শ্যামল মণ্ডল শান্তিনিকেতনের উপকণ্ঠে বিস্তৃত মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট আশ্রম, যার বয়স অন্তত একশো বছরের কাছাকাছি। চারপাশে তাল, শাল আর আমগাছের ছায়ায় আশ্রমটিকে দূর থেকে মনে হয় যেন সময়ের থেকে আলাদা কোনো টুকরো জায়গা, যেখানে আধুনিকতার কোলাহল ঢুকতে পারেনি। আশ্রমের মূল প্রবেশপথের কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল করবীর গাছ—গোটা এলাকার সবচেয়ে বেশি আলোচিত আর ভয়ভীতির কেন্দ্রবিন্দু। আশ্রমের সন্ন্যাসী আর আশ্রমে পড়তে আসা অনাথ ছেলেমেয়েরা সবাই জানে, দিনের বেলায় করবীর গাছ স্বাভাবিক মনে হলেও সন্ধ্যা নামলেই তার চেহারা পাল্টে যায়। প্রতিদিনই গাছের ডালে ফোটে অদ্ভুত টকটকে লাল ফুল, যার রং এতটাই গাঢ় যে অনেকেই বলে, রক্তের মতো দেখায়। আশ্রমের…
-
-
সৌম্য বসাক ১ বর্ষার প্রথম বজ্রবিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গে আকাশের বুক ফুঁড়ে যখন জলধারা নেমে আসে, তখনই পুরো গ্রাম যেন কেঁপে ওঠে সেই আওয়াজে। চারিদিকে গাছের পাতার ফাঁকে জমে থাকা ফোঁটা ঝরে পড়তে থাকে, কাদামাটি ভিজে যায় আর ছোট ছোট খালবিলগুলো ফুলে ওঠে। ঠিক তখনই, গ্রামের প্রাচীনতম স্থান—শিবতলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মা মহামায়ার মন্দিরটিকে ঘিরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মন্দিরের গর্ভগৃহ, যেখানে বছরের পর বছর দেবীর কালো পাথরের মূর্তি স্থাপিত আছে, বর্ষার প্রথম দিকেই জলে ভেসে যায়। মন্দিরের চৌহদ্দিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন দেখে—গর্ভগৃহের পাটাতন পর্যন্ত জলে ডুবে যাচ্ছে, আর জ্যোৎস্নার মতো দীপশিখা ম্লান হয়ে উঠছে সেই স্যাঁতসেঁতে আবছায়ায়। গ্রামের…
-
এক শ্যামবাজারের রাস্তাগুলো দিনের আলোয় যতটা সরগরম থাকে, রাত নামলেই যেন ততটাই অচেনা হয়ে যায়। বিশেষ করে শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড় থেকে একটু ভেতরের সরু গলিটা যেন আরও রহস্যে ভরা। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরনো থিয়েটার হল, যার নাম আজ আর কেউ মনে রাখে না। একসময় এখানে জমজমাট নাটকের আসর বসত, শহরের বড় বড় অভিনেতারা মঞ্চে আসতেন, তুমুল হাততালিতে ভরে উঠত আসনভর্তি দর্শক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব থেমে যায়—একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে থিয়েটারটি বন্ধ হয়ে পড়ে। তারপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়, ধুলো জমে গেছে ভেতরে, মাকড়সার জালে জড়িয়ে গেছে সোনালি আসন, কাঠের মঞ্চ কেবল পচতে পচতে দাঁড়িয়ে…
-
দেবাশিস সেন ১ ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রামের পূর্বদিকের পাহাড়ের মাথায় লালচে আভা ফুটে উঠেছে, আর ধানখেতের কুয়াশার ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে ভেসে আসছে পাখিদের ডাক। শত বছরের পুরোনো দুর্গামন্দিরে ভক্তরা ভিড় জমিয়েছে, আজকের সকাল যেন অন্য সব সকালের মতোই ভক্তিময় হওয়ার কথা ছিল। ঘণ্টা বাজছিল, ধূপকাঠির গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল, আর মন্দির চত্বরে ঢাকের মৃদু আওয়াজ মিলিয়ে যাচ্ছিল ভোরের নীরবতার সঙ্গে। মন্দিরের প্রধান পূজারি হরিদাস পণ্ডিত তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নিয়মে গঙ্গাজল ছিটাচ্ছিলেন আর ভক্তদের আহ্বান জানাচ্ছিলেন—“এসো, মা দুর্গার চরণে প্রণাম করো।” কিন্তু সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল অপ্রত্যাশিত ঘটনা। আরতির পর যখন সবাই প্রতিমার দিকে তাকালো, তখন হঠাৎ বোঝা…
-
সন্দীপ সেনগুপ্ত হুগলির বিস্তীর্ণ গ্রামীণ প্রান্তরে, নদীর ধারে শ্যাওলায় ঢাকা ইটের প্রাচীর আর ধ্বংসস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো গড়। সময়ের ক্ষয়ে ক্ষয়ে এর অনেকটা ভেঙে পড়েছে, অনেকটা মাটির নিচে চাপা পড়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় নিস্তব্ধ প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অদ্ভুত নিদর্শন, অথচ স্থানীয়রা একে ভয়ে এড়িয়ে চলে। দীর্ঘদিন ধরে শোনা যায়, গড়ের ভেতরে রাত নামলে অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়—কখনো তলোয়ারের ঝনঝনানি, কখনো পদশব্দ, আবার কখনো গভীর নিশ্বাসের আওয়াজ। ফলে গ্রামবাসীর চোখে এ জায়গা “অভিশপ্ত” বলেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। এই ভয়ের মধ্যেও সরকার ঠিক করে, প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে জায়গাটি খনন করা দরকার। হয়তো গড়ের ভেতর থেকে মিলবে বাংলার ইতিহাসের…
-
সব্যসাচী পাল সকাল হলে গ্রামের ছোট্ট হোটেলের দরজার বাইরে অর্ণব, মেহুল, ইশিতা, রাহুল ও মায়া একত্রিত হয়। প্রত্যেকের মুখে ভরপুর উদ্দীপনা, যেন পাহাড়ের কোল তাদের রোমাঞ্চের প্রতীক্ষায় রেখেছে। রাহুল ক্যামেরা হাতে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে, পাহাড়ের চূড়ার ছবি কল্পনা করছে। মায়া তার ব্যাগ চেক করছে, ছোটখাটো জিনিসগুলো ঠিক মতো প্যাক করা আছে কি না। মেহুল তার জুতো ভালোভাবে বাঁধছে, যেন এই পথচলায় কোনো অসুবিধা না হয়। ইশিতা তার স্কেচবুক নিয়ে ব্যস্ত, পাহাড়ের ছবি আঁকার চিন্তায় মগ্ন। আর অর্ণব, যিনি দলটির প্রাকৃতিক নেতা, সকলকে খুঁজে খুঁজে ছোটো ছোটো পরামর্শ দিচ্ছেন। পাহাড়ের তাজা বাতাস তাদের মুখে লাগছে, এবং সেই বাতাস যেন এক…
-
রজত মিত্র অধ্যায় ১ – অর্ণব সেনের স্টুডিওটা যেন এক অন্যরকম জগৎ। শহরের ব্যস্ততার ভিড় থেকে কিছুটা দূরে, উত্তর কলকাতার এক পুরনো দোতলা বাড়ির ছাদের ঘরটিকে সে নিজের সৃজনশীল আশ্রয় বানিয়েছে। ঘরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে নানা রঙের টিউব, তুলি, পুরনো ক্যানভাস আর অর্ধেক আঁকা ছবির স্তূপ। জানলার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছে, ধুলো জমা কাঠের মেঝেতে আলোর রেখা ছড়িয়ে পড়ছে, আর বাতাসে মিশে আছে টারপেনটাইন আর জলরঙের ঘ্রাণ। অর্ণবের জীবন মূলত এই চার দেয়ালের ভেতরেই আবদ্ধ। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তার যোগাযোগ প্রায় নেই, কেবল মাঝে মাঝে চিত্রপ্রদর্শনীতে হাজির হয়ে কিছু চেনাজানা মুখকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় তাকে…
-
সায়ন্তন ঘোষ সন্ধ্যার আলো তখন পাহাড়ের ঢালে মিশে যাচ্ছে। সিলেট শহর ছেড়ে চন্দ্রনাথের পথে এগোতে এগোতে রুদ্র অনুভব করছিল এক অদ্ভুত গা ছমছমে শূন্যতা। পাহাড়ের রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে, শুধু কোথাও কোথাও ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে—গ্রামের বাড়িগুলোতে পূর্ণিমার পূজা চলছে। ট্যাক্সির ভেতরে বসে অনন্যা জানলার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকার দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, পাহাড় যেন অদৃশ্য চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। —“এই জায়গাটার মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক আছে, তাই না?” হঠাৎ ফিসফিস করে বলল তিথি। অভিষেক হেসে উত্তর দিল, —“তুমি আবার ভূতের গল্প শুরু করছো নাকি? আমরা এসেছি বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। কালো জলের খনিজ উপাদান বের করলে হয়তো একটা…
-
প্ৰিয়ম বসু ১ গ্রামের নাম ছিল সোনারপুর। চারদিক সবুজে মোড়া, ধানখেতের ঢেউ, পুকুরের জলচর, আর কাদামাটির সরু পথ মিলেমিশে যেন এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি করত। কিন্তু এই শান্তির মাঝেই ছিল এক রহস্য, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের মানুষের মনে ভয় এবং ভক্তি মিশিয়ে রেখেছিল—মন্দিরের ঘণ্টা। গ্রামে প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো এক মন্দির ছিল, পাহাড়ঘেরা গ্রামের কেন্দ্রে উঁচু একটি টিলার উপর। মন্দিরের ভেতরে ছিল এক বিশালাকার পিতলের ঘণ্টা, যা প্রতি রাত ঠিক বারোটায় নিজে থেকেই বেজে উঠত। কোনো মানুষ হাত না লাগিয়েও ঘণ্টার ভারী ধ্বনি গোটা গ্রামে প্রতিধ্বনিত হতো। গ্রামের লোকেরা বলত, এই ধ্বনি অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে, গ্রামকে…
-
অনিৰ্বাণ দাস ১ সকালবেলা শহরের কাগজে প্রথম পাতার শিরোনামই ছিল—“বিখ্যাত লেখক অরিন্দম সেন আর নেই।” গত রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়, অথচ মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সাহিত্য মহল থেকে শুরু করে পাঠকসমাজ স্তব্ধ হয়ে যায়। জীবদ্দশায় অরিন্দম ছিলেন রহস্য ও খুনের কাহিনীর এক অনন্য কারিগর, যার প্রতিটি লেখা পাঠকের মনে গা ছমছমে আবহ তৈরি করত। তাঁর বয়স হয়েছিল পঁয়ষট্টি, তবে এখনো নিয়মিত লেখালিখি করছিলেন। এমন একজন মানুষের হঠাৎ মৃত্যুতে সবাই ধরে নেয় হয়তো হার্ট অ্যাটাক বা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা। কিন্তু তার বাসভবন—শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ভিক্টোরিয়ান ঢঙের দোতলা বাড়িটি—যেন মৃত্যুর পর অদ্ভুত এক নীরবতায় ডুবে যায়। বাড়ির ভেতর ছড়ানো পুরোনো…