অনিন্দিতা ঘোষ পাল ১ প্রান্তি ছিল গ্রামের একেবারে সাধারণ মেয়ে। কাঁচা মাটির ঘর, উঠোনে মাটির চুলা, আর সারাদিন খাটুনি খাটা বাবা-মা—এই ছিল তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ। তবে তার মধ্যে এক অন্য রকম প্রাণ ছিল। চারপাশের মেয়েরা যখন মাঠের ধারেই লাজুক হয়ে বসে থাকত বা পুতুল নিয়ে খেলত, তখন প্রান্তি ছেলেদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করতে বেশি ভালোবাসত। স্কুল থেকে ফিরে বইখাতা ফেলে দিয়ে ছুটে যেত পাড়ার মাঠে। সেখানে ফুটবল খেলছিল বড় ছেলেরা, তার চোখে পড়ল বলটা কীভাবে এপাশ-ওপাশ দৌড়চ্ছে, ছেলেরা কেমন মন দিয়ে তাড়া করছে। প্রথমবারের মতো তার মনে হল, “এই খেলাটার মধ্যে যেন এক যাদু আছে।” মনে হল, ফুটবলের ওই গোল…
-
-
ঋতব্রত চক্রবর্তী পর্ব ১ : স্বপ্নের শুরু রাতের নিষ্প্রভতা যেন লালচে ছাই হয়ে উঠে বসে আছে স্বপ্নের ভেতরে—একটা শ্মশান, পাঁচটি নিবিড় প্রদীপ, নিরাবেগ নদীর ধারে কাঁসার থালায় রাখা কালচে ধূলি, আর কোথাও থেকে ভেসে আসা অসম্পূর্ণ শব্দ: “হ্রীং… ক্রৌঁ… শৌঃ… ন—” তারপরই ফাঁকা, এমন এক ফাঁকা যা নিঃশব্দ নয়; অদৃশ্য কণ্ঠের ভাঙন-ধ্বনি সেখানে ঘণ্টার মতো পাক খেতে থাকে, মাটির নিচে চোরা জলের শব্দের মতো সরে যায়, আবার ফিরে আসে। সেই স্বপ্ন থেকে পাঁচজন পাঁচ জায়গায়, পাঁচটি শরীর ভিন্ন ভিন্ন ঘামে, একই আতঙ্কে জেগে উঠল—যেন কোনো অদেখা আঙুল তাদের বুকের ওপর অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে লিখে রেখে গেল একটি মাত্র বৃত্ত, যার ভিতরে…
-
অনির্বাণ সেন পর্ব ১ কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে এক বিশাল আবাসন—গ্লাসের বারান্দা, রঙিন আলো, লিফটে ওঠানামার শব্দে ভরা। সেখানকার অষ্টম তলার ফ্ল্যাটে থাকে দত্ত পরিবার। সুদীপ্ত দত্ত একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে উচ্চপদস্থ অফিসার, মাসের শেষে তার অ্যাকাউন্টে যে বেতন জমে, তাতে অনায়াসেই চলে যায় তাদের তিন সদস্যের সংসার। তার স্ত্রী মৌসুমি, একসময় কলেজে ইংরেজি পড়াতেন, কিন্তু এখন ঘরের দেখাশোনাই তার প্রধান কাজ। মেয়ে ঐশী—নবম শ্রেণির ছাত্রী, পড়াশোনায় মেধাবী, আঁকতে ভালোবাসে, আর মাঝে মাঝে পিয়ানো বাজাতে শিখছে। ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকালে দূরে দেখা যায় আকাশচুম্বী সব টাওয়ার, আর একটু নিচে তাকালেই উল্টো দৃশ্য। ঝুপড়ি ঘরগুলোর ছাউনিতে টিন, কোথাও পলিথিন, কোথাও বা ভাঙা বাঁশ…
-
অনিন্দিতা ধর প্রথম পর্ব: “শেষ নয় শুরু” মধুরিমা বসে ছিল তার রুমের ছোট্ট সাইজের টেবিলের সামনে। হাতের কাপটি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার চোখের সামনে কিছুই স্পষ্ট ছিল না। এই কয়েক মাস ধরে, সে যেন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রোহিত, তার স্বামী, প্রায়ই অফিসে ব্যস্ত থাকে, আর সে নিজে বেশিরভাগ সময় একাই থাকে। তার জীবনে কিছুই বদলানো হয়নি, কিছুই নতুন ছিল না। তার দিনগুলোর মধ্যে একঘেয়েমি ভর করেছে, আর তাকে আরও একাকী করে তুলেছে। যতবারই মধুরিমা আ鏈ুলের দিকে তাকায়, ততবারই মনে হয় যেন সে কিছু খুঁজছে—একটি চমক, একটি অজানা দিশা। তাকে যেন বিশ্বাস করতে বলেছিল যে,…
-
স্নেহাশিষ রায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে। জাদরেল রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছে শহরের স্টেশনে। গরম বাতাসে ছিন্ন কাপড়ের মতো ওড়ানো যাচ্ছে না কোনো মন। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ৩২ নম্বর লোকাল ট্রেনের কামরায় যেন আগুনের ঢেউ বইছে। সেই উত্তপ্ত কামরার মধ্যে দিয়ে হাঁটছে দশ বছরের একটি ছেলে—হাতে একগুচ্ছ তালপাতার পাখা। ছোট্ট শরীরে ঘাম জমে রেখার মতো গড়িয়ে পড়ছে, তবে চোখে কোনো ক্লান্তি নেই। তার ঠোঁটে এক মৃদু ডাক—“তালপাতার পাখা নিন… গরমে আরাম… পাঁচ টাকায় একখানা…”। প্রতিটি যাত্রীকে দেখে সে যেন কল্পনা করে, কে কিনবে, কে ফিরিয়ে দেবে। কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ তিরস্কার করে—“যাও যাও, বিরক্ত করো না।” তবু সে এগিয়ে যায়।…
-
মিতা চট্টোপাধ্যায় স্বরূপা নিজের জীবনের মধ্যে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করে, যদিও তার কাজ ছিল কিছুটা অদ্ভুত এবং রহস্যময়। সে এক ধরনের ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিল, যা তাকে অন্যদের স্বপ্নে প্রবাহিত হতে সাহায্য করত। তার কাজ ছিল মানুষের স্বপ্ন রেকর্ড করা, তাদের সেসব অনুভূতি, দৃষ্টিকোণ এবং অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করা। প্রতিদিন সে তাদের স্বপ্নের সুর ও ছন্দে প্রবাহিত হয়ে যেত, যেন একটি অবিকল চিত্র, যা তার কাছে একান্ত সত্য হয়ে উঠত। তার ঘরটা ছিল এক অদ্ভুত জায়গা, যেখানে শত শত স্বপ্নের ডায়েরি রাখা ছিল, স্বপ্নের টুকরো, ছবি, শব্দ — সব কিছু যার মাধ্যমে সে তাদের মানসিক জগতের গভীরে পৌঁছাতে পারত। তবে, এই…