অনিন্দিতা রায় পর্ব ১ — ট্রেনের জানালা শিয়ালদহ স্টেশন গমগম করছে মানুষের চিৎকারে, বোঝাই ট্রেনের হুইসেলে আর উদ্বাস্তুদের কান্নায়। আগস্টের আর্দ্র গরমে ছাপোষা মানুষের ভিড় যেন এক বিশাল ঢেউ হয়ে উঠেছে, যাদের কোনো ঠিকানা নেই, আছে শুধু ছিন্ন দেহের মতো ভেঙে যাওয়া স্মৃতি। অঞ্জলি দাঁড়িয়ে আছে ভাই হরিদাসকে পাশে নিয়ে, হাতের মুঠোয় একটা ভাঁজ করা চিঠি। সেই চিঠি খুলনা থেকে সঙ্গে এনেছে, অন্য কিছু আনতে পারেনি। ট্রাঙ্কে আছে সামান্য কাপড় আর কয়েকটা হাঁড়ি-পাতিল, কিন্তু বুকের ভেতর যেটা নিয়ে এসেছে সেটা অদৃশ্য—শিকড় ছেঁড়া এক গ্রামের ঘ্রাণ, উঠোনে ঝরা শিমুলফুল, আর রহিমার মুখ। চারপাশে রেললাইনের শব্দে ভরে উঠলেও অঞ্জলি শুনতে পাচ্ছে কেবল…
-
-
জয়ন্তী বৰা সূৰ্যটো আজিও আগৰ দৰে উঠে, পিঠিত গৰম মেলে, কিন্তু ১৯৪৭ চনৰ এই জুলাই মাহত গোলাঘাটৰ ৰূপহী পথাৰ যেন অলপ বেছি চুপচাপ। ৰামেশ্বৰ হাজৰিকা ৰাতিপুৱাৰে হাঁহ-বগলী উৰা পথাৰখনেদি খোজ দি গৈ থাকোতেই লক্ষ্য কৰিলে—জোনাকিৰ দৰে চকচকোৱা পানীত অলপ ধূলি মিহলি হৈ গৈছে। বতাহত যেন কোনো আশংকাৰ গন্ধ। তেওঁৰ গাৰ গামোচাটো পিঠিত জপিয়াই আছিল, কিন্তু ওঁঠত চিৰচেনেহৰ হাঁহিটো নাছিল। হাঁহিটো যে ক’ত হেৰাল—সেয়া তেওঁ নিজেই নাজানে। গাঁৱখনত আটাইতকৈ ডাঙৰ ধাননি পথাৰ তেওঁৰ; যদিও নাম-ধামতে হাজৰিকা, মনত সদায় আছিল এক কৃষকৰ পৰিচয়। ৰাতিপুৱাৰ পাখি চিঞৰ আৰু গাঁওবাসীৰ হালধীয়া কাপোৰেৰে পথাৰৰ কোণ চাফা কৰা দৃশ্যবোৰই যেন কৈছিল — “সিহঁত হ’ব পাৰে দেশভাগৰ…
-
বহ্নি চক্রবর্তী পর্ব ১ পদ্মার ওপার থেকে সূর্য যখন মাথার ঠিক ওপর উঠে এল, তখন রমিজ আলী তার নৌকাটা ধীরে ধীরে ঘাটে বাঁধছিল। ঘাটটা এখন অস্থায়ী—বাঁশের খুঁটি দিয়ে বাধানো, পেছনে শুকনো খড়ের ছাউনি। সকালে তিনটে পরিবার পার করে এনেছে ওপার থেকে, এখন আবার পাঁচজন অপেক্ষা করছে যাবার জন্য। রমিজ কারো নাম জিজ্ঞেস করে না, ধর্মও না, শুধু বলে—“চুপচাপ বসেন, ভয় পাইয়েন না।” তার নৌকায় ওঠা মানেই যেন এক নীরব চুক্তি—পদ্মা কিছুই মনে রাখে না, আর মাঝিও না। বছরখানেক আগেও এই নদীর পাশে ছিল তার স্ত্রী আর ছেলের কুটির, দুজনেই এক রাতে উধাও। কেউ বলে হিন্দুদের দাঙ্গাকারীরা তুলে নিয়ে গেছে, কেউ…
-
সোমা মিত্র আমার স্মৃতি পুরোনো অ্যালবামের মতো—কিছু ছবি রঙ হারিয়েছে, কিছু এখনো ঝকঝকে। উত্তর কলকাতার যে বাড়িটাতে আমার জন্ম, সেই লালবাড়িটা এখন আর নেই। সেটার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে চকচকে অ্যাপার্টমেন্ট, নাম—“মঙ্গলতারা হাইটস”। মাঝে মাঝে ভাবি, নামটা কত গ্ল্যামারাস, অথচ সেই নামের নিচেই চাপা পড়ে গেছে আমার ছোটবেলার চটি পায়ে দৌড়ানো বারান্দা, কাঁঠালের গন্ধমাখা দুপুর, আর দিদার হাতে বাঁধা তুলসী মালা। আমাদের বাড়িটা ছিল এক রকম রেওয়াজি—সকালে প্রার্থনা, দুপুরে শব্দ করে পাখার ঘুরন্ত আওয়াজ, আর সন্ধ্যেবেলা harmonium-এর একঘেয়ে সুর। বাবা অফিসফেরতা এককাপ চায়ে দিন শেষ করতেন, আর মা রান্নাঘরের কোণে বসে চুপচাপ মাছ কুটতেন—কখনোই অকারণে হাসতেন না। তবু আমি জানতাম, মা…