বাংলা গল্প
-
অফিসের কাহিনি
শুভময় ব্যানার্জী প্রথম পর্ব – বোর্ডের বুদ্ধি কলকাতার গরম দুপুর। ট্রামে চেপে, বাস ধরে, নানারকম বাহন পাল্টে অবশেষে অফিসে ঢোকার সময়টা প্রায় দুপুর গড়িয়ে যায়। অফিসে ঢুকেই বিমলবাবু নিজের কপালে ঘাম মুছে চেয়ার টেনে বসলেন। বসের চোখ তখন লাল টকটকে, যেন মশারির ভেতর আটকে পড়া মশা। —“বিমল, আবার দেরি?” বিমল হেসে বলল, —“স্যার, এবার কিন্তু…
-
চাঁদের পাড়ায় বাঙালি মহল্লা
সৌরদীপ মুখোপাধ্যায় পর্ব ১ – চাঁদের আড্ডা চাঁদের বুকে প্রথম সূর্যোদয় দেখা মানেই এক অদ্ভুত বিস্ময়। পৃথিবী থেকে তিরিশ লাখ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহল্লার প্রতিটি বাসিন্দার কাছে সেটাই যেন প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেওয়া। ২০৮০ সালের শারদীয় পূজোর আগের সপ্তাহে ভারতের প্রথম চন্দ্র-নিবাসে তৈরি হলো বাঙালি মহল্লা—যেখানে কাঁচের গম্বুজের নিচে রাস্তায় টং দোকান,…
-
নিষিদ্ধ আলোর ছায়া
অদ্রিতা সেন পর্ব ১ : নীরবতার প্রথম ফাটল কলকাতার উত্তর শহরের পুরনো বাড়ি। উঁচু ছাদের ঘর, লাল ইটের দেওয়াল, বারান্দায় শুকোতে দেওয়া সাদা শাড়ি আর মাটির টবে মানিকজোড় তুলসী গাছ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়ার ছবি। এই বাড়ির ভেতরেই বাস করে মৈত্র পরিবার। বড়ো ছেলে অনিরুদ্ধ মৈত্র, তার স্ত্রী অনন্যা আর ছোটো ভাই অরিত্র। গল্প শুরু…
-
হিমালয়ের ছায়ায়
ঋদ্ধি সেনগুপ্ত পর্ব ১: ভোরট্রেন কলকাতার ভ্যাপসা গরম আর অনন্ত জটের ভিড়ের মধ্যে অর্ণার বুক ভরে উঠছিল এক অদৃশ্য ক্লান্তিতে। প্রতিদিন সকালেই সে অফিসের বাস ধরত, ফাইল আর কম্পিউটার স্ক্রিনে ডুবে থেকে সন্ধ্যার পরে ঘরে ফিরত। চারপাশের সবাই যেন শুধু ছুটছে, অথচ কোথাও পৌঁছোচ্ছে না। গত কয়েক মাসে সে বুঝতে পেরেছিল—তার নিজের ভেতরেও এক রকম…
-
বটতলার ছায়া
রুদ্রনীল মুখোপাধ্যায় পর্ব ১: শীতের ধোঁয়ায় ঢাকা গ্রাম পূর্ব মেদিনীপুরের এক ছোট্ট গ্রাম। শীতকালের ভোর। মাঠে ঘন কুয়াশা নেমে এসেছে। শীতল হাওয়ায় নারকেল গাছের পাতা কাঁপছে। দূর থেকে হেঁটে আসছে কৃষকরা, কাঁধে লাঙল, মাথায় উলের টুপি। পুকুরপাড়ে বসে রয়েছে বুড়ো গোপাল—গাঁয়ের লোক তাকে ডাকে “গোপাল-ঠাকুর” নামে। বয়স আশির কোঠায়। মুখভরা সাদা দাড়ি, চোখ দুটো জ্বলজ্বল…
-
অরণ্যতন্ত্র
শুভ্রনীল ধর ১ জুলাই মাসের ঘন মেঘলা এক সকালে পুরুলিয়ার পাহাড়ঘেরা রাস্তায় এগিয়ে চলেছে একটি সাদা জিপ—ড্রাইভারের সিটে বসে বছর পঁয়ত্রিশের এক লোক, কাঁধে গামছা ঝোলানো, কপালে রোদচশমা তুলে, মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় কিছু গুনগুন করছিল। তার পেছনে জানালার পাশে বসে অদ্বৈত চ্যাটার্জি দূরের দিকে তাকিয়ে ছিল—বৃষ্টির ধোঁয়া-ধোঁয়া কুয়াশার পর্দার আড়ালে যেন…
-
পেনশনের শেষ চেক
সন্দীপন ধর খামে মোড়া নীরবতা রমেশচন্দ্র বসু বসে আছেন জানালার ধারে রাখা সেই পুরনো বেতের চেয়ারে। জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া বিকেলের আলো তার রুপোলি চুলে খেলে যাচ্ছে। মাথার ঠিক পাশেই একটা ছোট কাঠের তাক, সেখানে রাখা তার স্ত্রীর একটা ছবি — মেঘলা শাড়ি, মৃদু হাসি, কপালে ছোট্ট টিপ। নাম ছিল তার — কাবেরী।…
-
ব্ল্যাকবোর্ড ফাইল
অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায় পর্ব ১: প্রথম বার্তা সৌম্য মুখার্জী প্রথম দিন স্কুলে ঢুকেই বুঝেছিল, এই স্কুলটা একটু অন্যরকম। শান্তিনিকেতনের সীমানা ছুঁয়ে থাকা এই পুরনো হাইস্কুলটির নাম ‘চৈতন্য বিদ্যামন্দির’, তবে গেটের ওপরে নামটা আধফাটা, আর নিচে একটা ছেঁড়া ব্যানারে আজও ঝুলছে গত বছরের নববর্ষের শুভেচ্ছা। স্কুলের বিল্ডিংটা অনেক পুরোনো, লাল ইটের দেয়াল আর কড়ি-পাতার ছাদ। অথচ, ভেতরের…
-
জিরো-জী সুন্দরী
সঞ্চারী নাথ মঙ্গলেও চা মঙ্গল গ্রহের লালাভ আকাশের নিচে গড়ে উঠেছিল ‘জিরো-জী টাউন’—ভারতীয় বাঙালিদের প্রথম মহাকাশ উপনিবেশ। মাধ্যাকর্ষণ প্রায় শূন্য, তাই সবকিছু ভাসমান, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। এই শহরের মাঝখানে ভাসমান ছোট্ট এক ক্যাপসুল, যার নাম ‘চা-রকেট’। চন্দন ঘোষ, বয়স তিরিশের কাছাকাছি, ‘চা-রকেট’ চালান। তার বানানো চায়ের স্বাদে মঙ্গলবাসীর হৃদয় জয় করেছে।…
-
অন্তর্ধান খাজাঞ্চিঘর
তন্ময় পাল ঘটনাটা শুরু হয়েছিল বর্ষার ঠিক আগের সময়ে, যখন আকাশ সারাদিন ধরেই ঝিম মেরে থাকে আর বাতাসে একটা ভিজে মাটির গন্ধ হালকা হালকা দোলা দেয়। আমি, শীর্ষ, তখন সদ্য কলেজে উঠেছি। আমার বাবা একজন পুরাতত্ত্ববিদ, মাটি খুঁড়ে ইতিহাসের হাড়গোড় জোগাড় করাই তার কাজ। সেবার বাবার এক বন্ধুর আমন্ত্রণে আমরা গেলাম নদিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে,…
-
অমাবস্যার বাড়ি
দেবায়ুধ পাল গাড়ি থামল কুঁয়োডাঙায় কুঁয়োডাঙা গ্রামের নামটা প্রথম শুনে মনে হয়েছিল কোথাও একটা গভীর কুয়ো আছে—শুধু গভীর না, এমন কিছু একটা যার দিকে তাকালেই গা ছমছম করে ওঠে। সুজয় যখন গাড়ি থামাল, তখন সন্ধে নামছে। পুরো গ্রাম যেন অন্ধকারের গায়ে চাদর মুড়িয়ে বসে আছে। অল্প আলোয় দেখে বোঝা গেল চারপাশে মাটির ঘর, তাল-খেজুর গাছ,…
-
ছাতার নীচে একদিন
রুক্মিণী ভট্টাচার্য পর্ব ১: মেঘ জমেছে হাজরা মোড়ের সেই পুরোনো বাস স্টপটায় দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি। তার পরনে একটা সাদা-লাল ছাপার কুর্তি, হাতে একটা বই, মুখটা মেঘলা আকাশের মতো ভাবনায় ঢাকা। বৃষ্টি নামবে বুঝে ছাতাটা খুলে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু জানত না, এই ছাতাটাই একদিন একটা গল্প হয়ে উঠবে। পাঁচ মিনিট আগেই ট্রামলাইন বরাবর হাঁটছিল একটা ছেলেও। নাম…












