অংশুমান রায় ঋদ্ধির আগমন কলকাতার শীত তখন পড়তে শুরু করেছে, তবে হাওয়ার ধার এখনো নরম। সন্ধের আলোয় গড়িয়াহাটের মোড় থেকে দক্ষিণে যে রাস্তা নেমে গেছে, সেই ফুটপাথগুলো ভরে উঠছে শালপাতার ধোঁয়া, ভাজা মুড়ির গন্ধ, আর দোকানিদের চেঁচামেচিতে। ড. অনির্বাণ দত্তের চেম্বার এই মোড় থেকে দশ মিনিট হাঁটাপথ। তিনতলা পুরনো বাড়ির দ্বিতীয় তলায়, কাঠের পালিশ করা দরজা, পাশে ছোট পিতলের নেমপ্লেট — Dr. Anirban Dutta, Consultant Psychologist. চেম্বারের ঘড়িতে তখন সাড়ে সাতটা। দিনের শেষ রোগী চলে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। অনির্বাণ ডেস্কে হেলান দিয়ে কাগজপত্র গুছাচ্ছিলেন, তখনই নিচের দারোয়ান কাঁচা গলায় ডাকল, — “ডাক্তারবাবু, একজন এসেছেন… বলছেন খুব জরুরি।” তিনি চোখ তুলে…
-
-
ঋতব্রত সেন [১] জুলাইয়ের এক মেঘলা দুপুরে মিহির তার ঠাকুরদার পুরনো কাঠের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, যেখান থেকে ধুলোমাখা বই আর ভাঙা পুতুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। ঠাকুরদা, বিশ্বেশ্বর পাল, এককালে ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন—তার চোখে এখনও সেই অতীতের আলো জ্বলে। মিহির ছুটির দিনে তার কাছ থেকে নানা কাহিনি শুনতে ভালোবাসত, বিশেষ করে কৃষ্ণনগরের পুতুলশিল্প ও রাজাদের গোপন ইতিহাস। সেই দিন, যখন বৃষ্টি বাইরের দিগন্ত ঘিরে রেখেছিল, ঠাকুরদা হঠাৎ এক গল্প শুরু করলেন—একটা পরিত্যক্ত বাড়ির, যেটি সবাই ‘পুতুলবাড়ি’ বলে চিনত। সেই বাড়ি নাকি এক কালে ছিল রামানন্দ পাল নামের এক পুতুলশিল্পীর, যিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দরবারে কাজ করতেন। কথিত আছে, রাজপরিবারের গুপ্তধন…
-
মৈনাক ভৌমিক ১ পুরুলিয়ার চন্দনবন — নামটি আজও অনেকের কাছে অজানা, যদিও লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা বহু গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এই অরণ্য। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলটি আদিবাসী জনপদের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ঘন জঙ্গলে ভরপুর, যেখানে আজও সূর্যাস্তের পর কেউ একা পথ মাড়ায় না। অথচ সেখানেই, এক শতাব্দী পুরনো ব্রিটিশ জরিপ মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া এক দাগচিহ্ন—“K.T. Akhra (Abandoned)”—ডঃ ঋত্বিক বসুর চোখে পড়ে। বহুদিন ধরে প্রাচীন ভারতীয় তন্ত্রচর্চা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসা এই প্রত্নতত্ত্ববিদ তার টিম নিয়ে রওনা দেন চন্দনবনের উদ্দেশ্যে। তাঁর দলের সঙ্গে ছিলেন ইতিহাসের গবেষক ইরা সেনগুপ্ত, ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর অভীক মণ্ডল, তথ্যলিপিকার তৃষা দে এবং স্থানীয় গাইড হিসেবে নিযুক্ত হন নিতাই মাহাতো,…
-
স্নিগ্ধা ঘোষাল (১) শালডাঙা—বাঁকুড়ার ভিতরের এক মাটির গ্রাম, যেখানে সন্ধ্যা নামে বেলাগাভরে, আর কুয়াশা নামে বাতাসে যেন জমাট বিষের মতো। গ্রামটা খুব বড় নয়, কুঁড়েঘর, পুকুর আর শিমুল গাছে ভরা এই জনপদে আধুনিকতার স্পর্শ এখনো খুব বেশি পড়েনি। গাঁয়ের মানুষজন এখনো চাঁদের গতিপথ দেখে দিন গোনে, আর নতুন চাঁদের রাতে হাত জোড় করে মাথায় দেয় পাতাবিহীন বেলপাতা। এই গ্রামে পূর্ণিমার রাত মানে এক অদ্ভুত গুমোট অনুভব—শব্দ নেই, কুকুর ডাকে না, শিশুরাও কান্না থামায়। ঠিক এমন এক পূর্ণিমা রাতেই মেঘ ফুঁড়ে আলো নেমেছিল গ্রামের এক কোণার পুরনো বাড়ির উঠোনে। কেউ ঠিক জানে না কখন শুরু হয়েছিল ওটা—তবে সকালের আলসে আলোয় দেখা…
-
সঞ্জয় দে পর্ব ১: বাড়ির রহস্য অভিজিৎ ছিল ইতিহাসের ছাত্র। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল পুরনো বাড়িগুলোর ইতিহাস খোঁজা, বিশেষত সেগুলোর যেগুলো সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে অথবা কেউ তাদের কাহিনী জানে না। একদিন, তার বন্ধু প্রীতম তাকে একটি পুরনো বাড়ির কথা জানায়, যে বাড়ি সম্পর্কে নানা গুজব ছড়িয়ে আছে। লোকজন বলে, এখানে অদ্ভুত হাসির শব্দ শোনা যায় এবং অনেক মানুষ এখানে হারিয়ে গেছে। সেই রাতের পর থেকেই বাড়িটির নাম তার মনের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। অভিজিৎ ভেবেছিল, এই বাড়ির রহস্য উন্মোচন করতে পারলে তার গবেষণায় নতুন একটি দিক যোগ হবে। তাই এক সকালে, তার গবেষণার জন্যই সেদিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত…
-
পর্ব ১ দেবব্রতের প্রথম রাতের ডিউটি। হাওড়ার পুরনো শিল্পাঞ্চলের এক পরিত্যক্ত টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিতে সে নিযুক্ত হয়েছে নতুন রাতের প্রহরী হিসেবে। নাম—প্রতুল টেক্সটাইল মিল। মিল বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় তিন বছর, কিন্তু মালিকপক্ষ এখনো জায়গাটা সুরক্ষিত রাখতে চায়—কোনো সরকারি নোটিশ, জমি দখল বা আগুন যেন না লাগে, এইসব ভেবে একজন নিরাপত্তারক্ষী রাখা হয়েছে। নিঃশব্দ এক জায়গা, চারপাশে ভাঙাচোরা কারখানা, পেছনে এক পুরনো জলের ট্যাংকির নিচে গেট ঘর। সন্ধ্যার পরই মিলের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়, শুধু মূল গেটের একটা নীল আলো ছাড়া। সেই আলোয় আজ প্রথম বসেছে দেবব্রত, মাথায় টুপি, পাশে একটা টর্চ আর বিস্কুটের প্যাকেট। নীলকমল কাকু, যিনি চাকরিটা জোগাড়…