অরিত্র মুখার্জী পর্ব ১: আগুনের চোখ অমাবস্যার রাতে গ্রামের নিস্তব্ধতা যেন অদৃশ্য কোনো হাত এসে একেবারে চেপে ধরত। গঙ্গার তীরের ছোট্ট জনপদ খয়েরপুরে তখন বাতাসও গায়ে লাগতে চাইত না। মাটির ঘরগুলো মৃদু শ্বাসের মতো নিস্তেজ হয়ে থাকত, পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিফলন তো নেই-ই, তারকারাও যেন আকাশের কালো পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। শুধু মন্দিরের গায়ে, কুঁচকে যাওয়া লালচে ইট আর কালো ধোঁয়া-মাখা দেয়ালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই প্রাচীন কালীমূর্তি—যার চোখে অদ্ভুত এক জ্যোতি নাকি দেখা যায়। বৃদ্ধরা বলত, “আগুনের চোখ”। তাদের দাবি, প্রতি অমাবস্যার রাতে মূর্তির দু’চোখ হঠাৎই জ্বলে ওঠে যেন কারো গায়ের ভিতর থেকে দাউ দাউ করে আগুন…
-
-
অর্কদীপ সেন পর্ব ১ : আগুনের পুঁথি রুদ্রর বয়স তখন সাতাশ। কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানে তার গবেষণা শেষ পর্যায়ে। তার বিষয়—বাংলার লোকবিশ্বাস, ভূতপ্রেত, তন্ত্রমন্ত্র আর আচার। এই শহরে যাদের কাছে তন্ত্র কেবল এক অদ্ভুত ভয়ের প্রতীক, তাদের চোখে রুদ্র ছিল খানিকটা অদ্ভুতুড়ে। সে পুরোনো গ্রন্থাগারে বসে দিনের পর দিন প্রাচীন পুঁথি ঘাঁটতে ভালোবাসত, রাতে ঘরে ফিরে নিজের নোটবইয়ে লিখে রাখত অদ্ভুত সব ছেঁড়া ছেঁড়া তথ্য—যেন একটি ভাঙা আয়নার টুকরো একত্র করছে, কিন্তু আয়নার প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। এক বিকেলে, গরমের ধুলোয় ভরা মে মাসে, রুদ্র যায় নীলরতন লাইব্রেরির আর্কাইভ বিভাগে। আর্কাইভের ভেতর ঢুকলেই ম্লান আলোয় অদ্ভুত গন্ধ ছড়িয়ে থাকে—পুরোনো কাগজ,…
-
সঞ্জয় দে পর্ব ১: বাড়ির রহস্য অভিজিৎ ছিল ইতিহাসের ছাত্র। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল পুরনো বাড়িগুলোর ইতিহাস খোঁজা, বিশেষত সেগুলোর যেগুলো সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে অথবা কেউ তাদের কাহিনী জানে না। একদিন, তার বন্ধু প্রীতম তাকে একটি পুরনো বাড়ির কথা জানায়, যে বাড়ি সম্পর্কে নানা গুজব ছড়িয়ে আছে। লোকজন বলে, এখানে অদ্ভুত হাসির শব্দ শোনা যায় এবং অনেক মানুষ এখানে হারিয়ে গেছে। সেই রাতের পর থেকেই বাড়িটির নাম তার মনের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। অভিজিৎ ভেবেছিল, এই বাড়ির রহস্য উন্মোচন করতে পারলে তার গবেষণায় নতুন একটি দিক যোগ হবে। তাই এক সকালে, তার গবেষণার জন্যই সেদিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত…
-
শুভেন্দু বসাক তান্ত্রিকের অভিশাপ শুভেন্দু বসাক নিষিদ্ধ শক্তি শুভ, এক তরুণ তান্ত্রিক ছাত্র, জীবন থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করছিল। তার সাধনাতে গভীরতার জন্য সে ছটফট করছিল, দিনের পর দিন চূড়ান্ত নিষ্ঠার সাথে তন্ত্র শাস্ত্র অধ্যয়ন করছিল। সে জানত যে তার ভিতরের শক্তি শুধু তাকে নয়, পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, যদি সে সেই শক্তির সঠিক ব্যবহার জানত। কিন্তু কেউ জানত না, যে তার তন্ত্র সাধনা শুধু এক ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এর পরিণতি তাকে এক অন্ধকারে নিয়ে যাবে, যা সে কখনো কল্পনা করতে পারেনি। তন্ত্র সাধনায় দীক্ষিত হওয়ার পর, শুভ একদিন শিখে গেল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মন্ত্র—এটি তার সাধনা…
-
জয় সাহা গলির মেয়ে সহেলীর জন্ম এক ছোট্ট শহরের এক অজপাড়া গলিতে। সে ছিল এক সাধারণ মেয়ে, যেখানে সমাজের চোখে তার কোন বিশেষ গুরুত্ব ছিল না। তার জীবন ছিল একেবারে নিরস, রুটিনমাফিক। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার কাজ ছিল ঘরের কাজ, মা-বাবার সহায়তা, ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনা, আর মাঝে মধ্যে স্কুলে যাওয়া। তবে, সহেলী কখনোই এই নির্ধারিত জীবনটিকে সঙ্গী করতে পারেনি। তার মন ছুটতে চেয়েছিল দূরে, তার চোখ ছিল নতুন দিগন্তে, যেখানে জীবনের অনেক সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সে জানত, সে তার ছোট্ট গলির মধ্যেই বন্দী। সেই গলির প্রাচীরের বাইরের পৃথিবী তার জন্য এক কল্পনা মাত্র। সহেলী ছিল খুব চুপচাপ। একা থাকলেই…
-
শঙ্খ সেন অজানা ডাক কলকাতার একটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী সুমি। বয়স তেইশ, তীব্র কৌতূহল এবং অদম্য সাহস তার মধ্যে মিশে রয়েছে। সে বিশ্বাস করে, পুরোনো গল্পগুলো সত্যি না হলেও, তাদের মধ্যে কিছু না কিছু গভীর অর্থ থাকে। কিন্তু এই বিশ্বাস কখনোই এত শক্তিশালী হয়ে উঠেনি যতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যখন সে প্রথমবারের মতো গ্রামে গিয়েছিল, যেখানে কালীপুরাণের রহস্যময় পুস্তকটির কথা শোনা গিয়েছিল। সুমি একটি গবেষণার কাজের জন্য গ্রামে আসছিল, এক অজানা সত্ত্বা, এক রহস্যময় পুস্তক এবং কিছু পুরনো প্রাচীন উপাখ্যান তাকে ডেকেছিল। তার সহকারী, সঞ্জীব, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো পুরাণবিদ্যা বিভাগের গবেষক, তাকে এই গ্রাম সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিল। সঞ্জীব…