• Bangla - রহস্য গল্প

    নীল হীরের অভিশাপ

    অর্কদীপ চক্রবর্তী পর্ব ১ — প্রদর্শনীর রাত বালিগঞ্জের ‘মিত্র ভিলা’ যেন আজ আলোর এক জটিল গোলকধাঁধা। প্রাচীন করিন্থীয় স্তম্ভগুলোতে সাদা কাপড়ের পর্দা নেমে এসেছে, বাতাসে শীতাতপের সঙ্গে ফুলের গন্ধ—চামেলি, টিউব রোজ, আর একটু যেন আপাত অচেনা ধূপের ধোঁয়া। চৌহদ্দিতে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের দিকে থেকে মৃদু ট্রামের ঘণ্টা ভেসে আসে, কিন্তু বাড়ির ভিতর তা পৌঁছয় না; ভিতরের উল্লাস আর ফিসফাস শব্দ সবকিছুকে আড়াল করে দেয়। আজ প্রদর্শনীর রাত—শুভ্রাংশু মিত্র তাঁর নতুন অধিগ্রহণ, সেই বিরল নীল হীরের ‘প্রাইভেট ভিউয়িং’-এর আয়োজন করেছেন। ‘নীল শাপলা’—এই নামটায় স্থির হয়েছে বাড়ির শিল্পপরামর্শদাতা মৃণালিনী বসু। কাঁচের বক্সের মধ্যে হীরেটা রাখা—জার্মানির বুলেটপ্রুফ গ্লাস, চারদিক জুড়ে ক্ষীণ লাল লেজার-গ্রিড, নিচে…

  • Bangla - ভ্রমণ

    নীলকণ্ঠের দ্বীপ

    সৌরদীপ মুখোপাধ্যায় পর্ব ১ : যাত্রার প্রথম সকাল ভোর পাঁচটা নাগাদ কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–এর চতুর্থ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হাতে শক্ত করে ধরা ছিল এক পুরনো খাতা—যে খাতায় আমি এতদিন যাবৎ সব ভ্রমণকাহিনি লিখে রেখেছি। শৈশব থেকেই সমুদ্রের প্রতি আমার অদ্ভুত টান, অথচ যতবার সমুদ্র দেখেছি, তা সবই দীঘা কিংবা পুরীর মতো চেনা জায়গায়। এবার প্রথমবার আন্দামান। নামটা শুনলেই আমার কানে বাজে নীল জলের ফিসফিস, ঝড়ের রাতে ইংরেজ জাহাজের ঘণ্টাধ্বনি আর অন্ধকার সেলের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া বন্দিদের আর্তনাদ। চেক-ইন শেষে বিমানে উঠে বুকের ভেতর কেমন ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছিল। আমার পাশের সিটে ছিলেন এক বৃদ্ধ দম্পতি—দু’জনেই পোর্ট…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    পোড়া বাড়ির আলো

    অর্ণব মুখার্জি পর্ব ১ — নতুন স্কুলশিক্ষক বর্ষার শেষে যে ভেজা গন্ধ মাটির ভেতর পর্যন্ত ঢুকে থাকে, সেই গন্ধ নিয়েই অরিন্দম প্রথম দিন গ্রামে পা রাখল। ছোট্ট স্টেশন, নামটি শিলালিপির মতো খসে পড়া বোর্ডে, প্ল্যাটফর্মে দু-একটা কেরোসিনের ল্যাম্প টিমটিম করছে, আর দূরে শালগাছের রেখা এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন কারও পুরোনো হাতের লেখা— থরথর করে, তবু পড়া যায়। কলকাতা থেকে ট্রেনে নামার পর একটা ভাঙা টেম্পো তাকে স্কুল পর্যন্ত পৌঁছে দিল। স্কুল বলতে ইট-সিমেন্টের দুটো দোচালা ঘর, সামনের মাঠে ঘাস বুনোভাবে উঠে এসেছে, তালগাছের ছায়া পড়ে লম্বা কালচে দাগ। প্রধান শিক্ষক ছুটিতে; সাময়িক দায়িত্বে থাকা ক্লার্কটি, নাম হারাধন, পাতলা গলার লোক,…

  • Bangla - তন্ত্র

    রুদ্রাক্ষের অভিশাপ

    অয়ন চক্রবর্তী পর্ব ১: উত্তরাধিকার কলকাতার ব্যস্ত জীবন থেকে অনেক দূরে, পুরোনো গ্রাম বাড়িটায় পা রাখতেই অর্কের মনে হল যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক নিস্তব্ধ, কেবল বাতাসে খেজুরপাতার শোঁ-শোঁ শব্দ। অর্ক বহু বছর পর ফিরেছে এখানে—তার ঠাকুরদার মৃত্যুর খবর পেয়েই। ছোটবেলা কেটেছিল এই বাড়িতেই, তারপর বাবা-মায়ের সঙ্গে শহরে উঠে যাওয়া। ঠাকুরদা ছিলেন একেবারে গ্রামীণ মানুষ, কিন্তু তার চোখে একটা অদ্ভুত দীপ্তি ছিল, যেন তিনি অনেক অজানা কিছু জানতেন। বাড়ির ভেতর পা রাখতেই ধুলোমাখা গন্ধ নাকে এল। মাটির দেওয়ালে ফাটল ধরেছে, সিঁড়িতে শেওলা জমেছে। কিন্তু ঠাকুরদার ঘরটা ছিল যেমন ছিল, তেমনই আছে। বাঁশের খাট, একপাশে বইয়ের তাক, আর পুরোনো কাঠের…

  • Bangla - ভূতের গল্প

    জলমহলের ডাক

    ১ ঈশা দত্ত ট্রেনে দীর্ঘ যাত্রার পর যখন সুন্দরবনের ভেতরের ছোট্ট জনপদের ধুলোমাখা স্টেশনে নেমে এলো, তখন তার মনে হচ্ছিল যেন শৈশবের স্বপ্ন আর ভয় দুটো একসাথে হাত ধরে হাঁটছে। ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে স্টেশন থেকে বেরোনোর সময় চারপাশের গন্ধটা প্রথমেই তাকে আঘাত করল—আধভেজা কাদা, নোনা বাতাস, গাছের পাতা, আর নদীর জলে লবণাক্ততার মিশ্র গন্ধ। এ সবকিছুর ভেতরে সে যেন শুনতে পাচ্ছিল অজস্র গল্পের প্রতিধ্বনি, যেগুলো ছোটবেলায় শোনানো হয়েছিল তাকে দাদার ঠোঁট থেকে। সেই জলমহল—এক ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়ি, নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ধেক ডুবে যাওয়া প্রাসাদ—যেটাকে নিয়ে লোকজন বলে অসংখ্য অদ্ভুত কথা। ঈশার মনে পড়ে গেল শৈশবের সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে থাকা, হাতে…

  • Bangla - রহস্য গল্প

    টেলিফোনের অপর প্রান্তে

    ১ রাত্রি শহরের উপর নেমে এসেছে একটি নিঃশব্দ কুয়াশার মতো। বাতাসে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে অদ্ভুত এক শীতলতা, যা গলির মোড়, ফুটপাথে, এবং পুরনো ইটের ভবনের দেয়ালে এক অদৃশ্য সুনিপুণ স্পর্শে উপস্থিত। কলকাতার এই উত্তরাঞ্চলের রাস্তা—যেখানে রাতের আলোও নিজেকে পুরোপুরি প্রমাণ করতে পারে না—শীতল বাতাসে ভাসছে। দিকহীন হাহাকার যেন বাতাসে মিশে গেছে; এক সময়কার রঙিন লণ্ঠনগুলো আজ নিঃশব্দ, অন্ধকারে ধীরে ধীরে গলিয়ে যাচ্ছে। অল্প আলো, দূরের হাওয়াই বাতি, এবং খণ্ড খণ্ড কাঁচের জানালার ঝকঝকে আলো মিলেমিশে এক ধরণের রহস্যময় আবহ সৃষ্টি করেছে। পাড়ার পুরনো বাড়িগুলো, যেখানে আগে শিশুদের চিৎকার আর পথচারীর কণ্ঠ শোনা যেত, আজ নিস্তব্ধ; এক অদ্ভুত আতঙ্কের ছায়া…

  • Bangla - রহস্য গল্প

    শঙ্খের অভিশাপ

    প্রাচীন মন্দির খননের সকালে সূর্যের প্রথম কিরণ ভোরের কুয়াশার মধ্য দিয়ে মাটির ওপরে পড়ে। অধ্যাপক সৌম্য সেনগুপ্ত, যিনি দেশের এক নামকরা প্রত্নতত্ত্ববিদ, একাগ্রভাবে খননক্ষেত্রের দিকে এগোচ্ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন সহকারী অরণ্য দত্ত, যিনি সৌম্যের পাশে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার কাজ করতেন। মাটির স্তর একের পর এক সরানো হচ্ছিল, আর ধুলোমাখা খণ্ডকোণ থেকে প্রাচীন কালকার নানা নিদর্শন উঠে আসছিল। হঠাৎ অরণ্য একটি অস্বাভাবিক আকৃতির বস্তু অনুভব করলেন। তার হাতের মুঠোয় ধরা পড়ল এক অলঙ্কৃত শঙ্খ, যার গায়ে খোদাই করা প্রতীকগুলো যেন কেবল সময়ের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। শঙ্খের উপর ক্ষীণ লালচে দাগ, যা প্রথমে কেবল মাটির দাগ মনে হলেও, যখন সূর্যের আলোতে…

  • Bangla - তন্ত্র

    দেহতরঙ্গ

    সুব্রত গুহ অধ্যায় ১ – গুরু ও শিষ্যের সাক্ষাৎ প্রাচীন অরণ্যের ভেতর নিস্তব্ধতার মাঝে আশ্রমটি দাঁড়িয়ে ছিল যেন সময়ের স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। ঘন বৃক্ষরাজির আড়ালে লুকোনো এই স্থানে পৌঁছতে হলে সাধারণ মানুষের অনেক সাহস প্রয়োজন, কারণ গ্রামের মানুষজন বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পায়। অরণ্যের পথে যতই গভীরে প্রবেশ করা যায়, ততই প্রকৃতির এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা অনুভূত হয়—পাখির ডাক ক্ষীণ হয়ে আসে, বাতাস যেন ধীর হয়ে পড়ে, আর প্রতিটি ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকে অজানা আতঙ্ক। ঠিক এই নীরবতার ভেতর দিয়েই অর্জুন এগিয়ে আসে, তার অন্তরে ভয় ও কৌতূহলের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। বয়স মাত্র…

  • Bangla - তন্ত্র

    শবনৃত্য

    ঋত্বিক বসু পর্ব ১ শ্মশানের ধোঁয়া যেমন ধীরে ধীরে রাতের বাতাসে মিলিয়ে যায়, তেমনই গোপালচন্দ্রর জীবনও এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মিশে গেছে। সে এই শ্মশানকর্তার কাজ করছে প্রায় পনেরো বছর। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত—কখনও কফিনে ঢাকা শরীর, কখনও শবযাত্রার সানাই, আবার কখনও হাহাকার করা আত্মীয়দের চোখের জলে ভিজে যাওয়া কাঠের চৌকি। তার কাছে সব যেন একই রকম। শ্মশান মানেই মৃত্যু, মৃত্যু মানেই চুপচাপ এক ছায়ার দিকে মিলিয়ে যাওয়া। কিন্তু সে রাতে কিছু যেন অন্যরকম ছিল। আগুন নিভে এসেছে, শেষ কাঠটুকু ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। গোপালচন্দ্র বাঁশের ঝুড়ি হাতে গঙ্গার জলে ভিজিয়ে ছাই ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চারদিক নির্জন, কেবল রাতের পেঁচার ডাক আর…

  • Bangla - নারীবিষয়ক গল্প

    নদীর গোপন নাম

    ঋতুপর্ণা দাশগুপ্ত পর্ব ১: নদীর ডাক গাঁটা যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মোড়ানো ছিল। শীতল দমকা হাওয়া ভোরের আকাশে নীলচে ছাপ রেখে দিত আর দূরে শাল-সেগুনের বনের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসত নদীর গুঞ্জন। এই নদীর নাম ছিল কুলেশ্বরী। তবে মাধুরী ছোটবেলা থেকেই জানত, নামটা পুরোটা নয়—এই নদীর আরেকটা নাম আছে, একেবারে গোপন নাম, যা শুধু রাতের আঁধারেই ফিসফিস করে শোনা যায়। মাধুরী তখন দশ বছরের মেয়ে। প্রতিদিন বিকেলে সে বাঁশের ডাল দিয়ে বানানো কঞ্চির দোলনা নিয়ে নদীর ধারে যেত। নদীর পাড়ে বসেই তার পড়াশোনা, খেলাধুলো সবকিছু। কিন্তু এক পূর্ণিমার রাতে, হঠাৎ করেই সে শোনে অদ্ভুত একটা আওয়াজ—যেন নদী গুনগুন করছে। প্রথমে ভেবেছিল…