সৌরভ ভৌমিক দোতলা বাংলোটির রং ছিল ছাই ধূসর, যেন রোদে পোড়া কোনও পুরোনো অ্যালবাম থেকে উঠে এসেছে। জানালার কাচগুলো ঘোলাটে, কাঠের পাল্লায় পোকায় ধরা ক্ষতচিহ্ন। হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে গাড়ির শব্দ থেমে গেলে মৃদু হাওয়া বইছিল পুরনো বাগানের ঘাসের গায়ে। গাড়ির দরজা খুলে নামলেন সায়ন আর রীতা। নবদম্পতি, শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে খানিক দূরে এক নিঃসঙ্গ বাংলোয় নতুন শুরু করতে এসেছেন। “এমন একটা জায়গা তুমি ঠিক করো কীভাবে?”—রীতার গলায় মৃদু অসন্তোষ। সায়নের হাসিটা ধীর, ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত প্রশান্তি—”শান্তি চেয়েছিলে, না? এখানে ট্রাফিক নেই, শব্দ নেই, কিচ্ছু নেই।” রীতা মুখ ফেরালেও বাড়ির দিকে চাইল—তাদের নতুন বাসা। ব্রোকার বলেছিল, বাড়িটা আগে এক ইংরেজ…
-
-
শুভ্রনীল দত্ত পর্ব ১: ফিরে আসা বাড়িটার নাম মধুবন কোঠি হলেও সেখানে এখন আর মধু নেই, নেই কোঠির আভিজাত্য। কয়েক দশক আগেও যেখানে চিত্রশিল্পীরা আসতেন রং তুলিতে ধরতে তার সৌন্দর্য, এখন সেখানে কেবল ধুলো, ঝোপঝাড় আর খালি জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সময়। ঋদ্ধি মেট্রো থেকে নেমে টোটো ধরে পৌঁছাল গ্রামের মোড় পর্যন্ত। বাকিটা হেঁটেই যেতে হবে। এই বাড়িতে সে শেষ এসেছিল আট বছর বয়সে, দাদুর শ্রাদ্ধে। তারপর বাবা-মা বিদেশে চলে গেলে কলকাতায় মামাবাড়িতেই মানুষ হয়েছে। কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে এই বাড়িটা যেন মায়ার মতন আটকে ছিল। “আপনি ওখানে যাচ্ছেন?”—টোটোচালক একটু থেমে বলেছিল, নাম শুনেই মুখ অন্ধকার। “হ্যাঁ, মধুবন কোঠি।…
-
অরিন্দম বসু লালগ্রাম—একটা ছোট্ট, প্রায় ভুলে যাওয়া গ্রাম দক্ষিণবঙ্গের এক প্রান্তে। জনসংখ্যা হাতে গোনা, কিন্তু কাহিনির অভাব নেই। দিন যতই আধুনিক হোক, লালগ্রাম সন্ধ্যা নামতেই আজও হারিয়ে যায় অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায়। কেউ বলে, এই সময়ে কেউ আসে। কাকে বলা হয় “কেউ”? কেউ জানে না। দেখা যায় না তাকে। কিন্তু তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়—মনে হয় ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশ্বাস ফেলছে ঘাড়ের কাছ ঘেঁষে। এই গল্প ঠিক এখান থেকেই শুরু। রুদ্র বসু—একজন তরুণ চিত্রনাট্যকার। শহুরে জীবন থেকে ক্লান্ত হয়ে কয়েক মাস আগে এসেছিল লালগ্রামে, একটি সিনেমার লোকেশন দেখতে। তারপর হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেল। পুলিশ, সাংবাদিক, বন্ধু—সবাই খুঁজেছে। কিছুই মেলেনি।…
-
ঋধিমান বসু মাঝরাতে সেই ডাকটা আবার এল। “সু-র-জ…” নরম, স্নিগ্ধ অথচ ভয়ানকভাবে গভীর সেই আওয়াজ যেন কানে নয়, সোজা মগজে ঢুকে পড়ে। গায়ের রোম খাড়া করে দেয় এমন এক সুরে, যেন হাজার বছর আগের কোনো প্রতিজ্ঞার স্মৃতিচিহ্ন বাজছে। তিন মাস হলো সূরজ সাঁতরাগাছির এই পুরোনো ভাড়াবাড়িতে উঠেছে। চাকরির কারণে কলকাতা থেকে দূরে, একটু নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিল। বাড়িটা পছন্দ হয়েছিল শুধু একটাই কারণে—ভাড়া খুব কম। আর যেটা কম, সেটা সবসময় সন্দেহজনক হয়। সূরজ একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু তার মনে আজীবন একটা ফাঁকা জায়গা ছিল। সম্পর্কের ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থতা, মনের মতো কাউকে না পাওয়া, একাকীত্ব তাকে নীরব করে তুলেছিল। সে ভাবত, “যদি…