। এগোল, আবার পেছন থেকে ছায়া… সে ঘুরে দাঁড়াল। সামনে দাঁড়িয়ে মুন্নি—নাকি তার ছায়া। মুখ পুড়ে গিয়েছে, চোখে অতল শূন্যতা। সে বলল, “আমাকে সেই আগুনে ঠেলে দিয়েছিলো যে… সে এখন তুই।”
অদ্বৈতের গলা শুকিয়ে গেল। তার নিজের মুখেই যেন বিস্ময়। সে কি সত্যিই…?

রাত গভীর হলে ঘরের প্রতিটি কোণে যেন এক অদৃশ্য ওজন জমে ওঠে। বাতাস থেমে যায়, অথচ শ্বাস নেওয়া যায় না। সেই রাতে অদ্বৈত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিল। চোখের নিচে কালি, ঠোঁটে চিরে যাওয়া রেখা, আর কপালে… সে দেখতে পেল, খুবই হালকা, কিন্তু পরিষ্কার—বোধিচক্রের ছাপ। তাবিজটা খুলে ফেলেছে আজ সন্ধ্যায়। শরীরে জ্বর আসছে, কিন্তু শরীরটা তার বলে মনে হচ্ছে না। হঠাৎ সে দেখতে পেল—আয়নায় মুখটা একটু বেঁকে যাচ্ছে, চোখের পাতা একটুর জন্য কাঁপছে না, এমনকি তার মুখে হাসি ফুটে উঠল, অথচ সে হাসেনি। সে পেছনে তাকাল—কেউ নেই। আয়নাটার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়া—যা কেবল তার প্রতিবিম্ব নয়, বরং তার ভেতরকার কেউ। তখনই ঘরের এক কোণে ছায়া থেকে উঠে দাঁড়াল সেই মেয়েটি—মুন্নি নয়, বরং সেই মুখহীন সত্তা। সে ফিসফিস করে বলল, “তুই ফিরে এসেছিস। এবার নিজের সত্যি রূপ দেখ।” হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল এক পুরোনো দৃশ্য—অগ্নিদগ্ধ সেই কুঁড়েঘর, যার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল এক কিশোর, চোখে কাঁপন, মুখে দ্বিধা। আগুন জ্বলছে, মেয়েটি কাঁদছে—“বাঁচাও।” কিন্তু সে নড়েনি। সে চলে গিয়েছিল।
অদ্বৈত জানত না, সেই কিশোর সে-ই ছিল কি না, কিন্তু তার শরীর কাঁপতে লাগল, তার মুখের ভেতরে যেন আরেকটি মুখ উঠে আসছে—এক অরণ্যতান্ত্রিক মুখ, চোখে ভয় নয়, বরং তৃষ্ণা।

ভোরবেলায় জবা তাকে দেখতে এল। তার মুখ দেখে শিউরে উঠল। “আপনার কপালে এই দাগটা কি করে এলো?” অদ্বৈত বলল না কিছু, বরং শুধুই তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন জল নয়, বরং কাঠিন্য। জবা মাটিতে বসে পড়ল, বলল, “আপনার মধ্যে এখন দুটো আত্মা আছে—একটা আপনি, আর একটা সেই, যার ঋণ এখনও শোধ হয়নি।” সে একটু থেমে বলল, “যদি আপনি ঋণটা ফিরিয়ে না দেন, তবে সে পুরোপুরি আপনার হয়ে যাবে। আর তখন আপনি, আপনি থাকবেন না।” অদ্বৈত প্রশ্ন করল, “এই ঋণ কী? আমি কেন?” জবা বলল, “কারণ একমাত্র আপনি-ই সেই রাতের সাক্ষী ছিলেন। আপনি হয়তো সরাসরি হত্যা করেননি, কিন্তু আপনি কিছু করেননি। আর এই বনে, নীরব দর্শকরা সবচেয়ে ভয়ংকর দায়ে বাঁধা পড়ে।” তখনই ঘরের বাইরে এক পাখির ডানা ঝাপটার শব্দ। এক বুনো ময়ূর উড়ে গিয়ে বসল জানালার গায়ে—যার চোখে ছিল রক্তের মতো টকটকে লাল ছোপ। অদ্বৈত জানে, এই বনের প্রতিটি প্রাণী তাকে এখন চিনে ফেলেছে। শরীর তার, কিন্তু আত্মা আর একা নেই।

সন্ধ্যা নামলে অদ্বৈত নিজে থেকেই হাঁটতে শুরু করল সেই গাছের দিকে, যেটা আত্মাধারী। তার ভেতরে তখন যেন দুই সত্তা কথা বলছে। এক পক্ষ বলছে, “আমাকে ছেড়ে দাও। আমি মানুষ। আমি দেখেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি অপরাধী নই।” আর আরেকটি গলা ফিসফিস করছে, “তুই দেখেছিলি। তুই ফিরেও এসেছিস। এবার শোধ দে।” সে গাছের গায়ে হাত রাখতেই মাটির নিচ থেকে কাঁপুনি শুরু হল—গাছ যেন জেগে উঠছে। পাতার ভেতর থেকে ভেসে এল একসঙ্গে শত শত কণ্ঠস্বর—“তুই। তুই। তুই।” হঠাৎ অদ্বৈতের মুখে কেঁপে উঠল অন্য কণ্ঠ—এক নারীস্বর, যন্ত্রণায় ভরা, কিন্তু তীক্ষ্ণ, “আমার শরীর গেছে। আমার নাম গেছে। এবার তোরটা চাই।”
আলো নিভে গেল।
অদ্বৈত নিজেকে দেখল না, বরং তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়ামূর্তি। এক মুখ, যার একপাশ গলে গেছে। চোখ দুটো গভীর, শূন্য, অথচ তীক্ষ্ণ। এবং সে হাসছে।
সে অদ্বৈত নয়।
সে আত্মরূপ।
এবং সে ফিরে এসেছে।

রাত গভীর হলে অদ্বৈতের শরীর একটানা কেঁপে উঠছিল, তবে ঠান্ডায় নয়—ভেতরের কিছু জেগে ওঠার ফলে। গাছের নিচে বসে থাকা তার দেহটি যেন আর দেহ নয়, বরং একটা আবরণ, যার ভিতর দিয়ে কিছু বেরিয়ে আসতে চাইছে। চাঁদের আলো আজ আর সাদা নয়—হালকা রক্তাভ। পাতাগুলো আজ সরব, বাতাস বয়ে চলেছে ঘুর্ণিবাতাসের মতো, আর অদ্বৈতের কানে একটানা ফিসফিস শব্দ। মাটি স্পন্দিত হচ্ছিল। আচমকা তার স্মৃতির ভেতর ফেটে পড়ল একটা দৃশ্য—বনের গভীরে আগুন জ্বলছে, একজন নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে, চারপাশে মুখ ঢাকা তান্ত্রিকদের দল। একজন তত্কালীন কিশোর দাঁড়িয়ে আছে দূরে—চোখে ভয়, মুখে দৃষ্টি নেই। সেই কিশোরের মুখটা ঘুরে ফিরল—এটা তার মুখ। তারই! সেই ছেলেটি সে-ই ছিল, সে ছিল সেই “দর্শক” যাকে দিয়ে বনের তন্ত্র শুরু হয়েছিল। বনের রক্তস্মৃতি আজ নিজের রক্তে ফিরে আসছে।
সে বুঝে গেল—এখন আর কিছু পাল্টানো যাবে না। আত্মা তার শরীর চাইছে। আর শরীর সেই স্মৃতির কাছে দায়ী হয়ে পড়েছে।

জবা অনেক দেরিতে এসে তাকে খুঁজে পেল, তখন অদ্বৈতের চোখে চেতনতা ছিল না। তার চোখ দুটো ফাঁকা, ঠোঁটে অস্বাভাবিক হাসি, এবং গলার নিচে স্পষ্টভাবে বোধিচক্রের নিচে পুড়ে যাওয়া চিহ্ন। জবা ছুঁয়ে দেখল—গরম। যেন আগুন তার গলায় গেঁথে দেওয়া হয়েছে। সে কাঁপা গলায় বলল, “তুমি যদি সম্পূর্ণরূপে তাকে গ্রহণ করো, তবে তুমি নিজের অস্তিত্ব হারাবে, আর তুমি হয়ে উঠবে তার বাহক।” অদ্বৈত তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না, কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস। তখন গাছের পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে এক কুয়াশার ঢেউ নেমে এল চারদিকে। সেই কুয়াশার মধ্যে ভেসে উঠল মুখ—সেই মুখ, যেটা এখন তার মুখ নয়, বরং সেই নারীর মুখ, যে আগুনে পুড়েছিল। সেই মুখ বলল, “আমার গল্প শেষ হয়নি। এই বন আমাকে গ্রহণ করেছিল। আমি এখন এই বন।”
অদ্বৈত মাথা নিচু করল। সে যেন স্বেচ্ছায় নিজেকে হস্তান্তর করল। তার চোখে কোনও ভয় নেই। কেবল এক আত্মসমর্পণের শীতলতা।

গভীর রাতে, গ্রামজুড়ে হঠাৎ এক চিৎকার শোনা গেল। চারদিক থেকে কুকুর, পাখি, এমনকি গাছগুলোও যেন শব্দ করছিল। গ্রামের মন্দিরে ঘন্টার শব্দ শুনে লোকজন বেরিয়ে এল। তারা দেখল, শালবনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে অদ্বৈত—কিন্তু তার মুখে ছায়া নেমে এসেছে। চোখে আলো নেই, এবং তার কণ্ঠস্বর নারীকণ্ঠে বলছে, “ঋণ শোধ হয়েছে। এবার এই বনে আর উৎসর্গ লাগবে না। এই বনের বুকে আমি রয়ে যাব। আমি এই বনের মুখ।”
লোকজন স্তব্ধ। তারা বুঝে গেল, বনের রক্তস্মৃতি এবার শরীর পেয়ে গিয়েছে। অদ্বৈত ছিল বাহক। এখন সে, সে আর নেই।
সে বন হয়ে গেছে।
গভীর জঙ্গলের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পাতা এখন তার স্মৃতি বহন করে।

১০

পুরুলিয়ার শালবনের সেই অঞ্চলকে এখন সবাই ডাকে “জাগ্রত অরণ্য” নামে। বনটা আগের মতো শান্ত নয়—এখন তার মধ্যে হাঁটলে হঠাৎ হাওয়া থেমে যায়, গাছের ডাল কাঁপে না অথচ পাতারা আপনাকে অনুসরণ করে। সেই রাতে, যখন অদ্বৈতের দেহ আত্মার বাহক হয়ে গেল, তখনই বনের গভীর স্তরে ঘটে যায় এক দারুণ পরিবর্তন। গ্রামের মানুষেরা জানে, কিছু একটা বদলে গেছে। উৎসর্গের নিয়ম উঠে গেছে, কিন্তু তার জায়গায় এসেছে নতুন নিয়ম—বন এখন নিজের মতো বিচার করে। কেউ মিথ্যে বললে, কেউ বনকে অপবিত্র করলে, কিংবা কেউ বনকে উপহাস করলে—তাকে ফিরে পাওয়া যায় না। গাছের গায়ে তার ছায়া থেকে যায় শুধু। অদ্বৈত, যে একসময় এনজিও কর্মী হিসেবে এসেছিল, এখন বনের এক ছায়াসত্তা। তার মুখ মাঝে মাঝে দেখা যায় জঙ্গলের কুয়াশার ফাঁকে, তার কণ্ঠ ভেসে আসে পূর্ণিমা রাতে—নারীস্বর, স্পষ্ট আর প্রাচীন। সে এক অরণ্যদেবী নয়, আবার মানুষও নয়। সে এখন তন্ত্রের মূর্ত প্রতীক। এক সমাধানহীন শাস্তি। এক জাগ্রত আত্মার ছায়া।

জবা সেই গ্রামের মধ্যেই রয়ে গেছে, কিন্তু সে এখন আর কারো সঙ্গে তেমন কথা বলে না। চোখে সারাক্ষণ একটা খালি দৃষ্টি, মুখে আতঙ্ক আর শ্রদ্ধার মিশ্রতা। সে মাঝে মাঝে সেই বোধিচক্র আঁকা গাছের নিচে গিয়ে বসে থাকে, যেন অপেক্ষায়। তার মনে হয়, অদ্বৈতের ভেতরে যে কিশোর ছিল, যে একদিন পেছন ফিরে পালিয়েছিল, সে হয়তো এখনও ভেতরে কোথাও বেঁচে আছে। একদিন গাছের নিচে বসে সে শুনতে পেল—একটা নিঃশব্দ কণ্ঠস্বর, “আমি এখনও এখানে… যদি কেউ ফিরিয়ে নেয়…”
কিন্তু সে জানে, ফিরিয়ে আনা মানেই আবার একটা ঋণ শুরু হওয়া।
সে জানে, এই তন্ত্র থেকে মুক্তি নেই।

সময় পেরিয়ে যায়, সরকার আসে, যায়, পুরনো সেই এনজিও-র রিপোর্ট ফাইলগুলো পড়ে থাকে ধুলোয় ঢাকা। অদ্বৈতের খোঁজ কেউ আর রাখে না। শহরের কেউ কেউ বলে, “উনি কোথাও হারিয়ে গেছেন।” কেউ ভাবে নিছক নিখোঁজ।
কিন্তু প্রতি পূর্ণিমায়, যখন চাঁদ গাছের ফাঁক দিয়ে পড়ে পড়ে এক অদ্ভুত আভা ছড়িয়ে দেয়, তখন গভীর জঙ্গলের পথ কেউ ভুল করেও নেয় না। কারণ তারা জানে—ওখানে এক আত্মা জেগে আছে। শরীর আর আত্মার সীমানা মুছে দিয়ে, একজন মানুষ বনে পরিণত হয়েছে।
সেই বন এখন নিজের চোখে সব দেখে।
নিজের কণ্ঠে সব শোনায়।
আর নিজের ছায়ায় গ্রাস করে।
নাম তার—অরণ্যতন্ত্র।

1000042125.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *