সুদীপ দে শাল, শিমুল আর পলাশের ঘন জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট গ্রামটির নাম রামচক। গ্রামের চারপাশ যেন এক অদৃশ্য পর্দায় ঢাকা—দিনে শান্ত, অথচ রাতে গোপনে কেঁপে ওঠে। এখানে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এক ভয়াল কাহিনি, যা শোনার পর শিশুদের চোখ ভিজে যায় আর প্রৌঢ়দের মুখে ছায়া নেমে আসে। বলা হয়, প্রতি বছর এক বিশেষ পূর্ণিমার রাতে, যখন আকাশে চাঁদ যেন দগ্ধ প্রদীপের মতো জ্বলতে থাকে আর মাটির ধুলো রূপালি আলোয় ভিজে ওঠে, তখন গ্রামে অদ্ভুত ঢাকঢোল বাজতে শুরু করে। শোনা যায়, শঙ্খধ্বনি, বংশীর আওয়াজ আর মেয়েলি হাসির কোলাহল—যেন কোনো অচেনা উৎসব শুরু হয়েছে। অথচ সেই রাতেই গ্রামবাসীরা ভয়ে নিজেদের ঘরে…
-
-
দেবিকা দাশগুপ্ত ১ গ্রামের প্রাচীন মন্দিরটি যেন সময়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে, শত বছরের নীরবতা আর শ্যাওলাধরা দেওয়ালে জমে থাকা ইতিহাস নিয়ে। চারপাশে কেবল বন আর পুরোনো বটগাছের ছায়া, গা ছমছমে নৈঃশব্দ্যকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশের মাঝে যেন এক অলৌকিক প্রদীপ, তার রুপালি আলোয় মন্দিরের ভাঙা ইট, পাথরের সিঁড়ি আর ভেতরের শিবলিঙ্গ সব যেন ঝলমল করে উঠেছে। গ্রামের লোকেরা সাধারণত রাতে এখানে আসে না—কারও চোখে ভৌতিক ভয়, কারও মনে অশুভ বিশ্বাস। কিন্তু ঋজু আলাদা। কলকাতায় পড়াশোনা করে ফেরা এই তরুণ কুসংস্কারের ভিড়ে আটকে নেই; তার মধ্যে আছে রহস্য বোঝার এক অদম্য কৌতূহল। সেদিন পূর্ণিমার রাতে হঠাৎই সে…
-
অর্জুন দে ১ গ্রামের প্রান্তে অবস্থিত খোশরুরাজ সরকারের পুরনো বাড়িটি বছরের পর বছর আগের সেই ভাঙাচোরা মেঝে আর ছাদের গাছের ফাঁকফোকর দিয়েই তার কাহিনী বলে চলে। আজও বাড়ির দেয়ালে সোনালী দিনের স্মৃতিগুলো উজ্জ্বল—তবে এখন যেন ম্লান হয়ে এসেছে সময়ের ধুলোয়। খোশরুরাজ, যে এককালে গ্রামের মঞ্চের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী ছিলেন, এখন নির্জনতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন। সাদা ধোঁড়া চুল আর গভীর রেখাচিত্র তার মুখে সময়ের সাক্ষী, কিন্তু চোখে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা। পুরোনো দিনের গান আর সুরের স্মৃতি তার হৃদয়ে বাজে বারবার, যেন এক পুরানো রেকর্ড প্লেয়ারের সিডির মতো। তার একাকীত্ব ঘিরে রেখেছে একটি গভীর শূন্যতা—তাঁর একমাত্র সন্তান অনেক বছর আগেই শহরে…
-
সৌমিত্র ঘোষ এক রোহিতের পায়ের তলায় মাটির ধুলো তখনও যেন শুকনো শস্যের মতো মৃদু শব্দ করছে। গ্রামের প্রাচীন স্কুলের অন্দরমহল আজ অনেকটাই বদলে গেছে, তবে তার স্মৃতিগুলো যেন এখনও একই রকম স্পষ্ট। ছোটবেলায় যখন সে এই স্কুলের আঙিনায় দৌড়ঝাঁপ করত, তখন এখানকার দোতলা ভবনের ছাদের নিচে কত গল্প জন্ম নিয়েছিল। আজ, অল্প কয়েক দিনের সংস্কার কাজের কারণে, পুরোনো সেই স্কুলের দেয়ালের কিছু অংশ খোলা হয় এবং সেখানে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত বাক্স, এক ধরণের টাইম ক্যাপসুল, রোহিতের চোখে পড়ে। বাক্সটি ধুলোমাখা, লোহার তৈরি এবং পায়ে-মাটির মধ্যে বেশ গভীরে চাপা ছিল। কৌতূহল আর উত্তেজনায় তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। কী থাকতে পারে…
-
উপাসনা রায় উত্তর কলকাতার যে রাস্তার নাম বারবার বদলেছে, সেখানে একটা বাড়ি আছে যার নাম কখনও বদলায়নি—লোকমুখে “কালোজানালা বাড়ি”। অর্পণ যখন প্রথম দিন চাবিটা হাতে পেল, বিকেলের আলো তখন ছেঁকে পড়ছে ছাদের ধুলোতে; সিঁড়ির মুখে জোনাকি বাতির মতো ঝুলছে পুরনো বাল্ব, আর মেঝের কালো-সাদা মোজাইকের ফাঁক থেকে উঠছে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ—আদ্রতা আর শেওলার মিশ্রণ। বাড়িওয়ালার সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই, দালাল বাবু বলেছিল, “এখানে যারা থাকে তারা নিজ দায়িত্বে থাকে। পানীয় জল নিজের মতো জোগাড় করবেন, আর… কালো জানালাগুলো বন্ধ রাখবেন।” কথাটা বলে একটু থেমে হেসেছিল, যেন মজা করছে। অর্পণ ভেবেছিল, পুরনো বাড়ির দোষ। কিন্তু যে জানালাগুলোর কাঠে সরু লোহার…
-
১ প্রাচীন কাল থেকে গ্রামটির নাম শিউলিবাড়ি, তবে এই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে বহু গোপন কাহিনি। গ্রামের উত্তর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষ প্রাচীন তন্ত্রপীঠ মন্দির, যার কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কানে কানে পৌঁছেছে। লাল ইটের গায়ে শ্যাওলা জমে গেছে, ফাটল ধরা প্রাচীর থেকে গাছের শিকড় নেমে এসেছে যেন সময়ের আঁচড়। জনশ্রুতি আছে, এই মন্দির একসময় এক তান্ত্রিক রাজা নির্মাণ করেছিলেন, যিনি দেবীর কৃপা পাওয়ার জন্য নরবলি পর্যন্ত দিতেন। গ্রামের বয়স্করা বলেন, মন্দিরের অন্তঃকক্ষে এক গোপন দরজা আছে, যার ওপারে বন্দি রয়েছে এক অদ্ভুত অলৌকিক শক্তি—শক্তি, যা একবার মুক্তি পেলে সমগ্র অঞ্চলকে ধ্বংস করে দিতে পারে। দিনের বেলাতেও মন্দিরের ভেতরে…
-
তনিমা বসাক পর্ব ১: অজ্ঞাত সংলাপ কলকাতার গ্রীষ্মের বিকেল যখন কাচে ধাক্কা মারে, মনের ভেতরের অতীত-বর্তমানও তখন এক অদ্ভুত তাপমাত্রায় কাঁপে। ড. অরণ্য সেন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বাইরের ঝিম ধরা রোদ আর ঘামচাপা শহরের ভাঁজে ভাঁজে যতসব অদেখা গল্প জমা হচ্ছে, তার দিকে তাকিয়ে। তাঁর চেম্বারটি শহরের দক্ষিণে, বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছাকাছি, চতুর্থ তলায়, চুনে ধরা দেওয়ালের পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া বিবর্ণ সিঁড়ির শেষ প্রান্তে এক প্রাইভেট চেম্বার। এইখানেই তিনি মানুষের মন পড়েন—যেমন দারোয়ান পড়ে কাগজে মোড়া চা, কিংবা বইয়ের দোকানের ছেলে পড়ে পৃষ্ঠার ভাঁজ। আজ তাঁর টেবিলের সামনে বসে রয়েছে এক অদ্ভুত মেয়ে—নিপা বসু। চোখে সুরের মতো নরম অস্থিরতা,…
-
ঋতব্রত সেন [১] জুলাইয়ের এক মেঘলা দুপুরে মিহির তার ঠাকুরদার পুরনো কাঠের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, যেখান থেকে ধুলোমাখা বই আর ভাঙা পুতুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। ঠাকুরদা, বিশ্বেশ্বর পাল, এককালে ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন—তার চোখে এখনও সেই অতীতের আলো জ্বলে। মিহির ছুটির দিনে তার কাছ থেকে নানা কাহিনি শুনতে ভালোবাসত, বিশেষ করে কৃষ্ণনগরের পুতুলশিল্প ও রাজাদের গোপন ইতিহাস। সেই দিন, যখন বৃষ্টি বাইরের দিগন্ত ঘিরে রেখেছিল, ঠাকুরদা হঠাৎ এক গল্প শুরু করলেন—একটা পরিত্যক্ত বাড়ির, যেটি সবাই ‘পুতুলবাড়ি’ বলে চিনত। সেই বাড়ি নাকি এক কালে ছিল রামানন্দ পাল নামের এক পুতুলশিল্পীর, যিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দরবারে কাজ করতেন। কথিত আছে, রাজপরিবারের গুপ্তধন…
-
সঞ্জয় দে এক ঝর্ণাটির সামনে দাঁড়িয়ে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করে যুবকটি, যেন এই নির্জন জলপ্রপাত এক গভীর নিঃশব্দ ডাক ছুঁড়ে দিচ্ছে তার বুকের ভেতর। গ্রামের একপ্রান্তে ঘন জঙ্গলের পেছনে লুকিয়ে থাকা সেই বিশাল ঝর্ণা, দিনের আলোয় যেন স্বচ্ছ অথচ রহস্যে মোড়া। জনশ্রুতি বলে, এই ঝর্ণায় কেউ একবার ঢুকলে আর ফিরে আসে না—আর এমন নিখোঁজের ঘটনা কেবল একজন নয়, বহুজনের। মানুষজন বলত, তারা নিজের চোখে দেখেছে—কে যেন একদিন হেঁটে হেঁটে ঝর্ণার ধার ঘেঁষে জলের ভেতরে ঢুকে গেল, কিন্তু জল কোনো গতি ছাড়াই স্থির থেকে গেল, আর সেই মানুষ আর ফিরে এল না। পঁচিশ বছর আগে এমনই একদিন যুবকের বাবা, একজন…
-
জয়দীপ বিশ্বাস এক হ্যারিসন রোডের পশ্চিম প্রান্তে, রাস্তাঘেঁষে ছায়ায় ঢাকা এক পুরনো, প্রায় ভাঙা-ভাঙা বাড়ি—যার কাঁচ ভাঙা জানালার ওপারে আজও পড়ে আছে কিছু পুরনো পর্দা, ছেঁড়া পোস্টার, আর থিয়েটারের ধুলো ধরা আসবাব। শহরের ব্যস্ততা আর উজ্জ্বল আলো থেকে দূরে এই অব্যবহৃত অপেরা হলটা গত কুড়ি বছর ধরে সময়ের স্তব্ধতায় নিজেকে মুড়ে রেখেছে। নাম—“অ্যালিগ্রো থিয়েটার”। একসময় কলকাতার থিয়েটারপাড়ার গর্ব ছিল এই অপেরা হল, যেখানে যুগের পর যুগ বাঙালি অপেরার জন্ম হয়েছে—পিয়ানো, কর্ড, ভায়োলিন আর দোতারা মিলেমিশে সুরের এক আদি-আধুনিক কাব্য রচনা করেছিল এখানে। কিন্তু সেই অপেরা একদিন হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়—কারণ, যা কারও কাছে স্পষ্ট নয়। কেউ বলে আগুন লেগেছিল…