সোহম ঘোষ অধ্যায় ১ – অজানার ডাক শহরের ব্যস্ত জীবনে আটকে থাকা সেই তরুণ অভিযাত্রীর প্রতিদিনের দিন যেন একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল। ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে ছুটে যাওয়া, ট্রাফিকের শব্দ, যান্ত্রিক মুখের ভিড়—সবকিছু মিলেমিশে এক অনন্ত চক্রের মতো মনে হতো। মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকিয়ে সে কেবল ভাবত, এর বাইরে কি আর কোনো জীবন নেই? অজানা পথে হাঁটার, নতুন মানুষ ও নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার বুকের ভেতরে অনেকদিন ধরেই দানা বাঁধছিল। শহুরে আলো ঝলমলে জীবন তাকে কখনোই সম্পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারেনি; বরং তার মনে এক অদৃশ্য শূন্যতার জন্ম দিয়েছিল। একদিন অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে, বইয়ের দোকানে হঠাৎই একটি…
-
-
অঞ্জন বসু অধ্যায় ১ – প্রথম স্বপ্নের ডাক কলকাতার ভিড়ভাট্টা, গরম ও ধোঁয়াশা মিশ্রিত শহরের রোদ, এবং অটোরিকশার ক্লান্তি—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত চাপের অনুভূতি তৈরি করে। এক তরুণের মনে শহরের এই গণ্ডগোল, কোলাহল ও মানুষের আনাগোনা যেন শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে। অফিসের কাজ, বন্ধুবান্ধবের হট্টগোল, সামাজিক আবদ্ধতা—সবই তার মনকে ক্লান্ত করে দিয়েছে। সে জানে, শহরের ব্যস্ততা কখনোই তাকে পরিপূর্ণতা দিতে পারবে না। রাতের অন্ধকারে যখন তার কক্ষের জানালা দিয়ে দূরের আকাশের তারা মেলে, তখন সে স্বপ্ন দেখে পাহাড়ের শান্তির, নীরবতার, এবং প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্যের। তার হৃদয় খুঁজে বেড়ায় এমন এক জায়গা যেখানে শব্দ কম, বাতাস বিশুদ্ধ, আর চিন্তা মুক্ত। সেই রাতের…
-
ঋদ্ধি সেনগুপ্ত পর্ব ১: ভোরট্রেন কলকাতার ভ্যাপসা গরম আর অনন্ত জটের ভিড়ের মধ্যে অর্ণার বুক ভরে উঠছিল এক অদৃশ্য ক্লান্তিতে। প্রতিদিন সকালেই সে অফিসের বাস ধরত, ফাইল আর কম্পিউটার স্ক্রিনে ডুবে থেকে সন্ধ্যার পরে ঘরে ফিরত। চারপাশের সবাই যেন শুধু ছুটছে, অথচ কোথাও পৌঁছোচ্ছে না। গত কয়েক মাসে সে বুঝতে পেরেছিল—তার নিজের ভেতরেও এক রকম শূন্যতা জমেছে, যা ভরাট করার মতো কিছু নেই। এই শহর তাকে আর টানে না। একরাতে ডেস্কে বসেই সে হঠাৎ বুকিং করেছিল দার্জিলিংয়ের ট্রেন টিকিট—আর ভাবেনি। সকাল সাড়ে তিনটেয় অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। চারদিক তখনও অন্ধকার, কেবল ভেজা বাতাসে ভেসে আসছিল বৃষ্টির গন্ধ।…
-
হিয়া মিত্র পর্ব ১: পূর্ণিমার আগে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে ওঠার সময় অরণ্য ভাবছিল, শহরের শব্দকে যদি কাগজে বন্দি করে রাখা যেত, তবে হয়তো সে বুঝতে পারত নীরবতার প্রকৃত মানে কী। গাড়ির জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল চা-বাগানের ঢেউ, দূরে নীলচে পাহাড়, আর মাঝেমাঝে রাতের বৃষ্টির পর জমে থাকা কাদা। বাসস্ট্যান্ডে নামতেই কুয়াশা ওড়ার মতো ভেসে এসে তার গায়ে লাগল—ঠাণ্ডা, কিন্তু দংশনহীন। এখানে আসার উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: একান্তে বসে নতুন কবিতার বইয়ের খসড়া শেষ করা। কিন্তু উদ্দেশ্য স্পষ্ট হলেই কি পথ অনাড়ম্বর থাকে? গ্রামের একমাত্র চায়ের দোকানে বসে সে অল্প চিনি দিয়ে চা খাচ্ছিল। দোকানদার, বলিষ্ঠ গড়নের, গায়ের ওপর মোটা সোয়েটার টেনে, জিজ্ঞেস…
-
অনিরুদ্ধ বসাক পর্ব ১: পদ্মার পাড়ে, মেঘে ভেজা সকাল পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই একটা নিঃশব্দ যাদুর মধ্যে ঢুকে পড়া। আমি তখন রাজশাহীতে, বর্ষার শুরুতেই এসে পড়েছি। ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামছিল, যেন মাটিকে এক নতুন জেগে ওঠার ডাক দিচ্ছে। বাংলাদেশে বর্ষার সৌন্দর্য আলাদা। এখানে মেঘ শুধু আকাশে থাকে না, জমে থাকে মানুষের চোখে, গন্ধ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে কাদামাখা পথঘাটে, ধানখেতের ফাঁকে, কাঁঠালের গন্ধে। সকালটা শুরু হয়েছিল এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লেবু-চা দিয়ে, ছোট্ট এক চায়ের দোকানে। দোকানদার বললেন, “ভাই, বর্ষা কিন্তু আমাদের দেশের একেকটা প্রেমের গল্পের মত। শুরুতে আনন্দ, মাঝখানে অভিমান, শেষে শান্তি।” আমি চায়ের কাপ হাতে বসে ভাবছিলাম, ঠিকই তো—এই…
-
শ্রীজিত বন্দ্যোপাধ্যায় ট্রেন ছাড়ার হুইসেল যখন শিয়ালদহ স্টেশনের কোলাহল কেটে রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল, তখন আমি জানলার পাশে বসে সামনের সাত দিনের চিন্তায় ডুবে ছিলাম। ব্যাগে জুতসই জামাকাপড়, হাতে একটা নোটবুক, মাথায় শুধু একটাই ইচ্ছা—নিজেকে একটু খুঁজে পাওয়া। নামটা আগেই ঠিক ছিল—কালিম্পং। দার্জিলিং, কার্শিয়াং, মিরিক ঘুরে ফেলেছি অনেকবার, কিন্তু এই পাহাড়ি শহরটা আমার কাছে ছিল এক রহস্য। ট্রেন ছুটছে—কাঁচের বাইরে শহরের আলো এক এক করে ফিকে হয়ে আসছে। পাশে বসা সত্তরোর্ধ্ব ভদ্রলোক হঠাৎ কথা বলে উঠলেন, “উত্তরবঙ্গে যাচ্ছেন?” আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ, কালিম্পং।” তিনি চোখ মুছলেন, “কালিম্পং মানে আমার শৈশব। আপনার ভালো লাগবে, খুব ভালো।” রাত বাড়ছে, ট্রেন এগোচ্ছে শিলিগুড়ির…
-
ঐশী মল্লিক শুরুর চা, শুরুর স্বপ্ন শহরের ঘুম তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। কলকাতার গলি গলি জেগে উঠছে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে। হাওড়ার চায়ের দোকানগুলোর মধ্যে অন্যতম লালদার ছোট্ট দোকান। ছোট টিনের চালা, কাঁচের বয়ামে বিস্কুট, আর সিগারেটের গন্ধে ভাসা একটা সকাল। এখান থেকেই শুরু আমাদের পথচলা—স্বাদের পথে, মানুষের পথে, গল্পের খোঁজে। আমরা পাঁচজন। আমি ঐশী, আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রিমা, ওর বর রজতদা, আমার ভাই নীল আর ড্রাইভারের আসনে থাকা বিজয়। আমাদের গন্তব্য—ডুয়ার্স, শিলিগুড়ি হয়ে দার্জিলিং। তবে লক্ষ্যটা শুধু জায়গা দেখা নয়। লক্ষ্য হলো—প্রত্যেক জায়গার খাবার চেনা, অনুভব করা। তাই তো আমরা একে বলছি ‘খাবার-ভ্রমণ’, বা সহজ কথায়—স্বাদের পথচলা। …
-
জয় ভট্টাচার্য চুপচাপ বাতাস কালিম্পঙের এক কোণে, কুয়াশা মোড়া ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম বাতাসিয়াপুর। চারদিকে পাহাড়, গাছগাছালি আর নিঃস্তব্ধতা—শহরের ব্যস্ততা থেকে যেন একেবারে পালিয়ে আসার জায়গা। ঠিক সেখানেই শীতের ছুটিতে ঘুরতে এসেছিল চার বন্ধু—সৌরভ, অরিত্র, তিয়াসা আর মেহুল। দার্জিলিং থেকে ছোট গাড়িতে এক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে, শেষ বিকেলে তারা পৌঁছালো বাতাসিয়াপুর। গ্রামের একদম কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো কাঠের বাংলো—“হিমালয় ভিউ লজ”। নামের সঙ্গে মিলে বাংলোর বারান্দা থেকেই দেখা যায় কুয়াশার চাদরে মোড়া পাহাড়ের চূড়া। বাংলোর কেয়ারটেকার বুড়ো গনেশবাবু, মুখে চিরকালীন ধূসরতা। “রাতের দিকে বেশি বাইরে যাইয়েন না বাবুরা,” বললেন চা এগিয়ে দিতে দিতে। “এই পাহাড়ে কুকুরও কখনও কখনও হাওয়ায় ঘেউ ঘেউ…