বর্ণালী রাহা ১ শহরের উত্তর দিকের পুরনো অলিগলির মধ্যে এমন একটা গলি আছে, যার নাম কেউ ঠিক ঠাহর করতে পারে না। লোকমুখে বলে “লালগলি”, কেউ আবার “ঠাকুরদালান গলি” বলে ডাকেন— কিন্তু অফিসিয়াল মানচিত্রে তার কোনও অস্তিত্ব নেই। এই গলির একদম শেষে, পুরোনো পাথরের সিঁড়ি ঘেঁষে, এক আধভাঙা দোকান। বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না কী বিক্রি হয় সেখানে। দোকানের নামফলক নেই, কাচের জানালাও নেই—শুধু লাল কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা কাচবিহীন গেট। কিন্তু সন্ধ্যে নামতেই ভেতর থেকে একরকম আলো ঝলসে ওঠে, যেন কেউ ভিতরে রক্তমাখা প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে। দোকানটির নাম কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে না—যারা আসে, তারা ঠিক পথ খুঁজে নেয়।…
-
-
মীনাক্ষী ধর ভোর সাড়ে পাঁচটা। গ্রামের কুয়াশার চাদরের ভেতর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে চারপাশের ধুলোমাখা জগৎ। রেনু মণ্ডল মাটির বারান্দায় বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লাল চা হাতে নিয়ে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাড়ির ভেতর গরুর ঘটি থেকে টুপটাপ করে দুধ পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, আর রান্নাঘর থেকে বীণা খাঁর গলা — “আজি মাইনসেগো পেট ভরাই খাওয়াবার হইব না, রেনুবৌদি?” — রেনু কিছু বলল না। তার চোখে ক্লান্তি ছিল না, কিন্তু শান্তিও ছিল না। চোখদুটো যেন অনেক দূর দেখছিল, অনেক গভীরে—সেই জায়গায়, যেখানে শব্দ পোঁছায় না, শুধু গর্জন জমে থাকে। তার স্বামী কুন্তল মারা গিয়েছিল এই বাড়ির একচালা ঘরের…
-
ঊর্মি পাল অধ্যায় ১: “অশ্রু ও বিষ” অমৃতা এক কঠিন সন্ধ্যায় ঘরের জানালার কপাট বন্ধ করে বসেছিল। তার চারপাশে সন্ধ্যার অন্ধকার পসরানো শুরু করেছে, কিন্তু তার মনে এখনও মায়ার মতো সাদা আলোয় একটা বিষণ্ণ রূপের প্রতিফলন। এক সময় সে স্বপ্ন দেখেছিল, কী সুন্দর হবে তার জীবন! কিন্তু এখন তার সামনে শুধু একটা দীর্ঘ অন্ধকার পথ, যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়। তার জীবনের সবকিছুই যেন একটা অদৃশ্য বেষ্টনীতে আটকে গেছে, পরিবারের চাহিদা, তার স্বামী রোহিতের প্রত্যাশা, তার সন্তান মাহির স্নেহের আগ্রহ—এসব কিছু মিলে এক ভারী বোঝা হয়ে গেছে। রোহিত একজন সফল ব্যবসায়ী, কিন্তু তার সাফল্যের পেছনে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।…
-
মৌমিতা ঘোষ অধ্যায় ১: প্রথম সংকট অঞ্জলী রায় সকালে অফিসে পৌঁছাতেই এক তরুণ পুলিশ অফিসার তার সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাতে একটি ফাইল, আর চোখে তীব্র উদ্বেগ। “স্যার, ডিএসপি ম্যাম, আপনার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কেস এসেছে।” অঞ্জলী দ্রুত ফাইলটি খুললেন। ফাইলের মধ্যে ছিল এক নারীর মৃতদেহের ছবি, এবং সাথে কয়েকটি প্রতিবেদন। ছবিতে ওই নারীর চোখ বন্ধ, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, এবং শরীরের চারপাশে অসংখ্য রক্তের দাগ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নারীর শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি, তবে তার মৃত্যু সন্দেহজনক। এই কেসের পেছনে কোনো অপরাধী রয়েছে কিনা, তা জানার জন্য তদন্ত শুরু করতে হবে। অঞ্জলী একটি গভীর শ্বাস নেন।…
-
ঈশিতা বন্দ্যোপাধ্যায় অধ্যায় ১: ছায়া নামে লেখা রাত তখন প্রায় তিনটে। কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে, গড়িয়া অঞ্চলের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে ইরা সেন ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ভাসা চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে মনস্থির করলেন—আজ লিখতেই হবে। এই সপ্তাহের শেষে পাণ্ডুলিপি পাঠানোর সময়সীমা। কিন্তু ইরার ভেতর যেন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—লিখবেন, কিন্তু নিজের নামে নয়। নামটা হবে আগের মতোই—রুদ্র সেন। ইরা জানতেন, আজকের এই সাহিত্যের জগতে, একজন নারী যখন সাহসী, স্পষ্টভাষী, এবং পুরুষদের অন্তর্জগৎ বিশ্লেষণ করে—তাকে সহজভাবে নেওয়া হয় না। অযথা তর্ক, ট্রোল, অবমাননা—এসবই তার পূর্বের অভিজ্ঞতা। অথচ যখন “রুদ্র সেন” নামে তিনি পুরুষ সেজে লেখেন, তখন সেই একই ভাষা প্রশংসা কুড়ায়, পুরস্কার পায়,…