ঋতব্রত মুখার্জি পর্ব ১ : প্রথম দেখা সেদিন আকাশটা অদ্ভুত রঙে ভরে উঠেছিল। সারাদিনের গুমোটের পরে বিকেলের শেষে নামল হঠাৎ বৃষ্টি। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় সবাই দৌড়চ্ছে—কেউ অটো ধরছে, কেউ বাসের জন্য ছুটছে, কেউ ছাতা ভিজিয়ে হাঁটছে। আমি তখন কলেজ থেকে ফিরছিলাম, হাতে কয়েকটা ফাইল আর এক কাপ কাগজের কফি। মনে হচ্ছিল—এই ভিজে ভিজে শহরে কেবল একটাই শব্দ চলছে, বৃষ্টির টুপটাপ। বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়লো তাকে। নীল সালোয়ার পরে, কাঁধে ভেজা চুল ঝুলছে, একহাতে কালো ছাতা, তবু বৃষ্টির ফোঁটা তাকে যেন রেহাই দিচ্ছিল না। যেন ছাতার আড়াল থেকেও বৃষ্টি তাকে ছুঁয়ে ফেলছিল বারবার। তার চোখদুটো ছিল একেবারে সামনে, কিন্তু মনে…
-
-
সৌরদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় পর্ব ১ – প্রতিদিনের দেখা সকালের মেট্রো যেন শহরের ভেতরে আলাদা এক নদী। সেই নদীতে প্রতিদিন ভেসে যায় অসংখ্য মুখ, হাজারো ব্যস্ততা, কোলাহলের ঢেউ। অরণ্যের দিনও শুরু হয় ঠিক সেভাবেই—আলোর ফোঁটায় ভেসে ওঠা সল্টলেকের এক অচেনা ফ্ল্যাটবাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে, অগণিত মানুষের সঙ্গে গা ঘেঁষে দক্ষিণমুখী মেট্রোরেলের কোচে উঠে বসা। অফিসের টাইমকার্ড, মিটিং, ল্যাপটপ—সবই যেন এক অদৃশ্য নিয়মের বাঁধনে বাঁধা। অথচ এই অচেনা যাত্রার মাঝেই কখন যে একটা মুখ ধীরে ধীরে তার দিনের শুরু আর শেষ হয়ে উঠতে লাগল, সে নিজেও টের পেল না। প্রথম দিনটিতে কিছু বিশেষ ছিল না। এসপ্ল্যানেডের ভিড়ভাট্টার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় অরণ্য হঠাৎ…
-
সোহম ঘোষ অধ্যায় ১ – অজানার ডাক শহরের ব্যস্ত জীবনে আটকে থাকা সেই তরুণ অভিযাত্রীর প্রতিদিনের দিন যেন একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল। ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে ছুটে যাওয়া, ট্রাফিকের শব্দ, যান্ত্রিক মুখের ভিড়—সবকিছু মিলেমিশে এক অনন্ত চক্রের মতো মনে হতো। মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকিয়ে সে কেবল ভাবত, এর বাইরে কি আর কোনো জীবন নেই? অজানা পথে হাঁটার, নতুন মানুষ ও নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার বুকের ভেতরে অনেকদিন ধরেই দানা বাঁধছিল। শহুরে আলো ঝলমলে জীবন তাকে কখনোই সম্পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারেনি; বরং তার মনে এক অদৃশ্য শূন্যতার জন্ম দিয়েছিল। একদিন অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে, বইয়ের দোকানে হঠাৎই একটি…
-
সায়ন্তনী ধর পর্ব ১: অচেনা স্পর্শ কলকাতার ভিজে সন্ধ্যে। বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে ফ্ল্যাটের বারান্দা যেন একা বসে আছে। রিমঝিম ভেজা আলোয় স্নিগ্ধা দাঁড়িয়ে, হাতে এক কাপ কফি। তিরিশ পেরোনো এই নারী, সংসার আর অফিসের একঘেয়েমি পেরিয়ে আজ হঠাৎ যেন নিজের ভেতরেই অস্থিরতা টের পাচ্ছে। বিয়ের আট বছরের সম্পর্ক—অর্ণব, তার স্বামী, এখন প্রায় যন্ত্রের মতো। অফিস থেকে ফিরে শুধু ক্লান্ত শরীর আর একবিন্দু নিরুত্তাপ আলাপ। শারীরিক সম্পর্কও বহুদিন হয়ে উঠেছে দায়িত্বের মতো—যেন টিক চিহ্ন দিয়ে শেষ হওয়া কর্তব্য। স্নিগ্ধা আয়নায় তাকায়। চোখের নিচে হালকা কালি, ঠোঁটে এক চাপা অভিমান। অথচ শরীর তার এখনো মায়াবী, নরম চামড়ার নিচে লুকোনো এক অদম্য কামনা…
-
ঐশী সেনগুপ্ত পর্ব ১: বৃষ্টির ব্রেক কলকাতার জুলাই মাসের বৃষ্টি ঠিক যেন কাকেই বা কখন চমকে দেবে বোঝা যায় না। সকালে রোদ, দুপুরে গুমোট, আর বিকেল গড়াতেই যেন মেঘ ভিজিয়ে দিয়ে যায় ব্যস্ত মানুষগুলোর অবসরের ফাঁকফোকর। তিথি সিংহরায় ঠিক সাড়ে তিনটে নাগাদ নামল গেটস টেক পার্কের সামনে। তার ল্যাপটপ ব্যাগটা আজ অদ্ভুত ভারি লাগছে, হয়তো বা ভেতরের টেনশনটাই বেশি। আজ যে প্রেজেন্টেশনটা দিতে হবে, সেটা হেড অফিস থেকে সরাসরি এসেছে—এবং সঙ্গে এসেছে তিনটি কোম্পানির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ। পা রেখেই সে বুঝল, মেঘ জমছে। “দুপুরের পরে এমন আবহাওয়ায় বরাবরই কিছু একটা হয়,” নিজের মনেই বলে উঠল তিথি। অফিস ক্যান্টিনটা প্রায় ফাঁকা। আরেকটা…
-
অনিরুদ্ধ বসাক পর্ব ১: পদ্মার পাড়ে, মেঘে ভেজা সকাল পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই একটা নিঃশব্দ যাদুর মধ্যে ঢুকে পড়া। আমি তখন রাজশাহীতে, বর্ষার শুরুতেই এসে পড়েছি। ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামছিল, যেন মাটিকে এক নতুন জেগে ওঠার ডাক দিচ্ছে। বাংলাদেশে বর্ষার সৌন্দর্য আলাদা। এখানে মেঘ শুধু আকাশে থাকে না, জমে থাকে মানুষের চোখে, গন্ধ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে কাদামাখা পথঘাটে, ধানখেতের ফাঁকে, কাঁঠালের গন্ধে। সকালটা শুরু হয়েছিল এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লেবু-চা দিয়ে, ছোট্ট এক চায়ের দোকানে। দোকানদার বললেন, “ভাই, বর্ষা কিন্তু আমাদের দেশের একেকটা প্রেমের গল্পের মত। শুরুতে আনন্দ, মাঝখানে অভিমান, শেষে শান্তি।” আমি চায়ের কাপ হাতে বসে ভাবছিলাম, ঠিকই তো—এই…
-
রুক্মিণী ভট্টাচার্য পর্ব ১: মেঘ জমেছে হাজরা মোড়ের সেই পুরোনো বাস স্টপটায় দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি। তার পরনে একটা সাদা-লাল ছাপার কুর্তি, হাতে একটা বই, মুখটা মেঘলা আকাশের মতো ভাবনায় ঢাকা। বৃষ্টি নামবে বুঝে ছাতাটা খুলে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু জানত না, এই ছাতাটাই একদিন একটা গল্প হয়ে উঠবে। পাঁচ মিনিট আগেই ট্রামলাইন বরাবর হাঁটছিল একটা ছেলেও। নাম তন্ময়। চোখে চশমা, কাঁধে ব্যাগ, আর কানে হেডফোন। ট্রামটা চলে গেছে, কিন্তু ছেলেটা থেমে দাঁড়ায়—বৃষ্টি তার চুল ভিজিয়ে দিচ্ছে, অথচ সে নড়ছে না। বৃষ্টি বাড়তেই দুজনেই একটু করে সরে আসে স্টপের ছাউনির নীচে। হঠাৎ একটা ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দেয় মেয়েটির কাঁধটা। ছেলেটি একটু এগিয়ে এসে…
-
অনির্বাণ দত্ত সেই বিকেলের দেখা গড়িয়াহাট মোড়ের ব্যস্ততা তখন বর্ষার বৃষ্টিতে খানিকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। পথঘাট কাদা আর জলের প্যাচপেচে স্রোতে ভারাক্রান্ত, অথচ সেই মেঘলা বিকেলে কলকাতার আকাশে যেন কোনো অচেনা অপেক্ষার আলো ছড়িয়ে ছিল। ভিড় ঠেলে হাঁটছিল ঈশিতা। হাতে ধরা ছাতাটা বারবার উল্টে যাচ্ছিল হাওয়ায়, আর তার চশমার কাচে জলের ছিটে জমে অদ্ভুত একটা ঝাপসা দৃষ্টি তৈরি করছিল। মনে হচ্ছিল, চারপাশের সবকিছু যেন ভুল ঠিকানায় রাখা ছবি—একটু চেনা, একটু অচেনা। হঠাৎই চোখে পড়ল সেই মুখটা—অরণ্য। পাঁচ বছর পর। মাথার চুলে হালকা পাক ধরেছে, চোখের কোণে একটু বয়সের রেখা, কিন্তু হাসিটা এখনও তেমনই—একটু লাজুক, একটু ঠোঁটের কোণে অসমাপ্ত। তার হাতে কাগজে…
-
ঐশী মল্লিক শুরুর চা, শুরুর স্বপ্ন শহরের ঘুম তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। কলকাতার গলি গলি জেগে উঠছে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে। হাওড়ার চায়ের দোকানগুলোর মধ্যে অন্যতম লালদার ছোট্ট দোকান। ছোট টিনের চালা, কাঁচের বয়ামে বিস্কুট, আর সিগারেটের গন্ধে ভাসা একটা সকাল। এখান থেকেই শুরু আমাদের পথচলা—স্বাদের পথে, মানুষের পথে, গল্পের খোঁজে। আমরা পাঁচজন। আমি ঐশী, আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রিমা, ওর বর রজতদা, আমার ভাই নীল আর ড্রাইভারের আসনে থাকা বিজয়। আমাদের গন্তব্য—ডুয়ার্স, শিলিগুড়ি হয়ে দার্জিলিং। তবে লক্ষ্যটা শুধু জায়গা দেখা নয়। লক্ষ্য হলো—প্রত্যেক জায়গার খাবার চেনা, অনুভব করা। তাই তো আমরা একে বলছি ‘খাবার-ভ্রমণ’, বা সহজ কথায়—স্বাদের পথচলা। …