কাজল সরকার কলকাতার পুরনো শহর, যেখানে কালের সঙ্গেই এক এক করে হারিয়ে গেছে অনেক ইতিহাস, সেখানে এক রহস্যময় চুরি অথবা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটল। স্থানটি ছিল শহরের এক পুরনো অঞ্চলে, যেখানে অন্ধকার গলিপথ, পুরনো ভাড়াবাড়ি, আর দীর্ঘ ইতিহাস ঘেরা চায়ের দোকানগুলো ইতিহাসের এক অদ্ভুত অনুভূতি সৃষ্টি করে। ঋত্বিক মজুমদার, একজন ইতিহাস গবেষক এবং ব্যবসায়ী, যে কিনা কলকাতার পুরনো ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করত, তার বাড়ি থেকেই উদ্ধার হয় এক অদ্ভুত ঘটনা। পুলিশ প্রথমে ভাবল এটি একটি সাধারণ চুরি, কিন্তু পরে যখন ঋত্বিকের মৃতদেহ উদ্ধার হয়, এবং তার কাছে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও নিখোঁজ হয়ে যায়, তখন সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কেবলমাত্র চুরিই নয়,…
-
-
তুষার অধিকারী এক আষাঢ় মাসের শেষভাগ। ঘন মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে চিংড়িঘাটের ঘোলা জল থেমে থাকলেও বাতাস কাঁপিয়ে চলেছে। বোটের ইঞ্জিনের একটানা গর্জন ঠেলে, গহীন ম্যানগ্রোভের মধ্যে ঢুকে পড়ছে এক গবেষক দলের চার সদস্য—ড. অদিতি সেন, সম্রাট দে, জয়ন্ত ঘোষ ও স্থানীয় গাইড বীরাজ মুখার্জি। চারপাশে থমথমে নিরবতা। মাঝে মাঝে দূরে শোনা যায় ময়ূরের ডাক, আবার কোথাও চাঁদিয়ালের তীক্ষ্ণ শব্দ। গঙ্গার শাখা নদী ঘেঁষে বোটটা এগোচ্ছে, সঙ্গে করে যাওয়া খাবার, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন, ল্যাপটপ, আর একরাশ কৌতূহল। অদিতি চোখ মেলে দেখছেন—দু’পাশে যে বন, সেটাকে শুধুই গবেষণার বিষয় বলে মনে করা ভুল হবে। একটা অলিখিত অনুভব যেন সঙ্গী হয়ে এসেছে—এই বনের…
-
তিথি বসু পর্ব ১: তাবিজওয়ালা ঘর শহরের কোলাহলের মাঝখানে, যেখান থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ঝাপসা দেখা যায়, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে চৌরঙ্গীর একটি পুরনো হোটেল—‘হোটেল সম্রাট’। বাইরে থেকে দেখলে আধুনিক মনে হলেও ভিতরে ঢুকলেই যেন সময় পিছিয়ে যায়—ফিকে আলো, সাদা কাঠের জানালা, আর মোটা মোটা পর্দা যা আলো ঢুকতে দেয় না। সেই হোটেলের ৩১৫ নম্বর ঘর থেকে পাওয়া গেল এক মৃতদেহ। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দেখে—একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ খাটে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। ঘরের ভিতর অদ্ভুত একটা গন্ধ—মাটির, ধূপের, আর যেন ভেজা ছাইয়ের গন্ধ। মৃতদেহের পাশে পড়ে ছিল একটি তাবিজ—লাল সুতোয় বাঁধা, তাতে শিকল দিয়ে আটকানো একটা ক্ষুদ্র রৌপ্য বাক্স। এই খুনের…
-
সমীরণ সেনগুপ্ত এক রাত বারোটার কিছু পর। কলকাতার বুক জুড়ে যেন নিঃশব্দ এক বিষণ্নতা নেমে এসেছে। গলির পর গলি পেরিয়ে ডঃ অভিজিৎ ধর এসে দাঁড়ালেন জাফরান রোডের মোড়টায়—বামদিকে একটি পুরনো, ভাঙাচোরা বাড়ির পাশে লাগোয়া সংকীর্ণ দেওয়াল, যার গায়ে ছায়ার মতো কিছু একটার টলোমলো প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হচ্ছে। চারদিক ফাঁকা, তবে বাতাস ভারী। এক অদ্ভুত চুলকানির মতো অনুভব হচ্ছে তার মস্তিষ্কের ভেতর—এমন যেন কোনও অজানা কম্পন, অতি নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে মগজকে ঘিরে ধরেছে। এই জায়গাটায় বহু বছর আগে এসেছিলেন তিনি, শেষবার স্ত্রী রীণার হাত ধরে, তখনও জানতেন না—এই নির্জন গলি একদিন তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। গলির শেষপ্রান্তে একটা হলদে আলো টিমটিম করছিল,…
-
তিথি বসু পর্ব ১: সেই ভগ্নপ্রায় দরজার শব্দ নদীয়ার কুয়াশা ঢাকা বিকেলে ট্রেন থেকে নামতেই শুভমর মনে হলো সময়টা যেন হঠাৎ করে থমকে গেছে। বাইরের হাওয়া ঠান্ডা, কিন্তু বাতাসের মধ্যে কিছু একটা গুমোট। সে ব্যাগপত্র গুছিয়ে রিকশাওয়ালার দিকে এগোল। “চৌধুরীবাড়ি যাবেন?” জিজ্ঞেস করতেই রিকশাওয়ালার মুখটা কেমন থমথমে হয়ে গেল। “চৌধুরীবাড়ি? ওই যে শ্মশানের পাশে যেটা?” শুভম মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, ওটাই। আমি গবেষণার জন্য এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতি আছে।” রিকশাওয়ালা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, “আমি ওইদিক যাই না বাবু। ওখানে এখন কেউ থাকেও না।” শেষমেশ অনেক বোঝানোর পরে একজন রাজি হলো। অন্ধকার নেমে আসছিল, আর চৌধুরীবাড়ির পথটা খড়ি গাছ…
-
অধ্যায় ১ পুরুলিয়ার ঘন অরণ্য পেরিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে নির্জর বসু যখন সেই পুরনো কটেজটির সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সূর্য সবে পশ্চিমে হেলে পড়েছে। রোদ আর পাতার ফাঁক দিয়ে আলো-ছায়ার খেলা কেমন একটা বিমুগ্ধ নীরবতা তৈরি করেছিল। শহরের শব্দদূষণ, অফিসের ইমেল, অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন—সব ছাড়িয়ে, এই নির্জনতার মাঝে এসে যেন কিছুটা হালকা অনুভব করছিল সে। কটেজটা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই ভিতরে কী অপেক্ষা করে আছে—চুন-ঝরানো দেওয়াল, কাঁচভাঙা জানালার পাশে গাছের লতানো ডাল, আর এক পাশে একটা পোড়া পোড়া গন্ধ লেগে থাকা আগুন নিভে যাওয়া উনুন। দুলাল কাকা, কটেজের কেয়ারটেকার, চুপচাপ একটা চাবি এগিয়ে দিলেন—চোখেমুখে কোনো উৎসাহ নেই, যেন এক…
-
সমাপ্তি বর্মন সকালটা ছিল মেঘলা, অথচ বৃষ্টির কোনো আভাস নেই। রুক্মিণীর মাথার ওপর দিয়ে পাখির ছায়া উড়ে গেল—একটা নীল কুড়ুলি, সেইরকম রঙিন পালকের পাখি যেটা কেবল কুশলনগরের আকাশেই দেখা যেত তাদের ছোটবেলায়। বিশ বছর পর এই জায়গাটায় ফিরে আসার সাহস সে নিজের কাছেই একটা বিস্ময় মনে হচ্ছিল। পাশে বসে থাকা ভাই অর্ণব হঠাৎ বলে উঠল, “এই রাস্তার বাঁকে একটা নারকেল গাছ ছিল, মনে আছে?” রুক্মিণী হেসে মাথা নাড়ল। “আর মনে নেই? ওই গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আমি তোকে গুমরার জুস খাওয়াই বলেছিলাম, আর তো তোর গায়ে গড়িয়ে পড়েছিল!” দুজনেই হেসে উঠল। সেই হাসির মধ্যে ছিল পুরনো দিনের গন্ধ, ছিল শৈশবের ডাকে…
-
সঞ্জয় দে পর্ব ১: বাড়ির রহস্য অভিজিৎ ছিল ইতিহাসের ছাত্র। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল পুরনো বাড়িগুলোর ইতিহাস খোঁজা, বিশেষত সেগুলোর যেগুলো সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে অথবা কেউ তাদের কাহিনী জানে না। একদিন, তার বন্ধু প্রীতম তাকে একটি পুরনো বাড়ির কথা জানায়, যে বাড়ি সম্পর্কে নানা গুজব ছড়িয়ে আছে। লোকজন বলে, এখানে অদ্ভুত হাসির শব্দ শোনা যায় এবং অনেক মানুষ এখানে হারিয়ে গেছে। সেই রাতের পর থেকেই বাড়িটির নাম তার মনের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। অভিজিৎ ভেবেছিল, এই বাড়ির রহস্য উন্মোচন করতে পারলে তার গবেষণায় নতুন একটি দিক যোগ হবে। তাই এক সকালে, তার গবেষণার জন্যই সেদিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত…
-
অনির্বাণ ঘোষ অদ্ভুত ধ্বনি গাঁয়ের শেষ সীমানায়, ঘন জঙ্গল আর বুনো পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল বহুতলা ভুতের বাড়ি, যেখানে কোনোদিন মানুষের পা পড়েনি। গাঁয়ের বয়স্করা বলতেন, “এ বাড়ি শাপিত, এখানে বাস করা লোকের ভাগ্য বিপর্যস্ত।” কিন্তু আধুনিক যুবকরা এসব অন্ধবিশ্বাসকে গা ছেড়ে দিয়েছিল, আর তার মধ্যে এক জন ছিল আরিফ। এক রহস্যপ্রেমী সাংবাদিক, যিনি শহর থেকে এই গ্রামে এসেছিলেন কিছু অদ্ভুত ঘটনা অনুসন্ধান করতে। আরিফের প্রথম দিনের সন্ধ্যায় যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে অস্ত যাচ্ছিল, তখন গাঁয়ের বাজারের এক কনফেকশনারি দোকানে বসে শুপ্রা নামক এক স্থানীয় মেয়ের সাথে পরিচয় হলো। শুপ্রা কথায় কথায় বলল, “আপনি কি বহুতলা ভুতের বাড়ি সম্পর্কে জানেন?”…
-
শঙ্খ সেন অজানা ডাক কলকাতার একটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী সুমি। বয়স তেইশ, তীব্র কৌতূহল এবং অদম্য সাহস তার মধ্যে মিশে রয়েছে। সে বিশ্বাস করে, পুরোনো গল্পগুলো সত্যি না হলেও, তাদের মধ্যে কিছু না কিছু গভীর অর্থ থাকে। কিন্তু এই বিশ্বাস কখনোই এত শক্তিশালী হয়ে উঠেনি যতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যখন সে প্রথমবারের মতো গ্রামে গিয়েছিল, যেখানে কালীপুরাণের রহস্যময় পুস্তকটির কথা শোনা গিয়েছিল। সুমি একটি গবেষণার কাজের জন্য গ্রামে আসছিল, এক অজানা সত্ত্বা, এক রহস্যময় পুস্তক এবং কিছু পুরনো প্রাচীন উপাখ্যান তাকে ডেকেছিল। তার সহকারী, সঞ্জীব, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো পুরাণবিদ্যা বিভাগের গবেষক, তাকে এই গ্রাম সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিল। সঞ্জীব…