প্রকাশ মাহাতো ১ পুরুলিয়ার ঘন জঙ্গলের ভেতরে সকালের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি, সূর্যের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নেমে এসে ঝিলমিল ছায়া তৈরি করছিল মাটির ওপর। চারপাশে শুধু শাল, সেগুন আর মহুয়ার বন, যেখানে পাখির ডাক মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করছিল। গ্রামের শ্রমিকরা দল বেঁধে এসেছিল কাঠ কাটতে, হাতে কুড়াল, কাঁধে দড়ির বোঝা, কারও কোমরে বাঁধা পুরনো কাপড়, যাতে পরে কাঠ বেঁধে নিয়ে যাওয়া যায়। এই দলটার মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ছিল শিবলাল মাহাতো, বয়সে পঁয়তাল্লিশ ছুঁইছুঁই, রোদে পোড়া চেহারা আর চোখে গাঢ় দুশ্চিন্তার ছায়া। সে বহুবার এ জঙ্গলে ঢুকেছে, কিন্তু প্রত্যেকবারই মনে হয়েছে এই জঙ্গলের বুকের ভেতর যেন কোনও…
-
-
১ ঈশা দত্ত ট্রেনে দীর্ঘ যাত্রার পর যখন সুন্দরবনের ভেতরের ছোট্ট জনপদের ধুলোমাখা স্টেশনে নেমে এলো, তখন তার মনে হচ্ছিল যেন শৈশবের স্বপ্ন আর ভয় দুটো একসাথে হাত ধরে হাঁটছে। ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে স্টেশন থেকে বেরোনোর সময় চারপাশের গন্ধটা প্রথমেই তাকে আঘাত করল—আধভেজা কাদা, নোনা বাতাস, গাছের পাতা, আর নদীর জলে লবণাক্ততার মিশ্র গন্ধ। এ সবকিছুর ভেতরে সে যেন শুনতে পাচ্ছিল অজস্র গল্পের প্রতিধ্বনি, যেগুলো ছোটবেলায় শোনানো হয়েছিল তাকে দাদার ঠোঁট থেকে। সেই জলমহল—এক ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়ি, নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ধেক ডুবে যাওয়া প্রাসাদ—যেটাকে নিয়ে লোকজন বলে অসংখ্য অদ্ভুত কথা। ঈশার মনে পড়ে গেল শৈশবের সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে থাকা, হাতে…
-
অভিজ্ঞান শইকীয়া ১ গুৱাহাটী বিশ্ববিদ্যালয়ৰ কেন্দ্ৰীয় গ্রন্থাগাৰৰ ওপৰফালৰ কোণত এটা ধূলিমলিন পুৰণি সঁচাই থকা শ্বেল্ফ থাকে, য’ত বহুবছৰৰ পুৰণি পাণ্ডুলিপি, দলিল আৰু দস্তাবেজ সযতনে সংৰক্ষণ কৰা হয়। সেইদিনা শীতল শুৱঁনি লগা এপৰালি বতাহৰ ভিতৰত দিগন্ত বৰা—এজন গম্ভীৰ আৰু মনযোগী ইতিহাস গৱেষক—তাঁৰ দৈনিক অভ্যাসৰ দৰে সেই শ্বেল্ফৰ আগত থমকি দাঁড়িল। তেওঁ বিশেষকৈ আহোম যুগৰ সামরিক ইতিহাস আৰু সাংস্কৃতিক নিদৰ্শনৰ ওপৰত গবেষণা কৰি আছিল, আৰু দিনটোৰ প্ৰথমভাগত বিশ্ববিদ্যালয়ৰ উপ-গ্রন্থাগাৰিকই তেওঁৰ কাষত আহি কৈছিল যে, “পুৰণি সংৰক্ষণ বিভাগত কিছুমান নতুনভাৱে সংৰক্ষিত দলিল আছে, হয়তো আপোনাৰ কামত লাগিব।” দিগন্তৰ আগ্ৰহ একেবাৰে জেগাই উঠিল। তেওঁ কাপোৰৰ গ্লাভছ পিন্ধি, সাৱধানে এটা কাঠৰ বাকচৰ ঢাকনি তুলিলে। ভিতৰত…
-
সৌমিতা রায় শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের সকাল যেন মাটির গন্ধ, রঙের খেলা আর সুরের মায়ায় মোড়া এক অলৌকিক প্রভাত। ফাল্গুনের হাওয়া যেন হাতের তালুর মতো কোমল, তবু তার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক ধরণের উচ্ছ্বাস যা আকাশের নীলকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। আঙিনায় গাছের গায়ে গায়ে হলুদ-কমলা ফুলের মালা ঝুলছে, পথের ধারে আলপনার নকশা, আর সকালবেলার আলোতে লাল মাটির পথ যেন আরও গাঢ় রঙে রাঙিয়ে উঠেছে। কিরণময়ী বাবার দোকানে বসে রঙিন পোড়ামাটির গয়না সাজাচ্ছে—গোলাপি আর সবুজ রঙের কানের দুল, মাটির মালা, ছোট ছোট পায়েলের মতো নকশা করা ব্রেসলেট। বাবার হাতে তৈরি গয়নার উপর তার নিজের আঁকা নকশা উৎসবের ক্রেতাদের চোখে আলাদা করে…
-
দিব্যজ্যোতি দেৱচৌধুৰী ১ অভিজিৎ বহুদিনীয়া ছাত্ৰবাসৰ বিৰক্তিকৰ ভিৰভাঁটিৰ পৰা মুক্তি বিচাৰিছিল। গুৱাহাটী বিশ্ববিদ্যালয়ৰ গৱেষক হিচাপে তেওঁৰ দিনচৰি কাগজ-পত্র, কিতাপ আৰু গৱেষণাৰ চাপত ভৰ্তি। তেওঁ ভাবিছিল—এটা শান্ত, নিৰ্জন ঘৰ পাই থকাৰ পৰা হয়তো মনৰ স্থিৰতা আহিব, আৰু নতুন প্ৰবন্ধ লিখাৰ বাবে প্ৰয়োজনীয় মনোযোগ পোৱা যাব। সেই অনুসন্ধানতেই একদিনে তেওঁ পালে মাৰ্গহাটৰ এটা পুৰণি দুইতলা ঘৰৰ ঠিকনা। গুৱাহাটীৰ মূল নগৰৰ কোলাহলৰ পৰা অলপ আঁতৰৰপৰা হলেও, ঘৰখনৰ সৰু উঠোন আৰু মাটিৰ গন্ধত ভিজা পৰিৱেশত এক ধৰণৰ সান্ত্বনা আছিল। যদিও ঘৰৰ বাহ্যিক গঠনটো সলনি-ভাঙি পোৱা যায়—মজবুত কাঠৰ দৰজাৰ কাষে কাষে কাষ্ঠখণ্ড মলিন হৈ পৰা, জানলিৰ কাচবোৰত দাগ ধৰা—তথাপি সেই নিঃশব্দত অভিজিৎ এক ধৰণৰ অদ্ভুত…
-
ইন্দ্রনীল নস্কর ১ প্রায় সন্ধ্যার আগমুহূর্তে অর্ণব সেন পৌঁছালো সেই অজপাড়া গাঁয়ে। শহরের চওড়া রাস্তা, আলো ঝলমলে বিলবোর্ড আর ব্যস্ত ট্রাফিকের ভিড় পেরিয়ে, ধীরে ধীরে যখন গ্রামের সরু কাঁচা পথে প্রবেশ করল, তখন মনে হলো যেন অন্য এক জগতে এসে পড়েছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল মাঝে মাঝে দূরে শোনা যাচ্ছে শিস দিয়ে হাওয়া বয়ে চলার শব্দ। কোথাও কোথাও কয়েকটি ঝুপড়ি ঘর, ছোট ছোট বাঁশবনের আড়াল, আর সেগুলোর ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা গরু-মোষের ঘণ্টাধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে গোধূলির আলোয়। এই গ্রামটির কথা অর্ণব আগেই শুনেছিল—একটি প্রাচীন লোককথার জন্য বিখ্যাত। নদীর ধারে নাকি এমন সব ঘটনা ঘটে, যা মানুষের কল্পনারও অতীত। অর্ণব ইতিহাস গবেষক,…
-
১ গুৱাহাটী শহৰৰ পৰা খুব দূৰ নহয়, দক্ষিণ-পশ্চিম দিশত বিস্তৃত হৈ থকা দীপুৰ বিলক কেৱল এখন পানী ভৰ্তি জলাশয় বুলি নহয়, এক পৰিপূৰ্ণ জীৱ-বৈচিত্র্যময় স্থান হিচাপে জনা যায়। সেউজীয়া পৰিৱেশ, দূৰত নীল পৰ্বতৰ সাৰি, আৰু বিলৰ ওপৰত চকচকীয়া পানী জ্যোৎস্নাৰ পোহৰত সদায় ৰূপান্তৰিত হৈ পৰে। দিনৰ বেলাত ই যেন এক পাখিৰ স্বৰ্গ—এনে বহুত প্ৰজাতিৰ চৰাই আহে যিবোৰ ক্ৰমে উৰণ মাৰি পানীৰ ওপৰত খেলি ফুৰে। পদ্মফুলৰ সুবাসে বতাহ ভৰি তোলে আৰু বিলৰ পানীৰ ওপৰত ভাসি থকা সেউজীয়া পাতবোৰে এক অনন্য সৌন্দৰ্য সৃষ্টি কৰে। গাঁওবাসীসকলৰ বাবে দীপুৰ বিল কেৱল জীৱিকা নিৰ্ভৰ কৃষি বা মাছ ধৰা স্থান নহয়, ই এক পৰিচয়, এক সাংস্কৃতিক…
-
অদিতি পাল এক রাতের গঙ্গা সবসময়ই অন্যরকম। দিনে যে ঘাটে ভিড় জমে, স্নান, পূজা, আরতির ভিড়ে যেখানকার সিঁড়িগুলো পর্যন্ত হারিয়ে যায় মানুষের ভিড়ে, রাত নামলেই সেই জায়গাটা যেন অন্য কোনো জগতে ঢুকে যায়। বাতাসে তখন থাকে কেবল জলের সোঁদা গন্ধ আর অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে কেবল রাতজাগা পাখির ডাক কিংবা দূরে ভেসে আসা কুকুরের হাহাকার ভাঙে সেই নীরবতা। এই গঙ্গার এক পুরোনো ঘাট নিয়ে ছোটো ছোটো কিশোর থেকে শুরু করে বুড়ো পাণ্ডারা পর্যন্ত বলাবলি করে—ওখানে নাকি মাঝরাতে কান্নার শব্দ শোনা যায়। লোকেরা বলে, সেই কান্না কোনো মানুষের নয়, কোনো বউয়ের আত্মা ওখানে কাঁদে। যার করুণ সুরেলা সিসকি শোনা যায়, কিন্তু…
-
প্রিয়ম চক্রবর্তী শরতের শেষ ভাগ, আকাশে তুলোর মতো ভাসমান মেঘ আর বাতাসে ধানের গন্ধ মিশে আছে। কলকাতার ইতিহাসবিদ অনিন্দ্য মুখার্জী ও তাঁর স্ত্রী সায়ন্তী ট্রেনে চেপে যাচ্ছেন বীরভূম জেলার এক অখ্যাত গ্রামে, যেখানে স্থানীয় কলেজে আয়োজিত গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোককথা নিয়ে একটি সেমিনারে বক্তৃতা দিতে হবে অনিন্দ্যকে। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সায়ন্তী ক্যামেরা হাতে ধানক্ষেত, নদীর ধারে চরাচর, আর মাটির ঘরের ছবি তুলছিলেন। তাঁর চোখে গ্রামের সরলতা সবসময়ই এক আলাদা আকর্ষণ রাখে, আর অনিন্দ্যর কাছে লোককথা মানে ইতিহাসের ভেতরে লুকোনো এক অদেখা দরজা। সেমিনার ভেন্যুটি ছিল গ্রামপঞ্চায়েত ভবনের বড় হলঘর, যেখানে বাঁশের মাচা দিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে, কাগজের…
-
সৌমিত্র দাশগুপ্ত এক গ্রামের মাঝখান থেকে সামান্য দূরেই এক পুরোনো পুকুর, যার জলে সবসময় যেন এক অদ্ভুত গা ছমছমে নীরবতা ভেসে থাকে। চারপাশে শ্যাওলা জমে যাওয়া ঘাস, মাটিতে শুকনো পাতার স্তূপ, আর ভোরের কুয়াশা পুকুরের ধারে এক ভয়ানক আচ্ছাদন তৈরি করে। গ্রামের মানুষজন দিনের বেলায় সেখানে জল তুলতে যায়, গবাদি পশুকে গোসল করায়, কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই সেই জলাশয়কে এড়িয়ে চলে যায় সকলে। কারণ সেই পুকুরকে ঘিরে রয়েছে বহু বছরের ভয়ঙ্কর কাহিনি। অকারণে সেখানে ডুবে মরেছে গ্রামের মানুষ, কখনও শিশু, কখনও জেলে, কখনও গৃহবধূ। লোকেরা বলে, জলে সাঁতার জানলেও হঠাৎ পা কেঁচে যায়, শ্বাস আটকে আসে, আর চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে…